"সুতনুক নাম দেবদশিক্যি তং অকাময়িত্থ বলনশেয়ে দেবদিন্নো নাম লূপদখে।" অর্থাৎ সুতনুকা নামে দেবদাসীকে কামনা করেছিল বারাণসীবাসী দেবদিন্ন (দেবদত্ত) নামক রূপদক্ষ। 'দেবদাসী' প্রথার সঙ্গে আধুনিক বাঙালির পরিচয় হয়েছিল খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর এই গুহালিপির মাধ্যমে। পল্লবগ্রাহী অদ্বিতীয় লেখক নারায়ণ সান্যাল আজ থেকে প্রায় একাত্তর বছর আগে 'সুতনুকা একটি দেবদাসীর নাম' নামক কালজয়ী লেখাটি প্রকাশ করে আক্ষরিক অর্থেই আমাদের চেতনায় ইতিহাস, বিষাদ, ক্রোধ এবং বিস্ময় দিয়ে যে ভাবটি সৃষ্টি করেছিলেন, আজও তা প্রায় অটুট। তার পরেও এই নিয়ে লেখা হয়েছে নানা বই। শ্রীপান্থের স্বাদু গদ্য থেকে শুরু করে নানা গবেষণাপত্র অবধি অনেক কিছুই এসে পৌঁছেছে আমাদের চোখে ও মনে। কিন্তু এই প্রথার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সন্ধিক্ষণ সম্বন্ধে হয় আমরা অবগত নই, নয় বক্তব্যের শুষ্কতার জন্য সে-সব আমরা ভুলে গেছি। ঠিক এই শূন্যতা ভরাট করার জন্যই এসেছে আলোচ্য বইটি। সমকালীন নয়; বরং বিংশ শতাব্দীতে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ মুহূর্তে শুরু হয়েছে এর ঘটনাক্রম। এক অত্যন্ত মেধাবী উৎকলবাসী ছাত্রের বড়ো আদরের বোনকে তার বাবা ধর্মীয় আচারের বাহানায় জগন্নাথ মন্দিরে দান করেছিল তাকে 'দেবদাসী' করবে বলে। আসলে দায়মুক্ত হতে চেয়েছিল সে। সেই ছাত্রের শিক্ষক ছিলেন কিংবদন্তি চিকিৎসক এবং সনাজ-সংস্কারক ডক্টর মুথুলক্ষ্মী রেড্ডি। তিনি এই ঘটনাকে এত সহজে মেনে নেননি। নিজের ছাত্রটিকে তার বোনকে উদ্ধারের কাজে পাঠিয়েই তিনি থেমে থাকেননি। বরং প্রবল প্রতাপশালী কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে আইনগত ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তিনি। এই উপন্যাস সেই লড়াইয়ের ছবিটি তুলে ধরেছে। তারই সঙ্গে এতে জগন্নাথ মন্দির নিয়ে নানা স্বল্পজ্ঞাত তথ্য আলোচিত হয়েছে। এসেছে স্থাপত্য ও শিল্পের নানা কথা। তবে সবচেয়ে বেশি করে এই উপন্যাস দেবদাসী প্রথার নামে চলে আসা ক্রূরতা ও সম্ভোগের ভয়াবহ জগৎটিকে উন্মোচিত করেছে। যে প্রসঙ্গ নিয়ে অনেকেই আজও কথা বলতে চান না, সেটির এমন মর্মন্তুদ ফিকশনালাইজড অথচ বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ সত্যিই বিরল। বইটি অলংকরণ, শুদ্ধ মুদ্রণ এবং নয়নসুখকর বর্ণ-সংস্থাপনে সমৃদ্ধ। তবে একটি অনুযোগ থেকে গেল। পদ্মবিভূষণ উপাধিপ্রাপ্ত ডক্টর রেড্ডির জীবন এবং দেবদাসী প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের দিকটি নিয়ে লেখক প্রায় কিছুই লিখলেন না। বরং ডিউস এক্স মাখিনার মতো একটি চটজলদি সমাধান দিয়ে তিনি উপন্যাসটি শেষ করেছেন। অথচ পুরীর মন্দিরের বিবিধ চিত্তাকর্ষক হলেও মূল বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্করহিত প্রসঙ্গে বইয়ের একটি বড়ো অংশ ব্যয় হয়েছে— যা অভিপ্রেত ছিল না। সামগ্রিকভাবে বলব, সুলিখিত ও সুমুদ্রিত হলেও আদতে এই বই এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সচেতন পাঠক এটিকে আপন করে নেবেন বলেই আশা রাখি।
বছরের ১৮ নং উপন্যাস লেখক শুভব্রত বসু এর লেখা পদ্মযোনি।। বইটি প্রী বুকিং করতে পারেনি, প্রকাশের পর কয়েকটি আলোচনা পড়ে একটি আগ্রহ জন্মায় বইটির প্রতি।। প্রথমত নজরকাড়া প্রচ্ছদ, সঙ্গে সুন্দর অলঙ্করণ, ব্লারব এর লেখা বইটির প্রতি পাঠকদের আগ্রহ উদ্রেক করতে বাধ্য।।
বইটি-র ব্লার্বে লেখা এটি দেবদাসীদের সংঘর্ষ এবং দেবদাসী প্রথা বিলোপ আন্দোলনের কাহিনি।। শশীমণি দাসী ছিলেন পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের শেষ মাহারি দেবদাসী।। দয়িতাপতি মহাশৃঙ্গারি সুদেবের পৌরহিত্যে তিনি হয়েছিলেন ভগবানের রক্তমাংসের স্ত্রী।। কিন্তু সেই নারী কে এবং সব দেবদাসীকেই ভোগ করার অধিকার দয়িতাপতি মহাশৃঙ্গারি এর।। এই অন্ধকার প্রথার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন শ্রীমতী মুভালুর রামঅমৃতম আম্মিয়ার এবং মাদ্রাজ বিধানসভার সহ-সভাপতি ড. মুথুলক্ষ্মী রেড্ডি।। দুজনেই ছিলেন দেবদাসী প্রথা বিলোপ আন্দোলনের অগ্রদূত।। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় থেকেই ড. মুথুলক্ষ্মী রেড্ডির নেতৃত্বে দেবদাসী প্রথা বিলোপ আন্দোলন নতুন আশার আলো দেখায়।। নবীন সার্জেন ডাঃ ম্রুণাল কান্তি পট্টনায়কের বোন নাবালিকা শিবাঙ্গীকে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দেবদাসী হিসাবে অর্পন করেছে তার দরিদ্র পরিবার।। তাকে উদ্ধারের জন্য ডক্টর পট্টনায়ক ছুটি নিয়ে এসেছেন পুরী।। সেখানে তার সাথে আলাপ হয় জগন্নাথ মন্দিরের পন্ডা পতিতপাবন এর সাথে যিনি তাঁকে মন্দিরের বিভিন্ন অংশ ঘুরিয়ে দেখান, বলেন অনেক অজানা তথ্য।। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি তিনি পারলেন শিবাঙ্গীকে সেই নিষ্ঠুর পরম্পরার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে? এই উপন্যাস এক ইতিহাসেরই পুনর্নির্মাণ, পুরীর শেষ মাহারি দেবদাসী শশীমণি দাসীর জীবনকাহিনী, মুথুলক্ষ্মী রেড্ডির সংগ্রাম, এবং এক ভাইয়ের লড়াই তাঁর বোনকে সমাজের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার জন্য।।
পাঠ প্রতিক্রিয়া -
উপন্যাসটির নামের সাথে বিষয়বস্তুর আক্ষরিক অর্থে কোনো মিল না থাকলেও, সম্পর্কটি হল পুরীর শ্রীক্ষেত্রের সঙ্গে।। এই বইতে দুটি কাহিনী সমান্তরালভাবে চলেছে, একটি শ্রী জগন্নাথের শেষ মাহারি দেবদাসী শশীমণি দেবীর, অন্যটি নিজের বোনের সন্ধানে পুরী আসা ম্রুণালের, লেখনশৈলীর সুবাদে এবং সাবলীল ভাষার প্রয়োগ কাহিনীকে করে তুলেছে গতিময়।। ইনফো ফিকশন হলেও বইটিতে তথ্য ডাম্পিং করা হয়নি, অনেক অজানা তথ্য বইটি থেকে জানতে পেরেছি।। অনুযোগ আছে - পুরো বিষয়টি লেখক একটু তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলেছেন, মনে হয়েছে আরও কিছু লেখা যেতো, ফুটনোট এর ব্যবহার করলে সুবিধা হয় পাঠকদের।।
❓ কেন পড়বেন-
👉 দেবদাসী প্রথার বিলুপ্তি করণ নিয়ে শ্রীমতী মুভালুর রামঅমৃতম আম্মিয়ার এবং মাদ্রাজ বিধানসভার সহ-সভাপতি ড. মুথুলক্ষ্মী রেড্ডি এর অবদান।। 👉 পুরীর জগন্নাথ মন্দির এর সম্পর্কে নানা তথ্য।। 👉 দেবদাসী প্রথার প্রচলন ও তার ভয়াবহতা।।
ধর্মীয় প্রথা আর সংস্কারের অন্তরালে নারীর অধিকার ও জীবনের জটিল কাহিনী হলো শুভব্রত বসুর উপন্যাস ‘পদ্মযোনি’। বইটির মূল চরিত্র এবং বাস্তব ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ 'শশীমণি দাসী' যিনি ছিলেন পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের শেষ দেবদাসী। বইটি কেবল নিছক ইতিহাস নয়, বরং বাস্তব ইতিহাসের উপাদানের সাথে উপন্যাসের কাল্পনিক আখ্যানের এক অনন্য মেলবন্ধন। নন ফিকশন অংশে উঠে এসেছে শশীমণির মন্দিরে আসার বাস্তব প্রেক্ষাপট এবং তাঁর জীবনের ট্র্যাজিক পরিণতি। ১৯৩০ সালে আনুমানিক সাত আট বছর বয়সে শিশু হিসেবে তিনি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে আসেন এবং তৎকালীন মহাশৃঙ্গারি দয়িতাপতি সুদেবের পৌরোহিত্যে তাঁর অভিষেক সম্পন্ন হয়। শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে তাঁকে ঘোষণা করা হয় ‘ভগবানের রক্তমাংসের স্ত্রী’। জীবনের অধিকাংশ সময় মন্দিরের আচার, গীতগোবিন্দ পরিবেশন ও জগন্নাথের শয়ন সেবায় নিবেদিত থাকলেও শেষজীবনে নেমে এসেছিল চরম অবহেলা ও একাকীত্ব। ২০১৫ সালের ১৯শে মার্চ আনুমানিক ৯২ বছর বয়সে পুরীর এক জীর্ণ ঘরে চরম দারিদ্র্য ও বার্ধক্যের সঙ্গে লড়াই করে তাঁর মৃত্যু হয়; আর এর মাধ্যমেই জগন্নাথ মন্দিরের শতবর্ষ প্রাচীন দেবদাসী বা মাহারী প্রথার আনুষ্ঠানিক ইতি ঘটে। এই বাস্তব ইতিহাসের সমান্তরালেই লেখক তুলে এনেছেন বিংশ শতাব্দীর তিরিশ ও চল্লিশের দশকের সামাজিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে তীব্র রক্ষণশীলতার মুখে দাঁড়িয়ে আইনসভায় দেবদাসী প্রথা বিলোপের জন্য ডঃ মুথুলক্ষ্মী রেড্ডির ঐতিহাসিক সংগ্রাম। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির মায়লাপুর সুন্দ্রেশ্বর শিবমন্দিরের অকথ্য অত্যাচার ও খাদ্য জলের সংকট থেকে বাঁচতে তিন নাবালিকা দেবদাসীর পলায়নের প্রামাণ্য বিবরণ। অন্যদিকে শশীমণির ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে তীব্র মানসিক ও সামাজিক সংঘাত। মন্দিরের কঠোর নিয়ম আর অনুশাসনের ভেতর ছন্দপতন ঘটে যখন দয়িতাপতি সুদেবের বালক পুত্র বীরভদ্র ভালোবেসে ফেলে শশীমণিকে। ঈশ্বরের জন্য নিবেদিত এক নারীর প্রতি রক্তমাংসের মানুষের এই প্রেম ধর্মীয় শৃঙ্খলের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। এই আখ্যানের সাথেই সমান্তরালে যুক্ত হয়েছে শিবাঙ্গী নামের আরেক হতদরিদ্র পরিবারের নাবালিকার কাহিনী, যাকে দেবদাসী হিসেবে মন্দিরে উৎসর্গ করা হয়েছিল। বোনকে এই নির্মম প্রথার অন্ধকূপ থেকে রক্ষা করতে তাঁর দাদার মরিয়া লড়াই উপন্যাসটির ফিকশন অংশে আলাদা মাত্রা যোগ করে। সব মিলিয়ে, শশীমণির মন্দিরে অভিষেক থেকে শুরু করে শেষজীবনের নিঃসঙ্গ লড়াইয়ের বাস্তব ইতিহাস, ডঃ মুথুলক্ষ্মী রেড্ডির সংস্কার আন্দোলন এবং শিবাঙ্গী ও তাঁর দাদার কাল্পনিক উপাখ্যান এই তিন স্রোত এক মোহনায় মিশে ‘পদ্মযোনি’কে পাঠককূলের কাছে অত্যন্ত উপাদেয় করে তুলেছে।।
লেখক উপন্যাসের শেষে কিছু উৎসগ্রন্থের কথা লিখেছেন। সেই বইগুলি সংগ্রহ করা গেলে অনেক কিছু বিস্তারিত অভিজ্ঞতা করতে পারা সম্ভব হয় বলে মনে করি। আমরা সকলে পুরীর মন্দির নিয়ে যে ধরনের ঔৎসুক্য অনুভব করি, সেই অনুভূতির এক চারণভূমি পাওয়া যায় এই উপন্যাসে। কিন্তু তৃষ্ণা মেটে না।
মূলত লেখার ধরনের জন্য এক ধরনের না পাওয়া থেকে যায়। এই ধরনের বিষয়ে আরও কত উন্নতমানের লেখা পাওয়া সম্ভব, তার আভাস পাওয়া যায় গল্পের চলনে। আমরা এক ধরনের রঙ পাই, কিন্তু অধরা থেকে যায় বেশিরভাগটাই।
প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়!
This entire review has been hidden because of spoilers.