সি. এস. লিউইস-এর জগদ্বিখ্যাত কাহিনী "দ্য ক্রনিকলস অফ নারনিয়া" কিশোরদেরকে নিয়ে যায় অজানা এক জাদুর দেশে। সেখানে গাছপালা হেঁটে বেড়ায়, জলপরী-গাছপরীরা দল বেঁধে নাচে, পশুপাখি কথা বলে, দৈত্য-দানোরা মানুষের সাথে বন্ধুত্ব পাতায়, একের পর এক রহস্যময় ঘটনা কল্পনাকেও হার মানায়। লিউইস-এর সেই কাহিনী অবলম্বনে বাংলাদেশের কিশোরদের জন্য এদেশী পটভূমিতে রচিত হয়েছে "সিংহ আর ডাইনী"।
চার ভাই বোন। এক গবেষক প্রফেসরের বাড়িতে ক'দিনের জন্য থাকতে এসে ওদেরই একজন খুঁজে পেল একটা ওয়্যারড্রোব। যার পেছন দিয়ে গুপ্ত পথ চলে গেছে জাদুর দেশ আর্জেনিয়ায়। সেখানে পশুরাও কথা বলতে পারে, কিন্তু মানুষের বসবাস নেই। দেশের শাসন দখল করেছে এক ডাইনি, ও পাথর বানিয়ে ফেলে সবাইকে। তারই মন্ত্রবলে তুষারপাতে ছেয়ে আছে দেশ, কণকনে শীত থাকে বারোমাস।
কি হল সে জাদুর দেশে? ছোট ছোট চার ছেলে মেয়ে কি পথ ভুলে সেখানে উপস্থিত? নাকি সবই মহান কোনও জাদুর খেলা। এ সবই আছে "সিংহ আর ডাইনীতে"।
মাত্র দুটি বই দিয়েই এ.টি.এম. শামসুদ্দীন আমার চোখে সেবার অন্যতম প্রিয় অনুবাদক হয়ে উঠেছেন। বইদুটো হল মানিকজোর এবং যমঘরে বন্দী। এছাড়া সেবার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুবাদের মধ্যে ভদ্রলোকের অনূদিত "ত্রি-রত্নের নৌবিহার" বইটি রয়েছে। গতকাল সেবাতে গিয়ে তাই বিখ্যাত কিশোর ফ্যান্টাসি উপন্যাস সিরিজ "দ্য ক্রনিক্যালস অফ নারনিয়া"র কাহিনী নির্ভর সিরিজ "আর্জানিয়া"র পাঁচটি উপন্যাস নিয়ে এলাম নির্দ্বিধায়। কেননা লেখক প্রিয় এ.টি.এম. শামসুদ্দীন।
ভদ্রলোকের লেখার/অনুবাদের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে তা সরাসরি রূপান্তর নয়। বরং একটি বিদেশী গল্প সম্পূর্ণ দেশে পটভুমিকার ছাঁচে ফেলে তৈরি করাতে তার জুড়ি নেই। ধরা যাক একটি ঘটনা ঘটেছে ইংল্যান্ডের কোনও এক অভিজাত শহরে সেখানে হিরো ডন পেরি। সেই গল্পই লেখক এমনভাবে বলে যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাবলুকেই দিব্যি মানিয়ে যাবে সেই চরিত্রে দেশী পরিবেশে।
এই গল্পেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। লেখার স্টাইল কিংবা অ্যাডাপশনের কৌশল নিয়ে বিন্দুমাত্র অভিযোগ তোলার অবকাশ নেই। নারনিয়া'র আর্জানিয়া হয়ে ওঠা নিয়েও সমস্যা হয়নি। সেসব বিদেশী চরিত্র বদলে দেশী হয়েছে তাতেও আপত্তি ছিলনা। আপত্তি হচ্ছে গল্পটি কেটে ছেঁটে অত্যাধিক ছোট করার জন্য। অন্তত আমার তা-ই মনে হয়েছে। তবে যেহেতু আমি আসল গল্পটি পড়িনি তাই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছিনা। যদি আসল গল্পটিও অনুরূপ ছোট হয়ে থাকে, আর তার বর্ণনা অনুরূপ সংক্ষিপ্ত হয়, তবে "দ্য ক্রনিক্যালস অফ নারনিয়া" সিরিজটি আমার জন্য হতাশার নামান্তর।
যাই হোক। বই আরও চারটা আছে সিরিজে ... পড়ে ফেলব দ্রুত। এতটুকু বলতে পারি, রূপকথা প্রেমীদের মোটামুটি ভালোই লাগবে এই বই। আর গল্পে সামান্যতম জড়টাও নেই। দিব্যি উপভোগ করতে পারবেন। তবে হ্যা গল্পের কাহিনীতে আশা খুব বেশি নিয়ে ঢুকলে সম্ভবত হতাশ হবেন। আশা কম রাখুন, নারনিয়ার জনপ্রিয়তা মাথা থেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে বইটি পড়ুন, তাহলে সর্বাধিক আনন্দ পাবেন।
দেশের পটভুমিতে বিদেশী কাহিনী এতো সুন্দর করে বলা যে কি অসাধারন মুন্সিয়ানার পরিচয় দেয় লেখকের! আমি নিজেকে ভাগ্যবতীই মনে করি সেবার লেখকদের বই পড়তে পারায়।