১.
উর্দু সাহিত্য ঠিক কবে শুরু হয়েছিল, তা সঠিক বলতে পারবেন উক্ত বিষয়ে পণ্ডিত কোন ব্যক্তি। তবে, একথা বললে হয়ত অত্যুক্তি হবে না যে উর্দু সাহিত্যকে প্রথম সবচেয়ে ঋদ্ধ যিনি করেছিলেন, তিনি কবি গালিব। এবং গালিবের প্রায় একশ বছর পরে আরেকজন মানুষ উর্দুকে উপহার দিয়েছেন কিছু গল্প। তিনি সাদাত হাসান মান্টো। সেই দুজনকে নিয়ে গল্প ফেঁদেছেন রবিশঙ্কর বল।
২.
মান্টো আর গালিব দু’জন দুই সময়ের মানুষ। তাদের দেখা হয়নি। কিন্তু দুজনের ভেতর ব্যথা ছিল। সে ব্যথার বাখান কেমন? কেমন হতো যদি দু’জন কথা বলতে পারতেন?
মান্টো শুয়ে আছেন পাকিস্তানে, গালিব ভারতে। ব্রিটিশের পুঁতে দেওয়া তারকাটায় তারা আজ দুই দেশের বাসিন্দা। অথচ, মান্টো নিজে একসময় ছিলেন ভারতে। বোম্বে থেকে যার যাত্রা শুরু। অথচ তাঁকে চলে যেতে হলো অন্য কোথাও। তাই দু’জন কবরে শুয়ে কথা বলছেন একে অপরের সঙ্গে। মৃতের তো আর ভিসা, পাসপোর্ট লাগে না।
৩.
রবিশঙ্কর গল্প শুরু করেছেন উত্তম পুরুষে। লেখক একদিন এক আধপাগলা বুড়োর কাছ থেকে একটি পাণ্ডুলিপি পান, উর্দুতে লেখা। সংরক্ষকের দাবী, পাণ্ডুলিপিটি মান্টোর। গালিবের জীবনী নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন তিনি। অথচ, লেখক জানেন, মান্টো কোন উপন্যাস লেখেন নি। তবু মলিন পাণ্ডুলিপিটি গ্রহণ করলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে উর্দু শেখার জন্য পেয়ে গেলেন তবসুম নামের এক নারীকে। কিন্তু শেখার বয়স লেখকের নেই। তাই তবসুম যখন উর্দু পড়ে অনুবাদ করে দেয়, তিনি লিখে নেন নিজের ভাষায়। আর লেখক আমাদের নিয়ে যান ছায়ার জগতে।
ছায়ার জগত, কেননা মান্টো এবং গালিব উভয়েই মৃত। তাদের কথোপকথনে আমরা জানবো তাদের গল্প, তাদের সময়ের কথা। সে সময়ও আমরা দেখিনি। অর্থাৎ সবকিছুই আমাদের অদেখা, অন্য ভুবনের গল্প। তাই ছায়ার জগত। সেই সঙ্গে ছায়ার জগতের আরেকটি ব্যাখ্যা আছে। মান্টো এবং গালিব, একজন গল্পকার, একজন কবি। দুজনেই নিজের মনের ভেতরে একটা জগত পুষে রেখেছিলেন, যা বাস্তব জগতের সমান্তরাল এক পরাবাস্তব জগত। সে জগতে কখনও মান্টোর চরিত্রেরা তার সাথে গল্প জুড়ে দিতো, কখনও গালিব মিশে গিয়েছেন তার অতীতে ইতিহাসে, অদেখায়।
৪.
মান্টো এবং গালিব, সাহিত্যের ইতিহাসের অন্যতম দুই ছন্নছাড়া পাগলাটে মানুষ। অথচ উভয়ের দেখার চোখ ছিল দারুন, প্রকাশের ভাষা ছিল অনবদ্য। একজন দেখেছিলেন মোগল আমলের পতন, ভারতের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা। আরেকজন দেখেছিলেন ব্রিটিশদের বিদায়ের কাল, ভারতের আপাত জেগে ওঠার কাল। গালিব দেখেছিলেন সিপাহী বিদ্রোহ, মান্টো দেখেছিলেন দেশভাগ-দাঙ্গা। রক্ত চিনতেন দুজনেই। কবি গালিবের মনের গহনে ছিল পূর্বপুরুষের জাঁহাবাজ দুর্দান্ত রক্তের ছলকানি, মান্টোর ভেতরে ছিল কাশ্মিরি হাওয়া, স্বাধীনতার পিপাসা।
এরকম দু’জন মানুষকে নিয়ে গল্প লেখা হয়, তখন নিশ্চিত ভাবে সেখানে উঠে আসে সেই দু’জন মানুষের কাল। তাদের সমসাময়িক সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থা। ইতিহাসের একটা দলিল। যদিও উপন্যাসে ইতিহাস লেখার প্রয়োজনীয়তা কিংবা সুযোগ, কোনটাই নেই। তা কাম্যও নয়। তবে মোটা দাগে, সেই সময়ের একটা রেখাচিত্র ঠিকই ফুটে ওঠে।
এই উপন্যাসও তার ব্যতিক্রম নয়। গালিব আর মান্টোর জীবন ফুটে উঠেছে উপন্যাসে। সেই সঙ্গে তাদের যাপিত জীবনের সমসাময়িক ভারতের কথা। এই উপন্যাস পড়ে আমরা জানতে পারবো গালিব আর মান্টোর জীবন, তাদের মনোভাব। তাদের সংগ্রাম, তাদের স্বপ্নের কথা।
৫.
কিন্তু ‘দোযখনামা’ ঠিক কতোটা উপন্যাস, আর কতোটা রবিশঙ্করের নিজস্ব সৃষ্টি, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আবশ্যক।
লেখক শুরু থেকে শেষ অবদি গালিব আর মান্টোর জবানীতে তাদের জীবন কাহিনী বলে গেছেন। যেহেতু মান্টো, গালিবের পরবর্তী সময়ের মানুষ, তাই কখনও কখনও আমরা মান্টোর জবানীতে গালিবের জীবনের কাহিনী শুনি। সেই সঙ্গে গালিব বলে যান তাঁর সময়ের কথা। মোগলদের পতনের কথা, সম্রাট বাহাদুর শাহ-র কথা। স্ত্রীর সাথে গালিবের সম্পর্কের কথা। তাঁর মনের গভীরে চলে দ্বন্দ্ব আর তাঁর লেখার কথা। সিপাহী বিদ্রোহের কথা আসে, আসে ব্রিটিশ রাজের কথা।
তেমনি মান্টো বলে চলেন তাঁর নিজের কথা। বোম্বে এসে তাঁর কাটানো সময়ের কথা। তাঁর সংগ্রাম, সাহিত্য আর পথের অভিজ্ঞতার কথা। তাঁর বন্ধুদের কথা, ছন্নছাড়া জীবনের কথা। সেই সঙ্গে আসে ভারত ভাগ, দাঙ্গার কথা। পথের মানুষদের কথা। যাদের মান্টো দেখেছেন খুব কাছ থেকে।
কখনও গালিব বলেন, কখনও মান্টো। তাদের নিজেদের কথার মাঝে ইতিহাস, পুরাণ ঘুরে ফিরে আসে। কিন্তু, তাঁরা কেবল বলেই যান।
এই বলে যাওয়াটাই সমস্যা। আমি বলছি না যে উপন্যাসের কোন নির্দিষ্ট ‘ধারা’ থাকতে হবে, যা অনুসরণ করে লেখক লিখবেন। কিন্তু ‘দোযখনামা’-য় রবিশঙ্কর কেবল দুটি চরিত্রকে দিয়ে কথা বলিয়েছেন। তাঁরা বলে গেছেন একঘেয়ে সুরে। যদিও দু’জনের জীবন নানা অভিজ্ঞতায় ভরপুর হওয়ার কারনে সে বয়ান ‘একঘেয়ে’ লাগে না।
কিন্তু রবিশঙ্কর নিজে এখানে কি দিলেন? গালিব, মান্টো ছাড়া গালিবের চাকর কাল্লু-কে এই উপন্যাসের একটা চরিত্র বলা যায়। বাকি সব চরিত্র সাময়িক। তাদের কেউ এই গল্পে থাকে না। কোন চরিত্রকে রূপদান করার প্রয়োজন রবিশঙ্করের হয়নি। এমনকি গালিব, বা মান্টোকেও তাঁর আঁকতে হয়নি। অবশ্য, একারনেই হয়ত শুরুতেই বলে গিয়েছেন যে এ গল্প, ছায়া-মানুষদের জগতের গল্প।
তবু যে গল্প বলা হয়েছে সেখানেই লেখকের নিজের সৃষ্টি তেমন কিছু নেই। মান্টোর একটার পর একটা গল্প সুযোগ মতো গেঁথে দিয়েছেন নিজের লেখায়, মান্টোর যবানীতেই। অর্থাৎ, মান্টোর কাহিনী তিনি বলেছেন মান্টোর গল্পের আশ্রয় নিয়ে। গালিবের কাহিনী যখন আসে, গুলজারের লেখা গালিবের জীবনীর ছাপ সেখানে দেখা যায়। ছাপ আছে ‘দস্তাম্বু’-র। সেটা থাকবে, কেননা দস্তামু তো গালিবের জীবনের একটা অংশই।
৬.
গালিব এবং মান্টো, দু’জনেই খুব জটিল বাস্তব চরিত্র। তাদের সম্পর্কে যারা তেমন কিছু জানেন না, তাদের এ বই পড়তে খুবই ভালো লাগবে। কেননা তাঁরা ‘মানুষ’ মান্টো এবং গালিবকে চেনেন না। তাই ‘দোযখনামা’-র চরিত্র হিসেবে তাদের দেখতে সুবিধা হবে। অসুবিধা হয়ত কিছুটা তাদের হবে, যারা আগেই গালিব এবং মান্টোকে গুলে খেয়েছেন (আমার মতো)।
পাকিস্তানের সাথে আমাদের একটা পুরনো ‘শত্রুতা’ থাকার কারনে উর্দুর সাথেও সে শত্রুতা হয়ে গেছে। তাই উর্দু সাহিত্যের খনি সম্পর্কে আমাদের ধারনা প্রায় শুন্যের কোঠায়। এমনকি যারা কিছুটা হলেও সাহিত্য চর্চা করে, তাদেরও। ‘দোযখনামা’ আমাদের সবাইকে উর্দু সাহিত্যের সাথে কিছুটা পরিচয় করিয়ে দেবে। আগেই বলেছি, উপন্যাসে ইতিহাস লেখা কোন স্বাভাবিক বিষয় না। তাই বইয়ের বিজ্ঞাপনে যতোই বলা হোক যে 'দোযখনামা' '৪৭ এর দেশভাগ, সিপাহী বিদ্রোহের কথা বলে, তা কিছুতেই ঠিক না। এ বইয়ে দেশভাগ ফোটেনি, কিছুটা ফুটেছে হয়তো সিপাহী বিদ্রোহ।
‘দোযখনামা’-র সবচেয়ে সুন্দর অংশ এবং আমার মতে এই উপন্যাসে রবিশঙ্করের একমাত্র কীর্তি, উপন্যাসের ভাষা। সরাসরি উর্দু কিংবা উর্দু-আশ্রিত শব্দ, বাক্যাংশের সঠিক প্রয়োগ এ উপন্যাসের প্রাণ বলা চলে। প্রতি অধ্যায়ের শুরু মীর, কিংবা গালিবের ‘শের’ দিয়ে।
৭.
গালিব এবং মান্টোকে জড়িয়েই হয়ত কেবল লিখতে চেয়েছিলেন রবিশঙ্কর। লিখেছেনও তাই। ভাষা আর গল্পের ভেতর অনেক বারই আচ্ছন্ন হয়ে যেতে হয়, কিন্তু পড়ার মাঝে মাঝে, এবং পড়া শেষে বারবার মনে হয়, রবিশঙ্কর নিজে কি লিখলেন? এ তো মান্টোর অনেকগুলো গল্পের অনুবাদের ফাঁকে ফাঁকে গালিবের জীবনকে বসিয়ে দিয়েছেন কেবল। সেই সাজানোটা অবশ্য প্রায় নিখুঁত। তাই, স্বাদ লেগে থাকে অনেকক্ষণ।