এই বইয়ের একটা কবিতা নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। কবিতার নাম ‘হে মহাজীবন’।
ধরা যাক কবিতাটা এমন একজন পড়ছে যে জীবনে অন্য কোনো কবিতা পড়েনি। ধরা যাক এই পাঠক বা পাঠিকা কবির ব্যাপারে কিছু জানে না। কবিতার ইতিহাস, প্রেক্ষপটের ব্যাপারে কিছু জানে না। শুধু চোখের সামনে যে আটটা পংক্তি আর একটা শিরোনাম দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর ভিত্তিতে বোঝার চেষ্টা করছে এই কবিতার অর্থ কী হতে পারে। যেহেতু প্রতি লাইনের শেষের সঙ্গে পরবর্তী লাইনের শেষটা ছন্দে মিলে যায়, তাই আমাদের কাল্পনিক পাঠিকা লাইনগুলোকে জোড়ায় ধরে পড়ছে। এভাবে পড়লে কবিতাটা কেমন লাগতে পারে?
প্রথম যুগল:
‘ হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো,’
শুরুটা যেন প্রার্থনার মতো। তবে ঈশ্বরের বদলে এখানে মহাজীবনকে ডাকা হচ্ছে, তার কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে। কী এই মহাজীবন? ঈশ্বরেরই আরেক নাম? এখানে ‘জীবন’ শব্দটা যেন ঈশ্বরকে আরেকটু কাছে নিয়ে আসে, আরেকটু বাস্তব আর নিরেট করে তোলে। সে সাথে ‘মহা’ শব্দ জুড়ে কবি যেন জীবনকে একটা নতুন মাত্রা দিয়েছেন। মনে করিয়ে দিচ্ছেন জীবনের আরেকটা অর্থ: জীবন মানে শুধু আমার বয়স নয়, অভিজ্ঞতা নয়, জীবন মানে এমন সবকিছু যা নড়ছে, চলছে, সময়ের সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে, যার বেঁচে থাকার তাড়না আছে, মহাজীবন মানে জীবন্ত সবকিছু।
আর এই জীবন্ত মহাবিশ্বের কাছে কবি কী চাইছেন? কী তার প্রার্থনা? তিনি কবিতা থেকে মুক্তি চাইছেন। এই বিষয়টা শুরুতেই একটু ধাক্কা দেয়, কৌতূহল সৃষ্টি করে: একজন কবি কেন কবিতা থেকে মুক্তি চাইবেন? দ্বিতীয় লাইনে সেই কারণের ইঙ্গিত আছে। তিনি গদ্যের মতো কঠিন আর কঠোর কিছু চান। কিন্তু গদ্য কঠিন হবে কেন? সেটাও কি কবিতার মতো একধরনের সাহিত্য নয়? পরের লাইনগুলোতে হয়তো নতুন কিছু জানা যেতে পারে।
দ্বিতীয় যুগল:
‘পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!;
প্রথম দুই লাইন যদি প্রার্থনা হয়ে থাকে, তাহলে পরের দুটো যেন স্লোগান। লাইনদ্বয় জুড়ে হুকুমের সুর, ধ্বংসের আহ্বান, দ্বিতীয় লাইনের শেষে আশ্চর্যবোধক চিহ্ন—সব মিলিয়ে কবিতার এই অংশটা যেন হঠাৎ কয়েক পর্দা উঁচুতে চড়ে গিয়েছে। যেটা অনুরোধ ছিল, সেটাকে দাবিতে পরিণত করেছে।
এবার কবিতা আর গদ্যের মধ্যে পার্থক্যটা আরেকটু পরিষ্কার হয়। কবিতাকে কবি দেখেন অনেকটা সঙ্গীতের মতো করে—যেখানে শব্দের ঝঙ্কার আর সুর, সৌন্দর্য আর সুক্ষ্মতার মতো নির্মল বিষয়কে ধারণ করা হয়। সে তুলনায় গদ্যকে হয়তো তিনি আরও বাস্তবিক মনে করেন। কবিতার তুলনায় গদ্য আরও সরাসরি নিজের কথা বলতে পছন্দ করে। কাব্য যদি সঙ্গীতের মতো হয়, তাহলে গদ্য হচ্ছে সরঞ্জামের মতো। কঠিন, কঠোর, কড়া—এই বিশেষণগুলো অন্তত তাই বলে। হাতুড়ির সঙ্গে গদ্যের তুলনা তাই বলে।
তৃতীয় যুগল:
‘প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা—
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,’
এখানেও যেন আগের দুই লাইনের রাগ, অভিমান আর দাবি খানিকটা প্রবাহিত হয়েছে। সে সাথে আবারও কবিতাকে কবি যেভাবে দেখেন সে বিষয়টা পরিষ্কার করা হয়েছে। কবিতা হচ্ছে স্নিগ্ধ, কোমল, নাজুক। গদ্যের জন্য যে বিশেষণ ব্যবহার করা হয়েছে, কবিতার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ঠিক তার উলটো বিশেষণ।
শেষ যুগল:
‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় :
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।।’
এখানে হচ্ছে আমাদের ডিনুমা, আমাদের ক্লাইম্যাক্স, আমাদের রহস্যের সমাধান, যেখানে এসে শেষ পর্যন্ত বোঝা যায় কবি কেন কবিতা থেকে মুক্তি চাইছেন। কারণ মহাজীবনের বসবাস হচ্ছে ক্ষুধার রাজ্যে, কারণ মহাবিশ্বে জীবন্ত এমন কিছু নেই যার ক্ষুধার যন্ত্রণা সইতে হয় না। আর যে রাজ্যে ক্ষুধা হচ্ছে সবথেকে বড়ো সত্য, সেখানে সুন্দর আর স্নিগ্ধের থেকে কঠিন আর কঠোর হয়তো বেশি উপযুক্ত।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই দুটো লাইন আলাদা পড়লে অর্থ যা মনে হয়, কবিতার ভেতর তার অর্থ একদম বিপরীত। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটির সাথে তুলনা করা—এগুলো দেখলে মনে হয় ক্ষুধার্ত কোনো মানুষের চোখে বাস্তব পৃথিবীও রূপকে পরিণত হচ্ছে, চাঁদকে রুটির মতো লাগছে। কিন্তু কবিতায় পূর্ণিমার চাঁদের মতো প্রায়-দৈবিক, প্রায়-অলৌকিক, স্নিগ্ধতার এই চিরন্তন প্রতীককে তুলনা করা হয়েছে রুটির মতো সাধারণ, দৈনন্দিন, ক্ষুধা মেটানোর সরঞ্জামের সাথে।
হয়তো কবিতা আর গদ্যের এই তুলনার মধ্যে দিয়ে ‘হে মহাজীবন’ মনে করিয়ে দিতে চায় আমাদের জগতে সৌন্দর্য আর কাঠিন্য দুই-ই আছে। হয়তো যারা সত্য বলতে প্র্যাক্টিক্যালিটি বোঝেন, তাদের জন্য গদ্যের কড়া হাতুড়ি ঠিক আছে, সরাসরি বর্ণনা ঠিক আছে। কিন্তু যারা এর বাইরে সত্য খোঁজেন, প্রাত্যহিকের বাইরে বাস্তবতাকে বুঝতে চান, তাদের জন্য আছে কাব্যের রহস্য, পদ-লালিত্য-ঝঙ্কারের সুক্ষ্মতা।
আট লাইনের মাস্টারপিস।