Jump to ratings and reviews
Rate this book

বাঙালি মুসলমানের হজযাত্রা

Rate this book
হজ মুসলমানের একটি ফরজ আমল। যেদিন থেকে এদেশের মানুষ মুসলমান হয়েছে, সেদিন থেকেই বাঙালি মুসলমান হজ করতে মক্কা যাত্রা করেছেন।
বাঙালি মুসলমানের হজযাত্রা গ্রন্থখানি ইতিহাসের সেই প্রথম দিন যেদিন বাঙালি মুসলমান হজে গিয়েছিলেন সেদিনের দালিলিক তথ্য ধরে রচিত।

বর্তমান সময়ের হজের চালচিত্রও এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। এর বাইরেও হজ সংক্রান্ত কিছু মাসায়েল নারী, পুরুষ, শিশুর হজের পার্থক্য আলেমদের সূত্রে এ গ্রন্থে উপস্থাপিত হয়েছে।
যাঁরা হজ করেছেন, যাঁরা হজ করেননি, সকলের জন্য প্রয়োজনীয় একটি বই বাঙালি মুসলমানের হজযাত্রা, যা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আদি চালচিত্রকে ধারণ করে রচিত।

182 pages, Hardcover

Published April 1, 2026

Loading...
Loading...

About the author

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
0 (0%)
4 stars
0 (0%)
3 stars
0 (0%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 of 1 review
Profile Image for Hasan.
Author 11 books89 followers
Read
April 21, 2026
বাঙালি মুসলমানের হজ যাত্রা : ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আদি চালচিত্র


হজ যেমন প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য ফরজ ইবাদত, একই সঙ্গে হজের উদ্দেশ্যে গমন এক রোমাঞ্চকর যাত্রা। বিশেষত, আরব ভূখণ্ড থেকে বহু দূরের বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য হজ শুধু ইবাদত নয়, বরং সারা জীবন পুষে রাখা আকাঙ্ক্ষা। এই অঞ্চলের মানুষ স্বভাবতই জীবনের শেষ পর্বে হজের নিয়্যত করে থাকেন। সারাজীবনের সঞ্চিত সম্পদ ব্যয় করেন এই যাত্রায়; ইচ্ছে পোষণ করেন জীবনের শেষ দিনগুলো পঙ্কিলতামুক্ত হয়ে কাটাবেন, মক্কা-মদিনা থেকে ফিরে আসবেন পাপমোচনের এক নতুন অনুভূতি নিয়ে।
বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এই যুগেও, পরিবারের প্রবীণ কেউ যখন হজে রওনা দেন, তখন আশকোনা হজ ক্যাম্প এলাকায় এক ধরনের বেদনাবিধুর পরিবেশ তৈরি হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব জেনেও স্বজনদের চোখে ভাসে অনিশ্চয়তার ছায়া। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে হাজিরা সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন, যেন এটাই শেষ দেখা। মিটিয়ে দেন দেনা-পাওনা, কেউ কেউ ওয়ারিশদের উদ্দেশ্যে অসিয়তও করে যান। এই আবেগঘন দৃশ্য কল্পনা করলেই বোঝা যায়, একশ কিংবা দেড়শ বছর আগে হজযাত্রা কতটা বন্ধুর, কতটা অনিশ্চিত ছিল।

“বাঙালি মুসলমানের হজযাত্রা; ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আদি চালচিত্র” বইটিতে আমরা সেই সেকালের হজযাত্রার একটি জীবন্ত চালচিত্র দেখতে পাই। মূল আলোচনায় প্রবেশের আগে মোটাদাগে বলা যায়, বইটি মূলত হজ বিষয়ক কয়েকটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের সমন্বিত উপস্থাপনা। মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা রচিত ভ্রমণ বৃত্তান্ত (১৯১৬), খান বাহাদুর আহছানউল্লাহর হেজাজ ভ্রমণ (১৯২১), মুহাম্মদ সাঈদ হাসান শিকদারের পুণ্যপথের যাত্রীরা: হজ, হজযাত্রী ও পথ (২০২৩), মোহাম্মদ আলী খানের একজন হজযাত্রীর রোজনামচা (২০১১) এবং ইয়াসিন আলী সরকারের শতবর্ষ-প্রাচীন হজের ডায়েরি, এই বইগুলোর নির্যাসই এখানে একত্রিত হয়েছে। ফলে হজসাহিত্যের এই বিচ্ছিন্ন অথচ মূল্যবান দলিলগুলো আলাদাভাবে না পড়েও পাঠক এক মলাটে একটি সামগ্রিক ধারণা পেয়ে যান।

তবে মোহাম্মদ হাননান কেবল সেকালের বর্ণনাতেই থেমে থাকেননি; বইয়ের একটি বড় অংশ জুড়ে তিনি বর্তমান সময়ের হজ-ব্যবস্থাপনা, সৌদি আরবের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ২০২৫ সালে প্রকাশিত ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপন, বর্তমান সময়ে হজের খরচ, হজের ব্যবস্থাপনা সংযোজন করেছেন। ভবিষ্যৎ পাঠকের কথা বিবেচনায় এনে এই সংযোজন প্রাসঙ্গিক হলেও, বইটির শিরোনামে যদি ‘আদি ও বর্তমান চালচিত্র’ এই দুই দিকের উপস্থিতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকত, তবে পাঠকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান কিছুটা কমে আসত।

বই খুলতেই পাঠক থমকে যায় উৎসর্গপত্রে,“আমার বংশের পূর্বপুরুষ, শ্রী শ্রী হাজী মিঠু বেপারী, তাঁর স্মরণে।” ফুটনোটে উল্লেখ আছে, নামটি কবরফলকে ঠিক এভাবেই লেখা। এই ছোট্ট তথ্যই অনেক কিছুর ইঙ্গিত দেয়। শতবর্ষ-প্রাচীন হজ ভ্রমণ কাহিনিগুলোতেও একই প্রভাব স্পষ্ট। লেখক সচেতনভাবেই সামনে এনেছেন বিষয়টি। মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা কর্তৃক রচিত ভ্রমণ বৃত্তান্ত প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১৬ সালে। অপরদিকে ইয়াসিন আলী সরকারের হজ ভ্রমণ কাহিনি লেখা হয় ১৯৩০ সালে। তাদের দুজনের রচনাতে ফোর্ট উইলিয়ামের সংস্কৃতনুসারী বাংলা গদ্যের প্রভাব ছিল অনেক প্রকট। যেমন এক জায়গায় মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা লিখছেন, “জেদ্দা হইতে উষ্ট্রযোগে মক্কা-মোয়াজ্জামাস্থ সম্মানিত কাবা মন্দিরে গমন করিতে হয়।” ইয়াসিন আলী সরকার তার ডায়েরিতে লিখেছেন, “রাত্রিভর নিদ্রাদেবীর আশ্রয় পাইলাম।” তবে, ১৯২১ সালে প্রকাশিত খান বাহাদুর আহছানউল্লাহর হেজাজ ভ্রমণ এই দোষে দুষ্ট নয়। বিশ শতকের প্রথমার্ধের মুসলমান লেখকরা বঙ্কিমীয় গদ্যভাষা ব্যবহারে কীভাবে অভ্যস্ত হলেন, সেটি নিঃসন্দেহে আলাদা গবেষণার দাবি রাখে।

প্রথম অধ্যায়ে লেখক কাবাঘর নির্মাণের ইতিহাস ও হজের উৎপত্তিগত প্রেক্ষাপট সংক্ষিপ্ত কিন্তু বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছেন। একই অধ্যায়ে হজের সর্বজনীনতা নিয়েও আলোকপাত করা হয়েছে। অধ্যায়ের সবচেয়ে উপকারী অংশ নিঃসন্দেহে ‘হজকোষ’ বা হজ-সম্পর্কিত পরিভাষার ব্যাখ্যা। ২৯টি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষার ব্যাখ্যা বইটিকে শুধু তথ্যবহুলই করেনি, নবীন পাঠকের কাছেও গ্রহণযোগ্য করেছে। হজ সম্পর্কে যাদের পূর্বজ্ঞান কম, তাদের জন্যও এই অংশ বইটিকে সুখপাঠ্য করে তুলবে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে বাঙালি মুসলমানের হজযাত্রার গমনপথ, হজে যাওয়ার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, হাজিদের সংখ্যা, বয়স ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এসেছে। কিন্তু এখানেই একটি বড় ধরনের তথ্যগত ত্রুটি চোখে পড়ে। বল্লাল সেনের আমলকে ‘৬০০ শতক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, অথচ ঘটনাটি ১১৭৮ সালের সঙ্গে সম্পর্কিত। আরও বিস্ময়কর হলো, কয়েক অধ্যায় পরেই একই রেফারেন্স ধরে মূল ঘটনার বিবরণ আবার সঠিকভাবে চলে এসেছে। ফলে মনে হয়, কোথাও কোথাও সম্পাদনার ঘাটতি রয়ে গেছে। এই অধ্যায়ে ১৯১৩-১৪ সালে প্রায় ২৮ হাজার বাঙালি মুসলমানের হজযাত্রা এবং ২০২৩ সালে তা এক লক্ষ ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ১৯১৪ সালে সমগ্র পৃথিবী থেকে মাত্র এক লাখ ত্রিশ হাজার হাজির হজ পালন করার হিসাবও ঐতিহাসিক উপাদান।

বাঙালি হাজিদের বয়স ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রসঙ্গ টেনে শতবর্ষী রচনাগুলো থেকে রেফারেন্স টেনে লেখক দেখিয়েছন, সেই শুরু থেকেই শেষ বয়সে হজে যাওয়ার অভ্যাস এই অঞ্চলের মুসলমানদের, এই পর্যবেক্ষণ কেবল সামাজিক তথ্য নয়; এটি বাঙালি মুসলমানের ধর্মচর্চার বাস্তব চরিত্রও বোঝায়। একই সঙ্গে লেখক মক্কা-মদিনার উন্নয়নে বাংলার মুসলিম শাসকদের অবদানের কথাও এনেছেন, বিশেষত গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের প্রসঙ্গ। এই অংশ আরও বিস্তৃত হতে পারত, কিন্তু সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত হিসেবেও তা গুরুত্বপূর্ণ। হজপথে কিংবা হজকালীন মৃত্যুর প্রসঙ্গ এসে যখন জানা যায়, জাহাজে মৃত্যু হলে কখনো কখনো লাশ সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে হতো, তখন সেকালের হজযাত্রার কঠোর বাস্তবতা পাঠককে নাড়া দেয়। ভাস্কো দা গামার হাতে হাজিবাহী জাহাজ লুট ও যাত্রী হত্যার কথা উল্লেখ করেছেন লেখক, সত্যেন সেনের বই মসলার যুদ্ধ (১৯৬৮)- এ উল্লেখ আছে এই ন্যাক্কারজনক বর্ণনার।

বইয়ে বাঙালি মুসলমানের হজবিবরণী অংশটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। এখানে ১৯১৪ সালের হজের খরচের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা অনেকটা এমন—জাহাজভাড়া ৭০ টাকা, উটভাড়া ১০ টাকা, মক্কায় ঘরভাড়া ৪ টাকা, আরাফার তাঁবু ২ টাকা, মক্কা থেকে মদিনা যেতে উটভাড়া ৬০ টাকা, পাসপোর্ট ১ পয়সা। বইয়ের অন্য এক জায়গায় লেখক দেখিয়েছেন তখন আরব দেশের তুলনায় ভারতবর্ষের টাকার মান কত বেশি ছিল।

হজসাহিত্যে রাজনৈতিক ইতিহাস, এই দৃষ্টিকোণটি সচরাচর আলোচিত হয় না। অথচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে আরবের ক্ষমতার পালাবদল, উসমানি খেলাফতের প্রভাব হ্রাস, হেজাজের নিয়ন্ত্রণ হারানো, ব্রিটিশ সমর্থনে সৌদ শক্তির উত্থান, জেদ্দার রাজনীতি, এসব কিছু হজযাত্রীদের চোখে-দেখা বিবরণে উঠে এসেছে। ফলে পাঠক বুঝতে পারেন, হজের পথ ধরে আরবের ইতিহাসও পড়া যায়। মক্কা ও মদ���নার তুলনামূলক গুরুত্ব, হাজিদের কাছে মদিনার আলাদা আবেগ, সেকালের মদিনার আর্থসামাজিক অবস্থা, এসব বর্ণনা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। খান বাহাদুর আহছানউল্লাহর হেজাজ ভ্রমণ এ প্রসঙ্গে একটি শক্তিশালী সূত্র হয়ে উঠেছে।

আরব জাতির অতিথিপরায়ণতা, সামাজিক রীতি, একই আরব সমাজের দুই বিপরীত রূপের চিত্র। পথে লুটতরাজ আছে, আবার গৃহে গেলে মেহমানদারিও আছে। এই দ্বৈততা লেখক ভালোভাবে তুলে এনেছেন। খান বাহাদুর আহছানউল্লাহর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সে সময় আরবে পর্দাপ্রথা ভারতীয় উপমহাদেশের মতো কঠোর ছিল না। মোহাম্মদ হাননান প্রাচীন পাণ্ডুলিপি থেকে সরাসরি বর্ণনা এনে দেখিয়েছেন, আগে কাবা চত্বরে চার মজহাবের চার জামাত হতো।

বইয়ের শেষদিকে গবেষক-পাঠকের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান কিছু তথ্য আছে। কলিকাতা হজ্জ-কমিটির ১৯৩৫ সালের ঘোষণাপত্র, ১৯৩৫ সালের হজ-গাইড, ১৯২০ সালের হজের খরচ, ১৯৩৫ সালের আবশ্যক ব্যয়ের তালিকা, পাকিস্তান আমলে ১৯৬০ সালের হজ ব্যয়, ২০২৩ সালের হজ খরচ, ২০২৫ সালের হজ ব্যবস্থাপনা।বিশেষ করে পুরোনো নথিপত্রের সংযোজন বইটির একটি বড় প্রাপ্তি।

তবে বইটির সীমাবদ্ধতাও কম নয়। তথ্যের পুনরাবৃত্তি আছে, কোথাও কোথাও অধ্যায়ের নাম ও বিষয়বস্তুর অমিল আছে, কিছু তথ্যগত ভুল চোখে পড়ে, সম্পাদনার আরও যত্ন প্রয়োজন ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, বইয়ের শিরোনাম পাঠককে প্রধানত ‘আদি চালচিত্র’-এর প্রত্যাশা দেয়, কিন্তু ভেতরে এসে পাঠক বর্তমান সময়ের হজ-সংবাদ, সমসাময়িক সৌদি রাজনীতি ও প্রশাসনিক বিষয়ও বড় পরিসরে পান। এই বিস্তার খারাপ নয়, কিন্তু শিরোনামে তার ইঙ্গিত থাকলে ভালো হতো।

তবু এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বইটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলা ভাষায় হজসাহিত্য নিয়ে এমন সমন্বিত কাজ খুব বেশি নেই। এই বইটি শতবর্ষী হজসাহিত্যের সাথে সমকালীন সাহিত্যের সেতুবন্ধন ঘটাবে বলেই আমার বিশ্বাস।



বই : বাঙালি মুসলমানের হজ যাত্রা : ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আদি চালচিত্র
লেখক : মোহাম্মদ হাননান
প্রকাশনী : কথা প্রকাশ
মুদ্রিত মূল্য : ৪০০ টাকা
পৃষ্ঠা : ১৮২
প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০২
Displaying 1 of 1 review