“ভঙ্গুর পৃথিবী ছেড়ে নক্ষত্রের পানে” বইটিতে রয়েছে পৃথিবীর ভঙ্গুরতা নিয়ে আলোচনা, পূর্বতন ধ্বংসযজ্ঞের (পঞ্চ মহামৃত্যু) সালতামামী, তুষারযুগের হিস্যা এবং আগামীতে মানুষের সভ্যতার টেকসইত্ব আর বসবাসযোগ্যতা।
এই বইটি মূলত লিখিত হয়েছে কিশোর-কিশোরীদের জন্য। কী করলে পৃথিবীর নামের গ্রহটির ক্ষতি হয় আর কী করলে গ্রহটির উপকার হয় সেটি জানানো হয়েছে এই বইয়ে। একই সাথে নজর দেওয়া হয়েছে মহাশূন্যের দিকে। কীভাবে পৃথিবীর বাইরে বসতি স্থাপন করা যায়, কীভাবে দূর নক্ষত্রের পানে ছুটে যাওয়া যায় এবং এই মহাশূন্যযাত্রার আগে কীভাবে পৃথিবীতে টিকে থাকা যায় সে সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিই এই বইয়ের উদ্দেশ্য। মূলত সকল শিল্পী, বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ, চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ, স্বেচ্ছাসেবী, অ্যাক্টিভিস্ট, সমাজকর্মী তথা পৃথিবীর সকল মানুষেরই উচিত এই পৃথিবীর যত্ন নেওয়া। এই বইটি সেই উদ্দেশ্যেই লেখা হয়েছে।
লেখক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী জানান, এই বই লেখার মূল প্রেরণা তিনি পেয়েছেন সুদূর জার্মানির এক কনফারেন্স থেকে। ২০১৩ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ইউনিভার্স অ্যাওয়ারনেস’ প্রোগ্রামের অধীনে জার্মানির হাইডেলবার্গ শহরের ‘হাউস ডের অ্যাস্ট্রনমি’ প্রতিষ্ঠানে বিশ্বের নানা প্রান্তের সৌখিন জ্যোতির্বিদ এবং অ্যাকটিভিস্ট-শিক্ষকরা জড়ো হয়েছিলেন পাঁচদিনব্যাপী এক কর্মশালায়। সেখানে দলীয় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পৃথিবীর ভঙ্গুরতাকে কীভাবে কিশোর-কিশোরীদের মাঝে উপস্থাপন করা যায় সেই বিষয়ক একটি প্রেজেন্টেশন তৈরি করা হয়। সেই কাণ্ডটিই বর্তমান বইয়ের বীজ হিসেবে কাজ করেছে বলে জানান ফারসীম।
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী বিজ্ঞান পড়েন এবং পড়ান, বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করেন, সংগঠন করেন, লেখালেখিও করেন। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান-চর্চার নানা কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। বুয়েট থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন, এখন সেখানেই পড়ান। ক্যানাডার ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি। বাংলা একাডেমীর একজন জীবন-সদস্য। উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা: ‘অপূর্ব এই মহাবিশ্ব’ (যৌথ, ২০১১), ‘মহাকাশের কথা (২০১১)’, ‘ন্যানো(২০১০)’, ‘অংকের হেঁয়ালি ও আমার মেজোকাকুর গল্প(২০০৭)’, ‘জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান পরিচিতি(২০০০)’ এবং ‘জ্যোতির্বিজ্ঞান শব্দকোষ(১৯৯৮)’। বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের বিজ্ঞান বিশ্বকোষের তিনি অন্যতম লেখক-সংকলক ছিলেন। তিনি বাংলা একাডেমী থেকে বাংলা ১৪০৫-১৪০৬ সনের ‘হালিমা-শরফুদ্দিন বিজ্ঞান লেখক পুরস্কার’ পেয়েছেন।
পৃথিবীই আমাদের একমাত্র বাসস্থান। এখানেই আমাদের আবির্ভাব আর এখানেই আমাদের বিকশিত হওয়া। এই পৃথিবীটা কতই না আদর যত্ন করে আমাদের লালন করেছে তার গর্ভে, থাকতে দিয়েছে, খেতে দিয়েছে, তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে দিয়েছে। কিন্তু আমরা অকৃতজ্ঞের মত নির্মম ভাবে আমাদের এই উপকারি পৃথিবীর অপকার করে যাচ্ছি। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনে ভোগ বিলাসিতা আনার জন্য ধ্বংস করছি পৃথিবীর পরিবেষ। এতে কিন্তু আমাদেরই ক্ষতি হচ্ছে। আমরা ধীরে ধীরে পৃথিবীকে করে যাচ্ছি ব্যাসের অযোগ্য। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছি একটা দগ্ধ গ্রহ, যেখানে চারিদিকে শুধু আবর্জনা। এতে করে কিন্তু আমাদের ভবিষ্যতের অস্তিত্ব আশঙ্কার মধ্যে পরে যাচ্ছে। সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে বিলুপ্তির। মানব সৃষ্টি এসব সমস্যা ছাড়া পৃথিবী ব্যাসের অযোগ্য হবার জন্য আরো অনেক কারনই আছে সেসব এই গ্রন্থে লেখক উল্লেখ করেছেন। পৃথিবীতে ৫৪ কোটি বছর আগে বহুকোষী জীবের আবির্ভাব হয়েছে। তখন থেকে প্রাকৃতিক বিভিন্ন কারনে হয়ে এসেছে অনেক গন বিলুপ্তি। প্রায় একেবারে সমূলে উৎপাটিত হয়েছে প্রান। কি কারনে,কখন এবং কিভাবে সেসব গন বিলুপ্তি হয়েছে তার বর্ণনা পাওয়া যাবে বইটিতে। কালের আবর্তনে বিভিন্ন সভ্যতার ধ্বংসের কারন জানা যাবে বইটা পড়লে। এছাড়াও কিভাবে পৃথিবী বাসের অযোগ্য হয়ে যেতে পারে এবং এর থেকে নিস্তারের উপায় কি তার সমাধান এখানে দেয়া হয়েছে। প্রান উপযোগী গ্রহ, গ্রহের আয়ুষ্কাল, গোল্ডিলক্স গ্রহের সম্ভাবনা এবং সেটি কি তার বিস্তারিত বিবরন জানা যাবে বইয়ে। ভবিষ্যতে কোন একসময় হয়ত আমাদের এই পৃথিবী ছাড়তেই হবে এমনকি এই সৌরজগতও ছাড়তে হবে এবং ছাড়ার পর আমরা কোথায় যেতে পারি এবং কিভাবে, কোন ধরনের প্রযুক্তি দরকার তা যানা যাবে বইটি পড়লে। মূলত এই বইয়ের মূল উদ্দেশ্য হল পৃথিবীর প্রতি আমাদের সহনশীল হওয়া এবং এর যত্ন করা। কারন আমাদের এই পৃথিবীটা অত্যন্ত সংবেদনশীল একটা আবদ্ধ সিস্টেম। তাই অনেক সহজেই এটা আক্রান্ত হতে পারে। বইটা পড়লে আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভাবনার খোরাক পাবেন। জানতে পারবেন পৃথিবীর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ। এই বইয়ে উল্লেখিত লেখকের আমার ভালো লাগা সবচেয়ে সুন্দর উক্তিটি হল, “ঋণ করে হলেও ঘি দিয়ে ভাত খান”। বইয়ের বাহ্যিক দিক নিয়ে কিছু বলা দরকার। বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন সাব্বশাচি হাজরা। প্রচ্ছদটা অসাধারন লেগেছে আমাদের কাছে। এখানে পৃথিবীর ভঙ্গুরতা আর পাখি ধারা নক্ষত্র পানে যাত্রা বোঝানো হয়েছে। প্রথমা প্রকাশনী থেকে বের হওয়া এই বইটির পৃষ্ঠা গুলোও অনেক সুন্দর। বইয়ে উল্লেখিত বিভিন্ন ছবি সহজ ও সুন্দর বাংলায় বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। আর বিশেষ করে পুরো বইয়ে কোন প্রিন্ট মিস্টেক নেই। আশা করি সবাই বইটা পড়বেন আর আমাদের স্বাদের পৃথিবীটার কিছুটাও হলেও যত্ন নিতে আগ্রহী হবেন।
Number one fault-- Overpriced. ৭০ পাতার বইয়ের গায়ের মূল্য ১৭০!
জাফর ইকবাল স্যারের পর ফারসীম স্যারের বই পড়েই বিজ্ঞানের বই পড়ার সূচনা। আমার পছন্দের লেখকও বটে। কিন্ত এই বইটা খুবই সংক্ষেপিত। সাহিত্যমান বিবেচনায় ভাল, কিন্ত সাহিত্যমান ভাল করতে গিয়ে বিজ্ঞানটাই sacrifice হয়ে গেছে। প্রতিটা অধ্যায়ের বিশদ আলোচনার সুযোগ থাকলেও লেখক ভাসা ভাসা কিছু লিখে গেছেন। বিজ্ঞানের বই হিসেবে দুর্বল একটা বই। অন্য কেউ হলে 2.5 star দিতাম, কিন্ত বাংলায় বিজ্ঞানের বইয়ের অভাব আর বইয়ের ভাষা সুন্দর হওয়ায়, তিন দিলাম।