স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনী মূলক বই পড়তে আমার ভালোই লাগে। সত্য হোক বা মিথ্যা হোক লেখক সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের একটা কথা মনে পড়ছে। তিনি বলেছেন, “কোনো বাঙালি আজ পর্যন্ত আত্মজীবনী লেখে নি, কেননা আত্মজীবনী লেখার জন্য দরকার সততা। বাঙালির আত্মজীবনী হচ্ছে শয়তানের লেখা ফেরেশতার আত্মজীবনী।”
যেদিন থেকে হুমায়ুন আজাদের এই লেখা পড়েছি, সেদিন থেকে কারো আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা পড়তে গেলেই প্রশ্ন আসে, “এই লোক কী সৎ? তার জীবনীতে যা যা লিখেছেন সব কথা কী সত্যি?”
যাক, এতো কিছুর প্যাঁচালে না গিয়ে আমি তাই যখন যা মন চায়, যার আত্মজীবনী ই সামনে পাই , তাই পড়ি।
আত্মজীবনী পড়ে লেখককে না যতটা জানতে পারি, তার চাইতে বেশি জানি ঐ সময়-কালকে। কেমন ছিলো সেই সময়টা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি আমি।
‘বহে জলবতী ধারা’-তেমনই এক আত্মজীবনী। এটি লিখেছেন স্যার আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। আমি স্যারের পরিচয় বা পরিচয়ের আগে কোনো বিশেষণ যোগ করতে চাচ্ছি না। উনি এমন একজন মানুষ যার লেখাই তার পরিচয়, যার কথায় তার পরিচয়।
একটা আত্মজীবনী ঠিক যেমন হওয়া উচিত, বহে জলবতী ধারাও ঠিক তেমনই। এই বইতে লেখক তার ছেলেবেলাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। ছেলেবেলার বেড়ে ওঠা, শৈশব ও কৈশোরের সময়টাকে পাঠিকের সামনে কলমের খোঁচায় তুলে ধরেছেন।
আমরাও এক নজরে দেখে আসি কেমন ছিলো স্যারের ছোটবেলা?
তিনি জন্মেছিলেন কলকাতায়, ১৯৩৯ সালের ২৫ শে জুলাই। তবে ঘটনাক্রমে তার জন্মস্থান ও জন্মতারিখ দুটোই বদলে যায়। জন্মসাল হয়ে যায় ১৯৪০ আর জন্মস্থান হয় ঢাকা।
টাঙ্গাইল জেলার করটিয়ার প্রকৃতি ছাওয়া গ্রামে লেখকের সেই ছোটবেলা কাটে। লেখকের বাবা চাকুরিজীবি হওয়ায় একেকবার একেক জায়গায় তাকে যেতে হয়েছে। লেখকের শৈশবের বেশিরভাগ সময় করটিয়া, জামালপুর, পাবনা, বাগেরহাট বিভিন্ন জায়গায় কাটিয়েছেন।
তার শৈশবে তার বেড়ে উঠায় তিনি তার মামা ও তার বাবাকেই আদর্শ হিসেবে নিয়েছেন। আমার সবচে ভালো লেগেছে বাবাকে নিয়ে তার এই অভিব্যক্তি। নিজের বাবা সম্পর্কে তিনি লিখেন, “ছেলেমেয়েদেরও তো স্বপ্নের বাবা-মা আছে, যে বাবা-মাকে পেলে সন্তানের ভেতরকার কনকপ্রদীপের সলতে অলীক প্রভায় জ্বলে ওঠে। আমি সেই বাবাকে পেয়েছিলাম। সেই শিল্পী, শিক্ষক, আদর্শবান, প্রজ্জ্বলিত পিতাকে। আমার প্রথম জীবনের স্বপ্নকে তিনি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন।”
বাবার প্রতি যেমন ছিলেন দিলখোলা তেমনি মায়ের প্রতিও। মাকে নিয়ে অনেক লেখায় লেখেছেন। মাকে কখনো পেয়েছেন অতি কোমল, স্নেহপ্রবণ আবার কখনো পেয়েছেন কঠোরতায় ঘেরা।
লেখকের মায়ের নাম করিমউন্নিসা। মা সম্পর্কে স্যার লিখেছেন,-
“মা ছিলেন অসম্ভব জেদি ও প্রচণ্ড স্বভাবের। অল্প বয়সে তার দুরন্তপ্না আমাদের চেয়ে কম ছিলো না। তার রাগও ছিলো সৃষ্টিছাড়া। রেগে গেলে তিনি দাঁত কড়মড় করতে থাকতেন। আমরা পাশের ঘর থেকেও তার সেই কড়মড়ানির শব্দ শুনতে পেতাম। তারও ছেলেবেলার দস্যিপনা, আমাদের মতোই, ছিল সমবয়সী সবাইকে ছাড়ানো। গেছো-মেয়ে বলতে যা বোঝায় তিনি ছিলেন তাই।”
সংসার ঠিকমতো গুছিয়ে না নিতেই মধ্যবয়সের আগেই লেখকের মা এক কঠিন অসুখে পড়লেন। মাত্র ৩২-৩৩ বছর বয়স হবে। তার স্বাস্থ্য একেবারেই ভেঙে পড়ে। সসেই সাথে মানসিক ভাবেও অস্থির হয়ে পড়েন তিনি। তার এই মানসিক অস্থিরতা তার সন্তানদের কাছে আতংকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতেন। নিজেকে তার ব্যর্থ ও অসহায় মনে হতো। মনে হতো তিনি হেরে গেছেন। নিজের ব্যর্থতার জন্য নিজের ওপর নিজের অসহায় প্রতিশোধ নিতেন। রাগ উঠলেই তিনি হিংস্র হয়ে উঠতেন। ইচ্ছেমতো মারতেন ছেলেমেয়েদের।
লেখকের মায়ের মৃত্যুর পর তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। বাবার দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে লেখক খুব সুন্দর কয়েকটা কথা বলেছেন। তিনি বলেন, -
“যেসব স্বামী বিবাহিত জীবনে সুখ পায় না, বিবাহিত জীবনের ব্যাপারে তাদের ভেতর একটা বিতৃষ্ণার ভাব কাজ করে। বিবাহিত জীবনে অসুখী মানুষেরা নিজেদের নিঃসঙ্গতার কারণে একা একা বাঁচতে শিখে ফেলে। দাম্পত্য জীবনে সুখী স্বামীদের কোনো কারণে স্ত্রী বিয়োগ হলে তারা একেবেরেই অসহায় হয়ে পড়ে। স্ত্রীর ওপর তারা এতোটাই নির্ভরশীল থাকে যে সেই বিশাল শূন্যতা তারা সহ্য করতে পারে না।” নিজের বাবার দ্বিতীয় বিয়েটাকে লেখক এভাবেই পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন, যা আমার খুব ভালো লেগেছে।
ভাইবোনদের সাথে লেখক স্যার আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের সম্পর্ক ভালো ছিলো। মায়ের মৃত্যুর পর নিজেরা নিজের মতো করে মায়ের শোককে শক্তিতে পরিণত করেছেন। বাঙালি পরিবারে মায়ের পর বড় বোনই মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। লেখকের বড় বোন গুলনার আহমেদ স্বাভাবিকভাবেই মায়ের জায়গা নিলেন। ছোটো ভাইবোনদের দেখাশোনা করতে লাগলেন। ছোটবোন নীলুফার আফতাভী ডাক্তারি পড়তেন। ছিলেন অন্তর্মুখী। তারপরে মেহের নিগার। উনি ছিলেন মায়ের মতোই। ছোটভাই আব্দুল্লাহ আল মামুন। কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক। লেখকের ভাষায়, “সব জায়গা থেকে সব খাবে কিন্তু কাউকে কিছু দেবে না”
এবার লেখকের নিজের সম্পর্কে নিজের কিছু লেখা শেয়ার করি। আমার একটা ব্যাপার খুব অদ্ভুত লাগে। বেশিরভাগ লেখকের আত্মজীবনীর সাথে আমাদের পাঠকদের কিছু না কিছু কথা, অনুভূতি বা ঘটনা মিলে যায়, মিলে যায় লেখকের মনের ভাবনা সমূহ।
লেখক প্রথমেই লিখেছেন, “আমার জীবনে যে- যৌবনের আসার কথা ছিল বিশ-পঁচিশ বছর বয়সে তা এসেছে চল্লিশে, প্রৌঢ়ত্ব এসেছে ষাটে, শৈশব-কৈশোর হয়েছে দীর্ঘসস্থায়ী, এবং এ কারণেই আশা করছি বার্ধ্যকে আসলে হলে তাকে আমার মৃত্যুর পরেই আসতে হবে।”
এ কথা থেকে বুঝা যায়, সাধারণত একজন মানুষের শৈশব- কৈশোরের সময়গুলো যেভাবে কাটার কথা, লেখকের হয়তো সেভাবে কাটে নি।
কেমন ছিলো লেখকের সেই হারানো দিনগুলো ?
লেখক বড় হতে হতে বুঝতে পারেন যে, তার নিজের মধ্যে একধরণের হীনমন্যতা কাজ করতো। কেন, কীভাবে, কখন থেকে এই নিজেকে নিয়ে এই হীনমন্যতা তা তিনি নিজেও বুঝতে পারেন নি। ছোটোবেলায় তিনি ছিলেন কিছুটা দুরন্ত, কৌতুহলী এবং সরল। তার দুরন্ত কোনো মানুষের ক্ষতি হতো না। তার মধ্যে অমঙ্গল বা অশুভর শক্তি খুবই কম। তিনি বলেন, “সবার কাছে আমি ভালো, এটা আমার চরিত্রের প্রধান দুর্বলতা”
তিনি নিজেকে নিয়ে এতো বেশি হীনমন্যতায় ভুগতেন যে, তার বয়সি ছেলে বা মেয়েদের সামনেও নিজেকে ঠিক মতো প্রকাশ করতে পারতেন না। তার বয়সী ছেলেরা তখন যা বুঝতেন, তিনি সেই বয়সে তা বুঝতে পারেন নি। লেখকের কাছে মনে হতো তার সমবয়সীরা যেন তার চাইতেও অনেক বড়। তিনি বলেন, “কেন ছোট ছোট ঐ ছেলেদের অত বিরাট মনে হত ব্যাপারটা নিয়ে আমি বড় হয়ে অনেক ভেবেছি। ভেবে মনে হয়েছে ওরা বড় ছিল বলে যে ওদের অতবড় মনে হত তা নয়, আসলে নিজেকে আমি মানুষ হিসাবে এত বেশিরকম তুচ্ছ আর নগন্য মনে করতাম যে সেই হীনমন্যতার জন্যই ওদের সবাইকে অতবড় মনে হত। ”
এই লেখাগুলো আমাকে ভাবায়। আমি নিজেও এমন ছিলাম। আমার সহপাঠীদের সাথে আমার তেমন মিলমিশ ছিলো না।
নিজের সম্পর্কে লেখকের এই হীনমন্যতার অনুভূতি তাকে প্রতি পদে পদে তাড়া করেছে। তবুও ভাবতে অবাক লাগে, “তিনি তার স্বপ্নকেও ছাড়িয়ে গেছেন। তার কথাই এখন আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনি। তার নাম আমরা সার্চ করি।”
নিজের জীবনে প্রেম নিয়ে লেখকের মন্তব্য বড়ই মজাদার। লেখকের মতে,”যদি ও পক্ষ নিজ থেকে এগিয়ে না আসতো তবে তার জীবনে প্রেমের যা ঘটনা ঘটেছে তাও ঘটতো না। ”
শিক্ষা জীবনে তিনি পাবনা জেলা স্কুলে ১৯৫৫ সালে মাধ্যমিক ও ১৯৫৭ সালে প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
মানুষের জীবন আসলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্তের সমষ্টি। নদীর বয়ে চলার মতোই আমাদের জীবন বয়ে চলে নিরবধি। হঠাৎ করে একদিন এই নদী থেমে যায়। আমরাও আমাদের জীবনের সমাপ্তিতে পৌঁছে যাই। স্যার বলেছিলেন,”মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়”- স্যার নিশ্চয় তার স্বপ্নকে ছুঁতে পেরেছেন? তা না হলে গ্রাম থেকে উঠে আসা এক যুবক পুরো জাতিকে কিভাবে স্বপ্নে উজ্জীবিত করে? আলোকিত বাংলাদেশ গড়তে হলে বই পড়ার বিকল্প নেই। তাই তিনি গড়ে তোলেন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র।
“অনেক অবোধ স্বপ্ন শৈশব জুড়ে আমার মনকে উথাল-পাতাল করেছে। কিন্তু জীবন কী সে ই পথ ধরেই এগিয়েছে? নাকি এদের কিছু নিয়েছে, কিছু ফেলে দিয়েছে? নাকি এসে গেছে নতুন কোনো আকুতি, নতুন স্বপ্ন- যা ছেলেবেলায় ছিল একেবারেই অপরিচিত, অচেনা? আগামীতে তা বলার ইচ্ছা রইলো।”