জানবার কথা শিখতে তো ছেলেমেয়েরা ইস্কুলে যাচ্ছে। তাদের আবার 'জানবার কথা' কেন? একটি সাদামাটা জবাব আছে। ইস্কুলের বই ছাড়াও ছেলেমেয়েরা আরো কিছু কিছু বই পরতে চায়। পড়েও। ইস্কুলেও পড়ে, ইস্কুলের বাহিরেও পড়ে। আমরা ইস্কুলের আঙিনার বাইরেই ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসর জমাতে চেয়েছি। এ-আসরে বোঝা না বোঝার সঙ্গে পাস-ফেলের সম্পর্ক নেই। ওরা তাই সহজ হয়ে শুনছে, আমরাও সহজ করে বলছি। বিদেশী বুক অফ নলেজ ধরনের বইগুলির মতো 'জানবার কথা' প্রধানতই পাতা উলটে ছবি দেখবার বই নয়। ছবির বই এর পড়াবার বই-দুইই। এতো হাজার বছরের চেষ্টায় মানুষ যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা পেয়েছে তারই সারাংশ সহজ করে বলা হয়েছে 'জানবার কথা'য়।
দেব্রীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (English: Debiprasad Chattopadhyaya) ভারতের কলকাতায় ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ভারতের একজন প্রখ্যাত মার্ক্সবাদী দার্শনিক। তিনি প্রাচীন ভারতের দর্শনের বস্তুবাদকে উদ্ঘাটন করেছেন। তাঁর লেখাগুলো একাধারে দর্শন ও বিজ্ঞানের সমন্বয়। এছাড়াও তিনি প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানের ইতিহাস ও বিজ্ঞানের পদ্ধতি সম্পর্কেও গবেষণা করেছেন। তিনি ১৯৯৩ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
ছোটদের জন্য বিজ্ঞান নিয়ে কিছু লিখতে চাইলে দেবীপ্রসাদেকে আদর্শ হিশেবে ধরে নেওয়ার বিকল্প নেই মনে হয়। প্রথমেই বিভিন্ন মৌলিক প্রশ্নের মাধ্যমে কৌতূহল সৃষ্টি করে এরপর এক এক করে সব রহস্যের বৈজ্ঞানিক উত্তর পেশ করা- এভাবেই বিজ্ঞানকে পৌছানো উচিত ছোটদের কাছে। পাঠ্যপুস্তকের গৎবাঁধা মুখস্থ কথা ছোটদের বিজ্ঞানের প্রতি আকর্ষিত করার পরিবর্তে বরং তাদের বিজ্ঞানভীতি বাড়িয়ে দেয় বলেই মনে করি।
বইটি যখন লেখা হয়েছিল তারপর বিজ্ঞান আরও অনেক দূর এগিয়েছে। কোন হিতৈষী ব্যক্তি যদি এই বইটির আদলে বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক অগ্রগতি সংযোজন করে বইটির একটি পরিমার্জিত রূপ প্রকাশ করেন, তাহলে সেই ব্যক্তির প্রতি ছোটরা তো বটেই, সমগ্র জাতিই কৃতজ্ঞ থাকতেন।
ছোটদের জন্য বেশ চমৎকার একটি বই।খুব সহজ-সরলভাবে সুন্দর ভাবে সব কথা বর্ণনা করা।বইটি যখন প্রথম প্রকাশ করা হয়েছিল সেই সময় অনুযায়ী ছবিগুলোও দৃষ্টিনন্দন।মানুষের আগমণের ইতিহাস খুব সুন্দরভাবে ধারাবাহিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এখন অনেক কিছু পরিমার্জিত হয়েছে,অনেক কিছুর পরিষ্কার ধারণা পেয়েছি আমরা।সেই সময়ের বিজ্ঞান অনুযায়ী বইটি বেশ ভালোভাবেই লেখা হয়েছে।তবে আমার মনে হয় আজকালকার ছোট ছেলেমেয়েরা পড়তে পড়তে কিছু জায়গায় থমকে যেতে পারে।পরিমার্জিত সব কিছু সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হলে তারা পড়তে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে।অবশ্য বইয়ের প্রথমে কিছু কিছু পরিমার্জিত তথ্য সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে।তবে আমার মনে হয় সেটা যথেষ্ট নয়।ছোটদের তারপরেও পড়তে পড়তে কিছু কিছু জায়গায় বিভ্রান্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।আর বইটির শেষের দিকে আমার একটু বিস্তারিত বর্ণনার ঘাটতি লেগেছে।শেষের দিকে পড়ে কারো কারো মনে হতেই পারে যে প্রকৃতির হয়তো চেতনা আছে।কারো কারো মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে "প্রকৃতি কি তাহলে ইচ্ছে করেই এসব করে?ইচ্ছে করেই কি আমাদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ দেয়?আমরা তো প্রায় সব চ্যালেঞ্জ জয় করে ফেলেছি।তবে কি প্রকৃতি কোনো একদিন হোমো স্যাপিয়েন্সদের বলবে 'সব কিছুই তো হলো এখন আকাশে উড়ে দেখাও তো!দেখি তোমার দৌড় কত দূর!' তখন কি আমাদের ডানা গজাবে?" শেষের দিকে পড়ে কারো কারো এরকম ভুল ধারণা জন্মাতেই পারে।সে হয়তো ভাববে প্রকৃতির সত্যিই বুঝি চেতনা আছে।সে ইচ্ছে করেই আমাদের একের পর এক চ্যালেঞ্জ দিয়ে যাচ্ছে আর আমরা সেই চ্যালেঞ্জ জয় করার জন্য ধীরে ধীরে বিবর্তিত হচ্ছি।কিন্তু আসলে প্রকৃতির কোনো চেতনা নেই।এজন্য আমার মনে হয়েছে আরো কিছু বিষয় ক্লিয়ার করার দরকার ছিল।আমি জানি বিবর্তনতত্ত্ব বেশ গভীর একটি আলোচনার বিষয়।এই তত্ত্ব নিয়ে হাজারো গুজব ছড়িয়ে আছে চারিদিকে।অনেক বিস্তারিত বিষয়।সংক্ষেপে সব বোঝানো যাবে না।তবুও আমার মনে হয় আরো একটু বিস্তারিত বর্ণনার দরকার ছিল।কিছু কিছু ছোট প্রশ্নের উত্তর সংক্ষেপে ক্লিয়ার করাই যায়।এছাড়া ওভারঅল মোটামুটি ভালোই লেগেছে বইটি।
যারা বিজ্ঞান পড়েছে, আর যারা বিজ্ঞান পড়ে নি–সবার জন্যেই। এত মৌলিক রচনা ছোটদের জন্য হতে পারে, ভাবাই যায় না! কতটা আন্তরিক হলে সে যুগের কষ্টকর ছবি ছাপার প্রক্রিয়ায় এতগুলো ছবি সংযুক্ত করেছিলেন তাঁরা! তাই বর্তমান প্রকাশকগণকে অনুরোধ করব, ছবিগুলো স্পষ্ট পাওয়া না গেলে নতুন করে এঁকে দেওয়ার জন্য।