What do you think?


অবনীন্দ্র রচনাবলী
423 pages, Hardcover
First published January 1, 1973
About the author
Abanindranath Tagore
68 books54 followersAbanindranath Tagore (bn: অবণীন্দ্রনাথ ঠাকুর), was the principal artist of the Bengal school and the first major exponent of swadeshi values in Indian art. He was also a noted writer. He was popularly known as 'Aban Thakur'. Abanindranath Tagore was born in Jorasanko, Calcutta, to Gunendranath Tagore. His grandfather was Girindranath Tagore, the second son of Prince Dwarkanath Tagore. He is a member of the distinguished Tagore family, and a nephew of the poet Rabindranath Tagore. His grandfather and his elder brother Gaganendranath Tagore were also artists.
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 2 of 2 reviews
March 4, 2015
অনেকদিন ধরেই জমে ছিল বইটা। পড়বো, পড়ছি বলে হাতে নিতে নিতে সেই মাস কাবার। বই মানে পিডিএফ। ১৯৭৩ সালে খালেদ চৌধুরীর প্রচ্ছদ পরিকল্পনায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত অবনীন্দ্র রচনাবলীর পয়লা খণ্ড।
এই প্রথম খণ্ডে সংকলিত হয়েছে তার স্মৃতিকথাগুলো। ‘আপন কথা, ঘরোয়া, জোড়াসাঁকোর ধারে’ আর শেষটায় সংযোজনী।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা গুণেন্দ্রনাথ, সর্ম্পকে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের জ্যাঠতুতো ভাই। সেই সুত্রে তার আবাল্যকাল কেটেছে জোড়াসাঁকোর সেই বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে। বাড়ির যিনি হর্তাকর্তা, তিনি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। লোকে বলত মহর্ষি আর বাড়ির ছোটরা কর্তাদাদামশায়।
কর্তাদিদিমার সাত সাতখানা ছেলে। সব ছেলেরাই কী সুন্দর আর কী রং! তার মাঝে বয়সে যিনি ছোট, রঙের বেলায় তিনিই ছিলেন পিছিয়ে। চামড়ায় চিক্কনতা আনার খাতিরে ছেলেবেলায় তাকে খুব করে মাখানো হতো দুধের সর। সেই কালো ছেলেই শেষমেশ জগত আলো করে বসলেন। বাঙালির সমস্ত আকাশ জুড়ে যিনি আছেন, থাকবেন– রাত্রিদিনের রবীন্দ্রনাথ।
দীর্ঘসময় অবনীন্দ্রনাথ থেকেছেন রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি। লেখালেখির ব্যাপারে তাঁর প্রধান উৎসাহদাতাও ছিলেন তিনি। ঠাকুরবাড়িতে শখের গড়া নাট্যদল খামখেয়ালিতে তখন নিয়ম ছিল সভ্যদের নিয়মিত পড়তে হবে নিজের লেখা নাটক, প্রবন্ধ কিংবা অন্য যে কোনো যথাকিঞ্চিৎ। সেখানেই অবনীন্দ্রনাথ প্রথম পড়েন ‘দেবীপ্রতিমা’ বলে একটি গল্প। পরে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে প্রায়ই বলতেন— অবন, তোমার লেখাটি কিন্তু বেশ হয়েছিল। সব মিলিয়ে তাঁর লেখার পরিমাণ অবশ্য বেশি নয়, ২৬/২৭ খানি বই। লীলা মজুমদার বলেছিলেন- ..‘এ যেন কবিগুরুর কাঞ্চনজঙ্ঘার পাশে পাথরের ঢিবি। কিন্তু পাথর এত ঝকঝকে, তার ভিতর থেকে এমনি আলো ঠিকরোয় যে..মন বলে হীরে নয় তো?’
খুড়ো ভাইপোর মিল ছিল অনেকই। দুজনেই ছিলেন ইশকুল পালানো ছেলেদের দলে। দিব্যি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতেন, আজ পেটে ব্যথা, কাল মাথাব্যথার ছুতো, রেহাই নেই কিছুতেই! পাকা দেয়াল ঘেরা ক্লাসরুমে যেন দম আটকে আসতো তাঁর।
তবে ছবি আঁকার ঝোঁক তাঁর তখন থেকেই। বাড়িতেও ছিল সমমনা পরিবেশ, গানেঅভিনয়েরঙেতুলিতে ঠাকুরবাড়ি ছিল তখনকার বাঙালিসমাজের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
ছেলেবেলায় অবনীন্দ্রনাথকে বলা হতো বোম্বেটে। রবিঠাকুর তাকে বলতেন পাগলা। সত্যিই ভীষণ দুরন্ত ছিলেন। দস্যিপনায় কখনো বাবামশায় গুণেন্দ্রনাথের শখের জলাধারে রঙ মিশিয়ে দিয়েছেন, দু মিনিটে লালনীল মাছেরা মরে উঠেছে ভেসে। বুড়ো দারোয়ানের দাড়িতে হাত দিয়ে দেখতে গেছেন, বকুনি খেয়ে দুদ্দাড় আসতে হয়েছে পালিয়ে। বাড়ির পোষা পাখির খাঁচা খুলে দুষ্টুমি করে দিয়েছেন সব উড়িয়ে।
এই খ্যাপাটেপনা ছিল শেষ অবধিই তবে উন্মত্ত রূপে নয় বরং সবকিছু ছাপিয়ে স্নিগ্দ্ধতায়, নিজস্বতার ধারা খোঁজার মাধ্যমে। তুমুলভাবে প্রভাবিত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথের কাজে, তবুও হয়ে উঠেছেন নিজের পরিচয়েই ভাস্বর। সঙ্গ দিয়েছেন নাটকের দল গড়ায়। শিল্প নির্দেশনায়, মঞ্চসজ্জায় কাজ করেছেন দুজনে তাল মিলিয়ে। গড়া হয় ড্রামাটিক ক্লাব, এরপর নানা কারণে সেটি ভেঙে গেলে সুত্রপাত হয় ‘খামখেয়ালি’র। নামটি অবন ঠাকুরের নিজের-ই দেওয়া।
এমনি ধারায় যেতো সভ্যদের কাছে নেমতন্নের চিঠি।
খ্যাতিমান বাঙালিদের মধ্যে অক্ষয় মজুমদার আর অর্ধেন্দু মুস্তাফি প্রথম সাহেবদের এক বিদ্রুপের জবাব দিতে অভিনয়ে নেমেছিলেন কোরিনথিয়ান থিয়েটারে। এরপর ধীরে ধীরে মঞ্চস্থ হয় মাইকেল মধুসূদন দত্তের শর্মিষ্ঠা, দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পন, টেকচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল, বঙ্কিমের আনন্দমঠ। ক্রমে বাংলা থিয়েটারে চলতে থাকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথের রচিত নানা নাটক মঞ্চায়নের যুগ।
জোড়াসাঁকোর পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে অবশ্য নাটক করার ঐতিহ্য আরো অনেক পুরোনো। এইসব ঘরোয়া নাটকে বরাবরই দাপুটে অভিনয় করেছেন অবনীন্দ্রনাথ। পছন্দ করতেন কমিক রোলগুলো, যেখানে রসের সুযোগ আছে। চারপাশের নানা লোকজনকে তিনি খেয়াল করতেন শিল্পীচোখের তন্ময়তায়। তারপর সেই পোশাকআশাক, কথা বলবার ধরনকে ফুটিয়ে তুলতেন প্রয়োজনীয় চরিত্রে, পরতে পরতে।
অবন ঠাকুরের পয়লা শখ ছিল এস্রাজ বাজানো। অবশ্য শখ এবং শৌখিনতার চল ছিল ঠাকুর পরিবারের মজ্জাগত। সেকালে জমিদার বাবুদের শখ ছিল পায়রা ওড়ানো, দামি পাথর সংগ্রহ, দূলর্ভ ছবি কিংবা মূর্তি সংগ্রহ, নানা দেশি/ বিদেশি পশুপাখি পোষা, শখ ছিল বিলাসে- বসনে।
প্রথম ছবি আঁকতে শুরু করেন বাড়িতে শিক্ষকের কাছে, বড় ভাইদের পাশে বসে। ভালো আঁকার হাতের কারণে সুনামও হলো কিছুটা।
সংস্কৃত কলেজের পর তিনি ছবি আঁকা শিখতে শুরু করেন আর্ট স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল গিলার্ডির কাছে। মাস তিনেকের মধ্যেই ইউরোপীয় রীতির অঙ্কনে এতোটা দক্ষ হয়ে ওঠেন যে পরবর্তীতে তাকেই বহাল করা হয় এই পদে। কাজের কিছুই শিখলেন না বলে মায়ের যে আক্ষেপ ছিল, ছেলের খ্যাতি অর্জনের মাধ্যমে তা এবার ঘুচতে শুরু করে।
এই সময়েই সারা ভারত জুড়ে শুরু হয় স্বদেশি আন্দোলনের ধুম। বিদেশি পণ্য, বিলেতি পোশাক এমন কী ইংরেজি ভাষার বদলে শিক্ষিত বাঙালিসমাজ ঝুঁকে পড়ে সর্বত্র বাংলার প্রচলনে। প্রভিনসিয়াল কংগ্রেসে রবি ঠাকুরের নেতৃত্বে উগ্র ইংরেজপ্রেমীদের বুলির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদে নামলেন অবনীন্দ্রনাথ ও অন্যান্যরা। একই সময়ে অবনীন্দ্রনাথ খুঁজতে শুরু করলেন ভারতীয় চিত্রশিল্পের নিজস্ব ভাষা। ফরাসী প্রভাব এবং আঙ্গিক মুক্ত, সরল এবং সহজ তুলির বুনন, যে ছবি হবে অভিজাত মোগলাই খুশবুর বাইরে এসে, গেরুয়া মাটির ঘ্রাণ মাখা।
স্বদেশি ধারায় অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ছবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ‘শাজাহানের মৃত্যু’। এই ছবির জন্য দিল্লির দরবার থেকে তিনি জিতেছিলেন সোনার মেডেলও।
ছবি আঁকা, মঞ্চসজ্জা কিংবা লেখালেখির যে ব্যাপারখানা অবনীন্দ্রনাথকে দিয়েছে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে স্বাতন্ত্র্য, তা পটুত্ব নয়, বরং সহজবোধ্যতা। একেবারেই নিজের চোখে, নিজের মনকে ভেবে ভালবেসে লিখেছেন আর এঁকেছেন তিনি। গভীরতায়, মমতায়। তাই দিয়েছে তাকে নিজস্বতা। লেখার কলমে তুলির নরম টান ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা।
অবন ঠাকুরের ছবি নিয়ে এক ভদ্রলোক মন্তব্য করেছিলেন– 'আপনার ছবি দেখলে আঁকা মনে হয় না মোটেই। মনে হয় যেন কাগজের ওপরেই ছিল ঐ ছবি।'
অবনীন্দ্রনাথ পরবর্তী জীবনে ছবি আঁকার অভ্যাস করেন জাপানি শিল্পী টাইক্কান এবং হিশিদার কাছে। এদের সঙ্গও তার অঙ্কনরীতিকে করেছে সমৃদ্ধ। সিস্টার নিবেদিতা, স্বামী বিবেকানন্দ এবং জাপানি বিপ্লবী ওকাকুরারর সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণও কাছাকাছি সময় জুড়েই।
নিজহাতে শিখিয়েছেন প্রখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসু এবং যামিনী রায়কে। প্রতিষ্ঠা করেছেন ইণ্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট, সারা দেশ থেকে প্রাচ্যের শিল্প নিদর্শনের নানা নমুনা জহুরির চোখে, যত্ন নিয়ে জড়ো করেছেন ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতা এবং উৎসাহে চেষ্টা চালিয়েছেন দেশীয় ছবিকে সাধারণ লোকদের মাঝেও পরিচিত করে তুলতে। শেষ জীবনে মেতেছেন মাটির পুতুল গড়ায়, নিজ রীতিতে, সেই একই সরলতার আঁচড়ে কাদামাটির তালে চিরায়ত রূপ ছেনে তোলার কাজে।
এই স্মৃতিকথায় প্রেরণাদাতা হিসেবে নেপথ্যে,প্রকাশ্যে বার বারই এসে দাঁড়িয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।
যদিও স্মৃতির সুত্র নদীধারার মতো চিরদিন চলে না, ফুরোয় এক সময়। ছবিতে, লেখাতে, গল্পে কোনো গতিকে তারা জায়গা পেলে হয়তো বর্তে যায় বর্তমানে। নইলে পুরনো ঝুলের মতো হাওয়ায় উড়ে যায় একদিন হঠাৎ কাউকে কিছু না জানিয়ে…
মগ্ন হয়ে চোখ বুলিয়ে যাওয়ার পালা ফুরিয়ে একসময় ফুরিয়ে যান অবন ঠাকুরও। লম্বা শ্বাস নিয়ে মুড়ে রাখি ‘নরম’ বইখানা।
এই প্রথম খণ্ডে সংকলিত হয়েছে তার স্মৃতিকথাগুলো। ‘আপন কথা, ঘরোয়া, জোড়াসাঁকোর ধারে’ আর শেষটায় সংযোজনী।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা গুণেন্দ্রনাথ, সর্ম্পকে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের জ্যাঠতুতো ভাই। সেই সুত্রে তার আবাল্যকাল কেটেছে জোড়াসাঁকোর সেই বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে। বাড়ির যিনি হর্তাকর্তা, তিনি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। লোকে বলত মহর্ষি আর বাড়ির ছোটরা কর্তাদাদামশায়।
কর্তাদিদিমার সাত সাতখানা ছেলে। সব ছেলেরাই কী সুন্দর আর কী রং! তার মাঝে বয়সে যিনি ছোট, রঙের বেলায় তিনিই ছিলেন পিছিয়ে। চামড়ায় চিক্কনতা আনার খাতিরে ছেলেবেলায় তাকে খুব করে মাখানো হতো দুধের সর। সেই কালো ছেলেই শেষমেশ জগত আলো করে বসলেন। বাঙালির সমস্ত আকাশ জুড়ে যিনি আছেন, থাকবেন– রাত্রিদিনের রবীন্দ্রনাথ।
দীর্ঘসময় অবনীন্দ্রনাথ থেকেছেন রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি। লেখালেখির ব্যাপারে তাঁর প্রধান উৎসাহদাতাও ছিলেন তিনি। ঠাকুরবাড়িতে শখের গড়া নাট্যদল খামখেয়ালিতে তখন নিয়ম ছিল সভ্যদের নিয়মিত পড়তে হবে নিজের লেখা নাটক, প্রবন্ধ কিংবা অন্য যে কোনো যথাকিঞ্চিৎ। সেখানেই অবনীন্দ্রনাথ প্রথম পড়েন ‘দেবীপ্রতিমা’ বলে একটি গল্প। পরে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে প্রায়ই বলতেন— অবন, তোমার লেখাটি কিন্তু বেশ হয়েছিল। সব মিলিয়ে তাঁর লেখার পরিমাণ অবশ্য বেশি নয়, ২৬/২৭ খানি বই। লীলা মজুমদার বলেছিলেন- ..‘এ যেন কবিগুরুর কাঞ্চনজঙ্ঘার পাশে পাথরের ঢিবি। কিন্তু পাথর এত ঝকঝকে, তার ভিতর থেকে এমনি আলো ঠিকরোয় যে..মন বলে হীরে নয় তো?’
খুড়ো ভাইপোর মিল ছিল অনেকই। দুজনেই ছিলেন ইশকুল পালানো ছেলেদের দলে। দিব্যি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতেন, আজ পেটে ব্যথা, কাল মাথাব্যথার ছুতো, রেহাই নেই কিছুতেই! পাকা দেয়াল ঘেরা ক্লাসরুমে যেন দম আটকে আসতো তাঁর।
তবে ছবি আঁকার ঝোঁক তাঁর তখন থেকেই। বাড়িতেও ছিল সমমনা পরিবেশ, গানেঅভিনয়েরঙেতুলিতে ঠাকুরবাড়ি ছিল তখনকার বাঙালিসমাজের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
ছেলেবেলায় অবনীন্দ্রনাথকে বলা হতো বোম্বেটে। রবিঠাকুর তাকে বলতেন পাগলা। সত্যিই ভীষণ দুরন্ত ছিলেন। দস্যিপনায় কখনো বাবামশায় গুণেন্দ্রনাথের শখের জলাধারে রঙ মিশিয়ে দিয়েছেন, দু মিনিটে লালনীল মাছেরা মরে উঠেছে ভেসে। বুড়ো দারোয়ানের দাড়িতে হাত দিয়ে দেখতে গেছেন, বকুনি খেয়ে দুদ্দাড় আসতে হয়েছে পালিয়ে। বাড়ির পোষা পাখির খাঁচা খুলে দুষ্টুমি করে দিয়েছেন সব উড়িয়ে।
এই খ্যাপাটেপনা ছিল শেষ অবধিই তবে উন্মত্ত রূপে নয় বরং সবকিছু ছাপিয়ে স্নিগ্দ্ধতায়, নিজস্বতার ধারা খোঁজার মাধ্যমে। তুমুলভাবে প্রভাবিত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথের কাজে, তবুও হয়ে উঠেছেন নিজের পরিচয়েই ভাস্বর। সঙ্গ দিয়েছেন নাটকের দল গড়ায়। শিল্প নির্দেশনায়, মঞ্চসজ্জায় কাজ করেছেন দুজনে তাল মিলিয়ে। গড়া হয় ড্রামাটিক ক্লাব, এরপর নানা কারণে সেটি ভেঙে গেলে সুত্রপাত হয় ‘খামখেয়ালি’র। নামটি অবন ঠাকুরের নিজের-ই দেওয়া।
এতদ্বারা নোটিফিকেশন/ খামখেয়ালির অধিবেশন।
চৌঠা শ্রাবণ শুভ সোমবার/ জোড়াসাঁকো গলি ৬ নাম্বার..
ঠিক ঘড়ি ধরা রাত সাড়ে সাত/ সত্যপ্রসাদ কহে জোড় হাত,
যিনি রাজী আর যিনি গররাজী/ অনুগ্রহ করে লিখে দিন আজই।”
এমনি ধারায় যেতো সভ্যদের কাছে নেমতন্নের চিঠি।
খ্যাতিমান বাঙালিদের মধ্যে অক্ষয় মজুমদার আর অর্ধেন্দু মুস্তাফি প্রথম সাহেবদের এক বিদ্রুপের জবাব দিতে অভিনয়ে নেমেছিলেন কোরিনথিয়ান থিয়েটারে। এরপর ধীরে ধীরে মঞ্চস্থ হয় মাইকেল মধুসূদন দত্তের শর্মিষ্ঠা, দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পন, টেকচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল, বঙ্কিমের আনন্দমঠ। ক্রমে বাংলা থিয়েটারে চলতে থাকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথের রচিত নানা নাটক মঞ্চায়নের যুগ।
জোড়াসাঁকোর পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে অবশ্য নাটক করার ঐতিহ্য আরো অনেক পুরোনো। এইসব ঘরোয়া নাটকে বরাবরই দাপুটে অভিনয় করেছেন অবনীন্দ্রনাথ। পছন্দ করতেন কমিক রোলগুলো, যেখানে রসের সুযোগ আছে। চারপাশের নানা লোকজনকে তিনি খেয়াল করতেন শিল্পীচোখের তন্ময়তায়। তারপর সেই পোশাকআশাক, কথা বলবার ধরনকে ফুটিয়ে তুলতেন প্রয়োজনীয় চরিত্রে, পরতে পরতে।
''শখের আবার ঠিক বা ভুল রাস্তা কী! এর কি আর নিয়মকানুন আছে? আপনিই সে বেরিয়ে আসে, পথ করে নেয়। যার ভিতরে শখ নেই, তাকে ও কথা বুঝিয়ে বলা যায় না।
ছবিও তাই, টেকনিক, স্টাইল ওসব কিছু নয়। আসল কথা হচ্ছে ওই ভেতরের শখ। আমার বাজনার বেলাতেও হয়েছিল তাই''।
অবন ঠাকুরের পয়লা শখ ছিল এস্রাজ বাজানো। অবশ্য শখ এবং শৌখিনতার চল ছিল ঠাকুর পরিবারের মজ্জাগত। সেকালে জমিদার বাবুদের শখ ছিল পায়রা ওড়ানো, দামি পাথর সংগ্রহ, দূলর্ভ ছবি কিংবা মূর্তি সংগ্রহ, নানা দেশি/ বিদেশি পশুপাখি পোষা, শখ ছিল বিলাসে- বসনে।
প্রথম ছবি আঁকতে শুরু করেন বাড়িতে শিক্ষকের কাছে, বড় ভাইদের পাশে বসে। ভালো আঁকার হাতের কারণে সুনামও হলো কিছুটা।
সংস্কৃত কলেজের পর তিনি ছবি আঁকা শিখতে শুরু করেন আর্ট স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল গিলার্ডির কাছে। মাস তিনেকের মধ্যেই ইউরোপীয় রীতির অঙ্কনে এতোটা দক্ষ হয়ে ওঠেন যে পরবর্তীতে তাকেই বহাল করা হয় এই পদে। কাজের কিছুই শিখলেন না বলে মায়ের যে আক্ষেপ ছিল, ছেলের খ্যাতি অর্জনের মাধ্যমে তা এবার ঘুচতে শুরু করে।
এই সময়েই সারা ভারত জুড়ে শুরু হয় স্বদেশি আন্দোলনের ধুম। বিদেশি পণ্য, বিলেতি পোশাক এমন কী ইংরেজি ভাষার বদলে শিক্ষিত বাঙালিসমাজ ঝুঁকে পড়ে সর্বত্র বাংলার প্রচলনে। প্রভিনসিয়াল কংগ্রেসে রবি ঠাকুরের নেতৃত্বে উগ্র ইংরেজপ্রেমীদের বুলির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদে নামলেন অবনীন্দ্রনাথ ও অন্যান্যরা। একই সময়ে অবনীন্দ্রনাথ খুঁজতে শুরু করলেন ভারতীয় চিত্রশিল্পের নিজস্ব ভাষা। ফরাসী প্রভাব এবং আঙ্গিক মুক্ত, সরল এবং সহজ তুলির বুনন, যে ছবি হবে অভিজাত মোগলাই খুশবুর বাইরে এসে, গেরুয়া মাটির ঘ্রাণ মাখা।
স্বদেশি ধারায় অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ছবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ‘শাজাহানের মৃত্যু’। এই ছবির জন্য দিল্লির দরবার থেকে তিনি জিতেছিলেন সোনার মেডেলও।
ছবি আঁকা, মঞ্চসজ্জা কিংবা লেখালেখির যে ব্যাপারখানা অবনীন্দ্রনাথকে দিয়েছে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে স্বাতন্ত্র্য, তা পটুত্ব নয়, বরং সহজবোধ্যতা। একেবারেই নিজের চোখে, নিজের মনকে ভেবে ভালবেসে লিখেছেন আর এঁকেছেন তিনি। গভীরতায়, মমতায়। তাই দিয়েছে তাকে নিজস্বতা। লেখার কলমে তুলির নরম টান ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা।
অবন ঠাকুরের ছবি নিয়ে এক ভদ্রলোক মন্তব্য করেছিলেন– 'আপনার ছবি দেখলে আঁকা মনে হয় না মোটেই। মনে হয় যেন কাগজের ওপরেই ছিল ঐ ছবি।'
অবনীন্দ্রনাথ পরবর্তী জীবনে ছবি আঁকার অভ্যাস করেন জাপানি শিল্পী টাইক্কান এবং হিশিদার কাছে। এদের সঙ্গও তার অঙ্কনরীতিকে করেছে সমৃদ্ধ। সিস্টার নিবেদিতা, স্বামী বিবেকানন্দ এবং জাপানি বিপ্লবী ওকাকুরারর সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণও কাছাকাছি সময় জুড়েই।
নিজহাতে শিখিয়েছেন প্রখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসু এবং যামিনী রায়কে। প্রতিষ্ঠা করেছেন ইণ্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট, সারা দেশ থেকে প্রাচ্যের শিল্প নিদর্শনের নানা নমুনা জহুরির চোখে, যত্ন নিয়ে জড়ো করেছেন ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতা এবং উৎসাহে চেষ্টা চালিয়েছেন দেশীয় ছবিকে সাধারণ লোকদের মাঝেও পরিচিত করে তুলতে। শেষ জীবনে মেতেছেন মাটির পুতুল গড়ায়, নিজ রীতিতে, সেই একই সরলতার আঁচড়ে কাদামাটির তালে চিরায়ত রূপ ছেনে তোলার কাজে।
এই স্মৃতিকথায় প্রেরণাদাতা হিসেবে নেপথ্যে,প্রকাশ্যে বার বারই এসে দাঁড়িয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।
যদিও স্মৃতির সুত্র নদীধারার মতো চিরদিন চলে না, ফুরোয় এক সময়। ছবিতে, লেখাতে, গল্পে কোনো গতিকে তারা জায়গা পেলে হয়তো বর্তে যায় বর্তমানে। নইলে পুরনো ঝুলের মতো হাওয়ায় উড়ে যায় একদিন হঠাৎ কাউকে কিছু না জানিয়ে…
মগ্ন হয়ে চোখ বুলিয়ে যাওয়ার পালা ফুরিয়ে একসময় ফুরিয়ে যান অবন ঠাকুরও। লম্বা শ্বাস নিয়ে মুড়ে রাখি ‘নরম’ বইখানা।
December 10, 2015
ক্লাসিকের রিভিউ হয় না, বড়োজোর তাকে নিয়ে নিজস্ব মুগ্ধতা প্রকাশের একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। অবন ঠাকুরের "ছবি লেখা"-র সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল অনেক দিন আগে, যখন "রাজকাহিনি" আর "বুড়ো আংলা" উপহার পেয়েছিলাম সেই কোন্ ছোটোবেলায়। তারপর ছুটকো-ছাটকা লেখায় স্বাদ পেয়েছিলাম সেই মানুষটির অতুলনীয় স্মৃতি-চিত্রণ-এর। প্রকাশ ভবন থেকে প্রকাশিত এই রচনাবলি-র প্রথম খণ্ডে যখন একসঙ্গে সেই সবগুলো স্মৃতিকথা পেয়ে গেলাম তখন টেনিদার মতো করে আমারও চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করেছিল: "ডি লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক"। বইটির বিশেষ সম্পদ তার টীকা বা পুস্তক-পরিচয় অংশটি, তবে সেই নিয়ে ভাববেন গবেষকরা। আমরা ওনার স্বাদু কলমে আর বয়ানে পাক হওয়া সেইসব রঙিন গল্প আর কথা বরং উপভোগ করায় মনোনিবেশ করি।
Displaying 1 - 2 of 2 reviews



