দেব্রীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (English: Debiprasad Chattopadhyaya) ভারতের কলকাতায় ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ভারতের একজন প্রখ্যাত মার্ক্সবাদী দার্শনিক। তিনি প্রাচীন ভারতের দর্শনের বস্তুবাদকে উদ্ঘাটন করেছেন। তাঁর লেখাগুলো একাধারে দর্শন ও বিজ্ঞানের সমন্বয়। এছাড়াও তিনি প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানের ইতিহাস ও বিজ্ঞানের পদ্ধতি সম্পর্কেও গবেষণা করেছেন। তিনি ১৯৯৩ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
কোন একটা বিষয় সম্পর্কে একদিকে জানলে জানা সম্পূর্ণ হয় না। কিন্তু দেবীপ্রসাদের আলোচনা আসলে অনবদ্য। ফ্রয়েড মতবাদ বিশ্লেষণ এবং তার বিজ্ঞান-বাস্তব উভয়ই বিমুখতা এবং অসারতা নিয়ে লিখিত বইটি। কলেবর আরেকটু বড় হলে আরো ভালো হত, আরো ভালো জানতাম। তবে প্রাঞ্জল ভাষায় এই আলোচনাটির মূল্যও কম নয়।
সাইকোলজির নাম শুনেছে কিন্তু সিগমুন্ড ফ্রয়েডের নাম শোনেনি, এমন মানুষ বিরল । বিংশ শতাব্দীর বিপ্লবী ধারণাগুলির মধ্যে যেগুলি অন্যতম ফ্রয়েডের সাইকোঅ্যানালিটিক তত্ত্ব তার একটি । যদিও বর্তমানে ফ্রয়েডের তত্ত্বকে আর বৈজ্ঞানিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না, তবুও এই মতবাদের এমনই এক আবেদন আছে যা মননশীল পাঠকের পক্ষে উপেক্ষা করা কঠিন ব্যাপার ।
ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের সবিস্তার বর্ণনা ও তার সমালোচনা এর আগে পেয়েছি হুমায়ুন আজাদের "নারী" বইটিতে । তবে সেখানে এই মতবাদের বিচার হয়েছে নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে, যে কারণে ফ্রয়েডের "শিশ্ন-ঈর্ষা" তত্ত্বের উপর ফোকাস ছিল বেশি । দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর এই বইতে শিশ্ন-ঈর্ষার উল্লেখ করলেও তাই নিয়ে খুব বেশি শব্দ খরচ করেননি । বরং এখানে ফ্রয়েডের তত্ত্বের বিশ্লেষণ করা হয়েছে মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে । একেও পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ বলা চলে না, কিন্তু কোনো একটা বইয়ের ক্ষেত্রেই এমন বিশ্লেষণ করা হয়তো সম্ভব নয় । প্রত্যেকটি বই-ই কেবল একটা বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিই দিতে পারে ।
"ফ্রয়েড প্রসঙ্গে" বইটির বিশেষত্ব হল লেখক এখানে শুধুমাত্র এটাই প্রতিষ্ঠা করতে চাননি যে ফ্রয়েডবাদ আসলে সমাজতন্ত্রবিরোধী এবং প্রচ্ছন্নভাবে আসলে বুর্জোয়া ধ্যানধারণারই ধারক ও বাহক; বরং দেখাতে চেয়েছেন যে ফ্রয়েডবাদ বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে আদতে অবৈজ্ঞানিক একটি মতবাদ, যার অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছেন প্লেটোর ভাববাদকে । প্রথমটির ক্ষেত্রে ফ্রয়েডবাদের সমালোচনাকে লেখকের পক্ষপাতদুষ্টতার নিদর্শন হিসেবে ভাবার অবকাশ থাকলেও দ্বিতীয় ক্ষেত্রে এমন কোনো সংশয়ের অবকাশ লেখক রাখেননি । ফ্রয়েডীয় সাইকোঅ্যানালিসিসের সাথে পাভলভের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে ফ্রয়েড তাঁর তত্ত্বকে বৈজ্ঞানিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলেও আদতে বিজ্ঞানবিরোধী একটি ধারণায় পর্যবসিত করে ফেলেছেন । পাভলভের পরীক্ষণে যেখানে আমাদের আচরণের উপর নির্জ্ঞান (unconscious)এর কোনো প্রভাবই লক্ষিত হয়নি সেখানে ফ্রয়েড তাঁর তত্ত্বে নির্জ্ঞানকেই সমস্ত আচরণের মূল চালিকাশক্তি বলে দাবি করেছেন !
বইটি সম্পর্কে আমার একটা মৃদু অভিযোগ যে এটা আরও একটু বড় হওয়ার অবকাশ ছিল । বিশেষতঃ Oedipus complex নিয়ে আরও কিছু কথা বলার সুযোগ ছিল বলেই মনে হল । তবু যেটুকু তথ্য আছে এই বইতে, তা চিন্তাশীল পাঠককে সমৃদ্ধ অবশ্যই করবে । আর হ্যাঁ, লেখকের নিজের বক্তব্যেও পক্ষপাত কিছু থাকবে স্বাভাবিকভাবেই । তাই বইয়ের সমস্ত বক্তব্যই যে কায়মনোবাক্যে গ্রহণীয় এমনটা একেবারেই নয় । খেয়াল রাখতে হবে যে এটাও একটা বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকেই বিশ্লেষণ মাত্র ।
কোনো তত্ত্ব তার ক্ষেত্রে যতই প্রসিদ্ধ হোক না কেন তা অস্পর্শযোগ্য নয়। এমনটা হওয়াও উচিত নয়। আলোচনা- সমালোচনা হওয়া উচিত, সকল বিষয়েই। ঠিক তেমনটাই দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় "ফ্রয়েড প্রসঙ্গে" বইয়ে করেছেন। "ফ্রয়েড প্রসঙ্গে" বইটি মুলত মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ফ্রয়েডবাদের পুঁজিবাদী সংশ্লিষ্টতা ও মার্ক্সবাদী বা সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার সমালোচনা। ফ্রয়েড কে নিয়ে আমার আগ্রহ থেকেই বইটা ডিপার্টমেন্টের লাইব্রেরি থেকে তোলা। ফ্রয়েড এর সমালোচন গুলো সত্যিই আমাকে তার তত্ত্বগুলোর প্রতি এক নতুন দৃষ্টিকোণ দিয়েছে। শোষক ও সর্বগ্রাসী এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ফ্রয়েডবাদ দ্বারা লাভবান হচ্ছে এবং এই লাভবান করাই যেন -এর আসল লক্ষ। আমার ফ্রয়েডবাদ বা সমাজতান্ত্র নিয়ে জ্ঞান তুলনামূলক কমই বলবো। তাই হয়তো কিছু কিছু সমালোচনা আমার কাছে মনে হচ্ছিল অনেকটা জোর করে করা হচ্ছে এবং কিছু কিছু অযথাযথও লেগেছে। তবুও বইটা সকলকে পড়ার কথাই বলবো।