করোনার সময়ে মহামারিই ছিল নির্মমতম বাস্তবতা। মৃত্যু ও শোকের প্রবাহে কোনোভাবেই তাকে এড়ানোর উপায় ছিল না। তখন মানুষ ভাবতে শুরু করেছিল, মহামারি বদলে দেবে পৃথিবীকে। বিশ্বব্যবস্থা থেকে শুরু করে মানুষের সম্পর্ক, বিশ্বাস, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব—অনেক কিছু।
কিন্তু তিন-চার বছর বছর গড়াতে না গড়াতে, খোদ মহামারিকেই ভুলে গেল মানুষ। অস্বাভাবিকতা থেকে স্বাভাবিকে প্রত্যাবর্তনের এক বিস্ময়কর মানবীয় ক্ষমতা মহামারিকে স্মৃতির অতলে নিয়ে গেল। বিপুল বিপর্যয়কেও মানুষ আত্মস্থ করে নিল হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো।
কীভাবে ভাতৃঘাতি একের পর এক যুদ্ধ নিউ নরমাল থেকে মানুষকে নরমালে ফিরিয়ে দিল? কীভাবে শহর থেকে হারিয়ে গেল একেকটি স্মৃতিচিহ্ন?
মাহবুব মোর্শেদের ‘ক্যান্ডি ফ্লস’ উপন্যাসে এমন অনেক স্মৃতিচিহ্নের কথা লেখা হলো, যা মহামারির পর বেমালুম হারিয়ে গেছে। কিন্তু সেসব কোনো হাহাকারের গল্প তৈরি করেনি।
ক্রমপরিবর্তনশীল জীবনে পরিবর্তনই হয়তো সত্য। কিন্তু স্মৃতিতে কি কিছুই থাকবে না?
তাই ঘরবন্দি মানুষের সেই অব্যক্ত ও বিস্মৃত কথাগুলো এই উপন্যাসে লেখা হলো। আপনার গল্পও হয়তো এখান থেকেই শুরু হবে।
মাহবুব মোর্শেদের জন্ম ১৯৭৭ সালে ২৯ জানুয়ারী রংপুরে। গল্পকার, ঔপন্যাসিক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে। পেশা সাংবাদিকতা। শৈশব-কৈশর কেটেছে উত্তরের রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা ও দক্ষিণ-পশ্চিমের কুষ্টিয়ায়। ২০০৬ সালে তার গল্পগ্রন্থ ‘ব্যক্তিগত বসন্তদিন’ প্রকাশিত হয়েছে কাগজ প্রকাশনী থেকে। ২০১০ সালে ভাষাচিত্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে উপন্যাস ‘ফেস বাই ফেস’।
পরিচিত ঘটনাবলী মাহবুব মোর্শেদের গল্পে আসে নতুন আবিষ্কার, চমক আর বুননে সজ্জিত হয়ে। স্বতঃস্ফূর্ত ভাষা বুনে দেয় রহস্যময় সংযোগ। তার স্টোরিটেলিং সব সময়ই আকর্ষক, স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত। গদ্য সরল, কিন্তু দ্ব্যর্থকতায় ভরপুর—ইশারা আর পরিহাসে ঠাসা। তার কবিতা লিপ্সা, আকাঙ্ক্ষা, তাড়না ও প্রেমের আরেক উন্মীলন। গল্প-উপন্যাস রচনা ছাড়াও তিনি এক সময় বিচিত্র বিষয়ে লিখতেন ব্লগে। এখন ফেসবুকে লেখেন নানা বিষয়ে ছোট ছোট কথা।
মাহবুব মোর্শেদের উপন্যাস 'ক্যান্ডি ফ্লস' পড়লাম। এক বসায় না হলেও প্রায় একটানেই পড়া হয়ে গেছে। ঝরঝরে গদ্য, চমৎকার স্টোরিটেলিং এবং খুব পরিচিত এক সামাজিক বাস্তবতার ভেতর গল্প নির্মাণ— সব মিলিয়ে বইটি বেশ উপভোগ্য।
উপন্যাসের কথক কায়সার, একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টেন্ট। অফিসের সহকর্মী কিসলুর প্রভাবে সে ধীরে ধীরে খাবার, ভ্রমণ এবং বিশেষ করে নানা ধরনের মাছ নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এই ঘোরাঘুরির সূত্র ধরেই তার পরিচয় ঘটে বিভিন্ন নারীর সঙ্গে। কেউ তরুণী, কেউ বয়সে বড় সংসারী নারী, কেউ আবার বেপরোয়া ও বিদ্রোহী। তাদের উপস্থিতি কায়সারের দীর্ঘদিনের নিস্তরঙ্গ জীবনকে ধীরে ধীরে বদলে দিতে থাকে।
এর মধ্যেই আসে কোভিড মহামারী। মানুষের জীবনযাপন যেমন বদলে যায়, তেমনি বদলে যেতে থাকে কায়সারের জীবনও। দীর্ঘদিন নারীসঙ্গ থেকে দূরে থাকা কায়সার একে একে কয়েকজন নারীর খুব কাছাকাছি চলে আসে। অথচ তাদের হয়তো আগে থেকেই পরিচিত ছিল, সম্পর্ক ছিল স্বাভাবিক, প্রায় আনুষ্ঠানিক। আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পর্কগুলোর অনেকগুলোই ফিরে যায় আগের দূরত্বে— সৌজন্য বিনিময় আর সীমিত পরিচয়ের জায়গায়। কেন মানুষ হঠাৎ এত কাছাকাছি চলে আসে, কিংবা কী কারণে আবার দূরে সরে যায়— এই প্রশ্নগুলোর কোনো সরাসরি উত্তর উপন্যাস দেয় না। বরং সেই অনিশ্চয়তাকেই গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত করে। কোভিড সময়ের বর্ণনাও উপন্যাসটির অন্যতম শক্তিশালী দিক। পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে সেই নিঃসঙ্গ, উৎকণ্ঠাময় দিনগুলোতে ফিরে গেছি— যখন মানুষ একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন ছিল, আবার নতুন ধরনের সংযোগের খোঁজও করছিল। মহামারীর সেই মানসিক আবহকে মাহবুব মোর্শেদ বেশ বিশ্বাসযোগ্যভাবে ধরতে পেরেছেন।
উপন্যাসটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি এর চরিত্র নির্মাণ, বিশেষ করে নারী চরিত্রগুলোর উপস্থাপন। শ্রাবণী, কায়সারের সহকর্মী এবং তার সবচেয়ে কাছের মানুষ কিসলুর গোপন প্রেমিকা, হঠাৎ করেই এক বিকেলে কায়সারের জীবনে অন্যরকমভাবে প্রবেশ করে। এর আগে বহুবার দেখা হলেও তাদের সম্পর্ক ছিল দূরত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই বিকেলের অন্তরঙ্গতাকে তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করে, আর কিছুদিনের জন্য চলতে থাকে তাদের গোপন অভিসার। পাঠকও একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করে— হয়তো এমনটাই হওয়ার কথা ছিল।
অন্যদিকে তারানা চরিত্রটি আসে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। একটি বারে আকস্মিক পরিচয় থেকে শুরু হওয়া যোগাযোগ ধীরে ধীরে দুজন অপরিচিত মানুষকে একে অপরের দিকে টেনে নেয়। ভার্চুয়াল আলাপের পর গড়ে ওঠে শারীরিক ঘনিষ্ঠতাও। পরে বাস্তব দূরত্ব তৈরি হয়, তারানা সিডনিতে পরিবারের কাছে ফিরে যায়। কিন্তু সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যায় না, বরং ভার্চুয়াল জগতেই আরও কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যায় তারা।
আবার ফেসবুকের দীর্ঘদিনের স্বল্প পরিচয় পেরিয়ে কায়সারের জীবনে আসে বিষাদবিন্দু। সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বভাবের দুই মানুষ এক অদ্ভুত উপায়ে প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। এই সম্পর্কগুলোকে কোনো নির্দিষ্ট ছকে ফেলা যায় না, আর সেখানেই উপন্যাসটির সার্থকতা।
নারী চরিত্রগুলোর পাশাপাশি উপন্যাসটিকে এগিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রাখে কিসলু চরিত্রটি। তার খামখেয়ালিপনা, অস্থিরতা এবং জীবনকে দেখার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই কায়সারকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং গল্পকে ক্রমাগত এগিয়ে নিয়ে যায়।
মানুষের সম্পর্ক, আকর্ষণ, দূরত্ব এবং অনিশ্চয়তার এই বিপরীতমুখী অভিজ্ঞতাগুলোই ক্যান্ডি ফ্লসকে নিয়ে গেছে মনোজগতের এক বিশেষ দোলাচলে। যৌনতাকে উপজীব্য করে চরিত্রগুলোর ভেতরে যে টানাপোড়েন ও মানসিক উত্তেজনা তৈরি হয়, সেটিও উপন্যাসটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
অনেকদিন পর এমন কোনো রিসেন্ট বাংলা ফিকশন পড়লাম, যা আমাকে টানা পড়তে আগ্রহী করেছে।
গুডরিডস রেটিং আমার কাছে বেশ ঝামেলা লাগে। ৩-৪ মাঝে কিছু দেওয়া যায় না, নাহয় ৩.৫ দিতাম।