Born in a lower middle class family of Barisal in 1925, Sardar stood second at IA examination (Intermediate in Arts) but topped the first class in both his BA Honours and MA examinations in Philosophy from Dhaka University; he became a lecturer in 1946 at the age of 21. Involved in progressive politics as a student, he was an "enemy" of the then Pakistan government and in four phases spent almost the full twenty-four years of Pakistani rule in jail. Ayub Khan and Monem Khan ensured that he could never return to his teaching job during the Pakistan period. He participated in the 58-day hunger strike of political prisoners demanding humane treatment. He was elected a member of Constituent Assembly of Pakistan while in prison. Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman and National Professor Abdur Razzak brought him back to the Dhaka University immediately after the independence of Bangladesh in 1972.
Sardar Fazlul Karim has written scholarly books on philosophy, among them being his দর্শনকোষ (Bengali Encyclopedia of Philosophy). He has translated Plato, Aristotle, Rousseau and Engels. When Sardar was a high school student, Sarat Chandra Chattopadhyay's novel Pather Dabi: The Right of Way inspired him to dream of a revolution for the first time; his friend Mozammel Haq had given him the book. Young Mozammel, a political activist and journalist, died in 1965 Cairo plane crash. The book greatly influenced the teenaged Sardar. Years later he learnt that the same book had inspired Jyoti Basu to be a revolutionary. Sardar Fazlul Karim was always an obedient child and even helped his father in agricultural work.
Sardar Fazlul Karim came to Dhaka to study Intermediate in Arts (IA). He got admitted to the Government Intermediate College. Progressive students looked him up. Sardar was more a nationalist than a communist then. He brought out wallpapers and had a good personal library. Friends used to borrow books from him. Pearl S. Buck's The Good Earth also influenced him. Sardar Fazlul Karim became a student of Dhaka University in 1942; he studied English for a few days but shifted to Philosophy because Haridas Bhattacharya's class lectures had attracted him. He passed his BA Honors in 1945 when the Second World War ended. The 1943's Bengal famine influenced him a lot. The communists were very active during the Bengal famine. Sardar left Socrates, Plato and Hegel in his room and travelled to remote villages with relief for the hungry!
এ বইয়ের ব্যাপারে প্রথমেই যে কথা মনে হচ্ছে তা হল এই যে, বইটা গুছিয়ে কাজ করার চমৎকার একটা উদাহরণ। গঠনের দিক দিয়ে ‘যদ্যপি আমার গুরু’ এবং এই বই—দুটো একই—দুটোই আলাপচারিতার ভঙ্গিমায় লেখা।
কিন্তু দীর্ঘ কয়েক দশক আবদুর রাজ্জাক স্যারের সাথে আড্ডা দিয়েও যে কাজটুকু আহমদ ছফা গুছিয়ে করতে পারেননি—সেটা খুব সুন্দরভাবে করেছিলেন সরদার ফজলুল করিম, এবং আক্ষরিক অর্থেই ‘কয়েকদিন’ সচেতনভাবে আড্ডা দিয়ে। ‘যদ্যপি আমার গুরু’-র আড্ডাটা অনেকখানি বিস্তৃত ছিল—এবং একারণেই কোনো বিষয়ই পুরোপুরি আসেনি। একটু ট্রট্স্কি এসেছে, একটু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসেছে, কখনো শাহাবুদ্দিন মশাই একটু উঁকি মেরে গেছেন—ফলে কোনো কিছু সম্পর্কেই—বিশদ জ্ঞান যেটাকে বলে—সেটার স্পর্শটুকু পাওয়া যায়নি।
সেই তুলনায় এই বইয়ের পরিসর ছোট—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ—এবং লাগাম ধরে রাখার কারণে ছোট্ট পরিসরটা দারুণভাবে নিয়ন্ত্রিত। সেই সাথে এটা রেফারেন্স হিসেবে অধিকতর গ্রহণযোগ্য এই কারণে যে, সরদার ফজলুল করিম পুরো সাক্ষাতকারটা রেকর্ড করে এরপরে শ্রুতিলিখন করেছিলেন—যেখানে আহমদ ছফা লিখেছেন স্মৃতি থেকে।
(খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলতে ইচ্ছে করছে, ‘যদ্যপি আমার গুরু’-র লেখার খাপছাড়া ধরনটা হয়তোবা আহমদ ছফার খাপছাড়া স্বভাবের কারণেই। ছফা সাহেব নিজেই লিখেছেন—পিএইচডি থিসিসের কাজ করার সময় তিনি যখন প্রচুর বইপত্র পড়ছেন—তখন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক তাকে বারবার জিজ্ঞেস করতেন, বই যে পড়তাসেন, নোট লইসেন? আহমদ ছফা নোট রাখতেন না—এবং এই শুনে অধ্যাপক সাহেব তাকে বলেছিলেন ‘আনিসের’ কথা—(যিনি আনিসুজ্জামান স্যার ছাড়া অন্য কেউ হবে বলে মনে হচ্ছে না)—সেই আনিস নাকি নোট রাখতো, এবং এর ফলে তার গবেষণাগুলো হত অসম্ভব গোছানো এবং সুন্দর।
আমি নিজেও আহমদ ছফার ভক্ত—কিন্তু এ কথা আমি মানতে নারাজ যে, ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’-র মত রোমান্টিক লেখা যেসব মানুষের হাতে বেরুবে তারা স্বভাবে বাউণ্ডুলে হতে বাধ্য। এ ব্যাপারে সুকুমার রায়ের কথা মনে করা যায়—আবোল-তাবোল পড়ার পর চরম নিন্দুকও যাকে অ-রোমান্টিক বলতে পারবে না—এবং ইংল্যান্ড থেকে বাবার কাছে লেখা তার চিঠিগুলো পড়লে সুকুমারের গুছিয়ে কাজ করার স্পৃহা দেখে যে কেউ ভিরমি খাবে।
সুতরাং আমার বিশ্বাস, আহমদ ছফা যদি আরেকটু গোছালো হতেন—তাহলে আমরা—সংকীর্ণ অর্থেও যদি চিন্তা করি—অন্তত অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের আরেকটু কাছাকাছি আসতে পারতাম।)
এই বই শেষ করে যদি আবদুর রাজ্জাক স্যারের ব্যাপারে মত দিতে হয়—তবে এ কথাই মনে হয় যে...কী লোক রে বাবা! একটা বইও লিখে যাননি—অথচ তার ভেতরে এত এত কিছু জমে ছিল! দু হাজার বছর আগে সক্রেটিসের ক্ষেত্রে এটা মেনে নেয়া যায়—কিন্তু এ যুগে সক্রেটিসতুল্য একজন মানুষ—যিনি বসে বসে ক'জন শিষ্যকে দীক্ষা দিয়ে গেছেন—এবং বাকি জ্ঞানটুকু নিজের মাথার ভেতরে নিয়েই চলে গেছেন—তার ব্যাপারে একটু আফসোসই থেকে যায় এই ভেবে যে, ক'টা বই লিখে গেলে আরও অসংখ্য মানুষ তার চিন্তার সেই স্বর্ণভাণ্ডারটুকু স্পর্শ করতে পারতো।
এবং সক্রেটিসের প্রসঙ্গটা যখন আসলোই, তখন এ কথাও বলে ফেলা ভালো যে, অন্যদের ভেতরে জ্ঞানের তৃষ্ণাটা জ্বালিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক সক্রেটিসের মতই সার্থক। এই যে একটা বই পড়লাম—কোথাও কিন্তু কোনো সামারি নেই—কেউ বলেননি যে ইতিহাসটা ঠিক ‘এইরকম’ করে বিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু রাস্তাটা আবদুর রাজ্জাক স্যার দেখিয়ে গেছেন, সেই রাস্তা ধরে হাঁটার জ্বালানিটুকুও দিয়ে দিয়েছেন—অসামান্য ভঙ্গিতে একের পর এক বিষয়ের অবতারণা করে।
আমি জানি না তাঁর মতামতগুলোর যথার্থতা কতখানি। কিন্তু সার্থকতা সন্দেহাতীত।
অবধারিতভাবেই সরদার ফজলুল করিমকে আমরা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্লেটোর সম্মানটুকু দিতে পারি। আমি কৃতজ্ঞ এই মানুষটার কাছে।
বইটা অনেকদিন ধরেই পড়ব বলে লিস্টে রেখেছিলাম। অবশেষে শেষ হল। সরদার ফজলুল করিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা শিক্ষক আবদুর রাজ্জাকের সাথে একটি আলাপচারিতা করেন। টার্গেটে রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর তখনকার মুসলমান সমাজকে। এবিষয়ে আলাপে প্রফেসর রাজ্জাকের ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎপত্তি, ব্যাপ্তি, তখনকার শিক্ষকসমাজ আর তাদের চালচলন সবই তুলে এনেছেন অল্প অল্প করে। রাজ্জাক সাহেব কোন নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা বলেননি। স্পন্টেনিয়াসলি বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলে গিয়েছেন। আশ্চর্য লাগে যখন উনার বয়ানে পাওয়া যায় এই বিশ্ববিদ্যালয় গঠনে তৎকালীন প্রভাবশালী মুসলিম সমাজ যথা নবাব ও অন্যান্য জমিদার পরিবারের কন্ট্রিবিউশন ছিল না। আর হিন্দুসমাজরা এটার সাপোর্টে ছিলেনই নাহ। উল্টা স্যার আশুতোষ প্রতিবাদই করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মূলত হয় ইংরেজদের বদান্যতায়, এমনকি জমিও দেয় এই ইংরেজরাই। যদিও তার পেছনে কারণ ছিল রাজনৈতিক। টিচারদের ব্যাপারে অনেক কথা এসেছে। উনাদের যেমন ছিল উদারতা ঠিক তেমনি ছিল নীচতাও। কিন্তু ও সময়ের শিক্ষকরা পড়ানো ব্যাপারটাকে পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে নিতেন। ধর্মভেদে মার্কিং করতেন নাহ। দুএকজন ছাড়া সব শিক্ষকদের মধ্যেই ঋষিসুলভ উদারতার কথা বলেছেন। রাজ্জাক সাহেব জীবনে চলার পথে অনেক ব্যাক্তিত্বের সান্নিধ্যে এসেছেন। এনাদের মধ্যে হ্যারল্ড লাস্কি, শেরে বাংলা, সুহরাওয়ার্দী, সত্যেন্দ্রনাথ বসু আর কাজী মোতাহের হোসেন উল্লেখযোগ্য। সবার কথাই অল্প বিস্তর বলেছেন। বইটি পড়লে ব্যক্তি হিসেবে প্রফেসর রাজ্জাক কেমন ছিলেন তা অনেকটাই বোঝা যায়। মানুষ হিসেবে নির্মোহ হলেও আত্নসম্মানবোধ ছিল প্রবল। এবিষয়ে যেই হোক না কেন কোন ছাড় দিতেন না। এ বইয়ের আরেকটি আকর্ষন হচ্ছে পরিশিষ্টে কাজী মোতাহের হোসেনের সাথে ছোট্ট একটা স্বাক্ষাৎকার। কিছু কিছু বইয়ের সমালোচনা হয়না। আর হলেও এই বইয়ের সমালোচনা করা আমার কম্ম নাহ। পড়তে গিয়ে কিছু অসুবিধা ফেইস করেছি। বরং সেগুলা বলি। প্রফেসর রাজ্জাক বাংলা ইংরেজি মিলায় কথা বলেন। সেগুলা হুবুহু তুলে দেয়া হয়েছে। তাতে আমার অসুবিধা নাই। সমস্যা হচ্ছে প্রথমদিকে বাংলা ফন্টে ইংরেজিগুলা লেখা হয়েছে। এটা ইংরেজিতে দিলেই ভাল হত। আর যেটা অসুবিধা হয়েছে তা সরদার ফজলুল করিম ভূমিকাতেই বলেছেন। কোন ক্রনলজি নাই। এতে কিছু করারও নাই। কারণ প্রফেসর রাজ্জাক যখন যেটা ইচ্ছা হয়েছে বলেছেন। সো আর কিছু করার নাই। শেষে একটা আক্ষেপের কথা বলি। প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক একজন কালের স্বাক্ষী। কেন যে উনি কিছু লিখলেন না আর কেনই বা আমাদের বঞ্চিত করলেন তার প্রশ্নের উত্তর নেই। এমন প্রখর মেধা আর বিবেকসম্পন্ন একজন ব্যক্তি কালে ভদ্রে আসেন একজনই। আর সেইজন কিছুই জানায় গেলেন না তার উত্তর প্রজন্মের জন্য, এই দুঃখ রাখি কই।
জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে যেটুকু জানার জেনেছিলাম আহমদ ছফা রচিত 'যদ্যপি আমার গুরু' থেকে৷ সেখান থেকেই তাঁর ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলা এবং আমোদপূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবটির পরিচয় পেয়েছিলাম। তাঁর নিজের লেখা কোন জীবনীগ্রন্থ বা কোন বই না থাকায় এই প্রবাদপ্রতিম মনিষী সম্পর্কে জানার উপায় অন্যদের অভিজ্ঞতা কিংবা তাঁর সাথে কাটানো সময়ের আলাপচারিতা। সরদার ফজলুল করিম তাই অন্তত তাঁর মুখের কথাগুলোকে একটি লিখিত রূপ দেয়ার প্রত্যাশায় এই সাক্ষাৎকারটি দীর্ঘদিন ধরে নিয়েছেন এবং টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করে রেখেছেন৷ পরবর্তীতে, রেকর্ডিং শুনে শুনে সেই কথাগুলোকে আবার লিখে বই বের করার মতো দুরূহতম কাজটি সম্পন্ন করেছেন৷ এটা সত্যিকার অর্থেই একটি কঠিন কাজ ছিল। যেকারণে, কোন ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি বিষয়ের। কারণ, কথার পিঠে কথা আসায় কথোপকথন একেকসময় মোড় নিয়েছে একেক দিকে। তবে রাজ্জাক সাহেবের স্বাভাবিকতার কারণে মোটেই একঘেয়ে লাগেনি৷ তবে বাংলা অক্ষরে ইংরেজি কথাগুলো পড়তে একটু বেগ পেতে হয়েছে। ওইটুকু ছাড়া বাকি সবই দারুণ উপভোগ্য আর কৌতূহলোদ্দীপক ছিল। রাজা রামমোহন রায়ের মহত্ব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণ হিসেবে আবদূর রাজ্জাক মহাশয়ের মতামত ছিল, রামমোহন বাংলা ভাষায় তাঁর মূল ভাবনাগুলো লিখে গিয়েছেন, যা তাঁকে অমর করে রেখেছে। এই ভাবনার আঙ্গিকটা অভিনব লেগেছে। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নবাব সলিমুল্লাহ খান বা তাঁর পরিবারের যে অবদান বা জমি ছিল না, সেটাও একটা চমকপ্রদ তথ্য৷ হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক যেমনই থাকুক, শিক্ষাক্ষেত্রে পরীক্ষায় খাতা দেখা বা মার্কস দেয়ার ক্ষেত্রে হিন্দু বা মুসলিম কোন শিক্ষকই এর কোন প্রভাব ফেলতেন না৷ এই বিষয়টি আমার কাছে বর্তমান সময়ের চাইতে সেই সময়ের মানসিকতার উন্নত দিকের একটা নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে মনে হয়েছে৷ তখনকার দিনে ঢাকার বাইরের ছাত্রদের জায়গির রাখত ঢাকার গরিব বাসিন্দারা। সেটাকে খুব সুন্দরভাবে চিত্রায়িত করেছেন তিনি এভাবে, "তাই ঢাকা শহরের স্থানীয় অশিক্ষিত গরিবদের কন্ট্রিবিউশান টু দি ফার্দারেন্স অব হাইয়ার এডুকেশন ইজ গ্রেট।" নানান সময় নানান বিখ্যাত ব্যক্তির লেখা পড়ে মতামত দিতে হতো রাজ্জাক সাহেবকে। সেরকমভাবেই তিনি পড়েন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আত্মজৈবনিক একটি লেখা, কিন্তু সেটি ছাপা হলে শহীদ সাহেবের কৃতিত্ব তেমন বাড়ত না বলেই মনে করেছিলেন তিনি। তাই ছাপাতে নিষেধ করেন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের পরিজনকে। কাজী মোতাহার হোসেন এবং কাজী নজরুল ইসলামের সাথে সাক্ষাৎ এর অভিজ্ঞতাটাও খুব সুন্দর। নানান বিখ্যাত মানুষদের সাথে উঠাবসা ছিল তাঁর। হ্যারল্ড লাস্কি, মোনেম খান, মাহমুদ হোসাইন, শেরে বাংলা আরো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির সাথে আলাপের কথা তিনি ব্যক্ত করেছেন তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায়। দৃঢ়চেতা এবং আত্মমর্যাদাবান এই মানুষটির এই কথোপকথন পড়ে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা এবং ইতিহাস, বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে যেমন অনেক কিছু জানা যায়, তেমনি ব্যক্তি আবদুর রাজ্জাককেও আরেকটু চেনা যায়। শেষে কাজী মোতাহার হোসেন এর সাক্ষাৎকারটা ছিল একটি অনবদ্য সংযোজন, যা এই বইটির জৌলুশ বাড়িয়ে দিয়েছে হাজারগুণ৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ইতিহাস এবং একে কেন্দ্র করে পূর্ববাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে যে শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জীবনবোধের পরিবেশ সৃষ্টি ও বিবর্তিত হয়েছে, তার ইতিকথাকেই বোঝাতে চেয়েছেন সরদার ফজলুল করিম, এবং সেই উদ্দেশ্যেই এই সাক্ষাৎকার গ্রহণের পরিকল্পনা। সেই উদ্দেশ্য শতভাগ সফল।
জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সাথে সরদার ফজলুল করিমের আলাপচারিতার বই 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ।' দীর্ঘ এই আলোচনায় উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে অনেক অজানা কথা। যেসবকে এক কথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তৎকালীন সমাজের দর্পন বা ইতিহাস বলা যায়।
আবদুর রাজ্জাকের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ছফার 'যদ্যপি আমার গুরু' বইতে। কিন্তু অসাধারণ জ্ঞানী এই মানুষটা সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমার যতখানি, ঠিক ততখানি কম জানা যায়। রহস্যজনক এই মানুষটি কিছুই লেখে যাননি। সেখানে এই বইটি ক্ষুধার পরিমাণ কিছুটা হলেও কমিয়েছে। ইতিহাসের প্রাঞ্জল প্রকাশের জন্য লেখক এটিকে “একটি পোট্রের্ট, একটি প্রতিকৃতি” বলে অভিহিত করেছেন।
১৯১২ সালে প্রস্তাবিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯২১ সালে। ইংরেজরা যাকে বলেছিল তৎকালীন মুসলিম সমাজের জন্য একটা 'উপহার'। প্রথম দিকে ১১০৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১৭৮ জন মুসলিম হওয়ার পরেও ভিসি হার্টস বলেন, “ইসলামের ইতিহাস ও ঐত্যিহ্যের অধ্যয়নই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য”। তবে দেরিতে হলেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কারনে মুসলমান মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে উচ্চশিক্ষা এসেছে, তা অনস্বীকার্য।
আলোচনার এক পর্যায় আবদুর রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বলেন, “এতে নওয়াব পরিবারের আদৌ কোন অবদান ছিলো না”। ইংরেজদের সাথে সহযোগিতার ব্যাপারে বলেন- “১০০% এর উপর যদি কোন কো-অপারেশন থাকে মুসলমানরা তাই দিয়েছে। আসলে স্যার সৈয়দ মারা যাওয়ার পর উই বিগ্যান টু বিল্ড আপ দি মিথ”। আর রামমোহন রায়ের সবচেয়ে বড় অবদান হিসেবে বলেছেন তার বাংলা ব্যাকরন রচনা ও বাংলা ভাষা চর্চাকে।
তার কথা থেকে জানা যায় সত্যেন বোস নামক একজন শিক্ষকের কথা। যাকে তখন ১৮০০ টাকা বেতনের বিনিময়ে ঢাবি নিয়োগ দেয়, যা ছিল তখনকার সময় সবথেকে বেশি। নিয়োগের কয়েকদিন পর এই শিক্ষক নিজের বেতনকে ৬০০ টাকা কমিয়ে দিতে বলেন। বাকি টাকাটা ছাত্রদের স্কলারশিপের জন্য বরাদ্দ করার অনুরোধ করেন। এ সময় বেতন অনেক কম ছিল বলে শুধুমাত্র যারা আন্তরিকতা থেকে অধ্যাপনা করতেন তারাই শেষ পর্যন্ত থেকেছেন।
আলাপচারিতা থেকে জানা যায় ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাবি শিক্ষকদের ভূমিকার কথা। আবদুর রাজ্জাক মনে করেন, ভাষা আন্দোলন মূলত হয়েছে ছাত্র সমাজের দূর্দান্ত সাহস ও জাতীয় চেতনার বর্হিপ্রকাশ হিসেবে। ঐসময় তৎকালীন শিক্ষক সমাজ (এমনকি মুনীর চৌধুরী ও মোযাফফর আহমেদ সহ) শুধু প্রত্যক্ষ নয় পরোক্ষভাবেও কোন অবদান রাখেনি বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক। তবে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে তারা সমবেদনা প্রকাশ করে।
আবদুর রাজ্জাক মনে করেন, একজন শিক্ষক যেখানে আছেন সেখানেই থাকেন। তার জন্য পুরুষ্কার হলো তাঁর ছাত্ররা যখন কোনো একদিন জীবনের চলার পথে সফল হয়ে নতমস্তকে তাঁর সামনে এসে বলে, "চিনতে পারলেন না স্যার? আমি আপনার ছাত্র ছিলাম।"
নিজ স্মৃতি থেকে তিনি প্রাঞ্জলভাবে যেসব তথ্যনির্ভর ইতিহাস আলোচনা করেছেন তাতে ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তৎকালীন সমাজ সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। আবদুর রাজ্জাক মনে করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রমেই জাতীয় চেতনার ধারক হয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে স্বকীয়তা ও অধিকারবোধের বীজ ছড়িয়ে দিয়েছে।
এই '২০ থেকে '৯০ দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানুষগুলারে দেখলে নিজের মধ্যে হীনমন্যতা কাজ করে একটা। তাঁরা একেকজন কী করে গেছেন, আর আমরা ভার্সিটিতে বইসা কী ক���তেছি? ঘাসটাও তো কাটতেছি না। অনেক কিছুই জানা গেল, তবে আরও অনেক বেশী এক্সপেক্টেশন নিয়ে শুরু করছিলাম এটা পড়া। আরও অনেক তথ্য আসতে পারতো। একজন ব্যক্তি দেশ বিভাগ, বায়ান্ন, একাত্তর এত কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁকে নিয়ে কয়েক খণ্ডে লিখেও শেষ হওয়ার কথা না।
অসাধারণ আমোদপ্রবণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক। বিভিন্ন ব্যক্তিকে আমরা 'মহান' বলে গণ্য করি, তার আগে আব্দুর রাজ্জাককে পড়া জরুরি। আর প্রাসঙ্গিকভাবে কাজী মোতাহার হোসেনের সংলাপও ভালো লেগেছে। শিক্ষণীয়।
রাজ্জাক স্যারের কথাবার্তা তো শুনতে খুবই ভালো লাগে। সেই সময়ে সরদার স্যার বইটার ভূমিকায় বলতেছেন, রাজ্জাক স্যারের ভাষাটা তো লেখা কষ্ট। কিন্তু ওই ভাষাতেই লিখলে আরো মজা হইতো। হয়তো তখনও আমাদের সাহিত্য বা লেখালেখির জগৎ রাজ্জাক স্যারের ঢাকাইয়া ভাষায় বই লেখা হবে, সেইটার জন্যে প্রস্তুত ছিলো না।
বইটাতে বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং জিনিস আছে। যেমন পপুলার ধারণা এই যে ঢাবি প্রতিষ্ঠার সময় নবাব পরিবার জায়গা দিছে। রাজ্জাক স্যার বলতেছেন, এইসব খাস জমি, একটাও নবাবদের জমি না। খাস জমি মানে সরকারের মালিকানার জমি, ব্যক্তি মালিকানার না। কখনো সুযোগ পাইলে ঢাকা কালেক্টরেট এ এই দাগের খতিয়ান ঘেঁটে দেখে নিশ্চিত হবো।
এর বাইরে তার মনোজগতের তেমন কিছুই এই বইতে নাই, যতটা যদ্যপি আমার গুরু তে আছে। এইখানে তার কিছু স্মৃতিচারণ আছে আরকি। শেষের দিকে লেখকের কাজী মোতাহার হোসেন কে নিয়ে তিন চার পাতার একটা প্রবন্ধ আছে। ওইটা কীভাবে এই বইতে প্রাসঙ্গিক, জানিনা, সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয় এবং সত্যেন বোস নিয়ে আলাপ আছে বলে এখানে ঢুকিয়ে দেয়া হইছে।
যাইহোক, জরুরি বই, এই অর্থে যে, রাজ্জাক স্যার এর তো এরকম ডকুমেন্টেশন খুব কম। যদি উনি এত মিস্টিরিয়াস না হইতেন, তাইলে এই বই এত মূল্যবান হইতো না। তার সম্পর্কে রিসোর্স কম, তাই যা আছে, তার সকলই মূল্যবান।
পান্ডিত্যের শীর্ষে পৌঁছেও সেটাকে ধর্তব্যে না এনে জ্ঞানপিপাসা আর জ্ঞানার্জনের ইচ্ছা পোষণ আর প্রকাশ করার অপর নাম জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশবিভাগ, ভাষা আন্দোলন আর স্বাধীনতা যুদ্ধ পেড়িয়েও আজ অবধি গৌরবের সাথে টিকে আছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই প্রতিষ্ঠানটি। যুগে যুগে দেশ বিদেশের কত নামীদামী শিক্ষক এসেছে এই প্রতিষ্ঠানে। এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা মানুষকে দেখিয়েছে আলোর পথ, জ্ঞানের পর। মাতৃভাষার জন্য লড়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই। সক্রিয় রাজনীতিতে ভূমিকা রেখেছে এই প্রতিষ্ঠানেরই কৃতিমান ছাত্ররা। যুগে যুগে অজস্র কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী আর বিশিষ্ট গুণীজনদের আলোয় আলোকিত হয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। ঠিক তেমনি একজন জ্ঞানের ভারে সমৃদ্ধ মানুষ এই প্রতিষ্ঠানেরই ছাত্র এবং পরবর্তীতে শিক্ষক প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক।
'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ' (অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক এর আলাপচারিতা) - সরদার ফজলুল করিম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও অবকাঠামো, প্রশাসনিক অগ্রগতি ও দুর্বলতা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক, ভিসিদের রাজত্ব আর মুখ ও মুখোশ, সমাজের সূক্ষ্ম বিচার বিশ্লেষণ, বাংলার রাজনৈতিক অবস্থা, দেশবিদেশের প্রখ্যাত লোকদের সানিধ্য লাভ, দেশবিভাগের পর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্দিন, শিক্ষক হিসেবে নিজের অপারগতা এসবই ফুটে উঠেছে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক প্রচলিত ঢাকাইয়্যা মুখের ভাষায় সরদার ফজলুল করিম এর লেখায়।
"প্রতিকৃতির মধ্য দিয়ে সত্তার যে চিত্ররূপ ফুটে ওঠে সেটা তো শাশ্বত মর্যাদায় ভাস্বর, নতুনভাবে তুলির আচঁর টানা সেখানে অবান্তর"।
১৯১২ সালে প্রস্তাবিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালের পহেলা জুলাই। ইংরেজরা একে তৎকালীন মুসলিম সমাজের জন্য 'উপহার' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। প্রথম দিকে ১১০৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মুসলিম ছাত্র ছিলেন মোটে ১৭৮ জন কিন্তু তাও ভিসি হার্টস বলেছিলেন, 'এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অধ্যয়ন। দেরীতে হলেও এই বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্ন মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজেদ ছাত্রদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে সক্ষম হয়েছিলো।
একটা কথা প্রচলিত আছে এরকম যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর জন্য ঢাকার নওয়াব পরিবার ৬০০ একর জমি দান করেছিলো। এ প্রসঙ্গে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক বলেন, 'এতে নওয়াব পরিবারের আদৌ কোন অবদান ছিলো না'। ইংরেজদের সাথে সহযোগিতার ব্যাপারে মুসলমানরা কোন ধরনের কার্পণ্য করেন নি আর তাছাড়া আসলে স্যার সৈয়দ মারা যাওয়ার পর 'উই বিগ্যান টু বিল্ড আপ দ্য মিথ'। আর রাজা রামমোহন রায় এর কথা প্রসঙ্গে স্যার জানান যে রাজা রামমোহন রায় এর বাংলা ব্যাকরণ রচনা ও বাংলা ভাষা চর্চাটাই মূলত তার সবচাইতে বড় অবদান।
দেশবিভাগের পরপর ঢাবির অবস্থা খুব শোচনীয় হয়ে যায়। সে সময় সত্যেন বোস নামক এক শিক্ষক পায় ঢাবি। যিনি বেতন হিসেবে ১৮০০ টাকা পেতেন। যা তখনকার সময়ে অনেক বেশীই ছিলো। তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে তার বেতন থেকে ৬০০ টাকা কমিয়ে দিতে বলেন। আর সে টাকাটা ছাত্রদের স্কলারশিপে ব্যয় করার জন্য আদেশ দেন। এমনকি সত্যেন বোস বিভিন্ন জেলা ঘুড়ে এমনকি কোলকাতা থেকেও নিজে খুঁজে এনে অনেক শিক্ষককে ঢাবিতে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আসলে সে সময়টা বা পরিস্থিতিটা এমন ছিলো যে খুব বেশী আন্তরিক যারা ছিলেন তারা ছাড়া বাদ বাকি সবাই এই পরিস্থিতিটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
আব্দুর রাজ্জাক স্যার ১৯৩৬ সালে মাস্টার্স এ প্রথম শ্রেণীতে পাস করে ঢাবিতে রাজনৈতিক অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিকস এ বিশ্বখ্যাত প্রফেসর হ্যারল্ড লাস্কির অধীনে পিএইচডি করতে যান। 'পলিটিকাল পার্টি ইন ইন্ডিয়া' এই শিরোনামের থিসিসটি সে পরিপূর্ণ করতে পারেন নি তার কারন তার প্রফেসর হ্যারল্ড লাস্কির মৃত্যু। প্রফেসর হ্যারল্ড লাস্কি ছাড়া তার থিসিস মূল্যায়ন করার মতো কেউ নেই এই ভাবনাই তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনেছিলো যদিও তার থিসিস শুধুমাত্র জমা দেয়াই বাকি ছিলো। তবে অনেকের মতে পিএইচডি এর প্রতি তার বিতৃষ্ণা হওয়ায় থিসিস পূর্ণ করতে পারেন নি তিনি। সে যাই হোক, ১৯৫০ সালে তিনি দেশে ফিরেন। ১৯৭৩ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডি লিট উপাধি দেয়। এর ঠিক দুবছর পরই ১৯৭৫ সালে তিনি ঢাবির সিনিয়র প্রভাষক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। একই বছর সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক মনোনীত করে। সর্বদা ঢাকাইয়্যা বুলি বলা দেখতে ছোটখাটো এই মানুষটার জ্ঞান ছিলো হিমালয়সম। তিনি ছিলেন শিক্ষকদের শিক্ষক এমনকি তাকে অনেকে গ্রীক দার্শনিক ডায়োজেনিসের সাথে তুলনা করেন।
আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, 'একজন শিক্ষক যেখানে আছেন সেখানেই থাকেন। তার পুরষ্কার হলো যখন তার কোন ছাত্র জীবনে সফলভাবে চলার পথে নতমস্তকে তার সামনে এসে বলে, 'চিনতে পারলেন না স্যার..? আমি আপনার ছাত্র ছিলাম'। একজন শিক্ষকের জন্য এর চাইতে বড় সফলতা বা পুরষ্কার আর কিইবা হতে পারে..?
আব্দুর রাজ্জাক স্যার আমাদের অনেকের কাছেই দুর্ভেদ্য এবং রহস্য আর তার কারন একটাই আমরা কেউই তার চিন্তাচেতনা এবং তার পান্ডিত্যের রেশ আমরা পাই নি। তার নিজের লিখিত কোন বই নেই যদিও 'Bangladesh : State of the Nation' শীর্ষক বক্তৃতাকে একটি বইতে রুপান্তর করা হয়েছে। লেখালেখির প্রতি তার প্রচুর অনাগ্রহ ছিলো সে নিজেই স্বীকার করতো। তবে উনার সম্পর্কে সবচাইতে বেশী জানা যায় তার ছাত্র বাংলাদেশের সাহিত্যের আরেক উজ্জ্বল তারা আহমদ ছফা রচিত 'যদ্যপি আমার গুরু' এই বইটি থেকে। এছাড়া বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে তার ছাত্রদের সমন্বিত উদ্যোগে 'আব্���ুর রাজ্জাক স্মারকগ্রন্থ' নামেও একটি বই বের করা হয়েছে যেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঙ্গনের প্রথিতযশা মানুষগুলো লিখেছেন প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক স্যারের সাথে কাটানো মুহুর্তগুলো।
সবশেষে বলছি বইটাতে অনেক একঘেয়েমি আছে কেননা এটা শুধুমাত্র স্মৃতিচারণ মূলক এক সাক্ষাতকার। এতে নেই কোন সাহিত্যরস, নেই কোন গল্প, নেই কোন কল্পনারস আছে শুধু একগাদা জ্ঞানের কথা, ঢাবির উত্থান পতন এর কথা, স্যারের জ্ঞানের মাধুর্যতা আর মহিমা। বইটির ভাষাতে সরদার ফজলুল করিম কোন ধরনের আবেগ মিশান নি তার কারন একটাই স্যারের মুখে বলা ঢাকাইয়্যা ভাষা শুনতে শুনতে হুট করে আপনার মনে হবে হয়তো আপনি নিজেই সরদার ফজলুল করিম কিংবা ফজলে রাব্বী। তাই ভেবেচিন্তে পড়ুন।
নিজপ্রসঙ্গ : জ্ঞানতাপস প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক স্যারের নাম জেনেছি প্রথম সাধারণ জ্ঞান এর বই পড়ে। বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক হিসেবেই চিনতাম উনাকে। তার অনেক পরে যা সম্ভব ২০১০/১১ সালের দিকে বেঙ্গল গ্যালারী অফ ফাইন আর্টস এ এক শিল্পীর প্রদর্শনী দেখতে যেয়ে উনার ছবি দেখি সেখানে প্রথম। এর পরপরই আহমদ ছফা রচিত 'যদ্যপি আমার গুরু' বইটা পড়ি। এছাড়াও হুমায়ুন আহমেদ এর কিছু লেখাতেও উনার কথা জেনেছি আর তাছাড়া বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য পেইজে অনেকের সাক্ষাতকারে উনার জ্ঞানের মহিমা আর বর্ণনা শুনেছি। তার পর থেকেই উনার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ অনুভব করি। একটা কথাই ঘুড়ে ফিরে মনের গহীন কোনে, "স্যার এভাবে আমাদের বঞ্চিত করতে পারলেন"....?
পরিশিষ্টে কাজী মোতাহার হোসেনের সাক্ষাৎকারটা দারুন এক বাড়তি পাওনা। ওখান থেকেই জানলাম কাজী সাহেব পরিসংখ্যানকে ‘তথ্যগণিত’ বলতেন। যাইহোক, অধ্যাপক রাজ্জাক তাঁর আলো নিয়েতো আছেনই বইটিতে , সাক্ষাৎকারগ্রহীতা সরদার ফজলুল করিম তাঁর পরিমিতিবোধ , বিষয়ের চৌহদ্দিতে থাকতে গোছানো প্রশ্ন নিয়ে সেই আলোর নিচেও উপস্থিত।
অধ্যাপক রাজ্জাক Intellectual Confronttion বা বুদ্ধির দ্বন্দ্ব পছন্দ করতেন বলে জানা যায়। এরকমই এক দ্বন্দ্বে পাকিস্তানের গুপ্ত পুলিশ প্রধানকে তাঁর ভক্ত বানিয়ে ফেলেছিলেন ।
১৯৩০ পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের শিক্ষার অবস্থা, ঢাকার ও তৎকালীন রাজনীতির হালচালসূত্রে রাজ্জাক সাহেবের মন্তব্য, পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা সবই দারুন।
সরদার ফজলুল করিমের নেওয়া অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের আলাপচারিতায় (সাক্ষাৎকার না বলাই ভালো। কারণ, এখানে শুধু প্রশ্ন আর উত্তর, এই ধারা মানা হয়নি। বরং, আব্দুর রাজ্জাক গল্পই বলেছেন) উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, তৎকালীন আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বহু মনিষীদের বিষয়ে জানা যায় নানা কথা।
Professor Razzaque sir's interview with Sardar Fazlul Karim. His philosophy, political thought and the glory of Dhaka University along with its teachers, honorable VCs as well as educational cultur are depicted in lively sketch
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে জানার আকাংখ্যা থেকে পড়া শুরু করেছিলাম। খেয়াল করিনি যে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক স্যারের সাথে আলাপচারিতা নিয়ে বইটি লেখা। স্যারের আলাপ বেশ তথ্যবহুল তথ্যবহুল ও একই সাথে উপভোগ্য ছিলো।
Reading history is good. Reading history through interview is better. Reading history through Prof. Abdur Razzaq's is interview is awesome! It's not actually reading, it's experiencing.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজঃঅধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের আলাপচারিতা --সরদার ফজলুল করিম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম যুগের বিস্তারিত তেমন কোনো ইতিহাস ছিল না।এটার উপাদানগুলোও ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছিল -এরকম একটা বেদনাবোধ থেকে সরদার ফজলুল করিম চিন্তা করেন আবদুর রাজ্জাক স্যারের সাক্ষাৎকার গ্রহণের যেখান থেকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোড়া থেকে তার বৃদ্ধি ও বিকাশের ক্ষেত্রে রাজ্জাক স্যারের নিজস্ব কিছু স্মৃতি সংরক্ষণ করবেন।আর এই চিন্তা থেকেই তিনি ১৯৭৬ এর জুলাই আগস্টের দিকে এই কাজ শুরু করেন। রাজ্জাক স্যারের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ৪৫ বছরের।তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে সবসময়কার কোন্দল, রাজনীতি ইত্যাদির চেয়ে আগ্রহবোধ করতেন জ্ঞানচর্চায় এবং পুস্তক সংগ্রহ ও পাঠে। রাজ্জাক স্যারের দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিরপেক্ষভাবে অনেক ঘটনা উঠে এসেছে বইটিতে,ইতিহাস উঠে এসেছে। রাজ্জাক স্যার বিভিন্ন শিক্ষকদের বায়োডাটা ঘাটাঘাটি করতেন,তাদের সম্পর্কে কিছু পরিষ্কার ধারণা রাখতেন।।তখনকার সময়ের সাথে পরবর্তী সময়ের তুলনামূলক পার্থক্য নিয়ে আলোচন��� করতেন। তিনি জানতেন কোনোকিছু নিয়ে বক্তৃতা বা ক্লাসে লেকচার দিতে তিনি পারেন না,এরপরও তিনি শিক্ষকতা পেশাটিকে বেছে নেন এবং সেই পেশাতেই পুরো জীবন কাটান। মাস্টার্সে ভাইভা দেয়ার সময় রাজ্জাক স্যার তাঁর বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন যে সে বছর তিনি ভাইভাটা দেবেন কি না কারণ সে বছর ভাইভা দিলে তিনি সেকেন্ড ক্লাস পাবেন,পরের বছর দিলে হয়তো ফার্স্ট ক্লাস পেতে পারেন।অথবা কোনো কম্পিটিটিভ এক্সামে যোগ দিয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হতে পারেন।তাঁর বাবা বলেছিলেন,"আমি তো সারাজীবন পুলিশের চাকরি করলাম, তুমি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট না হতে চাইলে মাস্টারিতে যাও।"তখন রাজ্জাক স্যার বললেন,মাস্টারিতে ২০০ টাকা বেতন, ফ্যামিলিতে কিন্তু আমি বেশি কন্ট্রিবিউশন রাখতে পারবো না। আলাপচারিতায় বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গের আলোচনা সমালোচনা উঠে এসেছে।
সলিমুল্লাহ মুসলিম হল প্রতিষ্ঠায় নবাব সলিমুল্লাহর পরিবারের কোনো কন্ট্রিবিউশান ছিল না....বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল এঁনারা ইংরেজিতে সেল্ফ এক্সপ্রেশন খুঁজে পান নি বলেই বাংলায় ফিরে এসেছেন,বাংলা ভাষার উন্নতি করবার জন্য ফেরেন নি...... রামমোহনের ওয়ান এন্ড অনলি কন্ট্রিবিউশান ছিল দেশীয় ভাষার চর্চা করা।ব্রাহ্মসমাজ বা ধর্মপ্রচারে রামমোহনের বিশেষত্ব তেমন নেই,সেই সময়ে অনেকেই ধর্মচর্চা করেছেন,রামমোহনের চেয়ে জোরালোভাবেই করেছেন....রামমোহন মুসলিম নারী নিয়ে সংসার করতেন বলে সে সমাজ তাকে গ্রহণ করে নি,তিনি হিন্দু স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে লোকজন বাধা প্রদান করে যে রামমোহন থাকলে তারা থাকবেন না।রামমোহন রায়ও সেটি মেনে নেন এবং থাকেন না..কাজেই he wasn’t a founder of the hindu school... Muslims were backward in English..this is one of the reasons behind founding Dhaka University to bridge the gap,the gap that existed between muslim and non muslim students.... এরকম অনেক অনেক আলাপ উঠে আসে। কাজী মোতাহের হোসেন চৌধুরীর সাথের মজার মজার স্মৃতি বর্ণনার পাশাপাশি তুলে ধরেন তিনি কতোটা জ্ঞানী এবং আত্মভোলা ছিলেন। পাকিস্তানের গুপ্ত পুলিশ প্রধান আওয়ানের সাথে কথোপকথনের একটা অংশ আছে যেটা খুবই মজার ছিল।
১৪৪ পৃষ্ঠার বইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পূর্ববঙ্গীয় সমাজ -বিষয়টার লাগাম এমন নিখুঁতভাবে ধরে রেখেছেন সরদার ফজলুল করিম যেটি প্রশংসনীয়। সচেতনভাবে রাজ্জাক স্যারের কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণ করেছেন এবং তা বইটিতে সুন্দর করে গুছিয়ে প্রকাশ করেছেন।এটি পড়তে গেলে রাজ্জাক স্যারকে কালের সাক্ষীর মত মনে হয়,একটা অতীত সময়ের দর্পণের মত মনে হয়।
ভালো লেগেছে বইটি,অনেকাংশে অবশ্য পাঠ্য বলে মনে হয়েছে।
জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সাথে আরেক বুদ্ধিজীবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমের কথোপকথনে ত্রিশ থেকে সত্তর দশকের মধ্যবর্তী যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই আলোচনা এই বইতে স্থান পেয়েছে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে সরদার সাহেব কতটা শ্রদ্ধার সাথে দেখতেন তা এই বইটি কী যত্ন করে লিখা হয়েছে তা দেখলেই বুঝা যায়। বইটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যত আলাপ এসেছে তার সিংহভাগই অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। তাই তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর ক্ষণে ক্ষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই নিয়ে এই বইটি।
অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তার আড়ালে তার দেশপ্রেম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আনুগত্য ঢাকা পরে যায় যেটা এই বইয়ে বিশেষভাবে আড়াল হয়ে থাকে নি। উনি ২০০/২৫০ টাকা মাইনের একজন রিডার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করেন যখন ম্যাজিস্ট্রেট হতে পারলে নিসন্দেহে তিনি ৮০০/৮৫০ টাকা বেতনে চাকরি করতে পারতেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নেন এবং আজীবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন গঠন করা হয় তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মুসলিম এডুকেশনের জন্য তৈরি করা হলেও তখনকার নামজাদা মুসলমানরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এগিয়ে আসেননি। এমনকি ফজলুল হকও কাউন্সিলের অংশ হওয়া সত্বেও কোনো মিটিংএ আসতেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম স্টুডেন্টও ছিল প্রতি ডিপার্ট্মেন্টে ৩/৪ জন করে। এমনটা চলেছে ১৯৩৫/৩৬ পর্যন্ত। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে মুসলমানরা অর্থনীতি বিভাগ থেকে শুরু করে অন্য বিভাগে শিক্ষক হতে শুরু করে। তারপর থেকে সত্যিকার অর্থে বলা যায় মুসলমানদের শিক্ষার জন্য( মুসলমান ছাত্রদের) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকার অর্থে কাজ করা শুরু করে। এর একটা অংশ হিসেবে ছিল কারিকুলামে ইসলাম শিক্ষা, উর্দু এবং ফরাসি ভাষাকে স্থান দেওয়া। সামান্য মুসলিম টাচ দিয়ে যেন মুসলমান স্টুডেন্টদের আকর্ষণ করা যায়। নাহয় তখনকার প্রেসিডেন্সি কলেজের মানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ছিল( বেশিরভাগ বাঙালি সেখানেই পড়তে যেত)। আর অর্থনৈতিক দিক থেকেও মুসলমানদের পড়াশোনা করার ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরোতে হত। তখনকার ছাত্র হিসেবে আবদুর রাজ্জাকের মতামতগুলো এই বইয়ে বিশেষভাবে মূল্যবান।