ছোটদের জন্য জীবদ্দশায় খুব বেশি লেখেননি শরদিন্দু। সব মিলিয়ে গুণে দেখলে ওনার কিশোর সাহিত্যের সংখ্যা মাত্র ২৮-এ গিয়ে দাঁড়ায়। তারও মধ্যে গুণগত পার্থক্য প্রচুর। আছে এমন কিছু গল্প যা পড়া না পড়া সমান। লেখক ছোটদের কথা মাথায় রেখেই বুঝি অতি জটিল কিছু লেখেননি কোনোদিনও। চেষ্টা করেছেন সর্বদা জানালা খুলে রাখার। তাই এই বইয়ের লেখাগুলো বেশিরভাগই সহজ। ইচ্ছাপূরণধর্মী সরলাকৃত কিশোর-সাহিত্য। গতিশীল ও মায়াময়। বলাই বাহুল্য, বাকি আর কয়েকটি 'অমনিবাস'-এর তুলনায় এই খণ্ডটি কিছুটা হলেও ব্রাত্য। আশ্চর্য করে না। ডিমান্ডের নিরিখেও হয়তো বা প্রথম পাঁচের মধ্যে এর জায়গা মেলা দুষ্কর। তবুও, দুটো দিন বইটির নিষ্পাপ সান্নিধ্যে কাটিয়ে মনটা কেমন ভালো হয়ে গেলো।
দোসর হিসেবে লেখকের ক্ল্যাসিক গল্পবলিয়ে স্বত্বা এবং মদন সরকার, শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য ও পূর্ণেন্দু পত্রীদের ভুরি ভুরি সাদা-কালো অলঙ্করণ। যথেষ্ট ভ্যালু ফর মানি।
তবে স্রেফ সাহিত্যের প্রসঙ্গে বললে, আঠাশটির মধ্যে রুপকথা (ও উপকথা) গোছের কাহিনীগুলো অনাড়ম্বর। দুধ-ভাত যাকে বলে। খুব একটা মনে রাখার মতো নয়। আছে 'পুষি-ভুলোর বনবাস' ও 'ভালুকের বিয়ে'-এর মতো জঙ্গল-কেন্দ্রিক ফ্যান্টাসি। দক্ষিণারঞ্জনের পদাঙ্ক অনুসারী কিছু শিশতোষ ফেরিটেল। ('পরীর চুমু', 'আঙুর-পরী ও ডালিম-পরী', 'ময়ূরকূট') কটা খুচরো ঐতিহাসিক কাহিনী ('বীর্যশুল্কা', 'ঝিলম নদীর তীরে') ও চারটে ভয়াল-রসের গল্প। যাদের মধ্যে 'মোক্তার ভূত' বা 'রাতের অতিথি' দুটোই বহুল-চর্চিত গল্প। ওদিকে, শিকারের রোমাঞ্চ ও উগ্র আবহ-গুণে, 'উভয়-সংকট' পড়ে সামান্য শিউরে ওঠাই যায়। (মজার বিষয়, চারটে লেখার একটিও লেখকের 'অলৌকিক সমগ্র'-এ স্থান পায়নি।)
হাস্যরসের মধ্যে, স্কুলপড়ুয়া ন্যাপলাকে নিয়ে বইয়ের দুটো গল্প - 'জেনারেল ন্যাপলা' ও 'স্বামী চপেটানন্দ' - দুটোই বেশ মজার। স্বল্প পরিসরে চরিত্রটা কোথাও গিয়ে পাগলা দাশুর কথা মনে করায়। আফসোস, এর বাইরে লেখক নেপালচন্দ্রকে নিয়ে কোনো গল্প লিখে যাননি। এই একই আঙ্গিকেই 'গাধার কান'-এ ইন্টার-স্কুল রেষারেষি ও ফুটবল টুর্নামেন্টের কমিকাল ধারাবিবরণী বেজায় উপভোগ্য! এতে আর কিছু না পেলেও, লেখকের রেঞ্জ নিয়ে নতুন করে পুলকিত হতে হয়। ঠিক যেভাবে 'ভূমিকম্পের পটভূমি' পড়ে জানতে পারলুম যে লেখক ঘনাদা/টেনিদা-গোছের একটা আজগুবি 'টল-টেলস' লিখে গিয়েছিলেন সেই কবে!
গল্পটা আহামরি নয়। শেষটাও বেশ হৃদয়বিদারক। কিন্তু ঐযে বললাম? রেঞ্জ! অবশ্য, লেখকের এই রণদা'মামা চরিত্রটির রিপিট ভ্যালু কম। উনি যে আর কোনোদিনও কোনো গল্পে ফিরে আসেননি সেই নিয়ে আমার কোনো ব্যক্তিগত আফসোস নেই।
তবে, যার জন্য আপনি প্রকৃতপক্ষে এই বইটি হাতে তুলে নেবেন। বা নিয়ে ফেলেছেন যথারীতি। তার নাম সদাশিব। আধুনিক যুগে মির্চি বাংলার বদান্যতায় সদাশিবকে চেনে না এমন বাঙালি বিরল। সিরিজের পাঁচটি গল্প নিয়ে আলাদা করে কিছু বলতে হয় না। এ জিনিস চিরন্তন কিশোর সাহিত্য। ফুরফুরে মেজাজে, ফিল-গুড অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী। সাথে ইতিহাসের কমনীয় স্পর্শ। ভাবুন দেখি? কোন এক ক্ষণজন্মা বাঙালি লেখক (রাজশেখর বসুর অনুরোধে) মহারাষ্ট্রের মানুষদের নিয়ে, মহারাষ্ট্রের পটভূমিতে, শিবাজী মহারাজকে শীর্ষে রেখে লিখে ফেললেন ছোট-ছোট সব অভিযান কাহিনী! পাঁচখানা মাত্র। তবুও কি মায়াটে! কি সুন্দর সবটা!
শরদিন্দুর স্বর্ণকলমে জিজাবাঈ-এর তরুণ স্ফুলিঙ্গ হয়ে ওঠে পাঠকের আপনজন। যেন ফেলুদা বা দাদা-স্থানীয় কেউ। মন বলে, ইশ! যদি শিবাজী, য়েসাজি ও তানাজিদের সাথে তোর্ণা দুর্গে বসে করা যেত যুদ্ধের পরিকল্পনা! বা স্রেফ কোনো তেজী ঘোড়ার পিঠে চড়ে ছুটে বেড়ানো যেত সৈহ্যদ্রির সবুজ গালিচায়! পাঠক হিসেবে আমাদের চরম দুর্ভাগ্য, গল্পের নাম ও কিছু নোট তৈরি থাকলেও, লেখক সদাশিবের পরিকল্পিত লেখাগুলো (রক্তারক্তি কান্ড, কেলেঙ্কারী কান্ড, বিদঘুটে কান্ড, মহামারী কান্ড, প্রভৃতি) নিজের আয়ুষ্কালে লিখে যেতে পারেননি। লেখা হলে আজ আমাদের হাতে প্রায় নয়-দশটি কাহিনীর একটি পূর্ণাঙ্গ সিরিজ থাকতো!
ভাবি ও শূন্যে ঘুষি মারি।
যাই হোক, বইয়ের শেষ কাহিনী, 'নন্দনগড় রহস্য' একটি গল্পরূপী দীর্ঘশ্বাস সমান। নেপথ্যে, অনুসন্ধান ও অভিযানের ছেলেমানুষী আনন্দ। যার সুপ্রাচীন হৃদয়, কোনো গ্রীষ্মকালীন দুপুরে বটবৃক্ষের ছায়ায় কাঠের তরোয়াল চালানোর আনন্দ পুষে রাখে। ভীষণ প্রিয় গল্প আমার। পারলে পড়ুন প্লীজ। নয়তো বা শুনে আসুন গিয়ে। ঠিকানা ওই এক। রেডিও মির্চি নাইন্টি এইট পয়েন্ট... চেনেনই তো।
(৩.৫/৫ || জানুয়ারি, ২০২৫)