১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পেছনে আসলে কে ছিল? ১ জুন মধ্যরাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ভেতরেই বা কিভাবে খুন হলেন জেনারেল মনজুর? এটা কি এক ঢিলে দুই পাখি শিকার? দ্বিতীয় খুনের কাহিনি রাজনৈতিক অভিলাষ, ষড়যন্ত্র ও রক্তপাতের রুদ্ধশ্বাস এক বিবরণ। বাস্তব এই কাহিনি গোয়েন্দা গল্পকেও হার মানায়।
Mashiul Alam was born in northern Bangladesh in 1966. He graduated in journalism from the Peoples’ Friendship University of Russia in Moscow in 1993. He works at Prothom Alo, the leading Bengali daily in Bangladesh. He is the author of a dozen books including Second Night with Tanushree (a novel), Ghora Masud (a novella), Mangsher Karbar (The Meat Market, short stories), and Pakistan (short stories).
ইংরেজী ‘নভেল’ (novel) শব্দটি শুধু ‘উপন্যাস’-এই একটি অর্থই বহন করেনা; ‘নভেল’ এর আরো একটি অর্থ হলো ‘অভূতপূর্ব’ অর্থাৎ কি না যা আগে কখনো দেখা যায়নি। মিরিয়াম-ওয়েবস্টার ডিকশনারী’র তথ্য অনুযায়ী ‘অভূতপূর্ব’ অর্থে নভেল শব্দটির প্রথম ব্যবহার ১৫ শতকে (১৪০১-১৫০০), আর ‘উপন্যাস’ অর্থে ‘নভেল’ এর প্রথম ব্যবহার ১৬৩৯ সালে (দলিল দস্তাবেজে লেখা ঘটনার হুবহু বিবরণ থেকে একই ঘটনার ওপর কল্পনার আশ্রয় নিয়ে লেখা উপন্যাস যে আলাদা এই ধারণা মানুষের বোধহয় বেশ একটু পরেই হয়েছে!)। কথা বলে কিংবা হাতে লিখে কোন একটি ঘটনার বর্ণনা দিতে পারাটা স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন যেকোন মানুষের সহজাত দক্ষতা। কিন্তু সত্য মিথ্যা মিশিয়ে বিভিন্ন চরিত্রকে দিয়ে মনগড়া সব কথা বলিয়ে এক বা একাধিক ঘটনার সুদীর্ঘ বর্ণনা দেবার ক্ষমতাটি অনেকেরই (কিংবা বেশীরভাগেরই) থাকে না। এই ক্ষমতাটি এদের জন্য একটি ‘অভূতপূর্ব’ বিষয়ই বটে (আমরা যখন কোন উপন্যাস পড়ে মুগ্ধ হই, তার পেছনে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে আমাদের বিশ্বাসযোগ্যভাবে সুদীর্ঘ মিথ্যে কথা লেখার অক্ষমতা। আমরা মুগ্ধ হই আর ভাবি “ক্যামনে লিখলো এই লেখা?”)। উপন্যাস লিখবার বেলায় মানুষের গল্প বলবার সর্বজনীন ক্ষমতাটি সম্পূর্ণ নতুন রূপ পায় বলেই কি তবে উপন্যাসকে ‘নভেল’ বলা? হবেও বা। ‘দ্বিতীয় খুনের কাহিনী’ উপন্যাসটি লেখা হয়েছে বাংলাদেশের সপ্তম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তাঁর কথিত হত্যাকারী জেনারেল মনজুর- এই দুইয়ের হত্যাকান্ডের নাটকীয় ঘটনাকে উপজীব্য করে। ইতিহাস বইয়ের পাতায় লেখা শুষ্ক বিবরণীকে উপন্যাস আকারে ধরে মশিউল আলম কি খুব নভেলটি (নতুনত্ব) দেখাতে পারলেন? আমার মতে উত্তরটা হলো, “একেবারেই নয়”!
এই উপন্যাসের উৎসর্গপত্রের এক কোনায় ‘ডিসক্লেইমার’ জাতীয় নোটে লেখা আছে “’দ্বিতীয় খুনের কাহিনী’ বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে লেখা একটি উপন্যাস। তবে এর দৃশ্য-বিবরণ ও চরিত্রসমূহের সংলাপ রচনায় কল্পনার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে”। উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, এটি লিখবার সময় যথেষ্ট কল্পনার আশ্রয় নেয়া হয়নি! বইটির শেষে নির্ঘন্টে বেশ কিছু সহায়ক গ্রন্থ ও নথির উল্লেখ আছে যেগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে উপন্যাসটি লেখা হয়েছে। সহায়ক গ্রন্থগুলোর মাঝে উল্লেখ্যযোগ্যঃ "অ্যাসাসিনেশন অফ জিয়াউর রহমান অ্যান্ড দি অ্যাফটারম্যাথ" (জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী), “এক জেনারেলের নিরব সাক্ষ্যঃ স্বাধীনতার প্রথম দশক" (মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী) ও “আমার সৈনিক জীবন” (মেজর জেনারেল মনজুর রশীদ খান)। এই বইগুলোর সাথে পরিচিত এমন কেউ ‘দ্বিতীয় খুনের কাহিনি” পড়ে যথেষ্টই হতাশ হবেন। সহায়ক গ্রন্থগুলোতে যে ঘটনাগুলোর উল্লেখ আছে মশিউল আলম তাঁর উপন্যাসে ক্রমানুসারে শুধু সেগুলোকে নিয়েই গল্প ফেঁদেছেন, নিজের কল্পনা শক্তির প্রয়োগ ঘটিয়েছেন একেবারে ন্যূনতম পরিমাণে। এতে করে প্লট আক্রান্ত হয়েছে এক ধরণের রিজিডিটি (অনমনীয়তা) দ্বারা। দুর্বল বিবরণী ভঙ্গি উপন্যাসিক হিসেবে মশিউল আলমকে আরো প্রশ্নবিদ্ধ করে। পেশাগত জীবনে সাংবাদিক বলেই হয়তো লেখার ধরণে সাহিত্য কম, সংবাদ পরিবেশনের ঢং-টা বেশী। এই একই কারণে উপন্যাসের ট্র্যাজিক চরিত্র জেনারেল মনজুর পাঠকের মনে যথেষ্ট সহানুভূতি জাগাতে পারেনা, যেখানে জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী’র ৯৩ পৃষ্ঠার নন-ফিকশন বই পুরোপুরি সফল। প্রচলিত সংজ্ঞানুসারে ‘দ্বিতীয় খুনের কাহিনী’ ‘নভেল’ হয়তো হলো, কিন্তু লেখনীর দিক থেকে ‘নভেল’ কিছু হলোনা মোটেই।
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকদের একটি উল্লেখ্যযোগ্য অংশই সাংবাদিকতা পেশার সাথে জড়িত ছিলেন। এঁদের অনেকের ঝুলিতেই আছে নোবেল পুরস্কার (আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, আলব্যার কামু প্রমুখ)। নোবেল জয়ী এই লেখক-সাংবাদিকদের আদর্শে উজ্জীবিত হয়েই কিনা কে জানে আমাদের দেশেও ইদানিং সাংবাদিকেরা সাহিত্য চর্চার দিকে খুব ঝুঁকেছেন। সাংবাদিকতার বৃত্ত ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা ইদানিংকার লেখকদের মাঝে সবচেয়ে বড় নামটি অত্যন্ত হতাশাদায়কঃ আনিসুল হক, যিনি প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে যথায় তথায় গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের নাম কপচিয়ে একের পর এক গর্ভস্রাব প্রসব করেই যাচ্ছেন। মশিউল আলমও এই পথের পথিক হলে তা আতঙ্কের ব্যাপার হবে। মশিউল আলমের উপন্যাসের সমালোচনায় আনিসুল হক কে টেনে নিয়ে আসার কারণঃ দু'জনই সাংবাদিক, দু'জনই ‘প্রথম আলো’ তে কর্মরত, দু'জনই ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন, এবং দু'জনার দু'টি ঐতিহাসিক উপন্যাসই সাহিত্যের গণ্ডদেশে চপেটাঘাত বিশেষ।
‘দ্বিতীয় খুনের কাহিনী’ প্রকাশ করেছে ‘প্রথমা’ প্রকাশন যা ‘প্রথম আলো’র অঙ্গ-সংস্থান। তবে ‘প্রথমা’র অতি-বাণিজ্যিক আচরণে মন দ্বিধাগ্রস্ত হয়, প্রথমা কি প্রথম আলোর অঙ্গ-সংস্থান নাকি অন্ন-সংস্থান? চমৎকারী মোটা কাগজে ছাপানো বইটির মলাটের উজ্জ্বলতা বইয়ের মানকে ছাপিয়ে গেছে। প্রথমার প্রকাশিত বেশীর ভাগ বইয়ের জন্যই কথাটি খাটে। নিম্নশ্রেণীর অগোছালো ২২৩ পৃষ্ঠার একটি উপন্যাস রং ঢং করে ছাপিয়ে তার দাম ৪৫০ টাকা হাঁকতে দেখলে ব্যথিতই হতে হয়।
পুনশ্চঃ জাতি হিসেবে আমরা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। আবেগের আতিশয্যে ‘শ্রদ্ধা’ ও ‘ভালোবাসা’ এই দুটি বিষয়কে আমরা প্রায়ই মিশিয়ে এক করে ফেলি। হুমায়ূন আহমেদ ও মুহম্মদ জাফর ইকবাল কে নিয়ে কথা বলবার সময় অনেকেই, যাঁরা তাঁদের ছাত্র/ ছাত্রী নন, তাঁরাও উপরোক্ত ব্যক্তিদ্বয়ের নামের শেষে ‘স্যার’ পদবী লাগিয়ে কথা বলেন (যেন ‘স্যার’ না বললে শ্রদ্ধা কয়েক ছটাক কম পড়ে যাবে!)। চারপাশের ‘স্যার’ ডাকের বাহুল্যে অনেকেই ধারণা করে নেন যাঁরা লেখালেখি করেন তাদের হয়তো সম্মান করে স্যার-ই ডাকতে হয়। এবছরের বইমেলায় ঘুরবার সময় চোখে পড়লো দু'পাশে দুই নারীবন্ধুর কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে হেঁটে বেড়ানো এক যুবক। পাশ কেটে বেরিয়ে আসবার সময় চকিতে নারী বন্ধুদ্বয়ের উদ্দেশ্যে যুবকের গদগদ কণ্ঠে ছুঁড়ে দেয়া প্রশ্ন আমার কানেও এসে আঘাত করে, “আনিসুল হক স্যারের বই পড় তোমরা?” আমার মনের অন্ধকার এক কোনায় দীর্ঘদিনের লুকিয়ে রাখা আশংকাটি মর্কট-সদৃশ এক যুবক বাস্তবায়িত করে দিলো এক নিমিষে। জয় হোক বাংলার পাঠক সমাজের। প্রতিটি লেখকের গলায় ঝুলুক বাংলাদেশী নাইটহুডের বরমাল্য।
চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নিহত হলেন দেশের রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম। চট্টগ্রাম ডিজিএফআই প্রধাণের নিষেধ সত্ত্বেও জেনারেল জিয়া চট্টগ্রামে এলেন, মাত্র বারজন প্রেসিডেন্ট গার্ডস নিয়ে। সাথে লোকাল পুলিশের ভঙ্গুর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দেশের রাষ্ট্রপতি কোথাও অবস্থান করলে সেখানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেরকম কয়েক স্তরের হবার কথা, তার ছিটেফোঁটাও ছিল না চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে। ফলাফল, ভঙ্গুর নিরাপত্তার সুযোগে কিছু বিদ্রোহী সেনা অফিসারের হাতে খুন হলেন দেশের রাষ্ট্রপতি, তর্ক সাপেক্ষে দেশের ইতিহাসে সবচাইতে 'জনপ্রিয়' সেনা অফিসার। অবশ্য টাইট সিকিউরিটি থাকলেও জিয়া বাঁচতে পারতেন কি না সেই প্রশ্ন রয়েই যায়!
শেষের লাইনটার আগে যেই লাইনটা লিখলাম, ওটাই আসলে জেনারেল জিয়াউর রহমানের "লক্ষিন্দরের বাসরঘরের ছিদ্র", " একিলিস হিল", তাঁর অহংকারের মূল এবং পতনেরও প্রধান কারণ।
পঁচাত্তরের নভেম্বর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে জিয়া পর্যায়ক্রমে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন চাতুর্য এবং নিজের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে। বিদ্রোহী সৈনিকদের মাঝে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে, কোমরের বেল্ট সরোষে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে "আপনারা আমার কথা শোনেন না, আমি আর আপনাদের চীফ থাকবো না" বলে জিয়া নাটকীয়ভাবে বিদ্রোহ থামিয়ে দেন।
এই জনপ্রিয়তাই তার অহংকারের মূল, যেভাবে খুন হয়েছেন শেখ মুজিব, একইভাবে খুন হলেন জিয়া। নাহলে কেন মাত্র বারজন প্রেসিডেন্ট গার্ডস নিয়ে তিনি চট্টগ্রামে যাবেন? যেখানে ডিজিএফআই তাকে সতর্ক করেছে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে একটা বিদ্রোহ ঘনীভূত হচ্ছে! জনপ্রিয়তার দম্ভে জিয়াও তলিয়ে গেলেন!
পরের এবং মূল ঘটনার কেন্দ্রে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর বীর উত্তম যিনি কিনা জিয়াউর রহমান খুন হবার সময়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং। খুব স্বাভাবিক ভাবেই জিয়া হত্যার সমস্ত দায়ভার বর্তায় মঞ্জুরের উপর। মঞ্জুরের সাথে জিয়ার রেষারেষি কারো অজানা নয়। তার উপর জিয়া চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করলে তাকে বরণ করতে যাননি দায়িত্বশীল পদে থাকা মেজর জেনারেল মঞ্জুর।
এখানে আমরা দেখতে পাই, জিয়া হত্যার পরের ঘটনাপ্রবাহের লাগাম মঞ্জুরের হাতে থাকেনি। ঠিক যেমনভাবে শেখ মুজিব হত্যার পরে ছিচল্লিশ ব্রিগেডের কমান্ডার কর্ণেল শাফায়াত জামিল একটি ট্রুপস পর্যন্ত মুভ করতে পারেননি, সেরকম আবুল মঞ্জুর চুড়ান্ত ব্যর্থতার পরিচয় দিলেন! এই বিচারে পরে আসছি।
আবুল মঞ্জুর একজন চৌকস সেনা অফিসার, এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কেউ দ্বিমত পোষণ করেননি। পেয়েছেন সাহসিকতার পদক বীর উত্তম। যদিও এসব পদক নিয়ে বিতর্কের আভাস আমরা পাই মইনুল হোসেন চৌধুরীর বইয়ে, তারপরও বিভিন্ন বইয়ে দেখা যায়, লেখকবৃন্দ আবুল মঞ্জুরকে একজন চৌকস সেনা অফিসার হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি আবুল মঞ্জুর জিয়া হত্যায় জড়িত অফিসারদেরকে সাজা না দিয়ে ঢাকা সেনানিবাসের সাথে ফাইটিং পজিশনে চলে গেলেন। পেরিফেরির একজন অফিসার হয়ে তিনি কেন্দ্রকে নির্দেশ দিলেন তার বশ্যতা স্বীকার করতে! বিপ্লবী পরিষদ গঠন করে তার আনুগত্য স্বীকার করতে নির্দেশ দিলেন! হোয়াট দ্য হেল!
তারপর একগাদা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, পালানোর পথে ধরা পড়লেন তারই অনুগত অফিসারদের কাছে। হলেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার।
আবুল মঞ্জুরের উচিত ছিল হত্যাকারী সেনা অফিসারদেরকে ধরে বিচারের আওতায় আনা, কেন্দ্রের সাথে আনুগত্য রক্ষা করা। তিনি কেন করলেন না?
বিদ্রোহী সেনাদের উদ্দেশ্য ছিল জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টে ধরে এনে তাদের দাবি দাওয়া আদায় করা। কিন্তু তাদেরই একজন, যিনি আবার মঞ্জুরের আত্নীয় হন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর জিয়াকে গুলি করে বসেন। মঞ্জুর প্রথমেই আক্রমণকারী সেনাদের জিজ্ঞাসা করেন, "কে ছিল সে? সে কি মতি? মতি কি ড্রাংক ছিল?"
মঞ্জুর জানতেন সব। জেনেই কিচ্ছুটি করতে পারেননি। নাকি করেননি?
পনেরোই আগস্টের সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারী আপনারা কাকে মনে করেন? জিয়াউর রহমান? হতে পারে।
আমি মনে করি না। আমি যাকে মনে করি সে-ই ব্যক্তিই জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত। তিনিই লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিকে নিয়োগ করেছেন জিয়াউর রহমানকে হত্যা করতে। এরপর বাকিসব কলকাঠি তিনি এমনভাবে নেড়েছেন, সাথে আবুল মঞ্জুরের নিজের বোকামি মিলিয়ে বলির একমাত্র পাঁঠা হলেন মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর বীর উত্তম।
দুটো প্রশ্ন আমি রেখেছি। জিয়া কেন ভঙ্গুর নিরাপত্তা নিয়ে চট্টগ্রামে এলেন? এটার আংশিক উত্তর পেয়েছি। দ্বিতীয় প্রশ্ন, মঞ্জুর কেন কিচ্ছুটি করতে পারলেন না? কেন বোকামি করলেন?
কেন জানি মনে হচ্ছে খুব মেটিকুলাস উপায়ে দুজন জেনারেলকে হত্যা করা হয়েছে!
মশিউল আলম প্রশ্ন দুটোর গভীরে যাননি। প্রশ্ন রেখেই উপন্যাস শেষ করেছেন।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
মশিউল আলমের লেখা প্রথম পড়া হয় প্রথম আলোতে। ভালো লাগতো। জুলাই বিপ্লবের পরে পড়লাম তার দুটো বই। একটা ঘোড়ামাসুদ, আরেকটা এই বইটা। এই বইটাই আগে পড়েছি।
তার লিখনশৈলী অত্যন্ত সুখপাঠ্য। সুন্দর। পড়তে আরাম লাগে।
দ্বিতীয় খুনের কাহিনি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। কিছু কিছু জায়গায় টান টান পলিটিকাল থ্রিলারের আমেজ পাওয়া যায়।
তবে উপন্যাসটা অনেকটা ধারাবিবরণীর মতো হয়ে গেছে। ঢাকা সেনানিবাসের প্রায় প্রত্যেক সেনা অফিসার কিভাবে খবর পেলেন, কোন ভোরে কে কী অবস্থায় খবর পেয়ে কী প্রতিক্রিয়া দেখালেন এই করেই উপন্যাস এগিয়ে গেছে। এতে করে যেটা পাওয়া গেছে, জিয়াউর রহমান এবং আবুল মঞ্জুরের প্রতি সেনা অফিসারদের মনোভাব জানা গেছে। আরও যা হয়েছে, বইটা একটু একঘেয়ে হয়ে গেছে। জিয়া কিংবা মঞ্জুরের কর্মকাণ্ডের স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
তবে বইটার শেষটা বিষন্নতায় মোড়ানো। বোকামি দেখে মঞ্জুরের উপরে বিরক্ত হলেও শেষটায় তার পরিণতির জন্য বিষন্ন লাগছিলো। জানি যে তিনি মরবেন, তবুও চাচ্ছিলাম তিনি যেন পালাতে পারেন।
কয়েক বছর আগে মশিউল আলমের “ঘোড়ামাসুদ” পড়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। এর পর “জুবোভস্কি বুলভার” পড়েছি, পড়েছি সরদার ফজলুল করিমকে নিয়ে লেখা একটা বই (এ মুহূর্তে নামটা মনে পড়ছে না)। এবং আমার অভিভূত হওয়ার ধারা অব্যাহত থেকেছে।
এই বইটা হয়তোবা ঘোড়ামাসুদের মত মাস্টারপিস না, তবে অভিভূত হওয়ার মত একটা বই। পড়ে মনে হবে থ্রিলার পড়ছেন, শুষ্ক ইতিহাস না। যারা পড়েননি, পড়ে দেখতে পারেন।
কয়দিন পরপর প্রেসিডেন্ট কে মেরে ফেলে । শালা এই আর্মির চাকরিই আর করবো না , ইউনিফর্মও পরবো না , যাহ খুবই সত্যি কথা তবে জিয়াউর রহমানের প্রকৃত খুনী কে তা কিন্তু অজানাই রয়ে গেলো । লেখক ঠারেঠুরে হয়তো প্রচ্ছন্ন একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন কিন্তু সেটা পরিস্কার না । জেনারেল মঞ্জুরকে জিয়া হত্যার পেছনে মূল হোতা মনে করা হলেও আসলে তিনি এর পেছনে কতখানি কলকাঠি নেড়েছেন জানা সম্ভব হয় নি । ইতিহাস পড়ার এই একটা সমস্যা! আপনি প্রত্যক্ষ না করে বিশ্বাস ও করতে পারবেন না আবার অবিশ্বাস ও করতে পারবেন না । অতীতের তথ্যে অবিশ্বাস্য সত্যি আর বিশ্বাসযোগ্য মিথ্যা মেশানো থাকবেই । এতে আশ্চর্য্য হবার কিছু নেই । তবে ভাবতে অবাক লাগে বেশির ভাগ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এমন ভাবে মারা যান যেমনভাবে হয়তো তাদের মরার কথা ছিলো না । অতিতের ইতিহাস পড়ার আরেকটা ঝামেলা হলো বারবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝায় দেওয়ার ব্যাপারটা যে ''এই দুনিয়ায় কাউকেই বিশ্বাস করো না , বিশ্বাসের মর্যাদা দেওয়া খুবই বিরক্তিকর একটা কাজ । মানুষ সচারাচর বিরক্ত হতে পছন্দ করে না । '' পেছনে তাকান ... সিরাজউদ্দৌলা থেকে শুরু করে শেখ মুজিব , জিয়াউর রহমান এরা সবাই ই তো বিশ্বাসঘাতকতার স্বীকার । যাদের উপর আস্থা রেখেছেন তারাই জাফরী মার্কা আচরণ করেছে । এখন নিজের দিকে তাকান , আপনিই বা কতখানি নিরাপদ আপনার বিশ্বাসী মানুষদের মাঝখানে ? অবশ্য আপনার দোষ ও দেওয়া যায় না! বিশ্বাস না করে চলতেও তো পারবেন না । আমরা মানুষরা কত দূর্বল এইদিক দিয়ে তাই না ! দুর্ভাগ্য যে এই দুনিয়ায় রক্তশূন্যতা আছে , পানিশূন্যতা আছে ... কিন্তু বিশ্বাসশূন্যতা নামে কোন রোগ নাই । থাকলে সেই রোগে স্বেচ্ছায় আক্রান্ত হয়ে যাইতাম ।
ঐতিহাসিক কোনো ব্যক্তি, স্থান অথবা ঘটনা নিয়ে লেখা হলে সেটি হয় ঐতিহাসিক উপন্যাস। সে বিচারে ‘দ্বিতীয় খুনের কাহিনি’ একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। তবে সফল ঐতিহাসিক উপন্যাস হতে হলে শুধু উল্লিখিত তিনটি বিষয় নয়, প্রয়োজন হয় আরও কিছু উপাদানের। তা হলো, ইতিহাসের ঘটনা ও চরিত্রের পাশাপাশি অনৈতিহাসিক ঘটনা ও চরিত্র এবং এরচেয়েও বেশি দরকারি বাস্তব ঘটনার সঙ্গে রচয়িতার কল্পনার সংমিশ্রণ। ‘দ্বিতীয় খুনের কাহিনি’ সফল ঐতিহাসিক উপন্যাসের শর্তগুলো পূরণে ব্যর্থ। সংবাদ পরিবেশনের ন্যায় ধারাবাহিকভাবে ঘটনার বর্ণনাই চলেছে শুধু উপন্যাস জুড়ে। আর লেখকের কল্পনা শক্তির প্রয়োগ ঘটেছে একমাত্র সংলাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে।
মশিউল আলমের প্রায় সব উপন্যাসই পড়া হয়েছে। যার অধিকাংশই বেশ ভালো লেগেছে। তিনি অত্যন্ত সুলেখক তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে তাঁর সর্বোচ্চ রেটিং প্রাপ্ত এবং সর্বাধিক বিক্রিত এ বইখানা অনেকখানি হতাশ করেছে।
"ইতিহাসকে উপন্যাসরূপে বর্ণনা" - এইটা আমার বেশ প্রিয় একটা জনরা। বিশাল আয়তনের "সময় ট্রিলজি" হয়তো চাইলে আরো দশবারও পড়তে পারব।
কিন্তু ঠিক এই বইটা কেন জানিনা আমাকে একটা সেকেন্ডের জন্যও "ঠিক স্বস্তি" দেয়নি। কেমন যেন অস্বস্তি নিয়ে পড়েছি। মনে হচ্ছিল- সবই কেমন যেন অভাররিয়েক্ট করে লেখা, অযথা উপমা - অতিরিক্ত আবেগ, আর সাথে প্রচুর রিপিটেশন।
সবচে বড় সমস্যা - কোনো বইয়ের যত শেষের দিকে যাব- উচিত বইয়ে থাকা প্রশ্ন বা জটগুলো যেন সমাধান হতে থাকে। কিন্তু এই বইয়ে মনে হলো - সময় যত যাচ্ছে আরো যেন জট বাড়ছে। শুধুই আবেগ আর আবেগ; কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য, সিদ্ধান্ত বা সমাধান নেই। ইতিহাস, বা, ইতিহাসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দুটোতেই লেখককে ঠিক সুদক্ষ বোধ হোলো না। (সেদিক থেকে লে. কর্ণেল এম এ হামিদ এর লেখা ভালো লেগেছে)
অবশ্য পুরোটাই আমার নিজস্ব চিন্তাভাবনা।
This entire review has been hidden because of spoilers.
ভালো, কিন্তু বড্ড বেশি ন্যারেটিভ। ইতিহাসের বেশ স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে বইটা লিখেছেন লেখক-সাংবাদিক মশিউল আলম। কিছু কিছু যায়গায় কেন যেন একটু খাপছাড়া মনে হচ্ছিল, আবার কিছু জায়গায় একই কথার পুনরাবৃত্তি। যেরকমটা আশা নিয়ে শুরু করেছিলাম, সেরকম আশানুরূপ হয়নি।
মেজর জিয়া হত্যাকাণ্ডের পিছনে জেনারেল মনজুরকে দায়ী করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি কতোটুকু জড়িত ছিলেন আর আদৌ কতোটুকু নিরপরাধ ছিলেন তা আর জানা হলো না ১ জুন রহস্যজনকভাবে ক্যান্টেনমেন্টে তাকে মেরে ফেলার কারণে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসটা এমন কেন? রক্ত রক্ত আর রক্তের হোলিখেলা।
বই : দ্বিতীয় খুনের কাহিনি লেখক : মশিউল আলম প্রকাশক : প্রথমা প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ ঘরানা : রাজনৈতিক উপন্যাস পৃষ্ঠা : ২২৪ প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ : মাসুক হেলাল মুদ্রিত মূল্য : ৪৫০ টাকা
'কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের গুলিতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছিলেন' - এই বাক্যের বাইরে জিয়া হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে অনেকেরই কোন ধারণা নেই। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে আসলে কি ঘটেছিলো দীর্ঘদিন ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ছিলো। এখনো যে জিয়া হত্যার জট পুরোপুরি খুলেছে তাও না। তবে লেখক মশিউল আলম তাঁর 'দ্বিতীয় খুনের কাহিনি' বইয়ে জিয়া নিহত হওয়ার পরের ভয়াবহ অনিশ্চিত ও অস্থির সময়কে নানা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পাঠকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
মেজর জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের নাগরিকদের কাছে তাঁকে আলাদা করে পরিচিত করার কিছু নেই। ১৯৭৫ এ যখন বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করা হলো, তার পর থেকেই বাংলাদেশ নামক শিশু রাষ্ট্রের রাজনীতিতে ঘটলো আশ্চর্য এক পটপরিবর্তন। বিচারপতি সায়েমের হাত থেকে সর্বময় ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নিলেন জিয়া। প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করলেন নিজেকে। সেনাবাহিনীর একজন মেজর সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেন। বিএনপি গঠন করলেন আর আর হলেন এর চেয়ারপার্সন।
শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট জিয়ার নামে একটা অভিযোগ বেশ জোরেশোরেই শোনা যাচ্ছিলো। আর সেটা হলো, সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের ব্যাপারে তাঁর একচোখা নীতি। পাকিস্তান ফেরত অমুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের বেশি সুযোগসুবিধা দিতে শুরু করলেন তিনি। আর পক্ষান্তরে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদেরকে বদলি করতে লাগলেন ঢাকার বাইরে। বেশিরভাগকেই বদলি করা হলো চট্টগ্রামে। আর অদ্ভুতভাবেই, এই চট্টগ্রামেই গুপ্তহত্যার শিকার হন প্রেসিডেন্ট জিয়া।
চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি জেনারেল মনজুর ৭৫ পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট জিয়ার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। সর্বাধিক যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট তাঁকে সেনাপ্রধান না করে করলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে। চাপা ক্ষোভ, নাকি অভিমান?
৩০ মে রাতের শেষ প্রহরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের 'কাগজের নিরাপত্তা' নখের আঁচড়ে ছিঁড়ে হানা দিলো সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য। কোন কথাবার্তা ছাড়াই তারা নৃশংসভাবে হত্যা করলো প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে। ২৮ রাউন্ড বুলেট তাঁকে ঝাঁঝরা করে দিলো। তিনি ওইদিন সরকারী না, বরং দলীয় এক কাজে চট্টগ্রাম সফরে গিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্টের সাথে নিহত হলেন তাঁর সফরসঙ্গীদের কয়েকজন। শুধু তাই না, জিয়ার লাশ সরিয়ে ফেলা হলো অজ্ঞাত স্থানে। পুরো ব্যাপারটাই কি ওয়েল প্ল্যানড? নাকি হটহেডেড কিছু তরুণ অফিসারের বেপরোয়া মেজাজের নমুনা?
নড়েচড়ে বসলো পুরো দেশ। 'সরকার' বলতে আসলে যা বোঝায়, তা রইলোনা। সবকিছুর দায় এসে চাপলো জিওসি মনজুর আর তাঁর অনুগত কয়েকজন অফিসারের ওপর। তাঁরাও নিজেদেরকে সেনাবাহিনীর 'বিপ্লবী কাউন্সিল' হিসেবে পরিচয় দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করলেন।
৩০ মে'র পর থেকে প্রতিটা ঘন্টা কাটতে লাগলো চরম অনিশ্চয়তায়। মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের মধ্যকার পুরোনো চাপা দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হয়ে উঠলো। বেসামরিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অদ্ভুত এক দোলাচলে পড়ে গেলেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়া কি সত্যিই কোন বৈষম্য সৃষ্টি করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আর অমুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের মধ্যে? নাকি ঠান্ডা মাথার এই মানুষটা চেয়েছিলেন সব বৈষম্য দূরে ঠেলে সবাইকে নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে? ৩০ মে'র পর আর এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া হয়নি। জানা যায়নি এসবের পেছনে আসলে কার হাত ছিলো। কার অসুস্থ উচ্চাকাঙ্ক্ষার বলী হতে হয়েছিলো প্রেসিডেন্ট জিয়াকে সেটা অবশ্য 'দ্বিতীয় খুনের কাহিনি' পড়লে কিছুটা আন্দাজ পাওয়া যায়। আর জিওসি মনজুরের ভয়���্কর ভাগ্যলিখন বইটার নামটাকে আরো ভয়াবহভাবে সার্থক করেছে, এটা বলাই যায়। আর সেটাও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।
ব্যক্তিগত মতামত : 'দ্বিতীয় খুনের কাহিনি' বইটাই সম্ভবত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড ও তার পরবর্তী সময়কে নিয়ে লেখা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে তথ্যবহুল বই। লেখক মশিউল আলম এই বইটা লিখতে গিয়ে বেশ অনেকগুলো সহায়িকা গ্রন্থ ও সাক্ষীর সাহায্য নিয়েছেন। সেগুলোর নাম তিনি বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় উল্লেখও করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টাকে ঝাপসা অবস্থা থেকে আরো একটু পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন তিনি। গল্পের ছলে অতীত ইতিহাসকে পুনরায় আলোর বৃত্তে আনার এই প্রয়াস সত্যিই প্রশংসার দাবীদার।
প্রাঞ্জল লেখনী ও সবিস্তার বর্ণনাভঙ্গি 'দ্বিতীয় খুনের কাহিনি' পাঠে দারুন সহায়ক ছিলো। মাত্র ২২৪ পৃষ্ঠার এই বইয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা অন্ধকার অধ্যায় সম্পর্কে পাঠক তার কৌতুহল ভালোভাবেই নিবৃত্ত করতে পারবে বলে মনে হয়েছে আমার। মাসুক হেলালের প্রচ্ছদ ভালো লেগেছে। চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন 'দ্বিতীয় খুনের কাহিনি'।
একেকজনের মতামতের ভিন্নতা থাকতেই পারে। আমার কাছে মনে হয়েছে যথেষ্ট লেখাপড়া না করেই এই বইটি লেখা হয়েছে। ইতিহাসকে কেন্দ্র করে উপন্যাস রচনা খুবই কঠিন একটি কাজ। এর জন্য অনেক বেশি রেফারেন্স, অনেক বেশি লেখাপড়ার, গবেষণার দরকার। লেখক খুবই অযত্নে, অবহেলায় এরকম একটা ভালো বিষয়কে নষ্ট করেছেন। মাঝেমাঝেই জিয়ার ব্যাপারে তার অতিরিক্ত ভালোবাসা লেখায় প্রকাশিত হয়েছে। সোজা কথা, বইটি পড়ে সময় নষ্ট আর বাল্যসুলভ কাঁচা হাতের লেখা বলেই মনে হয়েছে।
দৃষ্টিভঙ্গি ১: মেজর ফারুক এবং রশিদ মুজিব হত্যার সব রকম পরিকল্পনা ও অপারেশন পরিচালনা করলেও জিয়া অবশ্যই তা জানতেন, এদের সাথে জড়িতও ছিলেন। এত উচ্চ পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তা হয়েও জিয়া এসব কিছু জানতেন না এটা অবিশ্বাস্য। জিয়া নিশ্চিতভাবে মুজিব হত্যায় পরোক্ষভাবে মদদ জুগিয়েছেন।
দৃষ্টিভঙ্গি ২: চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ঢাকার তুলনায় কিছুই না, এখানের সবকিছু বলতে গেলে মঞ্জুরের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। জিয়া খুন হলেন মঞ্জুরের কাছের সেনা অফিসারদের হাতেই। কিন্তু মঞ্জুর কিছু জানতেন না। কারণ মঞ্জুর ছিলেন দুধে ধোয়া তুলসীপাতা। তিনি জিয়া হত্যায় কোনোভাবেই জড়িত থাকতে পারেন না
উপলব্ধি: ১। আমরা বাঙালি 'ইতিহাস পর্যবেক্ষক', আমরা ইতিহাস দেখবো এবং লিখবো এক চোখ চেপে ধরে। ২। কাউকে দায়মুক্তি দিতে বা অভিযুক্ত করতে আমরা লেখকরা সত্য-মিথ্যা, লজিকের ধার ধারবো না। ৩। 'মুক্তিযোদ্ধা', 'দেশপ্রেমিক', 'দক্ষ', 'চৌকস', 'সুশিক্ষিত' গুণাবলি সম্বলিত সেনাদের সকল অপকর্ম "দেশের বৃহত্তর কল্যাণে গৃহীত অত্যাবশকীয় কর্ম" হিসেবে বৈধতা দেওয়া যাবে।
বাস্তবতা কখনও কল্পনাকেও হার মানায়। যা কিছু আমরা থ্রিলার গল্পে পড়ি, অ্যাকশন সিনেমায় দেখি; বাস্তব যে তারচেয়েও বেশি রোমাঞ্চকর হয়। তখন আমরা বলি, পুরো থ্রিলার গল্পের মতো। কিংবা অমুক সিনেমার সাথে মিলে যায়। অথচ যেকোনো গল্প, রোমাঞ্চকর উপাখ্যান বাস্তব থেকে নেওয়া। কিছুটা রং ছড়ানো হলেও বাস্তব কখনও তারচেয়েও রঙিন হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের জন্মের সূচনা লগ্ন থেকেই এই দেশটা এক ধরনের রাজনৈতিক বলয়ে প্রবেশ করে। যেই বলয়ে ক্ষমতা ছাড়া কিছু ছিল না। ক্ষমতার লোভ মানুষকে অন্ধ করে তোলে। কখনও কখনও স্বৈরাচার হয়ে ওঠে ক্ষমতাবান। কিন্তু আমরা জানি, লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। আর এর সবচেয়ে বাস্তব উদাহরণ এই দেশটা দিয়ে এসেছে সেই একাত্তরের পর থেকেই। পঁচাত্তর এসেছে, এসেছে একাশিও। একই গল্প বারবার ফিরে আসে এই বাংলায়। রক্তের স্রোত বয়ে চলে। কী পাওয়া যায় এতে? কে জানে?
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তখন চট্টগ্রামে। হয়তো ভাগ্যের করুণ পরিণতির দরুন-ই তাকে ছুটে যেতে হয় বন্দর নগরীতে। নাহলে কেন ইরাক-ইরান সমঝোতা বৈঠক বাদ দিয়ে তিনি ছুটবেন। তার রাজনৈতিক দলের অন্তর্কোন্দল যেন আন্তর্জাতিক সংকটের চেয়েও বড়। দেশের উপরে কিছু নেই। নিজ দলের দুই পক্ষ মারামারি করছে, একে অপরের রক্ত ঝরাচ্ছে; এরচেয়ে বড় লজ্জার কী হতে পারে? সামরিক উর্দি খুলে গেলে আমজনতার বস্ত্রে তিনি দেশে ফিরিয়ে আনতে চান গণতন্ত্র। অথচ তার দলেই কি না, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে! কী করবেন তিনি?
তিনি চট্টগ্রামে গিয়েছেন সংক্ষিপ্ত ঘোষণায়। দলের এই অন্তর্দলীয় কোন্দল দূর করতে। কিন্তু তিনি জানতেন না, সেখানে অপেক্ষা করছে এক বিভীষিকা। অনেক দিনের ক্ষোভ, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র কিংবা নিজের স্বার্থ হাসিল; সবকিছুই এখানে ভাগ্যের করুণ পরিহাস। যেই পরিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে জিয়াউর রহমান কী ভাবছিলেন? রক্তের উপর দাঁড়িয়ে দেশ পরিচালনা করা একপ্রকার দুঃসহ। কারণ সেই রক্ত একসময় গ্রাস করে নিতে চায়।
হয়তো সে কারণেই গোয়েন্দাদের নিষেধাজ্ঞা, সংশয় উপেক্ষা করে রাষ্ট্রপতি ছুটছেন তার নিজস্ব কাজে। মুক্তিযুদ্ধের ওই যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে কত জীবন সংশয় এক তুড়িতে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সাহসী যোদ্ধা হিসেবে লড়াই করেছেন পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিপক্ষে। হয়েছেন বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত। তিনি এত সহজে ভয় পেয়ে লুকিয়ে থাকবেন? যেখানে দেশটাকে গড়ে তোলার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন! অথচ তারই নেতাকর্মী দুর্নীতির আখড়া হিসেবে তার প্রতিটি কাজে বাঁধা প্রদান করছে।
একটি দেশের রাষ্ট্রপতি যখন মারা যায়… দুঃখিত, ভুল বললাম। একটি দেশের রাষ্ট্রপতিকে যখন মেরে ফেলা হয়, তখন দেশের অভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি সমর্থিত সরকার এক উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সময় পার করে। আর যদি এই অভ্যুত্থান সামরিক বাহিনী দ্বারা সংগঠিত হয়, তাহলে সংশয় দ্বিগুণ আকার ধারণ করে। দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে, এই নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে যায় প্রশাসন।
আর যদি রাষ্ট্রপতি হয় জনপ্রিয় কেউ, মানুষের মনে তার প্রতি ভালোবাসা থেকে থাকে; তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি যদিও অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ভুল মানুষের মতামত গ্রহণ করেছেন। একাধিক ভুলের মধ্যে তিনি অনেক সামরিক বাহিনীর সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা সদস্যকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলেন; যেন তার পথে কেউ বাঁধা হতে না পারে।
মানুষের মনে ক্ষোভ জন্ম নিতে নিতে এমন পরিস্থিতির তৈরি হয়, যখন তখন বারুদের মতো জ্বলে ওঠে। কোনটা নিতান্তই ক্ষোভ আর কোনটা ষড়যন্ত্রের বীজ, তা বুঝতে আমাদের অনেক দেরি হয়ে। যখন বোঝা যায়, তখন সব শেষ হয়ে যায়।
এই বঙ্গদেশের অগ্রযাত্রার দুই বছরও হয়নি, এতেই দুই রাষ্ট্রপতির প্রাণ হরণ যেন এক ভবিতব্য। প্রথমটা নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও দ্বিতীয়জন থেকে যান আড়ালে। কিছুটা হয়তো রাজনৈতিক কারণ এখানে ঘাপটি মেরে থাকে। সেই দ্বিতীয় জনকে নিয়েই লেখা হয়েছে “দ্বিতীয় খুনের কাহিনি” বইটি। লিখেছেন মশিউল আলম।
মশিউল আলমের সাথে আমার পরিচয় “প্রিসিলা” নামক বইটির মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘরানার এক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী বেশ মুগ্ধ করেছিল। তার এই “দ্বিতীয় খুনের কাহিনি” বইটিও মুগ্ধ করার মতো। বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে লেখা যেকোনো উপন্যাস আমার বেশ ভালো লাগে। আর যদি এমন থ্রিলার জাতীয় এক অনুভূতি দিতে পারে, তাহলে আরো বেশি উপভোগ্য হয়।
বইটির শুরুতেই লেখক অন্তিম পরিণতি দিয়ে ফেলেছেন। প্রেসিডেন্ট তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। অন্তিম হলেও যেন অন্তিম নয়। তারপর থেকেই মূল ঘটনার শুরু। চরম অনিশ্চয়তায় মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি মহল দিন কাটাচ্ছে। এরপর কী হবে? গল্পের মূল আকর্ষণ যেন এখানেই। শত দোষ থাকার পরও জিয়া জনপ্���িয় ছিলেন। এখানেই যারা তাকে হত্যা করেছে, তাদের দুর্বলতা। শুরুর বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারলে পাল্টা আঘাত দেওয়া যায়।
জিয়াউর রহমান যেহেতু সামরিক সদস্য ছিলেন, সেহেতু সামরিক ও এর সাথ সংশ্লিষ্ট সকল বাহিনীর কর্মকর্তাদের অনুভূতি, অভিব্যক্তিগুলো লেখক তুলে ধরছেন। তাদের মধ্যেও উৎকণ্ঠা ছিল। যেহেতু সামরিক বাহিনী দ্বারা অভ্যুত্থান ঘটেছে, তাদের ভবিষ্যৎ কী? জিয়াকে যারা পছন্দ করে তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না তো? ঠিক কী কারণে জিয়াকে এই পরিণতি বরণ করতে হলো?
জিয়াকে নিয়ে গুরুতর এক অভিযোগ ছিল। তিনি মুক্তিযোদ্ধা সামরিক বাহিনীর প্রতি সদয় ছিলেন না। তাদের রাজধানী থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বদলী করেছেন। অন্যদিকে অমুক্তিযোদ্ধাদের বসিয়েছেন গুরুত্বপুর্ণ আসনে। মুক্তিযুদ্ধ না করা এরশাদ হয়েছেন সেনাবাহিনীর প্রধান।
বইটির সবচেয়ে দূর্বল দিক, এখানে জনগণের অভিব্যক্তি লেখক তুলে ধরেননি। একজন রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে সবচেয়ে দিশেহারা হয় সেই দেশের জনসাধারণ। কিন্তু তাদের অনুভূতি ধরে রাখার চেষ্টা করেননি লেখক। ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে লেখা যেকোনো ফিকশনে যেমন ইতিহাস থাকবে, তেমনি লেখককে কল্পনার আশ্রয় নিতে হবে। কাল্পনিক চরিত্রগুলোকে প্রাণবন্ত করতে হবে। এখানে সেই অংশের অনুপস্থিতি ছিল। যদি এরূপ কিছু লেখক তৈরি করতে পারতেন, তাহলে হয়তো আরো বেশি উপভোগ্য হতো।
লেখকের লেখা সবসময় সাবলীল। গল্প বলার ধরন বেশ দারুণ। প্রতিটি অধ্যায়ে লেখক আকর্ষণ ধরে রাখতে পেরেছিলেন। বেশ গতিশীল লেখা। তবে পুরো বইটিতে একই ঘটনার বেশ কয়েকবার পুনরাবৃত্তি বর্ণিত ছিল, যা বিরক্তির কারণ হয়েছিল আমার জন্য। যদিও গল্পের গতির কারণে তেমন বাঁধা হতে পারেনি। তবে লেখকের লেখার গতিশীলতা এত বেশি ছিল যে, আরেকটু লাগাম টেনে ধরা প্রয়োজন ছিল বোধহয়।
এই বইটার আরো একটি আকর্ষণীয় বিষয় লেগেছে। মানুষ যখন অচিরেই কোনো ঘটনার সাক্ষী হয়, যা সে কল্পনাতেও আনেনি; তখন এক ধরনের হতবিহ্বল অবস্থা ঘিরে ধরে। এই পরিস্থিতি যখন একটু একটু করে কমতে থাকে, তখন বিচার বিবেচনা বৃদ্ধি পায়। আর তখন উল্টো প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। এমনটিই ঘটেছে জেনারেল মনজুরের সাথে।
পুরো ঘটনার দায়টা আসলে কার? জেনারেল মনজুরের? একসময় যার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তার নিঃশেষে কি তারই সুফল মিলবে? লেখক খোলসা করেননি আসল অপরাধীর। শুধু ভাসা ভাসা গল্প বলেছে। যার উপর ভিত্তি করে পাঠক ভেবে নিতে পারবেন। এখানে লেখক সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের। গল্পের ছলে বলেছেন তার দুর্বলতা কোথায় ছিল। আবার উল্লেখ করেছেন গ্রহণযোগ্যতাও। অন্যদিকে জেনারেল মনজুরের ভাবনার প্রতিফলনও ঘটিয়েছেন। আবার এরশাদের মনোভাবও ব্যক্ত করেছেন। যদিও অধিকাংশই লেখকের কল্পনার উপর ভিত্তি করে। কেননা, এত বছর পর সত্য মিথ্যা যাচাই করার সুযোগ নেই। আর ফিকশনে সত্য খুঁজে বের করার চেষ্টা অনর্থক।
পরিশেষে, মানুষ অনেক কিছুই বলতে চায়। সব কি বলতে পারে? কিছু মানুষ তার মুখ খুললে অনেকের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই কারণে এই মুখগুলো বন্ধ করার প্রয়োজন হয়। বিপদকে এভাবেও থামিয়ে দেওয়া যায়। চিরতরে হারিয়ে যাওয়া সে জীবন কখনও কারো বিপদের কারণ যে হতে পারে না।
শুরু থেকে মাঝ পরযন্ত দুরদান্ত। তবে এর পরে ঝুলে গেল।জেনারেল মঞ্জুরকে খুব-উইক মাইন্ডেড(আনডিসাইসিভ)মনে হইসে বরণায়।একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল র্যাংকের লোক এরকম আনডিসাইডিভ/ক্লুলেস হবে এটা আসলে মেনে যাওয়া যায়না।(অবশ্য কেউ জেনারেল মঞ্জুরের জবানবন্দিও জানবেনা)
সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা বলেই বোধহয় এই অবস্থা।বাংলাদেশ বলেই বোধহয় এটা নিয়ে নন-ফিকশন(পরযাপ্ত রিসারচ) কিছু লেখা হলনা।নন-ফিকশন যাও বা কিছু হয়েও থাকে সেগুলা কথা জানিনা।(যদিও অনেকের আত্মজীবনীতে এসবের বয়ান আছে বলেই জানি)।
প্রচুর চরিত্র আছে(প্রধান ছাড়াও),শুরুতেই এদের এক্টা নিরঘট দিয়ে দিলে ভাল হত।লেখকের সত্য ঘটনা অবলম্বনে ফিকশন লেখার প্রচেস্টা খারাপ না।তবে উনাকে আরো অনেক খাটতে হবে।(অবশ্য বাংলাদেশে এই খাটুনির কোন দাম পাবে না উনি,সো উনাকে দোষও দেয়াও যায়না)
জেনারেল মনজুর এর প্রতি এক ধরনের সাধারণ মমত্ববোধ থেকে এই বইটির ধারাবর্ণনা এগিয়েছে। একেবারে নিরোপেক্ষ থাকার চেষ্টায় রচিত এই ঐতিহাসিক উপন্যাস বিএনপি সমর্থকদের খুব একটা পছন্দ হওয়ার কথা না। আওয়ামী ঘরানার কারো কাছেও মনঃপুত হওয়ার কথা না। তবে, এরশাদ সমর্থকরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবেন লেখাটি পড়ে। তবে আদর্শকে আড়াল করে শুধু বাস্তবে ঘটে যাওয়া দৃশ্যাবলির বিবরণ হিসেবে পড়তে চাইলে বেশ সুখপাঠ্য এই বইটি।
This book, I believe, truly depicted the ins and outs of murders of both Zia and Manjur. The writer truly succeeded in dragging the truth and also his attempt of presentation successfully paid off.
জাতি হিসেবেই আমরা বাংলাদেশিরা হয়তো অনেকটাই বিস্মৃতিপ্রবণ । রাষ্ট্রীয় অথবা সামাজিকভাবেও কখনো নিজেদের ইতিহাসের বাকবদলের ঘটনাগুলো আমরা কখনোই সাধারণ মানুষ বা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য গুছিয়ে পৌঁছে দেয়ার কোন সদিচ্ছা দেখি না । বাংলাদেশের জন্মের এক দশকের মধ্যেই ঘটে গেছে নৃশংস সব হত্যাকাণ্ড আর ষড়যন্ত্র । শুধু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড নয়, এরপরে জেনারেল জিয়া এবং এরশাদ নিজেদের স্বার্থে হত্যা করেছেন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের । এতে করে জাতি হিসেবে আমরা শুধু দুর্বলই হয়েছি । একদিকে যেমন জেনারেল জিয়াকে সুযোগ সন্ধানী এবং স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের পুনর্বাসনকারি হিসেবে আখ্যা দেয়া যায়, বলা যায় ধীরে ধীরে ক্ষমতা এবং রাজনীতির নেশা তাকে পেয়ে বসেছিল, পাশাপাশি নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখলে প্রেসিডন্ট জিয়ার রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতি প্রবল ঝোঁকটাও চোখে পরে এবং তার ঝোঁকটা হয়তো শেষ পর্যন্ত ছিল বাংলাদেশের ভালোর জন্যই । তবে, এই ক্ষমতার নেশায় বুঁদ হয়ে তিনি নিজে এবং তার নিয়োগকৃত হঠকারী-লম্পট সেনাপ্রধান এরশাদের প্ররোচনায় প্রতিরক্ষাবাহিনী থেকে সকল সম্ভাব্য পথের কাঁটাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে��েন এবং এমন দুর্ভাগা মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তার সংখ্যা কয়েক হাজার । মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের সাথে বিভিন্ন রূপে এবং মাত্রায় বিরূপ আচরণও করেছেন ক্রমাগত । কর্নেল তাহেরের প্রহসনের বিচারের ইতিহাস তো এখন কিংবদন্তী । তাছাড়া তাহেরের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড এবং পরিকল্পনার কারণে তাকে সরিয়ে ফেলবার জন্য বিদেশী-সর্বগ্রাসী শক্তির প্রবল চাপও ছিল বোধ করি । এভাবেই হয়তো প্রায় প্রতিপক্ষহবিহীন রাজনৈতিক-সামরিক পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধান জেনারেল থেকে প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠা জিয়াকে গ্রাস করেছিল অতি মাত্রার আত্মবিশ্বাস । অতঃপর ৩০শে মের অপ্রত্যাশিত হত্যাকাণ্ড ।
এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে দেশের জনগণের ধারনা সামস্টিক বিচারে ভীষণ ঘোলাটে । জিয়ার হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছন্ন একটি ঘটনা হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টাও দেখা যায় । তবে এর পেছনে নিশ্চয়ই কাজ করেছে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে জমে ওঠা ক্ষোভ এবং কুটিল এরশাদের চাল । তাছাড়া, দেশ জিয়া কীভাবে চালিয়েছেন তার সাথে হত্যাকাণ্ডের কোন সম্পর্ক নেই । ব্যাপারটি বোঝার জন্য জানতে হবে হত্যাকারী কারা? ও বুঝতে হবে হত্যাকারীদের প্রেক্ষাপট । কী পরিস্থিতিতে তারা এতটা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো যে তাদের জিয়াকে হত্যার পথ বেছে নিতে হলো? জিয়া কীভাবে দেশ পরিচালনা করছিলেন সে ব্যাপারটি তার হত্যার ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক । মূলত, মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের সাথে ক্রমাগত বিরূপ আচরণ ও রিপ্যাট্রিয়ট সেনা কর্মকর্তাদের (পাকিস্তান ফেরত সেনা কর্মকর্তা) প্রতি পক্ষপাত-ই হত্যার মূল কারণ । হত্যাকারীরা উর্দিধারিই ছিলেন । সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে খুন করে ফেলে নি । বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যাকাণ্ড-ও একইভাবে পড়া উচিত বলে মনে করি । যতদূর বুঝতে পারি, বঙ্গবন্ধু একটা ব্যাপার স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে সামরিক বাহিনীর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই । সেনাবাহিনী বাংলাদেশ রাষ্ট্রে যে গুরুত্ব দাবী-আশা করেছিল বঙ্গবন্ধু তাদের তা দিতে রাজি ছিলেন না । ফলশ্রুতিতে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ।
জেনারেল জিয়া বা রাষ্ট্র ক্ষমতায় বুঁদ প্রেসিডেন্ট জিয়াকে জানার আগ্রহে বইটি হাতে নিলে কাজের কাজ খুব হবে না । নামের ইঙ্গিত অনুসারেই, চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে ৩০শে মে’তে ঘটে যাওয়া প্রেসিডেন্ট জিয়ার হত্যাকাণ্ড এবং এরপর ঘটনা পরম্পরায় বীর উত্তম জেনারেল মনজুরের হত্যাকাণ্ডকে ঘিরেই এই উপন্যাস । বরং বলা যায় জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর অস্থির সময়ে ব্রাউনিয় গতিতে ঘটে যাওয়া সব ঘটনার হাত ধরে অবশেষে পহেলা জুন মধ্যরাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ভেতরে জেনারেল মনজুরের সেই “দ্বিতীয় খুনটিই” এই উপন্যাসের মূল পাটাতন । চট্টগ্রামের সেই ২-৩টি দিন বাংলাদেশের ইতিহাস এবং ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল নিঃসন্দেহে । আর তার ফলশ্রুতিতেই বাংলাদেশের জনগণ পায় এরশাদের মত নির্লজ্জ-দুর্নীতিবাজ রাষ্ট্রনায়ক । তার হাতেই শুরু হয় সর্বব্যাপী দুর্নীতির এক মহা উৎসব এবং দেশের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যায় চিরতরে । যারা এখন দেশের দুর্নীতির পরিস্থিতি নিয়ে হা-হুতাস করছি তাদের জন্য এরশাদের উত্থান এবং তার রাষ্ট্র পরিচালনা কৌশল বোঝাটাও জরুরী বলে মনে করি । জিয়ার প্রস্থান আর এরশাদের উত্থানের নেপথ্য ইতিহাস বুঝবার জন্য সাহায্য করতে পারে এই উপন্যাস ।
মশিউল আলমের গদ্য শৈলী সুন্দর । সাংবাদিকের গদ্য সুন্দর হওয়াই স্বাভাবিক । তাছাড়া তথ্য সংগ্রহ এবং গবেষণার কাজটিও করেছেন । সাহায্য নিয়েছেন সেসময়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের । তারপরও, ঘটনার ঘনঘটার বাইরে চরিত্রায়ণ বা আখ্যান কোনটাই মনে বিশেষ ছাপ ফেলেনি । এমন প্রেক্ষাপটকে নিয়ে হয়তো পাঠকের প্রত্যাশার পারদ হয়তো আগে থেকেই আকাশ ছুঁয়ে থাকে । উপন্যাসের পুরো ঘটনার কারণেই এক গুমোট বিষাদ ভর করে বই শেষ করতে করতেই । মনে হয় মুক্তিযোদ্ধা উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার এমন ছিলেন কেন? ক্রান্তিলগ্নে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটিয়েও খালেদ মোসাররফ কেন পরিস্থিতি সামলে উঠতে পারলেন না? জেনারেল মনজুর কেন ভুগছিলেন সিদ্ধান্তহীনতায়? মানুষের সমাজে ক্ষমতার শিখরে কি শুধু পৌঁছায় কুটিল-অমানবিকেরাই?
আমার বই পড়ার শুরু থেকেই ফ্যাসিনেশনের একটা বড় জায়গা ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়কে ঘিরে লেখা বইগুলো। ফিকশন বইয়ের মধ্যে মা, নির্বাসন, শ্যামল ছায়া, জোছনা ও জননীর গল্প, ১৯৭১, সূর্যের দিন, সৌরভ, আগুনের পরশমনি, অনীল বাগচির একদিন, আমার বন্ধু রাশেদ, গ্রামের নাম কাকনডুবি, ক্যাম্প, ক্ষ্যাপা, ছারপোকা, জেনারেল ও নারীরা ইত্যাদি সহ আরো অনেক অনেক বই পড়া হয়েছে এক সময়ে।
এরপর পড়া হয় একাত্তরের দিনগুলি, একাত্তরের চিঠি, রাইফেল রোটি আওরাত, জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা, দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ, ১৯৭১: ভেতরে ও বাইরে, আমি বীরঙ্গনা বলছি সহ বেশ কিছু নন ফিকশনাল বই।
( এই বইগুলোর মধ্যে জোছনা ও জননীর গল্প, মা, জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা - আমার অন্যতম পছন্দের।)
এরপর আমার হাতে আসে ক্রাচের কর্নেল এবং দেয়াল। যা আমাকে একাত্তরের পরবর্তী ঘটনাগুলো নিয়েও ব্যাপক আগ্রহী করে তোলে। সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ, বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ, আগুনের দিন শেষ হয় নি, ফাঁসির মঞ্চে কর্নেল তাহের, জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি - ইত্যাদি সবগুলো বই পড়া যুদ্ধের পরবর্তী সময় সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য। যেগুলোর বেশিরভাগই নন-ফিকশন। তবে এর মধ্যে বেশিরভাগ বইয়ের প্রেক্ষাপট যুদ্ধের পর থেকে ১৫ আগস্টের কালো রাত পর্যন্ত। কোনোটা তাজউদ্দীন আহমেদকে নিয়ে, আবার কোনোটা কর্নেল তাহেরকে নিয়ে। (এই দুইজন ক্যারেক্টার আমাকে বেশ ভালোভাবে ফ্যাশিনেট করেছিল)
কিন্তু এই বইগুলোর কোনোটিতেই পরবর্তী জিয়ার শাসন, জিয়া হত্যা, এরশাদ শাসন নিয়ে আলোচনা নেই। সত্যিকার অর্থে এই সময়কাল নিয়ে জনপ্রিয় বই খুবই কম।
ঘাটাঘাটি করে অবশেষে "দ্বিতীয় খুনের কাহিনি" বইটি পেয়েছি। 'দ্বিতীয় খুন' বলতে এখানে বঙ্গবন্ধুর পর প্রেসিডেন্ট অবস্থায় খুন হওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি জিয়াউর রহমানের কথা বুঝানো হয়েছে।
বইয়ের শুরুর দিকে লেখার স্টাইল খুবই বোরিং। একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা। প্রতিটা মানুষকে হত্যার বিষয় জানানো হচ্ছে, তারা আকাশ থেকে পরার রিয়াকশন দিচ্ছে। এই ঘটনাতেই বইয়ের প্রথম ১০০ পেজ। এতটুক পড়ে অনেকদিন বইটি ফেলে রাখা ছিল। তবে শেষের দিকে এসে অবশেষে বইটি কিছুটা গতি পায়।
কারা ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ থাকলে তাদের জন্য রেকমেন্ড করা যেতে পারে। বাকিদের জন্য স্ট্রংলি রেকমেন্ডেড না।
৩০শে মে থেকে ১জুন- চারদিনের ঘটনার উপর ভিত্তি করে লিখা এই উপন্যাস। তবে একে নিছক উপন্যাস ভাবলে ভুল হবে। লেখক এখানে বই জুড়ে একেকজনের অনুভূতি আর সিচুয়েশন বর্ণনা করে গিয়েছেন বাট কোনো কংক্রিট কংক্লুশন দেননি। কে দেশপ্রেমিক আর কে বিশ্বাসঘাতক সে ধোয়াশাও কাটেনি, মেজর মতি ই বা কেন খুন করলো বা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ই বা কেন এরশাদকে বসালেন ক্ষমতায় এসব প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী পাঠকদের জন্য মাস্ট রিড। খুবই সাবলীল ও রোমাঞ্চকর লেখা। একবার পড়তে শুরু করলে শেষ না করে রাখা যায় না। একই সময়ে চলা বিভিন্ন ঘটনাকে লেখক একই সুতোয় গাঁথতে পেরেছেন সুনিপুণভাবে।
বইটি পড়ে/শুনে মনে হচ্ছিল জেনারেল মঞ্জুর ছিলেন খুব উইক মাইন্ডেড (কনফিউজড) মানুষ। একজন বীর উত্তম মুক্তিযোদ্ধা এবং জেনারেল পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির জন্য এমন আচরণ কিছুটা অপ্রত্যাশিত মনে হয়। অবশ্য কেউ জেনারেল মঞ্জুরের জবানবন্দিও জানবেনা
উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, এটি লিখবার সময় যথেষ্ট কল্পনার আশ্রয় নেয়া হয়নি! তবে এজন্য এটা শুনতে বেশ ভালো লেগেছে আমার! সত্য ঘটনা ক্রোনোলজি করে সুন্দর ভাবে গোছানো আছে এখানে।
জিয়া হত্যাকাণ্ডের পেছনে জেনারেল মনজুর ও এরশাদের ভূমিকা নিয়ে এমনিতেই ধোঁয়াশা মাঝে ছিলাম। খুব একটা স্পষ্ট হয়েছে তা নয়। কজ ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস আর সত্যিকারের ইতিহাস এক নয়। তবে এই উপন্যাসের সার্থকতা হলো লেখক সত্যটা জানার আগ্রহকে আরও জাগ্রত করেছেন।
বইটি শুনতে খুবই উপভোগ করেছি। পড়লেও ভালো লাগতো। প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যা নিয়ে যারা গল্পকারে কাহিনীতে শুনতে পা পড়তে চান মাস্ট রিড/হেয়ার!
পচাত্তর পরবর্তী সময়টা আমার কাছে কেমন যেন ঘোলাটে লাগে, সেই ঘোলাটে বাতাসের ঝাপ্টা এসে লেগেছে এই বইয়েও। বইটাকে ব্যক্তিগতভাবে আমার বড্ড ন্যারেটিভ মনে হয়েছে। পুরো বই জুড়ে একেকজনের অনুভূতি আর সিচুয়েশন এর কথাই শুধু বারবার দেখেছি কিন্তু জাজমেন্টে গিয়ে কোনো কনক্লুশন খুঁজে পাইনি। কে দেশপ্রেমিক আর কে রিপ্যাট্রিয়েট সে ধোয়াশাও কাটেনি, মেজর মতি ই বা কেন করলো কিংবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ই বা কেন এরশাদকে বসালেন ক্ষমতায়, সব মিলিয়ে আমি গোলকধাধায় পড়ে যাচ্ছি। হয়তো পড়াশোনা অনেক কম নয়তো ইতিহাসটা ঠিকভাবে অধ্যয়ন ই করতে পারছি না।
Overlong, meager in content, not researched well enough. The dark period of the assassinations of General Zis and, subsequently, General Manzoor in Chittagong in the summer of 1981. Ego clashes within the army, the effect of assimilation of repatriated officers from Pakistan into Bangladesh and its pitfalls. The fallible characters of our war-hero army officers and the fox-like maneuvers of General Ershad, the ultimate winner.
শুরুটা টান টান থাকলেও কিছুটা সময় পর ঝুলে গেছে। আর লেখকের জিয়া তোষণ বড্ড চোখে লাগে। হয়ত প্রকাশকের চাপ থাকতে পারে। কোন চরিত্র ঠিকমত দাগ কাটতে পারল না।
অসাধারণ! অসাধারণ!! মশিউল আলমের কৃতত্ব এই যে, তিনি খুব সিম্পলিস্টিক ভাষায় ইতিহাস আশ্রিত রচনাটি লিখতে পেরেছেন। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না এটা ইতিহাস গ্রন্থ না, ইতিহাস আশ্রিত গ্রন্থ।
আজ শেষ করলাম মশিউল আলমের উপন্যাস ‘দ্বিতীয় খুনের কাহিনি’। সাধারণত আমি তার বই যখন আসে তখনই পড়ে ফেলি, কিন্তু এই বইটি আসে ২০১৫-তে, আমি পড়লাম এই মার্চে। দ্বিতীয় খুনের কাহিনির প্রথম ১৭০ পৃষ্টা পড়া শেষ করি গত ভোর ৫টায়। অনেকবার ঘুমাব ঘুমাব করেও পড়া থামাতে পারছিলাম না। বাকি অংশ শেষ করলাম আজ দুপুরে।
যদিও উপন্যাস, ‘দ্বিতীয় খুনের কাহিনি’ মূলত ইতিহাস নির্ভর। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্যতম দুই চৌকশ মুক্তিযোদ্ধা সেনা কমান্ডার জিয়া এবং মনজুরের খুন নিয়েই এই উপন্যাসটি লেখা হয়েছে। মশিউল আলম উল্লেখ করেছেন যেহেতু একটি ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস তাই অনেকের সাক্ষাতকার নেয়া হয়েছে, অনেক বই ব্যবহার করা হয়েছে রেফারেন্স হিসেবে। অনেক সংলাপ লেখার ক্ষেত্রে তাকে চরিত্র বিশ্লেষণ করে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে।
‘দ্বিতীয় খুনের কাহিনি’ বাঙলা সাহিত্যের অন্যতম ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস বলে আমি মনে করি। জেনারেল জিয়া যখন খুন হন তখন তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। প্রচলিত আছে তাকে হত্যার পেছনে জেনারেল মনজুরের ভূমিকা সর্বাগ্রে। কিন্তু ইতিহাস জানেন বোঝেন এমন সবাই জ্ঞাত আছেন যে মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনাসদস্য এবং পাকিস্তানফেরত সেনা সদস্যদের মধ্যে একটা চরম বিভেদ ছিল।
হতাশাব্যঞ্জক হলেও সত্য জিয়াউর রহমান একজন অকুতোভয় সেনাসদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধা হয়েও বঙ্গবন্ধু হত্যায় পরোক্ষ ভূমিকা রাখেন কারণ তিনি ব্যক্তিগতভাবে লোভী হয়ে গেছিলেন বাংলাদেশের অসংবাদিত নেতা হবার জন্য। সেনাবাহিনীর প্রধান হওয়া সত্বেও তিনি চেয়েছিলেন হতে রাষ্ট্রের প্রধান, রাজনৈতিক দলের প্রধান। তিনি সেনাবাহিনী থেকে সরে এসে বি এন পি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং নিজেকে ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি হিসেবে একটি অগণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা সেনাসদস্যদের বঞ্চিত করে পাকিস্তানফেরত সুবিধাবাদী সেনাসদস্যদের ভালো অবস্থানে নেন যার অন্যতম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যাকে জিয়া করেন সেনাবাহিনীর প্রধান। অথচ এরশাদ সেই ব্যক্তি যে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের দাসত্ব করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে দেশে এসেও বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই না করে ছুটি শেষে আবার পাকিস্তানে ফিরে যান। অথচ জিয়াউর রহমান পচাত্তর পরবর্তী প্রেক্ষাপটে এরশাদের মতো লোককে করেন সেনাপ্রধান অথচ সেনাবাহিনীর সবচেয়ে দক্ষ ব্যক্তি জেনারেল মনজুরকে চট্টগ্রাম ক্যা��্টনমেন্টের জি ও সি করে ঢাকার বাইরে পাঠিয়ে দেন। শুধু তাই নয় এরশাদের পরামর্শে জিয়া সেনাবাহিনীতে চৌকশ মুক্তিযোদ্ধা বেশীরভাগ অফিসারকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাইরে পাঠিয়ে দেন, বেশীরভাগকে পাঠান চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে, জেনারেল মনজুরের অধীনে। এসবই আসলে ছিল এরশাদের চাল। তিনি মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের জিয়াউর রহমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে এমন একটি ক্যান্টনমেন্টে পাঠান যেখানে বাংলাদেশের তৎকালীন সেনাবাহিনীর সেরা সামরিক অফিসার দায়িত্বে। এরমধ্য দিয়ে এরশাদ সুকৌশলে প্রেসিডেন্ট জিয়া এবং জেনারেল মনজুরের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেন। তারপর তিনি জেনারেল মইন যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা তাকে দিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে খুন করান এমনভাবে যাতে তার দায় পড়ে জেনারেল মনজুরের ওপর।
দারুণ কূট-কৌশলের মাধ্যমে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ৩দিনের মধ্যে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সেনাবাহিনীর সেরা কর্মকর্তাকে হত্যা করান এবং নিজে দখল করে নেন বাংলাদেশের ক্ষমতার কলঙ্কিত আসনটি।
মশিউল আলম অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে ইতিহাসের বিশ্লেষণ করেছেন এই বইটিতে। তিনি দেখিয়েছেন এরশাদের কূট-কৌশলের কাছে কীভাবে প্রেসিডেন্ট জিয়া পরাস্ত হন। কীভাবে জিয়াউর রহমান নিজে একজন মুক্তিযুদ্ধ হয়েও ক্ষমতার লোভে এরশাদকে সাথে নিয়ে চারশরও বেশী মুক্তিযুদ্দ করা সেনা কর্মকর্তাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসিতে ঝোলান, কীভাবে ক্ষমতার লোভে রাজাকার গোলাম আযমসহ অন্যদের বাংলাদেশে ফেরত আনেন, জামায়াত ইসলামীকে রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং মন্ত্রীসভায় আনেন আলীমের মতো রাজাকারদের। জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদেরও পুনর্বাসিত করেন। জেনারেল মনজুরের চরিত্র নিজেও উপন্যাসে হতাশা ব্যক্ত করে জিয়াউর রহমানের এহেন কর্মকান্ডে যা কীনা তার মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
জেনারেল মনজুরের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যায় কোন ভূমিকাই ছিল না কিন্তু এরশাদ কূট-কৌশলে তাকে কীভাবে ফাঁসিয়ে দেন, কীভাবে সেনাবাহিনীর দ্বারা পুলিশের কাছে আত্মসমর্থন করা জেনারেল মনজুরকে আর্মি হেফাজতে নিয়ে খুন করান যাতে সাধারণ মানুষ না জানে কি হয়েছিল সেটা অত্যন্ত প্রাঞ্জল এবং বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তুলে ধরেছেন মশিউল আলম। তিনি পরিষ্কারভাবেই দেখিয়েছেন বি এন পি’র সুবিধাবাদী নেতারা কীভাবে পালিয়ে থেকেছেন তখন, কীভাবে জেনারেল মনজুর ব্যর্থ হন বিভ্রান্ত এবং হতাশ চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের সেনাসদস্যদের নেতৃত্ব দিতে।
বইটিতে সেনা কর্মকর্তাদের সাথে তাদের স্ত্রীদের কথোপকথন অনেকক্ষেত্রেই ক্লান্তিকর মনে হয়েছে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর এই খুন দুটোয় কী ভূমিকা ছিল, এরশাদের খুঁটির জোর ছিল কে বা কারা সেটা উপন্যাসে পরিষ্কার হয়নি। এছাড়া এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী উপন্যাস যা কেবল পাঠককে সত্য জানতে সাহায্যই করবে না বরঞ্চ ব্যবহৃত হতে পারে ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের জন্য রেফারেন্স হিসেবে।
মশিউল আলমের ‘দ্বিতীয় খুনের কাহিনি’ প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশনী ২০১৫ সালে, পাওয়া যাবে রকমারিতে সারাবছর জুড়ে। মশিউল আলমকে অভিনন্দন এমন একটু বই লিখবার জন্য।