ঐতিহাসিকের নোটবুক বিশিষ্ট ইতিহাস-গবেষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামের বাঙালি সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, জাতিসত্তা ইত্যাদির একটি ইতিহাসভিত্তিক বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধগ্রন্থ। নানা জটিল ঐতিহাসিক বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে সহজ-সরল ও আকর্ষণীয় ভাষায়। প্রতিটি প্রবন্ধ আকারে ছোট কিন্তু চিন্তায় গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। লেখক একজন ঐতিহাসিক হলেও এ গ্রন্থে তিনি একজন ইতিহাস-বিশ্লেষণী গল্পকার। ইতিহাসের জটিল বিষয়কে তিনি গল্পের মতো করে সাজিয়েছেন, তবে কাল্পনিকভাবে নয়, সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে। প্রবন্ধগুলো একাধারে শিক্ষণীয় এবং উপভোগ্য। লেখক আমাদের ঐতিহাসিক চিন্তাকে সমূলে নাড়িয়ে দিয়েছেন, ভিত্তিহীন প্রথাগত চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ইঙ্গিত দিচ্ছেন ইতিহাস বিষয়ে নতুন চিন্তা ও বিশ্লেষণের।
কয়েকটা প্রবন্ধ সত্যি চমৎকার। ঢাকার নবাব পরিবারের উত্থান ও পতন, কিংবদন্তীকে অগ্রাহ্য করে শেরে বাংলা ফজলুল হকের কর্মকাণ্ডের প্রস্থচ্ছেদ; কিংবা শ্যাম্পুর প্রবর্তক বিলেত অভিবাসী দীন মোহাম্মদের জীবন বৃত্তান্ত সম্ভবত এই বইয়ের সেরা অংশ। ঢাকা শহরের কালেক্টর হিসেবে ইংরেজ সাহেব ম্যাথু ডে-এর অভিজ্ঞতা, টিভি সিরিয়ালে অতিরঞ্জিত করা টিপু সুলতানের কৃতিত্বের নিরাবেগ বিশ্লেষণ সংক্রান্ত লেখা দুটিও ভালো লেগেছে।
কলাম ঘরানার কয়েকটা রচনা বইয়ের মূল সুরের সাথে যায়নি। এবং, কোনো আলোচনাতেই লেখক কোনো তথ্যসূত্র উল্লেখ করেননি, ফলে বইটি আগ্রহী পাঠক বা গবেষকদের কাছে ভবিষ্যতে সূত্র হিসেবে ব্যবহারের অনুপযোগী। একাডেমিশিয়ানদের রচনায়ও এ ধরনের শ্রমবিমুখতা বিরক্তি জাগায়।
ইতিহাস সহজ করে বলা এক জিনিস, ইতিহাস গল্পের মতো করে বলা আরেক জিনিস। কিন্তু এই দুটো জিনিসই আবার ভুলভাবে ধরে নেওয়া হয়। অনেকে ভাবেন সহজ করে বললে বোধয় অনেক কিছু বাদ দেওয়া হয়। আবার গল্পচ্ছলে মানেই সেখানে অনেক ছল আছে, সত্য কম। অথচ 'ইতিহাস' হিসাবে স্বীকৃত অনেক 'নন-ফিকশনেও' ফ্যাক্টের চেয়ে ফিকশন বেশি থাকে।
সিরাজুল ইসলাম তাহলে কোন তালিকায় পড়েন। তার কাজের পরিধি (ফ্ল্যাপ থেকে) দেখে বোঝা যায় তিনি একাডেমিশিয়ান এবং পুরোদস্তুর একজন গবেষক। কিন্তু যে কাজ তিনি করেন তা করতে গিয়েই হয়ত বুঝেছেন যে জটিল বয়ানের চেয়ে সহজ বয়ান মানুষের কাছে পৌঁছতে বা বোঝাতে সহায়তা করে। তাই তিনি পত্রিকায় যখন লেখেন তখন সে লেখায় রস থাকে। সেক্ষেত্রে তিনি 'সহজ করে' বলাই পছন্দ করেন। আর সহজ করে বলার মধ্য দিয়েও যে ফ্যাক্ট তুলে আনা যায় সেটাও সিরাজুল ইসলাম দেখিয়েছেন। বরং জনপ্রিয় ধারায় কথিত ইতিহাসের বাইরে তিনি যেভাবে আলো ফেলেন তা বিস্ময়কর। যেমন তিনি শুরুতেই ঢাকার নবাব পরিবারের উত্থান-পতন নিয়ে যে লেখাটি রেখেছেন সেখানে নবাবদের নবাবী নেই কিন্তু নবাবী কোথা থেকে শুরু হলো তার মূল পর্যন্ত গিয়েছেন। আর সে নবাবী কেমন করে শেষ হলো তারও সূত্র দিয়েছেন। এসবের মধ্যে তথ্য যা এসেছে তাও বর্ণনার মধ্যেই তিনি রেখেছেন।
নবাবদের ইতিহাসে আঙুল তোলার মতো তেমন কেউ নেই কিন্তু 'আমাদের হক সাহেব'কে নিয়ে, বিশেষত তার গুণকীর্তন বাদ দিয়ে, লিখলে এখনও অনেকে লাফিয়ে উঠতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে কীর্তন না করার মানে আবার নিন্দা করা না। আবুল কাশেম ফজলুর হক যে আসনে উঠেছিলেন, সেই কিংবদন্তি অবস্থান থেকে তাঁর নিজেরই বারবার টলে পড়ার কথা তুলে খানিক ব্যবচ্ছেদ করেছেন এই বইয়ের লেখক এবং তা যুক্তিযুক্ত।
হক সাহেবের কথা থেকে অখন্ড কিংবা খন্ডিত ভারতের আরও অনেক নেতার কথায় আসা যায়। মোগল সম্রাট থেকে এখনকার প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত। সিরাজুল ইসলাম এখানে তাদের কথা বলার পাশাপাশি তাঁদের যে অবস্থানে রাখা হয় তা নিয়ে মানুষের মনোজগত নিয়ে আলোচনা করেন। 'খেতাব' অধ্যায়ে সেই মোগল আমল থেকে আজ অবদি নানা ভাবে মানুষের নামকে জাঁকালো করে তা জনপ্রিয়তার কাজে ব্যবহারের যে নজির এবং মনস্তত্ত্ব, তা বলার চেষ্টা করেছেন। 'ভারতের এই দশা কেন'? এমন প্রশ্নের উত্তরে যারা কেবল ইংরেজের দোষ ধরেন, তাদের নতুন করে ভারতীয়দের মনস্তত্ত্ব নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবেন সিরাজুল ইসলাম।
কেননা, নেতা বদলের সাথে সাথে আমাদের স্থান, স্থাপনার নামও বদলে যায়। 'রমনা' হয়ে যায় 'সোহরাওয়ার্দী উদ্যান'; 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা' নিয়ে আজও নানা রকম রাজনীতি চলে দলীয় কিংবা সাম্প্রদায়িক স্বার্থ রক্ষায়। আমাদের নেতৃত্ব সেখানে কীভাবে ব্যর্থ তা একজন নিপুণ বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে লিখেছেন সিরাজুর ইসলাম, এই বইয়ের 'রাষ্ট্রচিন্তায় বাঙালি নেতৃত্বের ব্যর্থতা' প্রবন্ধে।
এ ছাড়াও এই বইয়ে সন্নিবেশিত হয়েছে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির নানা আলোচনা। আছে 'পলাশীর যুদ্ধ', 'টিপু সুলতানের বীরত্ব', 'পূন্যাহ', 'নববর্ষ', 'বিলাতে শেখ দীন মোহাম্মদ'-এর বৃত্তান্ত। দেশ বিদেশের ইতিহাস-সংস্কৃতির নানা আলোচনার মোট ২২ টি প্রবন্ধ নিয়ে সিরাজুল ইসলামের এই বই যার মধ্যে কিছু কিছু গল্পচ্ছলে আর কিছু কিছু নিপুণ তাত্ত্বিকের মতো করে তিনি লিখেছেন। ইতিহাস, সংস্কৃতি নিয়ে আগ্রহী পাঠকদের জন্য সুখপাঠ্য হবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
অনেকদিন পরে কোনো বই শেষ করে নিজের অজান্তেই বললাম, বাহ বেশ তো!এভাবেও বুঝি লেখা যায় ইতিহাস?
বাংলাপিডিয়া খ্যাত ইতিহাসবেত্তা সিরাজুর রহমানের বাঙালি সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি আর ইতিহাসের কিছু অনালোচিত অংশকে আকর্ষণীয় করে লেখা দু'শ পাতার প্রবন্ধগুচ্ছের নাম " ঐতিহাসিকের নোটবুক "।
জ্ঞানচর্চার প্রথম দিককার ধাপ হলেও বাঙালির ইতিহাস ভীতি কিংবা অনাগ্রহ বড় বেশিই প্রবল - এই তেঁতো সত্যটি ভালো করেই জানেন ঢাবির ইতিহাসের শিক্ষক সিরাজুর রহমান। গৎবাঁধা অতীতের কেচ্ছা তিনি শোনাতে চান নি। তাই ভূমিকাতেই নিজের উদ্দেশ্য পরিষ্কার করেছেন এই বলে-
" এটা সত্য যে, টীকাটিপ্পনীর ইতিহাস সব পাঠক পছন্দ করেন না। তবে তাঁরা অবশ্যই অতীত ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে জানতে চান। ইতিহাস সবার জন্য। এ অনুভূতিতে আমি নিয়মিত না হলেও মাঝেমাঝে ইতিহাসমূলক লেখা বিভিন্ন সংবাদপত্র- সাময়িকীতে প্রকাশ করেছি।এগুলোর মধ্যে বাচাই করা কিছু লেখা এ প্রবন্ধ-সংগ্রহ গ্রন্থে সন্নিবেশিত হল। "
বহুবিচিত্র সব বিষয়কে পুঁজি করে নিজের কলম চালিয়েছেন সিরাজুর রহমান। প্রচলিত বইয়ের পাতার বেশকিছু রথী-মহারথীকে ফুৎকার দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন ঐতিহাসিকের নোটবুকে।
ঢাকার নবাবদের কথাই ধরুন না, এই বংশের উত্থান-পতনকে যেভাবে তিনি গল্পে গল্পে বলেছেন তা আসলেই দারুণ মজলিশী। তাঁর ভাষায়,
" দুটো নিলামের মধ্যে সময়ের ব্যবধান এক শতাব্দীর। প্রথম নিলাম সূচনা করে ঢাকা খাজা পরিবারের উত্থান, আর দ্বিতীয়টি এর পতন। "
নবাবি আর ব্রিটিশ আমলে বাংলা ছিল ভাগ্যান্বেষীদের এক অভয়আশ্রম বিশেষ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ সবাই এখানে ভাগ্য ফেরাতে হাজির হত। এখন যেমন আমাদের মানুষেরা সেসব দেশে পাড়ি জমাই ঠিক তেমন। এক ভাগ্যান্বেষীর নাম আবদাল হাকিম। তার জন্মস্থান কাশ্মীরে। পেশায় সে চর্মকার তথা চামড়া ব্যবসায়ী। বঙ্গদেশের লোকেরা অাবার চামড়ার ব্যবসাকে ভালো পেশা হিসেবে দেখত না। তাই অবাঙালি মুসলমান ও বিদেশীরাই চামড়া ব্যবসায় করত।
আবদাল হাকিমের নজর কিন্তু চামড়া ব্যবসায় না। সে ব্রিটিশ সাহেবদের পাইক, গোমস্তা বা সেরেস্তাদার হতে পারলেই লালে লাল। কিন্তু ঢাকা বা কলকাতায় ইংরেজরদের দালালী করার সেসব পদ সিংহ, ঠাকুর, বসাকদের দখলে ইতিমধ্যে চলে গিয়েছে ।
তা দেখে হতাশ আবদাল হাকিম আর্মেনীয়দের সাথে শুরু করল লবণ ব্যবসায়। তখন লবণপ্রাপ্তির বড় উৎস ছিল বরিশাল। আর্মেনীয়দের মাঝে প্রভাবশালী লবণ ব্যবসায়ী কোজা মাইকেল, কোজা ডিকস্তা, কোজা জোহানেসের পার্টনার হয়ে গেলেন আবদার হাকিম। তিনিও এক পর্যায়ে নামের আগে বসিয়ে দিলেন কোজা হাকিম। এই আর্মানিয়দের কোজাই হয়ে গেল ভারাক্কিপূর্ণ টাইটেল খাজা!
আবদাল হাকিমের মৃত্যুর পর তার ভাই হাফিজুল্লাহও কোজাদলে অর্থাৎ আর্মেনীয়দের লবণ ব্যবসায়ে যোগ দেয়। কোজা মাইকেল বন্ধু নতুন কোজা হাফিজুল্লাহকে বলে,
"কোম্পানির দুর্নীতি, শোষণ আর কতিপয় ভুল নীতির কারণে দেশের শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্য শেষ হয়ে যাচ্ছে।..... এখন পুঁজির মার নেই। জমির মূল্য যেভাবে দিনদিন বাড়ছে তাতে মনে হচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে জমিই হবে এদেশে ধন ও সম্মানের উৎস। " কোজা মাইকেলের কথাটি মাথায় গেঁথে নিলেন হাফিজুল্লাহ। এদিকে তার ভাই আলীমুল্লাহও গাঁজা, সুপারি আর আফিম বেঁচে বেশি কামাতে পারছে না।
তখন এক অস্থির সময় যাচ্ছিল বটে। বাকেরগঞ্জের জমিদারি কিনে নেয় মুদি দোকানদার মানিক। রাণী ভবাণীর পরিবারের অবস্থাও টলমলে। জনৈক সাবেক লাঠিয়াল কিনেছে ভবাণীর জমিদারি। এমন সময় আসল খাজা নাকি কোজাদের ঐতিহাসিক পয়লা নিলাম। বরিশালের দু'টো পরগণা কিনলেন হাফিজুল্লাহ। লেখকের ভাষায়,
"কোজা হাফিজুল্লাহ, সাকিন, ঢাকা বেগম বাজার, পেশা লবণের ঠিকাদারী, একুশ হাজার টাকা মূল্যে মহল আইলাটিয়ারখালী ও ফুলঝুঁড়ি ক্রয় করিলেন। " এই থেকে জমিদারির যাত্রা শুরু। জমি শুধু কিনেছেন আর কিনেছেন হাফিজুল্লাহ আর তার ছোট ভাই আলীমুল্লাহ। আয় করেছেন দু'হাতে। আলীমুল্লাহ হয়েছেন পূর্ববঙ্গের সেরা ধনী জমিদার। দুইহাতে আয় করেছেন তো দশহাতে ব্যয় করে জাতে উঠতে চেয়েছেন। টাকা দিয়ে সব পেয়েছিলেন আলীমুল্লাহ। কিন্তু স্থানীয় মুসলমানদের চোখে তিনি,
"সুদখোর, চামড়া, লবণ, আফিম আর গাঁজার ব্যবসায়ী। "
আলী মিয়া জাতে উঠতে না পারলেও শান শওকতে পুত্র গনি মিয়া ঢাকার নাজিমে নওয়াবদের হারিয়ে দেন। ইংরেজপ্রভুকে সন্তুষ্ট করে বংশানুক্রমিক নবাব উপাধি বাগিয়ে জাতে উঠে যান। লোকের কল্যাণে জলের মত টাকা ব্যয় করতেন।গনি মিয়ার জীবিত অবস্থায় ই পুত্র আহসানউল্লাহর অবস্থা পড়তে শুরু করে। আহসানউল্লাহ কোনোমতে চালাতে থাকেন। তার পুত্র সলিমুল্লাহ মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা আর বঙ্গীয় রাজনীতিতে মাততে গিয়ে ঋণে জড়িয়ে পড়েন। মহাজন হিন্দু। তারা তাঁকে বঙ্গভঙ্গ থেকে সরে আসতে চাপ দেয়। আবার ব্রিটিশ সরকারও টাকার মুলো ঝুলিয়ে পকেটস্থ করে সলিমুল্লাহকে। শেষকালে নবাব পরিবারের পতনের দ্বিতীয় নিলামের সময় এসে যায়। টাকার অভাবে সলিমুল্লাহ নিলামে হাজীগঞ্জ বেঁচে দেন। এর কিছুদিন পর মারা যান সলিমুল্লাহ। মোটামুটি সমাপ্ত ঘটে কাশ্মীরি ভাগ্যন্বেষী কোজাদের ওর্ফ খাজাদের জ্বলজ্বলে অধ্যায়।
ফজলুল হক কে "শেরে বাংলা" সহ নানা উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আবার কালের চক্রে একেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা " বিল্লিয়ে বাংলা ", "কুত্তায়ে বাংলা " বলে ব্যঙ্গ করত। কিন্তু কেন? কারণ অনুসন্ধান করেছেন সিরাজুল ইসলাম। তিনি ফজলুল হককে অস্থিরচিত্তের বলে দাবী করেই ক্ষ্যামা দেননি, তাঁকে যেসব কাজের স্বীকৃতি দেয়া হয় তা কতটা ঐতিহাসিক ভুল তার ব্যাখা, প্রমাণ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। শিক্ষা নিয়ে তিনি কাজের চে' ঢোল বেশি পিটিয়েছেন তার প্রমাণ হাজির করেছেন। জমিদারি বিলোপে হক সাহেবে্ব কৃতিত্ব কত কম তা সিরাজুল ইসলামের লেখা পড়তে গিয়ে টের পেয়েছি। ক্ষমতার প্রতি হক সাহেবের দুর্নিবার আকর্ষণের নজির কয়েকটি ঘটনা তো লেখক উল্লেখ ই করেছেন। হায় ঈশ্বর! ফজলুল হককে নিয়ে বইয়ের প্রচলিত মিথগুলো এবার মিথ্যা বলার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছেন আমাকে!তথ্যের মারপ্যাঁচে হক সাহেবের বিশাল রাজনৈতিক সুকীর্তির সবগুলোকে স্লান করে তাঁকে সাধারণে নামিয়ে আনেন সিরাজুল ইসলাম।
১৭৬৫ সালে মির্জা আবু তালিব নামের জনৈক ভারতবাসীর ইংরেজভূমি ভ্রমণের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বর্ননা করেছেন কতো সহজে! "আফিন্দি" আবু তালিবের ইংরেজনামা তো বিশ্বে এক অনবদ্য দলিল। বহু ভাষায় অনুদিত।
ভারতে কে চালু করেন রেল? কে আবার, ডালহৌসি। থামেন আপনি। কীসের ডাল আর কে হৌসি? ভারতে রেল প্রবর্তনকারী ইঞ্জিনিয়ার মেকডোনাল্ড স্টিভেনসন। তাঁর বুদ্ধিতেই কোম্পানি রেল চালু করে। কিন্তু বইতে যে ডালহৌসির নাম লেখা? ভুলে যান। কীভাবে ইঞ্জিনিয়ার মেকডোনাল্ড রেল চালু করেন সেই চরমপ্রদ অজানা ইতিহাসের অধ্যায় উন্মুক্ত করে দেন সিরাজুল ইসলাম।
এক টাকায় আটমন চাল মিলতো শাঁয়েস্তা খার আমলে। নবাব সুজাউদ্দিনও দিতে পারত আটমণ এক টাকায়। বোঝেন কত সস্তা ছিল জিনিসপত্র। আসলে সেসময় বাংলার মানুষের হাতে টাকাই থাকত না। তাঁরা অর্ধাহারে, অনাহারে মরত। এক টাকা সেকালে যার কাছে থাকত সে সমাজে ধনী লোক বলে গণ্য। বিদেশি পর্যটকদের কাছে তখনকার একটাকা কিছুই নয়, কিন্তু বাংলার কৃষকগোষ্ঠীর একটাকা কামাই করবার সামর্থ্য বড়ো কম লোকেরই ছিল।এতো সস্তায় যে বঙ্গে খাবার মেলে, সেখান কত মানুষ স্রেফ বছর বছর ননা খেতে পেয়ে মরেছে তা টাকায় আটমনকে কোথায় দাঁড় করিয়ে সেই ইতিহাস সেটা গবেষণার জন্য তোলা রইল। সিরাজুর রহমান দেখিয়েছেন শাঁয়েস্তা খার এই মিথের বাস্তবতা কতো নির্মম ছিল।
আরও মজার তথ্য ভরপুর এই বই। যেমনঃ ১৭৮৭ সালের সরকারি রিপোর্টে দেখা যায় ব্রিটিশ ভবঘুরেদের সরকার বাধ্য হয়ে জেলে পাঠাচ্ছে!
১৮৩০ এ কর্ন ওয়ালিস তো ব্রিটিশরা যেন ভারতীয়দের পোশাক না পরে, আর ভারতীয়রা যাতে আংরেজ বাবু বনতে না পারেন সাজুগুজু করে তার জন্য কঠোর আইন ই পাশ করে ফেলে।
উপাধীর প্রতি বাঙালি কেন সব জাতেরই লোভ মজ্জাগত। তাই মুগল সম্রাট পলাশীর যুদ্ধের পর যখন, রবার্ট ক্লাইভকে যখন সাইফ জং ( সমরের তলোয়ার), সাবুদ জং (সমরে শক্ত), আমীরুল মামালিক (সাম্রাজের সেরা) মুইন উদ দৌলা (রাজ্যের প্রথিতযশা) বলে খেতাব দেন তখন তা নিশ্চয়ই জানবার মতই বিষয়।
শের এ মহীশূর টিপু সুলতানকে সিরিয়ালের কল্যাণে লোকে বিরাট যোদ্ধা হিসেবে চেনে, মানে দেশপ্রেমিক বলে। কিন্তু এখানেই খটকা বাঁধান সিরাজুল ইসলাম। তিনি নানা তথ্য- উপাত্তের বলে বলীয়ান হয়ে দেখান টিপু যোদ্ধা ছিলেন বড্ড সাধারণ মানের। কিন্তু তাঁর উদারতা, রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে যে সংস্কার চিন্তার কথা ইংরেজ গবেষকগণ পেয়েছেন তাতে তাঁরা সবাই টিপুকে সেসময়ের সেরা চিন্তাশীল কল্যাণকামী নরপতি হিসেবে মানতে প্রস্তুত। যোদ্ধা হিসেবে নয়।
১৭৮৩ সালের ঢাকায় এলেন কালেক্টর কাম ম্যাজিস্ট্রেট ডে সাহেব। সেই ডে সাহেবের দলিল ঘেঁটে এমন এক ঢাকার কথা শুনিয়েছেন সিরাজুল ইসলাম তা নিঃসন্দেহে অনেক বেশি অবাক করবে।বাঙালির অপরিবর্তনীয় চরিত্র সম্পর্কে ধারণার সাথে সাথে জানতে পারবেন তৎকালীন ঢাকার অার্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা।
সিরাজুল ইসলাম কত সহজে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন সেই বাঙালির সাথে যিনি বিলাতে প্রথম পাবলিক স্কুলে পড়েছেন, ইংরেজিতে বই লিখেছেন, মেম বিয়ে করে সেখানেই প্রথম হোটেল ব্যবসায় দিয়েছেন সেই শেখ দীন মোহাম্মদেরর সাথে। এ এক অভিনব মানুষ দীন মোহাম্মদ!
এই বইতে কতোশতো খুঁটিনাটি অথচ খুব আগ্রহজাগানিয়া ঘটনাগুলো নিয়ে ছোট্ট ছোট্ট করে লেখা প্রবন্ধগুলো প্রথাগত ইতিহাসে জ্ঞানে আঘাত করেছে। ভাবতে শিখেয়েছে এভাবে নয়, হয়েছিল ওভাবে। খুব তথ্যবহুল বই। অথচ দু'শ পাতার বই কখনো ঝুলে পড়েনি তথ্যের ভারীত্বে, বরং দুরন্ত গতিতে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে আমাকে।
কিন্তু এতো ভালোর পরেও সিরাজুল ইসলামের গুটিকয় বাক্য নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রথমত, তিনি ন্যূনতন রেফারেন্সের ধার ধারেন নি। শেষে সংক্ষিপ্ত আকারে হলেও তা দিতে পারতেন। তাতে তিনি যেসব সাহসী দাবী করেছেন, যুক্তি দিয়েছেন তা আরো প্রামাণ্য হতো। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রতি বিরূপতা। কিন্তু নাজিমুদ্দিনের প্রতি কোমল মনোভাবের যথার্থ কারণ তিনি দেখাতে পারেন নি বলেই মনে হয়েছে। ��াজিমুদ্দিনের প্রতি তাঁর আলাদা আকর্ষণকে লুকাতে চান নি কিংবা পারেন নি। কিছু বানান ভুল ছিল। এতো সুন্দর একটি বইতে বানান ভুল নিঃসন্দেহে পাঠককে বিরক্ত করবে।
প্রথমেই বলতে হয় ইতিহাসের এমন পাঠ যে কাউকে আকৃষ্ট করবে।
ঢাকার খাজা পরিবার, আবুল কাশেম ফজলুল হক, পলাশী, ইংরেজ, মুঘল, টিপু সুলতান, শায়েস্তা খাঁ, বাংলা নববর্ষ, বিলেতে বাঙালি দীন মোহাম্মদ, মুক্তিযুদ্ধ ও এর আনুষঙ্গিক বিষয়াদি প্রভৃতি নিয়ে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে প্রাঞ্জল আলোচনা পেয়েছি।
সমস্যার মধ্যে বলতে হয় বইটা লেখকের বিভিন্ন সময় লেখা প্রবন্ধের সংকলন। সে হিসেবে এগুলো প্রকাশের তারিখ সাথে দেয়া থাকলে ভাল হতো। আর বইজুড়ে প্রচুর ভুল বানান, বাক্যের ভেতরেও ভুল। এসব বাদ দিলে বেশ উপভোগ্য বই।
ইতিহাস এতো মজার, তা এই বই না পড়লে বুঝতে পারতাম না।স্কুল কলেজে ইতিহাসের প্রতি ছাত্রদের একটা ভীতি থাকে,কারণ পড়ানোই হতো এমনভাবে যে আমরা মজা পেতাম না।এই বইয়ের মত করে যদি ইতিহাস পড়ানো হয় তাহলে ইতিহাস যে কত মজার তা বুঝতে পারবো।
ইতিহাসের খন্ড খন্ড অংশ গুলোকে একই বিন্দুতে এনে সরস গদ্যে রূপান্তর করার বিষয়টা সহজ কাজ না। ঐতিহাসিকের নোটবুকে অনেকগুলো টপিকের উপরে বেশ চমৎকার লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম। বইয়ের মালমশলা নিয়েছেন সরকারি রেকর্ড থেকে। এজন্য হয়তো কোনো রেফারেন্স উল্লেখ করতে পারেননি। বইয়ের এটাই সবচেয়ে বড় দূর্বলতা।
কিছু কিছু বই আছে যেগুলা পড়ে আত্মা শান্তি পায়, বইয়ের শেষ করতে মন চায়না, শেষ করলেই তো এই অমুল্য রতন হারিয়ে যাবে এমন অনুভূতি আসে। ঐতিহাসিকের নোটবুক বইটি আমাকে অনেক কিছু নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে, অনেক অজানা ইতিহাস জেনেছি, এক তরফা অনেক ইতিহাস জানতাম সেখান থেকে বের করে নিয়ে এসেছে। বইটা আমাকে দর্শন নতুন করে শিখিয়েছে। দর্শন এর মাঝে যে এত রস আমি আগে বুঝিনি, এখন অন্য দর্শন সম্পর্কিত অন্যান্য বই বই পড়তেও বাধ্য করছে। সঙ্গত কারনে বইটার অনেক প্রবন্ধের মাঝে ব্যক্তিবাদ থেকে সাম্রাজ্যবাদঃ একটি তাত্ত্বিক আলোচনা এই প্রবন্ধটা আমার সবচেয়ে প্রিয়। এছাড়াও রাষ্ট্রের উদ্ভব ও বিকাশধারা, আমাদের হক সাহেব, টিপু সুলতানের বীরত্ব, পোশাক পরিচ্ছদের সংস্কৃতি ও রাজনীতি, খেতাব ভাল লেগেছে। আসলে সবগুলা প্রবন্ধই ভাল, অজানার অন্ধকার সরিয়ে আলো নিয়ে আসবে।
Fast but interestingly presented. Sirajul Islam does bear a partisan look at history, one in favour of individual freedom, secular identity. He tries to sift through history to find out nationalist rhetoric in the context of changing economy, colonialism and revolutions. His main focus is making people understand how historical narratives change in response to their time and place, and draws a merciless look at those in charge of steering it. His disdain for glorification of leaders comes out scathing at every page, and keeps reminding the value of individual thoughts as opposed to groupthink. This historian is not neutral, remember this if you decide to pick up this book.
মুদ্রার যেমন এপিঠ-ওপিঠ থাকে, প্রদীপের উজ্জ্বল আলোর নিচে যেমন অন্ধকার থাকে; ঠিক তেমনি আমাদের জানা ইতিহাসেরও অনেক না-জানা দিক থাকে। বিভিন্ন কারণে আমরা তা জানতে পারি না-কতকটা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে, কতকটা আবার আমাদের জানতে দেওয়াই হয় না।
লেখক আমাদের জানা জিনিসকেই আবার উপস্থাপন করেছেন, কিন্তু নূতন মোড়কে। ইতিহাসের অনেক মহানায়ককে সাধারণ মানুষের কাতারে নামিয়ে এনেছেন। সাহস আছে বলতে হবে!!
কিন্তু সমস্যা একটাই, কথাপ্রকাশের এই বইয়ে প্রচুর বানান ভুল। প্রকাশকের থেকে এ ব্যাপারে কিছুটা পেশাদারত্ব কাম্য।