শুধু হাতি নয়, ‘রোগ’ হাতি। অর্থাৎ কিনা, গুণ্ডা হাতি। দলের স্বীকৃত সর্দারের সঙ্গে নতুন সর্দার হতে ইচ্ছুক হাতির দ্বৈরথ হাতির সমাজে প্রচলিত এক ঘটনা। তুমুল যুদ্ধে এক পক্ষের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। সেই পরাজিত হাতিই হয়ে ওঠে ‘রোগ’ হাতি। দলতাড়িত, স্বজনবিচ্ছিন্ন, অপমানিত, ক্ষতবিক্ষত। গুণ্ডা হাতির আক্রমণ বড় মর্মান্তিক। লেশমাত্র মৃত্যুভয় যেহেতু থাকে না তার, কোনওভাবেই নিরস্ত করা যায় না তাকে। নিষ্ঠুর, বেপরোয়া হয়ে ওঠে তার অত্যাচার। সেবার ওড়িশার লবঙ্গি-বনে এমনই এক হাতির উপদ্রব। বেড়াতে গিয়েও তাই জড়িয়ে পড়তে হল ঋজুদা ও রুদ্রকে। ধোপা যেমন পুকুরঘাটে কাপড় কাচে, হিংস্র হাতিটাও নাকি তেমন করে লোকজন-গাইবলদ শুঁড়ে জড়িয়ে তুলছে আর আছড়ে মেরে ফেলছে। লবঙ্গি-বনের সেই অভিজ্ঞতা বড় ভয়ঙ্কর। রুদ্রর জবানিতে সেই অভিজ্ঞতার কথাই অতি রোমাঞ্চ-জাগানো ভঙ্গিতে এই বইতে বর্ণনা করেছেন শিকারগল্পের একচ্ছত্র লেখক বুদ্ধদেব গুহ।
Buddhadeb Guha (Bengali: বুদ্ধদেব গুহ) is a popular Bengali fiction writer. He studied at the well-known St Xavier's College of the University of Calcutta.
His novels and short stories are characterized by their dreamy abstractness and romantic appeal. His essays reveal the soul of a true wanderer providing some of the most beautiful renditions of travel in Bengal. His love for forests and nature provide the background for many of his novels.
A highly successful chartered accountant by profession, and an accomplished musician, Guha is very urbane in his lifestyle. He was one of the first to create characters representing easy-going, upper middle-class modern Bengali families, whom readers could identify with, and that gave him instant popularity.
He is the recipient of many awards including Ananda Puraskar, 1976; Shiromani Puraskar; and Sharat Puraskar.
The Library of Congress has over fifty titles by him. His most famous novel, according to many, is Madhukori. It is considered a milestone in Bengali literature. He is also the creator of Rijuda, an imaginary character who moves about in jungles with his sidekick Rudra. The jungles that he wrote about were mainly in Eastern India.
হাতি বৃদ্ধ হবার পর নতুন কোন প্রতিদ্বন্দ্বী তাকে বিতাড়িত করে।দলছুট অপমানিত হাতি উম্মাদ নৃত্য চালায় তার আশেপাশে।কখনো তা মানুষের মৃত্যুর কারণ হয় কখনো বা মানুষের সহায় সম্বলের।
বইপ্রেমী বা সাহিত্যপ্রেমী মানুষদের বিষয়ে নানারকমের স্টিরিওটাইপ প্রচলিত রয়েছে। তার কয়েকটি খুব সত্যি, কয়েকটি আবার নয়ও। তবে সাহিত্যপ্রেমী মানুষ যে প্রকৃতিপ্রেমীও হবে, সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সত্য। কিন্তু ব্যতিক্রম তো সবেতেই হয়। আর এবারে সেই ব্যতিক্রম হলাম আমি। ভীষণরকমের ব্যতিক্রম। ইট-কাঠ-পাথরের শহর আমার মন-প্রাণের সবটুকু দখল করে রয়েছে। কলকাতা আমার জীবন! নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সিনারিওয়ালা জায়গায় ঘুরতে যেতে আমার ইচ্ছে করে না। বই-ই আমার চিরকালীন সঙ্গী। এহেন পাঠকের ক্ষেত্রে ঋজুদা সিরিজ বা বুদ্ধদেব গুহ-র বেশিরভাগ লেখা পড়াই একটু ট্রাবলসাম্ ব্যাপার। লেখকের যে টিপিক্যাল শহুরে ব্যাপারকে নস্যাৎ করে বনরাজ্যের প্রজাদের মহিমান্বিত করার একটা প্রবণতা আছে, তাও আমার খুব একটা ভালো লাগে না। তবুও পড়ি। পড়ব। একটা আকর্ষণ তো আছেই। বিপক্ষীয় তত্ত্ব কি পড়তে নেই?
যাইহোক, এবারের ঋজু-অভিযান যে লবঙ্গি-বনে, তা বলাই বাহুল্য। বিপক্ষে একটি রোগ (Rogue) হাতি বা গুণ্ডা হাতি। অশান্তি সৃষ্টি করা গুণ্ডাটিকে ঘুমের দেশে পাঠানোই হল মূল অভিযান। সঙ্গে আনুষঙ্গিক জঙ্গুলে-জীবনের নানান কথকতা, গুণ্ডা হাতির ইতিবৃত্ত এবং মূল শিকার পর্বের কিছু উত্তেজনা। এইসব নিয়েই এই ছোট্ট ঋজু-নভেলা।
তারা বাদ দেওয়ার মতো এবারে তেমন সিগনিফিক্যান্ট কিছু ছিল না। তবে বাংলা বইতে ওড়িয়া সংলাপ ভালো লাগল না। আর শহুরে যাপনকে সামান্য খোঁচা মারার কথা তো বললামই এর আগে। তাই একটু বেশিই স্ট্রিক্ট হয়ে একটি তারা বাদ।
বইয়ের নাম - ঋজুদার সঙ্গে লবঙ্গি-বনে লেখক - বুদ্ধদেব গুহ প্রকাশক - আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড
"ঋজুদার সঙ্গে লবঙ্গি-বনে" গল্পের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে ওড়িশার লবঙ্গির জঙ্গল। মহানন্দার উত্তর আর অঙ্গুল শহরের কিলোমিটার চল্লিশেক দক্ষিণে পাহাড় ঘেরা জঙ্গলময় এক উপত্যকায়, দল থেকে বিতাড়িত স্বজনবিচ্ছিন্ন এক 'রোগ' হাতির উপদ্রব; আর সেই কারণেই পড়েছে ঋজুদার ডাক। ভটকাইয়ের মত যাদের 'রোগ' হাতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই তাদের জন্য বলে রাখি -- হাতির দলে যখন উঠতি কোনও তরুণ হাতি বলশালী হয়ে ওঠে, তখন দলের বৃদ্ধ সর্দারকে পরাজিত করে সে হয়ে ওঠে সেই দলের নতুন দলপতি। আর বৃদ্ধ পরাজিত এবং দল থেকে বিতাড়িত হাতিটি উন্মত্ত তাণ্ডব চালায় জঙ্গলে। সে হাতি ক্ষিপ্র, মেরে ফেলে জঙ্গলের আশেপাশের মানুষকেও। এরকম এক 'রোগ' হাতির শিকার দলে বাস করা হাতির শিকারের মত নেহাত সাদাসিধে নয়। ঋজুদার নিজের কথায় - "রোগ হাতিকে তোর খুঁজতে হবে না। সেই তোকে খুঁজে বের করবে।" অর্থাৎ শিকারী খুদ শিকার হো গয়া-র বড় সম্ভাবনা এই সাঙ্ঘাতিক জানোয়ার শিকারের ক্ষেত্রে। এহেন এক 'রোগ' হাতির শিকারের দায়ভার বর্তেছে ঋজুদা ও রুদ্রের উপর। এই হল গল্পের পটভূমি। রহস্য-রোমাঞ্চের টিপিকাল প্যাঁচালো পথে নয়, এ কাহিনী গড়িয়েছে সাবলীলতার সরলরেখা বরাবরই।
গল্পের মধ্যে সত্যিকারের রোমাঞ্চের জায়গা হয়ত কয়েক পাতা জুড়েই। গল্পের মূল অংশে প্রবেশ করতেও কুড়ি পাতার অধিক ব্যয়িত হয়েছে। কিন্তু, তা সত্ত্বেও বইটির প্রতিটি পাতাই সুখপাঠ্য, কারণ রোমাঞ্চ এ বইয়ের মূল প্রতিপাদ্য নয়। এ গল্প কুসুম-হরজাই-শিমূল-পলাশের, গভীর জঙ্গলের ভিতর আরও গভীর এক দহের, পাহাড়ের গা বেয়ে এঁকেবেঁকে চলা লাল রাস্তার, কিংবা ডিড-ড্য-ডু-ইট আর পিউ-কাঁহা পাখির। বাঘ্যমুণ্ডা-লবঙ্গির আশে পাশের জঙ্গলের এক মন-কাড়া রূপ লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন এই শিকার কাহিনীর মধ্যে দিয়ে। প্রিয়জন-ত্যক্ত উন্মাদ কম্ফু, আর দলতাড়িত অপমানিত 'রোগ' হাতি -- এই দুইয়ের মধ্যে যে একটি কমন বেদনার সুর রয়েছে তা গল্পের মধ্যে আরও একটি স্তর এনে দিয়েছে। আরও একটা সত্য - যেটা পড়তে পড়তে বারবার মাথায় এসে ঘোরাঘুরি করে গেছে, সেটা হল - এ জগতের অমোঘ প্রতিস্থাপনের নিয়ম। এক প্রজন্ম আসে, এক প্রজন্ম যায় - নিশ্চিতভাবে। আজ যে গর্বিত মধ্যমণি সে-ই কালের নিয়মে একদিন হয়ত 'রোগ' হয়ে হারিয়ে যাবে। কালোত্তীর্ণ কজনই বা হয়!
ঋজুদার গল্প আগে কোনওদিন পড়িনি। 'শিকার' শব্দটা শুনেই কেমন অনীহা জাগে। কিন্তু নির্জন প্রকৃতির পটভূমির প্রতি আমার একটা বায়াসনেস আছে বরাবরই। সেই বায়াসনেস, আর আনন্দের ফ্রী ডেলিভারির কুড়ি পার্সেন্ট ছাড়-এই দুইয়ের ঠেলা খেয়ে ঋজুদার দুটি বই কিনে ফেলেছিলাম। ঐ বায়াসনেসের ছাপ যে আমার পাঠ প্রতিক্রিয়াতে পড়েনি, তার গ্যারান্টি দিতে পারি না। কিন্তু, ঋজুদার হাত ধরে যে এক টুকরো জঙ্গল আমার বুকশেলফে উঠে এল - তা যে সবুজে-সবুজে আরও বড় হবে এটুকু বলতে পারি।