অলি আহাদ আকন্দকে ঘিরে রেখেছে দুটি স্বপ্ন, তিনি ওদের দেখছেন, না কি স্বপ্নদুটিই তাকে? অতীতচরা কিন্তু বর্তমানে ফিরতে উন্মুখ এক টাইম মেশিনে চড়ে বসেছেন রেণু। স্মৃতি, ক্ষয়, অর্জন ও বিভ্রম সব মিলেমিশে যাচ্ছে জীবনের সেই আশ্চর্য দর্শনের সঙ্গে: চারদিকে এত যে মুখরতা, তা কি চূড়ান্ত নৈঃশব্দ্য নির্মাণেরই প্রক্রিয়া নয়? সমস্ত ছাপিয়ে বহুস্বরবিশিষ্ট এ উপন্যাসে বেজে চলেছে সন্ধ্যাকালীন রিকুয়েম, এক অবিরাম সান্ত্বনাসংগীত; কান পাতলে শোনা যায়।
"বিদায়বেলার আগে প্রতিবিম্ব ছাড়া আর কিছু রাখা হলো না। জীবনের চেয়ে অন্য কিছু, স্বপ্নের দেয়াল ধরে হাঁটাহাঁটি, কম্পিত শব্দের ছায়াগুলো রচনা করে রাখে ওজনহীন উপস্থিতি - নৈঃশব্দ্যের ক্যালিগ্রাফি।" _কুমার চক্রবর্তী, পাখিদের নির্মিত সাঁকো
"শোনো, রিকুয়েম" পড়তে পড়তে একটা সময় মায়ানগর উপস্থিত হতেই মনে হলো লেখক আমাদের "চায়ের কাপে সাঁতার" এর এক সম্প্রসারিত কল্পরাজ্যে উপস্থিত করেছেন। এখানে চরিত্র সীমিত, প্লট সম্পূর্ণ আলাদা এবং খুব বেশি উচ্চাভিলাষী নয়, তারপরও মায়ানগরের আমাদের পরিচিত সেই জগতটাই যেন হাজির হয়েছে ভিন্ন এক আঙ্গিকে। কাহিনির কেন্দ্রে আছেন বৃদ্ধ অলি আহাদ আকন্দ আর তার স্ত্রী রেণু। দুজনকে ঘিরে আছে তাদের পরবর্তী বংশধররা। অলি আহাদ, রেণু, জামিরুল, তাহির, আইনুন প্রভৃতির বয়ানে আমরা কাহিনি উন্মোচিত হতে দেখি।
অলি আহাদের অসুস্থতা ও বিভ্রম ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু এর সূত্র ধরে হাজির হয় মুক্তিযুদ্ধ, প্রান্তিক অঞ্চলে মুসলমানদের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ইত্যাদি । সূক্ষ্মভাবে ঢুকে পড়ে সম্প্রতি আলোচিত কিছু ইস্যুও। গ্রাম, পুকুর, শীতভোরের কুয়াশা স্বপ্নীল এক জগতের সন্ধান দেয় কিন্তু সেই পুকুরে ভেসে থাকা লাশ মনে করিয়ে দেয় যে স্বপ্নেও আমাদের রক্ষা নেই, বাস্তবতা এতোই কঠিন!
চরিত্র হিসেবে রেণু সবচেয়ে বর্ণিল। এরকম বিরুদ্ধ স্রোতের যাত্রীরা সময়কে বেগবান করে তোলেন। পাশে তার সন্তানাদি আর পুত্রবধূকে অনেকটাই প্রথাগত ও বৈশিষ্ট্যহীন মনে হয়। (অন্তত তারা তাদের বিষাক্ত সমকালকে কীভাবে পার করছে তার কিছু ইঙ্গিত তো থাকতেই পারতো।) বয়স বাড়ার সাথে সাথে সন্তানরা নিজেদের একসময় বাবা-মার জায়গায় আবিষ্কার করে, বাবা-মা কী করেছিলো কেন করেছিলো তা হাতেনাতে বুঝে তারা ক্লান্ত ও বিপন্ন হয়। এই পালাবদল এনামুল রেজা স্বল্প পরিসরে সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন। উপন্যাসে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে কিন্তু শেষ অংশটা এতো বিষণ্ণ মাধুরী দিয়ে লেখা যে সব ত্রুটি ভুলে যেতে ইচ্ছে করে।
"রিকুয়েম" অর্থ শোকসংগীত যা কারো মৃত্যুর পর গাওয়া হয়। অলি আহাদ মারা যাচ্ছেন, তার জীবন খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত এক বাঙালির, যেখানে গৌরবের কিছু নেই, গ্লানি অশেষ, অপূর্ণতা নিত্যসঙ্গী। এখন এই অন্তিম সময়ে কি তিনি বরণ করে নেবেন সবকিছু নাকি শেষটাও হবে গ্লানিতে ভরা? বিভ্রান্তিপূর্ণ? সিদ্ধান্তটা অলি আহাদকেই নিতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ একা,জীবনের অবিশ্রান্ত কোলাহলক্রন্দন পার হয়ে চূড়ান্ত নৈঃশব্দ্যের কাছে পৌঁছাতে যে আত্মিক প্রশান্তি প্রয়োজন তা অলি আহাদের আছে কি না সেটাই বিবেচ্য। আমরা, নিরপেক্ষ দর্শকরা, এ সময় সন্ধ্যাকালীন রিকুয়েম শুনতে থাকি কান পেতে।