তিমিরহনন বইটিতে লেখক কৌশিক মজুমদার তাঁর জাদুবাস্তব লেখনীখানি দিয়ে বুনেছেন অপরূপ এক কাহিনি। মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়া আমপোলা গ্রাম, রহস্যময় চিনদেশ আর উনিশ শতকের লন্ডনের পটভূমিকায় রচিত এই উপন্যাসের কুশীলব বিচিত্র সব চরিত্র।
একদিকে দারোগা নিকুঞ্জ, অঘোরনাথ, হানা, আদুরী, কালীনাথ আর সাইগার হোমস জড়িয়ে পড়েন এক গভীর রহস্যজালে, অন্যদিকে ইংরেজ বিজ্ঞানী রবার্ট ফরচুন চা গাছের উৎস সন্ধানে ছদ্মবেশে এগিয়ে চলেন চীনদেশের দুর্গম পথে। সঙ্গী বাঙালি যুবক রসিকচন্দ্র। এরই সমান্তরালে এক অসম্ভব যাত্রায় ব্রতী হন প্রাচীন ভারতের এক চরিত্র বজ্রবাহু। তিনিই এই উপন্যাসের আকর, আবার যোগসূত্রও বটে।
তিন প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা, ইতিহাস, রহস্য, লোককথা, রোমাঞ্চ ও অভিযানের অনন্য মিশ্রণে রচিত এই উপন্যাসকে কোনও একক ঘরানা বা জঁরের সীমারেখায় বেঁধে রাখা যায় না। বরং এটি এক চিরন্তন দস্তানগোর গল্পবলার ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করে, যেখানে বাস্তব ও অলৌকিক, ইতিহাস ও কল্পনা অবলীলায় মিশে যায় পরস্পরের সঙ্গে। এ এমন এক উপলব্ধি, যা সরাসরি আত্মাকে স্পর্শ করে।
জন্ম ১০ এপ্রিল, ১৯৮১, কলকাতা। স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পি. এইচ. ডি. তে সেরা ছাত্রের স্বর্ণপদক প্রাপ্ত। নতুন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া Bacillus sp. KM5 এর আবিষ্কারক। বর্তমানে ধান্য গবেষণা কেন্দ্র, চুঁচুড়ায় বৈজ্ঞানিক পদে কর্মরত এবং হাবড়া মৃত্তিকা পরীক্ষাগারের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। জার্মানী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা গবেষণাগ্রন্থ Discovering Friendly Bacteria: A Quest (২০১২)। তাঁর কমিকস ইতিবৃত্ত (২০১৫), হোমসনামা' (২০১৮),মগজাস্ত্র (২০১৮), জেমস বন্ড জমজমাট (২০১৯), তোপসের নোটবুক (২০১৯), কুড়িয়ে বাড়িয়ে (২০১৯),নোলা (২০২০), সূর্যতামসী (২০২০), আঁধার আখ্যান (২০২০) ও নীবারসপ্তক (২০২১) এই সব দিনরাত্রি (২০২২), ধন্য কলকেতা সহর (২০২২), আবার আঁধার (২০২২), অগ্নিনিরয় (২০২২), হারানো দিনের গল্প (২০২৪), সিংহদমন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪), আরও একটি প্রবন্ধ সংকলন (২০২৫), আতঙ্ক সমগ্র (২০২৫), তিমিরহনন (২০২৬) সুধীজনের প্রশংসাধন্য। সরাসরি জার্মান থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন ঝাঁকড়া চুলো পিটার (২০২১)। বাংলাদেশের আফসার ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ম্যাসন সিরিজের বাংলাদেশ সংস্করণ (২০২২, ২৩), মৃত্যুস্বপ্ন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪) । সম্পাদিত গ্রন্থ সিদ্ধার্থ ঘোষ প্রবন্ধ সংগ্রহ (২০১৭, ২০১৮) ফুড কাহিনি (২০১৯), কলকাতার রাত্রি রহস্য (২০২০) সত্যজিৎ রায়ের জন্ম শতবর্ষে একাই একশো (২০২২), কলিকাতার ইতিবৃত্ত(২০২৩), বিদেশিদের চোখে বাংলা (২০২৪) এবং কলিকাতার নুকোচুরি (২০২৫)
প্রচ্ছদ আর সামনের কিছু পাতা দেখে সত্যি ভালো লেগেছিল । এর আগে কৌশিক বাবুর বিখ্যাত ট্রিলজি পড়েছি সুতরাং বইকে সুন্দরভাবে সাজানোর ব্যাপারে ওনাকে বেশ উচ্চ পর্যায়ে রাখতাম।হ্যাঁ, এ আই এর ব্যবহার দেখে কিছুটা অদ্ভুত লেগেছিল। আর্টের জগতে এ আইয়ের ব্যবহার এমনিতেই বিতর্কিত বিষয়। লেখক নিজে গবেষক, সুতরাং এই সিদ্ধান্ত তাঁর এবং বাকি পাঠকের উপরে ছাড়াই ভালো, আমার কোন জায়গায় কি মনে হয়েছে, পরে আসছি। উপন্যাসে প্রথম দিকে আমি শুরু করেছিলাম আগের উপন্যাস গুলোর কথা মাথায় রেখে, অনেক সিরিয়াস মানসিকতা নিয়ে। কিছুক্ষণ ওই আমপোলা গ্রামের ঘটনা পড়ে মনে হল শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজের টেস্ট পাচ্ছি। আরো কিছুক্ষণ পড়লাম, দেখলাম যে ঘটনাবলী কিঞ্চিৎ ডার্ক হয়ে গেল। আরো কিছুক্ষণ পড়লাম, দেখলাম কেমন রহস্য রোমাঞ্চের গন্ধ পাচ্ছি। ইতিহাস ইতিহাস আছে। তারপর আর একটু পড়লাম, দেখলাম পৈশাচিক জিনিসপত্র টাইপ কিছু আছে। তার মধ্যে রসিকতা আছে। মনে হল এলিস ইন দি ওয়ান্ডারল্যান্ডের ডার্ক ভার্সন টাইপ কিছু হতে পারে। তারপর আরো খানিক পড়ে দেখলাম, সত্যি সত্যিই রূপকথা ঠাকুরমার ঝুলিতে ঢুকে পড়লাম বুঝি। শেষের দিকে গিয়ে যখন অঘোর একমাস জ্বর আর ভুলো রোগ থেকে উঠে তিমির হননের গান আওড়াতে থাকে আর বলে, " আজ থেকে অনেক বছর পরে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বরিশাল জেলায় জীবনানন্দ দাশগুপ্ত নামে এক শিশুর জন্ম হবে আর সেই এই কবিতা লিখবে।" আমার মনে হল চায়ের ফুল চিনতাম না বলে প্রচ্ছদের ছবির ফুলটাকে আফিমের পপি ফুল ভেবেছিলাম। সেইটা বোধহয় এই সবের কথাই আন্দাজ করে। বইয়ের মলাটে যা যা বলা হয়েছে, সব সত্যি। সত্যিই "এমন উপন্যাস আগে পড়িনি"। তাও তো কাহিনী শেষ হয়নি। পরবর্তী পার্ট "সিন্ধুসারস" কবে আসবে জানি না। যাইহোক, এতক্ষণ তো বইটা পড়ে কেমন লাগলো বললাম। বইটা কেমন বলি। যা বুঝলাম, গল্পের গরু গাছে তুলে দেওয়াই যায়, যদি কেউ তুলতে তারপরে নামাতে জানে। এই ধরনের ফ্যান্টাসি ধরনের লেখা দুইভাবে উতরানো যায় বলে আমার মনে হয়। একটা ইমোশনে, যেখানে পাঠকের মনে হতে থাকে, এমন যদি হয় তো বেশ হয় বা এরকম হলে মন্দ হতো না। আরেকটা হয় ঘটনার ঘনঘটায়। লেখক দ্বিতীয় পন্থা বেছেছেন। তাই হয়তো এমন কোন জায়গা আমি খুঁজে পেলাম না যে মনের গভীরে খুব দাগ টানতে পারে। তবে গভীরতা না পেলেও একটা ভয়ানক স্রোত পেয়েছি যা পাঠককে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে। নইলে দুইদিনে বই শেষ করি :)(তবে কোথাও দাগ কাটেনি বলা ভুল হবে, অঘোরের মায়ের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনার বিবরণ লেখক যেভাবে দিয়েছেন, সত্যিই অপূর্ব ) গল্পের অধ্যায় গুলোর নাম এবং বিন্যাসে বেশ অভিনবত্ব আছে। কোন বিশেষ সময়বিন্যাস মেনে তো চলে না। কখনো তা এগিয়ে গেছে কখনো পিছিয়ে। এই ধরনের সমান্তরাল সময় বিন্যাসের ক্ষেত্রে অনেক লেখক বোঝার সুবিধার জন্য কিছু কিউ দেন। এখানে অধ্যায় গুলোর নাম সে কাজটা করতে পারত কিন্তু তা আদৌ করেছে কিনা আমি তো বুঝে উঠতে পারিনি। অনেক সময়ই কিছুটা লেখা না পড়া অব্দি বোঝার উপায় ছিল না যে ঠিক কোন সময়কালের কথা বলা হচ্ছে। আগেই বললাম লেখা ছড়ানো আর গোটানোর কথা। এই কাহিনী জুড়ে লেখক মূলত ছড়িয়েছেন। এতগুলো কাহিনীর খোলা সুতো পড়ে রয়েছে যে এখন এটাকে আর ক্লিপ হ্যাঙ্গারও বলা চলছে না; গোটা গল্পটাই ঝুলে আছে তার উপর। হ্যাঁ, চা সম্বন্ধে গল্পের ছলে অনেক অজানা তথ্য সুস্বাদু ভাষায় লেখক পরিবেশন করেছেন তা সত্যি সাধুবাদ যোগ্য। বাকি রচনা চানাচুর কিংবা ফুচকার মতন; অনেক খেয়ে নেওয়া যায়, পেট ভরে না মন ভরে।তবে সবথেকে যেটা হতাশ করেছে সেটাই বইয়ের অলংকরণ। প্রথম কয়েকটা পাতা বাদ দিয়ে বাকি বইয়ের অলংকরণ এত সাদামাটা আর এ আই সম্বলিত তো সত্যি মন খারাপ করে দেয়। কৌশিক বাবুর বইয়ের অন্যতম ইউএসপি ছিল তার অলংকরণ। ইতিহাসের ছাপ থাকে, ডিটেলিংস থাকে। সেই দুটোই এই বইয়ে বহুমাত্রে অনুপস্থিত। গভীরতা নেই। বিশেষ করে রচনাটি এতটাই বর্ণাঢ্য সেখানে অলংকরণ এত মিনিমালিস্টিক কেন বুঝলাম না। দুটো ছবির কথা বিশ্বাস ভাবে বলবো। একটা কালীনাথের ঘরের অলংকরণ। লেখা পড়ে ঘরের যা বিবরণ চোখের সামনে ভাসে তাতে এই ঘর অ্যান্টিক শপের মতন ইন্টারেস্টিং একটা জায়গা বলে মনে হয়। উৎসাহ জাগে। ঠিক পরের পাতায় যখন তার একটা নিতান্ত সাদামাটা ঘরের ছবি দেখি কোথাও এক পলকে মারা পড়ে সেই কল্পনাটা। পাশাপাশি বইয়ের শুরুতেই সমুদ্রের মধ্যে এক দেবীর ছবি দেখতে পাই। সারাক্ষণ কন্টেক্স খোঁজার পর অবশেষে যখন তার বিবরণ পেলাম, হতাশ হতে হয় দেবীর শারীরিক বিবরণ পুরোপুরি মেলে না। এমনকি মুকুটের যে তিনটি ফুলের কথা বলা হয়েছে যা রচনা অনুসারে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা বৈশিষ্ট্য। সেটা বোঝাই যায় না ছবিতে। কৌশিকবাবু সুলেখক, এইরকম একটা বিষয় বস্তু নিয়ে এরকম একটা লেখাকে এত সুখপাঠ্য ভাবে উপস্থাপন সহজ কিছু না, সেখানে তিনি স্বার্থক। কিন্তু রচনা হিসেবে এটা কতটা উচ্চমানের সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ...