জাহান্নম হইতে বিদায় বইটি শওকত ওসমানের একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। কিন্তু অনন্যতার দাবী রাখে এই উপন্যাস। কারণ মুক্তিযুদ্ধের অন্যসব উপন্যাসের মতো করে রচিত হয় নাই। এই উপন্যাসে যুদ্ধের প্রারম্ভ, যুদ্ধের নৈতিক দিক, যুদ্ধের প্রস্তুতি ইত্যাদি বিষয়ের দিকে অধিক আলোকপাত করেছেন। এই উপন্যাসের চরিত্রগুলোও হাতে গোনা! তাও সকলকে ঠিক পাওয়া যায় না। তাছাড়া এই বইয়ের ভেতর দিয়ে শওকত ওসমান যুদ্ধের সময় চীনের অবস্থানের কারণে চীনকে কটাক্ষ করেছেন।
Shawkat Osman (Bengali: শওকত ওসমান; Sheikh Azizur Rahman; 1917 – 1998) was a Bangladeshi novelist and short story writer.Osman's first prominent novel was Janani. Janani (Mother)is a portrait of the disintegration of a family because of the rural and urban divide. In Kritadaser Hasi (Laugh of a Slave), Osman explores the darkness of contemporary politics and reality of dictatorship.
Awards Bangla Academy Award (1962) Adamjee Literary Award (1966) President Award (1967) Ekushey Padak (1983) Mahbubullah Foundation Prize (1983) Muktadhara Literary Award (1991) Independence Day Award (1997)
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে ভিন্নতার দাবিদার কেননা স্বাধীনতা যুদ্ধের রোমহর্ষক বর্ণনা বা যুদ্ধকালীন রাজনৈতিক সংঘাত এই বইয়ের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে নি ।অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এই উপন্যাসের চরিত্র হাতে গণা তাও সবাইকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় পাওয়া যায় না । মূল চরিত্র অনেকটা মনলগের মত করে তার দেখা দৃশ্যাবলী তুলে ধরেন আর নিজের মনের সাথে সেই দৃশ্যের অবতারণা বিষয়ে একটা সিদ্ধান্তে পৌছাতে চান । যুদ্ধের প্রস্তুতি, প্রারম্ভ ও যুদ্ধের নৈতিক দাবি এই উপন্যাসিকার বিষয়বস্তু । উপন্যাসটিকে জহির রায়হানের “সময়ের প্রয়োজনে” ছোট গল্পের বিস্তৃত রূপ মনে হয়েছে ।
মূল চরিত্র গাজী রহমান; একজন ছা-পোষা মধ্যবিত্ত প্রবীণ শিক্ষক । না, গাজী রহমানের পরিচয় এত ছোট নয় । উপন্যাসের পৃষ্ঠা থেকে তার চেহারা কল্পনা করলে ভেসে ওঠে ভাবালুতা জড়ানো সুদূরে দৃষ্টি নিবদ্ধ এক জোড়া চোখ, সফেদ দাড়ির এক বৃদ্ধ দার্শনিক । পরিচয় অল্প কিন্তু গভীরতা ব্যাপক । একাত্তরের মার্চে হানাদারদের প্রথম টার্গেটে পরিণত হয় অগণিত ছাত্র,শিক্ষক,বুদ্ধিজীবী, প্রগতিশীল মানুষ , কেননা তারাই ত শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছিল, দেশের মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিল শাসকদের বিরুদ্ধে । রাজনৈতিক পরিচয় না থাকার পরও শুধু স্বাধীনতাকামী হওয়ার অপরাধে অস্তিত্ব রক্ষায় গাজী রহমানকে পালাতে হয় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে । “মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ”; তবু মানুষের চেহারা নিয়ে যারা নেকড়ের মত জনপদে ধেয়ে এসেছে, দাঁত আর নখে দেশকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলছে, চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে মৃতদেহের স্তূপ, লোকালয় জিহবা আর চোখের আগুনে পুড়িয়ে শ্মশানে পরিণত করছে তাদের সামনে তিনি কি করতে পারেন ? তার অস্ত্র মানবতাবোধ আর বহুদিনের সঞ্চিত জ্ঞান এই পশুদের কাছে কাগজের তীর মাত্র !! নিজের নীরবতা আর অক্ষমতার অপরাধে তিনি জর্জরিত, বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ । প্রবীণ দার্শনিক যুদ্ধের নৃশংসতায় হতবিহবল হয়ে পড়েন । এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের মধ্যেই তিনি উত্তর খুঁজে পান এক অগ্রজ বন্ধুর কাছে, “যুদ্ধ তো শুধু অস্ত্রের কাজ নয় । কেন লড়ছি কিসের জন্য লড়ছি, তার সঠিক হদিস যদি জানা থাকে তাগদ অনেক বেড়ে যায় ।” পরাধীন দেশের নাগরিকের যে কোন পরিচয় থাকে না, সে শুধুই গোলাম – এই বোধ তাকে নিয়ে যায় মুক্তিশিবিরে । এভাবেই কাহিনীর পরিসমাপ্তি ঘটে ।
উপন্যাসের রাজনৈতিক দিক হিসেবে একটা ব্যাপার উল্লেখ করা যায় । শওকত ওসমান প্রায় কটাক্ষ করেছেন যুদ্ধকালীন চীনের ভূমিকাকে । “সর্বহারা”দের অস্ত্রেই যে পাকিস্তান সুজলা সুফলা বাংলা ছারখার করে দিয়েছে একথা তিনি বারবারই বলেছেন ।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শওকত ওসমান চারটি উপন্যাস রচনা করেন। উপন্যাসগুলো হচ্ছে ’জাহান্নাম হইতে বিদায়’ (১৯৭১), ’দুই সৈনিক’ (১৯৭২), ’জলাঙ্গী’ (১৯৭৩) এবং ’নেকড়ে অরণ্য’ (১৯৭৪)।
’জাহান্নাম হইতে বিদায়’ (১৯৭১) শওকত ওসমানের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিক্তিক উপন্যাস। দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক শ্রী সাগরময় ঘোষের অনুরোধে তিনি এই উপন্যাস রচনা করেন এবং ঐ পত্রিকায় এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি সাতটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত।এই উপন্যাস সম্পর্কে লেখক তাঁর নান্দীপাঠে লিখেছেন - ’ বাংলাদেশের ট্র্যাজেডির প্রকৃত কাহিনীকারের অপেক্ষায় আছি। অল্প পরিসরে ওই সামাজিক ঘূর্ণিঝড়ের সম্যক পরিচয়দান কঠিন। বক্ষ্যমাণ উপন্যাস একটিমাত্র মানসলোকের বিবরণ। সেখানে পরিবেশ মতো যেটুকু ছায়া পড়েছে, তার কোন পটভূমির হদিস হয়নি।’
’ জাহান্নাম হইতে বিদায়’ উপন্যাসের পটভূমি ১৯৭১ সাল। এই উপন্যাসে শিক্ষক গাজী রহমানের মানসলোকই পুরো উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে। গাজী রহমানের মাধ্যমেই আমরা এ উপন্যাসে বিধৃত অন্য চরিত্রগুলোর সন্ধান লাভ করি। বাংলাদেশ পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হলে মাসদেড়েক পর একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক গাজী রহমান জীবন রক্ষার আদিম তাগিদে শহর ছেড়ে অনিশ্চিত গন্তব্যে রওনা হন। প্রথমে তিনি আশ্্রয় নেন এক প্রত্যন্ত গ্রামে তাঁর এক পুরনো ছাত্রের বাড়িতে। ছাত্রটির নাম ইউসুফ। ইউসুফ সওদাগরী অফিসের কেরানী। ইউসুফের স্ত্রী সখিনা গাজী রহমানকে সেবা যতœ করে। গাজী রহমান হানাদার বাহিনীর কিছু কিছু অত্যাচার দূর থেকে প্রত্যক্ষ করেছে। সে দেখেছে গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কখনও প্রতিবাদ করতে পারেনি। তাদের প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বলেন ” তাদের কী আখ্যা দেবে, জন্তু দানব বা আর কিছু,তাও বাঙালী কোনদিন স্থির করতে পারবে না। তেমন ঘৃণা প্রকাশের ভাষা বাঙালীর কাছে এখনও অজ্ঞাত।”
এক সময় গাজী রহমান জানতে পারেন ইউসুফের গ্রামও দখলদার মিলিটারি বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হবে। তাই তিনি সেখান থেকে অন্যত্র পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ইউসুফের বাসস্থান ছেড়ে তিনি তাঁর পুরনো বন্ধু রেজা আলীর বাড়িতে ওঠেন। সেখানে তিনি এককালের সন্ত্রাসবাদী ও পরবর্তীকালে প্রগতিশীল বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠক কিরণ রায়ের সঙ্গে পরিচিত হলেন। সবাই পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেয় যে, এখানে থাকা নিরাপদ নয়। সীমান্তের ওপারে যেতে পারলে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রে এক আধটু ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। রেজা আলীর ব্যবস্থাপনায় সৈয়দ আলী নামের এক তরুণের সহায়তায় গাজী রহমানকে সীমান্তে অতিক্রমের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। সীমান্তে অতিক্রমের পূর্বে আমরা একটি ঘটনার সঙ্গে পরিচিত হই। গ্রামবাসী কিছু দলছুট পাকিস্তনী সৈন্য দেখতে পায়। তারপর কিভাবে তারা সৈন্যদের মসজিদের ভেতর ঢুকিয়ে মরিচগুঁড়ো দিয়ে অজ্ঞান করে এবং পরে মেরে ফেলে তার কাহিনী শুনতে পাই আমরা আলমের জবানীতে। আলম একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। সব শেষে গাজী রহমানের সীমান্ত অতিক্রমের মধ্য দিযে কাহিনীর পরিসমাপ্তি ঘটে। এই হচ্ছে এই উপন্যাসের মোটামুটি কাহিনী।
’ জাহান্নাম হইতে বিদায়’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র প্রবীণ শিক্ষক গাজী রহমান। অন্য চরিত্রগুলোন মধ্যে রেজা আলী, কিরণ রায়, সৈয়দ আলী, মাঝি, আলম, ইউসুফ, বৃদ্ধা, ফালু ইত্যাদি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের আকাশে-বাতাসে যেভাবে নিনাদিত হয়েছে তা গাজী রহমানের মনোজগতে দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাঁর স্কুল বিভিন্ন কাজে ভূমিকা রেখেছে। তাই হানাদার বাহিনীর কালো তালিকায় তাঁর নাম ওঠে। তাঁর জীবন হয়ে ওঠে বিপর্যয়ের সম্মুখীন। ফলে ফাঁকা শহর ছেড়ে তাকে গোপনে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বের হতে হয়। গাজী রহমান পাকিস্তানী বাহিনীর অত্যাচারের ভয়ে প্রথম তাঁর ছাত্রের বাড়িতে আশ্রয় নেন। তিনি জানেন, তাঁর পক্ষে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। আবার এ অত্যাচার তিনি নির্বিচারে মেনেও নিতে পারেন না। তাই তাঁর মধ্যে দোলাচল মানসিকতার জন্ম নেয়। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারার জন্য তাঁর মধ্যে অপরাধবোধ দেখা দেয়। কিরণ রায় গাজী রহমানকে বললেন যে, প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধে��� পক্ষে কাজ করতে পারে। আর তখনই গাজী রহমান উপলব্ধি করলেন যে, তিনিও যুদ্ধের সপক্ষে কাজ করতে পারেন। তারপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন ওপারে চলে যাবেন। সীমান্ত অতিক্রম করার সময় গাজী রহমান পাকিস্তানী বাহিনীর সৈনিকের মুখোমুখি হন। তারা বাসের যাত্রীদের তল্লাশি করেন এবং দুযুবককে ধরে নিয়ে যান। গাজী রহমানসহ বাসের অন্য যাত্রীরা প্রতিবাদমূলক কোন কখা বলতে সাহস পায়নি। তাঁর মধ্যে বিবেকের দংশন শুরু হয়। ”তোমরা কথা বলতে ভয় পাও? তোমরা অশিক্ষিত দরিদ্র আর আমিও বহু ডিগ্রী অর্জনের পর তোমাদের খুঁটিতেই বাঁধা রয়েছি। আমাকে খুন কর গলা টিপে আমাকে খুন কর। মূর্খ আর প-িত সমান ওজন।”
এই অনুভূতি প্রকাশের পর গাজী রহমান তাঁর পথের সন্ধান পান। পরিবারের কথা তাঁর মনে থাকে না। সীমান্ত অতিক্রম করার সময় সৈয়দ আলীর সাথে বিদায়ের পালা শেষ করার আগে তিনি ইউসুফের স্ত্রী সখিনার কাছে একটি চিঠি পৌঁছিয়ে দিতে বলেন। এই চিঠি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর অন্তরে গ্রথিত ধারণার প্রকাশ পেয়েছে। ”অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে পারে শুধু বীর পুরুষরা। মুক্তিফৌজের ব্রত তাই কঠিন। এমন কঠিনের সাধনা গ্রহণ করিয়াছে আমাদের মুক্তিফৌজবৃন্দ।”
এই উপন্যাসে আমরা গাজী রহমানের খাঁটি দেশপ্রেম লক্ষ্য করি। গাজী রহমান যেন শওকত ওসমানের প্রতিমূর্তি। লেখক নিজের জীবনের খ-িত একটি অধ্যায়ের রূপায়ণ করেছেন আলোচ্য উপন্যাসে সুুচারুভাবে।
এই উপন্যাসের আরেকটি চরিত্র সৈয়দ আলী। লেখক এই চরিত্রটিকে পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেননি। সে নিঃস্বার্থ ও পরোপকারী। সৈয়দ আলী গাজী রহমানকে সীমান্ত অতিক্রমের সময় সহযোগিতা করে। গাজী রহমান তার পরিচয় জানতে চাইলে সে বলে, ”গোলামের কোনো পরিচয় থাকে না। গোলাম গোলামই। স্বাধীন বাংলাদেশই হবে আমার পরিচয়।”
ফার্মের কেরানী ইউসুফ গাজী রহমানের একজন প্রাক্তন ছাত্র। তাঁর শিক্ষক গাজী রহমানকে বিপদের সময় তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিল। গ্রামে হানাদার দ্বারা আক্রমণের সম্ভাবনা দেখা দিলে সে শিক্ষকের নিরাপত্তার কথা ভেবে আকুল হয়। শিক্ষককে নিশ্চিন্তে কোথাও যেতে দিতেও সে ভরসা পায় না, যদি পাছে শিক্ষকের কোন বিপদ ঘটে। স্বল্প পরিসরে লেখক এই চরিত্রকে দরদের সঙ্গে অঙ্কন করেছেন। ইউসুফের স্ত্রী সখিনা স্বল্প পরিসরে উদ্ভাসিত এই উপন্যাসের একটি নারী চরিত্র। সখিনা গ্রাম্য জীবনে অভ্যস্থ সাধারণ বধূ মাতারই প্রতিচ্ছবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সখিনার ভাই। পঁচিশে মার্চের পর থেকে তাঁর কোন খোঁজ-খবর নেই। ভাইয়ের শোকে সখিনা মুহ্যমান হয়ে উঠলে প্রবীণ শিক্ষক গাজী রহমান ছলনার আশ্রয় নিয়ে বলেন, খালেদ মুক্তিফৌজে গিয়েছে। আর সে থেকেই মুক্তিফৌজের প্রতি সখিনার মনে এক ধরনের আগ্রহ জন্মে। এ চরিত্রটি আর বিকাশের সুযোগ দেননি লেখক। লেখক ইচ্ছা করলে এই চরিত্রটিকে আরও সম্প্রসারিত করে একটি আদর্শ চরিত্রের রূপ দিতে পারতেন।
’জাহান্নাম হইতে বিদায়’ উপন্যাসে রূপায়িত উল্লেখিত চরিত্রগুলো তেমন একটা ঘটনাবহুল নয়। তবে গ্রামের বৃদ্ধা মহিলা ও তার ছেলে ফালু চরিত্রের উপস্থাপনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে লেখক উপন্যাসটিকে অত্যন্ত বাস্তবমুখী করে তুলেছেন। সমাজ সচেতন লেখক শওকত ওসমান এই দুটি চরিত্রের মাধ্যমে একদিকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বরতা নিষ্ঠুরতা, অন্যদিকে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে পরস্পরের বিপরীতে স্থান দিয়ে প্রখর দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। বৃদ্ধা মহিলা শহুরে রাঁধুনীর কাজ করত। স্বামী করত দিন মজুরের কাজ। পাক সৈন্য বাহিনীরা বস্তিতে আগুন ধরিয়ে দিলে সব পুড়ে যায় এবং তারা যাকে যেখানে পেয়েছে গুলি করে হত্যা করেছে। কোন রকমে প্রাণে রক্ষা পায় বৃদ্ধা ও তার ছেলে ফালু। লেখকের শিশু মনস্তত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায় ফালুর উক্তিতে-
” তুমি কইলে না ক্যান মা, বাজান আমাগো ধাক্কা দিয়া পাশে ঠেইলা দিছিল হেয়ালা খানকীর পুতেরা যখন গুলি ছোড়ে তাই বাজান মইরা গেলেন-আরা বাঁচলাম। আমিও হালাদের গুলি করমো।”
শহর থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে ক্লান্ত বৃদ্ধা ও তার ছেলে ফালু যখন গাজী রহমানের নৌকায় করে কিছুটা পথ যাওয়ার সুযোগ পায় তখন বৃদ্ধার হাতে অন্য জিনিসপত্রের সঙ্গে একটি তারের খাঁচায় ছিল এক হালি বিলেতি ইঁদুর। শহরের বাসা ছেড়ে আসার সময় এই ইঁদুরগুলোকে ফেলে আসতে তাদের মায়া লেগেছে। বৃদ্ধা গাজী রহমানকে একথাটি বর্ণনা করেন এভাবে-
” ভাইজান, অবলা প্রাণী, ভাবলাম থুইয়া আসি। কিন্তু ভাবলাম, এগুলোর কেউ যতœ নিব না। খাওয়া বেগর মইরা যাইব। জান হ¹লের সমান।”
ইঁদুরগুলোকে বয়ে আনা খুব কষ্টকর। তবু বৃদ্ধার ছেলে ফালু বলে, ’ মা খাঁচা বইতে আমার জান যায় গা। তবু ইঁদুর রাইখ্যা আসতাম না।’
ইতর প্রাণীর প্রতি ফালুর ও তার মা বৃদ্ধার ভালবাসা প্রমাণ করে হানাদার বাহিনীর বিভীষিকাময় অত্যাচারের মধ্যে কয়েকটি ইতর প্রাণীর প্রাণ বাঁচানোর যে দৃঢ় সঙ্কল্প তার সঙ্গে গণহত্যার মতো নিষ্ঠুরতার ব্যবধান কোথায় ?
ঔপন্যাসিক শওকত ওসমান এই উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণ ও ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। শব্দ চয়নের ক্ষেত্রেও লেখক মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। একটি বিষয় লক্ষ্য করলে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস হিসেবে একে বিচার করলে এতে মুক্তিযুদ্ধের তেমন স্মরণীয় প্রতিচিত্র পাওয়া যায় না। গাজী রহমানের দেশত্যাগের মাধ্যমেই উপন্যাসের কাহিনীর পরিসমাপ্তি ঘটে। এ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের সুনির্দিষ্ট কোন কাহিনীও নেই। এই উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীরা কেউ মহৎরূপে চিত্রায়িত হয়নি। তবুও বলা যায় উপন্যাসটিতে মুক্তিযুদ্ধের সমকালীন সাধারণ মানুষের একটি বিশেষ দিক, বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মানসিকতা, পাঞ্জাবি সৈনিকদের প্রতি বাঙালীর ঘৃণা এবং যুদ্ধ করে এদেশ এদের কবল থেকে স্বাধীন করার প্রবল ইচ্ছা ব্যক্ত হয়েছে।
বাঙালী শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কেউ কেউ প্রগতিপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী হলেও তবু কিসের একটা বন্ধন যেন তাদের আটকে রাখে। তারা পিছ ুটানে হঠাৎ থমকে দাঁড়ান। মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রেও তাঁদের ভূমিকা ছিল অনেকটা নিষ্ক্রিয় অথচ আপামর জনসাধারণের ভূমিকাই মুক্তিযুদ্ধকে পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। এ সবের বিম্বিত রূপ মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসগুলোতে উজ্জ্বলভাবে রূপায়িত হয়েছে। মধ্যবিত্তের মানসবৃত্তি দোলাচল থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাদের মাঝেও জাগরূক ছিল। কেউ সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে, কেউবা মুক্তিযোদ্ধাদের বিপদের সময় আশ্রয় দিয়ে আবার কেউবা লেখনি শক্তি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করে-স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। আনোয়ার পাশার ’ রাইফেল রোটি আওরাত’ (১৯৭৩) এর অধ্যাপক সুদীপ্ত শাহীন, শওকত আলীর ‘যাত্রা’র (১৯৭৬) অধ্যাপক রায়হান, রশীদ হায়দারের ’ খাঁচায়’ (১৯৭৫) এর অধ্যাপক তাহের এমনকি শওকত ওসমানের ’ জাহান্নাম হইতে বিদায়’-এর প্রৌঢ় শিক্ষক গাজী রহমান-এঁদের প্রত্যেকের শ্রেণী চরিত্র মধ্যবিত্ত। এঁদের চেতনায় কাজ করেছে মধ্যবিত্তের জীবন মানসিকতা, এঁদের কাছে স্ত্রী-পুত্র নিজের জীবনের জন্য মায়ার মতো মনে হয়েছে। এঁরা যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ক্রিয়াকর্মে লিপ্ত ছিলেন তা বলা যাবে না। ’ পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ এটাও তাঁরা কামনা করেননি। প্রত্যক্ষ না হলেও যুদ্ধের প্রতি তাঁদের পরোক্ষভাবে তাঁদের সমর্থন ছিল একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আসলে এঁদের চরিত্রটাই যে এরকম কাঠামোর, নিরাপত্তায় সীমায়িত, মূল্যবোধ সম্পর্কে সজাগ এই শ্রেণীটা পুরনো ধ্যান-ধারণাকে ভাঙতে পারে না। আর এই ভাঙতে না পারার কারণেই শিল্পসত্তাতে এর অতিরঞ্জন কোথাও নেই। কেননা আমরা জানি, যে কোন ধারণার ভিত্তি গড়ে উঠতে হলে সুনির্দিষ্ট বাস্তবতার প্রতিফলন দরকার।
শওকত ওসমান বাংলাদেশের একজন চিন্তক, লেখক ও কথাসাহিত্যিক। মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে তিনি ছিলেন এক উচ্চকিত কণ্ঠের অধিকারী। "জাহান্নম হইতে বিদায়" উপন্যাস হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত রচনা করা প্রথম উপন্যাস । মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় এদেশে যে একটা গুমোট পরিস্থিতি বিরাজ করছিল তা লেখক এই উপন্যাসে বর্ণনা করেছেন । এক প্রবীণ শিক্ষক মনে হাজার দুঃখ -বেদনা- অশ্রু নিয়ে ভেসে চলছে এখান থেকে সেখানে ; না সে পাকিস্তানীদের সামনে মাথা উচু করে দাড়াতে পারছে , না সে সব কিছু স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারছে কারণ বিবেক আর বয়স । কতো জনই তো চেয়েছিল এদেশ পাকিস্তানের হোক, পরে যখন নিজের চোখে দেখেছে পাকিস্তানী সৈন্যদের আসল রূপ তখন তারা নিজেরাই অনুশোচনায় আল্লাহ'র কাছে কতো হাজার বার চেয়েছে আর যারা নিজের ভুল বুঝেনি তারা তো রাজাকার - আলবদর হয়েছে । তাদের ছিল অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র আর জানোয়ারের মতো হিংস্র মন , অপরদিকে আমাদের ছিল মনোবল আর দেশ মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা তবুও আমরা স্বাধীন হয়েছি । "জাহান্নম হইতে বিদায়" উপন্যাসের নাম যা উপন্যাসটাও তা , বাকী সব কিছু তো বইটা পড়লে আপনারা বুঝতেই পারবেন । বই সংগ্রহ করে পড়ুন, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের অস্থিরতা অতি সামান্য অর্থাৎ চুল পরিমাণ হলেও অনুভব করতে পারবেন । শুভ হোক আপনার পাঠ্য কার্যক্রম।
একাত্তর সালেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বই খুব বেশি প্রকাশিত হয়নি। আমরা অবশ্য প্রায় সবাই আনোয়ার পাশার 'রাইফেল রোটি আওরাত' এর কথা জানি। শওকত ওসমানের এই ছোট উপন্যাসটিও তদগোত্রীয়।
গাজী রহমান নামে এক স্কুল শিক্ষক কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে বৃহত্তর স্বার্থে দেশত্যাগ করেন, এই উপন্যাসে আমরা সেই কথাই জানার সুযোগ পাই।
জাহান্নম হইতে বিদায় বলতে, লেখক মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে জাহান্নামের সাথে তুলনা করেছেন৷ উপন্যাসে গাজী রহমান বাংলাদেশ হতে বর্ডার ক্রস করে ইন্ডিয়া চলে যান৷ আর বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়াকেই তিনি উল্লেখ্য করেছেন ‘জাহান্নম হইতে বিদায়’ বলে।
উপন্যাসের মূল চরিত্র, স্কুলের এক প্রবীন প্রধান শিক্ষক গাজী রহমান৷ মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে আমরা দেখতে পায়, হানাদার বাহিনী শিক্ষক এবং ছাত্রদের নির্বিচারে হত্যা করছে৷ গাজী রহমানের প্রাণনাশের ভয় ছিল৷ শিক্ষক হওয়ার সুবাদে সারাদেশেই তার ছাত্ররা ছিল৷ তিনি প্রথমে আশ্রয় নেন, ইউসুফের বাড়িতে । ইউসুফের স্ত্রী সখিনা, তার একমাত্র ভাই খালেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র৷ গাজী রহমান খবর পেয়েছেন । খালেদ ২৫ শে মার্চের কালোরাতে শহীদ হয়েছেন৷ কিন্তু গাজী রহমান সখিনাকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে বলে, ‘খালেদ মুক্তিফৌজে যোগ দিয়েছে মন খারাপ করে থেকো না ও ফিরে আসবে ’। সখিনাকে মানসিকভাবে শক্ত রাখার জন্যই মিথ্যার আশ্রয় ।
তারপর গাজী রহমান ইউসুফের বাড়ি থেকে চলে যান তার উকিল বন্ধু রেজা আলির কাছে । সেখানে দেখা হয় রাজনৈতিক বন্ধু কিরণ রায়ের সাথে । দুই বন্ধু বলে ‘তোমাকে (গাজী) বর্ডার পাস করার ব্যবস্থা করা হয়েছে’। তুমি অখানে গিয়ে মুক্তিফৌজদের উৎসাহ উদ্দীপনা দিয়ে কাজে লেগে পড়ো৷ গাজী রহমানকে বর্ডার ক্রসে সহযোগিতা করতে দিয়ে দেয়া হয় সৈয়দ আলিকে । সাথে আরও দুইজন। সৈয়দ আলি তাদেরকে বর্ডার ক্রস করিয়ে দেয়৷
উপন্যাসে কথক গাজী রহমান পাক হানাদার বাহিনীর নৃশংস হত্যা কান্ড এবং তাদের অত্যাচারের দৃশ্য বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া গাজী রহমানের সাথে নৌকায় দেখা হয়, এক বয়োবৃদ্ধ লোকের যে অঝোরে কান্না করতে থাকে। কান্নার কারণ বিস্তারিত বলেন বৃদ্ধ। দেখা হয় মাতারি এবং নয় বছরের ছেলে ফালুর সাথে৷ আলম নামের পা হারানো এক যুবকের সাথেও।
লেখক উপন্যাসের বিচ্ছিন্ন কাহিনিগুলো তুলে ধরেছেন, বর্ণনাকৃত অঞ্চল নরসিংদী ব্রাহ্মণবাড়িয়া কুমিল্লা থেকে রাস্তায় এবং নৌকাপথে ইন্ডিয়ার দিকে যাওয়ার সময় যাদের সাথে দেখা হয়, তাদের থেকে শুনা ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন।
_ জাহান্নম হইতে বিদায় শওকত ওসমান প্রথম প্রকাশ : ১৯৭১ সময় প্রকাশ পৃষ্ঠা : ৮৯ মুদ্রিত মূল্য : ১২০ পার্সোনাল রেটিং : ৮/১০
'জীবনে গাজী রহমান প্রথম উপলব্ধি করেছে প্রবীণ অস্থিসহযোগে,মানুষের প্রয়োজনের সীমানা অনেক খাটো করা যায়।আর পার্থিব সম্পদের প্রতি মমতা–যখন অস্তিত্বের শিকড়ে টান পড়ে – মুহূর্তে উড়ে যায়।'