জীবন বহমান, জলবতী ধারার মতোই; কিন্তু মানুষের জীবনের একটা আশ্চর্য ব্যাপার হলো, সে শুধু বয়েই চলে না, নিজের গতিপথের দিকে তাকাতেও পারে। একই সঙ্গে একটা জীবন যাপন করা আর সেই যাপিত জীবনের স্মৃতিরচনা করা সম্ভব হয় মানুষের পক্ষে। জীবনানন্দ লিখেছিলেন:'পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন।'
বহে জলবতী ধারা আমার নিজের জীবনের গল্প। জীবনের পথে আমি কীভাবে একটু একটু করে বেড়ে উঠেছি, এগিয়ে গেছি তার কাহিনী। ...বিশাল এই জীবনকে ছোট মনে হয় আমাদের স্মৃতিহীনতার কারণে। কাজেই জীবনের গল্প সংক্ষিপ্ত হওয়ার উপায় নেই। তবু ছোট করেই একেই বলতে হয়। কারণ, সাহিত্য-শিল্প জীবনের বিবরণ নয়, ইশারা।
Abdullah Abu Sayeed (Bengali: আবদুল্লাহ আবু সাইয়ীদ; born 25 July 1939) is a Bangladeshi writer, television presenter, organizer and activist. He is currently the Chairman of Bishwa Sahitya Kendra, a non-profit organization that promotes the study of literature, reading habits and progressive ideas.
Early life:
Sayeed was born in 1939 in Calcutta. His father was Azimuddin Ahmed, a teacher of both English and Bengali literature.He was also a playwright. Sayeed passed SSC exam from Pabna Zilla School in 1955 and HSC exam from Profollo Chandra College in 1957. He later earned the degree of BA and MA in Bengali from the University of Dhaka in 1960 and 1961 respectively.
Career:
Sayeed was a professor of Bengali language in Dhaka College.In mid-1970s he started presenting Shaptabarna (Seven Colors), a multidimensional TV show in Bangladesh Television. In 1978, he founded the Bishwa Sahitya Kendra.
AWARDS:
Sayeed was given the 97th Ramon Magsaysay Award in Journalism, Literature, and Creative Communication Arts for "cultivating in the youth of Bangladesh a love for literature and its humanizing values through exposure to the great books of Bengal and the world".
Bangla Academy Award (2011) for his essays. Ekushey Padak (2005) Mahbub Ullah Trust Award (1998) National TV award (1977)
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের আত্মজীবনীর পহেলা খণ্ড 'বহে জলবতী ধারা'। এখানে জন্ম থেকে নিজের স্কুল জীবনের কথা লিখেছেন তিনি। ২শ ২৩ পাতার এই বইটির প্রকাশক 'সময় প্রকাশন'।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের পিতা তার জন্মের সময় করটিয়া সাদাত কলেজে অধ্যাপনা করতেন। তিনি জন্মেছেন নানাবাড়ি কলকাতায়। সেখান থেকে চলে আসেন পিতার কর্মস্থলে। তাই তার লেখায় টাঙ্গাইলের সাদাত কলেজ ও এই এলাকার অনেক বর্ণনায় উঠে এসেছে।
তার পিতা টাঙ্গাইল থেকে বদলি হন মাদারীপুরের আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে। তাই সেখানকার অল্প-বিস্তর স্মৃতিচারণ রয়েছে। তবে, সবচেয়ে বেশি লিখেছেন পাবনার কথা। সেখানে এডওয়ার্ড কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন তার বাবা। লেখকের বর্ণনা পড়লে মনে হয় সপরিবারে একটি দীর্ঘ সময় সেখানে তারা ছিলেন। পাবনায় লেখক থাকাকালে ভাষা আন্দোলনের পর একটি জনসভায় এসেছিলেন তৎকালীন মুসলিম লীগের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনসহ অনেকে। সেই জনসভার স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে,
'সভার জনসমাগম যখন জমজমাট তখন ঘটল এক হাস্যকর ব্যাপার৷ দেখা গেল গোটা দশ-পনের কুকুর সভার মানুষজনের ভেতর দিয়ে নির্বিকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের গলার বেল্টের সঙ্গে একটা করে শক্ত বোর্ডের গোল কাগজ ঝুলছে, তাতে বড় বড় লাল হরফে লেখা : ‘নূরুল আমীন’ সারা সভাজুড়ে এক মহা হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হল । নিরীহ কুকুরগুলো বুঝতে পারছে না তাদের অপরাধ কী, অথচ যেখান দিয়ে তারা হাঁটছে সেখানেই মানুষজন হৈ হৈ করে তাদের দিকে ধেয়ে আসছে আর সেই পলায়মান কুকরগুলোকে প্রাণভয়ে পালাতে দেখে সভার লোকেরা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে। সমবেত শ্রোতাদের হাসির শব্দে সভা প্রায় বিশৃঙ্খল হয়ে উঠল । এই যখন অবস্থা সেই সময় নূরুল আমীন তাঁর দলবল নিয়ে মঞ্চে উঠে আসন গ্রহণ করলেন । '
তুখোড় মেধাবী যাকে বলে তা কখনোই ছিলেন না আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি পড়াশোনা পারতেন না। তাই প্রায়শই শিক্ষকদের হাতে কঠোর শাস্তি পেতেন। আর, তখন তো বিশ্বাস করা হতো - শাসন না করলে ছাত্র বখে যায়।
বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা, রঙিন শৈশব ও কিশোরবেলার কাহিনির পাশাপাশি পারিবারিক নানা বিপর্যয়ের কথা অকপটে লিখেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনেকের চাইতে অনেকটাই খোলামেলাভাবে লেখার প্রবণতা এই বইতে দেখলাম। যা পড়তে মন্দ লাগে না।
নির্মোহ ও সত্যোচ্চারণ করার সাহস না থাকলে আত্মজীবনী লেখা উচিত নয় বলেই মনে করেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি শতভাগ সততা নিয়ে লিখতে পারেননি - সেই ব্যর্থতার দায়ভার নিয়েছেন। যা ভালো লেগেছে। লেখক সৎভাবে লিখতে চেয়েছেন - এটা নিয়ে যেন একপ্রকার অহংবোধে তিনি আক্রান্ত। যা নানাভাবে ও নানান তত্ত্বকথার মাধ্যমে জাহির করতে চেয়েছেন। এটি পছন্দ হয়নি। সায়ীদ সাহেবের গদ্য প্রথমশ্রেণির এমন তারিফ করা যাচ্ছে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে আত্মকথন বাদ দিয়ে লেখা অন্যদিকে মোড় নিচ্ছিল, যা আত্মকথার বৈশিষ্ট্যকে ক্ষুণ্ণ করে।
সবকিছু মিলে মোটামুটি মানের একটি আত্মজীবনী। দ্বিতীয় খণ্ড এখনই পড়তে হবে - এমন তৃষ্ণা লেখক তৈরি করতে পারেনি। তবুও আনন্দ নিয়েই পড়া যায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের 'বহে জলবতী ধারা'র কথা।
বইটা কেমন লাগলো সেটা বলার আগে আমার স্কুলজীবনের একটা ঘন্টার কথা বলি। ক্লাস টেনের হায়ার ম্যাথ ক্লাস চলছে। ক্লাস নিচ্ছেন লিজেন্ড দেলোয়ার স্যার। এই পিরিয়ডটাতে চাইলেও মনোযোগ সরিয়ে অন্যদিকে নেয়া সম্ভব না। তারপরেও আমার বন্ধু আবু জাফর এই অসম্ভব কাজটাই করে বসলো! স্যারের দিকে তাকিয়েই আমার দিকে হালকা ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে জানতে চাইলো, এই মূহুর্তে আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের সবচে' ভালো মানুষটি কে?
এতো সুশীল একটা প্রশ্ন এমন সিরিয়াস একটা ক্লাসের মাঝখানে কেউ কাউকে করে না। আমি একটু বিস্মিতই হলাম। ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলাম। তারপর বললাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের নাম। একটা নাতিদীর্ঘ 'হুম' বলে আবু জাফর আবার ক্লাস করায় মনোযোগ দিলো। স্যার তখন বলেই যাচ্ছেন, কিহে খোকা! এ যেমন তেমন চতুর্ভুজ না, বৃত্তস্থ চতুর্ভুজ! জনতার সাথে শামিল হওয়া দরকার মনে করে সবার সাথে আমরা দুইজনও কোরাসে যোগ দিলাম, জ্বি, স্যার। যেমন তেমন চতুর্ভুজ না, বৃত্তস্থ চতুর্ভুজ!!
goodreads এ বইয়ের রেটিং দেয়ার যে ব্যবস্থা, তাতে পাঁচে তিন দিলে বুঝায় পাঠক বইটিকে পছন্দ করেছে, কিন্তু সেটাকে খুব বেশি পছন্দ করেনি। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের কলেজের আঙিনা পেরোনোর আগ পর্যন্ত যে স্মৃতিচারণা তাতে তাঁর মনের ওই সময়কার সুগভীর সংবেদনশীলতার পরিচয় মেলে খুব কম জায়গাতেই। একটি কুকুরের নিরুদ্দেশে বার্ধক্যে এসেও তাঁর যে গ্লানিবোধ, সেটাই সবচে' বেশি ছুঁয়ে গেছে আমাকে। চাইলে আরো অকপট হতে পারতেন, তাতে বইটাও আরো ভালো হত হয়ত। কিন্তু, সর্বজনশ্রদ্ধেয় হওয়ার বিড়ম্বনা বোধহয় এইখানেই। চাইলেও নিজেকে পুরোপুরি সংবৃত করা যায় না। আর, মাত্র তো প্রথম খন্ড পড়লাম! দ্বিতীয় খন্ডে কী আছে দেখা যাক। তবে তার আগে একটু রুচিবদল। এইবার আত্মজীবনী বাদ দিয়ে অন্য কোন বই।