● বিষাদ সিন্ধু বলতে কী বুঝায় —
বিষাদ সিন্ধু দুটি আলাদা আলাদা শব্দ। বিষাদ ও সিন্ধু। বিষাদ শব্দের অর্থ দুঃখ, বিষন্নতা, ভরাক্রান্ত ইত্যাদি। আবার সিন্ধু শব্দের অর্থ সাগর বা সমুদ্র।
সহজ কথায় বিষাদ সিন্ধু অর্থ দুঃখের সাগর বা দুঃখের সমুদ্র।
কিছু ওলামা এবং শিক্ষাবীদগন আবার বিষাদ সিন্ধুর ব্যাখ্যা করেছেন একটু ভিন্ন ভাবে। তারা বলেছেন : বিষাদ শব্দের অর্থ বিষে ভরা। আবার সিন্ধু হচ্ছে নদীর নাম। অর্থাৎ বিষে ভরা সিন্ধু নদীকেই বিষাদ সিন্ধু বলা হয়।
✰ বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসটি মূলত {হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)এর মেয়ে } হযরত ফাতিমা (রাঃ) এবং মুসলিম জাহানের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ) এর দুই ছেলে ইমাম হাসান (রাঃ) ও ইমান হোসেন (রাঃ) এর জীবন কাহিনী এবং সেইসাথে তাদের চরম শত্রু এজিদের পরাজয়ের কাহিনী নিয়ে লেখা।
● সংক্ষিপ্ত আলোচনা : —
হিজরি ৬১ সালে সংঘটিত কারবালা যুদ্ধের পূর্ব এবং পরের কাহিনী এই উপন্যাসের মূল বিষয়। উপন্যাসটি
৩ পর্বে বিভক্ত। যথা :
১. মহররম পর্ব
২. উদ্ধার পর্ব
৩. এজিদ - বধ পর্ব
এগুলো যথাক্রমে ১৮৮৫, ১৮৮৭ ও ১৮৯১ সালে তিন ভাগে প্রকাশীত হয়। যা পরবর্তীতে বিষাদ সিন্ধু নামক একটি সম্পূর্ণ বই আকারে বের হয়।
✰ নিচে তিনটি পর্বের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো,
১.মহররম পর্ব :
বিষাদ সিন্ধু বইয়ের প্রথম পর্বের নাম মহররম পর্ব। এখানে মোট ২৬ টি অধ্যায় রয়েছে।
➤ একদা মুহাম্মাদ (সাঃ) কিছু সাহাবীদেরকে নিয়ে আলোচনা সভা করছিলেন। তখন আল্লাহর তরফ থেকে জিবরাইল (আঃ) এসে নবীকে বলেলেন, সভায় থাকা মাবিয়া নামক এক সাহাবীর পুত্র দ্বারা আপনার জীবনের থেকেও অতি আদরের নাতি ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেন হত্যাকান্ডের স্বীকার
হবেন।
এ কথা শুনে মাবিয়া বললেন আমি কখনোই বিবাহ করব না। আমার সন্তানও জন্মিবে না।
কিন্তু সৃষ্টিকর্তার কথা যে বিফলে যায় না সেটাও জানিয়ে দিলেন মহানবী।
কয়েকদিন পর মাবিয়া ঘটনা ক্রমে বিবাহ করল এক বয়স্কা মহিলাকে। বিবাহের পরোই জন্ম নিল এক পুত্র সন্তান। নাম রাখলেন এজিদ।
এজিদ এই উপন্যাসের প্রধান কয়েকজন চরিত্রের মধ্যে একজন। এজিদ এমন একজন দানব যার অত্যাচার মদিনা জুরে কেউ সহ্য করতে পারেননি।
বিষাদ সিন্ধুতে এজিদ ইমাম হাসান (রাঃ) স্ত্রী জয়নাবকে লাভের তিব্র কামনাকে চিহ্নত করা হয়েছে। এজিদ চরিত্রে নিষ্ঠুরতম, নির্মমতা,দানবীয় পৈশাচিকতা ও অমানবিক আচরণ সবকিছুর ব্যাখ্যা ঐ জয়নাম প্রেম।
জয়নাবকে পাওয়ার আসায় এজিদ ইমান হাসান (রাঃ) কে মারার ফন্দি আাঁটলেন। এজিদ হাসানের মধ্যম স্ত্রী জায়েদাকে দিয়ে তার স্বামী হাসান (রাঃ) কে বিষ পান করিয়ে মৃত্যু বরণ করান।
এরপর এজিদ হোসেন (রাঃ) কেও শেষ করার জন্য কৌশলে তাকে তার পরিবার ও সৈন্যসহ কারবালার প্রান্তরে নিয়ে আসেন। সেখানে এজিদের সৈন্যরা হোসেন ও তার সাথীদের সাথে যে কারখানা করে বসেন তা ছিল খুবই হৃদয় বিদারক। কারবালার প্রান্তর বয়ে যায় রক্ত স্রতে। সেখানেই ইমাম হোসেনকে হত্যা করেন এজিদ সেনাপতি সিমার। ইমাম বংশে হোসেন পুত্র জয়নাল আবেদীন ছাড়া সেদিন আর কেউ বেচে রইল না।
২. উদ্ধার পর্ব :
বিষাদ সিন্ধু বইয়ের দ্বিতীয় পর্ব হলো উদ্ধার পর্���। এখানে মোট ৩০ টি অধ্যায় রয়েছে।
➤ কারবালার যুদ্ধ শেষ হবার পর এজিদ জয়নাল সহ,ইমাম বংশের সব মহিলাকে তারা গৃহবন্দী করে রাখেন।
উদ্ধার পর্বে উল্লেখ আছে, মহানবী (সাঃ) ভবিষ্যৎবানী করেছিলেন যে, মোহাম্মদ হানিফা এসে এজিদ গৃহে বন্দী ইমাম বংশীয় সকলকে উদ্ধার করবেন।
পরবর্তীতে মহানবী (সাঃ) এর বাণী সঠিক হিসেবে প্রমানিত হয়।
এই পর্বে ইমাম বংশীয়দের উদ্ধার করা হয় কীভাবে সে সব ইতিহাস ভালো ভাবে জানা যায়।
উদ্ধার কাজে হানিফা বাদে আরো কয়েকজন যোগ দিয়েছিল তারা হলেন : ওমর আলী, গাজী রহমান এবং জয়নাল আবেদীন সহ আরো অনেক নবী প্রেমী ভাইয়েরা।
৩. এজিদ - বধ পর্ব :
বিষাদ সিন্ধু বইয়ের শেষ পর্ব এটি। উপসংহারসহ মোট ৬ টি পর্ব রয়েছে এই অংশে।
➤ এ পর্বে এজিদের বিনাস, জয়নাল আবেদীনের দামেস্ক সিংহাসন লাভের ঘটনা খুব সুন্দর ভাবে
বর্নিত রয়েছে।
● ভালো লাগার মতো কিছু শিক্ষনীয় উক্তি : —
১. “প্রণয়, স্ত্রী, রাজা,ধন এই কয়েকটি বিষয়ের লোভ বড় ভয়ানক। এই লোভে লোকের ধর্ম,পুন্য,সাধুতা পবিত্রতা সমস্তই একেবারে সমূলে বিনাশ প্রাপ্ত হয়। ”
২.“বিনাশ করা অতি সহজ, রক্ষা করা বড়ই কঠিন"
৩.“কপাল মন্দ হইলে তাহার ফলাফল ফিরাইতে কাহারো সাধ্য নেই।"
৪.“সময়ে সকলেই সহ্য হয় কোন বিষয়ে অনভ্যাস থাকিলে বিপদকালে তাহা অভ্যস্ত হইয়া পরে,মহা
সুখের শরীরে মহা কষ্ট সহ্য হইয়া থাকে।"
৫.“কপাল মন্দ হইলে তাহার ফলাফল ফিরাইতে কাহারো সাধ্য নেই। "
৬.“যে আমার নয় আমি তাহার কেন হইব।"
৭.“বিশ্বাসী না হইলে নিরাপদের সুখ ভোগ করা যায় না ; দুঃখ ভোগ না করিলে সুখের স্বাধ পাওয়া যায় না।"
● লেখক এবং লেখকের লিখনশৈলী : —
বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের লেখক মীর মশাররফ হোসেন। তার ছদ্ম নাম গাজীমিয়াঁ। তিনি ১৩ নভেম্বর ১৮৪৭ সালে কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহন করেন। এবং ১৯ ডিসেম্বর ১৯১২ সালে নবাবপুর,বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তার জীবনে অনেক গ্রন্থ লিখে গেছেন। তার প্রকাশীত গ্রন্থ প্রায় ৩৬ টি।
মীর মশাররফ হোসেন এর বিষাদ সিন্ধু উপন্যাস দিয়ে তার বই পড়ার সূচনা হলো আমার। এটি একটি মহাকাব্যিক ও বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় ও প্রাচীনতম উপন্যাস।
লেখকের লিখনশৈলীর প্রশংসা অবশ্য কাম্য। সম্পূর্ণ উপন্যাসটিতে সাধু ভাষার ব্যবহার করেছেন তিনি।
উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ অবধি যে ভাবে গল্প এগিয়ে নিয়েছেন তিনি, তা বইটি পড়লে বুঝতে পাবেন। পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে খুব সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন সব কাহিনী গুলো।
তাছাড়া তার বইয়ের শব্দের ব্যবহারগুলো কিছু কিছু জায়গায় একটু জটিল করেছেন। সেজন্য পরামর্শ থাকলো,বইটি পড়ার সময় সাথে একটি বাংলা ডিকশোনারি রাখবেন। তাহলে পড়তে সুবিধা হবে।
● বানান : —
৩৫০ পৃষ্ঠার বই হওয়া সত্ত্বেও বইটিতে বানানের ভুল খুবই সামান্য। কিছু জায়গায় একটি শব্দের ভিতর থেকে অক্ষর হারিয়েছে। কিছু জায়গায় ডাবল শব্দ পর পর ব্যবহার হয়েছে। তবে, তাতে পড়তে কোনো অসুবিধা বোধ হয়নি।
● প্রচ্ছদ : —
বইটির প্রচ্ছদ নিয়ে আমি সন্দিহান। এই বইটি বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে ছাপানো হয়েছে। (সঠিক প্রকাশনীর নাম কারো জানা থাকলে কমেন্টে জানানোর অনুরোধ রইল)। তাই এর সঠিক প্রচ্ছদ কোনটি, সেইটা আমি নিজেও জানি না। তবে আমার সংগ্রহে যে প্রচ্ছদ নির্মিত বইটি আছে,সেটি আমার ব্যাক্তিগত ভাবে ভালো লাগেনি। অনলাইনে এই বইয়ের বাকী প্রচ্ছদ নির্মিত বইগুলোও দেখেছি। বইয়ের মান হিসেবে একটি প্রচ্ছদও আমার কাছে ভালো লাগেনি।
● মলাট • বাঁধাই • পৃষ্ঠা—
আগেই বলেছি বইটি বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে।তাই একেক প্রকাশনীর বইয়ের মান একেক রকম। আমার সংগ্রহের বইটির মলাট, বাধাই,পৃষ্ঠা সবকিছুই অনুন্নতই বলা চলে। পৃষ্ঠায় ঘষাঘষি একটু বেশী হলে হাতে গুড়ো লেগে যায়। বাধাই, মোলাট একদমই হালকা। তাই বই কেনার সময় অবশ্যই দেখে কিনবেন। কারণ বইয়ের মলাট ,বাঁধাই কিংবা পৃষ্ঠা যদি উন্নত হয় তাহলে বই পড়ার ফিলিংসটা আরো বেড়ে যায়।
(বিঃদ্রঃ বই পড়ার সময় বইয়ের প্রচ্ছদ, মলাট,বাঁধাই, পৃষ্ঠা এসব ম্যাটার করে না। বইয়ের গল্পটাই বেশি ম্যাটার করে। শুধু ফিল একটু কম আর বেশি।)
● খুচরা আলাপ : —
বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের প্রধান প্রধান চরিত্র গুলোর সন্ধান ইতিহাসে স্পষ্ট পাওয়া যায়। কিন্তু অনেক অপ্রধান চরিত্র ইতিহাসের কোনো গ্রন্থে পাওয়া যায়নি। যেহেতু,উপন্যাসটি অনেক বাস্তব ঘটনা কিংবা ঐতিহাসিক ঘটনার উপর নির্মিত, তাই এটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাসও বলা হয়।
বইটিতে যে সম্পূর্ণ বাস্তব ইতিহাসের উপর মিল রয়েছে তা নয়। গল্পের মিল রাখার জন্য কিছু অপ্রধান চরিত্র বানিয়ে মিলিয়েছেন লেখক।
সেই বলে বইটিকে একদম এভোয়েট করবেন না। কারণ, এখানে প্রধান চরিত্র গুলো সব ঠিক আছে।
বড় বড় যেসব কাহিনী, যেমন: কারবালার যুদ্ধ, জয়নালের রাজ্য জয় এসব ধর্মগ্রন্থেও উল্লেখ আছে।
আমি বার বার বলছি, গল্পের মিল রাখার কারণে অপ্রধান কিছু চরিত্র সাজিয়েছেন তিনি।
● বইটি কেন পড়া প্রয়োজন / পড়বেন : —
অনেকে নামে মাত্র মুসলমান,কিন্তু কাজে নেই। আল্লাহর আদেশ পালন তো দূরে থাক,আল্লাহর নামটি মুখে নেয়ারও সময় হয় না। সেইসব ভাই বোনদের আমি এই ইসলামিক ইতিহাস রচিত বইগুলো বেশী পড়তে বলব। এর মধ্যে বিষাদ সিন্ধু একটি।
কারণ তাদের দেখা দরকার আগেকার মুসলিমদের আর আমাদের মধ্যে পার্থক্যটা কী?
তারা কখনোই তাদের জীবনের পরোয়া করত না। তাদের ধর্ম রক্ষা আগে,আল্লাহর আদেশ পালন আগে, তারপর অন্যকথা। তারা সামান্য ধর্মের অপমান সহ্য করতে পেতেন না। অনায়াসে দিয়ে দিত জীবন।
এসব হৃদয় বিদারক কাহিনী বেশি বেশি পড়লে, শুনলে হৃদয় উজার হয়।তাই সকল আল্লাহ ভোলা মুসলমান ভাই বোনদের অনুরোধ করব, ইসলামের ইতিহাস গুলো বেশী বেশী জানুন। দেখবেন আল্লাহর নাম এমনিতেই মুখ থেকে বের হয়ে আসবে। ইসলামের প্রতি হৃদয় এমনিতেই নরম হয়ে যাবে।
✰ এছাড়াও বলব,যাদের ইসলামের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ রয়েছে তাদের জন্য অবশ্য পাঠ্য একটি বই এটি। যাদের ইমাম হাসান (রা), হোসেন (রাঃ) এর মৃত্যু কাহিনী, এজিদ বধ কিংবা কারবালার করুণ ইতিহাস জানার আগ্রহ আছে তাদের জন্য বিষাদ সিন্ধুই বেস্ট।
➟ বই : বিষাদ সিন্ধু
➟ লেখক : মীর মশাররফ হোসেন
➟জনরা : ইসলামিক ইতিহাস
➟ প্রকাশনী : শব্দশিল্প
➟ মূল্য : ৩৫০ টাকা
➟ পৃষ্ঠা : ৩৫০