১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর শত্রমুক্ত ঢাকায় অন্য বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রবেশ করেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পরিস্থিতি কেমন ছিল প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ রয়েছে এই বইটিতে। দিনলিপির ধাঁচে লেখা বইটির প্রাঞ্জল বর্ণনায় চোখের সামনে উপস্থিত ঐতিহাসিক নানা ব্যক্তিত্ব: বেগম ফজিলুতেন্নেসা মুজিব, জগজিৎ সিং আরোরা, তাজউদ্দীন আহমদ, জহির রায়হান, মাওলানা ভাসানীসহ আরও অনেকে। ৭২ সালেই বইটির প্রিন্ট ফুরিয়ে যায়।
"আলবদরের সম্পর্কে আমাকে অনেক তথ্য দিয়েছিলেন জহির রায়হান আর হলিডে কাগজের সম্পাদক এনায়েতুল্লাহ। বুদ্ধিজীবীদের হত্যাযজ্ঞের পেছনে রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন জহির রায়হান ও এনায়েতুল্লাহ। কিন্তু এই রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়েই প্রাণ দিতে হয় জহিরকে। দুর্বৃত্তদের উদ্দেশ্য সিদ্ধি হয়। বুদ্ধিজীবী নিধন অনুসন্ধান কমিটি ভয় পেয়ে কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়। তারা কাগজপত্র যা পেয়েছিল তা পুলিশকে তুলে দেয়। কিন্তু পুলিশ যে খুব বেশি দূর এগিয়েছে তা শুনিনি।পূর্বদেশের সে সময় চিফ রিপোর্টার ছিলেন সিদ্দিকী, রাতের বেলা মাঝে মাঝে পূর্বদেশে যেতাম। সিদ্দিকী আমাকে বলেছিলেন, আপনি যে চেয়ারটায় বসেছেন, ওই চেয়ারটায় বসত আমাদের সহকর্মী চৌধুরী মঈনুদ্দীন। গোবেচারা ছেলে । সাত চড়ে রা কাড়ত না। আমরা ভাবতাম এমন নিরীহ ছেলে আর হয় না। কিন্তু পরে জানলাম, সে হচ্ছে আলবদরের পান্ডা। যখন জানলাম, তখন পাখি খাচা ছেড়ে পালিয়েছে। " - পার্থ চট্টোপাধ্যায়
আজ অবশ্য শুনতে পাই একাত্তরে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ছাত্রসংঘের নেতা চৌধুরী মঈনুদ্দীন পূতপবিত্র। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের 'ডেটলাইন ঢাকা' বইটা অত্যন্ত দরকারি একটা পুস্তক। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর খুলনা হয়ে বাংলাদেশে প্রথম করেন সাংবাদিক পার্থ চট্টোপাধ্যায়। সেই সময় থেকে বেশ কিছু সংবাদ সংগ্রহের কাজে ঢাকায় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ঢাকার এক প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। ১৯৭২ সালেই 'ডেটলাইন ঢাকা' বইটা বের হয়। ২ শ পাতার বইটি দীর্ঘদিন পর রিপ্রিন্ট করেছিল বিপিএল। যদিও এখন বইটা আবারও দুর্লভ হয়ে গিয়েছে।
১৬ ডিসেম্বরের পরপরই ভারতে আশ্রয়ে নেওয়া বাংলাদেশিরা ফিরতে শুরু করেন। পার্থ চট্টোপাধ্যায় লক্ষ করেছেন, দেশে থাকা বাংলাদেশিদের সঙ্গে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশিদের ইতোমধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেছে। নয় মাস দেশে থাকা বাংলাদেশিরা ভারতফেরত বাংলাদেশিদের 'হাজি' বলে সম্বোধন করতেন। অর্থাৎ, তারা মুজিবনগর থেকে হজ করে এসে পুণ্য কামাই করেছেন এমন। আর, নিজেদের বলতেন 'গাজি'। সবমিলিয়ে, মুজিবনগরী বনাম অমুজিবনগরী দ্বন্দ্ব বিজয়ের পরই শুরু হয়ে যায়। তা সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁক বদলে বড়ো অনুঘটক হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে এসে আজ বাংলাদেশে ভারতবিরোধিতা তুঙ্গে। দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় ভারতীয় সেনা ও জনগণের প্রতি বাংলার মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দরদের কথা পুরো বই জুড়ে লিখেছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। এই অবস্থা বিজয়ের পর বজায় ছিল। কিন্তু আজ বাংলাদেশে ভারতবিরোধিতা তীব্র আকার কেন ধারণ করল, সেই কৌতূহলের উত্তর ভারতকেই খুঁজতে হবে।
টাঙ্গাইলে কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। দেখেন সেখানে 'সমান্তরাল সরকার' তৈরি করেছেন তিনি। তখনই বেশ কিছু বিতর্ক তৈরি হয় মুক্তিযুদ্ধের এই অসম সাহসী কিংবদন্তিকে নিয়ে। সেগুলোর ইঙ্গিতও পার্থ চট্টোপাধ্যায় দিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের মাঝেই পাকিস্তানপন্থি দালাল যেমন: মুসলিম লীগ, জামায়াত, নেজামি ইসলামি, পিডিপি ইত্যাদির নেতাদের নিয়ে ডা. মালেকের নেতৃত্বে একটি বেসামরিক মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী। সেই সরকারের দুইজন সদস্যের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তিনি দেখেছেন, পাকিস্তানের এসব দালালদের ন্যূনতম কোনো পাপবোধ নেই। বরং তারা সাফাই গাইছে। একই ধরনের অনুশোচনাহীন মনোভাব দেখেছেন পাকিস্তানি হানাদারদের পাণ্ডা রাও ফরমান আলি ও দুই পদস্থ সেনাকর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে। গণহত্যাকারী ও তাদের দোসরদের কখনোই পাপবোধ কাজ করে না।
পার্থ চট্টোপাধ্যায় বাঙালি হলেও বাংলাদেশি নন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকার সংবাদকর্মী ছিলেন। তাই সবগুলোকে ভারতের আতশকাঁচে দেখবেন - এমনটাই স্বাভাবিক। তাই বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদারদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র ও জিনিসপত্র ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ে যাওয়াকে 'বাতিল' করতে চেয়েছেন। মুসলমানের নামের আগে 'শ্রীমান ও শ্রীমতী' বসিয়েছেন। মোটকথা, ভারতের পক্ষে একটা বয়ান তৈরির চেষ্টা ছিল। তা সত্ত্বেও পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের 'ডেটলাইন ঢাকা' তৎকালীন সময়ের একটি দলিল। বিজয়ের ঠিক পরের ঢাকা শহরকে বুঝতে বইটা জরুরি।
সহজ ভাষায় লেখা। একটানা পড়া যায়। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশকে বুঝতে এই বইটা পড়া যেতে পারে। তবে লেখক ভারতপন্থি সাংবাদিক এটুকু মাথায় রেখে পড়লে ভালো হবে৷
বইটির মূল উপপদ্য হচ্ছে সাংবাদিক পার্থর দৃষ্টিতে দেখা মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পরবর্তী বিভিন্ন দিক। যা তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করছেন বাংলাদেশে অবস্থানকালে। রয়েছে তাঁর সাথে বিভিন্ন মানুষের সাক্ষাতকারের আলোচ্য দিক সমূহের অসাধারণ বর্ণনা। বইটি লেখা হয়েছে ডায়রির ধাঁচে , কিছুটা দিনলিপির মত কিন্তু ঠিক দিনলিপিও না। আসলে বইটাকে বলা যেতে পারে লেখকের স্মৃতিরোমন্থনের পাণ্ডুলিপি।
‘ডেটলাইন ঢাকা’ বইটির সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার হচ্ছে, এই বই পড়া শুরু করার পর থেকে মনে হচ্ছিলো প্রতিটা ঘটনা চোখের সামনে ঘটছে। লেখকের প্রাঞ্জল ভাষার ব্যবহার এবং প্রায় প্রতিটা ঘটনার চমৎকার বিবরণ বইটাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
লেখকের সাথে চান্দপুরে ( চাঁদপুর) পাকিস্তানি সাবমেরিন থেকে পালিয়ে আসা তৎকালীন পাকিস্তান নেভির চিফ পেটি অফিসার শেখ আলির দেখা ও কথোপকথন। সেই সাথে খুব অল্প লাইন খুব সুন্দর করে তাঁর জেনেভা থেকে শুরু করে মুক্তিবাহিনীর নৌ কমান্ডো হয়ে চাঁদপুরের অপারেশন সব উঠে এসেছে।
উঠে এসেছে ঢাকা রেডিও এবং টেলিভিশনকে কিভাবে পাকিস্তানী বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতো সে চিত্র। বিজয়ের পর বাংলাদেশে টেলিভিশন (১৬ই ডিসেম্বর) এবং ঢাকা রেডিও ( ১৭ই ডিসেম্বর) চালু করে হলেও পরে মুজিবনগর সরকারের তথ্য-সচিবের নির্দেশে , স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মীরা না ফেরা পর্যন্ত রেডিও এবং টিভির কার্যক্রম স্থগিত করে রাখা হয়।
লেখকের লিখেছেন, আল-বদর এর কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক। তাদের কুকীর্তি , গঠনতন্ত্র , ট্রেনিং এবং বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবি হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীদের কথা। যুদ্ধ শেষ হবার পরে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে আসা আত্মীয়দের কথাও উঠে আসে। এমনই একজন রাজশাহীর ডি আই জি মামুন মাহমুদের পত্নী মুসফেকা মাহমুদ। তিনি দেখা করেন বন্দী রাও ফরমান আলীর সাথে এবং “রাও ফরমান আলি সেদিন পরাজিত। বন্দি। আমাকে দেখে তিনি বিচলিত হয়ে উঠলেন।চিনতে পারলেন আমাকে। বিবেক নাম এক গুপ্তক্ষতকে যা প্রলেপ দিয়ে এতদিন ধেরে চেপে রেখেছিলেন রাও ফরমান আলি, আমাকে দেখে তার সেই গোপন ক্ষত আবার বুঝি ব্যথিয়ে উঠল। সেই একই কথা সেদিনও বললেন ফরমান আলি। ম্যাডাম, আপনার স্বামী রংপুর যাবার আগে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আমরা তার কোন খবর জানি না।”
সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে ডিসেম্বর মাসেই স্বজনহারা মানুষেরা একত্রিত হয়ে রাষ্ট্রসংঘ ( জাতিসংঘ) এর নিকট ৩৬ জন পাক আর্মি অফিসারের বিচারের দাবি চেয়ে দরখাস্ত পাঠায়।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও লেখক ৭২ সালের একটি স্মৃতিচারণ করেছেন চলমান ঘটনা প্রবাহের মধ্যে। খুবই ছোট্ট একটা ঘটনা দিয়ে অনে��� বড় কিছু প্রকাশ পেয়েছে বইটির একটি অধ্যায়তে। “শেখ সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আমার বাড়ি বাংলাদেশ।”
আছে আমাদের জহির রায়হান ও লেখকের দেখা হবার ঘটনা। লেখক মুক্তিযুদ্ধের সময় জহির রায়হানের লেখা আরেক ফাল্গুন ভারতে প্রকাশের ব্যবস্থা করে দেন। ১৩ই ডিসেম্বর শহীদুল্লাহ কায়সারকে আলবদর বাহিনী তুলে নিয়ে যাবার খবর পাবার পর থেক জহির রায়হান ভেঙে পড়েন। তিনি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন ঢাকার বুদ্ধিজীবী হত্যার পিছনে দায়ীদের খুঁজে বের করবেনই।
জহির বলেছিলেন “এখানে আপনার সঙ্গে আমি একমত নই।যারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী তারা সাময়িকভাবে গা ঢাকা দিয়েছে বটে, কিন্তু তারা বাইরে কোথাও যায়নি। এই দেশেই আছে। আবার তারা ঐক্যবদ্ধ হতে চেষ্টা করছে। আপনি ভাববেন না, সাম্প্রদায়িক শক্তি চিরদিনের মতো খতম হয়ে গিয়েছে।”
জহির রায়হানের বুদ্ধিজীবী নিধন অনুসন্ধান কমিটি বিলুপ্ত হয় ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তাঁর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে।
বিজয় লগ্নে আবদুল্লা নিয়াজিকে পাঠানো জেনারেল নাগরার আত্মসমর্পণের চিঠি। আত্মসম্পর্পণে প্রস্তুত পাকিস্তানবাহিনীর জেনারেলদের মানসিক অবস্থাম এবং তাদের স্ট্রাটেজি সব উঠে এসেছে। লাখ লাখ মানুষ হত্যার পরেও তাদেরই এক লে. কর্ণেলের দাম্ভিক উচ্চারণ “অত্যাচার- অত্যাচারের কথা কি বলছেন, কোন পাকিস্তানি সৈন্য সিভিলিয়ানদের উপর অত্যাচার করেনি।”
বইটিতে প্রায় প্রতিটি ঘটনার সাথে সংযুক্ত আরো কিছু ছোট ছোট ঘটনা আছে যা মাঝে মাঝে পাঠকদের বোঝায় সমস্যা করতে পারে। বইটির খারাপ দিক বলতে গেলেই এটিই। অনেকের কাছে এইটাও মনে হতে পারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বর্ণনা কিঞ্চিৎ বেশি। তবে আমার মতে সেটাই স্বাভাবিক।
ইতিহাস প্রেমীদের জন্য বইটি তথ্যবহুল এবং প্রয়োজনীয় তথ্যের সূত্র হিসেবে সহজেই ব্যবহার যোগ্য। অবশ্য পাঠ্য তাদের জন্য।