বহু শতাব্দী পর আজকে আনন্দমেলা কিনলাম। কারণ সকালে কাগজে বিজ্ঞাপন দেখলাম, আনন্দমেলার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বিশেষ সংখ্যা বেরিয়েছে। মূল অলংকরণসহ পুরোনো প্রচুর গল্প পুনর্মুদ্রিত হয়েছে এই সংখ্যায়। এই জন্যেই কিনলাম।
হায় রে আমার শৈশব-কৈশোরের ভালোবাসার আনন্দমেলা। আমার বোনের সঙ্গে এই পত্রিকা কাড়াকাড়ি করে পড়ার জন্য মারপিট পর্যন্ত করেছি। রাজ্যের বাইরে দীর্ঘদিন বসবাস করার সময়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার ট্রেনে গিয়ে এই পত্রিকা সংগ্রহ করে আনতাম। সেই পত্রিকার এই দুর্দশা দেখে মনটা দুঃখে ভরে উঠেছে।
ছোটোদের যেকোনো পত্রিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো তার ডিজাইন, অলংকরণ, পৃষ্ঠাসজ্জা। ছোটোরা নির্দিষ্টভাবে বলতে পারেনা ঠিকই, কিন্তু তাদের অবচেতনে সবচেয়ে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে একটা পত্রিকার প্রচ্ছদ, ভিতরের পৃষ্ঠার বুদ্ধিদীপ্ত ডিজাইন ও অলংকরণ। খুব সূক্ষ্ম বৈসাদৃশ্যও ছোটোদের নজর এড়িয়ে যায় না। অথচ এদের কাণ্ডকারখানা দেখে মনে হচ্ছে এরা ভেবেছে, আরে এটা তো বাচ্চাদের কাগজ। বাচ্চা মানেই তো দুদুভাতু।
কেমন কমন-সেন্সের অভাব এদের! প্রতিটা পৃষ্ঠার চারিদিকে প্রায় এক ইঞ্চি মতো অহেতুক জায়গা ছেড়েছে। এর ফলে মাঝের জায়গাটুকু সংকীর্ণ হয়ে গেছে। পুরোনো আনন্দমেলার পুনর্মুদ্রিত পৃষ্ঠাগুলো হয়ে গেছে ছোটো। হরফ হয়ে গেছে ছোটো। সবকিছু হয়ে গেছে ছোটো। যেসব স্বল্প-বাজেটের শিল্পীরা রাস্তাঘাটের ফ্লেক্স কিংবা পোস্টার ডিজাইন করেন, তাদের ডিজাইন সেন্সও এর চেয়ে ভালো থাকে! আনন্দবাজারের মতো এত ঐতিহ্যশালী সংস্থায় ঠিক কী দেখে ডিজাইন-শিল্পীদের চাকরি দেওয়া হয় জানি না!
এর সঙ্গে আছে একটা কুৎসিত ফন্ট। অধুনা বন্ধ হয়ে যাওয়া "এবেলা" ট্যাবলয়েডে এই কুৎসিত ফন্টটি দেখা যেত। সেই ট্যাবলয়েড বন্ধ হয়েছে বাঁচা গেছে, কিন্তু সেই কুদর্শন ফন্টটি এখনও এরা ছাড়তে পারেনি! এসথেটিক্সের বেসিক জ্ঞান থাকলে এই ফন্ট কেউ কীভাবে ব্যবহার করে আমি বুঝিনা!
আজকের এই ইন্টারনেট অধ্যুষিত দুনিয়ায় এমনিতেই মুদ্রিত পত্রপত্রিকার শিরে সংক্রান্তি। এই অবস্থায় ইন্টারনেটের পাশে টিকে থাকার অন্যতম বড় অস্ত্র হলো সুদৃশ্য ডিজাইন, সুপরিকল্পিত পেজ লে-আউট। কিন্তু যারা নিজেদের সুবর্ণজয়ন্তী বিশেষ সংখ্যাকেও এরকম বীভৎসদর্শন রূপে বাজারে ছাড়তে পারে, তাদের আদৌ টিকে থাকার ইচ্ছে আছে কিনা সেই ব্যাপারে সন্দেহ হচ্ছে আমার!
অমিতাভ চন্দ্রের সাদামাটা কল্পনাশক্তিহীন প্রচ্ছদ নিয়ে আলাদা আর কী বলবো। "দেশ" পত্রিকায় তাঁর নানাবিধ প্রচ্ছদের দ্বারা নিয়মিত নিজেকে এবং "দেশ"-কে হাসির খোরাক বানাচ্ছেন পাবলিকের কাছে।
আনন্দমেলা পত্রিকা মাত্র নয়, আমাদের সকলের জীবনের অংশ, প্রায় প্রত্যেকেরই শৈশব-কৈশোরের বহু স্মৃতি একে ঘিরে। আনন্দমেলা সুবর্ণজয়ন্তী সংখ্যা কেনার কিছুদিন আগেই ভাবছিলাম সম্পূর্ণ আনন্দমেলার পুরনো সংখ্যার ফ্যাক্সিমিলি একসঙ্গে বছর অনুযায়ী পুরোটা বাঁধিয়ে কেন বের হচ্ছে না? বেশ হার্ডবাউন্ড ১০০০-১২০০ পাতার এডিশন এক একটা। দাম যতোই হোক না কেন কিছু মানুষ কিনতেন। আনন্দমেলা সুবর্ণজয়ন্তী সংখ্যা সেই ইচ্ছা অনেকটাই মেটাতে পারল। এখানে লেখক তালিকা একদম ঠিকঠাক। বর্ণানুক্রমিক সূচি অনুযায়ী প্রথম লেখাটি অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের। পড়েই ভাবলাম, স্বপ্নের মতো অথচ গভীর বাস্তবের দ্যোতক এই গল্পটি এতোদিন পড়িনি কেন? আশাপূর্ণা দেবীর 'বিষে বিষক্ষয়' অনবদ্য। তখনকার এই লেখাগুলো বেশ জমজমাট হত। জয় গোস্বামীর লেখাটিও ভাল। বাকিগুলো এখনো পড়া হয়নি। দু-একটি কমিকস সম্পূর্ণ থাকলে ভাল হত। কিন্তু অরিজিনাল ইলাস্ট্রেশনগুলির জন্য আনন্দমেলা কর্তৃপক্ষ ধন্যবাদার্হ। বাড়তি পাওনা বলা যায়, সাহিত্যিক ও অন্যান্যদের স্মৃতিচারণগুলিকে। এঁদের বক্তব্যের সঙ্গে আশি-নব্বইয়ের অনেকেই যে নিজেদের 'আনন্দমেলাবেলা'র কিছু কিছু মিল খুঁজে পাবেন, সেটা নিশ্চিত।