Jump to ratings and reviews
Rate this book

পিতৃগণ

Rate this book
বরেন্দ্রির ভূমিপুত্রনেতা ভীম ও তার সহযোদ্ধাদের নিশ্চিহ্ন করতে রামপালের সাথে যোগা দিয়েছে আঠারো রাজা-সামন্ত-মহাসামন্ত। অঙ্গদেশাধিপতি মথন দেব, মহাপ্রতিহার শিববাজদেব, রাজা কাহ্নুর দেব, রাজা সুবর্ণদেব পীটীর রাজা দেবরক্ষিত, মগধের অধিপতি ভীমযশাঃ, কোটাটবীর রাজা ভীরগুণ, উৎকলরাজ জয়সিংহ, দেবগ্রামের রাজা বিক্রমরাজ, অপরমন্দারের মহারাজা লক্ষ্মীশূর, তৈলকম্পের কল্পতরু রুদ্রশিখর, কুজবটীর শূরপাল, উচ্ছালের রাজা ময়গলসীহ, ঢেক্কাবীর রাজা প্রতীপসীহ, কজঙ্গলের নরসিংহার্জুন, সঙ্কটগ্রামের চণ্ডার্জুন, নিদ্রাবলীর বিজয়রাজ আর কোশাম্বীপতি দ্বোরপবর্ধন রথী-পদাতিক-অশ্বারোহী-হস্তিযুথ নিয়ে ভীমের বিপক্ষে।
তাদের হয় বীরগাধা রচনা করে ‘বরেন্দ্রী বাল্মিকী’ সন্ধ্যাকর নন্দী। তার কাব্য ঘোষণা করে রামপালেই সঠিক, আর ভূমিপুত্র কৈবর্তরা ধিকৃত। রামপালের সভাকবির কাছে কি অন্য কিছু আশা করা যায়?
এইভাবে বিকৃত হয়ে যায় ইতিহাস। কেউ জানবে না, ভূমিপুত্ররা যে যুদ্ধ লড়ছে সেটাই ন্যায়যুদ্ধ। কারণ সেটাই স্বাধীনতার যুদ্ধ।
তাহলে আমরা, তাদের হাজার পরের প্রজন্ম, কোনোদিন কি জানতে পারব না পিতৃগণের গৌরবের সমাচার?
জানব!
সেই জন্যই তো দাসজন্মের শৃঙ্খল দুমড়ে-মুচড়ে ছুঁড়ে ফেলে মাতৃভূমিতে ফিরে আসছে কৈবর্ত-কবি পপীপ। সেই জন্যই তো পুঁথি, ভূর্জপত্র, খাগের লেখনি আর ভূষামাটি লাক্ষার কালির পাশাপাশি কিব পপীপ অস্ত্রহাতে চলে যুদ্ধযাত্রায়।
জানব বলেই সেই পোড়ামাটি নিচে চাপাপড়া ইতিহাস শিল্পের আলো প্রক্ষেপিত হয়ে রচিত হয় উপন্যাস ‘পিতৃগণ’।

301 pages, Hardcover

First published February 1, 2011

4 people are currently reading
160 people want to read

About the author

Zakir Talukder

22 books16 followers
জন্ম ২০ জনুয়ারি ১৯৬৫, নাটোরে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক। স্নাতকোত্তর ডিগ্রী স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে। সমকালীন মূলধারার বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অপরিহার্যতা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। অনবরত বাঁকবদল তাঁর সাহিত্যিকতার প্রধান বৈশিষ্ট। বিষয় ও আঙ্গিকে, মাধ্যম ও প্রকরণে তাঁর স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত অবস্থান সকল মহলেই স্বীকৃত। পেয়েছেন বাংলা একাডেমিসহ দেশের প্রধান প্রায় সকল সাহিত্য পুরস্কার।

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
45 (65%)
4 stars
17 (24%)
3 stars
6 (8%)
2 stars
1 (1%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 23 of 23 reviews
Profile Image for Shuhan Rizwan.
Author 7 books1,108 followers
August 12, 2015
চকমকি ভাষা কী শরসম অন্তর্দৃষ্টি- সবই প্রশংসনীয়। কিন্তু পাঠক হিসেবে আমি অন্ততঃ চাই বক্তব্যের বা দৃশ্যের আড়ালে নিরেট একটি গল্প। সেই বিবেচনায় জাকির তালুকদারের পিতৃগণ আমায় মুগ্ধ করেছে।

পাল রাজাদের বিপক্ষে বিদ্রোহ করে হাজার বছর আগেই আমাদের প্রকৃত ভূমিপুত্রেরা ৩৭ বছরের জন্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একেবারে নিজেদের একটি সাম্রাজ্য। ইতিহাসের কাদা সরিয়ে, বরেন্দ্রর সেই লালচে মাটিতে ক্লান্তিকর এক ভ্রমণে লেখক তুলে এনেছেন সেই কৈবর্ত বিদ্রোহীদের কথা। পপীপ নামের কবি, দিব্যোক আর ভীম নামের কৈবর্ত রাজ- তাদের নিয়ে বড় চমতকার কাহিনী খাড়া করেছেন লেখক। আশেপাশে ভাষাহীন, দৃশ্যহীন, গল্পহীন সব উপন্যাস যখন ক্লান্ত করে- বহু প্রশংসা শুনে এই উপন্যাসটা পড়তে বসে সত্যিই মুগ্ধ হলাম।
Profile Image for Titu Acharjee.
258 reviews33 followers
May 29, 2020
বইটি শেষ করে অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম। কী পড়লাম এইটা! যে ইতিহাসের গল্প অন্যকেউ বলেনি কখনো,যে জাতির একটা গৌরবময় অধ্যায় হারিয়ে যেতে বসেছিল বিস্মৃতির অতলে...জাকির তালুকদার সেই ইতিহাস,কৈবর্তদের সেই গৌরবময় অধ্যায়টাই বর্ণনা করেছেন অসামান্য দক্ষতায়। তিনি তুলে ধরেছেন অন্যরকম এক আখ্যান, একইসাথে বাংলা সাহিত্যকে করে ফেলেছেন ঋণী। মাখনের মতো লেখনীর মধ্য দিয়ে,নিখাদ নির্জলা ইতিহাসের পথ ধরে এ যেন এক ঐতিহাসিক ভ্রমণ ছিল। নিঃসন্দেহে এই বইকে "মাস্টারপিস" বলা যায়,যা বাংলা ভাষাভাষী প্রত্যেক পাঠকের পাঠকরা অবশ্যকর্তব্য ও বলা যায়।
Profile Image for Mahmudur Rahman.
Author 13 books358 followers
November 29, 2018
একাদশ শতাব্দী। পালবংশের শাসনকাল চলছে। ইতিহাসে সাধারণত পাল শাসনামলকে 'স্বর্ণযুগ' বলে অভিহিত করা হয়। কিন্তু, প্রদীপের নিচে থাকে অন্ধকার।

দ্বিতীয় মহীপালের সময়ে বলা যায় তিনি নাম মাত্র রাজা ছিলেন। শাসনকাজ চালাত তার প্রভাবশালী অমাত্যবৃন্দ। যদিও পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, এ সময়ে হিন্দু ধর্মের ধ্বজা একটু একটু উঠতে শুরু করে। সেই ধ্বজার তলে, কিংবা 'অপশাসনের' তলে পিষ্ট হয় বরেন্দ্রির কৈবর্ত জনতা।

কৈবর্তরা এই ভূমির আদি বাসিন্দা। তারা সহজ সরল। ভূমিতে শ্রম দিয়ে ফসল ফলায়। অল্পে তৃপ্ত এই মানুষদের ভূমিতে বাইরে থেকে এসে গেড়ে বসেছে কিছু মানুষ। তারাই এখন শাসক। কেবল শাসন করেই ক্ষান্ত নয় তারা, কৈবর্তদের করে তুলেছে দাস। ধীরে ধীরে হাতিয়ে নিচ্ছে তাদের ভুমি।

কৈবর্ত একটি জাতি। কেবল তারাই নয়। ভইল, কোল, রাজবংশিদের একই দশা। তাদের দুর্দশার কারন তাদের সরলতা, তাদের নিরক্ষরতা।

দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যেমন সকলে রুখে দাঁড়ায়, তেমনি রুখে দাঁড়িয়েছিল কৈবর্তরা। দ্বিতীয় মহীপালের আমলে দিব্যকের নেতৃত্বে সংঘটিত হয় বিদ্রোহ। মহীপাল নিহত হলে কৈবর্তরা নিজেদের ভুমি ফিরে পেলো। কিন্তু সরলতাই কাল হলো তাদের। রামপাল শক্তিসঞ্চয় করে ফিরে এলেন আবার।

ঐতিহাসিক এই আখ্যানকে উপন্যাসে প্রকাশ করেছেন জাকির তালুকদার। লেখকের অনেক শ্রম এবং সাধনার কাজ 'পিতৃগণ'।

ঐতিহাসিক উপন্যাসে ইতিহাসকে সরাসরি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু ইতিহাসের প্রতি সৎ থাকা প্রয়োজন। লেখক তা করেছেন। কিন্তু উপন্যাস হিসেবে কিছু ঘাটতি যেন রয়েই গেলো।

বিস্তৃত এই ঘটনার প্রেক্ষাপট, কিন্তু সে কাহিনীকে সংক্ষেপে প্রকাশ করায় যেন কিছুতা অতৃপ্তি থেকে যাবে পাঠকের মনে। চরিত্রচিত্রণের ক্ষেত্রেও তাই। এই উপন্যাসের মূল চরিত্রগুলো যেন কেউই পুরোপুরি নিজেকে প্রকাশ করতে পারলো না। মল্ল, পপীপ, ভট্টবামন, সকলেই অপূর্ণ। কৈবর্তগণের সবচেয়ে যোগ্য রাজা ভীম, তাকে যুদ্ধের নেতা হিসেবে দেখলেও এ উপন্যাস তাকে প্রকাশ করে না কিছুতেই।

বাংলাদেশের সাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাস তেমন একটা নেই। 'প্রদোষে প্রাকৃত জন'-এর পরে 'পিতৃগণ' একটা সম্ভাবনাময় নাম হয়ে থেকে গেলো। জাকির তালুকদার খেটেছেন অনেক। ভূমিকা অংশে তার কাজের প্রতি তীব্র আকাঙ্খাও স্পষ্ট। উপন্যাস হিসেবে 'পিতৃগণ' উপভোগ্য, কেননা একটা নিরেট গল্প আছে এখানে। কিন্তু, 'আরও ভালো কিছু হতে পারতো' ধরনের একটা অতৃপ্তি রেখে যায়।
Profile Image for Sakib A. Jami.
337 reviews38 followers
February 12, 2024
ইতিহাস লেখা হয় বিজয়ীদের দ্বারা। বিজেতারা গল্প লেখে নিজেদের, হারিয়ে যায় পরাজিত সৈনিক। হয়তো কোনো এককালে বিজয়ী হিসেবে সে-ই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু কালের বিবর্তন এমন কিছু ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকে, যা প্রতিনিয়ত রং বদলায়। একেক সময় একেক গল্প, একেক রূপকথা! ইতিহাস যেন নানান ছন্দে, নানান গল্পে দৃষ্টির সীমানায় এনে দাঁড় করিয়ে দেয় কিছু অজানা বাণী। ইতিহাসের পাতাতেও হারিয়ে যাওয়া কিছু গল্প বিস্ময়ের জন্ম দেয়। হতবাক করে দেয়! কল্পনা কিংবা বাস্তবকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় এমনভাবে, বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। আবার অবিশ্বাস করাও যায় না! আজ তেমনই এক জাতির কথা হোক! এই বাংলার বুক-ই একসময় তাদের নিঃশ্বাসের প্রতিদান দিত। আর আজ? কালের বিলীনে তারাও বিলীন হয়ে গিয়েছে ইতিহাসের পাতা থেকে।

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ যেন সুন্দরের পূজারী। সৌন্দর্যের মোহে এমনভাবে হারিয়ে যায়, সব যেন সেখানেই মাথা নত করে। প্রাচীন কাল থেকে আধুনিক যুগ, এই ধারার পরিবর্তন হয়নি। এই উপমহাদেশ, কিংবা বাংলার মাটিতে একসময় বাস করত কৈবর্ত জাত। মাটির মানুষ, মাটিতে মিশে যায়। তাদের সেই রূপ কোনোকালেই ছিল না। তারপর একদিন এখানে আগমন ঘটে আর্য শ্রেণীর। অন্যদের চেয়ে রূপে গুণে নিজেদেরকে আলাদা প্রমাণ করে তারা।

‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ একটি প্রবাদ আছে। ঠিক সেই কাজটিই যেন করে এই আর্যদের জাত। উদ্বাস্তুর মতো আগমন, তারপর যেন নিজেরাই সর্বেসর্বা বনে যায়। শতশত বছর ধরে যারা এই ভূখণ্ডে নিজেদের তিলে তিলে গড়ে তুলেছে, একটি ভিত্তি স্থাপন করেছে— তারাই হয়ে গেল অবাঞ্ছিত। আর্যদের সৌন্দর্যের কাছে তারা হয়ে পড়ল কদর্য। ভূমিপূত্রদের নামে মায়েরা সন্তানদের ভয় দেখায়। এই অঞ্চলের আদী নিবাস যাদের, তারাই পরিচিত হয় অসুর নামে।

এভাবেই চলে যুগের পর যুগ। সময়ের স্রোতে ভেসে যায় অনেকখানি স্মৃতি। তখন চলমান পাল শাসন। মহীপাল রাজ্য শাসনে ব্যতিব্যস্ত। বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী মহীপাল হলেও তার একান্ত উপদেষ্টা ভট্টবামন আবার হিন্দুধর্মাবলম্বী। ধর্মে ধর্মে রেষারেষি প্রাচীনকাল থেকেই চলমান। সেখানে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের একসাথে চলা বিস্ময়ের জন্ম দেয়। যদিও বাহ্যিক দিক আর অভ্যন্তরীণ দৃষ্টি কখনো এক হয় না। তারপরও একদিকে চলে হিন্দুদের মন্দির প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে আচার্য্যদের চেষ্টা চলে বৌদ্ধ মহাবিহার প্রতিষ্ঠার। হয়তো বহুকাল পরে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবে সেই মহাবিহার।

যে সময়ের গল্প বলা হচ্ছে, তখন বরেন্দির মাটিতে কৈবর্তের বাস হলেও শাসনের নামে অত্যাচার, নিপীড়নে যেন মাত্রা ছড়িয়েছিল। চলছিল কৈবর্তদের উপর নানান ছলচাতুরি। নিজেদের মতো খেটে খাওয়া মানুষদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা চালাতে হয়। তারা একবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারলে, তা হতে পারে হুমকির কারণ। এভাবেই দিনাতিপাত হয়। ঋণ শোধের নামে বিষ্টি (বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম) দিতে হয়। বট্যপকে একদিন এভাবে ধরে নিয়ে যায়। ধরে নিয়ে যায় তার সন্তান পপিপকেও। শ্রম দেওয়ার মত বয়স এখনও পপিপের হয়নি। কিন্তু বাবার ঋণের দায়ে মাকে ছেড়ে তাকেও কাজ করতে হয়। শরীর চলে না, কিন্তু অত্যাচার ঠিকই চলে।

যুগে যুগে যতবার অন্যায়, নিপীড়ন শুরু হয়েছিল; ততবার কেউ না কেউ, কোনো না কোনোভাবে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবার হয়। কেউ দিব্যোক হিসেবে সবার মাথা হিসেবে, কেউ বা মল্ল নামের অন্য কোনো চরিত্রে। আগে মল্লর কথা বলা যায়। কৈবর্ত জাতের সুদর্শন এই মানুষটির নজর পড়ে পপিপের উপর। এই শিশুটির উপর ভারী কাজের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়, প্রতিবাদ করে মল্ল। তাকে নিয়ে যায় এখান থেকে সেখানে। শিক্ষিত করার এক ধরনের প্রচেষ্টা চলে। কিন্তু যে জাত কখনো পড়াশোনার ধারেকাছে চলে, সেই জাতির কাছে কীভাবে পৌঁছুবে অক্ষরের বাণী? পপিপের যে কেবল মাকে চাই।

দিব্যোকের দিকে চেয়ে আছে সকল কৈবর্ত। কৈবর্তদের মধ্যে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, জ্ঞানী, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকা এই মানুষটি তাদের নেতা। যার উপর ভরসা করা যায়, বিশ্বাস রাখা যায়। অন্যদিকে ভট্টবামনের গলার কাঁটার মত বিঁধে আছে যেন দিব্যোক। একদিন হয়তো এই কৈবর্তদের বরেন্দি স্বাধীন হবে। কোনো শাসনের আওতায় থাকবে না। দিব্যোক যেন সেই আশার বাণী শুনিয়ে যাচ্ছে।

কৈবর্তদের এই স্বাধীনতা সংগ্রামের চলছে। চলছে পপিপের মাকে খুঁজে ফেরা। অন্যদিকে পপিপ যেন নতুন জ্ঞান অর্জনে নিজেকে নিয়োজিত করছে। সে জ্ঞান কি সে পাবে? যে স্বপ্ন মল্ল দেখেছে, তার সেই স্বপ্ন পূরণ হবে? এই গল্প হাজার বছর আগের এমন এক সময়ের যে সময়ের বিলীন হয়ে গিয়েছে। ইতিহাস থেকে মুছে গিয়েছে মল্ল, দিব্যোক, ভীম কিংবা পপিপ। কেননা ইতিহাস ধরে রাখতে চাই অক্ষরের জ্ঞান। যে জাতির কোনো লিখিত ভাষা নেই, তাদের ইতিহাস লিখবে কে? যাদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা যায়, ইতিহাসে টিকে থাকে তারাই।

জাকির তালুকদারকে এজন্য ধন্যবাদ দিতে হয়— তিনি এমন এক জাতির কথা তুলে ধরেছেন, যাদের নিয়ে কেউ কথা বলে না। যুগ যুগ ধরে সমাজের নিচু জাতের মানুষেরা প্রতিনিয়ত নিপীড়নের শিকার হয়ে চলেছে। তাদেরকে অসুর, নীচ— যে যেভাবে অপদস্ত করতে পারে করে চলে। এমন মানুষদের কথা বলতে সাহস লাগে। যে সাহস জাকির তালুকদারের ছিল বলেই তিনি এমন এক উপাখ্যান রচনা করেছেন।

জাকির তালুকদারের লেখনশৈলী নিয়ে বলতে গেলে এক কথায় বলতে হয়— দুর্দান্ত! তার সাহিত্যের ভাষা বেশ পছন্দ হয়েছে। শব্দের মধ্যে কিছু কাঠিন্য রয়েছে, তবুও পড়তে খুব যে কষ্ট হয় এমন না। আমি সবসময় মনে করি সাহিত্য মানে শব্দের খেলা। এ খেলায় যে যতটা পটু সে ততটাই সফল। জাকির তালুকদার শব্দের এ খেলায় অনন্য। তার শব্দচয়ন, গল্পের পরিচালনা, ভাষার দখল, বাক্য গঠন সবকিছুতে পরিমিত ভাব ছিল। প্রতিটি বাক্য রচনা যেন মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। কিছু সাংস্কৃতিক শ্লোক ছিল, যার অনুবাদও করে দিয়েছেন। এর আগে জাকির তালুকদারের লেখা পড়া হয়নি। প্রথম বইতেই তিনি আমাকে মুগ্ধ করেছেন।

এই গল্পে আছে বিভিন্ন ধর্মের সংমিশ্রণ। বিশেষ করে কৈবর্তদের ধর্ম এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। একই সাথে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের কথাও লেখক বলেছেন। যে উদ্দেশ্য নিয়ে ধর্মের আবির্ভাব, মানুষের সংস্পর্শ পেয়ে সেই ধর্ম যেন উল্টো পথে হাঁটা ধরে। ধর্মের নীতিতে কোন ভেদাভেদ থাকে না। তারপরও জাতিগত ভেদাভেদ আসে কীসের ভিত্তিতে? মানবজাতি নিজেদের সুবিধা অর্জনের জন্য ধর্মকে নিজেদের মতো ব্যবহার করে। আর এতেই উচ্চজাত কিংবা নিম্নজাতের সূত্রপাত। নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়। অথচ ধর্ম কিন্তু আমাদের তা বলে না। সমাজের বিজ্ঞ ও ধর্মীয় প্রচারকদের এসব মিথ্যে বয়ান ও নিজেদের উচ্চ আসনে দেখানোর প্রয়াসই ধর্মের মূল উদ্দেশ্য কে ব্যক্ত করে। যার জন্য ভুক্তভোগী হয় ঊর্ণাবতীর মত কেউ কেউ।

কথায় আছে, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। কোনো একসময় হয়তো স্বাধীনতা আসে, বিজয়ের পতাকা উড়ে। কিন্তু এই স্বাধীনতা রক্ষা করা খুব কি সহজ? কেননা চারিদিকে শত্রুপক্ষের বিচরণ। পরাজিতরা হাল ছাড়ে না। হয়তো শেষ মারণ আঘাত দিতে প্রস্তুত হয়। যুদ্ধের ময়দানে তারাই বিজয়ী হয় যাদের কোন পিছুটান থাকে না। দেশ মাতৃকাকে স্বাধীন করার জন্য যারা লড়াই করে তাদের হারানোর সাধ্য কারো থাকে না। কিন্তু সব লড়াই নিয়ম মাফিক হয় না। ছলনার বশবর্তী হয়ে গল্পের স্রোত বয়ে যায় অন্যখানে। ছলচাতুরি করে কাগজে-কলমে বিজয়ী হওয়া যায়, কিন্তু প্রকৃত বিজয়ী হতে হলে সাহসী হতে হয়। কাপুরুষেরা পরাজয় দেখতে পেলে আঘাত হানে পেছন থেকে ফলে তাদের বিজয় শেষে, দেখতে হয় পরাজয়। মানবিকতার পরাজয়!

জাকির তালুকদারের সাহিত্যগুণ নিয়ে বলার কিছু নেই। সাহিত্যগুণ গল্পের মাঝেও ছড়িয়ে দিয়েছেন। এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়, কাব্য রচনা যেকোনো কাহিনিকে পরিবর্তন করে দিতে পারে। কাব্যের ছন্দে সত্যকে মিথ্যে হিসেবে উপস্থাপন করা যায়, আবার মিথ্যেকে সত্য বানানো চায়। যার কাব্যের জোর যত বড়, কলমের ক্ষমতা যত বেশি; ইতিহাসের ধারণ ক্ষমতা তার তত বেশি। এ কারণেই হয়তো ইতিহাসকে ধারণ করতে বেশি বেশি সাহিত্য রচনা করতে হয়।

উপন্যাসের শেষটা অন্যরকম। এখানে বদলে যায় ভাবনা। যে গতিতে উপন্যাস রচিত, তার ঠিক উল্টো স্রোতে ভেসে যায় সময়। প্রকৃত বিজয়ীরা কখনো কখনো বিজয়ের দেখা পায় না। উপন্যাসের শেষভাগ যেন তারই ইঙ্গিত করে!

পরিশেষে, কিছু দুর্দান্ত গল্পের আলোচনা হয় না। নিভৃতে থেকে যায় বিশাল কোনো উপাখ্যান। জাকির তালুকদারের “পিতৃগণ” ঠিক তেমনই একটি বই। যে বইয়ের কথা ছড়িয়ে পড়া উচিত। আড়ালে থেকে যাওয়া এক জাতির কথা সবার জানা উচিত। একই সাথে প্রকৃত সাহিত্য রস আস্বাদ করতে এমন বইয়ের বিকল্প নেই। কে বলে, বর্তমানে মান সম্পন্ন বই পাওয়া যায় না? স্তব্ধ করে দেওয়া এরূপ উপন্যাসই তৃপ্তি দেয়। আবার গল্পের সেটা জন্ম দে আক্ষেপ। এমন যে না বলেও পারত!

▪️বই : পিতৃগণ
▪️লেখক : জাকির তালুকদার
▪️প্রকাশনী : রোদেলা প্রকাশনী
▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৩০০
▪️মুদ্রিত মূল্য : ৩৫০ টাকা
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৫/৫
Profile Image for Ashkin Ayub.
464 reviews229 followers
December 20, 2021
‘পদ্মা নদীর মাঝি’নাকি ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’-কোনটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, তা নিয়ে পাঠক-সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ আছে। তেমনি ‘মুসলমানমঙ্গল’ নাকি ‘পিতৃগণ’-কোনটি জাকির তালুকদারের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, এ নিয়ে তার পাঠকদের মধ্যেও মতভেদ আছে।

একটা গ্রুপ স্টাডির অংশ হিসাবে এই বইটা হাতে নিয়েছিলাম। ব্যক্তিজীবনের নানা ব্যস্ততা আর কাহিনীর গাম্ভীর্য দেখে খুব তাড়াতাড়ি বুঝে নিয়েছিলাম, এই বই সহজে শেষ করা উচিত না কিংবা যাবেও না। প্রায় দুই মাস ধরে অল্প অল্প করে পড়ে শেষ করলাম। পাল-শাসন ও কৈবর্ত বিদ্রোহের মত টপিক নিয়ে ভিন্ন পার্সপেক্টিভে এত সুন্দর লেখা কল্পনাতীত। পপীপ নামের কবি, দিব্যোক আর ভীম নামের কৈবর্ত রাজ- তাদের নিয়ে বড় চমতকার কাহিনী খাড়া করেছেন লেখক। পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে, যাই লিখি না কেন, কম হয়ে যাবে।

হটাৎ আরেকটা না হওয়া বইয়ের কথা মনে পড়ে গেলো। ‘করতোয়া মাহাত্ম্য’। করতোয়া পারের কৈবর্ত মানুষের জীবন আর সংগ্রাম, তাদের ইতিহাস-বিশ্বাস, লড়াই করে জয়ী হওয়া কিংবা হেরে যাওয়াকে এক বিশাল ক্যানভাস। ইলিয়াস বলেছিলেন, এটি হবে তাঁর ‘মাস্টারপিস’। ক্ষণজন্মা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের না হওয়া বইয়ের জন্য তো একটু নিরাবতা পালন করাই যায়।
Profile Image for Farzana Raisa.
533 reviews239 followers
May 13, 2020
এত সুন্দর একটা বই এতদিন পড়িনি! ঐতিহাসিক বইয়ে একটা দারুণ ব্যাপার আছে, সেটা হলো পার্সপেক্টিভ। অর্থাৎ, ঐতিহাসিক বই লেখা হলে তার প্রেক্ষাপট কিংবা চরিত্র বা ঘটনা সম্পর্কে পাঠকেরা জানেন। লেখক ঘটনাটা ঠিক কীভাবে সাজাবেন, কীভাবে উপস্থাপন করবেন-সে��া সম্পূর্ণ লেখকের স্বাধীনতা। ঐতিহাসিক উপন্যাসের মজা এটাই, ঐ যে বললাম-পার্সপেক্টিভ, সেটাই।

প্রাচীন বাংলায় পাল আমলে রাজা রামপালের সভাকবি ছিলেন সন্ধ্যাকর নন্দী। সভাকবি হলে যা হয় বা রাজার আশীর্ব্বাদপুষ্ট হলে স্বাভাবিকভাবেই অনেক অত্যাচারী রাজাও হয়ে যায় প্রজা দরদী, মহামানব, গুণে গুণান্বিত, শৌর্যে-বীর্যে অন্যতম। সেই সন্ধ্যাকর নন্দীর বইয়ে উঠে এসেছে এক 'কুৎসিত নৃপ'-এর কথা। ভয়ংকর দুষ্টু ও খলচরিত্রের অধিকারী, ছলনায় জুড়ি মেলা ভার এমনই এক নিম্নজাতের রাজার কথা। সে রাজা হলেন কৈবর্ত রাজা দিব্যোক। আমরা যদি আরেকটু ইতিহাস ঘাঁটি দেখা যাবে সেই পাল আমলে একটা বিদ্রোহ ঘটেছিল (রাজার আমলে বিদ্রোহ তো হয় কতোই, সেসব আর মনে রাখে ক'জনা) কিন্তু এ বিদ্রোহটা করেছিল বরেন্দ্র'র ভুমিপুত্ররা, যাদের আদর করে বলা হয় আদিবাসী। আশ্চর্যের বিষয় সেই বিদ্রোহ সফলও হয়েছিল। প্রবল প্রতাপশালী পাল সাম্রাজ্যকে হারিয়ে ৩৭ বছর যাবত সফল্ভাবে রাজ্য পরিচালনা করে রাজা দিব্যোক, রুদক আর তার পুত্র ভীম।

সেই প্রাচীন পাল আমলে বসবাসকরা সহজ-সরল সাদাসিধে মাটির মানুষ কৈবর্তরা কেন-ই বা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল? কেমন ছিল তাদের জীবন যাপন?-মোটাদাগে বললে এটাই মূলত পিতৃগণের প্লট। তবে শেষ নয় এখানেই, ইতিহাস ঘাঁটলে আরেকজন গুণী মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাচীন বাংলার অভিজাত সব কবির সাথে উঠে আসে আরেকটি নাম-এক কৈবর্ত কবি। নাম তার পপীপ। লেখক পপীপের জীবনীও কিছুটা তুলে ধরেছেন বইয়ে।

অসম্ভব সুন্দর এই বইটা পড়ে আমি অতৃপ্ত। লেখক পিতৃগণ বইটা দুইটা অংশে ভাগ করেছেন। প্রথম অংশ পপীপের ছেলেবেলাকাল আর দিব্যোকের বরেন্দ্র জয়। দ্বিতীয় ভাগে পপীপের যৌবনকাল আর রাজা ভীমের রাজত্বের শেষাংশ। দিব্যোকের চরিত্র ডেভেলাপ হবার আগেই ধুমধাম যুদ্ধ শুরু, আর তাদের জয় -_- একদমই মেনে নিতে পারলাম না। আর পরবর্তী অংশে যেখানে কবি পপীপ চরিত্রটাকে আরও একটু ফুটিয়ে তোলা হবে বলে ভাবছিলাম বা কবি জীবন সম্পর্কে লেখা হবে তার আগেই যুদ্ধ শুরু, পপীপ খতম, ভীম খতম সেই সাথে বই-ও। (প্লিজ, স্পয়েলের অপরাধে আমাকে গালি দিবেন না, এটা ঐতিহাসিক বই, ইতিহাস সবাই জানে। যদিও লেখক দেখিয়েছেন ভীম যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেছেন আসলে তা না, ভীম জ্যান্ত ধরা পড়েছিলেন, পরবর্তীতে বিদ্রোহী হিসেবে তার খুব নিষ্ঠুর বিচার করা হয়)

সবকিছু সত্ত্বেও বইটা আমার পছন্দের তালিকায় একদম প্রথম দিকেই থাকবে, বইটা যতোটা না সুন্দর তার চেয়ে বেশি ভালো লেগেছে ভূমিকা হিসেবে বলা লেখকের কথাগুলো। সমতট অঞ্চলের মানুষ হবার পরও আফসোস লাগছে, আহা! ক্যান যে বরেন্দ্রীর মানুষ হতে পারলাম না! সবমিলিয়ে, বইটা নিয়ে একটু আক্ষেপ থেকেই গেলো আর কী।


বই-পিতৃগণ
লেখক-জাকির তালুকদার
প্রকাশনী-রোদেলা


#happy_reading
#বই_হোক_অক্সিজেন






Profile Image for Rehan Farhad.
247 reviews13 followers
November 26, 2023
অসাধারণ অনবদ্য এক কাহিনি
Profile Image for Akash Saha.
156 reviews26 followers
February 1, 2022
''.........কুন্ডলি পাকাতে পাকাতে ধোঁয়া রূপ নেয় মুষ্টিবদ্ধ একটি হাতের, যে হাত আরও উঁচুতে উঠে চলেছে । মুষ্টিবদ্ধ সেই হাতের ঊর্ধ্বারোহণের যেন কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। আকাশের সীমা কে দেখেছে কবে! এই হাত কী তবে আজ আকাশ অতিক্রম করবে! সেই মুষ্টিবদ্ধ হাত এতই উঁচুতে ওঠে যে তাকে দেখা যায় আর্যাবর্ত থেকে, তামিল থেকে, সাগরপারের সিন্ধু-গান্ধার থেকে । সেই ধোঁয়ার ভাস্কর্য পৃথিবীকে জানাচ্ছে— আবার আমি আসব! হাজার বছর পরে হলেও আসব! এই জাতির মুক্তি হয়ে ফিরে আসব!''

বাংলার ভূমিপুত্র, কৈবর্তদের নিয়ে লেখা অনবদ্য এক উপন্যাস - জাকির তালুকদারের 'পিতৃগন'। সময়কাল 1068 খ্রিস্টাব্দ, যখন বাংলার আদিসন্তান, কৈবর্তরা আগুন জ্বালে দ্বিতীয় মহীপালের বিরুদ্ধে,নিজেদের মাটি ছিনিয়ে আনে অত্যাচারী আর্যগোষ্ঠী থেকে। দিব্যোক- রুধোক ও ভীমের হাতে প্রায় ৩৭ বছর বাংলা, আরও স্পষ্টভাবে বললে বরেন্দ্র স্বাধীন ছিল। এরপর রামপালের কপটতার কাছে পরাজিত হয়ে, বাংলার প্রকৃত স্বাধীনতা চলে যায় আর্যদের কাছে৷ শোষিত হতে থাকে বাংলার অনার্যরা, ভূমিপুত্ররা, সাধারণ জনগোষ্ঠী। প্রায় সাড়ে আটশ বছর ধরে শোষিত হয়ে, হাজারো কপটতার স্বীকার হওয়ার ১৯৭১ এ আবার বাংলার মানুষ তাদের স্বাধীনতা ফিরে পায় মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। স্বাধীনতা ফিরেই পাবে না কেন? তার শরীরে বইছে কৈবর্তদের রক্ত, যারা কখনো নিজের মাটি ও মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন নি।

উপন্যাসের কাহিনি এগিয়েছে পপীপ এর মাধ্যমে। পপীপ ছিলেন একজন অনার্য কবি। অনেক ছোট থাকতে তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় অনেক দুরের এক আখক্ষেতে, কাজ করে তার পিতার ঋণ শোধ করতে। ধীরে ধীরে পপীপ বড় হয়, সৌভাগ্যক্রমে শিখতে পারে পড়া লেখা। একসময় সে হয়ে উঠে কৈবর্তদের সবচেয়ে বড় কবি হিসেবে, সেই কবি একসময় আবির্ভূত হয় একজন যোদ্ধা হিসেবে। সেই ছোট্ট পপীপ রামপালের সাথে অন্যায্য যুদ্ধে শহীদ হয়ে নিজের মাটির ঋণ শোধ করে।

রাজা দ্বিতীয় মহীপালের সময়ে বাংলার অনার্যদের উপর শোষণ সহ্যের সীমা অতিক্রম করে।যদিও পালরা নিজেদের এ দেশীয় বলে দাবি করত, কিন্তু তারা কখনোই অনার্যদের মেনে নিতে পারে নি। পাল দের মন্দির নির্মাণ, বৌদ্ধবিহার তৈরির সমস্ত খরচ যোগাতে হয় কৈবর্তদের। এছাড়া ঋণের বিপরীতে নিজেদের বিক্রি করে দেয়ার ঘটনাও বাড়তে থাকে।এমনকি কৈবর্তদের ধর্ম, তাদের ওলান ঠাকুরের উপরও আঘাত আসে শাসকগোষ্ঠী থেকে।সে সময় কৈবর্তদের নেতা ছিলেন দিব্যোক। দিব্যোক ছিলেন অনেক দূরদৃষ্টিসমপন্ন একজন নেতা৷ তার নেতৃত্বে এবং কৈবর্তদের সাহসিকতার কাছে পরাজিত হয় আর্যরা। প্রায় সাইত্রিশ বছর ধরে টিকিয়ে রাখে স্বাধীনতা। পরবর্তীতে ভীমের শাসনামলে, এক অন্যায় যুদ্ধে পরাজিত হয় বাংলার ভূমিপুত্ররা। ঠিক যেমন পরাজিত হয়েছিল নিষাদপুত্র একলব্য! রাতের অন্ধকারে মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বের মতো হত্যা করা হয় ঘুমন্ত কৈবর্তদের।

কৈবর্তদের অসামান্য এই বিদ্রোহ, যা ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে 'কৈবর্ত বিদ্রোহ' হিসেবে, সেই সময় নিয়েই লেখা উপন্যাস পিতৃগণ। বাঙালিরা বীরের জাত, তারা কখনো হার মানতে শেখেনি বহিরাগতদের কাছে, সেই পাল বংশ থেকে ইংরেজ, পাকিস্তান আমলে। কৈবর্তদের এই বীরত্বের কথা আর্যদের লিখিত ইতিহাসে নেই, তাদের সবসময় দেখানো হয়েছে অসুর, দস্যু হিসেবে। অনেক গবেষণার মাধ্যমে লেখক জাকির তালুকদার কৈবর্তদের বীরত্বগাথাকে এক সুতায় বেধেছেন। টুকরো টুকরো তথ্যসূত্রকে জোড়া দিয়ে অসামান্য এক উপন্যাস সৃজন করেছেন, যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।যদিও উপন্যাসটি শুধু কৈবর্ত বিদ্রোহ ও সমসাময়িক সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তবুও এই স্বাধীনতাকামী মনোভাবের, সংগ্রামের শিকড় অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। বাঙালির প্রাচীন ইতিহাস জানতে, ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায়ে পা ফেলতে অবশ্যপাঠ্য জাকির তালুকদারের 'পিতৃগণ' উপন্যাসটি।

বইয়ের নামঃ পিতৃগণ
লেখকঃ জাকির তালুকদার
প্রকাশনী ঃ রোদেলা
রেটিং ঃ ৪.৫/৫
Profile Image for Anik Chowdhury.
176 reviews35 followers
December 16, 2021
পিতৃগণ

"জিষ্ণুশুচিজীবিতেশকলানিধিকমলেশপবনধনদেনম্।
যং বেধা ব্যধিত স��াহারং কিল লোকপালানামা্।।১৬।।"

অনুবাদ—(ক,খ) এই রাজাকে (রামকে ও রামপালকে) সৃষ্টিকর্তা সম্ভবতঃ ইন্দ্র, অগ্নি, যম, চন্দ্র, বরুণ, পবন, কুবের, ও সুর্য্য এই অষ্ট লোকপালের সমহাররূপে বা একত্র সংগ্রহরূপে সৃষ্টি করিয়াছিলেন।

রামচরিতম্
-সন্ধ্যাকর নন্দী
অনুবাদ- ডক্টর রাধাগোবিন্দ বসাক

প্রাচীন কবি সন্ধ্যাকর নন্দী রামচরিতম্ গ্রন্থের রচয়িতা। এই কাব্যগ্রন্থ দ্ব্যর্থকরীতি অনুসরণে লেখা। যেখানে কবি একদিকে রামায়ণের মহানায়ক রামের এবং অন্যদিকে রাজা রামপালের গুণকীর্তন করেছেন এক যোগে একই সাথে। রামের সীতা হরণকে লেখক কৈবর্ত জাতি কতৃক পাল রাজ্য ছিনিয়ে নেওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। তবে যে বই নিয়ে আজকের আলোচনার যে বিষয় সেটি হলো সেই কৈবর্ত জাতির গুণগান। যাদেরকে ইতিহাস জানে বিদ্রোহী এবং প্রতারক হিসেবে। যেসব কারণে জানেন তার মধ্যে প্রধান কারণ এই কবি সন্ধ্যাকর নন্দী। যিনি রামপালের সভাকবি হওয়ায় উনার গুনগান গেয়ে কৈবর্তদের ছোট করে গিয়েছেন নিমিষেই।

"পিতৃগণ" লেখক জাকির তালুকদারের অন্যতম সৃষ্টি। যেখানে লেখক উপন্যাসের মাধ্যমে হাজার বছর আগের ইতিহাস ফুটিয়ে তুলেছেন। এমন এক ইতিহাস যেখানে আমাদের ভূমিপুত্রদের কথা বলা হয়েছে। তাদের উপর হওয়া অনাচারের কথা আমরা এখানেই জানতে পারি।

পটভূমি-

প্রাচীন প্রাজ্ঞ পতঞ্জলী বলেছেন, "আদর্শের পূর্ব, কালবনের পশ্চিম, হিমালয়ের দক্ষিণ এবং পারিযাত্রের উত্তর- এই চতুঃসীমাবিচ্ছিন্ন ভূমিই আর্যাবর্ত।" অর্থাৎ এই চতুর্সীমার মধ্যে আর্যদের বাস। তারা উন্নত ছিলেন যুদ্ধরীতিতে, রাজ্য পরিচালনায় ইত্যাদি ক্ষেত্রে।
আর অন্যদিকে হলো বাংলার আদী নারী-পুরুষগণ। যাদের ইতিহাস চিনে ভিল,শবর, রাজবংশী,কৈবর্ত জনগোষ্ঠী নামে। যারা নিজেদের ভূমিকে হাতের রেখার মতো চিনে। মাটি তাদের মা, তাদের সাথে অনবরত কথা বলেন ধরিত্রী মাতা। তাই তাদের হাতের ছোঁয়া পেলে তরতরিয়ে বেড়ে উঠে যেকোনো গাছপালা, শষ্যক্ষেত। যেন এটি মায়েরই পরম আশীর্বাদ।

একদিন আর্যরা এলেন, তারা এই ভূমির সন্তানদের চেয়ে সব কিছুতে আধুনিক হওয়াতে তারা তাদের দখল করে প্রভুত্ব রূপে আবির্ভূত হলেন। এই ভূমির সন্তানরা হলেন দাস! এই বইয়ের মূল কাহিনীই হলো সেই দাসদের যারা এই ভূমিরই আদী পুরুষ। তাদের নিজেদের দাসত্ব থেকে মুক্তির লড়ায়। আর্যদের শক্তির একটা আধার হলো লেখা। ওরা সংস্কৃত জানে। লিখতে জানে। আর্যরা তাদের লেখায় এই ভূমির সন্তানদের অসুর বলে গিয়েছেন। বিনিময়ে এই সন্তানরা কিছুই লিখে যেতে পারেনি কারণ তাদের লেখার ভাষা ছিলো না। নেতা দিব্যোকের নেতৃত্বে মহীপালকে পরাস্ত করে কৈবর্তরা দীর্ঘ সাইত্রিশ বছর স্বাধীন করে রেখেছিলো। ইতিহাস তাদের ভূমিকে।বরেন্দ্রভূমি নামে জানে। কিন্তু সুখ কী বেশিদিন সয়? যেখানে আর্যরা তাদের সম্মানের জন্য বাকি আঠারো।সামন্তসহ আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর তাদের কবি সন্ধ্যাকর নন্দী কৈবর্তদের ম্লেচ্ছ, অসুর, তাদের নেতা দিব্যোককে প্রতারক বলে কাব্য রচনা করে চলেছেন।
কৈবর্তদের তখন নেতা ভীম। তার মত আদর্শ নেতা কৈবর্ত জাতি আগে দেখেনি। আর তাদের হয়ে হয়ে।ইতিহাস রচনা করতে ছুটে আসছে কৈবর্ত জাতির একমাত্র কবি পপীপ। শেষ পরিণতি কোথায়?
হাজার বছর পরে কৈবর্ত,ভিল, শবর, রাজবংশীদের রক্তের সাথে মিশবে আরো একটি রক্তধারা সেটি হলো আর্য রক্তধারা। তৈরি হবে নতুন জাতি বাঙালির। এই জাতির রক্ত মিশিত হবে আরো বহু জাতির সাথে। আর হাজার বছর পরে কবি ভুসুক আর্তনাদ করবেন "আজি ভুসুক বাঙালি ভইলা।"

প্রতিক্রিয়া-

লেখক জাকির তালুকদারের অনবদ্য সৃষ্টি এই পিতৃগণ। কিন্তু এই বই নিয়ে আলোচনা দেখেনি তেমন, আন্ডারেটেড মনে হলো। লেখকের চমৎকার সাবলীল লেখা এই বইয়ের কাহিনীকে করেছেন গতিময়। লেখকের গবেষণার প্রসংশা করতে হয়। উপন্যাসের ঢঙে লেখক কত কিছু যে জানিয়ে গিয়েছেন! অনেক নতুন নতুন তথ্য আপনাকে চমকাতে বাধ্য করবে। হাজার বছর আগের না দেখা একটা অন্ধকার দিককে তিনি আলোতে এনেছেন বলে ধন্যবাদ জানাতে হয়। এই বইয়ের প্রধান চরিত্র পপীপকে মনে হলেও একসময় গিয়ে মনে হবে না, এখানে পপীপ নায়ক নয়। এখানের অনেক চরিত্রই নায়কের মতো। যেমন, ভীম, দিব্যোক,মল্ল কেউই ফেলনা নয়। এক কথায় চমৎকার!
এটিই বাংলার প্রথম সফল কৃষক বিদ্রোহ। তবে বইটি আরো বড় হওয়ার কথা ছিলো। হলে ভালো লাগতো। কেমন যেন তাড়াহুড়ো করে শেষ করে দিয়েছেন লেখক। তবুও ভালো।
Profile Image for Shakil Mahmud.
90 reviews42 followers
August 6, 2021
উপাখ্যান হিসেবে বইটা ভালো। শুধু ভালো না, অনেক ভালো। অনেক ইনফর্মেটিভ। ইতিহাসের প্রায় চাপা পড়ে যাওয়া এক অধ্যায়কে নতুন করে তুলে আনা অত সহজ কাজ নয় মোটেই। সেটা করতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে লেখককে। ভূমিকার অংশটুকু বেশ লেগেছে। ইতিহাসের প্রামাণ্য উপাদান সংগ্রহ করা যে কতটুকু হেকটিক হতে পারে, সেটা লেখক ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ভূমিকাতে দেখিয়েছেন। উত্তরবঙ্গের নানান অঞ্চল ঘুরে ঘুরে, কিছু অংশ পায়ে হেঁটে, রাতদিন একাকার করে, নিজের পেশাগত কাজ চুলোয় তুলে বিভিন্ন এলাকার মানুষ থেকে কৈবর্তদের সম্পর্কে কিংবদন্তী বা জনশ্রুতি গুলো সংগ্রহ করতে লেখককে প্রচুর পরিমাণ মানসিক ও শারীরিক স্ট্রেসের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। এমন পরিশ্রমী লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে বিন্দুমাত্রও দ্বিধাবোধ আসছেনা বা আসবেও না।

তবে উপন্যাস হিসেবে বইটা কিছুটা দুর্বল। অনেকগুলো চরিত্র ভালো মতো ফুটে উঠতে গিয়েও উঠতে পারেনি। কৈবর্তদের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলনায়ক দিব্যোকের চরিত্রটাই ঠিকমতো ফোকাসে আসে নি। কেমন যেন জলের উপর দিয়ে উড়াউড়ি। দিব্যোকের চরিত্র নির্মাণ আরো বেশি মজবুত হওয়াটা দরকার ছিলো। দিব্যোকের নেতৃত্বে রাজা মহীপালের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অংশটা (১ম পর্বের একদম শেষ অংশ) অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হয়েছে। ওই জায়গাটা আরেকটু বেশি ফোকাস ডিসার্ভ করে। বইয়ের শেষে এসেও তাড়াহুড়ো। ধুম করে ভীম মরে গেলো আর সেখানেই কাহিনী শেষ। এরপরে কৈবর্তদের কি হলো না হলো সেই বিষয়ে ন্যূনতম কোনো হিন্টসও দেয়া হলোনা। পরবর্তীতে রামপাল ক্ষমতায় এসে কৈবর্তদের উপরে অত্যাচার চালালো কিনা, অথবা তাদের বরেন্দ্রভূমিটাকে নিয়ে কি করলো সেটার কিছুটা হলেও তথ্য দিয়ে দিলে ফিনিশিংটা আরো ভালো।

এরপরেও বলবো, ওভারলি বইটা একটা দুর্দান্ত রকমের মৌলিক কাজ। বাংলা সাহিত্য ভান্ডারের মৌলিক একটা টুকরো হিসেবে একে অনায়াসে বিশেষায়িত করা যায়। এরকম আরো বেশি বেশি ইতিহাস ভিত্তিক মৌলিক কাজ হোক সেটাই কামনা করি।
Profile Image for Nazrul Islam.
Author 8 books228 followers
January 6, 2019
পৃথিবীর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত একমাত্র যে ভূমিপুত্র কৃষক জাতি দখলকার শাসকের হটিয়ে নিজেদের স্বাধীন রাজ্য গঠন করেছিল তারা এই বাংলারই একটি জাতি। ইতিহাস যাদের চেনে কৈবর্ত নামে। সুখেই ছিল বাংলার কোল,ভিম,শরব,পুলিন্দা,কোচ,রাজবংশী,কৈবর্তরা। মাটির মানুষ অরা।নিজেদের মধ্যে নেই কোন ছলনা।মাটির সাথে নিত্য তাঁদের বিচরন।বাংলার মাটি সব ভূমিপুত্রদের দিয়েছেও দুহাত ভরে। গোলাভরা ধান,নদীতে মাছ আর বনে শিকার। প্রকৃতি মাতা তার ভাণ্ডার খুলে দিয়েছেন মৃত্তিকার সন্তাদের জন্য। কিন্তু যায় দিন ভালো আসে দিন খারাপ।একদিন হা রে রে রে করে ভারতবর্ষে এল কিছু তস্কর। নিজেদের তারা প��িচয় দিতে লাগল আর্য বলে। দখল করে নিতে লাগল একের পর এক রাজ্য। কিছু কিছু জায়গা/রাজ্য তারা দখল করতে পারল না। যে সমস্ত রাজ্যগুলোকে তারা আখ্যা দিল পাপভূমি হিসাবে। আর সেইসব অঞ্চলে বসবাস করা মানুষজনকে তারা আখ্যা দিল অসূর গোত্রীয় অস্পৃশ্য বলে।
তাঁদের ছোঁয়া পাপ।তাঁদের রাজ্যে কেউ পা দিলেও পাপ মোচন করতে হত। কুক্ষিগত করতে না পারা রাজ্যগুলোর মধ্যে বাংলাও ছিল। তারপর শত শত বছরের চেষ্টার পর অবশেষে যখন বাংলা দখন করতে পারল তারা তখন এদেশে অনাদিকাল থেকে বসবাস করে আসা ভূমিপুত্ররা নিজেদের দেশেই হয়ে গেল পর।বাংলা তথা পুন্ডুর নাম দিল তারা বরেন্দ্র।
যার অর্থ দেবতা ইন্দ্রের বর প্রাপ্ত যে জায়গা।তাদের ভাষায় দেবতা ইন্দ্র তাদের আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে বাংলার লালা মাটি বর দিয়েছেন। করতোয়া নদি হয়ে গেল পূন্যনদ। আর এই অঞ্চলের আদি অদিবাসিরা হয়ে গেল কৈবত। নিজের ঘরেই তারা হয়ে গেল পর। নিজের বলে আর তাদের কিছু রইল না। তারা যে অচ্ছুৎ। ঠিক যেন বর্তমানের আগ্রাসী আমেরিকা। যারা কিনা অন্য কোন রাষ্ট্র দখল করার ছুতা খুঁজে এই বলে "ওদের কাছে মারণাস্ত্র আছে।" তাই নিজের মারণাস্ত্র দিয়ে নিপীড়িত রাষ্ট্রকে মারা তাদের জন্য জায়েজ। আর্যরারাও করেছিল ঠিক একই কাজ। এক সময় ভূমিপুত্ররা আবিষ্কার করে তাঁদের ঘর আর নিজেদের ঘর নেই। তাঁদের বন নদি আর তাঁদের নেই। নদীতে দিতে হয় নদী কর।বনে দিতে হয় বন কর।শোষণ লাঞ্ছনা বঞ্চনা সহ্য করে চলে গেল শতাব্দীর পর শতাব্দী। কারণ তারা যে ছল জানে না। কি করে নিজেদের ভুমি ফিরে পাবে। কিন্তু সহ্যের ও একটা সীমা থাকে। এক সময় মাথা তুলে দাঁড়াল তারা। সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ল পাল রাজা মহীপালের সাথে। নেতৃত্ব দিল দিব্যোক এবং অবশেষে শতাব্দীর পর শতাব্দী নিজেদের মাটিতে প্রজা হয়ে থাকার পর পেল স্বাধীনতা। কিন্তু বেশিদিনের জন্য নয়। মাত্র সাইত্রিশ বছর মুক্ত রাখতে পেরেছিল তারা বরেন্দ্রীকে।
এই বই জানাচ্ছে বাংলার সেই ভূমিপুত্রদের সেই বীর গাঁথা।

বাংলার ইতিহাসে কৈবর্ত বিদ্রোহ এবং তার ফল খুব কম সময়ের জন্য হলেও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আফসোসের কথা সেই নিয়ে খুব একটা লেখালেখি কেও করেওনি। সত্যেন সেনের "কৈবর্ত বিদ্রোহ" একমাত্র বই যাতে মোটামোটি কিছুটা বর্ননা করা হয়েছে এবং শওকত আলীর "প্রদোষে প্রাকৃতজন" ওই সময়ের সামাজিক অবস্থা কিছুটা তুলে ধরলেও পূর্নাঙ্গ ছিল না। সেই হিসাবে জাকির তালুকদারের "পিতৃগণ" নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের মুকুটে একটা গুরুতবপূর্ণ পালক। বইটি লিখতে লেখকের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। দীর্ঘ আট-নয় বছর গবেষণা করে অতপর তিনি রচনা করেছেন "পিতৃগণ"। এত শ্রম এত আত্নত্যাগ বৃথা যায়নি। অবশ্যই বলতে হয় আমার পড়া গত বছরের (বইটা শুরু করেছিলাম ২০১৮ এর শেষের দিকে। ) সেরা একটা বই।

কাহিনী আবর্তিত হয়েছে কৈবর্ত ভূমিদাস এবং কবি পপীপকে ঘিরে।সাথে আছে মল্লা, সেবাদাসী উর্ন্নাবতী,দিব্যোক আর ভীম।কবি পপীপ ভূমিদাস থেকে কীভাবে কবি হয়ে উঠেছিলেন এবং শ্লোক কীভাবে কৈবর্তদের মনে প্রভাব বিস্তার করে তাঁদের ইতিহাস সংস্কৃতি সম্পর্কে সবার করেছেন বয়ান করে গিয়েছেন তাই বর্ননা করা হয়েছে। সাথে আছে কৈবর্ত বিদ্রোহের মূল কারিগর দিব্যোক।দিব্যোক আর ভীম আমাদের নিয়ে যাবে বরেন্দ্রীর সেই উত্তাল সময়ে। দিব্যোকের চোখে আমরা দেখবো কীভাবে বরেন্দ্রী মুক্ত হল। আর ভীমের চোখে আমরা দেখব কীভাবে পাল রাজা রামপালের কাছ থেকে নিজের ভূমি রক্ষা করার আপ্রাণ প্রেচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।

বই লিখতে লেখক অনেক গবেষণা করেছেন। অনেক অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাই চাচ্ছিলাম না বইটা নিয়ে কিছু বলি। তবুও কিছু কথা থেকে যায় যা না বললেই নয়। বইটার শুরু হয়েছিল দারুণভাবে খুব সুন্দরভাবে কৈবর্তের উপর চলা অত্যাচার,রাজকুট কৌশল এবং কৈবর্ত বিদ্রোহের বর্ননা করে যাচ্ছিল লেখক।কিন্তু প্রায় শেষের দিকে এসে কাহিনীর দ্বিতীয় অংশ শুরু হয় এবং প্রথম অংশ জুড়ে যেই পপীপ চরিত্রকে তৈরি করা হচ্ছিল সামনের জন্য তাকে জন রকম সুযোগ না দিয়েই ধুপধাপ কাহিনী শেষ করে দেওয়া হল। যেন মনে হল দীর্ঘ আট বছর ধরে লেখক লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছেন এইবার সময় হয়েছে ঘাড় থেকে ঝামেলা ফেলে দেওয়ার। তাই প্রায় দুইশো পাতা জুড়ে যেই কাহিনী তিনি তৈরি করেছেন দ্বিতীয় অংশের জন্য,সেটি মাত্র ত্রিশ চল্লিশ পাতায় ধুপধাপ করে শেষ করে দিয়েছেন।

বই লিখতে লেখক অনেক গবেষণা করেছেন। অনেক অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাই চাচ্ছিলাম না বইটা নিয়ে কিছু বলি। তবুও কিছু কথা থেকে যায় যা না বললেই নয়। বইটার শুরু হয়েছিল দারুণভাবে খুব সুন্দরভাবে কৈবর্তের উপর চলা অত্যাচার,রাজকুট কৌশল এবং কৈবর্ত বিদ্রোহের বর্ননা করে যাচ্ছিল লেখক।কিন্তু প্রায় শেষের দিকে এসে কাহিনীর দ্বিতীয় অংশ শুরু হয় এবং প্রথম অংশ জুড়ে যেই পপীপ চরিত্রকে তৈরি করা হচ্ছিল সামনের জন্য তাকে জন রকম সুযোগ না দিয়েই ধুপধাপ কাহিনী শেষ করে দেওয়া হল। যেন মনে হল দীর্ঘ আট বছর ধরে লেখক লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছেন এইবার সময় হয়েছে ঘাড় থেকে ঝামেলা ফেলে দেওয়ার। তাই প্রায় দুইশো পাতা জুড়ে যেই কাহিনী তিনি তৈরি করেছেন দ্বিতীয় অংশের জন্য,সেটি মাত্র ত্রিশ চল্লিশ পাতায় ধুপধাপ করে শেষ করে দিয়েছেন। কিন্তু কাহিনীর দাবী ছিল আরো কম করে হলেও দুইশ পাতা। নিদেহপক্ষে একশো পাতা। তাহলে বইটি পূর্নতা পেত।
তাই বইটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কালজয়ী বই হওয়া থেকে পিছিয়ে গিয়ে শুধুই অসাধারণ একটা বই হয়েই থাকবে।


রেটিং- ৪.৫/৫
Profile Image for Dhiman.
179 reviews14 followers
April 17, 2025
গুডরিডসের বদৌলতে ভালো একখানা রত্নের খোঁজ পাইলাম।

ঐতিহাসিক জনরা আমার বরাবরই প্রিয়। তাই যখন যাহা ঐতিহাসিকতার খোঁজ পাই সংগ্রহ করিয়া রাখি। ঐতিহাসিক কাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর ভাষা। উদাহরণস্বরূপ শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলোর কথা বলা যায়। শরদিন্দুর উপন্যাস গুলো কী কাহিনীর জোরে এতটা অপ্রিসিয়েটেড হয়? না। শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাস গুলোর এতটা এপ্রোসিয়েটেড হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে তার ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো, তার বর্ণনা ভঙ্গি, যে ভাষায় লিখা হয়েছে সেই ভাষা, তার চরিত্র গঠন, ঐতিহাসিকতা ফুটিয়ে তুলতে যথাযোগ্য শব্দের ব্যবহার। এগুলোর পরে আসে তার নিজস্ব মন গড়া একটি কাহিনী। তাই ঐতিহাসিক উপন্যাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গল্প বলার ধরন। পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহাসিক উপন্যাস তো অনেক লিখিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে কোন লেখক এর কি কোন ঐতিহাসিক উপন্যাস আছে? এ প্রশ্ন আমার মনে আসতো। হুমায়ূন আহমেদ কিছু কাজ করে গেছেন। কিন্তু আমি চাইছিলাম একদম কোর ঐতিহাসিক উপন্যাস। কিভাবে কিভাবে যেন গুডরিডসে এটির খোজ পেয়ে গেলাম। বিষয়বস্তু পড়ে বুঝলাম যে এটি হচ্ছে পাল শাসন আমলের কৈবর্ত কৈবর্ত বিদ্রোহ নিয়ে। তারপরে ভাবলাম যে এটি সংগ্রহ করতেই হচ্ছে তার উপর নিজের দেশের একজন লেখক এর উপন্যাস। পড়ে শেষ করার পর দারুন অনুভূতি হচ্ছে। দারুন একটু ঐতিহাসিক উপন্যাস। প্রথমে আসি বর্ণনা ভঙ্গি শব্দচয়ন। ঐতিহাসিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই জিনিসটাই। এবং এই উপন্যাসের ভঙ্গি শব্দ চয়ন এতটাই দারুণ যে বলাবাহুল্য। বাংলাদেশি কোন লেখকের বাংলা ভাষার উপর এতটা দখল আছে সেটা এই উপন্যাস না পড়লে জানতে পারতাম না। তারপর চরিত্র গঠন। চরিত্র গঠনও বেশ প্রশংসাযোগ্য। বেশ দারুন দারুন কিছু চরিত্র লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন তার অক্ষরের গুণে। পপীপ, মল্ল, উর্ণাবতী, পরমভট্টারক প্রমুখ। তারপর সে গল্প নির্মাণ। গল্পের প্লটটিও দারুন ভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। এবং যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে সেটার গুনে বইটা এটা আপনাকে ধরে রাখবে। আসলে বর্ণনার গুণেই এই বইটা পড়তে এত আরাম। বর্ণনা গুলি এত সুন্দর স্পেশালি শেষের দিকের যুদ্ধের বর্ণনাগুলো দারুণভাবে দেয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এরকম একটি বই নিয়ে সেরকম কোনো কথা হতে দেখা যায় না।

বইটির একমাত্র খারাপ দিক হচ্ছে বইটি যতটা ভালোভাবে শুরু হয় কিছু কিছু জায়গায় বইটি পড়ে যায়।
Profile Image for Nayeem Samdanee.
58 reviews11 followers
March 23, 2023
ইতিহাস ক্ষেত্রবিশেষে প্রবঞ্চক হয়, কারণ ইতিহাস পুরোপুরি নিরপেক্ষ হতে পারে না। মানুষই ��সব ন্যারেটিভ তৈরি করে, ইচ্ছেমতো বদলায়ও। প্রায় সহস্র বছর আগে যখন তথ্যের যথেচ্ছ বিকৃতি ঘটার সুযোগ ছিলো, সেই সময়কার এক অন্ধকারবৃত ইতিহাস বর্ণিত হয় জাকির তালুকদারের লেখায়। আমরা পাই পাল শাসনামলের শেষদিকে বাঙলার বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূমিপুত্র কৈবর্ত এবং আরো অন্যান্য আদি জনগোষ্ঠীর মানুষের কথা, তাঁদের নিজেদের মতো আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেবার জন্য আর্য‌ শাসকদের তীব্র লালসা আর বিপরীতে মাতৃভূমি রক্ষার্থে কৈবর্তদের বীরোচিত আখ্যান। বিশ্বাস করা কঠিন যে, এই বাঙলার বুকে ৩৭ বছর ধরে কৃষকশাসিত একটি রাজ্যের অস্তিত্ব ছিলো, যা রচিত হয়েছিলো নিতান্ত সাধারণ মানুষের একতাবদ্ধতা, শৌর্য ও রক্তে। এই সংগ্রামের গল্প ইতিহাস বইতে পাওয়া যায় না। প্রচলিত ইতিহাস কেবল বিজয়ী রাজাদের তোয়াজ করে, কারণ সেইসব রাজাদের ছিলো পোষা কবি, যারা ধন আর অন্নের বিনিময়ে ইচ্ছেমতো বানোয়াট প্রশংসায় স্নাত করেছে প্রভূকে। তবে এ-ও ঠিক, এই ধরনের উপন্যাসে নিরপেক্ষ থাকা কঠিন। কৈবর্তদের প্রোটাগনিস্ট হিসেবে বর্ণনা করার ফলে ক্ষেত্রবিশেষে লেখকের কিছুটা পক্ষপাত প্রকাশ পেয়েছে, এমনটা বলা হয়তো অত্যুক্তি হবে না। তারপরও স্বীকার করতে হবে, ভূমিপুত্রদের সংগ্রাম নিয়ে এমন লেখা অনবদ্য। কারণ, এই ইতিহাস বিস্মৃত হয়ে হয়ে যাওয়া কাম্য নয়। জাকির তালুকদারের গদ্য ঝরঝরে, উপভোগ্য। এছাড়া এই উপন্যাস লিখতে তাঁকে যে পরিমাণ খাটতে হয়েছে, সেটি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
Profile Image for Md Khalid Rahman.
137 reviews38 followers
January 29, 2024
সেই কত হাজার বছর আগে আর্যাবত থেকে পঙ্গপালের মতো এসে আর্যরা দখল করে নিলো এই মাটি, ভূমিপুত্রদের পরিণত করলো নিজেদের দাস। দেবকূলজাত বলে দাবী করা আর্যরা কেড়ে নিলো তাদের স্বাধীনতা, ধর্ম পালনের অধিকার, জীবনের মালিকানা, আখ্যায়িত করলো অসুর বলে।

পিতৃগণ সেই ভূমিপুত্রদের রুখে দাড়াবার ইতিহাস। ভুলে যাওয়া, অজানা এক সময়ের আখ্যান।

নিষাদপুত্র একলব্যের বংশধরেরা কখনো হার মানে নি অন্যায়ের কাছে, মানবেও না; বিজয়ীর লেখা বিকৃত ইতিহাস তাদের কথা মনে রাখুক, বা না রাখুক। কালের পরীক্রমায় আর্যদের রক্ত ভূমিপুত্রদের সাথে মিশে গেলেও আমার বিশ্বাস আমাদের রক্তে আজও দিনশেষে এই মাটির সেই শোষিত ভূমিপুত্রদেরই টান।

পপীপ, দিব্যোক, ভীম, মল্ল, ঊর্ণাবতীদের এই গল্পের পরিসর আরও বহুগুণে বৃহৎ হওয়ার দাবি রাখে।
Profile Image for Rifat Shohan.
34 reviews19 followers
September 12, 2021
এই বছরে আমার পড়া অন্যতম সেরা একটা বই। এরকম মাস্টারপিস বই এতদিন পরে কেনো পড়লাম এটা ভাবতেই খারাপ লাগছে। পাল শাসনামল ও কৈবর্ত বিদ্রোহের মত একটা পরিচিত টপিক নিয়ে একেবারে ভিন্ন পার্সপেক্টিভে এত সুন্দর লেখা কল্পনাতীত। একটা বই পড়েই জাকির তালুকদার আমার পছন্দের লেখকের লিস্টে ঢুকে গেলো। এই লেভেলের বইয়ের রেটিং দেয়া খুবই সহজঃ ৫/৫।
Profile Image for Rehnuma.
449 reviews21 followers
Read
October 16, 2024
❛সক্রেটিসকে নিয়ে এরিস্টোফানিস যখন ❛The Clouds❜ নামক প্রহসন রচনা করেছিলেন তখন এথেন্সবাসী ছিঃ ছিঃ রব তুলেছিল। সক্রেটিস সম্পর্কে একটা বাজে ধারনা ছড়িয়ে গিয়েছিল। তখন প্লেটো সারা কবি সাহিত্যিকদের উপর রাগ করে নিজের রচনা করা সকল সাহিত্য জ্বালিয়ে দেন। কারণ কী?
তার মতে কবি সাহিত্যিকরা চাইলেই সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য করতে পারে। মানে তাদের রচনায় যে কারো জীবনে বিপদও নেমে আসতে পারে। কথাটা কিছু ক্ষেত্রে ভুল কী?❜

লেখ্য ইতিহাসের জোর অনেক বেশি। আর সেই লেখক বা কবিরা যদি নিরপেক্ষ না হয়ে একপাক্ষিক ইতিহাস লিখে তবে পরবর্তী প্রজন্ম কী জানবে? লেখার জোর কতখানি সেটা ইতিহাসের সত্য মিথ্যে ঘাটলেই প্রমাণ হয়।
তেমনই এক হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস আছে বাঙালির। বাঙালির আদি জাতিদের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস। কিন্তু এই ইতিহাস জ্ঞাত আছে খুব কম লোকই। কারণ ঐযে প্রচার আর লিখিত ইতিহাসের জোর।
হাজার বছরেরও বেশি আগে বরেন্দির লাল মাটির বাসিন্দা ছিল কৈবর্ত জাতি। মাটিই ছিল তাদের প্রাণ। চাষবাস করে সুখে দিন কাটাতো তারা। কারো সাথে কারো বিবাদ ছিল না। তবে সুখ হয়তো কপালে ছিল না তাদের। তাই বাংলার মাটিতে আগমন ঘটলো আরেকদলের। যারা নিজেদের আর্য বলে পরিচয় দেয়। তাদের সীমানির্দেশ বলে,

❛প্রাগ্ আদর্শাৎ প্রত্যক্ কালকবনাদ্ হিমবন্তম্ উত্তরেণ পরিযাত্রম্।❜
অর্থাৎ, ❛আদর্শের পূর্ব, কালকবনের পশ্চিম, হিমালয়ের দক্ষিণ এবং পরিযাত্রের উত্তর - এই চতুঃসীমাবচ্ছিন্ন ভূমিই আর্যাবর্ত।❜

কিন্তু নিজের সীমা ছেড়ে তারা বরেন্দিতে বলতে গেলে ❛উড়ে এসে জুড়ে বসেছে❜। আবার খবরদারি করছে এদের আদি বাসিন্দাদের সাথেই। নিজেদের আর্য বলে আখ্যা দিয়ে কৈবর্তদেরকেই অচ্ছুত, নিচু, অ সু রজাতি হিসেবে দাস বানিয়ে রেখেছিল। নিজের ভিটেয় নিজেরাই পরাধীন হয়েছিল।
ধর্মের নামে রাজনীতি আর কূটনীতি প্রাচীন ব্যাপার। এই ধর্মের দোহাই দিয়ে নানা শ্লোক এই মনুর সংহার দেখিয়ে কৈবর্তদের নানা অ ত্যা চা রে নিমজ্জিত রেখেছিল তারা। আজ এই বিধান তো কাল ঐ বিধান। কাল একে দাস বানিয়ে নিচ্ছে তো পরশু দলবেঁধে তাদের বেগার খাটাতে নিয়ে যাচ্ছে। এমন অনাচারেই চলছিল দিন।

সময় একাদশ শতাব্দী। তখন শাসন করছে রাজা দ্বিতীয় মহীপাল। তবে সে নামের রাজা। সব কাজ চালায় তার মহামান্য মন্ত্রী ভট্টবামন। রাজা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হলেও বামন হিন্দু। নিজের পছন্দের লোকেদের রাজ্যের বড়ো দায়িত্বে বসিয়ে রেখেছেন। আর সমানে চলছে নিচু জাতের প্রতি অন্যায়। তাদের প্রধান শিকার যেন আদি বাসিন্দা কৈবর্তরাই। রানীরা স্বপ্ন দেখেন মন্দিরের আর নিমিষেই কোনো এক কৈবর্ত গ্রামকে দান করে দিয়ে হয় মন্দির নির্মাণের কাজ। থেমে থাকে না বৌদ্ধ মহা বিহারের কাজও। আর তার সাথে অ ত্যা চা রি ত হতে থাকে অ সু র খ্যাত জাতি।
এমন অত্যাচারের শিকার বট্যপ। বিশাল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে আত্মবিক্রি হয় সে রামশর্মার ইক্ষুক্ষেতে। ভারী ঋণের সাথে চড়া সুদের অংক যেন আজীবন দাস হিসেবে খেটেও শোধ হবার নয়। তাইতো তার ছোট্ট ছেলে পপীপকেও ধীরে নিয়ে যায় ইক্ষুর দাস হিসেবে। তবে বিধাতার লিখন যেন ছিল ভিন্ন। ইক্ষুখেতে পিতাকে পায় পপীপ। কিন্তু পিতার চেয়েও আপন হিসেবে পায় মল্লকে। তার জীবন বদলে দেয়ার এক কারিগর।
পপীপকে মল্ল গড়ে তুলতে চায় অন্যভাবে। যেই জোরের জন্য কৈবর্ত জাতি নি পী ড়িত আর যেই জোরের ফলে আর্যরা সবল পপীপকে সেই জোর আনতে হবে। হতে হবে কৈবর্ত জাতির ইতিহাসের বাহক। পপীপ কি পারবে সেই কবি হতে?

প্রত্যেক অন্যায়ের বিরুদ্ধেই রুখে দিতে একজনের আবির্ভাব ঘটে। কৈবর্ত জাতির জন্য সেই রক্ষাকর্তা হিসেবে আসে দিব্যোক। পাল রাজা মহিপালের বিরুদ্ধে দিব্যোকের নেতৃত্বে যু দ্ধ (ইতিহাস বলে বিদ্রোহ) করে বরেন্দির স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনে কৈবর্তরা।
তবে স্বাধীনতা হাতে আসার পর সবথেকে কঠিন কাজ সেই স্বাধীনতা রক্ষা করা। দিব্যোকের পরবর্তী পুরুষেরা পারবে সেটা রক্ষা করতে?
দিব্যোক, রুদোক এবং পরবর্তীতে ভীমের সুযোগ্য নেতৃত্বে কৈবর্তরা তাদের স্বজাতি সহ অন্যান্যদের সাথে সুখে দিনযাপন করতে থাকে। ওদিকে থেমে নেই পাল বংশের প্রদীপ।
রামপাল লোক জড়ো করছে গৌরের ক্ষমতা আবার ফিরিয়ে আনার। তার লোকবল অনেক বেশি। কিন্তু কৈবর্তদের আছে মাটির প্রতি প্রেম, কট্টলির প্রতি প্রেম।
দুই পক্ষই তৈরি হতে থাকে সম্মুখ সমরের। অসম যু দ্ধ। কে জয়ী হবে?
এদিকে পপীপের দায়িত্ব অনেক। সে যেমন সম্মুখ সমরে আছে। আছে সংস্কৃত শ্লোক দিয়ে তাদের ইতিহাসগাঁথা রচনায়। অনেক বছর আগে দাসত্ব থেকে পালিয়ে সে লালমাটিতে এসেছে নিজের এতবছর ধরে পাওয়া শিক্ষার প্রয়োগ ঘটাতে। সে কি পারবে কবি সন্ধাকরে নন্দীর মতো বা তার থেকেও উন্নত করে কৈবর্ত ইতিহাস লিখতে? নন্দী তো রাজাকে খুশি করতে একপাক্ষিক ইতিহাস লিখেছে। যা মানুষ জেনে আসবে তার সত্যতা নিয়ে আছে সংশয়। নিজেদের ইতিহাস গড়তে হবে তাকে। ওদিকে যু দ্ধের দামামা বাজছে।
ইতিহাস শুধু বিজয়ীর গাঁথা লিখে। আমরা পরাজয়ের খবর জানিনা। জানি শুধু বীরের কথা। ভীম এবং কৈবর্তদের গাঁথা কোন পক্ষে থাকবে?

হাজার বছর পর কাদের জয়গান জানবে প্রজন্ম?


পাঠ প্রতিক্রিয়া:

বাংলার অতীত ইতিহাসে আছে অনেক সুখ-দুঃখগাঁথা। সেই ইতিহাস সোনালী আবার কখনো র ক্তা ক্ত। পাল থেকে পর্তুগিজ, ইংরেজ শাসন হয়ে আবার পাকিস্তানের শাসন। এরপর আবার ৭১ এর র ক্ত ক্ষ য়ী যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ নামক দেশের জন্ম (নাকি পুনর্জন্ম?)। এই ইতিহাস সত্য-মিথ্যে-মিথ মিশে একাকার। আমরা তার কতটুকুই জানি?
অজানা ইতিহাসের সাগরে ডুব দিয়ে বাংলার আদি বাসিন্দা কৈবর্ত জাতির বীরত্বকে দুই মলাটে আবদ্ধ করেছেন লেখক জাকির তালুকদার তার ❝পিতৃগণ❞ উপন্যাসে।
এই উপন্যাসের মূল কাহিনি কৈবর্ত জাতি। ইতিহাসে আর্যদের বীরত্বগাঁথা আর তাদের জয়জয়কার শুনতে শুনতে আমরা হারিয়ে বসেছিলাম বাঙালির ভিত। সেই ভিতকেই যেন মাটির নিচ থেকে খুঁড়ে এনেছেন লেখক। উপহার দিয়েছেন চমৎকার এক উপন্যাসের।
ইতিহাসে পাল শাসনামলকে বলা হয় সেরা। তাদের বীরত্ব নিয়ে আছে ইতিহাস কিন্তু ভালোর ভেতরের কদর্য রূপ খুব কমই দেখা যায়। আর রক্ষণাবেক্ষণের ফলে সে ইতিহাস ফুলে ফেঁপে ওঠে। তাই আমরা পাল রাজাদের ভালো কথা জানি। আর নির্যাতিত জাতিকে চিনি বিদ্রোহী এবং বিশ্বাস ঘা ত ক হিসেবে।
লেখক তার কঠিন গবেষণা এবং দিনের পর দিন পায় হেঁটে ইতিহাসের খোঁজ করে এমন এক উপন্যাস রচনা করেছেন যেখানে আলোর অন্ধকার দিকের কথাও জানতে পেরেছি। প্রায় এক হাজার বছর আগের চাপা পড়া ইতিহাসকে ধুলো মুছে আমাদের সামনে এনেছেন তিনি।
পুরো উপন্যাসে কৈবর্তদের জীবনের গ্লানি, দুর্দশা এবং পরাধীনতার শেকলের করুন বর্ণনা এসেছে। এসেছে তাদের স্বাধীনতা পাওয়ার পরবর্তী ৩৭ বছরের সোনালী দিনের কথা।
লেখকের বাক্যগঠন, শব্দচয়ন এবং শব্দের প্রয়োগ প্রশংসা করার মতো। ভূমিকায় লেখক অনেক সময় নিয়ে লিখেছেন এই উপন্যাসের রচনায় যে শ্রম দিয়েছেন তার কথা। সেখানে ভাষাগুলো পড়তে অপেক্ষাকৃত কঠিন মনে হচ্ছিল। ভাবছিলাম হয়তো ভালো লাগবে না বইটা।
দুই পর্বে ভাগ করা উপন্যাসের শুরু করতেই আমার সেই ধারনা ক্রমেই মিলিয়ে গেছে। আর উপন্যাসের মুগ্ধতায় ছেয়ে গেছি। কিছুটা কঠিন বাক্য হলেও পড়তে ভালো লেগেছে। সাথে লেখক অনেক শ্লোকের অবতারণা করেছেন, সাথে দিয়েছেন এর বাংলা অর্থ। অনেক অজানা বিষয় জেনেছি। আর ভেবেছি আমাদের সময়ের সমাজ বইগুলো আমাদের ইতিহাস জানালেও অনেকটাই ধোঁয়াশায় রেখেছিল।
লেখক ফিকশন লিখলেও ইতিহাসের দিকে নজর দিয়েছেন। গবেষণা করে সত্য ইতিহাস তুলে ধরেছেন সাথে রেখেছেন গল্পের ধারাবাহিকতা।
আমার কাছে ভালো লেগেছে কিন্তু মনে হয়েছে লেখক বেশ তাড়াহুড়ো করে ফেলেছেন। প্রথম পর্বের সমাপ্তি যেন ঝড়ের বেগে দিলেন। সেখানে যু দ্ধের দৃশ্যের অবতারণা করাই যেত। না পাওয়া অনুভূতি নিয়ে প্রথম পর্বের ইতি।
এরপর দ্বিতীয় পর্বেও মনে হলো একই পুনরাবৃত্তি। বর্ণনা করছেন সময় নিচ্ছেন কিন্তু মূল আকর্ষণে গিয়েই যেন কেমন খেই হারিয়ে ফেললেন। দ্রুত সমাপ্তি টেনে দিলেন।
পপীপকে নিয়ে আমার আশা আরো বেশি ছিল। তার কবি জীবনের আরো কিছু জানতে চেয়েছিলাম সেটা অনুপস্থিত ছিল।
শেষটা আমার কাছে প্রত্যাশিত ছিল। কারণ ইতিহাস তো জয়ীকেই মনে রাখে। মনে রাখে লিখিত এবং সর্বজন স্বীকৃত ইতিহাস। তবে সত্য সবসময়ই সত্য। যাকে লেখক তুলে এনেছেন আমাদের সামনে তার সুন্দর কর্মের মাধ্যমে।


❛কবি সাহিত্যিকদের অবদান দেশের এবং দেশের মূল ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপুর্ণ। তাদের একপাক্ষিক রচনা বদলে দিতে পারে পৃথিবীর ইতিহাস, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি।❜
Profile Image for Asif.
40 reviews34 followers
July 29, 2021
সত্যি বলতে আমি অভিভূত। এত অসাধারণ একটা বই। অথচ কয়জন বাঙ্গালী পরেছেন তাদের পূর্বপুরুষের কীর্তি। ইতিহাস রচিত হয় বিজিতের দ্বারা, সেইকারনেই পাল সাম্রাজের এত নাম, যশ শুনলেও বরেন্দ্রির ভূমিপুত্র কৈবর্ত দের নাম তো কখনও শুনিনি। এই বই না পরলে হয়ত তাদের বীরগাথা অজানায় থাকত। লেখক মুগ্ধ করে দিয়েছেন। সুন্দর এক ঐতিহাসিক ভ্রমণ করালেন এই উপন্যাসের মাধ্যমে।
Profile Image for Reaz Uddin Rashed.
42 reviews5 followers
October 10, 2020
মহাকাব্যিক উপন্যাস 'পিতৃগণ'। আদি বাঙালি জাতির বীরগাঁথা; পৃথিবীর প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র স্বাধীন কৃষক রাষ্ট্রের জনক 'দিব্যোক' আর ক্রীতদাস থেকে রূপান্তরিত কবি, প্রেমিক, যোদ্ধা 'পপীপ' এর উপাখ্যান। ঐতিহাসিক উপন্যাস যারা পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।
Profile Image for Md Shariful Islam.
258 reviews84 followers
November 20, 2020
গোপাল, ধর্মপাল বা রামপালদের তো আমরা সবাই জানি কিন্তু দিব্যোককে কি জানি? আর যদি জানি তাহলে তা ‘ কৈবর্ত বিদ্রোহের নেতা ছিলেন দিব্যোক।‘ এই লাইনের বাইরে কতটুকু? সত্যি বলতে দিব্যোক সম্পর্কে আমার জ্ঞানও এই এক লাইনেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর এর দোষ যতটা না আমার তার চেয়ে বেশি বোধহয় আমাদের ঐতিহাসিকদের কেননা তাঁরা দিব্যোককে পরিচয় করিয়ে দেন নি আমাদের সাথে। আবার তাদের কাছে যতটুকু তথ্যই আছে তাও তো পাওয়া পাল রাজসভার সভাকবি সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম কাব্য থেকে যেখানে দিব্যোক অসৎ, ছলনাময়ী আর বর্বর হিসেবেই উপস্থাপিত। কিন্তু এর বাইরেও দিব্যোকের আলাদা পরিচয় আছে আর সেই পরিচয় দেওয়ার জন্যই লেখক লিখেছেন এই গবেষণালব্ধ বইটি। দিব্যোক হলেন পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র কৃষকরাজের প্রতিষ্ঠাতা যিনি ও তাঁর বংশধররা ৩৭ বছর তাঁদের ভূখন্ডকে স্বাধীন রেখেছিলেন পরাক্রমশালী পাল সাম্রাজ্য থেকে।

লেখকের বইটা লেখার উদ্দেশ্য ও প্রেরণার কথা লেখক স্পষ্ট করেছেন তাঁর দীর্ঘ ভুমিকায়। পারিবারিক শত আপত্তি সত্ত্বেও তিনি যে মহৎ কিছু দেবার আকাঙ্ক্ষায় বছরের পর বছর হাজারো পৃষ্ঠা পড়েছেন, মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন তা তিনি নির্দ্বিধায় বলেছেন ভূমিকাতে। তাছাড়া বইটা যে তাঁর স্বপ্নের উপন্যাস সে কথা জানাতেও ভেলেন নি তিনি। লেখকের উদ্দেশ্য ছিল খুব সরল। তিনি কৈবর্তদের খোঁজার মাধ্যমে বাঙালির বা নিজের পূর্বপুরুষদের খুঁজতে চেষ্টা করেছেন। পাল রাজারা বাংলা ভাষার জন্য অনেক কিছু করেছেন বা তাঁরাই আমাদের পূর্বপুরুষ এই প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি দেখাতে চেয়েছেন শাসক পালরা নন বরং শোষিত এবং বিদ্রোহী কৈবর্তরাই আমাদের পূর্বপুরুষ। আর তাইতো তিনি খুব সহজেই দিব্যোকের নেতৃত্বে কৈবর���ত বিদ্রোহকে মেলাতে পেরেছেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথে। অর্থাৎ লেখক তাঁর দীর্ঘ পরিশ্রমের মাধ্যমে আমাদের পূর্বপুরুষ বা পিতৃগণের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছেন আমাদের সাথে।

বইটার যে প্লট বা লেখকের যে উদ্দেশ্য সেটাই বইটা সম্পর্কে পাঠককে আগ্রহী করতে যথেষ্ট আর আমিও তার ব্যতিক্রম নই। লেখকের যে বিষয়টা সবচেয়ে ভালো লেগেছে তা হলো লেখক নিপুণতার সাথে কৈবর্তদের সাথে আর্যদের করা ব্যবহারের সাথে মিল দেখাতে পেরেছেন ব্রিটিশদের তার উপনিবেশগুলোতে করা ব্যবহার বা আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যে করা ব্যবহার বা পাকিস্তানের বাংলাদেশের সাথে করা ব্যবহারের। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি চিরদিনই একই যুক্তিতে চলে। আর্যরা যেমন বাইরে থেকে এসে প্রথমে ভালো মানুষের মতো এসে সংঘবদ্ধ হয়ে নিজেরাই ভূমির মালিক হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তারপর অসুর বা বর্বর উপাধি দিয়ে কৈবর্তদের বেদের বাণী শুনিয়ে ভালো করার দ্বায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছে ঠিক তেমনটাই বরাবর করে আসছে সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। আর এ কাজ করতে গিয়ে যে তাঁরা নিজেদের প্রকৃত ইতিহাসও লুকায় সেটাও দেখা যায় আর্যসহ সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির। দ্বিতীয় যে বিষয়টা লেখক করেছেন সেটা হলো তিনি দেখিয়েছেন কেন কৈবর্তদের বিদ্রোহ করা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল। আর্যদের ক্রমাগত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় নিপীড়নকে ( বাড়তি কর, বিহারের কারণে বেগার খাঁটা, দাস হয়ে যাওয়া, স্বধর্ম পালন করতে না পারা ইত্যাদি) তুলে ধরে তিনি সমস্ত স্বাধীনতাকামী জনতার দাবিটা তুলে ধরেছেন। আর সাথে মশালে অগ্নি সংযোগকারী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন দিব্যোককে যা আমরা যুগ যুগ ধরে দেখতে পায় ইতিহাসের পাতায়।

লেখক যে প্রচুর পরিশ্রম করেছেন সেটা তো স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু তবু ‘কোথায় যেন কি একটা নেই' ভাবনাটা থেকেই যায় বইটা পড়ার পর। প্রথমেই যে বিষয়টা নজরে আসে তা হলো চরিত্রগুলোর ঠিকমতো ফৃটে উঠতে না পারা। দিব্যোক, ভট্টবামন, পপীপ, ভীম, মল্ল, উর্ণাবতী কেউই যেন ঠিকমতো পরিস্ফুটিত হতে পারে নি। তার বড় একটা কারণ বোধহয় প্লটটা নিজেই। কেননা ভূমিকা ( বা ইতিহাস) থেকে আমরা জানি দিব্যোকের স্বাধীনতা অর্জনের ৩৭ বছর পর ভীমের পতন হয়। কিন্তু যেহেতু লেখক একটা বই-ই লিখেছেন ফলে একই চরিত্রগুলো পরের অংশে ঐভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারে নি। সবচেয়ে বড় আফসোস থাকবে নিশ্চিতভাবেই পপীপকে নিয়ে। কেননা লেখক উপন্যাস শুরু করেছেন পপীপকে দিয়ে, তার বড় হওয়া, কবি হয়ে ওঠার ধাপগুলো দেখিয়েছেন সময় নিয়ে কিন্তু শেষদিকে বলতে গেলে কাজেই লাগে নি পপীপ বা তার কবিত্ব। ফলে বইটাতে কোনো শক্তিশালী একক চরিত্র পাওয়া যায় না। আবার লেখক বারবার পুরাণের ঘটনাবলী তুলে ধরেছেন হুবহু আকারে যা বিরক্তির জন্ম দেয়। বাসুখুড়ো বা মল্ল বা পপীপ অন্যদের গল্প শোনাচ্ছে এভাবে লেখক পাঠকদেরই পুরাণের গল্প হুবহু শুনতে বাধ্য করেছেন। ফলে বইটা অসাধারণ হযে উঠতে উঠতেও ঠিক হয়ে ওঠে নি যেন! ‘ প্রদোষে প্রাকৃতজন’ বা ‘ অরণ্যের অধিকার’ এর মতো কালজয়ী বই হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকলেও ‘সুন্দর একটা বই' এই আটকে গিয়েছে বইটা।

শেষ করি, বইটা থেকে পাওয়া চিরন্তন একটা শিক্ষার কথা বলে যেটা আমরা সবাই জানি। ব্যাপারটা হলো ইতিহাস বিজয়ীদের কথা বলে। রামপালের সাথে ভীমের যুদ্ধের প্রাক্কালে মল্ল পপীপকে যে সতর্কবাণী দিয়েছিল তা বাস্তব হয়ে উঠেছে এখন। মল্ল বলেছিল সন্ধ্যাকর নন্দীর কাছে পপীপ হারলে ইতিহাস নন্দীর বয়ানকেই প্রকৃত ঘটনা বিবেচনা করে পালদের মহান আর কৈবর্তদের বর্বর হিসেবে মনে রাখবে আর বর্তমানে সেটাই হচ্ছে। আর এই কারণেই বইটা গুরুত্বপূর্ণ। না-বলা আর না-শোনা ইতিহাসকে জানতে তাই বইটা পড়ার বিকল্প নেই।
Profile Image for Parvez Alam.
307 reviews12 followers
January 3, 2026
বই রিভিউ: পিতৃগণ
লেখক: জাকির তালুকদার
জনরা: ঐতিহাসিক উপন্যাস

ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, তা সবসময় বিজয়ীদের জবানবন্দিতে লেখা হয়। রাজার রাজদণ্ড যেখানে ইতিহাস নির্মাণ করে, সেখানে পরাজিত বা শোষিত মানুষের দীর্ঘশ্বাসগুলো কেবলই ‘বিদ্রোহ’ বা ‘অরাজকতা’ নামে ধামাচাপা পড়ে যায়। জাকির তালুকদারের ‘পিতৃগণ’ পড়ার পর যে ঘোর তৈরি হয়, তা সেই ধামাচাপা দেওয়া হাজার বছরের পুরোনো এক নিগূঢ় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট পাল শাসনামল। বাংলার মাটিতে তখন আর্য আর অনার্য সংস্কৃতির এক নীরব অথচ তীব্র সংঘাত চলছে। মহীপালের রাজত্ব, বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের সহাবস্থান—এসবের আড়ালে যে কৈবর্ত জাতি (যাদের আমরা তথাকথিত নিচু জাত বা ভূমিপুত্র বলি) প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছিল, লেখক সেই গল্পটিই তুলে এনেছেন। আর্যরা যাদের ‘অসুর’ বা ‘দস্যু’ বলে আখ্যায়িত করেছে, জাকির তালুকদার দেখিয়েছেন তারাই আসলে এই মাটির প্রকৃত সন্তান।

গল্পের মূল আকর্ষণ এর চরিত্র নির্মাণ, বিশেষ করে ‘পপিপ’। ঋণের দায়ে শৈশব হারানো এক কিশোর, যে ধীরে ধীরে কলম এবং অস্ত্র—উভয় জগতেই নিজেকে শাণিত করে তোলে। পপিপের চোখ দিয়েই পাঠক দেখতে পান সেই সময়ের বরেন্দ্রভূমিকে। তার বেড়ে ওঠা, মল্লর হাত ধরে শিক্ষার পথে আসা এবং পরবর্তীতে কৈবর্ত বিদ্রোহের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা—পুরো যাত্রাপথটি লোমহর্ষক। অন্যদিকে দিব্যোক, রুদোক কিংবা ভীম—ইতিহাসের এই চরিত্রগুলো বইয়ের পাতায় এতটাই জীবন্ত হয়ে উঠেছে যে মনে হয় তারা কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়, বরং আমাদেরই বিস্মৃত পূর্বপুরুষ।

লেখকের গদ্যশৈলী নিয়ে আলাদা করে না বললেই নয়। ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই সময়ের আবহ তৈরি করা, যা জাকির তালুকদার নিপুণভাবে করেছেন। তার শব্দচয়ন, বাক্যের গঠন এবং বর্ণনাভঙ্গি পাঠককে ১০৬৮ খ্রিস্টাব্দের বাংলায় নিয়ে যায়। শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাসের মতো এতেও এক ধ্রুপদী স্বাদ আছে, তবে জাকির তালুকদারের ভাষা আরও বেশি মৃত্তিকা-সংলগ্ন এবং তীব্র। যুদ্ধের দামামা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের হাহাকার—সবই তিনি এঁকেছেন পরম যত্নে।

উপন্যাসটি কেবল একটি বিদ্রোহের গল্প নয়, এটি বিশ্বাসঘাতকতা ও ট্র্যাজেডিরও দলিল। দিব্যোকের নেতৃত্বে কৈবর্তরা যে স্বাধীন বরেন্দ্রভূমি গড়ে তুলেছিল, রামপালের ছলচাতুরীতে তার পতন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাঙালি জাতিসত্তার লড়াইটা আসলে বহু পুরোনো। একলব্যের মতো কিংবা একাত্তরের বীরদের মতো, এই মাটির সন্তানেরা বারবার ছলনার শিকার হয়েছে, কিন্তু মাথা নোয়ায়নি। বইয়ের শেষটা পাঠকদের বুকে এক ধরনের হাহাকার তৈরি করে। এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা গ্রাস করে যখন আমরা দেখি, প্রকৃত বিজয়ীরা কীভাবে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যায়।

পরিশেষে বলব, ‘পিতৃগণ’ কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধানে এক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন। যারা মনে করেন বাংলা সাহিত্যে এখন আর মৌলিক বা গবেষণালব্ধ কাজ হয় না, তাদের জন্য এই বইটি একটি কড়া জবাব। নিজের শেকড়কে চিনতে এবং ইতিহাসের অতলে হারিয়ে যাওয়া ‘পরাজিত’ নায়কদের গল্প জানতে এই বইটি পাঠ করা আবশ্যক।

রেটিং: ৫/৫
এক কথায়: বিস্মৃতির অতল থেকে তুলে আনা এক গৌরবোজ্জ্বল ও মর্মান্তিক আখ্যান।
Profile Image for Shahriar Kabir.
34 reviews
October 26, 2020
এক অসাধ্য সাধন করেছেন লেখক। কৈবর্ত বিদ্রোহ ��িয়ে রচনা খুবই বিরল, হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি। এর প্রধান কারণ কৈবর্ত বিদ্রোহ বিষয়ে তথ্যের অপ্রতুলতা এবং ইতিহাসের বিকৃতি। সন্ধ্যাকর নন্দী তাঁর "রামচরিতম" গ্রন্থে যেটুকু লিখেছেন কৈবর্তদের নিয়ে সেটা যথেষ্ট বিদ্বেষপূর্ণ। কারণ একটাই, কবি ছিলেন রামপালের সভাকবি এবং অন্নভুক। এতো সব প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও জাকির তালুকদার এমন একটি লেখা পাঠকদের উপহার দিয়েছেন সেটা সত্যিই অনেক প্রশংসনীয়। অনেক শ্রমসাধ্য একটি কাজ করেছেন তিনি।

লেখার ধরণ, শব্দের বাঁধুনি ও একটানা পড়ে ফেলার মত ঘটনাপ্রবাহ। পাশাপাশি প্রাচীন শব্দাবলীর সুদক্ষ প্রয়োগ পাঠকের চোখের সামনে তুলে ধরেছে প্রাচীন বরেন্দ্রভূমি ও তার বীরপুত্রদের অসম সাহসের একটি সচল মঞ্চায়ন। একজন বরেন্দ্রনিবাসী হিসেবে ও সর্বোপরি একজন বাঙালি হিসেবে পূর্বজদের বীরত্বগাঁথা পড়ার অনুভূতি সত্যি অসামান্য!
Profile Image for Gain Manik.
347 reviews4 followers
November 7, 2025
এটা রিভিউ নয়, স্মৃতি তৈরিকরণ মাত্র!

আমার পড়ার মূল ক্রাইটেরিয়ন ছিল লেখক হবে মৃত। কিন্তু যাইহোক, এই ব‌ইয়ের অনেক প্রশংসা শুনেই বেটার হাফকে উপহার দেবার জন্যই কিনেছিলাম, তবুও নিজেই আগে পড়ে ফেলি।
বেটার হাফকে ব‌ইটি উপহার দিয়ে চিন্তিত, আমাদের সদ্য গঠিত সম্পর্কটি টিকলে হয়। এই ব‌ইয়ের শেষ এমনভাবে আমাকে বিমর্ষ করে দিয়েছে যে তা বলবার নয়। ও পড়ার পর কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে জানি না!
তবুও বলছি জয় হোক পপীপের, সন্ধ্যাকর নন্দীরা সন্ধ্যার অন্ধকারে‌ই বন্দি থাকুক; আর জাকির তালুকদার তার সাহিত্য সাধনা অব্যাহত রাখিয়া আমাদের উত্তরোত্তর ঋদ্ধ করিতে সর্বদা সচেষ্ট থাকুক।
Profile Image for Tauhid Itul.
47 reviews29 followers
March 12, 2019
প্রচারেই প্রসার। বিশেষ করে ইতিহাসের ক্ষেত্রে তো প্রচারের কোন বিকল্প নেই। তারপর সেই প্রাচারটা কেমন হবে- ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক সেটাও বিবেচনায় রাখতে হয়। স্কুলের বইয়ে বরেন্দ্র-গৌড়-পুন্ড্র, পাল আমল, মোঘল সাম্রাজ্য, ব্রিটিশ আমল, বাশের কেল্লাসহ কত কিছুই পড়তে হয়েছিল- কিন্তু হাজার বছর আগের স্বাধীন কৃষকরাষ্ট্রের কথা পড়েছিলাম বলে মনে পড়ছে না, নাকি ভুলে গেছি?

'পিতৃগণ' উপন্যাসে লেখক আমাদের নিয়ে গেলেন হাজার বছর আগের বরেন্দীতে। কবি পপীপের জন্ম নেবার কাহিনী থেকেই উপন্যাসের যাত্রা শুরু। পাল রাজ্যে কৃতদাস হয়ে কৈবর্তদের জীবন যাপন, নিজেদের অধিকার আদায়ে দিব্যোক, মল্ল এর দূরদৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের স্বাধীনতা অর্জন করা নিয়েই প্রথম খন্ড।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে আছে স্বাধীনতা রক্ষায় নিজেদের সবকিছু উজাড় করে দেওয়ার গল্প। কৈবর্তদের সরলতার গল্প। যারা লিখিত চুক্তির চেয়ে মুখের কথাকে বেশি বিশ্বাস করে, তাদের গল্প।

উপন্যাস লেখার জন্য লেখকের পরিশ্রমের কথা শুরুতেই জানিয়েছেন। উপন্যাসটি যদি আরো বড় হতো, পপীপ, দিব্যোক, ভীম এর চরিত্র নিয়ে, রাজ্য পরিচালনা নিয়ে যদি আরো শত পৃষ্ঠা লেখা হত তাহলে লেখকের পরিশ্রমের সফলতা আরো বেড়ে যেত।
Displaying 1 - 23 of 23 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.