একটি চিঠি আবার খুলে দেয় সেই পুরোনো কেস। বদ্ধঘরের রহস্য, ভুলে যাওয়া স্মৃতি, আর মানুষের অপরাধবোধ। তদন্ত যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হয়— শুধু খুনের গল্প নয়, এটা ‘হামারটিয়া’র আখ্যানও হতে পারে।
দুই যুগ আগে ঘটে যাওয়া এক হত্যাকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্ত অনিরুদ্ধ সান্যাল শেষ বয়সে এসে আত্মহত্যা করে। তার আগে নিজের শেষ বার্তা চিঠিতে লিখে পাঠায় অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার জাভেদ আহমেদকে, যিনি পঁচিশ বছর আগে মালিনী অধিকারীর হত্যাকাণ্ডের তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন। বিবাহিত অনিরুদ্ধ ছিল মালিনীর পরকীয়া প্রেমিক। ওই ঘটনার আগে তারা মালিনীর খালি বাসভবনে রাত কাটিয়েছিল। শারীরিক পরিশ্রম, অতিরিক্ত মাদকদ্রব্য সেবন আর ঘুমের ওষুধ খেয়ে সারাদিন প্রায় অচেতন অবস্থায় ঘুমিয়ে ছিল তারা। পরবর্তীতে কাজের মাসি সেই বাড়িতে এসে মালিনীর বন্ধ ঘরে অস্বাভাবিকতা টের পেলে আবিষ্কৃত হয় মালিনীর লাশ। গলায় ছুরি মেরে হত্যা করা হয়েছিল তাকে। পাশেই ঘুমিয়ে ছিল অনিরুদ্ধ। স্বভাবতই সে ছিল প্রধান সন্দেহভাজন।
এমনকি পুরোটা সময় ঘুমিয়ে থাকা অনিরুদ্ধও ওই সময়ে আধো-অচেতন অবস্থায় তার করা বেশ কিছু কাজের অস্পষ্ট অনুভূতির ব্যাপারে ছিল দ্বিধাগ্রস্ত। তার এমন সন্দেহজনক আচরণ আর তার পক্ষের উকিলের দুর্বল ডিফেন্সের কারণে সে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়। পরবর্তীতে জেল খেটে বেরিয়ে একাকী জীবন কাটায় সে কিছু বছর, পরে তার ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়লে আত্মহত্যা করে। মৃত্যুর আগে জাভেদ আহমেদের কাছে লেখা চিঠিতে সে তার আক্ষেপ জানিয়ে যায়। তবে এবার জোর দিয়ে জানায় যে অপরাধটা সে করেনি, যার দায়ে এত বছর তাকে শাস্তি পেতে হয়েছে; আর অনুরোধ জানায় কেসটার পুনঃপর্যালোচনা করার জন্য।
চিঠিটা পড়ে জাভেদ এই বহু বছর পুরনো কেসটা আনঅফিশিয়ালি পুনঃতদন্ত করে দেখার সিদ্ধান্ত নেয়। এ ব্যাপারে সে সাহায্য চায় এককালে তার সহযোগী, মেধাবী পুলিশ অফিসার ইম্যানুয়েল গুহর কাছে। ইম্যানুয়েল সময়ের অনেক আগেই পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল। তবে জাভেদের এই অনুরোধে রাজি হয় সে। আগে পাওয়া তথ্য আর সে অনুযায়ী ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত অন্যান্য মানুষদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকলে বিষয়টা আরও জটিল ও রহস্যময় হতে থাকে।
কিছু ক্ষেত্রে অনিরুদ্ধের নির্দোষ থাকার সম্ভাবনা দেখা দেয়, কিন্তু সে খুন না করলে দরজা-জানালা বন্ধ সেই ঘরে অন্য কেউ কীভাবে ঢুকে মালিনীকে খুন করেছে? আর অনিরুদ্ধ যদি নির্দোষই হয়ে থাকে, তবে এত বছর পর কেসটা সলভ করে তাকে কি আসলেই ন্যায় দেওয়া সম্ভব? স্মৃতি, শোক, পুরনো বদ্ধঘরের হত্যারহস্য নিয়ে ‘শেষ মৃত পাখি’-খ্যাত লেখক শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের ‘হামারটিয়া’য় রহস্য ও সত্যান্বেষণের পাশাপাশি ফুটে উঠেছে অপরাধ, ন্যায় ও শাস্তির দার্শনিক উপস্থিতিও।
প্রশংসিত লেখক শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তার রহস্যোপন্যাস ‘শেষ মৃত পাখি’র জন্য। শক্তিশালী গল্প, বাংলায় প্রচলিত ডিটেকটিভ গল্পগুলোর তুলনায় নতুনভাবে উপস্থাপিত রহস্য ও টুইস্ট, রহস্যকাহিনীর সঙ্গে সত্তরের দশকের রাজনৈতিক পটভূমি ও সেই সময়কার সাহিত্যের একটি দিককে মেশানো নিরীক্ষাধর্মী উপাদানের কারণে বইটি হয়েছিল পাঠকদের অনেক পছন্দের। গত বছর প্রকাশিত ‘শেষ মৃত পাখি’র প্রতীক্ষিত সিক্যুয়েল ‘নৈশ অপেরা’ অবশ্য সেভাবে আশানুরূপ সাড়া ফেলতে পারেনি। অতিরিক্ত এক্সপেরিমেন্টের কারণে রহস্যকাহিনী হিসেবেও তেমন প্রশংসা পায়নি বইটি।
তাই পরবর্তী ডিটেকটিভ বই ‘হামারটিয়া’তে এসে এবার বেশি নিরীক্ষা কিংবা অপ্রয়োজনীয় গভীরতার দিকে না গিয়ে ছোট পরিসরের বেশ সহজ একটা গল্প নিয়ে হাজির হয়েছেন শাক্যজিৎ। এই গল্পের কাহিনি, ঘটনাক্রম, সবই বেশ সাধারণ ধরনের। সেখান থেকেই লেখক রহস্য ও গল্পের পাত্র-পাত্রীদের সুন্দর করে গড়ে তুলেছেন। সংলাপনির্ভর ন্যারেটিভের মাধ্যমে একটু একটু করে রহস্যটাকে জোরদার করা, পরিমিত ক্লু দেওয়া, আর সবশেষে সেটার সমাধান খারাপ লাগেনি সব মিলিয়ে। রহস্যের সমাধান কিছুটা অনুমেয় হলেও ‘শেষ মৃত পাখি’র মতো অযৌক্তিক নয়।
লেখনি বরাবরের মতোই সাবলীল। এমন প্রাঞ্জল ভাষার সঙ্গে পুরো গল্পটার অনবদ্য উপস্থাপনার কারণে ‘হামারটিয়া’ হয়ে উঠেছে বেশ উপভোগ্য। এবারের গল্পে লেখক অপ্রয়োজনীয় উপাদান অতিরিক্ত যুক্ত করে গভীর দেখানোর চেষ্টা করেননি। বরং চেষ্টা করেছেন আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ একটি হত্যারহস্য হলেও, ভিক্টিম, খুনি ও তাদের আশেপাশের মানুষের জীবনে এর মানবিক প্রভাবটা ফুটিয়ে তুলতে। এর মধ্য দিয়েই লেখক দেখিয়েছেন ন্যায়-অন্যায়, অপরাধ ও শাস্তির ধূসর দর্শনটাও। সবচেয়ে বড় কথা, এসব দার্শনিক আলাপ শেষ পর্যন্ত মূল অপরাধের আখ্যান কিংবা এর সঙ্গে জড়িত ও প্রভাবিত চরিত্রগুলোর গল্প থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি।
ছোট পরিসরের গল্প হলেও এতে বেশ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আছে। সত্যি বলতে, ‘শেষ মৃত পাখি’-তে চরিত্রগুলোর গঠন নানা কারণেই সেরকম ভালো লাগেনি। তবে এই বইয়ের ক্ষেত্রে তেমনটা মনে হয়নি আমার। চরিত্রগুলোর গুরুত্ব অনুযায়ী বেশ সুন্দরভাবে তাদের গড়ে তুলে, রহস্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে গল্পটাকে শক্তিশালী করেছেন লেখক। একইসাথে ফুটিয়ে তুলেছেন তাদের মানসিকতাও। বিশেষ করে ভিক্টিম মালিনীকে সরাসরি না দেখালেও তার চরিত্রের লেয়ার্ড দিকটা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রোটাগনিস্ট ইম্যানুয়েল গুহকেও ভালো লেগেছে। বিশেষ করে তার শক্তিশালী দার্শনিক বোধ আর ব্যক্তিগত দিকগুলো।
গল্পের কিছু কিছু দিক ভালো লাগেনি। প্রথমত, তদন্তকার্যটা কিছু ক্ষেত্রে একটু কেমন যেন লেগেছে। দুই যুগ আগের ঘটনা, অথচ ঘটনাবিন্যাস আর কথোপকথন শুনে মনে হয় যেন ঘটনাটা ঘটেছে দুই দিন আগে। আর তদন্তকার্যে ধাপে ধাপে সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা নেই। কেসের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আগেই জানা। সেগুলো পুনর্বিবেচনা করার সময় পাওয়া নতুন ক্লু থেকে মূল চরিত্র কখন, কীভাবে সমাধানে পৌঁছায়, তা একেবারে শেষে এসে রিভিল হয়। কিন্তু তাতে বিষয়টা কিছুটা অসংলগ্ন হয়ে যায়। গল্পের দার্শনিক ব্যাপারটা আরও ভালোভাবে উপস্থাপন করা যেত। কিছু আঁতেল মার্কা কথা ভুল জায়গায় বসানো আর সেগুলোর পুনরাবৃত্তির বদলে পুরো বিষয়টির গভীর ইমোশনাল দিকটা ঠিকঠাক ফিল করাতে পারলে পারফেক্ট হতো।
জাভেদ চরিত্রটা গল্পের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু তার চরিত্রায়ন একদম ভালো হয়নি। তার সংলাপগুলোও বেশ দুর্বল ছিল। লেখনি পুরো বইয়ে ঠিকঠাক থাকলেও, প্রথম অধ্যায়ের লেখা কেমন যেন খটমটে লেগেছে। মনে হচ্ছিল, ইংরেজিতে লিখে একেবারে আক্ষরিক বাংলায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে, শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের ‘হামারটিয়া’ মোটামুটি ভালো একটা মার্ডার মিস্ট্রি। এর আগে হাই এক্সপেকটেশন নিয়ে লেখকের ‘শেষ মৃত পাখি’ পড়ে বেশ হতাশ হয়েছিলাম, তাই এই বই থেকে খুব বেশি আশা রাখিনি। সেই দিক থেকে রহস্যকাহিনী হিসেবে ভালো হওয়ায় বইটাকে ৪ তারা দিলাম।
📚 বইয়ের নাম : হামারটিয়া
📚 লেখক : শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
📚 বইয়ের ধরন : ক্রাইম থ্রিলার, মিস্ট্রি থ্রিলার, ডিটেকটিভ ফিকশন
"নৈশ অপেরা" পড়ার পর শাক্যজিতের নতুন গোয়েন্দা উপন্যাস নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আবার সেই বহু বছর আগে ঘটে যাওয়া খুন, আবার নানারকম জল্পনার সমাহার। "কী যে হবে এবার!" এমন একটা ভয় কাজ করছিলো।
দেখা গেলো, লেখক একটিও বাজে শব্দ খরচ করেননি এবার। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা ধরে রেখেছেন। শেষের টুইস্ট "শেষ মৃত পাখি"র মতো মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো না হলেও বেশ কার্যকরী আর মানানসই। বড় কথা,"বদ্ধ ঘর হত্যা রহস্য" মানেই একগাদা "যদি কিন্তু অথবা"র সমাহার, যা পড়তে গেলে আমার মেজাজ বিগড়ে যায়। এ ব্যাপারটিতেও শাক্যজিৎ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।পুরো গল্পকে দার্শনিক ভিত্তি দিয়েছে গোয়েন্দাদের নৈতিকতা। অপরাধীর শাস্তি পাওয়া মুখ্য নাকি সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা মুখ্য তা নিয়ে চরিত্রদের নৈতিক দ্বন্দ্ব গল্পটিকে মাহাত্ম্য দান করেছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে ডিডি হোমিসাইডের অবসরপ্রাপ্ত ইনস্পেকটর জাভেদ আহমেদের ঠিকানায় একটা চিঠি আসে। চিঠিটা পড়ে তিনি চলে যান ২৫ বছর আগে ঘটে যাওয়া একটা কেসে। সেটা ছিল মালিনী অধিকারীর খুনের কেস। সেই সময় এটাকে লকড রুম মার্ডার হিসাবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। কারণ ঘরের দরজা ছিল বাইরে থেকে আটকানো, ঘরের ভেতর ছিল মালিনীর লাশ আর যখন দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকা হয়, তখন সেই লাশের পাশে পাওয়া যায় তার প্রেমিক অনিরুদ্ধকে। মালিনীকে যেই ছুরি দিয়ে খুন করা হয়, সেই ছুরিতে পাওয়া যায় অনিরুদ্ধেরই হাতের ছাপ।
যেহেতু খুনি রুমের মধ্যেই ছিল, তাই পুলিশও এটা নিয়ে খুব বেশি একটা তদন্ত করেনি। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় অনিরুদ্ধকে। ২৫ বছর জেল খাটার পর সে চিঠি লেখে জাভেদকে। সেখানে সে বলে সে আসলে নির্দোষ ছিল৷ সেই চিঠি জাভেদ দেখায় আরেক অবসরপ্রাপ্ত ইনস্পেকটর ইম্যানুয়েল গুহকে।
সেই সময় অদেখা কিছু ক্ল্যু আবারো তাদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নতুন করে আনঅফিশিয়ালি কেসটা রি-ওপেন করা হয়৷ সব সম্ভাব্য সন্দেহভাজন ব্যক্তির সাথে আবার একেক করে দেখা করা হয়। পুরোনো কাসুন্দি কেচে কী বের হবে এবার? . . বইটা পড়া শেষে গুগল করে দেখলাম হামারটিয়া (Hamartia) হলো মূলত একটি ধ্রুপদী গ্রিক সাহিত্যিক শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ "লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া" বা "ভুল করা"। বই পড়া শেষে আসলে এইটাই মনে হচ্ছে। পুরো বই জুড়ে দুইজনকে সন্দেহ করছিলাম কিন্তু লাস্টে এসে এমন টুইস্ট! মাথাটা ঘুরে গেল একেবারে! একদম আনএক্সপেক্টেড টুইস্ট! পুরোই মেইন কালপ্রিট থেকে Hamartied (এটা আদৌ কোনো শব্দ? :3) হয়ে গেলাম! xD
শাক্যজিতের লেখা নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। এই জনরাটা উনি আসলেই খুব ভালো লিখেন। একদম মাপা মাপা সব টুইস্ট আর টার্ন। মানে ঘুমে চোখ খুলে রাখাই যাচ্ছে না, এরপরেও আমি একদম একটানা এটা পড়ে শেষ করলাম এত বেশি ইন্টারেস্টিং!!!
বইয়ের নাম হিসেবে 'হামারটিয়া' আমার কাছে যথেষ্ট আনইউজ্যুয়াল বলে মনে হয়েছে। চাইলে হাতের কাছে থাকা গুগলে সার্চ করে বা চ্যাটজিপিটিকে এক লাইনের একটা নিরীহ প্রশ্ন করে জেনে নেয়া যেত এ নামের মাহাত্ম্য কী। তবে আমার কেন যেন মনে হচ্ছিলো নামটার অর্থ আমাকে এমন একটা ইঙ্গিত দেবে যেটা আমার 'কিছু-না-জেনে-বই-ধরা' পড়ার সিস্টেমে একটা 'বাগ' হয়ে দাঁড়াবে। তাই গুগল ফুগল বাদ দিয়ে ছুটির শুরুতে বসে গেলাম শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের নয়া বইটা নিয়ে। তবে মাথায় রাখলাম, বই শেষ করে এ নিয়ে ঘাটতে হবে।
শাক্যজিৎ এর একটা সিগনেচার রয়েছে। উনি বর্তমানে থেকে অতীত ঘেঁটে বেড়ান। এ বইটাও ব্যতিক্রম নয়। ১৯৯৮ সালে ভবানীপুরের একটা বাড়িতে খুন হন বাড়ির মালিকের কন্যা মালিনী অধিকারী। ৩৬ বছরে আটকে যাওয়ার মালিনী বিবাহিত ও এক সন্তানের জননী। কিন্তু তা সত্ত্বেও গলায় ছুরির ক্ষত নিয়ে মৃত অবস্থায় উদ্ধার হন একটা বদ্ধ ঘর থেকে যেখানে তার সাথে তার বয়ফ্রেন্ডও ছিল। বদ্ধ ঘর, পাশে অবৈধ প্রেমিকা তাও আবার মৃত, মার্ডার ওয়েপনে হাতের ছাপ; এ সব মিলিয়ে অনিরুদ্ধ সান্যালকে অপরাধী দেখিয়ে চার্জশীট জমা দিতে খুব একটা ঝামেলা হয়নি লালবাজারের ডিডির ইনভেস্টিগেটিভ অফিসার জাভেদ আহমেদের। অনিরুদ্ধ যে 'আমি খুন করিনি' ব্যাপারটা জোরালো গলায় বলেছেন, এমনটা না। তার মতে তিনি খুন করেছেন কি না সেটা উনি জানেন না। নেশা, ক্লান্তি, স্ট্রেস সব মিলিয়ে খুনটা যে উনি করলেও করতে পারেন, তা অনিরুদ্ধ নিজেই জানিয়েছেন। সে হিসেবে এটাকে ওপেন অ্যান্ড শাট কেস বলা গেলেও জাভেদ আহমেদের মনে একটা খটকা ছিলো। সে খটকার নৌকার পালে বাতাস লাগার কাজটা ঘটলো খুনের ঘটনার ২৫ বছর পরে যখন জাভেদ আহমেদের কাছে একটা চিঠি আসলো। চিঠি পড়ে তার মনে প্রশ্ন জাগল, তবে কি ভুল করেছেন? যদি করেও থাকেন, জীবন সায়াহ্নে এসে দুই যুগ আগের ঘটনার পেছনের কুশীলবদের খুঁজে বের করা কি তার দ্বারা সম্ভব হবে? ৬ মাস নিজের মধ্যে চেপে রেখে শেষমেষ আর না পেরে জাভেদ স্মরণাপন্ন হলেন লালবাজারের আরেক পোড় খাওয়া অবসরপ্রাপ্ত ডিটেকটিভ ইম্যানুয়েল গুহের। অবসরপ্রাপ্ত এককালের তুখোড় গোয়েন্দা যুগল কি পারবে সেপিয়া টোনের কলকাতার ইট-কাঠের মুখ খুলিয়ে ২৫ বছর আগে ঘটে যাওয়া লকড-রুম-মিস্ট্রি ঘটনার সত্যতা বার করতে? মোস্ট ইম্পর্ট্যান্টলি, 'ন্যায়' প্রতিষ্ঠা করতে?
কি, স্পয়লার দিয়ে দিলাম? একদমই না। লেখকের এ বইটার সাইজ মাত্র ১৬৪ পৃষ্ঠা, কিন্তু কিছু কিছু বই যে পৃষ্ঠার বিচারের চাইতে সাইজে বড় হয় অন্য কারণে তার অন্যতম উদাহরণ এ বইটা। একে তো বইয়ে মাথা খাটানোর অনেক জায়গা রয়েছে, তারওপর এমন কিছু দৃশ্যপট আছে, ডায়ালগ আছে, যেটা পড়ার মাঝখানে ধপাস করে বই বন্ধ করে নিজে নিজে চিন্তা করার অবকাশ দেবে৷ অর্থাৎ কারো যদি ১৬৪ পৃষ্ঠার থ্রিলার পড়তে বেসিক্যালি ২.৫ ঘন্টা লাগে এটা সম্ভবত আরো এক্সট্রা ১ ঘন্টা ডিমান্ড করবে৷ এ টাইপ বইয়ে ২ পৃষ্ঠা মিস করলেই মিস। সেখানে এতো অল্প শব্দে স্পয়লার একদমই দিতে না চাইলে, দেয়া সম্ভব না।
লেখক হিসেবে শাক্যজিৎ কী তা তিনি 'শেষ মৃত পাখি'তেই বুঝিয়েছেন৷ 'নৈশ অপেরা'তে তো তা আরো প্রবল, যদিও অনেককে বলতে দেখেছি যে নৈশ অপেরা অনেক স্লো (স্লো লাগলেও সেটা আমার কাছে ছিলো উপভোগ্য স্লো)। তবে এ বইটাকে স্লো বলার কোনো চান্স সম্ভবত শাক্যজিৎ এর কোনো পাঠকই পাবেন না। শাক্যজিৎ-সুলভ লিখনশৈলীর সাথে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, ইন ডিটেইল চরিত্রায়ণ সব এখানে উপস্থিত। বরাবরের মতই তার লেখায় মরচে ধরা শহরের একটা রূপ আবার দেখা গেল। বৃষ্টিতে ভেজা সবুজাভ অন্ধকার শহর, সল্টলেকের নিস্তব্ধ বার, জীর্ণ বাড়িঘর, রেডিয়োতে সকালের খবর, সেপিয়া টোনের মহল্লা; সবমিলিয়ে বিষণ্ণ একটা লোকালয়। আমি তো কলকাতার নই, তবু বুঝতে পারি কলকাতাকে এভাবে দেখা আমার বয়সী বা আমার চেয়ে বড় কলকাতাবাসীর কাছে নস্টালজিক একটা ব্যাপার হতে পারে। আবার এটাও হতে পারে যে লেখক আপন কল্পনায় এ শহরটার এ রূপেই আটকে গেছেন।
হালের 'মাথা-নষ্ট-করা-টুইস্ট' এ বইতেও আছে, তবে তা এতো সাবলীল ও ব্লেন্ডেড যে পাঠকমাত্রই অবাক হবে আমার ধারণা। গল্পের শুরুতে যত সুতো ছড়িয়েছে সব মেলে শেষে, একদম পাকাপোক্তভাবে। এমনকি এখানে ওখানে হাটতে থাকা চার্লি চ্যাপলিন বেশের ঘমশ্যামও অংকের সমীকরণ ছিড়ে বাইরে যেতে পারেননি। আর উপন্যাসের শেষটা তো একদম গ্রিক ট্র্যাজেডি। এত সুন্দর! এত সুন্দর! যে মনে হয়, ইশ আবার যদি ভুলে গিয়ে নতুন করে বইটা পড়ার এক্সপেরিয়েন্স নিতে পারতাম!
বইটা শেষ করে খুঁজলাম 'হামারটিয়া' মানে কী। হামারটিয়া গ্রিক শব্দ। এর মানে কোনো একজন ব্যক্তির এমন কোনো একটা ভুল, যেটা ধীরে ধীরে তাকে পতনের দিকে ঠেলে দেয়। আবার অনেক সময় গ্রিক ট্র্যাজেডিতে হামারটিয়া এমন ভাবে দেখানো হয়েছে যে, ছোট্ট একটা ভুলের জন্য গল্পের মুখ্য চরিত্রে পতন হচ্ছে এবং অনেক সময় সে ভুলটা ঐ মুখ্য চরিত্রও করছে না। এটা বোঝার পর আমার মনে হয়েছে, উপন্যাসের নাম এরচেয়ে সুন্দর আর কিছু কি হতে পারত?
শেষ করি জাভেদ আহমেদকে উদ্দেশ্য করে ইম্যানুয়েল গুহের একটা মনোলগ দিয়ে-
"ন্যায় একটা মিন পজিশন, দুই চরম অবস্থানের মধ্যবর্তী বিন্দু। অন্যায় এবং অতিরিক্ত ন্যায়, যার জন্য বাকি সমস্ত কিছুকে বিসর্জন দিতে হয়, এই দুই এক্সট্রিমের মাঝামাঝি বিন্দুতে ন্যায় থাকে। তুমি চাইছ অতিরিক্ত ন্যায়, যার জন্য হয়ত অনেকের জীবন আবার এলোমেলো হবে। তুমি যে জাস্টিসকে খুঁজছ, সেই জাস্টিস সত্যের খাতিরে এমপ্যাথিকে বিসর্জন দিতে বলে। তার পরিণতি কী হবে আমি জানি না। তুমি, আমি, আমরা সেটা মেনে নিতে কতটা প্রস্তুত?"
গল্পের কেন্দ্রে একটি পঁচিশ বছর পুরনো খুন। ভবানীপুরের একটি ঘর। ভেতর থেকে বন্ধ দরজা। মৃত এক নারী। তার পাশে অচেতন অবস্থায় প্রেমিক। সমস্ত প্রমাণ যেন একদিকেই আঙুল তোলে। মামলা হয়, সাজা হয়, জীবন বদলে যায়। তারপর একদিন, বহু বছর পরে, একটি চিঠি এসে উপস্থিত হয়। আর সেই চিঠিই খুলে দেয় বহুদিন ধরে বন্ধ থাকা একটি দরজা।
তবে শেষ পর্যন্ত হামারটিয়াকে শুধু একটি লকড-রুম মিস্ট্রি বললে কম বলা হবে। এটি ভুল বিচার, স্মৃতি, অপরাধবোধ, ভালোবাসা এবং মানুষের ভঙ্গুরতার গল্প। এমন এক গল্প, যেখানে সত্য উদ্ঘাটনের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে— কেন সেই সত্য এতদিন আড়ালে ছিল।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, গল্পের মনস্তাত্ত্বিক স্তর। কিছু দৃশ্য বা চরিত্র প্রথমে অপ্রয়োজনীয় মনে হলেও পরে বোঝা যায়, তারা আসলে এই ট্র্যাজেডির মানসিক কাঠামো তৈরি করছে। এখানে রহস্যভেদ যতটা লজিক্যাল, তার চেয়েও বেশি সাইকোলজিক্যাল।
কতদিন পর মোহগ্রস্তের মতো বই পড়লাম। হামারটিয়াকে বলা চলে সংলাপের ইন্টিগ্রিটির ফাইনেস্ট এক্সাম্পল। কলকাতার সুশীল আর আধুনিক পাড়ায় এবার ঘুরিয়ে আনলেন শাক্যজিৎ। শেষবার শাক্যজিৎ পড়েছিলাম যখন, দার্জিলিং কে দেখা হয়েছিল মন ভরে।
পুরো গল্পটাই সংলাপ নির্ভর। নেই কোলাহল। অনাড়ম্বর। ইন্টেলেকচুয়াল আলাপ ভালোই তো লাগলো। যাকে যেমনটা দেখাতে চেয়েছেন, তার কথা আর ভাড়ারও দিয়েছেন সেরকমই।
২৫ বছর আগের একটি খুন, যার সুরাহা, সুরতহাল কিংবা দন্ড সবই শেষ। কিন্তু মূল অভিযুক্ত সবশেষে কোন এক দুপুরে আত্মহত্যা করলেন জীবনটা টানতে না চেয়ে, দাবী করে গেলেন খুব করুণভাবে, খুনটা তিনি করেননি। তাই সেই তদন্তের তদন্ত কর্মকর্তা দুই অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ আবার বিবেকের তাড়নায় সইতে না পেরে আনঅফিশিয়ালি রিওপেন করলেন সে কেস।
এত আগের ঘটনা নিয়ে সহজে তদন্ত চলেনা। শুধুমাত্র আলাপে, প্রশ্নে, দ্বিধায়, সুপ্ত কথায়, ভর্ৎসনায় একটা কংঙ্কাল দাঁড় করানোর চেষ্টাই তাই করে গেলেন দুই বৃদ্ধ গোয়েন্দা। একটা লকড রুম মিস্ট্রিকে ক্যালকুলেট করলেন উল্টো দিক থেকে, সকল অভিয়াস দিকগুলোকে এড়িয়ে। কারণ অভিয়াস দিকগুলো দিয়ে বিচার যা হবার হয়ে গেছে। দাবীর পক্ষে দেখতে গেলে খুঁচিয়ে দেখতে হবে যা দেখবার প্রয়োজনই নেই!
গল্পে অতিতের বুকে স্ক্যালপেল চালানো হল নির্মোহ দক্ষতায়। আরেকবার অপরাধ না শাস্তি বড় তা নিয়ে বিতর্ক চললো। আমরা একটি গল্প পেলাম যার সমাধানের চাইতে সমর্পণটা আকর্ষণীয়। বদ্ধঘরের হত্যারহস্যের মতো রহস্যের চমৎকার টেকনিক্যালিটিকে এই প্রথমবার খেলো হয়ে যেতে দেখলাম দর্শনের কাছে।
A brilliantly crafted locked-room mystery that transcends the boundaries of conventional thrillers. Through its layered characters, psychological depth, and hauntingly melancholic portrayal of Kolkata, Shakyajit Bhattacharya delivers a story where truth, justice, empathy, and human fallibility collide in the most unforgettable way.
ডিটেকটিভ উপন্যাসের চেয়ে এই গল্পটা দর্শন আর নীতিশাস্ত্রের সংঘাত বললেই ভাল হয়। অ্যাডভেঞ্চারাস হওয়া কি চরিত্রদোষের মাঝে পড়ে? একের ভুলে অন্যের শাস্তি পাওয়া কি ঠিক? অথবা এক ভুলের শাস্তি মেলা অন্য ভুলের কারণে? আর যখন দোষী বের হয়েই যায়, তাকে ধরে ফেলা ন্যায়সঙ্গত, নাকি ছেড়ে দেয়া? দু'জন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার এক পুরনো মামলার সূত্রই নতুন করে খুঁজতে থাকেন, সে-ও ঐ নিজের বিবেককে পরিস্কার করার জন্যই। গল্পটা ঝিমায় না কখনো, নীতিশাস্ত্রের লেকচারও নেই, এজন্য কখনো বোরিং লাগে না। সব মিলিয়ে সাড়ে তিন।
অদ্ভুত এই নামের উপন্যাসিকার অর্থ সূদুর গ্রীক থেকে আসা। এই মানে হল লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া। মানে বুঝাই যাচ্ছে যে কেউ কিছু একটা ক্যাচাল লাগানোতে বইটা লিখা হয়েছে।
নিরেট গোয়েন্দা প্লট। কিন্তু ঘটনা ২৫ বছর আগের। অপরাধী খুনের দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে যাবজ্জীবন খেটে বের হয়েছেন। লাংস ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার ফলে গলায় ফাস লাগিয়ে আত্নহত্যা করেন। কিন্তু বিদায়ের আগে নিজ কেসের ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের কাছে একটা চিঠি দিয়ে নিজের অপরাধ অস্বীকার করে যান অনিরুদ্ধ।
ঘটনা খুব একটা চমকপ্রদ তা আসলে না। এগুলা হরহামেশাই হয়। মালীনি উচ্চবংশের বড়লোক ঘরের মেয়ে। মেধাবী মালীনি চাকরিও করেন ব্যাপক ভাল। তার স্বামী তারই মা প্রফেসর দেবারতীর ছাত্র শতদ্রু। সিধেসাধা মধ্যবিত্ত ঘর আর মন-মানসিকতার ছেলে শতদ্রু কিছুদিন পরেই মালীনির কাছে ঢেড়সের মত লাগা শুরু হয়। এরমধ্যেই মালীনি স্মার্ট অনিরুদ্ধের প্রেমে পড়ে যায়। অনিরুদ্ধ বিয়ে করা সন্তান-সন্ততিওয়ালা মানুষ। কিন্তু এসব সত্ত্বেও দূর্বার প্রেম গজায় উঠে এ দুজনের মধ্যে। অনিরুদ্ধ বউ পারমিতাকেও ছাড়তে চায় না আবার মালীনিকেও নাহ। মালীনি বিয়ে করতে চায় অনিরুদ্ধকে। এসব নিয়ে তাদের মধ্যে চলতে থাকে চরম মনোমালিন্য। এরই মধ্যে একদিন মালীনির বাসায় একান্তে সময় কাটিয়ে ব্যাপক নেশাপানি করে ঘুমায় যায় মালীনি আর অনিরুদ্ধ। কাজের মাসীর আগমনে আর চেচামেচিতে ঘর ভেংগে দেখা যায় মালীনি মৃত আর অনিরুদ্ধ ভ্যাবলা হয়ে বসে আছে। রুমের দরজা জানালা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। সো মার্ডার একজনের পক্ষেই করা সম্ভব, আর সে হল অনিরুদ্ধ। ট্রায়াল হয়, ওপেন এন্ড শাট কেস।
ভেজাল বাজায় অনিরুদ্ধ। চিঠিটা তদন্তকারী অফিসার জাভেদের কাছে পাঠানোর ফলে জাভেদ চলে যায় তারই প্রাক্তন পার্টনার ইমানুয়েলের কাছে। স্থিতধী আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির ইমানুয়েল কেসটা আবার ঘেটে দেখতে রাজি হয়। শুরু হয় ২৫ বছর আগের রিকনসিলিয়েশন।
সব মিলায় বলতে গেলে বইটা পড়ে ভাল লাগল খুব। লেখক সুন্দর লেখেন। ধাপে ধাপে যেভাবে গল্পটা সাজিয়ে তুলেছেন তার কোন তুলনা হয় না। চরিত্রগুলাও খুব সাবধানে গঠন করেছেন। বইয়ের নামকরণ আর প্রচ্ছদ অসাধারণ হয়েছে। গল্পের প্লট আসলে খুব একটা ইউনিক না। কত আর ইউনিক জিনিস বানানো যায়। তাসত্ত্বেও বইটা আসলে পড়বেন লেখার মসৃণতার আনন্দ উপভোগ করার জন্য। উনার শেষ মৃত পাখি বইটা পড়েও আমার একই অনূভুতি হয়েছিল।
পঁচিশ বছর আগে ঘটে যাওয়া লকড রুম মার্ডার মিস্ট্রি। ঘরের ভেতর দুইজন ছিলেন, একজনকে পাওয়া গেলো গলায় ছুরিবিদ্ধ অবস্থায়, আরেকজনের হাতের ছাপ ছুরিতে। হিসাব বরাবর, খুনী গেলো জেলে। কিন্তু সাজাপ্রাপ্ত আসামী জেল থেকে বেরিয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে চিঠি লিখলেন ইনভেস্টিগেটিং অফিসারকে। এরপর করলেন আত্মহত্যা। কিন্তু খুনটা আসলে করলো কে?
একটা মাথানষ্ট রহস্যন্মোচন। পৌরাণিক কাহিনির সাথে বর্তমান সময়কে রিলেট করার ব্যাপারটা খুবই ভালো লেগেছে। Recommended
Hamartia is a literary term originally defined by Aristotle in his Poetics. It refers to a tragic flaw or a fatal error in judgment that leads to the downfall and suffering of an otherwise noble hero. (Merriam-Webster)
বৃষ্টিস্নাত দিনের সঙ্গে রহস্যকাহিনীর চিরাচরিত সখ্য এবং অনেকদিন পরে কোনো বই শেষ করতে পারার আনন্দে রেটিং দেওয়ায় কিছুটা উদারতা দেখিয়েছি, অস্বীকার করব না। মনে পড়ল, গত ঈদেও শাক্যজিৎ পড়েছিলাম।
হামারটিয়া শব্দ টা এসেছে গ্রিক শব্দ থেকে যার অর্থ লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া। কেন বইটার নাম হামার টিয়া হলো সেটা বোঝাতে আমি ফ্ল্যাপের লেখা টা দিচ্ছি এর বেশি কিছু বললে স্পয়লার হয়ে যাবে। তবে এইটুকু বলতে পারি মেদ হীন বইটা এক বসায় পড়ে ফেলতে পারবেন এবং শেষের দিকে যখন রহস্যের সমাধান হবে আপনার হৃদপিণ্ডের শব্দ নিজ কানে শুনতে পারবেন। এই বছর আমার পড়া বইয়ের ভিতরে সেরার তালিকায় থাকবে বই টা।
ফ্ল্যাপের লেখা
পঁচিশ বছর আগে সমাধান হওয়া এক খুন।
একটি চিঠি আবার খুলে দেয় সেই পুরোনো কেস। বদ্ধঘরের রহস্য, ভুলে যাওয়া স্মৃতি, আর মানুষের অপরাধবোধ। তদন্ত যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হয়— শুধু খুনের গল্প নয়, এটা ‘হামারটিয়া’র আখ্যানও হতে পারে।
একটা লকডরুম মার্ডার মিস্ট্রি এবং এর মধ্য দিয়ে শাক্যজিতের আরেকটি অনবদ্য থ্রিলার পাওয়া গেল। শেষ মৃত পাখি যাদের পড়া আছে তারা এই লেখকের ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত। এই উপন্যাস, যা আকারে বেশ ছোট, সেই পূর্বাভিজ্ঞতা থেকে পাঠককে সরিয়ে নিয়ে যায় না। বরং, আবারও আমরা লেখককে কুর্নিশ জানানোর সুযোগ পাই।
বইটি একটি ক্লাসিক লকড রুম মার্ডার মিস্ট্রি, শেষ হবার আগে আন্দাজ করার উপায় নেই কিভাবে কি হলো। কিন্তু শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য নিছক মার্ডার মিস্ট্রি লিখেন নি। উৎকৃষ্ট ডিটেকটিভ কাহিনী হলেও বইটি মূলত মানুষের ন্যায়ের ধারণা নিয়ে এক দার্শনিক আলাপ। ন্যায় বা জাস্টিস বলতে আমাদের প্রচলিত ধারণা কে rethink করার একটা প্রয়াস বইটি দেয়। উনার গদ্য বেশ স্বাদু ও কবিত্বপূর্ণ হওয়ায় পড়ে ফেলা যায় অনাসায়ে কিন্তু বইটির রেশ মনে থাকে বেশটা সময় জুড়ে।
চিরাচরিত শাক্যজিৎ। একটা কোল্ড কেস , কিছু অপরাধবোধ আর শ্রাবনের কলকাতা। অসম্ভব ভালো পরিবেশ গঠন। (এইটা বোল্ড করে লিখলে ভালো হয় ) | একটা কঠিন রহস্যের একটা নিপাট সাধারণ উন্মোচন। সব সময় হয়তো শেষ মৃত পাখির মতো jaw dropping solution দরকার নেই। ইমানুয়েল কে ভালো লেগেছে। বইটার দাম দৈর্ঘ্যের তুলনায় একটু বেশি মনে হয়েছে। আরো ইমানুয়েল কে চাই , এবার আরো বেশি দৈর্ঘ্যে।
শাক্যজিতের লেখায় এক ধরনের Urban melancholy র ছাপ থাকে। "শেষ মৃত পাখি" তারপর "নৈশ অপেরা"এবং সবশেষে এসে "হামারটিয়া" বইতেও এই ছাপটা পেলাম। তবে তা থ্রিলকে বিন্দুমাত্র কমায় না বরঞ্চ পুরো গল্পটাকে যদি মঞ্চনাটকের সাথে তুলনা করা হয়, নাটকের এক দৃশ্য বলা যেতে পারে এই বিষন্ন আবহকে। বৃষ্টিতে ভেজা শহর, নিস্তব্ধ বার, বারবার নিজের সাথে দাবার চাল দেওয়া ইমান্যুয়েল অথবা চার্লি চ্যাপলিন বেশী ঘনশ্যাম.. কলকাতার এ রূপটা বেশ অচেনা। শেষ মৃত পাখিতে দার্জিলিং এর পর কলকাতার এ রূপ আমাকে বিশেষ অবাক করেনি। অথচ টিভি সিরিয়াল বা ম্যাগাজিনের পর্দায় কলকাতাকে সবসময় ভিন্নরূপেই দেখে এসেছি। এটা লেখকের মুন্সীয়ানা যে নব্বই দশকের আবহের সাথে আরবান মেলানকোলি এমনভাবে ব্লেন্ড করেছেন, পাঠককে কল্পনা করতে কষ্ট হয় না।
২৫ বছর আগে ভবানীপুরের পৈতৃক বাড়িতে খুন হন মালিনী অধিকারী, গলায় ছুরিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে, পাশে নেশাগ্রস্ত প্রেমিক অনিরুদ্ধ স্যান্যাল। বদ্ধ দরজার মধ্যে খুন, পাশে পরকীয়া প্রেমিক যে কীনা জোর দিয়ে বলতেও পারছে না সে খুন করেছে কী না। পুলিশ ওপেন এন্ড শাট কেস হিসেবেই এটাকে দেখে এবং রায়ে অনিরুদ্ধর জেল হয়। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা জাভেদ আহমেদ সবকিছু একটু ভিন্ন এঙ্গেলে দেখতে চান, বলা যায় দেখতে বাধ্য হন তার কাছে আসা এক চিঠির পর। যে চিঠিতে অনিরুদ্ধ কনফেস করেছে যে সে খুনটা করেনি। এখন জাভেদ আহমেদ কেন বাধ্য হন তা নিয়ে ডিসকাশন করা যেতে পারে। ন্যায় প্রতিষ্ঠার তাগিদে নাকি ২৫ বছর আগে যে "কিন্তু" তার মনে উঁকি দিয়েছিলো তার শেষ দেখতে? এখানে চলে আসে দর্শনের আলাপ। ভিকটিম মৃত, খুনী হিসেবে একজন সাজাভোগ করে শেষটায় গ্লানিময় জীবন নিয়ে আত্মহত্যা করে। এখানে ন্যয় প্রতিষ্ঠার কি আদৌ কিছু থাকে? কিছু কি বদলাবে এতদিন পর?
শেষটাতেও লেখক দর্শনের ছাপ রেখেছেন তবে এ সাথে এনেছেন গ্রিক ট্রাজেডি। থাইসিটিসের উদাহরণ দিয়ে। ট্রাজেডি অথবা আয়রনি। ঘনশ্যাম এবং ইম্যানুয়েল ও কি ট্রাজেডির আরেক উদাহরণ নয়? শুরু থেকে শেষ অবধি ফিলসফি, রহস্য, মিথলজিক্যাল এক্সাম্পল এবং বর্ণনা সবকিছুই দারুণ ছিলো। Perfect blending যাকে বলে।
একটি রহস্য-রোমাঞ্চধর্মী (থ্রিলার) উপন্যাস। গল্পের শুরু ২০২৪ সালে, যখন অবসরপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টর জাভেদ আহমেদের কাছে একটি চিঠি আসে। চিঠিটি তাকে ২৫ বছর আগের একটি খুনের মামলার কথা মনে করিয়ে দেয়।
সেই মামলায় মালিনী অধিকারী নামের এক নারীকে খুন করা হয়েছিল। ঘটনাস্থলের সমস্ত প্রমাণ তার প্রেমিক অনিরুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল—খুনের অস্ত্রে তার আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়, এবং পরিস্থিতিও তাকে অপরাধী হিসেবে নির্দেশ করছিল। ফলে অনিরুদ্ধকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কিন্তু ২৫ বছর পর জেল থেকে লেখা চিঠিতে অনিরুদ্ধ দাবি করে যে সে নির্দোষ। এরপর জাভেদ আহমেদ ও আরেক অবসরপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টর আবার মামলাটি খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। পুরনো সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা তথ্য সামনে আসতে থাকে।
তদন্ত যত এগোয়, ততই রহস্য গভীর হয় এবং শেষ পর্যন্ত এমন একটি চমকপ্রদ মোড় আসে যা পুরো ঘটনার ব্যাখ্যাই বদলে দেয়।
ক্লাসিক লকড রুম মিষ্ট্রি বাংলায় সেরকম নেই। দৃশ্যপট সুন্দর সাজানো গোছানো। শেষ মুহূর্ত অবদি কৌতূহল আটকে রাখে। কিন্তু অহেতুক তত্বের জটিলতা বইটাকে দুর্বল করেছে। এবং অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি স্ল্যাং ও যথেষ্ট পরিচিত লেখকের এহেন কাঁচা লেখার পরিচয় কিছু ক্ষেত্রে খুবই খাঁজা লেগেছে। হতাশ। দুটো তারা যথেষ্ট। একবার পড়া যায় আর কি।
যে অপরাধী, আইনের চোখে তাঁর দোষী সাব্যস্ত হওয়াই কি সবসময় ন্যায়বিচার? নাকি কিছু ক্ষেত্রে তাঁর 'নিরপরাধ' তকমাটাই বজায় থাকা বেশি কাঙ্খিত? এমনকি যখন প্রকৃত দোষীর পরিবর্তে শাস্তি পেতে হয় একজন সত্যিকারের নিরপরাধ ব্যক্তিকে তখনও কি তা কাঙ্খিত হতে পারে?
পড়ে মনে হতে পারে বুঝি ক্রিস্টোফার নোলানের 'ডার্ক নাইট' ছবিটার বিষয়ে কোনো আলোচনার অবতারণা, কিন্তু এক্ষেত্রে এটা বইয়ের গল্পের অন্তর্নিহিত দার্শনিক প্রশ্ন । ন্যায় বড় নাকি জীবন? অপরাধ বড় নাকি শাস্তি? শেষের প্রশ্নটা যদি শুনতে গোলমেলে লাগে তাতে পাঠকের দোষ নেই অবশ্য । আমারও লেগেছিলো । তাই মূল জিজ্ঞাসাটাকে আরও সহজ ভাষায় যদি তুলে ধরি তবে সেটা এরকম - অপরাধীর 'অপরাধী' বলে আইনের চোখে গণ্য হওয়াটাই কি সবচেয়ে জরুরি (অর্থাৎ শাস্তি বড়), নাকি তাঁর কাছে নিজের অপরাধের উপলব্ধিই অগ্রগণ্য কারণ এই অপরাধবোধেই তাঁর শাস্তি (অপরাধ বড়)? যদি দস্তয়েভস্কির 'ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট'এর কথা মনে পড়ে থাকে, তবে আশ্বাস দেব গল্পের প্লটের সঠিক আন্দাজ পাওয়ার দিকে এগোচ্ছেন ।
'হামারটিয়া' শব্দটির অর্থ একধরণের judgmental error যা কারও পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । বইয়ের গল্পের ভিত্তিও এমনই এক বিচারের ত্রুটি, যে কারণে খুনি সাব্যস্ত হন একটি নিরপরাধ মানুষ যার শেষ পরিণতি আত্মহত্যায় । আর তাঁর এই পরিণতিই খুলে দেয় পঁচিশ বছর আগে 'সমাধান' হয়ে যাওয়া একটা খুনের ঘটনার কেস, যার পুনর্মূল্যায়ণে নেমে পড়েন দুই অবসরপ্রাপ্ত হোমিসাইড ইন্সপেক্টর, একজন বিবেকের তাড়নায়, আরেকজন নেহাত কৌতূহলবশে । গল্পের ছকে এমনিতে কোনো নতুনত্ব নেই - মার্ডার-মিস্ট্রির সমাধানে রিটায়ার্ড পুলিশ ইন্সপেক্টরের অবতীর্ণ হওয়া, লকড-রুম মার্ডারের ধাঁধা, গোয়েন্দা চরিত্রের পরামর্শদাতা হিসেবে শার্লকের মাইক্রফটের মতো একটি চরিত্র - সবই অতিপরিচিত trope; নতুনত্বটা দার্শনিক জিজ্ঞাসার মধ্যে । ন্যায়ের আদর্শ ঠিক কতটা মূল্যবান? বা 'ন্যায়' আদতে কী?
বইয়ের পিছনে দেওয়া ব্লার্বের নিচে একটা লেখা পাওয়া যায় - Justice is a mean position. কথাটার অর্থ অনুধাবন করতে হলে অ্যারিস্টটলের সদ্গুণ নীতিশাস্ত্রের (virtue ethics) একটা প্রাথমিক ধারণার প্রয়োজন হয়, নির্দিষ্টভাবে বললে Golden Meanএর ধারণা যা বলে দুটি চরম অবস্থানের মধ্যবর্তী জায়গাই হল সদগুণের অবস্থান । এক্ষেত্রে ন্যায় হল দুই চরম অবস্থান - অন্যায় ও অতিরিক্ত ন্যায় -এর মধ্যবর্তী mean position । অর্থাৎ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া যেমন অগ্রহণীয়, তেমনই প্রশ্নবিদ্ধ যে-কোনো-মূল্যে ন্যায়ের আদর্শ । জীবনের মূল্যের সাথে ন্যায়বিচারের আদর্শের trade-offই প্রকৃত ন্যায় ।
লেখনী বুদ্ধিদীপ্ত এবং intellectually demanding, যদিও লেখকের একটু শো-অফের প্রবণতা আছে বলে মনে হয় মাঝে-মাঝে । তা নিয়ে অবশ্য অভিযোগ নেই আমার, কারণ সবসময় যে lowest common denominatorএর কথা ভেবেই সাহিত্য রচনা করতে হবে এমন কোনো কথা অবশ্যই নেই । তবে ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাত-সম্পর্কিত রাজনৈতিক মতামতের প্রকাশটা অনভিপ্রেত বলেই মনে হল । কোনো প্রয়োজন ছিল না । জানিনা দুই প্রধান চরিত্রের একজনকে ইহুদি, আরেকজনকে মুসলিম বানানোর নেপথ্যে সূক্ষ্মভাবে কোনো বার্তা দিতে চেয়েছেন কিনা লেখক । চেয়ে থাকলেও আমার কাছে তাঁর বিশেষ গুরুত্ব নেই, কারণ কোনোরকম political commentaryর চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় বইয়ের দার্শনিক জিজ্ঞাসা তথা ধর্মীয় symbolismগুলো । চিন্তাশীল এবং সুপঠিত পাঠকের জন্যই যে লেখক লেখেন, বুঝতে অসুবিধা হয় না । তাঁর লেখনীর এই বৈশিষ্ট্যটি যে উপভোগ করেছি সেটা বলা বাহুল্য ।
২০২৬ রিভিউ - ৪৬ বই: হামারটিয়া লেখক: শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য খু.নে।র মামলা তামাদি হয় না, জানেন তো? ২৫ বছর আগের হওয়া এক খুন। বর্তমান সময়ে হওয়া এক আত্ম।হ।ত্যা। দুটো জুড়ে দিল এক চিঠি। বহু বছর আগে, কলকাতার বুকে,প্রচন্ড শীতে নিজের ঘ।রে অভিসাররের পর খউন হন মালিনী। বদ্ধ ঘরে ছিল প্রেমিক অনিরুদ্ধ। পাঢ় মাতাল এই প্রেমিকযুগলের বাহ্যজ্ঞান লোপ পেয়েছিল সে সময়। মাতাল অনিরুদ্ধ একেক বার একেক কথা বলে গ্র।এফতারের পর। সে স্বীকার করেই নেয় সে খ।উন করেছে। ২৫ বছর পর, সে সময়ের তদন্তকারী অফিসার, জাভেদ আহমেদের কাছে আসে এক চিঠি। সে এখন অবসরে. তবুও আনঅফিশিয়ালভাবে, স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়া কলকাতার শেষ ই।জরায়েলী বংশোদ্ভূত ইহুদি, ইম্যানুয়েলের সাহায্য নেয়। যে অবস্থাতে ওই লা*শ পাওয়া যা, তা কারো কাম্য ছিল না! ফলে কেউ পুরানো ইতিহাস নতুন করে পড়তে চায়নি। না পারমিতা, না সাম্য, না শতদ্রু, না মা দেবারতি অথবা রাংতার। কিন্তু, মৃ।ত মানুষের শেষ চিঠির আবদার রাখতে আবার নতুন করে স্মৃতি হাতড়ে সেদিনের কথা মনে করে সবাই। সেদিনের ঘটনা বা তার আগে পরে ঘটা সব কিছু, শুধুমাত্র মালিনী আর অনিরুদ্ধের নিষিদ্ধ সম্পর্কের খাতিরে বদলে যায়। কে ভুল, কে ঠিক তার বিচারের দায় কার? এখানে পোয়েটিক্স,হামারটিয়া, গ্রীক মিথের কিছু ব্যাপার এসেছে। মানসিক অবস্থা, জটিলতা, অপরাধ সব মিলে এক গোলকধাঁধা যেন। সেদিন অনিরুদ্ধ খ।উ।ন করেছেন বা করেননি, আজ ২৫ বছর পর এসে তা নিয়ে মাতামাতি করা অর্থহীন হয়তো। তবে মানুষের মস্তিষ্ক জটিল খেলা সমাধান করতে হয়তো বেশ অভ্যস্ত। তাই কলকাতার বুকে জীবন সায়াহ্নে এসে রহস্য উন্মোচনের কোন দায় থাকে না! কিছুই এসে যায় না আজ। তবুও অপরাধ আর মনস্তত্ত্বকে দাবার গুটির মত সাজিয়ে নিতে হচ্ছে। শেষ মৃত পাখি বইটার মত বৃহত কলেবরের বই এ নয়। মেদহীন ঝরঝরে এই বইতে অপরিকল্পিত অতিরিক্ত কোন কথায় নেই,যেটা এই বইয়ের কাহিনীর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। খ।উ।নী কে এটা হয়তো সূত্র মিলিয়ে পাওয়া সহজ, আবার অনেকের পক্ষে মাথা ঘুরিয়ে দেবার মত। গল্পের প্লট ও খুব আলাদা কিছু না। কিন্তু, কিন্তু, কিন্তু, এই গল্পকে সুন্দর করে তুলেছে গ্রীক মিথের আখ্যা ও ব্যখ্যা। প্রতিটি, প্রতিটি চরিত্রের মানসিক অবস্থা, অতীত-বর্তমানের মধ্যে ঝুলে থাকা সুতো আর সত্য কিছু গল্প। শুরু থেকে শেষ খেই হারাবেন না, প্রতিটি চরিত্রের মানসিক অবস্থা, কথার ফাঁকে বলা কিছু সত্য, কিছু মিথ্যে যদি প্রথম থেকে ধরতে পারেন তো বেশ, নইলে শেষ পর্যন্ত লেগে থাকুন। কোন ছোট্ট ঘটনা, এক মুহূর্তের কিছু ঘটনা বদলে দিতে পারে একজন মানুষকে, হয়তো একাধিক পরিবারকেও। কিন্তু এই হামারটিয়া ঠিক কার এখানে বলুন তো?
কোনো আপাত নিরীহ রহস্যকাহিনীর অতীত খুঁড়ে বের করা যখন শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের লেখার বিষয়বস্তু হয়, তখন নিঃসন্দেহে তা যে একটি মাস্টারপিস তৈরি হবে সেটা বলাই বাহুল্য। এর আগে তনয়া সিরিজে এই মাস্টারপিসের স্বাদ পেয়েছি ভালোভাবে। হামারটিয়াও তার ব্যতিক্রম নয়। শাক্যজিতের অন্যান্য রহস্যকাহিনীর মতো এই গল্পও কেবল রহস্য উদঘাটনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বারবার তা পাঠককে এনে দাঁড় করিয়েছে কঠিন কিছু প্রশ্নের মুখে। যেগুলির মধ্যে অন্যতম হল অপরাধ ও শাস্তির মধ্যে যেকোনো একটা বেছে নেওয়ার আদিম অনন্ত কালের সেই লড়াই। এছাড়াও মানবমনের বিকৃতমনস্কতার যে অনুসন্ধান তাও অন্যান্য লেখার মত এতেও রয়েছে পুরোমাত্রায়। রহস্য উন্মোচনের ক্ষেত্রেও এমন একটি বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছে যা আজও আমাদের সমাজে একটা খুবই নেগ্লেকটেড বিষয়। এছাড়াও এর আগে বর্ষার কুয়াশামাখা দার্জিলিং হোক বা ভেঙ্গে পড়া চার্চকে ঘিরে থাকা মফস্বল; মূল রহস্যকাহিনীর প্রেক্ষাপট ছিল চিরাচরিত শহরের বাইরে। আর এবার সেখানেই কলকাতা শহরকে প্রেক্ষাপট হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে শহরটাকে নুয়ার রূপ দিয়েছেন লেখক। অন্ধকারাচ্ছন্ন এই শহর আর সেখানে প্রায় বিচ্ছিন্ন দুই বৃদ্ধ গোয়েন্দার চরিত্র শহরটাকে আরও বেশি জীবন্ত করে তোলে। উপন্যাসটি ছোটো হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে প্রথম থেকেই প্রচুর গতিশীল। কাজেই যারা শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের কাজের সাথে প্রথমবার পরিচিত হতে চান তাদের কাছে এই বইটি অবশ্যপাঠ্য।
অনেকদিন পর আবার একটা এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো একটি গল্প পড়লাম। অবশ্য উপন্যাসের আয়তনটাও সাহায্য করেছে। রোববারের দুপুর ফাঁকা পেয়ে পড়ে ফেললাম শাক্যাজিত বাবুর শেষ বেরনো উপন্যাসটি।
অদ্ভুত চরিত্রের সমাহার এই গল্পে। মূল গোয়েন্দা ইমানুয়েল গুহ, কলকাতার শেষ ইহুদি যিনি কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন গোয়েন্দা। গল্পের শুরু এক বৃদ্ধ শাস্তি প্রাপ্ত খুনের আসামি যিনি আত্মহত্যা করেছেন , তিনি তার অপরাধের গোয়েন্দার কাছে বলে যান যে তিনি অপরাধী নন। আগাথা ক্রিস্টির ফাইভ লিটল পিগস প্রচ্ছন্ন ভাবে এই গল্পে মিশে আছে। এখানেও সামান্য কয়েকজন অপরাধীর মধ্যে আমাদের সন্দেহ ঘোরাফেরা করে। তারপর গোয়েন্দার প্রখর যুক্তিবিস্তারে একজন অপরাধীর অপরাধ ধরা পরে। মূল ঘটনাটি ঘটে নব্বই দশকের শেষের দিকে , তাই নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকের কলকাতার সামাজিক চিত্রও কিছুটা ফুটে উঠেছে এই উপন্যাসে।
আগের বইটির মতো এখানে অযথা বর্ণনা নেই, তাই বইটি আয়তনেও ছোট আর পড়তেও ভালো লেগেছে। আশা রাখি উনি আরও এরকম বই আমাদের পড়ার সুযোগ করে দেবেন।
"আমার কাছে ন্যায় মানে একটা মিন পজিশন, দুই চরম অবস্থানের মধ্যবিন্দু। অন্যায় এবং অতিরিক্ত ন্যায়, যার জন্য বাকি সমস্ত কিছুকে বিসর্জন দিতে হয়, এই দুই এক্সট্রিমের মাঝামাঝি বিন্দুতে ন্যায় থাকে।"
"মৌলালি থেকে ঠান্ডা বাতাস পিঠে জলীয় গন্ধ নিয়ে ছুটে এসে তাঁদের পিঠে আছড়ে পড়ল, তারপর ছুটে গেল রাসমণি রোডের মাথাপাগল উথালপাথাল গাছেদের উপর দিয়ে। ইম্যানুয়েল বললেন 'বাড়ি যাও জাভেদ, হাওয়াটা খারাপ।'
'হায় ইজি,' যাত্রার ভঙ্গিতে ভুরু তুললেন জাভেদ। 'এই বদলের দুনিয়ায় তুমি শালা একই থেকে গেলে। দেখতে পেলে না, হাওয়াটা পুর্বদিক থেকে আসছে। ইস্ট উইন্ড।'
ইম্যানুয়েল হাসলেন, 'হোমস আর ওয়াটসন কি আমাদের মত এত বুড়ো হয়েছিল?"
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর সময়টুকু বেশ ভালোভাবেই কাটাচ্ছিলেন সাবেক পুলিশ অফিসার জাভেদ আহমেদ। কিন্তু বিধিবাম! একটা চিঠি জাভেদকে বাধ্য করে অবসর থেকে ফিরে আসতে।
অনিরুদ্ধ সান্যালের চিঠি। যে কিনা ২৫ বছর আগে ঘটে যাওয়া মার্ডার কেস এর আসামী ছিল। এইতো কয়েকবছর আগে ছাড়া পায়। আসামী না হয়েও এতবছর জেলে খেটেছিল সে। সামাজিক বঞ্চনা, পরিবার থেকে একা হয়ে যাওয়া অনিরুদ্ধ বেশিদিন নিজেকে সামলাতে পারে নি। সুইসাইড করে বসে।
চিঠিতে অনিরুদ্ধ জাভেদের কাছে অনুরোধ করে ২৫ বছর আগের কেসটার যেন আবার তদন্ত করা হয়। কিন্তু জাভেদ জানে এত বছর আগের ঘটনার তদন্ত অফিসিয়ালি করা সম্ভব না। আন-অফিসিয়ালি করতে হবে। কিন্তু সে একা পারবে না। মঞ্চে হাজির হলো ইম্যানুয়েল গুহ। জাভেদের বন্ধু এবং অবসরপ্রাপ্ত আরেক পুলিশ অফিসার। যাকে জাভেদ সংক্ষেপে "ইজি" বলে ডাকে।
বলছিলাম "হামারটিয়া" বইয়ের কথা। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের লেখা। ড্রামা, লকড রুম মিস্ট্রি, খানিকটা ফিলোসোফি'র মিক্সড জনরা। আমার কাছে ভালো লেগেছে বইটি। লেখকের লেখা ছিল বেশ ঝরঝরে। ছিল পরিমিত বর্ণনা। তদন্তের টেকনিক্যাল সাইডগুলো বেশ ভালোভাবে উপস্থাপন করেছেন তিনি।
আমরা সচরাচর যে লকড রুম মিস্ট্রি পড়ি, লেখক সেদিকে না গিয়ে ভিন্ন দিকে গিয়েছেন। দেখাতে চেয়েছেন যে, লকড রুম মিস্ট্রি এভাবেও উপস্থাপন করা যায়। এর নাম দিয়েছেন তিনি "ভ্যারিয়েশন অফ লকড রুম মিস্ট্রি।"
লেখক সংক্ষেপে গ্রিক লিটারেচারও এনেছেন। বইয়ের নামকরণ, তার স্বার্থকতা কোথায় এবং মূল গল্পের সাথে গ্রিক সাহিত্যের সম্পর্ক চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন।
এন্ডিং এ চমকে গিয়েছিলাম। গল্পের ফ্লো এমনভাবে আগাচ্ছিল, আমি যে তিনজনকে সন্দেহ করেছিলাম, মনে করেছিলাম তাদের মধ্যে কেউ হবে। কিন্তু লেখক ভেবে রেখেছিলেন অন্যরকম এন্ডিং। এটা নিয়ে আর কথা না বলি।
আচ্ছা এখন বলি কারা এই বইটা পড়বেন না বা কাদের কাছে এই বইটা খারাপ লাগবে। ১. যাদের লকড রুম মিস্ট্রি+ড্রামা পছন্দ না। ২. যাদের টুইস্টওয়ালা বই পছন্দ। ৩. যাদের ডিটেইলিং অনেক পছন্দ। ৪. আনইউজুয়্যাল এন্ডিং যাদের ভালো লাগে না।
ইম্যানুয়েল গুহ ক্যারেক্টর টা ইন্টেরেস্টিং মনে হয়েছে আমার কাছে। ক্যারেক্টর বেইজড একটা দুইটা বই আনলে মন্দ হয় না।
এইতো! ভালো থাকবেন সবাই। বইয়ের সাথে ভালো সময় কাটুক।
বই : হামারটিয়া লেখক : শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী প্রকাশনা : সুপ্রকাশ
৪.৫/৫.০! পড়া শুরু করার পর থেকেই হুকড ছিলাম টানা শেষ করতে পারি নাই কারণ মার্দার মিস্ট্রি পড়ার উপযোগী সময় ছিল না তখন! এইজন্য একটু অবসরের খোজে ছিলাম যখন টানা পড়ে শেষ করা যাবে! বইটা আসলে এক নি:শ্বাসে পড়ে ফেলার মতো, বইয়ের সাইজ ও সেটার জন্য খুব উপযোগী, কন্টেন্ট ও! ২৫ বছর আগের একটা লকড রুম মার্ডার মিস্ট্রি নিয়ে কাহিনী! যসেই লকড রুমের যে সমাধানে এসে তারা পৌছান শেষ পর্যন্ত সেই সমাধান আমার শুরু থেকেই মনে হইহে ইরেস্পেক্টিভ অফ খুনী কে! খুনী কে এইটা অবশ্য আমার মনে হয় না কেউ ই ধরতে পারবে শেষ করার আগে কারণ সন্দেহ সবার দিকেই যাবে কোন না কোন সময়! তবে জাভেদের মতোই বলতে হয়- খুনী ওই দুইজনের একজন হইলেই মেইবি আমিও বেশি ই স্বস্তি পাইতাম! "A likely impossibility is prefarable to an unconvincing possibility"- অনেক চিন্তার খোরাক দিয়ে যায় এই লাইন! শুধু এই বইয়ের কাহিনীর জন্য না! বাস্তবের অনেক কিছুর জন্য ই! ভেরি গুড রিড! লেখকের পড়া ৩য় বই আমার! হতাশ হই নাই এখনো! মার্ডার মিস্ট্রি ভালো লিখেন খুব!
মাঝে মাঝে মনে হয় থ্রিলার পড়া ছেড়ে এখন থেকে নন ফিকশন পড়া শুরু করব, তারপর কিভাবে যেন এই ধরনের থ্রিলার হাতে এসে যায়, আবার থ্রিলারের প্রতি দুর্বলতা বৃদ্ধি পায়.