অনেক দিন আগে এক শীতের রাতে বাংলার এক মফস্বল স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন এক স্টেশন মাস্টার। ট্রেনটি যখন স্টেশনে ঢোকে, তার দুটি কামরায় স্টেশন মাস্টারের জন্য তখন অপেক্ষা করছিল এক অদৃশ্য রহস্য, যে রহস্যের জট-জাল বিস্তৃত হয় ভবিষ্যৎ পর্যন্ত। সেই ভবিষ্যতে, ২০১৪ সালে, মানবসভ্যতার এক চূড়ান্ত বিপর্যয়ের সামনে সম্মুখীন হয়। এমনই এক শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনীতে কথাশিল্পী দীপেন ভট্টাচার্য মানবসভ্যতার এক ক্রান্তিলগ্নের ছবি এঁকেছেন তাঁর বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ‘নক্ষত্রের ঝড়’ উপন্যাসটিতে। এ মহাজাগতিক কাহিনীতে রয়েছে পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, মানুষের মনোজগৎ ও গ্রহান্তরের ভিন সভ্যতার বিবর্তনের এক চমকপ্রদ সম্মিলন।
দীপেন (দেবদর্শী) ভট্টাচার্য (Dipen Bhattacharya) জ্যোতির্বিদ, অধ্যাপক ও লেখক। জন্ম ১৯৫৯ সালে। আদি নিবাস এলেঙ্গা, টাঙ্গাইল। ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল, নটরডেম কলেজ ও ঢাকা কলেজে পড়াশুনা করেছেন।
মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ম্যারিল্যান্ড-এ নাসার (NASA) গডার্ড স্পেস ফ্লাইট ইনস্টিটিউটের গবেষক ছিলেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে (ইউসিআর) গামা রশ্মি জ্যোতি জ্যোতিঃপদার্থবিদ হিসেবে যোগ দেন। মহাশূন্য থেকে আসা গামা-রশ্মি পর্যবেক্ষণের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে বায়ুমণ্ডলের ওপরে বেলুনবাহিত দূরবীন ওঠানোর অভিযানসমূহে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করছেন ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড কমিউনিটি কলেজে; এছাড়া পদার্থবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে অধ্যাপনা করছেন ক্যালিফোর্নিয়ার মোরেনো ভ্যালি কলেজে। ১৯৭৫ সালে তিনি বন্ধুদের সহযোগিতায় ‘অনুসন্ধিৎসু চক্র’ নামে একটি বিজ্ঞান সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৬-২০০৭ সালে ফুলব্রাইট ফেলো হয়ে ঢাকার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। বাংলাদেশে বিজ্ঞান আন্দোলন ও পরিবেশ সচেতনতার প্রসারে যুক্ত।
পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা ছাড়াও বাংলা ভাষায় তাঁর বিজ্ঞান-কল্পকাহিনিভিত্তিক ভিন্ন স্বাদের বেশ কয়েকটি ফিকশন বই প্রকাশিত হয়েছে।
দীপেন ভট্টাচার্যের বিজ্ঞান কল্পকাহিনি অসাধারণ হবে এটা নিপাতনে সিদ্ধ। কিন্তু এই উপন্যাসের দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক আলোচনা কতোজন ধরতে পারবে সে ব্যাপারে আমি সন্দিহান। ধরতে পারলে ভালো লাগবে নিশ্চিত।
বইটা হাতে পেয়ে শুরু করতে খুব বেশি দেরি করিনি। মহাকাশযান/মহাজাগতিক কোনো স্থান দিয়ে শুরু হয়নি, শুরু হয়েছে একদমই গ্রামীণ পটভূমিতে ঘটা একটা ঘটনা দিয়ে। অতীতের একটা সময় এক ট্রেন স্টেশনের মানুষ দেখে এক ট্রেনের দুটি বগীতে এমন কিছু হয়ে গেছে যাকে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় না। আরও কয়েক বছর পরে আটলান্টিকের উপরে চলমান বিমানে ঘটে যায় এমন এক ঘটনা। এরপর সেটা মহামারী আকারে দেখে দেয় ভবিষ্যতে ২০৪১ সালে। এরপর থেকে শুরু হয় মূল উপন্যাস। গল্প এগিয়ে যেতে থাকে। বইটিতে গল্পের প্রয়োজনে প্রচুর টেকনিক্যাল বিষয় আনতে হয়েছে। এবং এই বিষয়গুলো একটু উচ্চশ্রেণির, ছোটদের বুঝতে সমস্যা হবে।
সায়েন্স ফিকশন লেখকদের অনেকেই সাই-ফাই লিখতে গিয়ে ফ্যান্টাসিতে ভরিয়ে ফেলেন। একসময় বুদ হয়ে পড়তাম জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন। জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশনেও ফ্যান্টাসির ছড়াছড়ি। সায়েন্স ফিকশনে ফ্যান্টাসি চলে আসলে, হোক সেটা সিনেমায় কিংবা বইয়ে, ভালো লাগে না। এদিক বিবেচনা করে একটু বেশি পরিমাণ টেকনিক্যাল হলেও বইটিকে বেশি নম্বর দেয়া যায়। বইটি টেকনিক্যাল দিক থেকে বেশি সমৃদ্ধ হওয়াতে হয়তো কিছুটা কঠিন হয়েছে কিন্তু তাতে করে ফ্যান্টাসি থেকে একদমই মুক্ত থেকেছে। সায়েন্স ফিকশন হিসেবে এটা খুবই ভালো দিক।
বইয়ের পটভূমি ২০৪১ সালের ঢাকা। এই বইতে বিজ্ঞানের যে ধারণাগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, তা বেশ উঁচুস্তরের এবং জটিল। এই অংশটা পড়তে আনন্দ লেগেছে।আইডিয়ার অভিনবত্ব এবং মৌলিকত্ব খুবই চমকপ্রদ। এক্ষেত্রে লেখককে বাহবা দিতেই হয়। তবে গল্পের সংলাপ এবং উপস্থাপনার ভঙ্গিমা অপরিণত লেগেছে। আজিমভের লেখা আমার কাছে এরকম মনে হয়। থিউরি ভালো থাকে(যেটা সায়েন্স ফিকশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ), তবে উপস্থাপনা দুর্বল হয়। এজন্যই আমি আজিমভের লেখার প্রশংসা করতে বাধ্য হলেও ঠিক তার ভক্ত নই।
ইংরেজিতে এই বই পড়লে দুইতারা দিতাম। তবে বাংলায় এরকম লেখার প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাতে চারতারা দিচ্ছি।
দীপেন ভট্টাচার্য দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লিখে আসছেন। বাংলাভাষায় প্রতিবছর অনেকগুলো সাইফাই প্রকাশিত হয় একুশের বই মেলায়, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল কিংবা হুমায়ুন আহমেদের মতো লেখক বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লিখে বহু খ্যাতি কুড়িয়েছেন। মূলধারার বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী একটা পরিচিত ছকের মধ্যে পড়ে গেছে বহু আগেই – গল্পের মধ্যে যে কোনভাবে রকেট, মহাকাশে ওয়ার্মহোল ভ্রমণ, ভিনগ্রহের প্রাণী, অতিরিক্ত-বুদ্ধিমান কম্পিউটার/রোবট, স্থান-কালের আপেক্ষিকতা ঢুকিয়ে দাও; ব্যাস, কল্পকাহিনী তৈরি। কিন্তু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী প্রথমত: যে একটা “কাহিনী” যার একটা “প্লট” থাকবে; যার নায়ক-নায়িকারা মানুষ, সে মানুষের যে একটা সমাজ-প্রেক্ষিত আছে, সুতরাং বেশ কিছু পিছুটান ও দ্বন্দ্ব থাকবে; তারা একটা মানবিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাবে, সে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পাঠক নায়ক-নায়িকার চরিত্রের বিকাশ দেখবে; আর কল্পবিজ্ঞানের “কল্পিত-বৈজ্ঞানিক-ব্যাপার-স্যাপার” গাঁজাখুরী কোন আকাশ-কুসুম কল্পনা হবে না, কল্পিত বৈজ্ঞানিক উপাদান কাহিনীর সমাজ-বাস্তবতার সীমা হাস্যকর-ভাবে অতিক্রম করবে না – এই খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর প্রতি যথাযথ মনোযোগের অভাবে মূলধারায় সস্তা-ফ্যান্টাসির স্তর অতিক্রম করতে পেরেছে এরকম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী হাতে গোনা যাবে। এর কারণ হয়তো বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লেখাকে হালকা চালে নেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি, কিংবা দ্রুত পাঠকপ্রিয়তা অর্জন, অথবা বাণিজ্য। তবে দীপেন’দা বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী লেখাকে সহজ ভাবে নেন নি; তাঁর তিনটি উপন্যাস অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো (২০০৬), দিতার ঘড়ি (২০১২) ও নক্ষত্রের ঝড় (২০১৫)-র পাঠ যে কোন বুদ্ধিদীপ্ত পাঠককে এ বার্তা পৌঁছিয়ে দেবে।
আমি তাঁর প্রথম উপন্যাস অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো পড়ি সম্ভবত ২০০৬ কি ২০০৭ সালে। এর আগে তিনি একটি বিজ্ঞান-কল্প-গল্প সংকলন নিওলিথ স্বপ্ন (২০০২) প্রকাশ করেন। এছাড়াও তিনি বেশ কিছু বিজ্ঞান-ধর্মী ছোট-গল্প লিখেছেন যা অন্তর্জালে বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত হয়েছে [১]। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী তিনি লিখেছেন খুবই কম। সৌভাগ্যক্রমে আমি তাঁর সকল গল্পই পড়েছি – মৌলিক কল্পকাহিনী লেখার ক্ষেত্রে তিনি যে পথে এগিয়েছেন তা অভিনব ও মৌলিক। তাঁর বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসে পদার্থ বিজ্ঞানের কোয়ান্টাম মেকানিক্স কিংবা সমান্তরাল মহাবিশ্বের মতো আধুনিক-পদার্থবিদ্যার তত্ত্ব-নির্ভর ধারণাগুলো তিনি সফল ভাবে যুক্ত করেন; কিন্তু বিজ্ঞানের ঐ ধারণাগুলো তাঁর গল্পের ভরকেন্দ্র থাকে না, মূল আগ্রহের জায়গা হিসেবে পাঠক একটা নিটোল প্লট উপহার পান যেখানে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব-ধারণাগুলো ভিত্তি হিসেবে কাজ করে; এবং তাঁর উপন্যাস শেষ পর্যন্ত একটা কাহিনী থাকে না, পাঠকের কাছে সরবরাহ করে মানুষ, মানুষের সভ্যতা, তার সমাজ, ইতিহাস ও আগামী ভবিষ্যৎ বিষয়ক কিছু সুচিন্তিত ভাবনা। আমি সম্প্রতি তাঁর নক্ষত্রের ঝড় পড়লাম; আমার পাঠ প্রতিক্রিয়া এই লেখাতে উত্থাপন করছি।
ছোটবেলার কিছু কবিতা আছে যেগুলো এখন পড়লে পাঠ বদলে যায়। কবিতা তো একই আছে, কিন্তু আমার কাছে ধরা দেয়া ভাব তার রঙ বদলে ফেলেছে! যেন অন্য কোনো আমির জন্য কবি একটা কিছু বুনে গেছেন। কবির বুনন একই আছে, কিন্তু আমার আমিকে চিনে চলেছি নতুন বুনট পড়ার অমোঘ সময়ের হাত ধরে। এমন একটা কল্পকাহিনীর মধ্য দিয়ে ঘুরলাম যেন গল্পকল্পবিজ্ঞানতত্ত্বকথার এক ঝড় থেকে জেগে উঠলাম! নক্ষত্রের ঝড় হল ঠিক ঠিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অঙ্গসজ্জায় পরতে পরতে আঁকা গল্প। আবার কবে পড়ব কে জানে? সেদিন হয়ত পাঠ বদলে যাবে, সব ঝড়ই ঝড়! কিন্তু কোন ঝড়ই আগের ঝড়ের মত না। প্রতিটা ঝড়ই নতুন। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যারও এই গুণ। যারা তত্ত্ববিজ্ঞানের প্রেমে অন্ধ তারাই বইটা পড়ে শেষে বুকে চেপে একটা বিহবলতার বিস্ময়কে অনুভব করতে পারবেন। :)
একটি মহাজাগতিক কণাকে যদি পাশাপাশি দুইটি চির দিয়ে যেতে দেওয়া হয়, তাহলে কণাটির যে কোন চির দিয়ে যাবার সম্ভাব্যতা থাকবে। কিন্তু ���িরের মুখে যদি কোন পর্যবেক্ষক থাকে তবে দুইটি চিরের সম্ভাবনা কলাপ্স করবে এবং কণাটি নির্ধারণ করবে কোন চির দিয়ে যাবে। অর্থাৎ, পর্যবেক্ষক ���র্যবেক্ষণের মাধ্যমে ঘটনার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এইটা হচ্ছে গল্পের পেছনের বিজ্ঞান। তবে গল্পের ভাষাটা একটু কটমটে হয়েছে। মনে হয়েছে কথাগুলো আরো সহজে বলা যেত। গল্পের চরিত্রগুলো সর্বদা ভয়েই আধমরা হয়ে ছিলো, পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মত হঠাৎ কোন সিদ্ধান্ত নিতে অনেক বেশি সময় নিয়েছে। তবে গল্পের প্লট ভালো। বিজ্ঞানের সাথে কোন সংঘর্ষ নেই। এখানেই লেখকের স্বার্থকতা।
চমৎকার গল্প, দূর্দান্ত বুনন। দীপেন ভট্টাচার্য নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান কল্পকাহিনী রচয়িতা। তাঁর 'দীতার ঘড়ি' ও 'বার্ট কোমেনের ডান হাত ও অন্যান্য কল্পকাহিনী' পড়ার পর সন্দেহ করেছিলাম- তিনিই হয়তো বাংলায় সবচে' ভালো বিজ্ঞান কল্পগল্প লেখেন। এই বইটিও পড়ার পর নিশ্চিত হলাম।
“I... a universe of atoms, an atom in the universe.” - Richard Feynman
বাংলা ভাষায় এখন প্রতি বছরেই বেশ কিছু মৌলিক কল্পবিজ্ঞানের বই বের হচ্ছে যা বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের জন্য অবশ্যই বেশ ভালো একটি দিক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সেগুলো একটি নির্দিষ্ট ছকে আবদ্ধ, আবার অনেকে তাদের প্রিয় কল্পবিজ্ঞান লেখকদের লেখা বাদে এই জনরার বই খুব একটা কিনেন না। এ কারণে অনেক সময় দারুন কিছু কল্পবিজ্ঞান বই থেকে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে, ক্ষেত্রবিশেষে লেখকও। লেখক দীপেন ভট্টাচার্য আর তার বই " নক্ষত্রের ঝড় " কে আমার কাছে ঠিক এ গোত্রেরই মনে হয়েছে। - নক্ষত্রের ঝড়ের শুরু হয় সুদূর অতীত কালের এক সময়ে। সে সময়ে এক গভীর রাতে কলকাতাগামী এক ট্রেনের খামারগাছা স্টেশনে ঢোকার পরে সেই স্টেশনের স্টেশন মাস্টার আবিষ্কার করেন ট্রেনের দুইটি বগির সকল মানুষ একেবারে উধাও হয়ে গেছে ! অথচ বাদবাকি বগিগুলোতে লোক যেমন থাকার তেমনই আছে,এমনকি গায়েব হওয়া মানুষদের জিনিষপত্র গুলোও ট্রেনের ভিতরেই রয়ে গেছে ! এর কয়েক বছর পরে আটলান্টিক মহাসাগরে ব্রিটিশ যাত্রীবাহী বিমান বিওএসি’র একটি প্লেনেও একই ধরণের ঘটনা ঘটে।
কালের পরিক্রমায় এ ঘটনাগুলো মানুষের স্মৃতি থেকে লোপ পেতে থাকলেও অদূর ভবিষ্যতে আবারো মানুষ একইভাবে অদৃশ্য হওয়া শুরু করলে অমল নামের এক ব্যক্তি এ ঘটনাগুলো তদন্তে নামেন। এখন সেই কলকাতাগামী ট্রেনের এবং আটলান্টিকের ওপর থেকে বিওএসি এর বিমানের যাত্রীদের নিখোঁজ হবার ঘটনার সাথে অদূর ভবিষ্যতের ঘটনাবলীর কি সম্পর্ক ? কে বা কারা রয়েছে এই ঘটনাগুলোর পেছনে ? তা জানতে হলে পড়তে হবে লেখক দীপেন ভট্টাচার্য এর সায়েন্স ফিকশন " নক্ষত্রের ঝড় " বইটি । -- আগেই ব্যক্ত করেছি বাংলা কল্পবিজ্ঞানে প্রতি বছরেই বেশ কিছু মৌলিক কল্পবিজ্ঞানের বই বের হচ্ছে, কিন্তু তার ভিতরে হার্ড সায়েন্স ফিকশনের পরিমান বেশ কম, যা বের হয় তার বেশিরভাগই সাধারণত সফট সায়েন্স ফিকশন। সে হিসেবে বাংলা ভাষায় এ ধরণের হার্ড সায়েন্স ফিকশন পড়ে বেশ অবাকই হয়েছি। গল্পের প্লট,সাব প্লট গুলো সাই ফাই গল্পের হিসেবে বেশ আকর্ষণীয়। শুরুর কয়েকটি ঘটনার পরে কাহিনী যখন মেইন প্লটে আসে তখন কাহিনী কিছুটা ঢিলে হলেও শেষটা অদ্ভুত সুন্দর লেগেছে। - নক্ষত্রের ঝড় গল্পের প্লট দুর্দান্ত হলেও লেখনী খানিকটা দুর্বল লেগেছে। হার্ড সায়েন্স ফিকশন ঘরানার হওয়াতে গল্পে প্রচুর সায়েন্টিফিক আর ট্যাকনিক্যাল টার্ম বলা হয়েছে, যেগুলো আরো গুছিয়ে, সহজভাবে বলা যেতে পারতো। তবে গল্পের প্লটের সাথে সাথে অদূর ভবিষ্যতের পৃথিবীর, বিশেষ করে ঢাকার যে ডিস্টোপিয়ান চিত্রকল্প লেখক তার লেখার মাধ্যমে একেছেন তা বেশ প্রশংসার যোগ্য। লেখক এ বইতে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বা সংগঠনের নাম গুলো যথাসম্ভব বাংলা ভাষায় দেয়ার চেষ্টা করেছেন, এটিও ভালো লেগেছে ।
গল্পের চরিত্রগুলোর ভিতরে অমল বাদে কেউ একটা খুব ফোকাস পায়নি, অবশ্য এ ধরনের গল্পে সাধারণত চরিত্রায়ণের চেয়ে গল্পের সায়েন্টিফিক টার্মস গুলোর উপরেই জোর দেয়া হয়। বইয়ের প্রচ্ছদ,বানান সহ বাকি কারিগরী দিক সমূহ তেমন একটা খারাপ লাগেনি। - এক কথায়, বাংলা সায়েন্স ফিকশনের হার্ড সায়েন্স ফিকশন শাখার এক দারুন উদাহরণ হচ্ছে নক্ষত্রের ঝড়। যারা একটু খানি বিজ্ঞানের সাথে বেশিরভাগ কাহিনী ফ্যান্টাসি বা ফিকশন এর বদলে একেবারে নিখাদ সায়েন্স ভিত্তিক সায়েন্স ফিকশন পড়তে আগ্রহী তাদের এ বইটি পড়ার আমন্ত্রণ রইলো।
বইটির কাহিনি গড়ায় কোলকাতা-নবদ্বীপ লাইনের একটি ছোট্ট স্টেসন "খামারগাছা" থেকে, তারপর থেকে লেখকের লেখনীর মুন্সীয়ানায় নানা ফ্যান্টাসি আর রোমাঞ্চে ভর করে কাহিনি এগুতে থাকে। বইটিতে টেকনিকাল টার্ম আছে প্রচুর তবে তার জন্যে লেখাটির স্বাদ নিতে বেগ পেতে হয়না। আরো একটি কথা- বইটির সংলাপ গুলো পড়ে আমার মনে হয়েছে এই বইটির সংলাপগুলো একটি সায়েন্স ফিকসন সিনেমার জন্যে অতি উপযুক্ত। যেহেতু কাহিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংগঠিত হয়েছে ঘরের ভেতর তাই সিনেমার পরিচালককে খুব একটা বেগ পেতে হবেনা চিত্রায়ণ করতে।
বাংলা মৌলিক কল্পবিজ্ঞানে এক ঘেয়েমির ঘেরা টোপ থেকে বেড়িয়ে ভিন্নতার স্বাদ পাওয়া যায় কালে ভদ্রেই । “নক্ষত্রের ঝড়” সব দিক থেকেই চিন্তার উদ্রেককারী । তবে শেষ পর্যন্ত তাকে তো আর নির্জলা বিজ্ঞান আলোচনা হলে চলে না, তাতে কল্পনা আর গল্পের মজাটা থাকা চাই । নক্ষত্রের ঝড়ের শুরুটাও ঝড়ের মতই । প্রথম দিকেই ঘটনার আকস্মিকতা আর চড়াই-উতরাই স্নায়ুর উপর চেপে বসে ঠিকি । শুরুটাতেই দ্বিপেন বাবু তার পাঠকদের পেয়ে বসবেন । কিন্তু, এরপর ঘটনাপ্রবাহ আর তার কার্যকারণের ব্যাখ্যা নিয়ে যদি বলতে হয় তবে তা যে সর্বসাধারণের গিলে খাওয়ার মত বস্তু তার দাবী করা যায় না । এখানে উঠে এসেছে আধুনিক কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের নিগূঢ়তম সব রহস্য আর প্যারাডক্স । বর্তমান সময়ে অগ্রসর বিজ্ঞান পাঠক বা সচেতন নাগরিক মাত্রই কণা-তরঙ্গ দ্বৈততা, কোয়ান্টাম এন্টেংগেলমেন্ট, এমন কি মানব চেতনা(কনসাসনেস)’র প্রতি কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে ওয়াকিবহাল । কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের জোরেই আমরা জানতে পারি যে, শুধু মাত্র চৈতন্য বা চেতনাসম্পন্ন কোন সত্তার পর্যবেক্ষণের ফলে, এমনকি তার পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনার বিষয় আমলে নিয়ে আমাদের আশপাশের ভৌতজগত আচরণ করে বা তার আচরণ বদলায় । যেমন ফোটনের পর্যবেক্ষণের সাপেক্ষে কণা বা তরঙ্গের রূপে আচরণের প্রবণতা । আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এমনসব বিষয়কে উপজীব্য করেই গড়ে উঠেছে এই বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর পটভূমি । তবে শুরুর টানটান ঘটনাপ্রবাহের পরপরই ক্রমাগত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার উন্মোচনে খানিকটা হতাশ হতে হয় । গল্পের মজার পারদ নেমে গেলে যেমনটা লাগে ঠিক তাই । গল্পের মূল বিষয়টা বিকশিত হলেও চরিত্রগুলি বিকশিত হবার সুযোগ পায় নি । বিকশিত হবার প্রয়োজনও হয়তো ছিল না । লেখক নিজে জ্যোতির্বিদ এবং বিজ্ঞান সংগঠক । আগের কল্পকাহিনীগুলো (দিতার ঘড়ি, বার্ট কোমেনের ডান হাত বা অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো) পড়েই ভিন্নতার স্বাদ পাওয়া গিয়েছিল । বাংলা কল্প বিজ্ঞানে এমন দার্শনিক চিন্তার ছোঁয়া খুবি বিরল । তাই তার কাছ থেকে এমন একটি নিখাদ কল্প বিজ্ঞান অপ্রত্যাশিত ছিল না মোটেই । তবে আমরা সৌভাগ্যবান । কারণ, বাংলায় আমরা এমন একটি কল্পকাহিনী পড়তে পারছি । এই জন্য দ্বিপেন ভট্টাচার্য ধন্যবাদ পেতেই পারেন ।
বড় সাহিত্যিকের মত উপস্থাপন সুন্দর নয় তাই ঠিক ভক্ত হতে পারলাম না।গল্পে আন্তরিকতার অভাব ছিলো না তাই পড়ে শেষ করা গেছে। তবে বিষয়বস্তু খুবই অসাধারণ ছিলো! বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের চিন্তার খোরাক হতে পারে বইটি।