সালটা ১৯৮৮। আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে মাত্রই সিনাই উপদ্বীপ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করলেও গাজায় আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। তাদের আগ্রাসনে অতিষ্ঠ হয়ে মুক্তিপাগল ফিলিস্তিনীরা হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেছে, শুরু হয়েছে ইন্তিফাদা আন্দোলন। মেজর রায়হান রাশীদ–বাংলাদেশ আর্মি ইন্টেলিজেন্সের তুখোড় এজেন্ট। আরব লিগ নেতৃবৃন্দের বিশেষ অনুরোধে অত্যন্ত বিপজ্জনক এক গোপন মিশন নিয়ে ইসরায়েলের ভেতরে অনুপ্রবেশ করেছে। তার লক্ষ্য বোলতা হয়ে ঢুকে গুঞ্জন সৃষ্টি করা। সহকারী হিসেবে প্রথমেই পরিচিত হলো ফটোগ্রাফিক মেমোরির অধিকারী ফয়সলের সাথে। যে কিনা মিশরীয় আল-মুকাবারাতের অপারেটিভ। আবু সালেম–ইন্তিফাদা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান এই নেতা গাজার শাতি ক্যাম্পে আত্মগোপন করে আছেন। চার মাস ধরে তিনি ইসরায়েলি বাহিনীর চোখকে ধোঁকা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, ফিলিস্তিনিদের মুক্তির জন্য চালিয়ে যাচ্ছেন লড়াই। মোসাদ তার মাথার দাম নির্ধারণ করেছে পাঁচ লক্ষ শেকেল। রায়হান ইসরায়েলে ঢুকেই শুরু করল গুঞ্জন। গুপ্তচর হিসেবে শত্রুভূমির ঠিক ভেতরেই মাথা খাটিয়ে ফাঁকি দিতে শুরু করল মোসাদের ভয়ানক শ্যেনদৃষ্টিকে। আর একের পর এক বসাতে লাগল বোলতার কামড়। কিন্তু শত্রুও তো ঘোল খাওয়ার পাত্র নয়। সমানে সমানে চলল লড়াই। ওদিকে আবু সালেমকে উদ্ধার করতে গেল মিশরীয় সেনাবাহিনির তিন সৈন্য। কী অপেক্ষা করছে ওদের সবার সামনে? উত্তাল এই সময়ে, টলোমলো এই পটভূমিতে, ছায়ার আড়ালে কীসের নাটক ঘটে যাচ্ছে সবার চোখের আড়ালে? এই দুই অপারেশন কি পারবে তাদের সামনে থাকা এক ও অভিন্ন লক্ষ্যটা উদ্ধার করতে? রায়হান, ফয়সল, সারা আসফা কিংবা আবু সালেম–কী আছে তাদের ভাগ্যে? কেউ কেউ কি হারিয়ে যাবে আজীবনের জন্য? আর ফারাও–কে সে, কী তার পরিচয়? রোমাঞ্চ, বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনা, বিশ্বাসঘাতকতা আর ভালোবাসার এক অসামান্য কাহিনিগাঁথা অন্তর্ঘাত। এসপিওনাজ থ্রিলারের মাঝে হতে যাছে এক অনন্য সংযোজন। যারা পেজ টার্নার বই পছন্দ করেন আর গল্পের মাঝে খুঁজে নিতে চান আবেগঘন আখ্যান, তাদের জন্য একটা চমৎকার যাত্রা অয়ন ইসলামের অন্তর্ঘাত।
Auyon Islam is a fiction writer, translator, and literary agent based in Queensland, Australia. Born in Rajshahi, Bangladesh, he balances a dual life: working as an engineer by day and crafting immersive stories in his free time.
Auyon’s original works primarily explore the realms of urban fantasy, thrillers, horror, and science fiction. He is the author of Ontorghaat, a gripping geopolitical spy thriller set against the historical backdrop of the 1988 Intifada.
As a translator, his goal is to bring beloved international fantasy into natural, authentic Bangladeshi Bangla without losing the atmosphere or narrative beat of the originals. His translation credits include major titles like Kevin Hearne's Hounded.
When he isn’t plotting high-stakes espionage or adapting magical vocabulary, Auyon can usually be found playing badminton, swimming, playing with his kids, watching movies with his beautiful wife, Jesmin, or tending to his home garden.
সাল ১৯৮৭! ই জ রা য়ে লের সামরিক দখলদারির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে ফি লি স্তি নিদের এক প্রতিরোধ আন্দোলন। নাম, ইন্তিফাদা আন্দোলন। যে আন্দোলন ফি লি স্তি নিদের অস্তিত্বের দাবিকে আরও পোক্ত করে। নিজেদের স্বাধীন ভূখণ্ডের দাবি, নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের দাবিতে এমন এক গণজাগরণ ফি লি স্তি নিদের বাস্তবিক লড়াইকে সামনে আনে। কিন্তু দখলদার ই জ রা য়ে ল তা মানবে কেন? তারাও প্রতিহত করে। পেশী শক্তির লড়াইয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে। আর এই দুয়ের মধ্যে বোলতা হয়ে প্রবেশের প্রস্তুতি নেয় বাংলাদেশ আর্মি ইন্টিলিজেন্সের মেজর রায়হান রশীদ।
ইন্তিফাদা আন্দোলন গড়ে ওঠার এক বছর পরের সময়। তখন দখলদার ই জ রা য়ে ল যেন আরও বেশি শক্তিমত্তা প্রদর্শন করছে। আন্দোলনের নেতা আবু সায়েম গা জায় শাতি ক্যাম্পে অবস্থান নিয়েছে। আর ঠিক সে সময়টাতেই মিশরে বিশেষ অপারেশনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে রায়হান রশীদ। কাজ প্রায় শেষের দিকে। দেশে ফিরে আসবে এমন সময় নতুন এক কাজের জন্য তাকে ডেকে নেওয়া হয়। প্রবেশ করতে হবে তেল আ বি বে। গোপন এক মিশনে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে হবে ই জ রা য়ে লের শক্তিশালী সংস্থাগুলোকে। তবেই না খেলা জমবে!
রায়হান রশীদ বাংলাদেশের আর্মির এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বুদ্ধিমত্তায় যে অতুলনীয়। কিছুদিন আগে মিশরের সাথে ই জ রা য়ে লের শান্তিচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ফলে চাইলেও যখন মিশর ই জ রা য়ে লের অভ্যন্তরে অভিযান চালাতে পারবে না, তখন এক বাংলাদেশের যুবক বোলতা হয়ে প্রবেশ করে শত্রুর ডেরায়। কিছু অদ্ভুত কাগজে ছেয়ে যায় পুরো তেল আ বি ব। হুমকিগুলো নিছক-ই হুমকি না, যখন জানা যায় একজন মো সা দের এজেন্ট মারা যায়। সব মিলিয়ে নাম না জানা এ সংগঠনের কারণে ই জ রা য়ে লের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো, এমনকি মো সা দ পর্যন্ত নড়েচড়ে বসে।
ওদিকে কাজ করে যায় রায়হান। সাথে গুপ্তচর ফয়সল। লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার সময় একটি ভুল। ক্ষমতাশীল শত্রুর বিপক্ষে লড়তে গেলে কখনোই মনোযোগ হারাতে হয় না। প্রেম, ভালোবাসার জন্য বেখেয়ালি কাজ করতে হয় না। একটি ভুলের কারণে বিপদ হলেও হতে পারত। কিন্তু রায়হান ঠান্ডা মাথার মানুষ। একই সাথে আত্মবিশ্বাস যেন তাকে সকল প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে সাহস জোগায়। তাই বারবার শত্রুপক্ষের ডেরায় হানা দেয়। তবে সে যদি বোলতা হয়, আশেপাশে টিকটিকিও আছে। যে চাইলেই বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে। সে কারণেই হয়তো পদে পদে বাধা আসছে।
তবুও অটল, অবিচল রায়হান তার লক্ষ্যের খুব কাছে। কিন্তু প্রতিপক্ষও তো থেমে নেই। প্রতিটি চাল মেপে মেপে এগিয়ে আসছে। মরুভূমির বালুতে ছুটে চলছে ওরা। ধেয়ে আসছে শত্রুপক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে কী করে পরিত্রাণ পাবে? কত মূল্য দিতে হবে এর জন্য, রায়হান জানে না। শুধু জানে জীবনের অন্তিম পরিণতি হলেও হতে পারে। কিন্তু বুকে অসীম সাহস, সবকিছুর শেষ দেখার প্রত্যয় আর হার না মানা মানসিকতার কিছু সহযোদ্ধা থাকলে আর কী লাগে? জীবনের শেষবিন্দু দিয়ে হলেও একসাথে পরিণতি বরণ করতে হবে! দেখা যাক কী হয়…
অয়ন ইসলামের প্রথম বই। অথচ পড়তে গিয়ে মনেই হবে না তিনি প্রথম বই লিখছেন। এত পরিণত ভাষাশৈলী! গল্প বলার ধরন অত্যন্ত চমৎকার। পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিল আন্তর্জাতিক স্পাই থ্রিলার পড়ছি, যার পরতে পরতে উত্তেজনা, সাসপেন্স। প্রতিপক্ষের সাথে ইঁদুর-বেড়াল, ষড়যন্ত্রের বীজ, অটুট লক্ষ্য, অসীম সাহসের এই “অন্তর্ঘাত” উপাখ্যান যেন বাংলা মৌলিক থ্রিলার সাহিত্যের অনন্য সংযোজন। আরও স্পষ্ট করে বললে বাংলা মৌলিক স্পাই থ্রিলার সাহিত্যে এমন বই খুব কমই লেখা হয়েছে।
বইটা পড়তে পড়তে আপনি পৌঁছে যাবেন অতীতে। তেল আ বি বের অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াবেন রায়হানের সাথে। কখনও উৎকণ্ঠায় নড়ে চড়ে বসবেন। ই জ রা য়ে ল এমন এক দেশ, যা শত্রুপক্ষের জন্য নরক। সেই জায়গায় যখন প্রধান চরিত্র প্রতি মুহূর্ত বিপদের আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে, তখন পাঠক হিসেবে নিজেরও অস্বস্তি লাগে। মনে ভয় ধরায়। লেখকের লেখার গুণ এখানেই। তিনি পাঠকের মনকে যদি বইয়ের সাথে জুড়ে দিতে পারেন, যেখানে পাঠক মনে করবেন তিনিও এই বইয়ের একটা অংশ; বইয়ের প্রতিটি মুহূর্তে তখন উপভোগ্য হয়ে ওঠে।
উপন্যাসের শুরুটা বেশ ভালো। বর্তমান সময় দিয়ে লেখক শুরু করেছেন। অতীতের এক চরিত্র এসেছেন বাংলাদেশে। মিশরের সেই তরুণ যুবকের বয়স এখন বার্ধক্যে এসে পৌঁছেছে। এই বয়সে এসে অতীতের স্মৃতিচারণ দিয়ে যে গল্পের শুরু, সেই গল্প আপনাকে নিয়ে যাবে তেল আ বি বে। ১৯৮৮ সালে। জীবনের কিছু কিছু ঘটনা থাকে, যা সময়ের সাথে সাথে আরও তীব্রভাবে স্মৃতির সাথে জুড়ে যায়। সময়ের সাথে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনে হয় এই তো কিছুদিন আগে এই ভয়ংকর ঘটনার সাক্ষী হতে হয়েছিল। যেখানে জীবন ও মৃত্যুর মাঝে বিশাল দূরত্ব, তার সীমারেখা কমে এসেছিল।
এই বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। তখনকার ফি লি স্তি ন সময়টা বোঝা জরুরি। ই জ রা য়ে ল বা মার্কিন, তাদের সাথে মিশরের সম্পর্ক, মিশরের ইচ্ছা, নীরবে কাজ করে যাওয়ার মতো ঘটনাবলী এখানে বিপুল পরিমাণে ব্যাখ্যা না করা হলেও ঘটনাক্রমে উন্মুক্ত হয়। কাদের কী ভূমিকা গল্প এগোনোর সাথে সাথে তা পরিষ্কার হতে থাকে। এখানে জটিলতাও কম নেই। কেননা একটি জাতি, যারা নিজেদের অস্তিত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে, স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে এমন এক জাতির বিরুদ্ধে, যারা সময়ের সাথে সাথে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। তাদের শক্তিমত্তার সাথে পেরে ওঠা কঠিন। তবুও কঠিন এক মিশন এখানে সফল করতেই হতো।
রায়হানের মিশন খুব সিম্পল। একজনকে উদ্ধার করে আনতে হবে। কিন্তু এই মিশনের আড়ালে ভয়ংকর এক দায়িত্ব কাঁধে চেপে আছে। একটি মিথ্যে অভিযানের কথা ছড়িয়ে দিতে হবে। এর পথে পথে বাধা। কখনও প্রশাসনের সামনে, কখনো মো সা দের মতন সিক্রেট সার্ভিসের নজরে পড়ার ভয় আছে। কিন্তু একটা বিষয় লক্ষণীয়, মানুষ যতই প্রতিকূলতার মধ্যে পড়ুক, নিজের আত্মবিশ্বাস, দক্ষতা ও নিজের প্রতি ভরসা যদি থাকে, তাহলে সকল প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব। এই কাজে দক্ষ বলেই শত্রুর ডেরা থেকে মিত্রকে ছাড়িয়ে আনার প্রচেষ্টা সফল হয়েছে।
লেখকের একটা বিষয় তারিফ করতে হয়। এই বইয়ের এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে অনেক চরিত্র এসেছে। কোনো চরিত্র সময় বেশি পেয়েছে, কারো অবস্থান সীমিত সময়ের জন্য। লেখক চেষ্টা করেছেন প্রতিটি চরিত্রকে গুরুত্ব দেওয়ার। তাদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দিয়েছেন। তাছাড়া সবগুলো চরিত্রকে আপনার কোনো না কোনো সময় মনে ধরবে। যে কিশোর রায়হানদের গাড়িকে পার করে দেওয়ার জন্য সামনে সামনে দৌড়িয়েছে, তার জন্য আপনার মন খারাপ হবে। যে ছেলেটা পরিবারের কথা না ভেবে এক মিশন সফল করতে নিজের জীবনের পরোয়া করেনি, মরুভূমির তপ্ত বালির মধ্যে লড়াই চালিয়ে গিয়েছে, তার জন্য আক্ষেপ হবে। মমতা জাগবে সেই মেয়েটির জন্য, যে নিজের শক্ত আবরণকে বিদেয় করেছে কেবল ভালোবাসার জন্য নিজের মানবিকতাকে জাগ্রত করেছে। প্রতিটি চরিত্রকে লেখক এত যত্ন নিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন, এই চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছিল উপন্যাসের প্রাণ।
এই দুনিয়ায় সম্ভবত মানুষের জীবনের মূল্য সবচেয়ে কম। বিশ্বে যত বড় বড় সিক্রেট সার্ভিস আছে, সেখানে একবার যুক্ত হলে জীবনের প্রতি মমতা ঝেড়ে ফেলতে হয়। কঠিন আবরণে মুড়ে ফেলতে হয়। কিন্তু শক্ত খোলসের ভেতরে তো একটা নরম মন থাকে। যা হয়তো ভালোবাসা খোঁজে, স্নেহ চায়। আর মানুষ যখন নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে, তখন নিজের অবস্থান ভুলে মানবিকতা জেগে ওঠে। এই বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল আবেগের নিয়ন্ত্রণ। ভালোবাসা দেখানোর পাশাপাশি আবেগের যে সংযোগ স্থাপিত হয়েছে, তার গুরুত্ব অপরিসীম। জটিল এক গল্পের মাঝে এর প্রয়োজন ছিল। গল্পের গতির লাগাম টেনে ধরার জন্যও এর দরকার ছিল।
আর তাছাড়া ফারাও নামের এক চরিত্র তো ছিলই। রহস্যময় এ চরিত্র মিত্র, না শত্রু; তা বোঝা বড় দায়। পুরোটা সময় আড়ালে ছিল। আড়ালে থেকেই কলকাঠি নেড়েছে। হয়তো জীবনের তাগিদে কিংবা ভয়ংকর কোন কিছুর আশঙ্কায়। মানুষ কেন বিশ্বাসঘাতকতা করে? কেন নৈতিকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের অবস্থানের অমর্যাদা করে? তার মনস্তত্ত্ব হয়তো বোঝা যাবে না। কিন্তু জানা গেলেও যেতে পারে। কিংবা সেই পাইলটদ্বয়, যারা না থাকলে অনেক কিছুই হতো না। চাইলেই তো তারা নিজেরা পিছু হটতে পারত। কিন্তু জীবনের চেয়ে দায়িত্ব বড়। কেউ দায়িত্বকে বিক্রি করে দেয় ভালো থাকার জন্য। আবার কেউ জীবনকে বাজি রাখে দায়িত্ব পালনের জন্য! এই তো পৃথিবী। যেখানে একই সাথে দ্বৈত বৈশিষ্ট্যের মানুষ একই সাথে থাকে।
অয়ন ইসলাম খুব দারুণভাবে গল্প সাজিয়েছেন। ভাষাশৈলী দুর্দান্ত ছিল। কিছু বর্ণনা মুগ্ধ করেছে। বিশেষ করে মরুভূমির মাঝে ছুটে চলার মাঝে প্রকৃতিকে তিনি জীবন্ত করে তুলেছিলেন। গল্পের গতি পরিমিত ছিল। কখনো ছুটেছে, পরক্ষণেই লাগাম টেনেছেন। সব মিলিয়ে “অন্তর্ঘাত” পড়ার অভিজ্ঞতা বেশ ভালো। শেষের দিকে আক্রমণ দৃশ্যগুলোর বর্ণনাও লেখক দিয়েছেন দারুণভাবে। মরুভূমির মাঝে একটি গাড়ি ছুটে চলছে। তাকে ধাওয়া করছে শত্রুপক্ষ। পথের এই ছুটে চলা মিশেছে আকাশ পথেও। তার মধ্যে টুকরো টুকরো সংঘর্ষ, লুকিয়ে বাঁচিয়ে ফিরে আসা। কিংবা সহযোদ্ধাদের কেউ হয়তো সেখানেই থমকে গিয়েছে।
এখানে লেখকের প্রশংসা করা উচিত বলে মনে করি। গল্পের এক দুইটা মূল চরিত্র আছে ঠিকই, কিন্তু যখন লড়াইটা চলেছে তখন সকলেই এক কাতারে। সবাই সহযোদ্ধা। সবার সমান গুরুত্ব ছিল। কাউকে লেখক অতিরঞ্জিত করে সর্বেসর্বা করে তোলেননি। এমন মিশনের ক্ষেত্রে এক দুইজনের ভূমিকা একটু বেশি থাকে। তাকে পরিমিতভাবে ব্যবহার করে লেখক সবাইকেই লড়াইয়ে সমানভাবে ব্যবহার করেছেন। কেউ বুদ্ধি দিয়েছে, কেউ সম্মুখ সমরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কারো বিপদে কেউ এগিয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে চরিত্রগুলোর ভূমিকার পাশাপাশি গল্পের গতিপ্রকৃতি একক সত্তায় এগিয়েছে।
আমার দারুণ লেগেছে এর শেষের অংশগুলো। আক্রমণ, প্রতি আক্রমণের বিষয় তো ছিলই। সেই সাথে মরুভূমির বুকে ছুটে চলা যে ইঁদুর-বেড়াল খেলা, একটা টানটান উত্তেজনার যে পারদ লেখক তুলেছেন; একটা স্পাই থ্রিলারের তো এমনই হওয়া উচিত। যেখানে শেষবেলায় মুখোমুখি লড়াইটা বহুদিন মনে থাকবে। তৃপ্ত মন নিয়ে শেষের অংশ এগিয়ে আসব দ্রুততার সাথে।
লেখক যেভাবে এর সমাপ্তি টেনেছেন, তাও দারুণ। যখন কোনো বইয়ের সিক্যুয়াল লেখার পরিকল্পনা থাকে, তখন অচিরেই দেখা যায় সেটা তাড়াহুড়ো করে করা। কিংবা এমনভাবে সমাপ্ত হয়েছে, যেখানে আসলে গল্পের অপূর্ণতা প্রকাশ পায়। এখানে লেখক অবশ্যই যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। এমন জায়গায় সমাপ্তি এঁকেছেন, যেখানে একটি ঘটনাপ্রবাহ পরিপূর্ণ রূপে শেষ হয়েছে। একই সাথে আরও একটি ঘটনার আভাস দিয়েছেন। যার জন্যই হয়তো অনেক বছরের অপেক্ষা ছিল। আমি মুখিয়ে আছি পরবর্তী বই পড়ার। কেননা এমন আবেগী সমাপ্তির পর পরের দৃশ্যে কী হবে, তা জানার আগ্রহ যে বাড়ে!
ঋদ্ধ প্রকাশ থেকে প্রকাশিত এই বইটির সম্পাদনা দারুণ হয়েছে। প্রকাশনীর প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়ে অভিযোগ করার কিছু নেই। নতুন প্রকাশনী হিসেবে বেশ ভালো যাত্রা সম্পন্ন হয়েছে। মানসম্মত বই নির্বাচনের কারণে প্রকাশনীর কাজকর্ম ভালো লাগে। “অন্তর্ঘাত” ভালো বই। এর পরতে পরতে যে উত্তেজনা লুকিয়ে আছে, পাঠক অচিরেই তার সাথে নিজের সংযোগ অনুভব করবে।
বইটির প্রচ্ছদও দারুণ হয়েছে। মরুভূমির উপর ছুটে ছিল গল্পের মূল আকর্ষণ এখানে ফুটে উঠেছে।
পরিশেষে, মিশর থেকে তেল আ বি ব, তেল আ বি ব থেকে গা জা! একটা পরিভ্রমণে কতটা উৎকণ্ঠা লুকিয়ে থাকে। পিছনে শত্রু আসছে। তবুও শত্রুর ডেরায় গিয়ে ভয়ডরহীন এক পরিস্থিতি তৈরি করার মতো সাহস সবার থাকে না। সাহসীদের জীবনের গল্প অন্যরকম হয়। তারা হারার আগে হেরে যায় না। শত্রুর ডেরায় মিত্রকে রেখে পালিয়ে যায় না। যে মিশন কাঁধে চেপেছে, তা পূরণের জন্য জীবনকে বাজি রাখতে পারে। “অন্তর্ঘাত” এমন এক সাহসী গল্প, যে গল্পের আলোড়নে নিজেকে আবিষ্কার করল পাঠ থামিয়ে রাখা যায় না।
▪️বই : অন্তর্ঘাত ▪️লেখক : অয়ন ইসলাম ▪️প্রকাশনী : ঋদ্ধ প্রকাশ ▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫
১৯৮৮ সালের ইন্তিফাদা আন্দোলনের অন্যতম বড় নেতা আবু সালেমকে ফিলি*স্তিন থেকে সড়িয়ে মিশরে নিয়ে আসার গোপন এক মিশন নিয়ে তেল আবিবে পৌঁছাল মেজর রায়হান রশীদ। বাঙালি আর্মি ইন্টেলিজেন্সের তুখোড় এই এজেন্টের কাজ ছিল বোলতা হয়ে ঢুকে হয়ে কিছু গুঞ্জন করা। কিন্তু মোসা*দের নাকের ডগায় বসে এসব করে এত সহজে পার পাওয়া কি আর সম্ভব? তারওপর যখন নিজেদের মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে এক বেঈমান।
মোসা*দ বনাম বাঙালি
১৯৬৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর এক ক্যাপ্টেন সাইফুল আজমকে মিলিটারি এডভাইজার হিসেবে জর্ডানে পাঠায় পাকিস্তান। ওই বছরেরই জুনে আরব-ইস*রায়েল যুদ্ধ শুরু হলে সেই যুদ্ধে জর্ডানের গেস্ট পাইলট হিসেবে অংশ নেন সাইফুল। যুদ্ধের প্রথম দিনেই তিনি ভূপাতিত করেন দুটো ইস*রায়েলি যুদ্ধ বিমান। যুদ্ধের দুদিনের মাথায় তাকে জরুরী ভিত্তিতে ইরাকে নেওয়া হয়। আর সেখানে গিয়ে তিনি আরও দুটো ইস*রায়েলি এলিট এয়ারক্রাফট মিরাজ ৩ ধ্বংস করেন। ইস*রায়েলের মতো দেশের চারটি বিমান ধ্বংস করলেও, সাইফুল আজমের নিজের একটি বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। ইস*রায়েল যুদ্ধ শেষ হবার আগ পর্যন্ত জানতেও পারেনি, তাদেরকে নাকানিচুবানি খাওয়ানো পাইলট কোনো আরব নন, একজন বাংলাদেশী। তার এই কৃতিত্ব স্বরূপ তাকে নিজেদের সর্বোচ্চ সম্মাননা প্রদাণ করে জর্ডান, ইরাক ও পাকিস্তান। ২০০১ সালে এসে আমেরিকা তাকে "লিভিং ঈগল" উপাধিতে ভূষিত করে। বাংলাদেশের গর্ব এই পাইলট মারা যান ২০২০ সালে।
ওপরে যে ইতিহাসটুকু লিখলাম তার সাথে আমাদের আজকের বইয়ের রিভিউর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে বাংলাদেশী একজন এজেন্ট গিয়ে ইস*রায়েলে ঝামেলা পাকাচ্ছে; এহেন গল্প লেখার কারণে ওপার বাংলার মলাট গ্রুপে ব্যাপক হাসাহাসি হয়েছিল বইটা নিয়ে। সেটার জবাবে এই ইতিহাসটুকুর উপস্থাপনা। আমরা ফেলনা ছিলাম না, অদক্ষও না। আমাদের সেরকম বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ যদি দলকানা না হয়ে সার্বভৌমত্বের কথা চিন্তা করে সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী ও বিমান বাহিনীকে সঠিক রিসোর্স ও ট্রেনিং দেওয়া হতো, তবে আমরাও পিছিয়ে থাকতাম না কোনো অংশেই। কেন আর কোন দেশের ইন্ধনে আমাদের আজ এই অবস্থা তা ইতোমধ্যেই দেশের বেশিরভাগ মানুষ জানে। আজ বইয়ের গ্রুপে এসে সেই আলাপে না যাই, বরং বইটা নিয়ে আলোচনা করি।
বোলতার গুঞ্জন
স্পাই থ্রিলার হিসেবে বইটাকে যাচাই করতে গেলে আমি বলব বেশ ভালোভাবেই তাতে উৎরে গিয়েছেন লেখক। একদম শুরুতে কেন মিশর নিজেদের বাহিনীর কাউকে ব্যবহার না করে একজন বাংলাদেশীকে পাঠানো হলো, কীভাবে সে ইস*রায়েলী আকাশ সীমা পার করে তেল আবিবের মতো নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার একটা শহরে প্রবেশ করল; তার খুবই সুন্দর ও বিশ্বাসযোগ্য একটা ব্যাখ্যা দিতে পেরেছেন লেখক। আর তাই শুরুতেই পাঠক টের পেয়ে যাবে অন্তত আষাঢ়ে কোনো গল্প সে পড়তে বসেনি। বইয়ের প্রথম ভাগে ধুন্ধুমার কোনো একশনের দেখা পাওয়া যাবে না। পাওয়া গেলেই বরং তা অস্বাভাবিক হতো। কেন না, এটা যে গোপন মিশন। এখানে শুধু গুঞ্জন তোলার কথা। আর সেসব মিশনের খুঁটিনাটি বেশ আগ্রহোদ্দীপক সব ঘটনা দিয়ে সাজানো। প্রতি পদে পদে থাকা বিপদকে এড়ানোর জন্য যেসব পূর্ব প্রস্তুতি ও বুদ্ধিমত্তার খেল দেখানো হয়েছে তাতে আমি মুগ্ধ হয়েছি। একটা দুটো কাকতালীয় ব্যাপার স্যাপার যে ছিল না, তা বলব না। তবে গল্পের খাতিরে অতোটুকু তো মেনে নিতেই হয়। পোস্টার সাঁটানো, গোপন চিঠি পাঠানো কিংবা বিভিন্ন তল্লাশি ও জেরা বুদ্ধিমত্তার সাথে পাশ কাটানো; এসব সিকুয়েন্সগুলো যথেষ্ট উত্তেজনাকর ছিল। তেল আবিবের পাশাপাশি, ফিলি*স্তিনেরও কিছু অংশ রেখেছেন লেখক। রায়হানের গোপন মিশনের উত্তেজনার জায়গায় এই অংশে রয়েছে নির্যাতিত ও নিপীড়িত ফিলি*স্তিনিদের জীবনযাত্রার বর্ণনা। যদিও তা বেশ স্বল্প পরিমাণে। এই অংশের মূল ফোকাস ছিল আবু সালেম ও তার কথিত কন্যা সারার মাঝে তৈরি হওয়া বন্ডিং।
যুদ্ধ ও প্রেমের গল্প
শুরুর অর্ধেকে একটু ধীর, কিন্তু মসৃন গতিতে এগিয়ে চলা গল্পের গতি বেড়ে যায় যখন বোলতার গুঞ্জন কামড়ে পরিণত হয়! বইয়ের শেষ অংশটুকু তাই আদর্শ থ্রিলারের মতোই টানটান উত্তেজনা, ঘাত প্রতিঘাত ও টুইস্ট দিয়ে ভরা। অনেকটা যাকে বলে আনপুটডাউনেবল হয়ে যায়। আবু সালেমকে মুক্ত করার পুরো পর্বটুকুই লেখক সাজিয়েছেন কার চেস, বন্দুকযুদ্ধ, বুদ্ধিমত্তা ও স্যাক্রিফাইস দিয়ে। আর শেষে রয়েছে একটা মন ভালো করার মতো চমক। যে গল্প শুরু হয়েছিল স্পাই থ্রিলার হিসেবে, সেটাই এক পর্যায়ে পরিণত হয় প্রেমের আখ্যানে। তবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে প্রেমটাই গল্পের মূল উপজিব্য ছিল। যদিও ভালোবাসা নামক মানবিক অনুভূতির অংশগুলো ব্যক্তিগতভাবে আমার বেশি ভালো লেগেছে। বিয়োগান্তক অংশ পড়বার সময়ে কিছুটা মন খারাপও হয়েছে। আর এসবের ক্রেডিট দিতে হয় লেখক অয়ন ইসলামকে। নতুন লেখক হিসেবে যতটা ভালো করা সম্ভব ততটাই করেছেন তিনি। বর্ণণা ও সংলাপের মাঝে রেখেছেন যথাযথ সামঞ্জস্যতা। সংলাপ ছিল পরিস্থিতির সাথে মানানসই। অহেতুক অতি নাটকীয়তা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলেছেন। বেশিরভাগ নতুন লেখক এসব জায়গাতেই তালগোল পাকিয়ে ফেলেন সাধারণত। ভাষাশৈলিও ভালো ছিল। হয়তো আরও অনেক পোড় খাওয়া লেখকদের সাথে কম্পেয়ার করা যাবে না। তবে পড়তে মন্দ লাগেনি আমার। চরিত্রায়ন ছিল দূর্দান্ত। বেশ ভালো কাজ দেখিয়েছেন তিনি এই জায়গাটিতে। প্রতিটা চরিত্রই কোনো না কোনোভাবে মনে দাগ কেটে যাবে।
ব্যক্তিগত রেটিং: ০৮/১০ (ধুন্ধুমার একশন সমৃদ্ধ স্পাই থ্রিলার হিসেবে নয়, একটা গোপন মিশন কীভাবে বিল্ডআপ করে এবং ধীরে ধীরে একটা আকার নেয় সেটা পড়তে চাইলে এই বইটা চমৎকার লাগার কথা সবার। পাশাপাশি ইমোশন ও মানবিক অংশগুলোও ভালো লেগেছে। কিছু নাটকীয়তা বা কাকতালীয় অংশ থাকলেও, মোটাদাগে বইটা যতটা সম্ভব বাস্তবতার কাছাকাছি ছিল)
দারুণ একটা থ্রিলার! টান টান উত্তেজনা! এক বসায় পড়ে শেষ করলাম। কাহিনির বিল্ড আপ থেকে শুরু ক্লাইম্যাক্স, সবকিছুই দারুণ লেগেছে। বইটার পরবর্তী সিক্যুয়াল প্রকাশিত হওয়ার দাবি রাখে।
১৯৮৮ সালের মধ্যপ্রাচ্য। অবরুদ্ধ এক ভূখণ্ডে মুক্তিকামী মানুষের প্রতিবাদ রূপ নিয়েছে ই-ন্তি/ফা-দা আন্দোলনে। আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা আবু সালেম আত্মগোপনে আছেন শাতি ক্যাম্পে। তাকে খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে হি-জ-রে-লি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মাসুদ’ (আসল নাম বুঝে নেন)। এমনই উত্তপ্ত সময়ে মিশরীয় ইন্টেলিজেন্সের বিশেষ অনুরোধে এক গোপন মিশন নিয়ে হিজ-রেলের প্রাণকেন্দ্র প্রবেশ করল বাংলাদেশ আর্মি ইন্টেলিজেন্সের চৌকষ অফিসার মেজর রায়হান রাশীদ।
এখানে অনেক পাঠকের ভ্রু কুঁচকে উঠতে পারে। মিশরীয় ইন্টেলিজেন্সের মিশনে বাংলাদেশের অফিসার কেন? যৌক্তিক প্রশ্ন। তবে লেখক এটার একটা ব্যাখা দিয়েছেন, যেটা যথেষ্টই গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে আমার কাছে। যাই হোক, গল্পে ফিরি।
মেজর রায়হান রাশীদের মিশন হচ্ছে, শত্রুভূমিতে অতি গোপনে এমন কিছু ‘ছোট ছোট’ কাজ করা যার ইম্প্যাক্ট হবে ব্যাপক। অনেকটা বাটারফ্লাই এফেক্ট বা প্রজাপ্রতি প্রতিক্রিয়ার মতো। তবে এখানে একটা না, অনেকগুলো প্রজাপতি ডানা ঝাপটাবে। মেজর রায়হান রাশীদের লক্ষ্য সরাসরি শত্রুর বুকে আঘাত হানা নয়, বরং এমন এক অদৃশ্য চাপ তৈরি করা, যাতে হিজ-রেলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মাসুদ’-এর মাথার ঘায়ে কুত্তাপাগল অবস্থা হয়ে যায়। মরীচিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে তাদের রিসোর্সের বড় একটা অংশ অকুপাইড হয়ে যায়। আর এই সুযোগে মিশনের মূল উদ্দেশ্য হাসিল করা হবে।
গল্পের এই পর্যায় পর্যন্ত মূলত বিল্ডআপ। অনেকটা ধীরলয়ের ক্লাসিক্যাল সংগীতের মতো। আর এই অংশ যদি ক্লাসিক্যাল সংগীত হয়, তাহলে বইয়ের পরের অংশটা নিঃসন্দেহে হার্ড রক। আর শেষটা যেন মাথা আউলানো হেভি মেটাল। কার চেজ, হেলিকপ্টার চেজ, সারফেস টু এয়ার স্ট্রাইক, এয়ার টু সারফেস স্ট্রাইক, ট্যুইস্টের পর ট্যুইস্ট, বিশ্বাসঘাতকতা আর আত্মত্যাগ। মোটকথা, একটা আদর্শ জিওপলিটিক্যাল থ্রিলারে যা যা থাকার দরকার, তার সবই আছে। হ্যাঁ, রোমান্সও আছে। পরিমিত মাত্রায়।
মূল চরিত্র রায়হান রাশীদের পাশাপাশি অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চরিত্র হচ্ছে - পাইলট অনুপম, শত্রুভূমিতে রায়হান রাশীদের কন্ট্যাক্ট ফয়সল, আবু সালেমের পালিতা কন্যা সারা আসফা, হিজ-রেলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মাসুদ’ এর ডিপ কাভার এজেন্ট র্যাচেল, এবং রহস্যময় চরিত্র ‘ফারাও’। প্রত্যেকটা চরিত্রই কমবেশি ডানা মেলার সুযোগ পেয়েছে। বুদ্ধির খেলা আর অ্যাকশন সিকোয়েন্সেরর ফাঁকে ফাঁকে লেখক নিপুণ ভাবে চরিত্রগুলোর মাঝে আবেগ ও মানবিকতার জাল বুনেছেন। বিশেষ করে চরিত্রগুলোর ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আর শেষের দিকে যেভাবে ইমোশনের সঙ্গে অ্যাকশনের ব্লেন্ড করেছেন সেটা এক কথায় অনবদ্য। ফলে বইয়ের শেষে অ্যাকশন, ট্যুইস্ট, ট্র্যাজেডি, স্যাটিসফেকশন - সবকিছু ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছে মানবিক সম্পর্কের দিকটাই।
হ্যাঁ, কিছু ব্যাপার তো অবশ্যই আছে। কাকতালীয় ঘটনা আছে, ভাগ্যের ছোয়া আছে, হয়তো কিছুটা মেলোড্রামাও আছে। কিন্তু গল্প-উপন্যাস-মুভিতে তো এগুলো থাকেই। কিছু জিনিস অন্যরকম হলে হয়তো আরেকটু ভালো হতো (আমার কাছে)। কিন্তু ভালোর তো কোনো শেষ নাই, আর সবার তো একই জিনিস পছন্দ না।
প্রচ্ছদটা কাহিনির সঙ্গে পারফেক্টলি মানিয়ে গেছে। প্রোডাকশন কোয়ালিটি এক কথায় টপনচ।
বইটা পড়ার সময় অনেকবারই মাসুদ রানা সিরিজের পুরনো সেই মধ্যপ্রাচ্য মিশনগুলোর কথা মনে পড়ে গেছে। কায়রো, মৃত্যুপ্রহর, রাত্রি অন্ধকার। তবে সবচেয়ে বেশি মনে পড়েছে ‘সংকেত’ (কেন ফলেটের ‘দ্য কী টু রেবেকা’র এডাপ্টেশন)’ বইটার কথা। রোপা ইরিনা সহ নানাবিধ কারণে বইটা আমার অতিপ্রিয়। কয়েকঘন্টার জন্য সেই দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য লেখকের একটা ধন্যবাদ পাপ্য।
এমনিতে বাংলাভাষায় মৌলিক স্পাইথ্রিলারের সংখ্যা বেশ কম, আর মানসম্মত স্পাইথ্রিলারের সংখ্যা তো হাতে গোণা। অয়ন ইসলামের ‘অন্তর্ঘাত’ সেই ছোট্ট তালিকাটাক আরেকটু লম্বা করবে নিঃসন্দেহে। থ্রিলার প্রেমী, বিশেষ করে স্পাই থ্রিলার প্রেমীদের জন্য হাইলি রেকমেন্ডেড।
বই : অন্তর্ঘাত লেখক: অয়ন ইসলাম প্রচ্ছদ: পরাগ ওয়াহিদ প্রকাশনী: ঋদ্ধ প্রকাশ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৭২ মূদ্রিত মূল্য: ৫০০ টাকা ব্যক্তিগত রেটিং : ৮/১০