উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা তথা ভারতের নবজাগরণ (শব্দটা হালে খুব বিতর্কিত হয়ে পড়েছে অবশ্য) প্রসঙ্গে কথা উঠলে যেসব মানুষের কথা ওঠে, তার মধ্যে কি নরেন্দ্রনাথ দত্তের নামটাও আসে? যদিও মানুষটির জন্ম ১৮৬৩ সালে (রবীন্দ্রনাথের থেকে মাত্র বছর দুয়েকের ছোট!), তাঁর ভাবনা-চিন্তা এবং সাংগঠনিক ক্ষমতার পরিচয় আমরা পাই বিংশ শতকেই| সমকালীন বাংলা-তথা-ভারত (যথারীতি) তাঁকে নির্দয়ভাবে সমালোচনা বা (আরো খারাপ) উপেক্ষা করেছে, এবং বিদেশের অজস্র মানুষ যখন নিজেদের কোন-না-কোনভাবে তাঁর দ্বারা প্রভাবিত বলে ঘোষণা করেছেন, তখনই লোকে তাঁকে নিয়ে আরও জানতে-বুঝতে আগ্রহী হয়েছে| সেই মানুষটি, যাঁকে আমরা স্বামী বিবেকানন্দ নামে চিনি, নিয়ে বিশেষ করে গত এক দশকে বাংলার নাকউঁচু বোদ্ধাদের মধ্যেও কৌতূহল বেড়েছে, কারণ সচরাচর যেসব মেকি দেবতাদের পাদ্য-অর্ঘ্য দিতে তাঁরা উৎসুক হন তাঁদের অধিকাংশই এই সময়ে ভুল (যেমন মার্ক্স), বা ফাঁপা (যেমন নেহরু), বা মিথ্যুক (নাম বলে শেষ করা যাবেনা) বলে প্রমাণিত হয়েছেন| আমি নিজে রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র, কিন্তু সেখানে আমাদের যেভাবে ঠেসে-ঠুসে ভক্তি শেখানোর চেষ্টা করা হত, তার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ম ব্যাপারটাতেই আমার অরুচি জন্মে গেছিল| পরে, অন্য বহু হতাশ বামপন্থীর মত আমিও আবিষ্কার করেছিলাম যে এমন বহু মানুষ, যাঁদের আমরা এদ্দিন স্রেফ তাঁদের ধর্ম দিয়ে চিনে এবং মেঁপে এসেছি, আসলে মানবিকতা নামক মাপকাঠিতেই বিচার্য, এবং সেই বিচারে সেসব মানুষকে জানার চেষ্টা করাটা আশু কর্তব্য| তার পর থেকেই আমি স্বামী বিবেকানন্দের একটি প্রামাণ্য জীবনীর সন্ধান করে চলেছিলাম| শংকরের লেখা বিবেকানন্দ-বিষয়ক বিভিন্ন বই-এ আলগা-আলগাভাবে অনেক তথ্য থাকলেও আমি খোঁজ করছিলাম একটা (বা একাধিক, কারণ মাত্র এক খণ্ডে এমন মানুষের জীবনকে আঁটানো যাবেনা) সুসংগঠিত বই-এর, যাতে কালানুক্রমিক-ভাবে মানুষটির জীবনের তথ্যগুলো থাকবে, কিন্তু সেটা হবে একটা ন্যারেটিভ-এর মাধ্যমে| আলোচ্য বইটি অনেকাংশে সেই আশা পূরণ করেছে| অনেকাংশে কথাটা লিখলাম কারণ বইটা লেখার সময় লেখকের ভক্তিরস অনেক ক্ষেত্রেই ন্যারেটিভ-কে প্রভাবিত করে ফেলেছে| তবুও, এই প্রথম খণ্ডটি পড়লে নরেন্দ্রনাথ দত্তের স্বামী বিবেকানন্দ হওয়ার পথটা বোঝা যায়, তার পেছনে থাকা স্থান-কাল এবং অন্যান্য পাত্রদেরও চিনে নেওয়া যায়| ভরসা থাকুক, যাতে পরের খণ্ডগুলোও এই ধারা অব্যাহত রাখতে পারে|