প্রায় আশি বছর আগে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন ইরতাজ চৌধুরি, ধ্রুবর দাদা। বছর চারেক পর আবার ফিরেও আসেন, সাথে একটা বাক্স। কিন্তু বাক্সটার কোনো চাবি নেই। খোলার কোনো উপায়ও নেই। কোথা থেকে এল বাক্সটা, কী আছে এর ভেতরে-- কোনো কিছুরই উত্তর দিয়ে যাননি ইরতাজ চৌধুরি। একদিন হুট করেই চাবিটা যেন পায়ে হেঁটে এসে ধরা দেয় ধ্রুব চৌধুরির হাতে।সেদিন থেকেই বেপরোয়া কিছু দুর্ধর্ষ মানুষের আনাগোনা শুরু হয় ধ্রুবর জীবনে। না চাইতেও সে জড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত রহস্যের বেড়াজালে। কিন্তু ওর কোনো ধারণাই নেই যে রহস্যটা কতটা গভীর, জটিল এবং অবিশ্বাস্য!ধ্রুব কি পারবে সম্রাট অশোকের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে?কেনই বা ওর পিছে লেগে আছে হাজার বছরের পুরনো গুপ্তসঙ্ঘ-- দি আর্কিটেক্টস?
অ্যান্টিক শপের বর্তমান মালিক ধ্রুব-এর দাদা বহু বছর আগে একটা বাক্স নিয়ে এসেছিলেন কোথা থেকে যেন। বাক্সটা খোলার কোনো চাবি না থাকলেও, বংশ পরম্পরায় সেটা রয়ে গেছে ধ্রুবদের পরিবারে। একদিন নিতান্তই কাকতালীয় ভাবে বাক্সের চাবি হাতে পেয়ে গেল ধ্রুব। কিন্তু এরপরেই ওদের জীবন আর স্বাভাবিক রইল না। একের পর এক আক্রমণের শিকার হতে হলো ওদেরকে। সবাই বাক্সটার পেছনে লেগেছে। জেদ চেপে গেল ধ্রুব'র। বাক্সের রহস্য সে উদঘাটন করেই ছাড়বে। আর সেটা করতে গিয়ে বন্ধু অরণ্যকে সাথে নিয়ে ঘুরে আসতে হলো ইতিহাসের অনেক পেছন থেকে।
লেখক পরিচিতি
রিভিউতে কখনোই যেই কাজটা করি না, এবার সেটাই করতে হচ্ছে। কারণ মাহমুদুস সোবহান খান নামটা বইপাড়ায় বিস্মৃতপ্রায় হয়ে গেছে। এখন অনেক পাঠক চেনেই না কে এই লেখক! তবে আমরা যারা লেখকের "দ্য মাস্টারপ্ল্যান" ও "পাপেটমাস্টারস" বই দুটো পড়েছি। তারা বেশ ভালো করেই জানি, ইতিহাসের বিভিন্ন কন্সপিরেসি থিয়োরি নিয়ে দূর্দান্ত গতিশীল স্পাই থ্রিলার বই লেখার ক্ষেত্রে উনি কতটা পটু। বিশেষ করে পাপেটমাস্টারস বইটা বেশ ভালো ছিল। তো ভদ্রলোক দীর্ঘদিন পর আবার লেখালিখিতে ফিরলেন। তবে এবার আগের দুই বইয়ের চেনা চরিত্র নীল রিশাদকে নিয়ে নয়, নতুন চরিত্র নিয়ে নতুন আঙ্গিকে গল্প সাজিয়েছেন। এবারের গল্পটাকে ঠিক স্পাই থ্রিলার না, অনেকটা আর্কিওলজিক্যাল অ্যাডভেঞ্চার বলা যায়।
দি আর্কিটেক্টসের ভালো লাগার দিক
প্রথমেই বলতে হয় বইটা সুখপাঠ্য। মানে, আপনি পড়তে শুরু করলে কোথাও কোনো বিরক্তি ছাড়াই একটানা পড়ে যেতে পারবেন। গতিশীল গল্প, ক্রমাগত কিছু না কিছু ঘটে চলেছে। সত্যি কথা বলতে কী, আগের দুই বইয়ের প্রায় কিছুই এখন আর আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে বইগুলো ভালো লেগেছিল। তাই তূলনা করে বলতে পারছি না লেখকের লিখনশৈলী আগের চেয়ে আরও ভালো হলো নাকি রয়ে গেছে আগের জায়গাতেই।
এমনিতে এই বইয়ের গল্পটা ভালো। অন্তত যেভাবে শুরু হয়েছে আর যেভাবে এগিয়েছে তা যথাযথ লেগেছে আমার কাছে। প্রথমে সম্রাট অশোকের ছোট্ট একটা অংশ দিয়ে শুরু। এরপর বর্তমান টাইমলাইনে ধ্রুবকে দিয়ে সরাসরি ঘটনাপ্রবাহের সূচনা। ধ্রুব-এর পেছনে দুটো পক্ষ সারাক্ষণই লেগে থাকে। এই দুই পক্ষ কে বা কারা এসব রহস্যের সাথে যুক্ত হয় বাক্স নিয়ে নানা রকমের জিজ্ঞাসা। বাক্সের ভেতরে পাওয়া চিরকুটগুলোর রহস্য উদ্ধার করতে গিয়ে লেখক ঘুরিয়ে এনেছেন, বাংলাদেশে থাকা ইহুদিদের ইতিহাসের অংশ আর ব্রিটিশ শাসনামলের উপমহাদেশের কিছু অংশে।
ধ্রুবদের যাকে বলে, "প্রতি পদে পদে রয়েছে বিপদ" টাইপ সিচুয়েশন ছিল পুরো বই জুড়েই। এর পাশাপাশি পুলিশের গোয়েন্দা চরিত্র হিসেবে আগত মফিজ চরিত্রের কর্মকাণ্ডও বেশ ভালো লেগেছে। পুলিশি তদন্তের অংশটুকু এই বইয়ে বেশ সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। তবে বইটার সবচেয়ে ভালো লাগার জায়গা বোধকরি চাল পাল্টা চালের অংশগুলো। শত্রুপক্ষে এক ধরণের প্ল্যান করে, তো ধ্রুবরা করে আরেক প্ল্যান। এক ধাপে মনে হয় শত্রুপক্ষ জিতে গিয়েছে, তো আরেক ধাপে এসে মনে হয় ধ্রুবরাই বরং ওদের বোকা বানিয়েছে। পুরো বই জুড়ে থাকা এই ইঁদুর বেড়াল খেলাটা বেশ ভালো লেগেছে।
দি আর্কিটেক্টসের যেখানে সমস্যা
বইটার সবচেয়ে দূর্বল জায়গা হলো, যেই ঘটনা থেকে গল্পের শুরু সেটারই কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া বইয়ের শেষ টেনে দেওয়া। আমি জানি না লেখকের কোনো সিক্যুয়েল লেখার প্ল্যান আছে কিনা (একদম শেষে এসে মনে হয়েছে লিখলেও লিখতে পারেন)। তবে যদি উনি সিক্যুয়েল লিখেন, তাহলে উনার অবশ্যই উচিত হবে ধ্রুব'র দাদা কীভাবে জানলেন বাক্সটার কথা, কী কারণে আর কীভাবে বাক্সটা দি আর্কিটেক্টসের কাছ থেকে চুরি করেছিলেন সেই ব্যাপারে বিস্তারিত ব্যাখ্য প্রদান করা। এমনকি এই ঘটনাটা দিয়ে আরেকটা সিক্যুয়েল লেখার প্লটও তৈরি করা সম্ভব।
তবে এই বইতে যেহেতু সেই ব্যাখ্যাটা ছিল না, তাই সেটা আমার দিক থেকে বইয়ের নেগেটিভ পয়েন্ট। এছাড়াও মহিম কাউন্সিলের একজন বেঈমানি করে আসছে যুগ যুগ ধরে। কিন্তু সেই বেঈমানীর কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হলো না। এভাবে একের পর এক মহিমকে বেঈমান হিসেবে নিয়োগ করার পেছনে জোরালো কোনো কারণ তো থাকা উচিত ছিল নাকী? ইয়াকুব চরিত্রের যে ক্ষমতা উল্লেখ করা হয়েছে, সে তুলনায় খুব সহজেই তাকে বোকা বানানো গেছে; এটাও আসলে ভালো লাগেনি। কারণ ধ্রুবরা তো আর নীল রিশাদের মতো এজেন্ট ছিল না, ওরা ছিল সাধারণ মানুষ। যদিও ধ্রুব'র ব্যাকস্টোরির মাধ্যমে কিছুটা হলেও আইডিয়া দেওয়া হয়েছিল যে সে গড়পড়তা বাঙালির চেয়ে বুদ্ধিমান। তবুও হাইলি ট্রেইনড একজন বিদেশী এজেন্টের সাথে পাল্লা দেওয়ার ব্যাপারটা আরও খানিকটা কঠিন করলে ভালো হতো মনে হয়েছে। এছাড়া মহিম কাউন্সিলের সাথে উপমহাদেশে থাকা ইহুদিদের সম্পর্কটাও পুরোপুরি ক্লিয়ার ছিল না।
ব্যক্তিগত রেটিং: ০৭/১০ (লেখকের আগের দুই বইয়ের তুলনায় এই বইতে ইতিহাসের কন্সপিরেসি থিয়োরি কিছুটা কম ছিল, মিস করেছি ব্যাপারটা।আগের দুই বইয়ের চেয়ে ভালো লাগার দিক থেকে খানিকটা পিছিয়েই থাকবে হয়তো এই বইটা। কিংবা এমনও হতে পারে, পাঠক হিসেবে অভিজ্ঞতা বাড়ার কারণে এই খুঁতগুলো নজরে পড়েছে। তবে শেষের কিছু চমক আর একটা ঘটনাবহুল গল্প হিসেবে উৎরে যাবে বইটা আমার কাছে। এটা ওই ধরণের বই যা পড়ার পর মনে হয়, It's Good, But it could have been better!!)
পুরনো ঢাকায় অ্যান্টিক দোকান, একটা রহস্যময় বাক্স, তার বেশ কয়েকটা চাবি, বাঙাল মুলুকে ইহুদী জাতির ইতিহাস, সম্রাট অশোক; এ সব মিলিয়ে গুপ্তধনের যে দিকটাতে নজর যায় সেটা এখনো গেস করতে না পারলে আপনার নেক্সট TBR লিস্টে যে বইটার নাম রাখতে পারেন সেটা হলো, 'দি আর্কিটেক্টস'। গেস করতে পারলেও পড়ার লিস্টে রাখেন। কেন রাখবেন সেটা নিয়ে অল্প কথায় বলি।
প্রথমত, বইটা মাহমুদুস সোবাহান খানের লেখা। বাংলা মৌলিক থ্রিলারের খোঁজ খবর যারা রাখেন তারা সম্ভবত বেশিরভাগই আমার সাথে একমত হবেন যে, তিনি মোস্ট আন্ডাররেটেড ভালো লেখকদের একজন। তিনি যে ভালো লেখেন তা প্রমাণ করেছেন 'দ্য মাস্টারপ্ল্যান' আর 'পাপেটমাস্টারস' এ-ই। তার লেখাতে মেদ একদমই ছিলো না আগে। এ ব্যাপারটা থ্রিলারে ভালো হলেও আমার মনে হয় একটু মেদ থাকলে খারাপ হয় না। সে আশাটা পূরণ হয়েছে 'দি আর্কিটেক্টস' এ। এবারের লেখাটা একটু ডিটেইলড।
দ্বিতীয়ত, বইটা দারুণ ফাস্ট পেসড এবং পেজ টার্নার। শুরু করার ৫-৭ মিনিটের মাঝেই আপনি হুকড হয়ে যাবেন। ধ্রুব, ধ্রুবর ফ্রেন্ড অরণ্য, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ, আর্কিটেক্টস আর একটা গ্রুপ্ত শত্রু মিলে এ রেসটা শুরু হয় তাতে আপনি এক বসায় ২২৪ পেজের বইটা শেষ করে উঠলেও আমি অবাক হবো না। তবে ফাস্ট পেসড হলেও লেখক ক্যারেক্টারগুলোকে বেশ যত্ন করে ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরি দিয়ে টিয়ে তৈরী করেছেন। বেশ কিছু ইতিহাস, কন্সপিরেসী থিওরি পাঠকের মাথায় দিয়েছেন লেখক, যেটা চমৎকার একটা কাজ।
ব্যস এ দুটাই কারণ বইটা পড়ার জন্য। তৃতীয় একটা কারণ হতে পারে বইটার প্রোডাকশন ভালো। অবশ্য শিরোনাম প্রকাশন থেকে যা বই আসে সেগুলো সব ভালো প্রোডাকশনের বইই হয়, এটা নতুন কিছু না। তবে বইয়ের প্রোডাকশন কেন প্লাস পয়েন্ট এইটা আমি এখনও বুঝি না, থ্রিলারের ক্ষেত্রে তো আরো বুঝি না। এছাড়া ২২৪ পেজের বই হিসাবে ৩০০ টাকার আশেপাশে কিনতে পাওয়াটাকে হিসাব করলে অবশ্যই একটা প্লাস পয়েন্ট।
ইরতাজ চৌধুরী এই গ্যাঞ্জামে কেমন জড়ায়ে পড়লো সেই ব্যাপারে একটা প্রশ্ন অবশ্য রয়ে গেছে। এছাড়া আর একটা ড্রব্যাকই লাগছে আমার কাছে সেইটা হইলো, মূল চরিত্র বেশি শক্তিশালী হওয়াটা, বেশি স্মার্ট হওয়াটা। এইটা অবশ্য এই বইয়ের ক্ষেত্রে না, সব বইয়ের ক্ষেত্রেই আমার লাগে। মূল চরিত্র হইবো হ্যারি ড্রেসডেনের মতো। লাস্টে জেতার আগেও ওরে ভর্তা বানায়ে দিবে সব অ্যান্টাগনিস্ট মিলা, তাইলেই না জমে।
যাইহোক, চার মাস আগে প্রকাশ পাওয়া এই বইটা নিয়া কেন আলাপ নাই কে জানে। এক লিংকন ভাইকেই দেখলাম বইটা নিয়া কথা বলতে। অ্যাকশান, কন্সপিরেসী থ্রিলার, গুপ্তধন এই কি-ওয়ার্ড গুলারে হিসাব করলে এই বইটা ভালো জনপ্রিয়তা পাওয়ার কথা। বেচারা লেখকের কপাল থেকে কবে যে আন্ডাররেটেডের এর তকমাটা মুছবে কে জানে। তবে আপনারা যারা থ্রিলার লাভার, তারা চাইলে বইটা পড়তে পারেন। সময়টা খারাপ কাটবে না একদমই।
বাংলাদেশের প্রথম অ্যান্টিক শপের কর্ণধার ধ্রুব চৌধুরি। পুরান ঢাকার নামকরা চৌধুরি পরিবারের এই সন্তান দেশ ও বিদেশের অনেক অ্যান্টিক কালেক্টরের কাছে সুপরিচিত। একদিন ধ্রুবর কাছে অনেকটা হেঁটে হেঁটেই যেন চলে আসে মূল্যবান পাথরের তৈরি একটা চাবি। আর এই চাবিটা আসার পরপরই সম্পূর্ণরূপে বদলে যায় ধ্রুবর জীবন। সোনালী ব্যাংকের ভল্ট থেকে বহু প্রাচীন একটা বাক্স বের করে আনতে গিয়ে হামলার সম্মুখীন হয় ধ্রুব ও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু অরণ্য। অত্যন্ত অবাক হয়ে তারা লক্ষ্য করে, একাধিক রহস্যময় গোষ্ঠী একদম পেছনে পড়ে গেছে ওদের।
ধ্রুব চৌধুরির দাদা ইরতাজুদ্দিন চৌধুরি হারিয়ে গিয়েছিলেন বহু বছর আগে। তারপর অবশ্য তিনি ফিরেও এসেছিলেন। সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন সেই রহস্যময় প্রাচীন বাক্সটা, যেটার সম্পর্কে ইরতাজুদ্দিন চৌধুরি কাউকেই কোনকিছু জানাননি। এতোগুলো বছর পর সেই বাক্সটা হস্তগত করতেই যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে কিছু মানুষ। বাক্সটা হাতে পাওয়ার জন্য রক্ত আর লাশের বন্যা বইয়ে দিতেও যাদের মধ্যে কোন দ্বিধা নেই। পৃথিবীর অন্যতম শক্তিধর এক দেশের সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট ইয়াকুবও সেই একই লক্ষ্যে পা রেখেছে বাংলাদেশের বুকে। আর এজেন্ট ইয়াকুবকে সাহায্য করছে তাদের এই দেশের স্লিপার এজেন্ট মিরাজ।
বিখ্যাত মৌর্য সম্রাট অশোকের রেখে যাওয়া এক সুপ্রাচীন রহস্যকে সবসময়ই রক্ষণাবেক্ষণ করে এসেছে দি আর্কিটেক্টস নামের গুপ্তসঙ্ঘের সদস্যরা। হাজার হাজার বছরের প্রাচীন এই গুপ্তসঙ্ঘের সদস্যরাও লেগে আছে ধ্রুব আর অরণ্যের পেছনে। কারণ একটাই, সেই প্রাচীন বাক্স আর সেটার তিনটা চাবি। এজেন্ট ইয়াকুব, স্লিপার এজেন্ট মিরাজ আর দি আর্কিটেক্টস সদস্যরা যখন ধ্রুব আর অরণ্যের পেছনে ছুটছে, ঠিক তখনই রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ঘটে গেলো বেশ কয়েকটা রহস্যময় খুনের ঘটনা। পুরো ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবেই পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফেললো।
স্পেশাল ব্রাঞ্চের তুখোড় অফিসার মোফাজ্জল হায়দার ওরফে মফিজ সাহেবও তৎপর হয়ে উঠলেন আসলে কি ঘটছে সেটা জানার জন্য। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও এই কেসে এসে জুটলেন মদনমোহন কর্মকার নামের এক গোয়েন্দা। প্রাচীন এই বাক্স রহস্যের সাথে জুড়ে গেলেন দেশের নামকরা এক বিজনেস টাইকুন পর্যন্ত। চলতে থাকলো ধ্রুব আর অরণ্যের প্রাচীন বাক্স আর সেটাএ চাবি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ, একইসাথে ওদের পেছনে লেজুড়ের মতো লেগে রইলো এজেন্ট ইয়াকুব আর দি আর্কিটেক্টস। শেষমেশ কি সমাধান হবে প্রাচীন এই বাক্স রহস্যের? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, কে হাসবে শেষ হাসি?
মাহমুদুস সোবহান খানের লেখা আমি এর আগে পড়িনি। ২০২৬-এর বইমেলায় যখন তাঁর 'দি আর্কিটেক্টস' প্রকাশিত হয়, তখন আমি বইটার প্রতি আগ্রহী হই। মূলত ওই সময় বইটার ব্যাককভারের লেখাগুলো পড়েই আমার ভেতরে বইটা পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। অবশেষে 'দি আর্কিটেক্টস' পড়ে শেষ করার মাধ্যমে সেই আগ্রহ নিবৃত্ত করতে পারলাম। বইটার কাহিনির মূল থিম ট্রেজার হান্ট, মিস্ট্রি আর সাসপেন্স থ্রিলার কেন্দ্রিক। মৌর্য সম্রাট অশোকের রেখে যাওয়া এক প্রাচীন রহস্যময় বাক্স, সেটাকে লুকিয়ে রাখতে চাওয়া এক প্রাচীন গুপ্তসঙ্ঘ, বাক্সটাকে হাতে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠা এক ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি আর এসবের সাথে জড়িয়ে পড়া ধ্রুব আর অরণ্য নামের দুই বাংলাদেশি তরুণের গল্প 'দি আর্কিটেক্টস'।
'দি আর্কিটেক্টস' পড়ার আগেও আমি বেশ কিছু ট্রেজার হান্ট থ্রিলার পড়েছি, যেগুলোর কাহিনি আবর্তিত হয়েছে সম্রাট অশোক, গুপ্তসঙ্ঘ আর লুকায়িত প্রাচীন কোন গুপ্তধন উদ্ধারের মতো ব্যাপারগুলোকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এই বইটা একটা দিক দিয়ে বেশ আলাদা লেগেছে আমার কাছে। এখানে লেখক মাহমুদুস সোবহান খান বেশ বিস্তারিতভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসকারী ইহুদিদের সম্পর্কে অনেক তথ্য দিয়েছেন। ঐতিহাসিক এই তথ্যগুলোতে উঠে এসেছে আধুনিক বাংলাদেশ ও তৎকালীন অখণ্ড ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাবসা-বানিজ্যের জন্য এসে বসতি স্থাপন করা বেশ কিছু ইহুদি পরিবারের কথা। এই উপমহাদেশে বসবাসকারী তৎকালীন ইহুদিদের মধ্যেকার নানা জাতিভেদ নিয়েও মাহমুদুস সোবহান খান ইন্টারেস্টিং কিছু তথ্য দিয়েছেন। 'দি আর্কিটেক্টস'-এর এই অংশগুলো যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং লেগেছে আমার কাছে।
সম্রাট অশোকের রেখে যাওয়া এক প্রাচীন রহস্যকে ঘিরে আবর্তিত হওয়া এই কাহিনির ফার্স্ট হাফ একটু স্লো মনে হয়েছে আমার কাছে। সেকেন্ড হাফে গিয়ে কাহিনি কিছুটা গতিময়তা লাভ করলেও মাঝেমাঝেই আবার ধীর হয়ে গেছে। নার্ভ গ্যাস সহ নানা হাইটেক টেকনোলজির ব্যবহার দেখিয়েছেন এখানে লেখক। এই ব্যাপারগুলো শুরুর দিকে উপভোগ করলেও পরবর্তীতে একটু অতিরিক্তই মনে হয়েছে আমার। এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের পেছনে লেগে আছে। সেখানে শুধু ট্র্যাকিং আর ট্র্যাকিং। এসবের মধ্যেই মাহমুদুস সোবহান খান মাঝেমাঝে পাঠককে অবাক করে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে সেই চেষ্টাগুলো আমার ক্ষেত্রে খুব একটা কাজে আসেনি। বরং এই ট্র্যাকিং ট্র্যাকিং খেলা মাঝেমাঝেই আমাকে বেশ বিরক্ত করেছে। দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে চলা ইঁদুর-বিড়াল খেলা ভালো লাগে৷ কিন্তু সেটা মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলে আর ভালো লাগে না।
লেখক মাহমুদুস সোবহান খান 'দি আর্কিটেক্টস'-এ যে রহস্যময় বাক্সের কথা বলেছেন, সেটার ভেতরে আসলে কি রহস্য আছে সেটার সম্পর্কে সামান্য কিছুও যদি হিন্টস দিতেন কাহিনির মাঝে তাহলে একজন পাঠক হিসেবে আগ্রহটা খানিকটা বাড়তো। তিনি সেটা করেছেন, তবে একেবারে উপন্যাসের ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে। 'দি আর্কিটেক্টস'-এর শেষটা আরো ভালো হতে পারতো, আমার মতে। যে জিনিসটার জন্য এতো দৌড়ঝাঁপ, সেটাকে আরো খানিকটা আলোয় আনা যেতো বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। এই উপন্যাসের অনেক ব্যাপারই আমার কাছে একটু বেশিই সিনেম্যাটিক আর অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। তবে মাহমুদুস সোবহান খানের চমৎকার গল্প বলার গুণে সেগুলো মোটামুটিভাবে উৎরে গেছে।
মাহমুদুস সোবহান খান যদি এক অধ্যায়ে একাধিক সিকোয়েন্স না ঢুকিয়ে এক অধ্যায়ে শুধু একটা সিকোয়েন্সের বর্ণনা দিতেন, সেটা আরো বেশি ভালো হতো। এক অধ্যায়ে একাধিক সিকোয়েন্স আনার কারণে মাঝেমাঝেই কনসেনট্রেশন টুটে গেছে আমার। মাহমুদুস সোবহান খানের ভেতরে সম্ভাবনা আছে। লেখকের লেখার ধরণ চমৎকার। তাঁর প্লট সিলেকশনও ভালো। কিন্তু বেশ কিছু উন্নতির জায়গা তাঁর এখনও আছে। এখন যদি আমাকে প্রশ্ন করা হয় 'দি আর্কিটেক্টস' আমার কাছে ওভারঅল কেমন লেগেছে, আমার উত্তর হবে - ওয়ান টাইম রিড হিসেবে বইটাকে চালিয়ে নেয়া যায়। ট্রেজার হান্ট, প্রাচীন ইতিহাস আর এসপিওনাজ থ্রিলারের ব্লেন্ডে কিছু পড়তে চাইলে 'দি আর্কিটেক্টস' ট্রাই করে দেখতে পারেন।
বইটার সম্পাদনা ভালো হয়েছে। দুই-তিনটা ছোটখাটো ভুলভ্রান্তি ছাড়া মেজর কোন ভুল পাইনি। সজল চৌধুরীর করা প্রচ্ছদটা 'ঠিকঠাক' টাইপ লেগেছে। উনার আরো ভালো কাজ অতীতে দেখেছি৷ সেসবের তুলনায় 'দি আর্কিটেক্টস'-এর প্রচ্ছদটা একটু বেশিই সাদামাটা মনে হয়েছে আমার কাছে। বইটার প্রোডাকশন কোয়ালিটি বেশ ভালো ছিলো।
৪ দিনের মধ্যেই শেষ পড়ে শেষ করলাম। (অনেকে হয়তো একদিনই শেষ করে দিবে। )
224 পেজের বই। কোনো প্রকার বোরিং লাগে নাই। গল্পের প্লট টা বেশ ইউনিক। ফার্স্ট পেসড।
ফার্স্ট টাইম কোনো বাংলা মৌলিক থ্রিলার পড়লাম এবং হতাশ হয় নি। অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা পেলাম।
তবে এন্ডিং টা তেমন পছন্দের হয় নি। লাস্ট এ যেটা পাওয়া যায় না পাওয়া গেলেই খুশি হতাম। যদিও এইটা ফিকশন তবুও। শেষের দিকে একটু গুলিয়ে যাচ্ছিল ঘটনা গুলো যদিও। মোফাজ্জল হায়দার চরিত্রকে বেশ ভালো লেগেছে।
এই ধরণের গল্পের মেইন প্রটাগনিস্ট অর্থাৎ ধ্রুবকে প্রটাগনিস্ট হিসেবে মন জয় করতে পারলো না।
গল্পে কয়েক জায়গায় গালি ব্যবহার করা হয়েছে যেইটা আমরা সবাই কম বেশি বলি। হয়তো নরমাল কিন্তু আমার কাছে ভালো লাগে নি।
বানানে কয়েক জায়গায় সমস্যা রয়েছে যেমন সদ্ব্যবহার বানানটি। তাছাড়া তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য জিনিস নেই। এন্ডিং টা আরও ভালো আশা করেছিলাম।