কার্ল মার্কসের মতো মানুষদের ব্যক্তিজীবন সবসময়ই আড়ালে চলে যায় তাদের কীর্তি এবং অবদানের বিশালতার কারণে। মার্কসের ব্যক্তিজীবন আড়াল করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছেন একদিকে তার ভক্তরা, অন্যদিকে শত্রুরা। ভক্তরা করেছেন, যাতে মার্কসের পয়গম্বরসুলভ ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আর শত্রুরা করেছেন এই কারণে যে মার্কসের বিরোধিতা করতে বসেও ব্যাপক প্রশংসা না করে কোনো উপায় থাকে না। তারপরেও কার্ল মার্কসের অনেকগুলো জীবনকথা প্রকাশিত হয়েছে। বলাবাহুল্য, সেগুলো একমুখী বিধায় সেখানে বক্তমাংসের মানুষটি অনুপস্থিত।
জন্ম ২০ জনুয়ারি ১৯৬৫, নাটোরে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক। স্নাতকোত্তর ডিগ্রী স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে। সমকালীন মূলধারার বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অপরিহার্যতা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। অনবরত বাঁকবদল তাঁর সাহিত্যিকতার প্রধান বৈশিষ্ট। বিষয় ও আঙ্গিকে, মাধ্যম ও প্রকরণে তাঁর স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত অবস্থান সকল মহলেই স্বীকৃত। পেয়েছেন বাংলা একাডেমিসহ দেশের প্রধান প্রায় সকল সাহিত্য পুরস্কার।
মহৎ মানুষের কীর্তির আড়ালে তার দোষ,গুন চাপা পড়ে যায়। গুণগ্রাহী ভক্তদের অঢেল সম্মানের ভিড়ে প্রকৃত সত্য জানা দুরূহ হয়। মার্কসের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও প্রাসঙ্গিক। তার নাম নিয়ে বিপ্ল'ব হয়েছে কিংবা বিপ্ল'বের নামে হানাহানি। সবকিছু ছাপিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে এখনও মার্কস উচ্চারিত হয় এবং হবে।
মার্কস যুগপৎ প্রতিভাবান,পরিশ্রমী। যৌবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে লাইব্রেরিতে। মার্কসের জন্মের পূর্বেই তার পিতা সপরিবারে ইহুদি থেকে খ্রিষ্টান হয়েছিলেন সেটা অবশ্য জাগতিক সুবিধার জন্যই। প্রথম যৌবনে মার্কস ছিলেন হেগেল প্রভাবিত। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এ নিয়ে হাঙ্গামাও বাধিয়েছেন। জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তাঁর চেয়ে ৫ বছরের বড় জেনিকে। পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্বজ্ঞানহীন ছিলেন মার্কস;যাননি পিতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও। দারিদ্র তার আমৃত্যু সঙ্গী ছিল কেননা চাকুরি বলতে তেমন কিছু তিনি করেননি। জীবনের অর্ধাংশ যাযাবরী জীবন কাটিয়েছেন। জার্মানী,ফ্রান্স,বেলজিয়াম কোথাও থিতু হতে পারেননি। কারন তাঁর কলম। জীবদ্দশায় কয়েকটি পত্রিকা চালিয়েছেন। শেষে পরিবার সহ আশ্রয় পেয়েছেন ইংল্যান্ডে। আর্থিক দৈন্য,শারীরিক দুর্বলতা মার্কসের নিত্য সঙ্গী ছিল। আর্থিক বিষয় কিংবা অনেক লেখাও এঙ্গেলস খাঁটি বন্ধু হিসেবে লিখে দিয়েছিলেন। হাতে টাকা আসলে টাকা উড়াতেন দুহাতে। পরিবারকেন্দ্রিক হিসেবে মার্কস বুর্জোয়া। মার্কসের সাথে খুব কম মানুষের বনিবনা হতো কারন মার্কস দ্বিধাহীন সমালোচনা করতেন।
কার্ল মার্কসের ব্যক্তিজীবন নিয়ে আমার পড়া প্রথম বই। সেদিক বিবেচনায় বইটাকে মার্কসের পৃষ্ঠপোষকতার আলোকে লেখা বলে মনে হয়েছে। এবার বিরাগভাজন কারো দৃষ্টিকোণ থেকে পড়ে দেখতে পারলে নিজস্ব একটা কাঠামো দাঁড় করাতে পারতাম।
কার্ল মার্কস একজন অসম্ভব মেধাবী মানুষ ছিলেন, এতে কেউই কখনও দ্বিমত পোষণ করতে পারবে না। সেই সাথে তার দূরদর্শিতাও প্রশংসনীয়। তার সারাজীবন ভালো টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে, এ সম্পর্কে ভালো ধারণা পেলাম৷ ক্ষুরধার মস্তিষ্কের মানুষ হিসেবে প্রয়োজনের তুলনায় হয়তো কিছুটা বেশিই স্পষ্টভাষী ছিলেন৷ একারণে অনেক বেশি পরিমাণে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে৷ সেই সাথে একটা ব্যাপার মনে হয়েছে, কারো সাথে সম্পর্ক বিরূপ দিকে মোড় নিলে সেটাকে তিনি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি। সেসব নিয়ে অনেক বেশিই ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন। হয়তো মেধাবী মানুষদের অতিরিক্ত স্পর্শকাতরতার অভিশাপ কাজ করেছে তার বেলাতেও।
কার্ল মার্কসের কীর্তির বাইরে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতুহল থাকলে বইটি পড়া যেতে পারে।