বইটি সম্পর্কে একটু বলি, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর দুই খণ্ড পারস্য প্রতিভা (১ম খণ্ড ১৯২৪ সালে প্রকাশিত ও ২য় খণ্ড ১৯৩২ সালে প্রকাশিত) থেকে সাতটি প্রবন্ধ নিয়ে করা হয়েছে বিশ্বসাহিত্যের এই সংস্করণটি। প্রথম প্রবন্ধটি পারস্য-সাহিত্যের ক্রমবিকাশের উপর। আর বাকি ছয়টি ছয়জন বিখ্যাত পারস্য কবির উপর উপর। তাঁরা হলেন কবি ফেরদৌসী, ওমর খাইয়াম, শেখ সাদি, কবি হাফেজ, জালাউদ্দিন রুমী ও ফরিদুউদ্দিন আত্তার। দুখণ্ড থেকে প্রবন্ধগুলো নিয়ে অর্ধেক সাইজের বই করা কেন দরকার কে জানে!
ভূমিকা লেখক শহীদুল আলমের বইটি সম্পর্কে অভিমত “ভাষার মাধুর্যে, বর্ণনার চাতুর্যে ও ভাবের প্রাচুর্যে এই বইটি সেদিন যেমন সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, ‘পারস্য প্রতিভা’র সেই ঔজ্জ্বল্যে আজো এতটুকু মলিনতার ছায়া পড়েনি।”
বইটিতে 'ভাবের প্রাচুর্য' এত বেশি ছিল যে আমি হারিয়ে যাচ্ছিলাম। নাহ, লেখক ভাবের মাঝে না, বা পারস্য কবিদের ভাবের মাঝেও না। অন্য কোনও খানে, যার সাথে এই বইয়ের সম্পর্ক নাই। প্রবন্ধ লেখক পারস্য কবিদের ভাব, জীবনদর্শন এসব ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে নিজেই এত ভাবপ্রবণ হয়ে গেছেন যে কি বলতে চেয়েছেন তা সহজভাবে পড়ে খুব একটা উদ্ধার করতে পারিনি। কঠিন ভাবে উদ্ধারের চেষ্টাও করিনি। সব মিলিয়ে বইটি আমার কাছে কেমন যেন ঝাপসা মনে হল।
বইতে রিপিটেশন প্রচুর। পারস্য কবিদের পরিষ্কার ভাবে তুলে ধরার জন্য হয়তো লেখক একই কথা বারবার বলেছেন, তাতে কনফিউশন ছাড়া আর কিছু তৈরি হয়নি। তাই 'বর্ণনার চাতুর্যও' ব্যাপারটার সাথেও আমি একমত নই। এবং ভাষাও আমাকে আকৃষ্ট করেনি, তাই কিভাবে বলি এর 'ভাষায় মাধুর্য' ছিল!
এছাড়া আরও একটি ব্যাপার খেয়াল করলাম, কিছু কিছু জায়গায় এমন কিছু ঘটনা দিয়ে কবিদের জীবনদর্শন বর্ণনা করতে চেয়েছেন যেগুলো ঐতিহাসিকভাবে ভুল প্রমাণিত বলে বইটির ফুটনোটেই উল্লেখ করা হয়েছে। ফুটনোট গুলো পরে যোগ করা হলে ঠিক আছে কিন্তু ভুল জেনেও যদি বইয়ে দেয়া হয় (আমার কেন যেন মনে হয়েছে সেটাই করা হয়েছে) তাহলে আর কী বলার আছে!!
সমালোচনা সত্ত্বেও একটা ব্যাপার বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রবন্ধগুলো খুবই পরিশ্রম করে লেখা। হয়তো আমি কনটেন্ট বুঝতে পারিনি তবে পরিশ্রমটা বোঝা যায়। পরিশ্রমের জন্য একটি তারা যুক্ত হলো।
অতিরিক্ত ভাবের ধাক্কায় কোনটা লেখকের বক্তব্য আর কোনটা যে কবির জীবনী নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে তাঁর বক্তব্য সেটা সবসময় ঠিকভাবে বোঝার উপায় নেই। লেখকের নিজের ধর্মীয় জ্ঞান সিরিয়াস লেভেলের কম হওয়ায় ইসলামের নামে প্রচুর শিরকি কথাবার্তা আছে, যেমন মহানবীর নামের সামনে বেশ কয়েকবার প্রভু ব্যবহার করেছে লেখক। প্রতিটা কবিকে অতিরিক্ত বড় দেখাতে গিয়ে তাঁদেরও যে বিভিন্ন জায়গায় বোঝার ভূল থাকতে পারে এটাও লেখকের লেখায় আসেনি; অনেকটা যে যা বলছে, ভাবছে, লিখছে সেটাই মহাসত্য এরকম ভাবে লেখা।
কবি ফেরদৌসীর (১১ জন পারস্য প্রতিভার প্রথম) মনের অবস্থা বুঝাতে যখন পাতা ঝরানোর পাশাপাশি, আকাশে বাতাসে অনুভূতির ছড়াছড়ি নিয়ে দুটো পৃষ্ঠা খরচ করেছেন তখনই বুঝা যায়, কি পরিমাণ ভাবাবেগে তাড়িত হয়ে বরকত সাহেব এই বইটি শেষ করবেন। তাছাড়া পারস্য নিয়ে অতিরিক্ত আবেগে দুষ্ট-এই অপবাদ বা উপবাদ দেয়া হলে বাড়াবাড়ি হয় না। কোন্ কোন্ কবির দিউয়ান বা গজল থেকে 'আজিও বাংলার সুকন্ঠ আলিমগণ বা বাক্যব্যবসায়ীগণ ধর্মসভায় সুললিত গান গাহিয়া শ্রোতৃবর্গকে মোহিত করিয়া তোলেন' তার বর্ণনা প্রায়ই আকর্ষণীয় করার থেকে লেখাকে বিকর্ষণীয় করেছে বেশি। প্রতিবার একেক কবির সম্পর্কে লিখতে গিয়ে ২৫% জায়গা ভাবের আতিশয্য ও সাধু ভাষার বাগাড়ম্বরে ভারাক্রান্ত করে ফেলায় আসল উদ্দেশ্য কিছুটা হলেও ব্যাহত হয়েছে বলা যায়। কতিপয় ব্যক্তিত্বদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণও চোখে পড়ে। ফিরদৌসী, সাদী, হাফিয, আত্তার, রুমীর প্রতি যতটা যত্ন নিয়ে লেখা হয়েছে ততটা বাকিদের উপর নেই। নাসির-নেযামীকে চেনার জন্য এই বই নয়। আবার, কিছু ঘটনা বর্ণনায় ইচ্ছাকৃত অলৌকিকতার আশ্রয় নেয়াটা সহজে গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষত, পাদটীকা দিয়ে যখন লেখক নিজেই বলেন, "সাদীর জীবৎকাল সম্পর্কে ১০২ ও ১২০ বছরের উল্লেখ পাওয়া গেলেও বিশেষ কারণবশত উত্তরোল্লিখিত মতামতটিই নেয়া হচ্ছে" তখন পাঠক হিসেবে জ্ঞানের পথ ও ভাবের পথ নিয়ে প্রশ্ন জেগে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু ঐ যে একটা কথা আছে, একটি জায়গায় 'কিন্তু' শব্দের আগে যা বলা হয় তা সবই ঘোটক-পুরীষ। তেমনি-
কিন্তু এই বইয়ের অসম্ভব একটি গুণ হলো, এতজন ফার্সির রথী-মহারথী কবি-দার্শনিকের জীবন ও লেখা নিয়ে বাংলাতে একসাথে আর কিছু আছে কিনা আমার জানা নেই। আর তার সাথে মুসলিম দর্শন জগতের ক্রমবিকাশ নিয়ে চমৎকার তথ্য ও তত্ত্ববহুল ভূমিকা অনেক প্রশ্নের উত্তর যেমন দেয়, তেমনি দেয় নতুন ভাবনার খোরাক। শিয়াদের মধ্যে বিভাজনের কাহিনী যেমন আছে, তেমনি আছে নিউ-প্লেটোনিজম থেকে শুরু করে মুতাযিলা হয়ে সুফিবাদ নিয়ে এক বিস্তৃত আলোচনা। বস্তুজগতে ঈশ্বরের যৌক্তিকতার প্রশ্ন, নির্গুণতার বিতর্ক, পাপপুণ্যের তর্কসহ পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য দর্শনের সাথে ইসলামিক দর্শনের মেলবন্ধন ও বিভাজন দেখানোর জন্য লেখকের পরিশ্রম সহজেই অনুধাবন করা যায়। এই শ্রমের জন্যই বইটি আলাদা মূল্য রাখে।
জীবনী অংশে ফিরদৌসীর শাহনামার পাশাপাশি গজনীর সুলতান মাহমুদকে নিয়ে অনেক অজানা কথা জানা যায়। পাওয়া যায় ওমর খৈয়ামের উদাসীনতার সাথে সেলজুক আমলের কিংবিদন্তীতুল্য নিযাম-উল-মুলক ও Assassin শব্দের আদি ধারক হাসান সাব্বাহের হাশিশী সম্প্রদায়ের কথা। উঠে আসে শেখ সাদীর মতো কবির ভাবসাধনার প্রেরণা। নাসির খসরুর থেকে জানা যায় সেই সময়কার ধার্মিক অসহিষ্ণুতার কাহিনী। শিয়াদের একটি শাখা 'ইসমাইলী'দের সাথে নির্মম ব্যবহার ও এই শাখাটির চিন্তাধারার সুতীক্ষ্ণ ব্যবচ্ছেদ। নেযামী গাঞ্জাভীর ব্যাপারে আবেগ কম ব্যয় করার কারণে এই অদ্ভুদ মেধাবী কবির কথা কম-কম মনে হয়। খামসা নিয়ে খুবই কম সময় দিয়েছেন লেখক। আত্তার-রুমীতে এসে লেখক আবেগে বিগলিত হয়েছেন এবং সূফীবাদের তত্ত্বকথায় মুখর হয়েছেন। প্রচুর ফার্সির সংযোজনে মূল সাহিত্যের রস নেয়াটাও সহজ এ অংশে এসে। হাফিয আর জামীর ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে কোনভাবে। এরপর ইবনে সীনা ও ইমাম আল গাযযালি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভাবমিশ্রিত কথার আতিশয্যে দুই পণ্ডিতের কীর্তি একটু ম্লান হয় বৈকি। মূলত বইটির উদ্দেশ্য হল কবিদের জীবন ও কবিতার বিশ্লেষণ। পারস্য 'প্রতিভা'র কথা তুলতে গেলে সিনা ও গাযযালি না এলে তাঁদের ঘোরতর অপমান হয় বলেই বোধ হয় বরকত সাহেব হালকা করে ছেড়ে দিয়েছেন। ﮔﻞ ﺍﺯ ﺭﺧﺖ ﺁﻣﻮﺧﺘﻪ ﻧﺎﺯﮎ ﺑﺪﻧﯽ ﺭﺍ ﺑﺪﻧﯽ ﺭﺍ ﺑﻠﺒﻞ ﺯ ﺗﻮ ﺁﻣﻮﺧﺘﮧ ﺷﯿﺮﯾﮟ ﺳﺨﻨﯽ ﺭﺍ ﺳﺨﻨﯽ ﺭﺍ - ফুল তার কোমলরূপ আপনার থেকে পেয়ছে, বুলবুল তার সুরেলা গলা আপনার থেকে পেয়েছে (জামীর গজল/নাত) এর মত বিখ্যাত গান যেমন আছে এই বইয়ে তেমনি আছে, খৈয়ামের বেহেশতে যাওয়ার আ���ে মদিরা দিয়ে ভুলে থাকার তত্ত্ব। আছে সাদীর ভক্তিরসে পরিপূর্ণ কথামালা। আছে সবার প্রিয় রুমীর আধ্যাত্মিকতা।
সবের শেষে, এটুকু বলা যায় যে, কোন আগ্রহী পাঠক যদি বাংলাতে ইরানি সুফি ও ভাবের কবিদের ও তাঁদের কবিতা সম্পর্কে প্রাথমিক কিন্তু মোটামুটি ভাল একটা ধারণা নিতে চান তবে এই বইটি পড়তে পারেন। তবে অবশ্যই বরকত সাহেবের ভাবের কথাবার্তা শুরু হলে (১০-১৫ পৃষ্ঠা পড়লেই টের পাওয়া যায়) হলে সেই পৃষ্ঠা বাদ দিয়ে গেলেই ভালমত এই রস নেয়া যায় বলে আমার মতামত। অনেক কিছু জানা যেমন যায় তেমনি বেশ কিছু ভুলও ভাঙ্গে।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা, বিশ্বাস ও যুক্তি কখনো মেশাবেন না! এই তত্ত্বটা লেখক কতটা প্রয়োগ করেছেন সেটাই চিন্তার বিষয়।
সাধু ভাষা পড়তে আমার এমনিতেই কষ্ট হয়। তার উপর অতি ভারিক্কি ভাষা, ভাবের অতিশোয্য। ছয়জন পারসিয়ান কবি, দার্শনিকের জীবন নিয়ে লেখা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট বোরিং।
পারস্য সাহিত্যের মহাকবিদের জীবন আর চিন্তাধারা সম্পর্কে একটা ধারনা নেয়ার জন্য ভালো বই। এই বইটা পড়ে হয়ত আপনি বাছাই করতে পারবেন কার লেখা আর একটু ঘাঁটবেন।