আমার ছ্যাগীডারে মারলি ক্যান?... সব খাইয়া ফালাইছস? ঘরের মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। আর সেই রক্তের মাঝখানে বসে আছে এক অদ্ভুত ছায়ামূর্তি-যার জিভ আর মানুষের মতো নেই। সে শুধু চেনে ক্ষুধা, আর চেনে প্রতিশোধ। আজ রাতের আঁধারে মিটবে তার বহুদিনের পুরোনো এক সাধ! মেট্রো স্টেশনে কুড়িয়ে পাওয়া একটি সাধারণ কয়েন। অথচ তার জন্যই আজ জীবন বাজি রাখতে হলো সাইদুল সাহেবকে। আনোয়ার সাহেবের লোভ, ক্যাপ পরা রহস্যময় যুবক, আর প্রাচীন রোমান ইতিহাসের এক অভিশপ্ত অধ্যায়-সব মিলেমিশে একাকার এক রাতে। শেষ পর্যন্ত কে পাবে সেই 'ক্যারন'স ওবল'? “তোমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত তোমাদের রক্ত দিয়েই করতে হবে।” শতবর্ষী জমিদার বাড়ির দেয়ালে কান পাতলে শোনা যায় এক অভিশপ্ত অতীতের ফিসফিসানি। সেই পচা রক্তের গন্ধ আর অদৃশ্য ছায়ার হাতছানি কি উপেক্ষা করতে পারবে সৌমিক? নাকি তাকেও বরণ করতে হবে পূর্বপুরুষের করুণ পরিণতি? “আমাদের বাড়িতে এক ধরনের সুইসাইডাল টিউন বাজে। এই সুর আপনার কানে গেলে আপনার সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। পালাতে পারবেন না।” লেখকের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠল এক দুঃস্বপ্ন। রহস্যময় সুর, পিশাচের ফিসফিসানি, আর একের পর এক মৃত্যু-সবকিছুর সাক্ষী হয়ে রইল একটি নোটবুক আর এক অভিশপ্ত আয়না। বুকের উন্মুক্ত হাড়গুলোর ফাঁক দিয়ে কাঁটাচামচটা হৃৎপিন্ডটায় ঢুকিয়ে দিলো। চামচের আগায় লেগে থাকা হৃৎপিণ্ডের অল্প একটু মাংস মুখে ঢুকিয়ে হাতটা পড়ে গেল নিচে। নিজেকে পবিত্র করে, শুদ্ধ করে সে এই পৃথিবী ছেড়েছে। পাথরের ভেতর উজ্জ্বল আভার কিছু গেঁথে রয়েছে। অন্ধকারে জ্বলছে অদ্ভুত এক প্রাণীর কঙ্কাল। হঠাৎ পায়ের নিচে মাটি কেঁপে উঠল ভীষণভাবে। সেই কঙ্কাল এখন স্পষ্ট এক প্রাণীর গড়নে রূপ নিচ্ছে-যার চোখ দুটো আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। হ্যালো, আমার একটা কাজ করে দিতে হবে... আমার রুপোর আঙটিটা ফ্রিজের নিচে আছে। মৃতরা কি কথা বলতে পারে? নাকি পুরোনো এক মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরকাল থেকে ভেসে আসছে তাদের অতৃপ্ত আত্মার আকুতি? সুমিতের জীবনে নেমে আসা এক অদ্ভুত অভিশাপের গল্প।
পড়ে শেষ করলাম নটিলাস প্রকাশনীর বহুল প্রতীক্ষিত হরর সঙ্কলন "ভয়াল ভয়ঙ্কর"। প্রথম সঙ্কলন হিসেবে নটিলাস ভালো গল্প নির্বাচনে বিচক্ষণতার কোনোরকম ত্রুটি রাখে নি। গা ছমছমে দারুণ সব গল্পগুলো পড়তে গিয়ে মনেই হয় নি সময় কখন পেরিয়ে গেল। বলা বাহুল্য, হাতে পাওয়ার দুই দিনের মধ্যেই সমস্ত গল্প পড়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছি রীতিমত। আমি রিভিউ লিখতে পারি না আসলে। গল্পগুলো নিয়ে ছোটখাট এক টুকরো অনুভূতি লিখব ভেবেই কীবোর্ডে আঙুল স্পর্শ করে চলেছি। এই সঙ্কলনে আছে মোট ২৯টি গল্প-
১. জানকির রাত - বাপ্পী খান ⭐⭐⭐⭐⭐ রহস্যময় এক লোক আছমান হুদ লেখককে জানকিছড়ার জঙ্গলে নিয়ে যায় এক অদ্ভুত প্রাণীর কঙ্কাল দেখাতে,যা কেবল রাতেই দৃশ্যমান হয়। ভয়াবহ এই রাতে কী অপেক্ষা করছে লেখকের জন্য ? হররের সাথে এডভেঞ্চারের মিশেলে দারুণ উপাদেয় হয়ে উঠেছে গল্পটি।
২. নিয়ন্ত্রণ - শাহরিয়ার নাবিল ⭐⭐⭐⭐⭐ কেমন হতো যদি কাউকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন আপনার ইচ্ছে মতো? কী ভাবছেন? দারুণ হতো? গল্পটা পড়লে আপনার হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিকের সীমা ছাড়িয়ে ফেলতে পারে। হররের সাথে ডার্ক হিউমার ব্লেন্ড করে যে অদ্ভুত একটা গল্প ফেঁদেছেন লেখক, আপনি মুগ্ধ হওয়ার সাথে সাথে ভয়ের স্বাদটাও দারুণভাবে উপভোগ করবেন!
৩. মোবাইল - মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ ⭐⭐⭐⭐ ক্রিং ক্রিং ক্রিং- সাবধান! কল ধরবেন না! গল্পটা পড়ে বেশ ভয় পেয়েছি! আর ক্লাইম্যাক্সের ধাক্কাটা.....!! এক কথায় দারুণ একটা গল্প!
৪. সময় যেন থমকে গিয়েছে কোথায়! - আলভী রহমান শোভন ⭐⭐⭐⭐ রাশলান প্রায় বার বছর পর দাদাবাড়িতে আসে। এই বাড়িতেই ওর বাবা আর দাদা একইভাবে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছিলেন। আসলেই কি হার্ট অ্যাটাক নাকি অন্যকিছু?... বেশ ভাল ছিল গল্পটা।
৫. অপ-পবিত্র - সাজ্জাদ সিয়াম ⭐⭐⭐⭐1/2 "আমার মূল সমস্যাটা হচ্ছে Contamination OCD। খাবারদাবারের ব্যাপারে ভয়ংকর খু্ঁতখুঁতে মানুষ আমি।".. গল্পটা পড়ে মনে হচ্ছে আমারও Contamination OCD হয়ে গেছে। রুচির বারটা বেজেছে আমার। অনবদ্য লেখনী!
৬.ভয়ংকর বিভ্রম- রুকসাত জাহান ⭐⭐⭐⭐ নবাগত অভিনেত্রী পারভীন জীবনের প্রথম নাটকে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছে। যেমন তেমন নাটক নয় কিন্তু, হরর নাটক.... Creepy একটা গল্প। ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। ক্লাইম্যাক্স দারুণ।
৭. কয়েন- সারা ফাইরুজ ⭐⭐⭐⭐ মেট্রো স্টেশনে কুড়িয়ে পাওয়া সাধারণ একটি কয়েন। অথচ তার জন্যই আজ জীবন বাজি রাখতে হলো সাইদুল সাহেবকে।... বেশ অন্যরকম একটা গল্প। লেখনশৈলী সুন্দর।
৮. তালগাছতলায় কে কাঁদে?- কাজী আসিফ ⭐⭐⭐1/2 "আয় রে আমার প্রাণপাখি, তুই ফিরবি না ক্যান রে?..." গল্পটা শেষ করে আপনার কানে বাজতে থাকবে এটাই..
৯. নন ফিকশন- আরমান কবির ⭐⭐⭐⭐⭐ "আমাদের বাড়িতে এক ধরনের সুইসাইডাল টিউন বাজে। এই সুর কানে গেলে আপনার সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। পালাতে পারবেন না।" এই গল্পটা পড়ে এত বেশি ভয় পেয়েছি যে বৃষ্টিস্নাত ঠান্ডা আবহাওয়াতেও ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছিলাম। দারুণ লেখনী!
১০. অজয় চ্যাটার্জির সাহস- মাইনুদ্দিন চৌধুরী ⭐⭐⭐⭐ "মনে রাখিস, কর্ণপিশাচিনী এক ক্ষুধার্ত প্রেতসত্তা। সে শবের ওপর বাস করে,পচাগলা শবদেহ ভক্ষণ করে!" গল্পটা বেশ ভয়ের। তন্ত্রসাধনার সাথে হররের মিশেল আমার বরাবরই পছন্দ।
১১. মা কই? - তামজীদ রহমান ⭐⭐⭐⭐1/2 "মুখপুড়ি, আমি যাওনের সুমায় তোর মারেও নিয়া যাব। কারিন জ্বিনের লগে আমার বান্ধা হইছে।" Melancholic Horror.. গল্পটায় যেমন ভয় ছিল,তেমনই ডিস্টার্বিংও। ক্লাইম্যাক্সে গিয়ে মন খারাপ হয়েছে খুব।
১২. দ্য ওয়াচার- নাঈমুর রহমান ⭐⭐⭐⭐ "তুমি যদি ওকে দেখতে পাও,তবে চোখ ফেরাবে না। চোখ ফেরালেই..." গল্পটা ভালো ছিল। অন্যরকম ভয়ের। অনুবাদ ঝরঝরে।
১৩. ঝোল - লিংকন হাসান ⭐⭐⭐⭐⭐ "আমার ছাগীডারে মারলি ক্যান? সব খাইয়া ফালাইছোস?".... এই গল্পটা এত সুন্দরভাবে লেখা! ডিটেইলিংগুলো খুব ভালো লেগেছে। গল্পটা খুবই ডার্ক আর ডিস্টার্বিং। কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠেছে পড়ার সময়। অসম্ভব ভাল লেগেছে।
১৪. আহবান- রাইয়ান কবির ⭐⭐⭐⭐ "ইয়্যামারাখ...ইয়্যামারাখ!"... আলির মনে হলো সে এতদিনে তার জীবনের আসল লক্ষ্য খুঁজে পেয়েছে! এই গল্পটার মধ্যে এডভেঞ্চারের সাথে Folklore ভাইব ছিল। লেখনী খুবই সুন্দর আর পরিশীলিত। কাশ্মীরে চলে গেছিলাম যেন একমুহূর্তের জন্য।
১৫. অদৃশ্যদর্শন - রায়হান মাসুদ ⭐⭐⭐1/2 অমি যাদের দেখতে পায়,তারা থাকে অন্যজগতে। তবু অমি কেন তাদের দেখে? অমির স্ত্রী সামান্তার ভাগ্যে কী আছে? গল্পটা বেশ ভালো ছিল। লেখনী সুন্দর।
১৬. পাপবন্দী - জারিফ চৌধুরী ⭐⭐⭐⭐ আপনি কি আপনার জীবনে এমন কোনো গুরুতর পাপ করেছিলেন যার শাস্তি হয় নি? আপনার মনে অনুশোচনা থেকে গেছে? আজকের প্ল্যানচেটে সেইসব পাপের কথাই স্মরণ করবেন... গল্প পড়তে পড়তে আপনিও হয়তো তাদের সাথে প্ল্যানচেটে জড়িয়ে পড়বেন। বেশ ভাল গল্প।
১৭. সময়ের কার্নিশে ছায়ার বিলাপ- ইশিতা জেরিন ⭐⭐⭐⭐ চাপাডাঙা গ্রাম। কী এমন রহস্য লুকিয়ে আছে এই গ্রামের ঠাকুরবাড়িতে। চাকরিসূত্রে ঠাকুরবাড়িতে আশ্রয় নেওয়া তনয়ের ভাগ্যে কী লেখা আছে? গল্পটা পড়ে ভয় পেয়েছি। লেখনশৈলী সুন্দর।
১৮. সৌল অফ ডেড- সিজলান সোহাগ ⭐⭐⭐⭐ কুকুর লিলিয়ার ভীষণ অপছন্দ। ভীষণ! গল্পটা একই সাথে ভয়ের এবং হাহাকারের। গল্পটা পড়ে এক অদ্ভুত শুন্যতা অনুভূত হতে থাকে। দারুণ লেখনী।
১৯. সেই ভয়াল রাতে- এমরান আহমেদ ⭐⭐⭐⭐ সব ভূত কি ভয়ঙ্কর হয়? আচ্ছা, মানুষ বেশি ভয়ঙ্কর নাকি ভূত? উত্তর মিলবে গল্পে। বেশ সুন্দর গল্প।
২০. শকুনখোঁড়া - নাদিম মাহমুদ সতেজ (নিজের লেখাকে রেটিং দেওয়ার মত সু-সাহস বা দুঃসাহস কোনোটাই আমার নেই!) কালবৈশাখীর ঝড়ে নৌকা ভেঙে মনিরাম জেলে আর তার পুত্র মধুরাম আশ্রয় নেয় রহস্যময় এক গ্রামে। নাম তার শকুনখোঁড়া। লোকে বলে, এই গ্রামে নাকি মানুষরূপী পিশাচদের বসবাস!
২১. ভয়ঙ্কর বিভীষিকা - মহিউদ্দিন মোহাম্মদ যুনাইদ ⭐⭐⭐1/2 গল্পটা পড়ে নস্টালজিক হয়ে গেছিলাম। ক্লাইম্যাক্সটা ভালো। বাঁশঝাড় দেখলেই এখন থেকে এই গল্পটার কথা মনে পড়বে।
২২. নাগের জাত- নাসিফ বিন হোসেন ⭐⭐⭐1/2 মুরুব্বি আবদুর রহমান শেষ বয়সে এক পরমাসুন্দরী নারীকে বিবাহ করলেন। কে এই নারী? লেখনশৈলী সাবলীল।ভাল লেগেছে।
২৩. উঁকি- ওয়াসিফ নূর ⭐⭐⭐⭐ আপনিও নিশ্চয়ই উঁকি দেন? এই গল্পটা পড়লে উঁকি দেওয়ার আগে দশবার ভাববেন। বেশ Creepy ছিল গল্পটা!
২৪.শেষবার- মুয়ীদ মাহতাব ⭐⭐⭐⭐ ''প্রথমবারের মতো তার হাসি দেখলাম। অসম্ভব সুন্দর সেই হাসি।'' গল্পটা পড়ে মন খারাপ হয়েছে। বেশ ভাল লিখেছেন লেখক।
২৫. বিদায়, রায়হান!- ইমরান চৌধুরী ⭐⭐⭐1/2 হাইওয়ে-৪১। কেন এখন অবধি ১৪ জন এক্সিডেন্ট করেছে এখানে? উত্তর মিলবে গল্পে। বিদেশী গল্পের ছায়া অবলম্বনে লেখা এ গল্পটির লেখনশৈলী সাবলীল। ভাল লেগেছে।
২৬. র্যাডলফ কার্টারের জবানবন্দী- নাজমুস সাকিব ⭐⭐⭐⭐ এই গল্পটা পড়ে কেন জানি অনেক ভয় পেয়েছি। লেখকের অনুবাদ অসম্ভব সুন্দর ছিল। পড়ে 'অনুবাদ- অনুবাদ' মনে হয় নি। এখানেই লেখকের সার্থকতা।
২৭. বিবর্ণ চিঠি- সালসাবিলা নকি ⭐⭐⭐⭐১/২ "তোমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত তোমাদের রক্ত দিয়েই করতে হবে!" এই গল্পটা পড়ার সময় ভীষণ অস্বস্তি আর দুশ্চিন্তা আমাকে জেঁকে বসেছিল। আর এই অস্বস্তিটা অনুভব করানোতে লেখকের মুনশিয়ানার প্রশংসা করতেই হয়! শেষটা দারুণ!
২৮. হৃদয়ের কথা রবে না গোপন- সাকিব ⭐⭐⭐⭐ বিখ্যাত লেখক এডগার এলান পো এর "The Tell-Tale Heart" অবলম্বনে লেখা এই গল্পটি আমার মাথায় অনেকদিন থেকে যাবে। লেখক খুব সাবলীলভাবে লিখেছেন। চমৎকার একটা গল্প।
২৯. বোবা প্রতিশোধ- সজল চৌধুরী ⭐⭐⭐⭐⭐ এই সঙ্কলনের সবচেয়ে ছোট গল্প হলেও আমার কাছে এর ওজন অনেক বেশি ভারী। এই গল্প নিয়ে আমার বেশি কিছু বলার নেই। শুধু এতটুকু বলব, গল্পটা পড়ে আমার গায়ে কাঁটা যেমন দিয়েছে, তেমনি চোখ দুটোও ঝাপসা হয়েছে। অসম্ভব সুন্দর ছিল এই গল্পটা। একটা ধাক্কা দিয়ে গেছে হৃদয়ে।
সব মিলিয়ে নটিলাস প্রকাশনীর ভয়াল ভয়ঙ্কর এর গল্পগুলোর স্বকীয়তা, ভয়ের আবহ আর পরিণত লেখনীর গুণে পাঠকমহলে সমাদৃত হবে সে ব্যাপারে আগাম ভবিষ্যদ্বানী করে আজকের লেখার এখানেই ইতি টানলাম!