শিক্ষা তাঁকে বিচিত্র করেছে। কিন্তু আলোকিত করতে পারেনি। যেহেতু পরকালই মানুষের জীবনের অনন্ত জীবন, সেহেতু এই স্বল্পকালীন জীবনের ভুল-ভ্রান্তির জন্য অন্ধকার কবরে গিয়ে ফেরেশতাদের দেয়া কঠিন যন্ত্রণা যাতে ভোগ করতে না হয়, এই বিষয়ে ছিল তাঁর সচেতন দৃষ্টি। ত্যাগ আর তিতীক্ষাকে তিনি করেছিলেন জীবনের প্রধান ধর্ম। এই বিষয়ে সুরে গান রচনা করতেন তিনি-“এই দুনিয়া ঘোরের বাজার, সুন্দরী পাপ হাজার হাজার, সেই ভুলে পা দিও না গো বেহেশতরেই পাখি, মোহের খেলা বন্ধ হবে, বন্ধ হলে আঁখি। সৃষ্টিকর্তার পরই যেহেতু ইহ দুনিয়ায় স্বামীর স্থান, স্বামীকে তিনি গুরুত্ব দিতেন পয়গম্বরেরও অধিক হিসেবে।
Nasreen Jahan (Bangla: নাসরীন জাহান), (1966) is a modern Bangladeshi author and literary editor. She became famous with the publication of her award-winning novel উড়ুক্কু in 1993 which was later translated as The Woman Who Flew.
She has distinguished herself with her poetic prose and psychological approach to human behavior. She is capable of handling intricate human mind with dexterity. She is prone to focus on man-woman relationship in the backdrop of social fabric and examine its intricacies. Nasreen Jahan has candidly treated sex as a theme and went ahead of time by reflecting on homosexuality her short stories and novels. Her writing separately exhibits realism, surrealism, also magic realism. Her works are never erotic in nature.
বৈদেহী শব্দের অর্থ কি? বাংলা ভাষার 'বৈদেহী' শব্দটা সীতা অর্থ প্রকাশ করে। সেই সীতা যাকে অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে দিতে হয় নিজের সতীত্বের প্রমাণ।
নারীর সতীত্বকে নিয়ে লেখা একটা অসাধারন উপন্যাস হচ্ছে নাসরীন জাহানের 'বৈদেহী' । 'বৈদেহী' উপন্যাসে ভেসে আসে নিরালা নামের এক ধর্মভীরু চরিত্রের জীবনচক্র। নিরালাকে ঘিরে আসে আরো কিছু চরিত্র , যা মূলত এই সমাজেরই এক চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
হিরণপুর গ্রামের এক নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের মেয়ে নিরালা। নিরালার বাবা চাকরি করত শহরে ,সেই সূত্রে শহরের প্রতি অদম্য টান রয়েছে নিরালার। শহরের প্রতি টান থাকলেও গ্রামের সহজ সরল সবুজ পরিবেশে বড় হয় নিরালা। উপন্যাসটির একটা বড় চরিত্র হচ্ছে চাঁদমন বিবি। আরবি ফারসি জানা মেয়ে নিরালার দাদিআম্মা চাঁদমন বিবি। দাদিআম্মার জীবন দর্শন বলতে একটা কথাই ছিল সতীত্বই নারীর জীবনের সেরা অর্জন। সেই শিক্ষাই দিয়েছেন তিনি নিজের নাতনিকে। 'স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর জান্নাত' আর দাদীআম্মার সতীত্বের কঠিন শিক্ষায় ,স্নেহে মমতায় বড় হয় নিরালা। নিরালা ধর্মের কুসংস্কারের অন্ধকারে তলিয়ে যায়, দাদীআম্মার শেখানো সব বুলি মনের অন্তরে গেঁথে নেয় সে। মনে প্রাণে স্বপ্ন দেখে দাদীআম্মার মতো সতী হওয়ার। তার দাদীআম্মার একটাই গর্ব " সতী আমি, সতী আমার কঠিন বিষের পরাণ। " নিরালাও তাঁর দাদীআম্মার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সতীর আদলে সীতা হতে চেয়েছিল। কিন্তু পেরেছিল কি ?
নিরালার জীবনে যখন আগমন ঘটে হাসানের, তারপর থেকেই সে চাঁদমন বিবির আদর্শ থেকে সরে আসতে শুরু করে। সে খসে পড়ে শহরের কঠিন রুঢ় বাস্তবতার মধ্যে। নিরালা হয়ে ওঠে নীরা। বাস্তবতার নিষ্ঠুর আঘাত নীরাকে ফেলে দেয় এক নতুন পৃথিবীতে, যেখানে সবাই চায় তার দেহের কাঁচা মাংস। স্বামীর এমন দুর্দশায় কোনো কূল কিনারা খুঁজে পায় নি নীরা। এমনসময় আবুল হক এসে দাঁড়ায় নীরার পাশে। অত্যন্ত স্নেহমমতার সাথে নিরালাকে নীরা বানিয়ে তার জীবনটা বিষিয়ে দেন আবুল হক । নীরা এটাকেই নিজের সৌভাগ্য মনে করে । দাদীআম্মার শিক্ষায় শিক্ষিত নীরা এটাকে মনে করে অগ্নিপরীক্ষা। অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে হয়ে উঠতে চায় সতী, হতে চায় সীতা । অত্যন্ত সম্ভ্রমের সাথে বেশ্যাবৃত্তিকেই বেছে নেয় জীবনের অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে। স্বামীকে বাঁচাতে হবে, হাসানকে কে সুস্থ করতে হবে কিন্তু টাকা কৈ? এমনসময় বেশ্যাবৃত্তি ছাড়া আর কোনো পথ সে খুঁজে পায় না। নিরালা থেকে রুপান্তরিত নীরা তখন নানান জনের বিছানায় যায় । ছাত্র যুবা, রাজনীতিবিদ, লেখক শিল্পী সবাই খুঁটে খায় তাকে, তাকে উপর্যপুরি ভেঙে,পিষে, নিংড়ে হাড় মাংস এক করে দেয়। নীরা বেশ সম্ভ্রমের সাথে বেশ্যাবৃত্তি করে বলে তার চাহিদা বেশি, মানুষ তাকে একবার বিছানায় চায় , দুবার চায় , বারবার চায় , গালে চুমু খায়, মুখে খায় না । বলে , "বেশ্যার ঠোঁটে কেউ চুমু খায় না। " এরকম তীব্র, তিক্ত অভিজ্ঞতা আর অপমান সহ্য করে অগ্নিপরীক্ষা দেয় নীরা । চরম ধর্মভীরু আর ইসলামিক মনোভাবাপন্ন নীরা কিভাবে এই চরম কঠিন কাজটা করে সেটা ভেবে পায় না হাসান। নীরার বিবাহিত স্বামী হাসান। সে নীরাকে শিখিয়েছে, "ধর্ম মানুষের তৈরি। তুমি যা শিখেছো সব পুরুষদের স্বার্থ রচিত।" আত্মার বিশুদ্ধতাই মূল। তোমার প্রাণের জন্য তুমি লড়ছো। আমার প্রাণের জন্য আমি তোমার উপর ভরসা করে আছি। এই মর্মকথা নীরা সম্পূর্ণভাবে ধারণ না করলেও নিজের সাথে অনেকটা মিলিয়ে নিয়েছিল ।নইলে মেয়েদের জন্য এমন চরম বিপজ্জনক জায়গায় সে যেতে পারতো না। হাসান অনেকটা মুক্তমনা । ছোটথেকে দুরন্ত হলেও চাচার কাছে মানুষ হয়ে সে বদলে যায়, অনেক শান্ত হতে শুরু করে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন চাচা তার মধ্যে মৃত্যু ভয় ঢুকিয়ে দিয়ে কৈশোর আর যৌবন নষ্ট করে দেয়। সারাক্ষণ মৃত্যুভয় গ্রাস করে থাকে হাসানকে। যদিও পরে সে নিজের দর্শন আর বিশ্বাস এর কিছু পরিবর্তন ঘটায় । কিন্তু একটা দুর্ঘটনায় তাঁর জীবনের অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়। একজন শিক্ষক হয়ে ছাত্রদের কাছে এমন মার খেয়েছিল সেদিন যে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ছাড়া বাঁচা সম্ভব না। চিকিৎসায় হাসানের সব শেষ হয়ে গেলে নিরালা হয়ে ওঠে নীরা। নিজের স্বামীকে সুস্থ করতে সে সব কিছু করতে রাজি। নীরা যখন অন্ধকারে তখন তার জীবনে আলো নিয়ে আসে সালাহউদ্দিন। সেই আলোয় সে দেখে অন্ধকারে পতিত তার পঙ্কিলতা, তার যৌবন, তার চারপাশ , আবুল হকের প্রকৃত রূপ। নীরা সেই অন্ধকার থেকে উঠে আসে। অন্যদের মতো সে ভেসে যায়নি কিন্তু ভেসে যায় তার দাম্পত্য। নীরা না পারে সতী হতে, না স্বামীকে সে পায়, না পারে সে দাদীআম্মার আদর্শ অনুসরণ করতে। শেষপর্যন্ত একরাশ না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়ে নিজ স্বামীর সাথে বসবাস করে সে, কিন্তু যে প্রাণের জন্য, যে স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য তাঁর এই জীবনপরীক্ষা সেই জীবনটাই আর ফিরে পায় না সে।
এই ছিল বৈদেহী উপন্যাসের পাঠ সংক্ষেপ। ব্যাক্তিগতভাবে আমার উপন্যাসটা অনেক ভালো লেগেছে। একরকম ঘোরের মধ্যে ছিলাম পড়ার সময়, চোখের সামনে যেন নীরার জীবনটা ভাসছিল।
এবার কিছু কথা :
উপন্যাসটায় যে শুধু নিরালা আর হাসানের জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে তা নয়। উঠে এসেছে গ্রাম্য মানুষের ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার। হাসানের বড় চাচার চরিত্রে প্রকাশ পেয়েছে এমন সব বিশ্বাস যা ধর্মানুসারেও সঠিক নয়। বড় চাচা চরিত্রে প্রকাশ পেয়েছে মৃত্যুভয়ে সেঁধিয়ে থাকা মানুষের বিশ্বাস আর ধ্যানধারণা। আরেকটা ছোট চরিত্র ছিল নিরালার গ্রামের ইমাম সাহেব। এই চরিত্রে ধর্মান্ধদের একটা ঘৃণ্য দিক ও প্রকাশ পেয়েছে। একদিন নিরালা চুপিচুপি তার দাদিআম্মার ঘরে আড়ি পেতে দাদিআম্মা আর ইমামের কথা শুনে ফেলে। "গ্রামের এক দিনমজুরের মেয়ে তার স্বামীকে নিয়ে সিনেমা হলে গিয়েছিলো সিনেমা দেখতে। ততোদিনে সিনেমা হল পাহারার বিষয়ে মাদ্রাসার ছাত্রদের আলস্য এসে গেছিল। ছিন্ন বিচ্ছিন্ন পুরুষেরা মাঝেমধ্যেই সিনেমা দেখতে যাওয়া শুরু করেছিল। কিন্তু কোন মেয়ের হলে যাওয়া সেই প্রথম। কি করে যেন চতুর্দিকে খবর হয়ে গেলো। রাতে মাদ্রাসার ছেলেরা ওঁৎ পেতে থাকে সিনেমা হলের সামনে।এরপর মেয়েটি স্বামীর সাথে সিনেমা হল থেকে বেরোনোর কিছু পরে যখন গোরস্থানের পাশ ধরে হাঁটছে, তখন সব ছেলেরা নেকড়ের মতোন ঝাঁপিয়ে পরে ওদের ওপর। ছেলেটিকে গাছের সাথে বেঁধে রেখে ওরা মেয়েটিকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করে।"
উঠে এসেছে মেয়ে দেখার নোংরা প্রথাও। বরপক্ষ মেয়ে দেখতে আসে, ভয়ে মেয়ে সেঁধিয়ে থাকে। নিরালা চরিত্রের মাধ্যমে এই বিষয়টির একটা প্রতিফলন ও রয়েছে উপন্যাসটায়।
উপন্যাসটার কিছু অংশ লেখা নিরালার অবস্থান থেকে, কিছু অংশ আবার হাসানের পক্ষ থেকে। এই বিষয়টা বাদে উপন্যাসটার সবকিছুই আমার মন কেড়েছে।
বই : বৈদেহী লেখক : নাসরীন জাহান প্রকাশনী : মাওলা ব্রাদার্স পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১০৮ মুদ্রিত মূল্য : ৭০ টাকা
নাসরীন জাহান-এর বৈদেহী পড়লাম। একটি চমৎকার বিষয় নিয়ে বইটি লেখা হয়েছে। মূল আখ্যায়িকায় বলা, সংবেদনশীলতা আর আমাদের শৈশবের শিক্ষা আমাদের পরবর্তী জীবন আর মানসিকতার ওপর কী প্রভাব ফেলে। কিন্তু লেখিকার লেখার মুন্সিয়ানার অভাবের কাছে মার খেয়ে গেছে অনেকটাই লেখাটি। উপন্যাসটি আরো ভাল হতেই পারতো। বানান ভুলগুলোও দেখা দরকার ছিলো।
আমাদের ঘরে ঘরে এমন নিরালা আছে। যারা জানেই না তারা নিজেরা জীবনে কী চায়। তাদের জীবনের ঘড়ি আবর্তিত হয় স্বামীর ���চ্ছের সাথে। স্বামী কী খেতে ভালবাসে কী বাসে না ভাবতে ভাবতে নিজের কিছু চাহিদা ছিলো কিনা তাই ভাবতে ভুলে যায়। শৈশবের শিক্ষার কারণেই জুজু তাদের তাড়িয়ে বেড়ায় জীবনভর। ধর্মের জুজু, স্বামীর জুজু, পরকালের জুজু আর এই লোকভয় প্রোথিত করে গুরুজনেরা। ধর্ম হলো কাউকে শাসনে রাখার বড় হাতিয়ার। একবারও কোন মেয়ে প্রশ্ন করতে সাহস পায় না, ধর্ম শুধু মেয়েদের প্রতি এতো কঠিন কেন? মেয়ে হয়ে জন্মানো কেন তবে? ধর্ম কী তাহলে ইচ্ছে করে সমস্যা তৈরী করতে ভালবাসে? মেয়েদের না তৈরী করলে কী হতো না? কিংবা শুধু নারী দেহ তৈরী করতে পারতো, ব্রেইন না দিলেও সমস্যা ছিলো না। কিংবা গৃহস্থালী কাজ করার জন্যে যতটুকু মগজের দরকার তার বেশী না দিলেই হতো। সর্বশক্তিমান কী এইটুকু শক্তি বা ক্ষমতা নিয়ন্ত্রন করতে পারতেন না?
আশা করছি, এই বিষয়টার ওপরে ভবিষ্যতে আরো অনেকেই কাজ করবেন। মেয়েরাই বোধ হয় সবচেয়ে ভাল কাজ উপহার দিতে পারবেন কারণ ভুক্তভোগী ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাদেরই বেশি এই স্থানটিতে। জীবনের যাতনার বিষে নীল হতে হতে, নিজেকে নারী দূরে থাক এমনকি মানুষ হিসেবেও অগ্রাহ্য করতে করতে ভার্জিনিয়া উলফের সেই দীর্ঘশ্বাস মনে পড়ে, নিজের একটা ঘর! উপন্যাস থেকে তুলে ধরি নিরালার কিছু তেতো নোনা অভিজ্ঞতা:
দাদীআম্মার জীবনে প্রাণের চেয়েও মূল্যবান শব্দ সতীত্ব। এই বিষয়ে তাঁর আবেগ এমনই প্রবল, তিনি হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে মূল্যবান এবং পবিত্র বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেন একসময়ের সহমরণকে। সীতা দাদীআম্মার জীবনের প্রধান এক আদর্শ। তিনি চোখমুখে আলো জ্বেলে গল্প করতেন, কি করে রাবণ রাক্ষসের মতো লম্পটের কাছে গিয়ে সেই বৈদেহী নিজেকে সতী রেখেছিল-বলতেন, তুই হবি তা-ই। কেউ তোকে যদি এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করে, ধরণীকে নির্দ্বিধায় বলবি, দু ফাঁক হতে। আগুনকে বলবি, তোকে আশ্রয় দিতে।
নিরালার মনে তার দাদীকে নিয়ে প্রশ্ন জাগে কিন্তু তা প্রশ্রয় পায় না নানামুখি চাপে ও তাপে: শিক্ষা তাঁকে বিচিত্র করেছে। কিন্তু আলোকিত করতে পারে নি। যেহেতু পরকালই মানুষের জীবনের অনন্ত জীবন, সেহেতু এই স্বল্পকালীন জীবনের ভুল-ভ্রান্তির জন্য অন্ধকার কবরে গিয়ে ফেরেশতাদের দেয়া কঠিন যন্ত্রণা যাতে ভোগ করতে না হয়, এই বিষয়ে ছিল তাঁর সচেতন দৃষ্টি। ত্যাগ আর তিতিক্ষাই তিনি করেছিলেন জীবনের প্রধান ধর্ম। এই বিষয়ে সুরে গান রচনা করতেন তিনি-“এই দুনিয়া ঘোরের বাজার, সুন্দরী পাপ হাজার হাজার, সেই ভুলে পা দিও না গো বেহেশতরেই পাখি, মোহের খেলা বন্ধ হবে, বন্ধ হলে আঁখি।” সৃষ্টিকর্তার পরই যেহেতু ইহদুনিয়ায় স্বামীর স্থান, স্বামীকে তিনি গুরুত্ব দিতেন পয়গম্বরেরও অধিক হিসেবে।
নিরালার স্বামী হাসানের হতাশ অভিজ্ঞতা:
নীরার সাথে এই একটি জায়গাতেই আমার প্রবল মিল, আমরা দুজনেই খুব কুণ্ঠিত, নির্জন, চাপা স্বভাবের। এক ঘন্টা এক সঙ্গে আছি, হয়ত দেখা যাচ্ছে দুজনের মধ্যে কোনো কথাই হচ্ছে না, কিন্তু উভয়েই এতে প্রাণের উত্তাপের কোন ঘাটতি অনুভব করছি না। তবে ওকে কেন্দ্র করে আমার একটাই শূন্য দিক, ও আমাকে বড় জ্ঞান করে, শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে, এক সমান্তরালে দাঁড়ানো বন্ধু মনে করতে পারে না। ও দুঃখে, প্রেমে, ক্রুদ্ধতায় সবকিছুতেই আমার কাছে নত। ওর এই স্বভাব যতটা না অনুভব থেকে উঠে আসে তার চেয়েও বেশি আসে তার আজন্ম শিক্ষা থেকে। এই বিষয়ে ও এমনভাবে নির্মিত, আমি এই একটি বিষয়কেই চেঁছে কোনো নতুন রূপ দিতে পারি নি।
মুসলিম পরিবারে জন্মেছি তাও বাংলাদেশে। নেহাত নিরালা হতে হতে হয়ে ওঠা হয়নি কারণটা হয়তো শহরে জন্মানো আর বড় হওয়ার কারণে। যৌথ পরিবারে বাবা কাকারা জীবিকার তাগিদে বাইরে বাইরে থাকতেন সারাদিন। মা, চাচীরা, দাদীর কাছ থেকে এই শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। মেয়েদের কী করতে আছে আর কী করতে নেই। জোরে হাঁটতে, লাফাতে নেই মাটি ব্যথা পাবে, ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করাটা ঠিক না সমান সমান কারণ ভাই ছেলে তার অধিকার বেশি, সেইতো বাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা আমি বা আমরাতো অস্থায়ী। মেয়েদের জোরে কথা বলা নিষেধ, যখন তখন ঘরের বাইরে যাওয়া নিষেধ। দাদু বলতেন, এমন করে চলতে হবে যাতে অন্য পুরুষ টের না পায়, পৃথিবীতে যে একজন অন্য নারী আছে, এটা অবশ্য দাদুর নিজের কথা নয়, হাদীসের কথা।
'বৈদেহী' সমাজের ডার্ক সাইটের ইতিহাস। এক অবলা নারীর আত্মকথন। পুরো উপন্যাস ধীরস্বভাব এক নদীর মত বয়ে যায়। তবে, বিরক্ত করে দেয় মাঝে, একই কাহিনীর যেন পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। নারী একটা শিল্প যেমন তাদের কষ্টও সীমা নেই তেমনি।
তবে, লেখক কিছু জিনিস যেন সমাজের সকল মানুষের অতৃপ্ত ক্ষুধার বাসনা রূপে প্রকাশ করার অভিলাস করে। নারীদের ভালবাসার শক্তি আর দাসত্ব দুটো জিনিস তিনি ফুঁটে তুলতে সফল। তবে, কারো সতীত্ব নিয়ে লেখকের ব্যক্তব আমার মনে হয় তিনি বুঝাতে অক্ষম। একটা চরিত্রকে একই জায়গায় বারবার আবির্ভাব করেছেন। তিনি , পুরো বিষয়টা কল্পনার আঙ্গিকে পরিবেশন করেছেন হয়ত। বাস্তবে যদি হতো, তাহলে তিনি ক্ল্যারিফিকেশন গুলো আরও গুছালো ভাবে উপস্থাপন করতেন!
কাহিনী গড়ে উঠেছে, নিরা, হাসান আর সালাদীন কে নিয়ে। মাঝে আবুল হাসান যেন সুযোগ সন্ধানী এক শকুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। নীরা তার দাদীর কাছে জেনে, স্বামী সব কিছু! স্বামী যদি মারতে মারতে মেরে ফেলে তাহলেও চুপ থাকতে। নীরার যখন বিয়ে হয়, তারপর তার জীবনে আংশিক সুখের পর নেমে আসে ঘোর অমবস্যা। তার স্বামী হাসান পঙ্গু হয়ে যায় ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে। তাকে বাঁচাতে নিজের সতীত্ব বিক্রি করে দেয় নীরা। তার জীবনের উত্থান পতনে আবার ভালবাসা এনে দেয় সালাদীন।
সালাদীনের উদাসীন চরিত্র তার মাঝে আলোড়ন করে। কিন্তু যার জন্য সব কিছু বিলিয়ে দেয় নীরা, সে স্বামীর কাছে অপরিচিত হয়ে উঠে। তার ঠোঁটে চুম্বন করতে তার স্বামীর বাঁধে। যার জন্য জীবনের মূল্যবান সম্পদ সে অনায়াসে ত্যাগ করে তার কাছে সে আজ বিদঘুটে গলি ঘুপচি।