এদেশের শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সুলতান এক কিংবদন্তী পুরুষ । উপন্যাসের চেয়েও রোমাঞ্চকর তাঁর জীবন । ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব , বিচিত্র জীবন যাপন এবং শিল্পশৈলীর নির্ভুল সাতন্ত্রের জন্য তাঁকে নিয়ে অপার কৌতূহল , বিস্ময় এবং শ্রদ্ধাবোধ অসংখ্য জনের । সেই সুলতানকে নিয়ে এই উপন্যাস । জীবনী ভিত্তিক হয়েও সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে লেখা উপন্যাসটি সাময়িকীতে প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুধিজনের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয় । এর কাহিনী শিল্পী সুলতানকে নিয়ে আবর্তিত হলেও এতে ছয় দশকের ব্যপ্তিতে চলমান ঘটনার বর্ণনা যেমন রয়েছে , তেমনি ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের আশা - আকাঙ্ক্ষা এবং ইতিহাসের পতন ও অভ্যুদয়ের বন্ধুর গতিপথ অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে বিধৃত হয়েছে । এছাড়া কোন শিল্পীর জীবদ্দশায় তাঁকে নিয়ে সম্পূর্ণ উপন্যাস লেখার প্রচেষ্টা সম্ভবত বাংলাদেশে এই প্রথম ।
হাসনাত আব্দুল হাই (English: Hasnat Abdul Hye) একজন বাংলাদেশি লেখক এবং প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক। তিনি ঢাকা, ওয়াশিংটন, লন্ডন ও কেমব্রিজে লেখাপড়া করেন। তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, জগদীশ চন্দ্র বসু পুরস্কার, শের-ই-বাংলা পুরস্কার, এস.এম. সুলতান পুরস্কার, শিল্পাচার্য জয়নুল পুরস্কারে ভূষিত হন।
১৯৫৩ সাল। জয়নুল আবেদিন ক্লাস থেকে তার ছাত্র দেবদাস চক্রবর্তীকে ডেকে নিয়ে বললেন এয়ারপোর্টে যাও, একটা পাগল আসছে। দেবদাস তার সহপাঠী রউফকে নিয়ে রওয়ানা হলেন এয়ারপোর্টের দিকে। জয়নুল আবেদিন তখন আর্টস কলেজের প্রধান। করাচি থেকে দিল্লী হয়ে সুলতান সেদিনই ঢাকা আসছেন। দেবদাস বা রউফ কেউই সুলতানের চেহারা চেনেন না। জয়নুল আবেদিন চেহারার একটা বর্ণনা দিয়ে রেখেছেন যদিও তারপর আবার বলেছেন সেই বর্ণনা এখন হয়তো মিলবে না। সুলতান বহুরুপী, এর মধ্যে নিশ্চয়ই নিজেকে বদলে ফেলেছে।সেদিন এয়ারপোর্টে ঋষি-ফকিরদের মতো লম্বা চুলের ফরসা, দীর্ঘদেহী সাদা আলখাল্লা পরা সুলতানকে দেবদাস আর রউফ ঠিকই চিনে ফেলতে পেরেছিলেন। কিন্তু মানুষ সুলতানকে চিনতে, বুঝতে পেরেছিলেন কয়জনই বা।
শিল্পকলা একাডেমির খোলা আর্ট গ্যালারীতে সুলতানকে ছবি আঁকতে দেখে কৌতুহলী হয়েছিলেন আহমেদ ছফা।সুলতানের এসিসট্যান্ট বাটুলকে জিজ্ঞেস করে জানলেন এই শিল্পীর নাম সুলতান। ছফা অবাক, অনেক শিল্পীকেই চেনেন, মেশেন কারো মুখে কখনো এর নামও তো শোনেন নি। পরদিনই ছফা আর্ট কলেজে যান শামিম শিকদারের কাছে, প্রশ্ন একটাই কে এই সুলতান। শামিম বলেন সুলতান হচ্ছেন দ্য লাস্ট অব দ্য বোহেমিয়ানস। সত্যিই তাই। আর বহুরুপী। খাকসার আন্দোলনের সমর্থক হিসেবে সুলতান ধরেছিলেন আলখাল্লা পরার অভ্যাস। এক পর্যায়ে পায়ে খরম পরে সন্ন্যাসীদের মতো গেরুয়া বেশেও ছিলেন কিছুদিন। ১৯৫৩ থেকে ৬৫ প্রায়ই পরতেন শাড়ি, পায়ে নূপুর, আলতা, মাথার চুলে ফুল। বলেছিলেন এটা নিজের মধ্যে বাঙালিত্বকে ধারণ করার জন্য করতেন, ছিলেন রাধাভাবে বিভোর। লুঙ্গি, পাঞ্জাবিও পরেছেন অনেকসময়।তবে মূলত পোশাক ছিল আলখাল্লাই। একের মধ্যে তিনি যেন বহু, অথবা বহুর মধ্যে এক। নড়াইলের মাসিমদিয়া গ্রামের এক রাজমিস্ত্রী শেখ মেসেরের ছেলে লাল মিয়া। বাবা প্রায়ই জমিদার রায়বাবুদের বাসার বিভিন্ন স্থাপনার কাজ করতেন। সেগুলোর অনেকগুলোর নকশা করে দিতেন বালক লাল মিয়া।জমিদার ডি এন রায় দেখতে চাইলেন ছেলেটিকে। অন্য শরিকের ছেলে অরুণ রায়কে ভার দিলেন তাকে ছবি আঁকা শেখানোর।অরুণদার কাছে ছবি আঁকা শিখলেন লাল মিয়া বেশ কিছুদিন। ক্লাস এইটে উঠে বাড়িতে আর মন টিকলো না।সেটা ১৯৩৮ সাল। ততোদিনে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। নিজের মা তো সেই ছোটবেলাতেই মারা গেছেন। গিয়ে উঠলেন ডি এন রায়দের কলকাতার বাড়িতে। আট শরিকের বাড়িতে ভাগাভাগি করে তিন বছর ঘরের ছেলের মতোই থাকলেন। তারপর ভর্তি পরীক্ষা দিলেন কলকাতার আর্টস কলেজে। ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম, কিন্তু এন্ট্রাস পাস না করলে ভর্তি হওয়া যায় না, নিয়ম নেই। ডি এন রায়ের পরামর্শে গেলেন হাসান শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে। ইনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বড় ভাই। রাজনীতিবিদ নন, তবে শিক্ষিত, শিল্পবোদ্ধা মানুষ। বললেন লাল মিয়া নাম চলবে না। তিনিই নাম দিলেন শেখ মোহাম্মদ সুলতান, সংক্ষেপে এস এম সুলতান। শাহেদ সাহেবের অনুরোধে নিয়ম বদলে এন্ট্রাস পাস না হওয়া সত্ত্বেও ভর্তি করা হলো তাকে আর্টস কলেজে। পরীক্ষায় ফার্স্ট সেকেন্ড ই হতেন,থার্ড ইয়ার পর্যন্ত পড়েছেন সেই কলেজে। এই সময়টায় থেকেছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর বাড়িতে। কিন্তু মন টিকলো না বাঁধাধরা নিয়মে। বের হলেন দেশ ভ্রমণে, পড়াশোনা আর শেষ হলো না।
আগ্রা, দিল্লী, আজমীর, লক্ষ্ণৌ। যেখানেই গেছেন সেখানের মানুষের সাথে মিশে গেছেন।ভালোবাসা পেয়েছেন, দিয়েছেন। কিন্তু মন বেশিদিন টেকে নি কোথাও। সিমলা গিয়ে জীবনের প্রথম চিত্র প্রদর্শনী করলেন এক ইংরেজ ভদ্রমহিলার সাহায্যে। পাঞ্জাবের কাপুরতলার মহারাজা সেই প্রদশর্নীর উদ্বোধন করলেন। তার আমন্ত্রনে গেলেন পাঞ্জাবে, জলন্ধরে। সেখানে পরিচয় হলো এক ধনী জমিদার আমীর হাবিবুল্লাহ খানের সাথে।সেই জমিদার বাড়িতে কাটিয়ে দিলেন ছয় বছর পরিবারের একজন হয়েই। বাবার মৃত্যুর পর একবার নড়াইলে এলেন। যোগ দিলেন কৃষক আন্দোলনে। মন টিকলো না। আবারও জলন্ধর, সেখান থেকে দেরাদুন হয়ে মুসৌরির পথে। তারপর শ্রীনগরে থিতু হলেন কিছুদিনের জন্য। এরমধ্যে দেশভাগ হয়ে গেছে। কাশ্মীর নিয়ে লড়াই বাঁধলো ভারত পাকিস্তানের মধ্যে। একটা ট্রাকে চেপে শিয়ালকোট হয়ে পাড়ি দিলেন লাহোরে। মানুষের ভালোবাসা সেখানেও পেলেন।
পরিচয় হলো ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, সাদাত হোসেন মান্টো এবং আরও অনেক বিখ্যাত, অখ্যাত মানুষের সাথে। এখানেই ধরলেন চরসের নেশা। দেশে এসে অবশ্য চরসের বদলে গাজা ধরেছিলেন।নেশাকে তিনি ভাবতেন আধ্যাত্মিকতায় পৌছাবার উপায় হিসেবে। লাহোরে ঠিক মন বসলো না। সেখান থেকে গেলেন করাচিতে। করাচিতে আলাপ হলো খান আতা, ফতেহ লোহানী প্রমুখের সাথে।কালচারাল এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে যাওয়ার সুযোগ হলো আমেরিকায়, সেখান থেকে লন্ডনে। চিত্র প্রদশর্নীও করলেন সেখানে। সেই একজিবিশনে ছিল পিকাসো, মাতিসের মতো শিল্পীদের ছবিও। তবু ফিরে এলেন করাচিতে। কাটিয়ে দিলেন দুবছর। থাকতেন ক্যাসিনো গেস্ট হাউজে। সেটা হয়ে উঠলো করাচির শিল্পী সাহিত্যিকদের আড্ডা। নিয়মিত আসতেন বড়ে গোলাম আলীর মতো শিল্পী। প্রচুর ভালোবাসা পেয়েছেন সেখানকার মানুষের, লোকে বলতো সুলতানকে সবাই ভালোবাসে, বাঙাল মুলুকের লোক জাদু জানে। চিত্র প্রদশর্নী করেছিলেন লাহোর আর করাচিতে। তবু সব ছেড়ে ঢাকায় চলে আসলেন।
দেশে এসে সেভাবে গুরুত্ব পেলেন না। অভিমান করেছেন জয়নুল আবেদিন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের উপর, তারা সাহায্য করেন নি বলে। যশোরে তার মামা বাড়ির গ্রাম চাচুরি পুরুলিয়াতে নিজের চেষ্টায় একটা স্কুল করেছিলেন। তবে যেভাবে গড়তে চেয়েছিলেন সেভাবে হয় নি, তাই ছেড়েছুড়ে আসলেন সব। সোনারগাঁয়েও সরকারি অনুদানে ছবি আঁকার স্কুল করেছিলেন। স্থানীয়দের অসহযোগীতায় আর কিছু লোকের চক্রান্তে সেটাও ছেড়ে দিতে হলো। শেষ পর্যন্ত দেশের বাড়ি নড়াইলের গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শিশুস্বর্গ, সাথে ছিল নিজের পোষা পশুপাখিদের চিড়িয়াখানা।বিয়ে করেন নি, তবে ছিলেন তার ধর্ম কন্যা ও ধর্ম নাতনীরাও। স্বাধীন বাংলাদেশে সুলতান দুবার মাত্র চিত্রপ্রদশর্নী করতে পেরেছিলেন। একবার ১৯৭৬ আরেকবার ১৯৮৬ তে। দুবারই এই উদ্যোগে এগিয়ে এসেছিলেন দুইটি বিদেশি দুতাবাসের দুজন বিদেশি কর্মকর্তা। এর বেশি কিছু হলো না কেন কে জানে? হয়তো তার খামখেয়ালীপনা বা অন্যদের উদাসীনতা বা এই দুটোই তার কারণ। অথচ তার জীবদ্দশাতেই তাকে নিয়ে তারেক মাসুদ নির্মাণ করেছেন প্রামাণ্যচিত্র আদমসুরত।
এককালে ল্যান্ডস্ক্যাপ একেছেন বিস্তর, একেছেন মানুষের ছবি। এই দেশের আকাশের, এই দেশের সাধারণ মানুষের ছবি। সুলতানের ছবিতে বাঙালিরা বলিষ্ঠ, পেশীবহুল বাস্তবের বাঙালির মতো রুগ্ন নয়। বলতেন এই বলিষ্ঠ বাঙালিরাই হলো বাঙালির আসল রূপ। সুলতানের অনেক ছবি হারিয়ে গেছে, অসম্পূর্ণ রেখেছেন নিজেই কতো ছবি। এই বইয়ে শুধুমাত্র প্রচ্ছদেই সুলতানের আঁকা একটা ছবি দেয়া আছে কেবল। আরও ছবি দেয়া যেত, দেয়া উচিত ছিল বলেই মনে করি। শিল্পীর জীবনী নিয়ে বই, অথচ বইয়ে ছবি নেই, এটা একটু অদ্ভুতই লেগেছে। হাসনাত আবদুল হাই এই বইকে বলেছেন জীবনধর্মী উপন্যাস, এই উপন্যাসে লেখক নিজেও একটি চরিত্র।বইটি লেখা হয়েছে সুলতানের জীবৎকালেই। হাসনাত আব্দুল হাইয়ের লেখা বেশ ভালো লেগেছে। সাবলীল, সুন্দর ও তথ্যনির্ভর। তবু বইয়ের একটা দূর্বলতার কথা না বললে নয়, বইটিতে ঘটনাক্রম বড়ই এলোমেলো। আগের কথা পরে, পরের কথা আগে এসেছে। হয়তো লেখক যে ধারাবাহিকতায় তথ্য পেয়েছেন সেই আঙ্গিকে লিখতে চেয়েছেন তবু বইয়ের শুরুর দিকে ঘটনাক্রমের গোলকধাঁধায় পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারেন। তবে একবার এগিয়ে গেলে বইটি মুগ্ধ করবে। যেমন মুগ্ধ করবেন সুলতান,দ্য লাস্ট অব দ্য বোহেমিয়ানস।
শিল্পী এস এম সুলতানের জীবন সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা ছিল না। এই বইটা পড়ে তার বোহেমিয়ান জীবন, ছবি আঁকার ধরণ, ব্যক্তিগত দর্শন সহ অনেক কিছুই জানা গেল। হাসনাত আবদুল হাইয়ের লেখা সুখপাঠ্য।
এস এম সুলতান। বাংলাদেশের শিল্পজগতে এক সুবিখ্যাত নাম৷ দীর্ঘদিন তাঁকে একরকম ভুলে ছিল বাংলাদেশের বিদগ্ধ সমাজ। কিন্তু তাঁর জীবনাচরণ থেকে ব্যক্তিগত দর্শন সবই প্রচণ্ড আকর্ষণীয়৷ সেই মানুষটাকেই কলমের আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন হাসনাত আবদুল হাই। দুই স্টাইলে এই জীবনীভিত্তিক উপন্যাসটি লেখা হয়েছে৷ এক স্টাইলে সুলতান নিজের মুখেই বলেছেন নিজের কথা, অপর স্টাইলে সুলতানকে দেখা হয়েছে অন্যের চোখে। সুলতান এর জীবন কোন ঝাঁ চকচকে আলিশান জীবন নয়। কিন্তু প্রচণ্ড রোমাঞ্চকর। প্রচণ্ড মোহময়। সুলতান ছবি আঁকেন এত দ্রুত, যে তিনি ছবি আঁকছেন না নাচছেন ঠাহর করা যায় না। তাঁর ছবির প্রায় সবই গ্রামঘেঁষা, শক্তিশালী কৃষক পুরুষ তাঁর ছবির অন্যতম বিষয়বস্তু৷ ছবির মাধ্যমে সবসময়ই তিনি অনুধাবন করাতে চেয়েছেন বাঙালির শক্তিমত্তা এবং লড়াকু মনোভাবকে। সুলতানের চরিত্রে একই সাথে মিশে রয়েছে দৃঢ়তা, নিজের শক্তির উপর বিশ্বাস এবং আশ্চর্য উদাসীনতা। বিদেশ বিভুঁই ঘুরেও তাঁর মনে হয়েছে দেশে, নাড়ীর কাছে ফিরতেই হবে৷ তাঁর কাছে গতিময়তাই জীবনের চূড়ান্ত কথা৷ একই সাথে মোলায়েম এক হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন সুলতান৷ তাঁর চোখে সকল মানুষই ছিল সমান, সকলকে অকাতরে স্নেহ বিলিয়ে দিতেন তিনি৷ গড়ে তুলেছিলেন এক চিড়িয়াখানা, যেখানকার প্রতিটি পোষা প্রাণী ভাষা বুঝত তাঁর। অর্থের প্রতি, বিত্তের প্রতি, স্থায়ী জীবনের প্রতি তাঁর কোন মোহ ছিল না৷ বোহেমিয়ান জীবনযাপনকারী এই শিল্পী যখন ইচ্ছে নাচতেন, গান শুনতেন, গাঁজার কলকেতে দিতেন প্রচণ্ড টান, শাড়ি পরে নারী সেজে ঘুরে বেড়াতেন৷ কিন্তু তাঁর মধ্যে ছিল এক গভীর বোধ, গভীর দার্শনিকতা। সুলতানকে চেনার জন্য, তাঁর ভাবনার সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য এই বইটি একটা পথপ্রদর্শকই বলা চলে। পরিশীলিত লেখাটি খুব বেশি উচ্চকিত নয়, সুলতানকে প্রায় সঠিকভাবেই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক৷ ছুঁয়ে গেছেন তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোনগুলি। নানান গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সাথে সুলতানের সম্পর্ককেও বেশ চমৎকারভাবে ছুঁয়ে যাওয়া হয়েছে। সুখপাঠ্য।
'সুলতান' পড়লাম প্রায় অনেক দিন ধরে। তাও যা পড়লাম তা আসলে হাসনাত আবদুল হাইয়ের চোখে দেখা সুলতান। কী আশ্চর্য রূপকথার মত একটা জীবন! যখন যেখানে ইচ্ছে চলে যাচ্ছেন, পকেটে কোন পয়সা নেই, সেসব নিয়ে চিন্তাভাবনাও নেই! একে তাকে ছবি এঁকে মুগ্ধ করে মুহূর্তেই বন্ধু হয়ে যাচ্ছেন। অচেনা এক মানুষের আস্তানায় বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছেন!
সোহরাওয়ার্দী থেকে শুরু করে পাকিস্তানের সাদাত হোসেন মান্টো, হাফিজ এদিকের জয়নুল আবেদিন, আহমেদ ছফা কার সাথে না মোলাকাত হল তার!! অথচ, সম্পূর্ণ যাত্রা তার একার! প্রতিদিন পড়তাম, দেখতাম সে দেহরাদুন থেকে শ্রীনগর গেলো, সেখান থেকে লাহোর গেলো... এমন করে যাচ্ছে যাচ্ছে... সেই সমস্ত ল্যান্ডস্কেপ! তার রঙ, মানুষ, তাদের ব্যাবহার সবকিছু কী প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে এই মানুষটাকে।
এক চিনার গাছের বর্ণনা, মিশৌরী শহরের তাসের দেশ, কোত্থেকে কোথায়! ভয়ডর বলে যে একটা বস্তু থাকতে পারে তা সম্ভবত উনার জানা ছিলো না। প্রচন্ড একটা জীবনীশক্তি- সম্ভবত এটাই তার জীবনের অন্যতম প্রধাণ আশীর্বাদ!
সুলতান কে জানার আনন্দ একটা অন্যরকম অনুভূতি! আমি আপাতত এই অনুভূতি ব্যাখ্যা করতে পারছি না। অদূর ভবিষ্যতে একটা স্কেচ খাতা আর কলম-পেন্সিলের ব্যাগ টা নিয়ে আমিও পৃথিবী দেখতে বের হবো। এই বই পড়তে পড়তে প্রায় রাতেই আমি এমন স্বপ্ন দেখতাম। স্বপ্নে সুলতান কে চাচা সম্বোধোন করতাম! তারপর বইতে যেই শহরটার কথা লেখা থাকতো স্বপ্নে সেই মাঠে বসে আমি পাকা ধানের ক্ষেত আর তার হাতে ধরা তুলির ডগায় ইয়েলো ওকর রঙ টা দেখতাম। একদম বাস্তবের মত স্বপ্ন...
লেখক এমন করে না লিখলে মাহাত্ম টা বুঝতে হত নিজ তাগিদে। সেই কষ্টুটুকু করতে আমি রাজী ছিলাম। সৌভাগ্যবশত কষ্ট করতে হল না। বইটার প্রতি পাতায় লাল মিয়া, প্রতি পাতায় সুলতান....
এটা সেই বইগুলার মধ্যে একটা—যেসব পড়লে হাঁটার ধরন পাল্টে যায়।
মাঝপথে গিয়ে নোট করা ছেড়ে দিসি। এই বইটা তাত্ত্বিক জ্ঞানার্জনের জন্য না, আত্মিক উপলব্ধির জন্য। রঙতুলির একেকটা স্ট্রোকের মত চোখের সামনে বড়ে গোলাম – শাহেদ সোহরাওয়ার্দীরা জেগে থাকবেন, মাঝখান দিয়ে আল্লা রাখা – সাদত হোসেন মান্টো উঁকি দিয়ে যাবেন—এইটাই আমার এখন দরকার।
বইটা এক দিনেই শেষ হয়ে যেতো, মাঝখানে একজন ফোন দিয়ে গতি কমিয়ে দিলো। এতে উত্তমও হল বটে, তার সাথে ঘণ্টাদেড়েক সুলতান-সম্পর্কিত আলোচনা বইটা ধারণ করতে বেশ সাহায্য করলো।
এই বইটা কি আমি পড়সি? ঠিক ওভাবে, ‘পড়সি’ বলার সাহস পাচ্ছি না। এই যেমন, জয়নুল যে কলকাতা আর্ট কলেজে শেষ বর্ষে পড়ার সময়েই শিক্ষক হয়ে গেসিলেন—এমন তথ্যগুলা আমি যেকোনোদিন ভুলে যাবো বলে মনে হচ্ছে। কিংবা সুলতানকে কোন কোন জমিদার-ব্যাবসায়ীরা খাতির করে নিজের বাসায় নিয়ে গেসিলেন, বছরের পর বছর অতিথি বানিয়ে রাখসিলেন—এসব তো এখনই ভুলে গেসি।
কিন্তু সব ছাপিয়ে যেই বোধটা জেগে আছে সেটা বোধহয় এই তথ্যগুলোর চেয়েও মূল্যবান। সুলতানের পোষা পনেরো কুকুর, তিরিশ বিড়াল, আর তিনশো গিনিপিগের মত।
এই বই আমাকে আবার পড়তে হবে। আবার আবার।
অন্য মতামত বই সম্পাদনার ব্যাপারে হাসনাত আবদুল হাইয়ের অযত্ন স্পষ্ট। নিজেই লিখসেন, দেশের বাইরে যাওয়ার আগে তাড়াহুড়া করে বইয়ের কাজটা শেষ করসেন—কারণ একটানে শেষ না করলে নাকি তার আর কাজ হয় না। বেশ, কিন্তু কাউকে কি সম্পাদনার ভারটা দিয়ে যাওয়া যেতো না? কোনো বাক্যে সুলতান উত্তম পুরুষ, পরের বাক্যেই তৃতীয়—এই কাজ তো শিশুও করবে না। অন্যদিকে কালক্রমের অ-ধারাবাহিকতার ব্যাপারটা আমরা গ্রহণ করতে পারতাম—শহীদুল সেই অভ্যাস দাঁড় করায়ে দিয়ে গেসেন—কিন্তু এই বইয়ে সেই অ-ধারাবাহিকতা কোনো শিল্পের প্রয়োজনে ঘটে নাই, ঘটসে অলসতার জন্য। যেন গোছানো পাণ্ডুলিপি ঘরের বাচ্চা এসে এলোমেলো করে দিলো, এরপর সেটাই আমরা সোজা ছাপিয়ে বই করে ফেললাম।
সম্ভবত এটা উপন্যাস হয় নি। লেখক নিজেই বলেন, 'এটা উপন্যাস লেখার উপন্যাস।' বরং বলা যায় 'It was an ode to Sultan, the last true bohemian.' হিস্টোরিকাল ফিকশনের ছাঁচে শিল্পী সুলতানের পরিচয়পত্র বলা যায় এটিকে।
সমাজে না, আমরা বাস করি বেলুনে। ছোট-বড় নানা রঙের বেলুনের ভেতর গুটিসুটি হয়ে থাকি। বেলুন আরো বাড়ছে, ছোট হচ্ছে। সুলতান চাইলে হিলিয়ামে ফোলানো দামি বেলুনে থাকতে পারতেন। কিন্তু বোহেমিয়ান এ শিল্পী থেকে গেছেন গ্রাম-বাংলার মানুষগুলোর প্রশ্বাসে ফোলানো বেলুনের মাঝেই। মানুষই ছিলো তার আরাধনা, সাধারণ মানুষের জন্যই তার শিল্প। সৃষ্টির পাশাপাশি তার স্বপ্ন ছিলো ছোটদের নিয়ে। নির্ভেজাল সুলতান শিশুদের জন্য ফাইন আর্টস স্কুল গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু পৃথিবী তার মতো সরল নয়। তার এই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে সঠিক জানি না।
তার রঙিন জীবন নিয়ে কিছুটা এলোমেলোভাবেই বইটিতে লেখা। কিন্তু তাতে সুলতানকে উপলব্ধি করতে তেমন সমস্যা হয় না।
এস এম সুলতানের নাম প্রথমবার শুনেছিলাম স্কুলে পড়ার সময়। ক্লাস সিক্স নয়তো সেভেন এ চারু ও কারুকলা বইয়ে বাংলাদেশের কয়েকজন চিত্রশিল্পীকে নিয়ে লেখা ছিলো। জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান এদের সাথে এস এম সুলতান এই নামটাও ছিলো। এস এম সুলতান সম্পর্কে জানাশোনা ওই পর্যন্তই ছিলো। কিছুদিন আগে ফেসবুকে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ভাস্কর নভেরা আহমেদকে নিয়ে একটা লেখা দেখে উনার সম্পর্কে জানার আগ্রহ হয়। সেই আগ্রহ থেকেই হাসনাত আব্দুল হাই এর লেখা 'নভেরা' বইটা পড়া হয়েছে, আর 'নভেরা' পড়তে গিয়েই 'সুলতান' নামক বইয়ের ব্যাপারে জানা। 'যদ্যপি আমার গুরু' বইয়েও আহমদ ছফা সুলতানকে নিয়ে অল্পবিস্তর লিখেছেন। আরও কিছু জায়গায় ঘাটাঘাটি করে মনে হলো, নাহ বইটা পড়ায় যায়।
বইটা শুরু দিকে কেমন জানি একগুঁয়ে লাগছিলো, পড়ায় মন বসছিলো না একদমই । কিন্তু আস্তে আস্তে কখন যে সুলতানের মোহনীয় জাদুবলয়ে পড়ে গেছি টেরই পাইনি। সুলতানের ব্যতিক্রম ব্যক্তিত্ত্ব যেনো মন্ত্রমুগ্ধের মতো টানছিলো, তাই বইটা শেষ না উঠতেই পারিনি।
নড়াইলের এক কাঠমিস্ত্রীর ঘরে জন্ম সুলতানের, প্রতিবেশি জমিদার পরিবারের বদৌলতে কলকাতা যাওয়া, কলকাতা গিয়ে সোহরাওয়ার্দী পরিবারের সাথে পরিচয় হয়। সুলতান তখন কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হন, কিন্তু পড়ালেখা শেষ না করেই বেড়িয়ে পড়েন ভ্রমণে। আগ্রা, সিমলা, লক্ষ্ণৌ, আজমীর, মুসৌরি, শ্রীনগরসহ ঘুরেফিরেন ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে, তারপর সেখান থেকে পশ্চিম পাকিস্তান। যেখানেই গিয়েছেন সেখানেখানকার মানুষের সঙ্গে সহজেই মিশে গেছেন। তাঁর ছবি আঁকার বিশেষ গুন, ব্যাতিক্রমী ব্যক্তিত্ত্ব, অদ্ভুত বেশভূষা আর আড্ডাবাজ স্বভাব সবমিলিয়ে মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছেন সবসময়। তিনি নির্লিপ্তভাবে ভালোবেসেছেন মানুষকে, শুধু মানুষ নয় পশুপাখির প্রতিও ছিলো তার অগাধ ভালোবাসা । শামিম সিকদার সুলতান সম্পর্কে আহমদ ছফাকে বলেছিলেন দ্য লাস্ট বোহেমিয়ান। কারণ ঘরের চৌকাঠ কখনো বেঁধে রাখতে পারেনি সুলতানকে, কোথাও গিয়ে কিছুদিনের জন্য থিতু হতে পারেন না, পথ যেন সর্বদাই তাকে ডেকে বেড়ায়। করাচিতে চরসের মাধ্যমে নেশা করা শুরু করেন, দেশে ফিরে ধরেন গাঁজা। নেশা করাকেও একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন তিনি। তাঁর মতে নেশার মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতায় পৌছুনো যায়। এই নেশার জন্য অনেক জায়গায় মানুষের কাছে বদনামও হয়েছেন কিন্তু কারোর কথা শোনার মতো মানুষ নন তিনি।
সুলতানের বাবা ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রী, তাই আঁকাআকির হাতেখড়ি হয়েছিল বাবার থেকেই। তারপর কিছুদিন জমিদার সত্যেন রায়ের ছেলের কাছে ছবি আকাঁ শিখেছেন কিছুদিন কলকাতা আর্ট কলেজে। তাঁর জীবন যেমন আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা ছিলো, চিত্রকর্মগুলোও ছিলো একদম আলাদা। ছবি আঁকার নিজস্ব একটা স্টাইল তৈরি করেছিলেন। তিনি গতানুগতিক নিয়ম মেনে ছবি আঁকেননি বলে অনেক গুনী চিত্রকরদের বিরাগভাজনও হয়েছেন। সুলতানের ছবি আঁকার প্রধান বিষয়বস্তু ছিলো বাংলার প্রকৃতি আর গ্রামের মানুষজন। তাঁর ছবিতে বাঙালিদের চিরাচরিত আদলের পরিবির্তে পেশিবহুল কর্মঠ কিংবা সংগ্রামী মানুষদের চেহারা ফুটে উঠে। তিনি ছবির জন্য কখনোই মডেল ব্যবহার করতেন না, এমনকি বন্ধ ঘরে বসেই এঁকে ফেলতেন গ্রামীণ সব দৃশ্যগুলি। ছবি আঁকার বেশির ভাগ উপাদানও তিনি প্রকৃতি থেকেই জোগাড় করতেন।
বাংলাদেশের একজন কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানকে নিয়ে জানার জন্য এই বইটা অবশ্য পাঠ্য একটা বই। তবে শুরুর থেকেই বইয়ের কাহিনি ভীষণ অগোছালো, যেজন্য প্রথমদিকে পড়তে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছিলো। ধারণা করা যায় যে লেখক বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে যেসব তথ্য যোগাড় করেছেন, আর সেই সময় অনুযায়ীই লিখেছেন। কিন্তু লেখার সময় যদি সময়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেন তাহলে পাঠকদের জন্য সুবিধা হতো। তবে এমন একজন কিংবদন্তিকে আমার মতো কিছু নগন্য পাঠকদের কাছে পরিচিত করেছেন সেজন্যেই হাসনাত আব্দুল হাই এর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করাই যায়। তাছাড়া এই বইয়ে শুধু সুলতান না আহমদ ছফা, সাদাত হোসেন মান্টো, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, জসীমউদ্দিন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং তার ভাই, গায়ক বড়ে গোলাম আলী সহ আরও অনেক বিখ্যাত মানুষের বলা হয়েছে, যেখান থেকে তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও কিছুটা হলেও জানা যায়। সবশেষে বলবো, যারা কষ্ট করে রিভিউটা পড়েছেন সবাই বইটা পড়বেন আশা করি।
এক মলাটে শিল্পী এস. এম. সুলতান সম্পর্কে জানার জন্য যতটুকু প্রত্যাশা করা যায়, তার চেয়েও বেশি কিছু পেয়েছি। সুলতান সম্পর্কে যাদের পূর্বজ্ঞান প্রায় শূন্য, তারাও এই বই পড়ে তাঁর শিল্পীসত্তা ও মানুষটিকে গভীরভাবে চিনতে পারবেন। লেখক সহজ, সাবলীল ও প্রাণবন্ত ভাষায় সুলতানের জীবন, দর্শন ও শিল্পভাবনাকে তুলে ধরেছেন। শুধু একজন চিত্রশিল্পী নয়, বরং একজন ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবেও সুলতান এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠেন। তাঁকে ঘিরে থাকা মানুষের জীবনকথা ও স্মৃতিচারণ বইটিকে করেছে আরও জীবন্ত ও মানবিক। ফলে বইটি তথ্যসমৃদ্ধ জীবনী হওয়ার পাশাপাশি পাঠযোগ্য ও উপভোগ্য একটি স্মৃতিকথা হিসেবেও অনন্য।
সুলতানের ব্যাপারে প্রথম কোথায় জেনেছিলাম? চারু ও কারুকলা নামের একটা বই ছিল হাইস্কুলের পাঠ্য হিসেবে, সেখানে। জয়নুল, কামরুলের সাথে সুলতানকে ভিন্নধারার চিত্রশিল্পী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নম্বর পাবার জন্য যদ্দূর পাঠ করা দরকার তদ্দূরই। এরপর ছফা সাহেবের প্রবন্ধের কল্যাণে সুলতানকে জানার সুযোগ হলো। মূলত তখন থেকেই সুলতানের প্রতি আগ্রহের জন্ম!
সুলতানের ব্যাপারে জানা যায় কমই। জন্ম নড়াইলের এক কাঠমিস্ত্রীর ঘরে। ঘর কখনো তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। পথে বেড��িয়ে পড়াই তাঁর নেশা! শামীম সিকদারের ভাষায়- সুলতান দ্য লাস্ট অব দ্য বোহেমিয়ানস! কিন্তু পথ সর্বদা বিপদসংকুল! এখানে সুলতানের ভাগ্যের তারিফ করতেই হয়। হাতের টাকাপয়সা সব উড়িয়ে দেওয়ার পরে ঠিকই কিছু না কিছু ব্যবস্থা হয়েই গেছে, পথে কাউকে না কাউকে পাওয়া গেছেই ঈশ্বরের দূত হিসেবে সাহায্য সাথে নিয়ে! ভাগ্যক্রমে কলকাতায় যাওয়া, সোহরাওয়ার্দী পরিবারের সুদৃষ্টিতে আর্ট কলেজে পড়ার সুযোগ পাওয়া, এবং পড়া শেষ করেই আবার বেরিয়ে পরা!
ব্যাক্তিজীবনে খুবই অদ্ভুত এই মানুষটি! বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ করতে শাড়িও পরেছেন বছর কয়েক, পায়ে দিতেন আলতা! হাতে টাকা পয়সা আসলে এক দন্ডে সব খরচ করে ফেলতেন, ভবিষ্যতের জন্য কোনো ভাবনাই নেই! পশু পাখিদের ভাষা বুঝতেন, বিষধর সাপও যেন তাঁর পোষ মেনে নিত! বাচ্চাদের আর্টের স্কুল খোলার জন্য অনেক দৌঁড়ঝাপ করেছেন, আমাদের দেশের মানুষের মানসিক বিকাশের জন্য যে চিত্রকলার বিকল্প নেই তা-ই মানুষকে বুঝাতে চেয়েছেন।
খাকসার আন্দোলনেও সমর্থন দিয়েছিলেন তিনি।
সুলতানের আর্টের স্টাইল আমাদের দেশের প্রচলিত আর্ট স্টাইল থেকে ভিন্ন ছিল। তিনি যেন একাই একটি ধারা! তাঁর আঁকা ছবিতে দেখা যায় গ্রাম বাংলার প্রতিচ্ছবি। তিনি আঁকার জন্য মডেল ব্যবহার করতেন না। তাঁর চরিত্রগুলো সব পেশিবহুল, তিনি বাংলার সন্তানদের পেশিবহুল দেখিয়েছেন যা তাঁর চিত্রকলার বিশেষ দিক। এ নিয়ে তাঁর নিজস্ব মতবাদও রয়েছে। রঙ সুলতান নিজেই প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করে বানিয়ে নিতেন।
সুলতানের পুরো জীবনটাই যেন বিশাল এক যাত্রা, সেই যাত্রার একমাত্র পথিক সুলতান নিজেই। জীবনের বিভিন্ন সময় তাঁর সাথে বিভিন্ন মানুষের সাথে দেখা, কিছুদূর পথচলা, কিন্তু শেষ অব্দি সুলতান থেকে গেছেন একাই। কিংবা কাউকে নিজের জীবনের সাথে জড়ানোর সুযোগই দেননি!
এইসব কথাবার্তা মিলেই সুলতান বইটি। হাসনাত আবদুল হাই জীবনীনির্ভর সাহিত্য রচনায় অনন্য। তবে বইয়ে সম্পাদনার অভাব ছিল মনে হয়েছে। তবে এত বড় মাপের সাহিত্যিকের সমালোচনা করার সাহস আমার নেই। সব মিলিয়ে অতি সুখাদ্য!
একটা বিচিত্র মানুষের জীবন; আমি শুধু তাকে একজন চিত্রশিল্পী বলব না... বলবো, জীবনশিল্পী! মানুষটা অজানাকে জানার তাগিদে ছুটেছে প্রান্তরে প্রান্তরে। বিশ্বের উন্নত নামকরা দেশগুলোতে নিজের পদচিহ্ন এঁকে দিয়ে ফিরেছে আবার আপন ধূলিতে। জন্মভূমির সেই অচিন মায়ায় আবদ্ধ রেখেছে নিজেকে চিরকাল। থেকেছে লাইমলাইটের বাইরে। খেতাব কিংবা অর্থবিত্ত কিছুই তাকে ছুঁয়ে যেতে পারেনি।
সুলতানের জীবনেই আমি দেখতে পেরেছি সেই গ্রাফ যা মানুষের বেঁচে থাকার প্রমাণ; সেই উত্থান পতন যা বুঝিয়ে দেয় আমরা বেঁচে আছি... সরলরেখায় মিলিয়ে যাইনি! সরলরেখায় মিলিয়ে যাওয়া মানেই বিনাশ।
বোহেমিয়ান লাইফস্টাইলের অনবদ্য উদাহরণ সুলতান। একজন ফাইন অ্যার্ট স্টুডেন্ট হিসেবে আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে বইটা। শুধু আমার কেন... আমি রেকমেন্ড করি সবার পড়া উচিৎ বইটা।
হাসনাত আবদুল হাই স্যারের লেখা অসাধাণভাবে সাবলীল ও উপভোগ্য।