রকিব হাসান বাংলাদেশের একজন গোয়েন্দা কাহিনী লেখক। তিনি সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তিন গোয়েন্দা নামক গোয়েন্দা কাহিনীর স্রষ্টা। তিনি মূলত মূল নামে লেখালেখি করলেও জাফর চৌধুরী ছদ্মনামেও সেবা প্রকাশনীর রোমহর্ষক সিরিজ লিখে থাকেন। থ্রিলার এবং গোয়েন্দা গল্প লেখার পূর্বে তিনি অন্যান্য কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি রহস্যপত্রিকার একজন সহকারী সম্পাদক ছিলেন।রকিব হাসান শুধুমাত্র তিন গোয়েন্দারই ১৬০টি বই লিখেছেন। এছাড়া কমপক্ষে ৩০টি বই অনুবাদ করেছেন। তিনি টারজান সিরিজ এবং পুরো আরব্য রজনী অনুবাদ করেছেন। তাঁর প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ ড্রাকুলা। রকিব হাসান লিখেছেন নাটকও। তিনি "হিমঘরে হানিমুন" নামে একটি নাটক রচনা করেন, যা টিভিতে সম্প্রচারিত হয়।
আমার জন্মদাত্রী জননী জটিল ছিলেন, জটিল আছেন। অনেক আগে কেউ একজন তাঁর মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে যে রাস্তার প্রত্যেক গলির মোড়ে তার ছেলে-মেয়েদের চাপা দেওয়ার জন্য অন্তত একটা-দুটো ট্রাক অপেক্ষা করে। বলা বাহুল্য সেই থেকে আমরা কখনো তার চোখের আড়াল হই নি। তিনি হতে দেন নি।
আমরা বলা যায় গ্রামেই থাকতাম। বাসার বিপরীতে বিশাল মাঠ, সেখান থেকে সমবয়সীদের খেলার আওয়াজ পেতাম। এতটুকুই। এমন কোন বিকেল আমার মনে নেই, যে বিকেলে আমি ঘর থেকে বের হয়ে একটু খেলেছি। বিশ্বাস করা যায়? প্রায় ১৭ বছর কাটিয়ে দিলাম এক বিকেলেও না খেলে! আমার এ মাথার উপর বাতাস কখনো গান গেয়ে যায় নি, আমার পায়ে কাদা লাগুক জননী সেটা চান নি। শৈশব বলতে আমার কিছু নেই।
অনেক পরে, যখন চামড়া ঝুলে যাবে, মৃত্যুর ছায়া লেগে থাকবে চোখে, আফসোস(!) , আনন্দে ঘুরে তাকাবার মত আমার কোন স্মৃতি নেই। আমি হয়তো তখন এই বইটা আবার হাতে নিব। নিজে যা কখনো না পেয়েও হারিয়েছে, অন্যের চোখ দিয়ে সেটারই শখ মেটাবো। এখন থেকে হয়তো অনেক বছর পরে...
বইটা পড়তে পড়তে যেন অন্য কোন এক জগৎ এ হারিয়ে গিয়েছিলাম। মার্ক টোয়েনের টম সয়্যার আর হাকলবেরি ফিন পড়ার সময় একধরণের হতাশা বোধ কাজ করেছিল। মনে হচ্ছিল, জীবনে একবার যদি দ্বীপান্তরীই না হতে পারলাম, শেষরাতে ফিরে এসে নাই দেখতে পারলাম যে আমাকে হারিয়ে মা বাবার কোন অনুশোচনা হচ্ছে কিনা, এসব না করেই বড় হয়ে কি লাভ! এই অনুভূতি গুলো আরো একবার ফিরে এলো রকিব হাসানের এই স্মৃতিকথা পড়তে গিয়ে। বইটা লেখকের শৈশব আর কৈশোরকাল নিয়ে লেখা। তাই, ঘটনাগুলো যখন কেউ পড়বে এখনকার সময়ের সাথে সে সময়ের ফারাকটা আবিষ্কার করে তার খানিকটা বিমর্ষ হয়ে ওঠাটা অস্বাভাবিক কিছু হবেনা। হ্যা, ছেলেধরার ভয় বাচ্চাকাচ্চাদেরকে তখনকার মা রাও দেখাতেন। কিন্তু এখনকার সবকিছু যেমন একটা বদ্ধ আর গুমোট ঘরের মত আবদ্ধ, চারদিকে ঘৃণা আর অবিশ্বাসের ছড়াছড়ি, তার সাথে মনে হয়না সেসময়কার পরিবেশের কোন তুলনা দেয়া চলে! তাই লেখক যখন তার চোখ যেদিকে যায় সেদিকে হারিয়ে যাওয়ার কিংবা গ্রামের পুকুরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাঁতার কাটার গল্প করেন তখন একটু হিংসা-ই হয় বৈকি! তবে এই সুখস্মৃতি গুলোর সাথে খুব করে নাড়া দিয়ে গেছে মানুষের অমানুষিকতার গল্প গুলো। জন্ম হওয়ার পরে মানুষ কখন থেকে অমানুষ হতে শুরু করে? কেন একজনের হৃদয় এতটা শক্ত হয়ে যাবে যে বিনা কারণে একটা মানুষ কিংবা অবলা একটা পশুকে মেরে ফেলতে কারো কোনো দ্বিধাবোধই কাজ করবেনা? মনটা নরম থাকতে থাকতেই সবাইকে যদি এই বইগুলো পড়িয়ে একটু মানবিকতার শিক্ষা দেয়া যেত তবে বেশ হতো! রকিব হাসানের বই একসময় গোগ্রাসে গিলেছি। সেবা প্রকাশনীর বইএর লিস্টি ধরে একটার পর একটা ক্রমানুসারে শেষ করেছিলাম। রকিব হাসানতো আমার দৃষ্টিতে একটা সময় পর্যন্ত পৃথিবীর সেরা লেখকই ছিলেন! তবে সেই মোহভঙ্গ হয়েছিল যখন দেখলাম বেশিরভাগ বইগুলোই ইংরেজী বইএর লাইন বাই লাইন অনুবাদ। মিথ্যা বলবোনা, একটু মনঃক্ষুণ্নই হয়েছিলাম। কিন্তু আজ এতদিন পরে প্রিয় লেখকের লেখা গুলো পড়ে ভালো লাগল। লেখকের এরকম আরো কিছু বই থাকলে ভালো হত।
চমৎকার! কিন্তু একটা ব্যাপার মিসিং - তাঁর বই পড়ার ব্যাপারটা, এক জায়গায় শুধু উল্লেখ আছে বই পড়ার কথা, ওইটুকই। কোথাও একটা সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলেছেন যে আগ্রাসী পাঠক ছিলেন,হয়তো কৈশোর পার হবার পর বেশী পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। লেখক যে আসলে বড় পাঠক এটাই পড়ে জানতে ইচ্ছে করে বেশী।
রকিব হাসান। আমাদের কৈশোর রাঙানো তিন গোয়েন্দার লেখক রকিব হাসানের আনন্দ বেদনার কৈশোর। মফস্বল শহরের আর পাঁচজন কিশোরের জীবনের গল্পই এটা। নস্টালজিক লেখা। কাজল কালো পানির দীঘি,পাখি মারা কিংবা ফড়িং আর চৈত্রের দুপুরে বাউণ্ডুলেপনা।
যার লেখা পড়ে আমি পাঠক, তিন গোয়েন্দা সিরিজের লেখক রকিব হাসানের কৈশোর নিয়ে বইটি। প্রিয় লেখকের ছোটবেলা নিয়ে জানার আগ্রহ ছিল অনেক আগে থেকেই, সেজন্যই অনেকদিন ধরে বইটা পড়ার ইচ্ছা ছিল। অনেক চেষ্টার পর বই ম্যানেজ করে অবশেষে পড়া হল। অল্প পরিসরে লেখকের ছোটবেলা নিয়ে লেখা বইটা ভালো লাগলো।
বইটিতে উঠে এসেছে লেখকের শৈশব আর কৈশোরের কিছু স্মৃতি। সেসময়ের ভালোলাগা, মন্দলাগা, ব্যক্তিক্রম কিন্তু বাস্তব কিছু অভিজ্ঞতা। আরও আছে কিছু গালগল্প, নানী-মা এর মুখে শোনা অদ্ভুত কিছু ভৌতিক বর্ণনা, যা বর্তমান যুগে এসে অযৌক্তিক বোঝা গেলেও তখনকার সময়ে লেখককে দারুণ ভাবিয়েছে। তার মানসিকতা কে নিয়ন্ত্রণ করেছে অদৃশ্য উপায়ে।
আছে কিছু হাসির গল্প, মিষ্টি খাওয়া, ইনজেকশন, প্রভৃতি নিয়ে কিছু কথা। কিংবা বন্ধুর সাথে খুনসুটি। তাদের মধুর রেষারেষি। পরস্পরকে একহাত দেখে নেবার প্রচেষ্টা, কিন্তু তবুও বন্ধুত্বে কিছুমাত্র খাদ নেই।
মানুষের টুকরো টুকরো বীরত্ব উঠে এসেছে ঘটনাচক্রে। একজন আপাত বাউন্ডুলে মানুষও যে বিপদের মুখে কি অবলীলায় ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে তা লেখকের মতো আমাকেও মুগ্ধ করেছে। বড়রা যে সবসময় সঠিক মানুষ চিনবে তেমন না, অনেক সময় ছোটারাও জেনে ফেলতে পারে একটি দুটি গোপন অধ্যায়, আর সেগুলোই পরিচিতদের স্বভাবকে তাদের চোখে মহান করে তোলে।
কিছু কিছু জায়গায় দারুণ কষ্ট লেগেছে। বুকে হাহাকারের মতো বাঁশির সুর বেজে উঠেছে। লেখকের বাবার মৃত্যুকে ঘিরে লেখাটুকুতে বিশেষ করে। আরও স্পষ্ট দেখা গেছে মানুষের চরিত্রের নির্মম দিকগুলোর প্রদর্শন। একটি নিরীহ কাঠবেরালিকে তারা কতো অবলীলায় মেরে ফেলতে পারে, কুকুরকে বিষ মাখানো খাবার খাইয়ে নিধন করে। অথচ কুকুরের নারী সঙ্গীটি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকে, পচে গলে যাওয়া লাশটার কাছে রোজ আসে, যতদিন না নিজের মৃত্যু ঠিক একই স্থানে বরণ করে না নিতে পারে। পশুর-পাখির মধ্যে যে সহানুভুতি আছে, তা কি আদেও আছে মানুষের মাঝে? তারা একটা মানুষকেও সামান্য কিছু কাপড় চুরি করার অপরাধে, বাঁশের সাথে বেঁধে বেদম পেটায়। সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ, যার এই চুরিতে কোনও ক্ষতিই হয়নি, সেও একহাত নিতে ছাড়েনা। বেঁধে রাখা মানুষটাকে মারে নির��বিচারে, এমনকি তার গায়ে ছুরি/ব্লেড দিয়ে ক্ষত করার পরামর্শ দিতেও এতটুকু বাঁধেনা। আমরা এতো নির্মম কেন?
এর উত্তর লেখকের কাছে নেই। লেখকের বাবাও এর উত্তর বাৎলে দিতে পারেনা। হয়তো আমরা কেউই পারবোনা। প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে পারলেই আমাদের চলে, তাতে কার কি ক্ষতি হল সেসবে দেখার কি দায় পড়েছে আমাদের?
তবে সব কিছু ছাপিয়ে লেখক লিখেছেন রবীন্দ্রনাথের অমোঘ শব্দরাজি, "দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায়, রইল না ..."
মানুষ বেঁচে থাকবেনা অনন্তকাল, মৃত্যুই আমাদের অন্তিম পরিণতি। হারিয়ে যাওয়া দিনেও ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। জন্ম থেকে কেবল এগিয়ে যেতে হবে সম্মুখে, কখনও বলিষ্ঠ পায়ে হেঁটে, কখনও হাচরে পাঁচরে হামাগুরি দিয়ে, কখনও গড়িয়ে গড়িয়ে। এগিয়ে যেতে হবে ততদিন যতদিন আমাদের ছুটি না হয়। শুধু ফেলে আশা জীবনের মুহূর্তগুলো জীবন্ত থাকে স্মৃতির মণিকোঠায় ভবিষ্যতের পাথেয় হয়ে।
যাই হোক, বইটা পড়ে ঠিক কতটা ভালো লাগলো আশাকরি তা পরিষ্কার হয়ে গেছে এর মধ্যেই। তবে সঙ্গে কিঞ্চিৎ আফসোসও হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের এতো বলিষ্ঠ একজন লেখক কেন আরও আরও সামাজিক আর মৌলিক গল্প লিখলেন না। কেন কেবল অনুবাদ আর বিদেশী গল্প অবলম্বনে লেখায় অধিক গুরুত্ব দিলেন?!! এ অন্যায়, ঘোর অন্যায়!
কেমন ছিলো আমাদের পছন্দের তিন কিশোরের স্রষ্টার কৈশোর? জানার জন্য আগ্রহ হয় বইকি। তাই বইটির খোঁজ জানার সাথে সাথেই পড়ে ফেললাম। ছোট্ট মিষ্টি একটা বই। সুললিত ভাষায় রকিব দা লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর সোনাঝরা শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোর স্মৃতি। রকিব দার বাড়ি যে ফেনীতে তা আমরা নিশ্চয়ই জানি। সেখানেই কেটেছে তাঁর ছোটবেলাটা। আমাদের প্রিয় রকিব দা ছোটবেলায় ছিলেন ভীষণ ডানপিটে৷ এহেন দুষ্টুমি নেই যাতে তাঁর আগ্রহ ছিলো না। তিনি যে মুসার মতোই পানিপাগল ছিলেন তা কি আমরা জানতাম? পানির নিচে মুসার মতোই অদৃশ্য শক্তিকে ভয় পেতেন তিনি। একবার পায়ে সত্যিই কলস আটকে গেছিল, তবে তা কোন দৈত্য-দানোর কলস নয়। গাঁয়েরই এক সাধারণ মানুষের হারিয়ে যাওয়া কলসি। রকিব দার মা ছিলেন খুব রাগী, প্রায়শই নানান দুষ্টুমির জন্য শলার ঝাড়ুর বাড়ি পড়তো তাঁর পিঠে। কি, মেরিচাচীর কথা মনে পড়ে না? রকিব দা স্বপ্ন দেখতেন আফ্রিকার, দূর-দূরান্তে কিংবা অজানা জিনিস জানার অদম্য কৌতূহল ছিল তাঁর। এর ফলেই হয়তো বড় হয়ে আমরা তাঁকে তিন গোয়েন্দার লেখক হিসেবে পেয়েছি। যদিও তিন গোয়েন্দা অনুবাদ, কিন্তু রকিব হাসানের বেশ মৌলিকত্ব মিশে রয়েছে তার মধ্যে। চাইলে রকিব দা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক হতে পারতেন। সে ক্ষমতা তাঁর ছিল। কেন তিনি মৌলিক রচনা এতো কম লিখলেন কে জানে। পাঠকসমাজের জন্য এটা রীতিমতো দুঃখের।
কিংবদন্তি লেখক রকিব হাসান। বাংলাদেশে বই পড়ে,কিন্তু ওনাকে চেনে না,এ অসম্ভব! ওনার ছেলেবেলা, কিশোর বয়সের আনন্দ বেদনা গুলো লেখা আছে এই বইটিতে। এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মত বই। লেখককে নতুন করে চেনার মত বই এটি...
তোমার শাড়ি পড়া মূর্তির মতো সুন্দর দৃশ্য আমি কখনো দেখিনি। এভাবে বলতে হয়, বইটা সুন্দর অসীম সংখ্যক নীরব জোছনা নিয়ে।
'আমার কৈশোর' বইটি আমার নস্টালজিয়া শৈশব আর কৈশোরের অবাধ্য এক যুবকের স্মৃতি টেনে এনে দেয়। পুকুরে মাঝে সাঁতার কাটা, বন্ধুদের সঙ্গে বাসায় না জানিয়ে ঘুরতে চলে যাওয়া যেন লেখক আমার সামনে আমাকে তুলে ধরেছেন।
একজন পাঠককে দুঃখিত, একই সাথে হাসাতে পারে এমন বই সত্যই বিরল। আবার সাথে লেখকের বলা প্রতিটি কথা চোখের সামনে ভাসিয়ে তুলতে পারা একজন লেখকের সার্থকতা।
লেখক এতে, তার ফেনী শহরের স্মৃতি আর নানার বাড়ির স্মৃতি বর্ণনা করেছেন অসাধারণত্ব দিয়ে। তার গুলতি দিয়ে পাখি শিকার করা, তরমুজ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়া যেন এক শিশুর শৈশবের মধুর স্মৃতি। মারবেল খেলা আবার মাছ শিকার করা চুরি করে শিশুদের জন্মগত অধিকার যেন। এছাড়া তার দাদুর কাছে শোনা মেছো ভূত, শাকচুন্নির গল্প তার শৈশবে পুরোটা জুঁড়ে নঁকশি কাঁথা বানিয়েছে স্মৃতির।
পাঠককে উদ্বেলিত আর কৌতূহলী করতে এই বইয়ের জুঁড়ি মেলা ভার। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও অর্থেনটিক তার গল্প বলা।
মধ্যরাত। খট খট শব্দ হচ্ছে। টাইপরাইটারের শব্দ। রকিব হাসান টাইপরাইটারে লিখছেন। লিখছেন তিন গোয়েন্দা। নিজের হাতের লেখাটা তাঁর পছন্দ না। তাই বাংলা টাইপরাইটার কিনে নিয়েছেন। একটা টাইপরাইটার থাকে বাসায় অন্যটা সেবা'র অফিসে। তাঁর লেখালেখিটা পুরো রাত জুড়েই চলে। মাঝে মাঝে লিখতে লিখতে রাত কেটে ভোর হয়ে যায়। তিনি লেখা শেষ না করে ঘুমুতে পারেন না। রকিব হাসানের টেবিলের পাশেই ঢাকা দেয়া চায়ের কাপ। তিনি চায়ের কাপে ছোট্ট চুমুক দিলেন। লেখাটা দাঁড়িয়ে গেছে। তিনি অনেকটা হাল্কা বোধ করলেন। লেখালেখির সময় তাঁর আশেপাশে কেউ থাকেনা, নয়তো দেখতে পেত রকিব হাসানের ঠোঁটের কোণে শিশুর সারল্য মাখা হাসি। রকিব হাসান চোখ থেকে চশমাটা খুলে পরিষ্কার করতে করতে বারান্দায় চলে এলেন। নিস্তব্ধ রাত। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। আজকের লেখাটা লিখতে গিয়ে তিনি নিজের ছেলেবেলায় চলে গিয়েছিলেন। তাঁর নানুবাড়ি ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার নবীনগরের ইব্রাহিমপুর গ্রামে। ছুটিছাটায় প্রতিবছরই মায়ের সঙ্গে যেতেন সেখানে। সকালে নানুবাড়ি যাবেন-- এই কথা ভেবেই তিনি ছটফট করতেন। উত্তেজনায় সারারাত ঘুম হতো না। আজ এতো বছর পর ছেলেবেলায় ফিরে যাবার জন্য যেন মনটা তেমন করেই ছটফট করছে। মধ্যরাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রকিব হাসান নানুবাড়ির পথে চলে গেলেন। সেই কুয়াশা, শীত, ঘোলা পানির খাল, ফসল কেটে ফেলা রুক্ষ ধানক্ষেত। নানুবাড়ি রকিব হাসানের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল তাঁর মামাত ভাই হাবিব, আর খালাত ভাই অলি। সে সময়গুলো কী দ্রুত কেটে গেছে ভেবে অবাক হন তিনি। কতো ছোটাছুটি আর হই-হুল্লোড়ই না করতেন তিনজন! ছোটমামাতো একবার তিনজনের নামই দিয়ে ফেললেন "ত্রিরত্ন"। নিজের অজান্তেই শব্দ করে হেসে উঠলেন তিন গোয়েন্দার জনক। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন, এই বোধ হতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদুস্বরে উচ্চারণ করলেন, সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি...
যে লেখক অজস্র মানুষের কৈশোর রঙিন করেছেন সে লেখকের নিজের কৈশোর কেমন ছিল? এমন প্রশ্ন হয়তো অনেকের মনেই জেগেছে। রকিব হাসানের সেই দুরন্ত কৈশোর খুঁজে পাওয়া যাবে ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত তাঁর "আমার কৈশোর" নামক বইতে। ধ্রুব এষ বইয়ের প্রচ্ছদে কিছু রঙিন সুতোর খুবই সাদামাটা অথচ গভীর ছবি এঁকেছেন। প্রতিটি মানুষইতো নিজের রঙিন শৈশবকে নিতান্ত অনিচ্ছায় ফেলে আসেন। আমার কৈশোর বইতে নিজের কৈশোরের ফেলে আসা দিনের স্মৃতি রোমন্থন করেছেন রকিব হাসান। ফেনী শহরে তাঁর বেড়ে ওঠা, বিকেলবেলা দীঘির পাড়ের দাদুর সঙ্গে গল্প করা, বই পড়া, দুপুরের কড়া রোদে সাঁতার কাটা, বনের ভেতর বন্ধুদের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া..নিজের ফেলে আসা কৈশোরের সেইসব বর্ণময় স্মৃতিগুলো রঙিন সুতোয় গেঁথে গেঁথে রকিব হাসান তৈরি করেছেন-- আমার কৈশোর।