প্রাচীন সভ্যতার ৮ টি লীলাভূমি- মিসর, মেসোপটেমিয়া, পারস্য ও অন্যান্য, প্রাচীন ভারত, চীন, হিব্রু ও প্রাচীন ইউরোপ, গ্রিস ও রোম। সম্পদের স্বল্পতা এবং প্রযুক্তির অনগ্রসরতার সেই যুগেই মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, স্থাপত্য, ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে কতটা উন্নতি করেছিল তা ভাবলেও অবাক হতে হয়। ইজিয়ান সভ্যতার মধ্য দিয়ে ইউরোপে নগরসভ্যতার বিকাশ, এরপর স্পার্টা ও এথেন্স সভ্যতার মাধ্যমে গ্রীক নগর রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ, রোমান সভ্যতার চোখ ধাঁধানো জৌলুশ, প্রাচীন ভারত, চীন, ইত্যাদি অঞ্চলে সভ্যতার বীজ বপন ও উন্মেষ, 'নীল নদের দান' মিসরের নিদর্শন-বিশ্বসপ্তাশ্চর্যের অন্যতম আকাশ্চুম্বী পিরামিড, রহস্যঘেরা মমি, বিস্ময়কর মূর্তি স্ফিংস, হায়ারোগ্লিফিক নামের চিত্রলিপি, স্বর্ণোজ্জ্বল মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতা, ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় উন্নত পারস্য সভ্যতা - কত যে বিস্ময়ে ঘেরা এসকল সভ্যতার কাহিনী, তা না পড়লে বোঝা যাবেনা।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় ১৯৬০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্ম। পৈতৃক নিবাস বিক্রমপুরের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার গনাইসার গ্রামে। পিতা মরহুম মোসলেম চোকদার ও মা মরহুমা রেজিয়া বেগম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে১৯৮২ ও ১৯৮৩ সালে যথাক্রমে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট থেকে ফারসি ভাষায় সার্টিফিকেট কোর্স সম্পাদন করেন। ১৯৮৫ সালে। ফোর্ড ফাউন্ডেশনের বৃত্তি নিয়ে ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি. অর্জন করেন ১৯৯৪ সালে। সত্তর ও আশির দশকে ‘শাহনাজ কালাম’ লেখক নামে ছড়া ও গল্প লিখিয়ে হিসেবে পরিচিত হলেও পেশা জীবনে এসে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠক্রমভিত্তিক গ্রন্থ রচনা এবং শিল্প-সংস্কৃতি ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক গ্ৰন্থ ও প্ৰবন্ধ লেখায় বিশেষ মনোনিবেশ করেন। ড. শাহনাওয়াজের রচিত ও সম্পাদনাকৃত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। এক যুগের বেশি সময়কাল ধরে তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে রাজনীতি ও সমাজ-সংস্কৃতি বিষয়ক কলাম লিখে আসছেন।
খুবই সুখপাঠ্য একটি বই। ঝকঝকে রঙিন, মূলত ছোটদের জন্য। ছোটদের হলেও বড়রা মাজার বইয়ের স্বাদ থেকে বাদ যাবে কেন? আকারে খুবই ছোট, এক বৈঠকেই শেষ করে ফেলা যায়। প্রাচীন বিশ্বসভ্যতা নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ. কে. এম. শাহনেওয়াজ অনেক আগে থেকেই লেখালেখি করছেন। ২০০৯ সালে ছোটদের উপযোগী করে বিশ্বসভ্যতার উপর ৮/৯ টির মতো স্বতন্ত্র বই লিখেন। এটি ঐ সিরিজের প্রথম বই।
মিশরীয় সভ্যতা সম্পর্কে প্রাথমিক পাঠ নেওয়ার জন্য ভালো একটি বই।তবে ভাষা আরেকটু স্বাদু হতে পারতো।"মিসর" লেখা হয়েছে ছোটদের জন্য।তারা বেশ আগ্রহ নিয়ে বইটি পড়বে বলেই আমার ধারণা।
ব্যক্তিগত ভাবে আমার ছোটদের বইপত্র পড়ে ভালো লাগে, মজা লাগে। এখনো সুযোগ পেলে ছোটদের বইয়ের পাতা ওল্টাতে ভুলি না। সে বই যেকোনো বিষয়েরই হোক না কেনো আমি ঠিকই ওল্টাবো। এক্ষেত্রে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়। এই যেমন — অনেক কিছু জানার ব্যাপার তো আছেই সেইসাথে কখনো কোন ছোট ছেলেমেয়েদের যদি বই দেয়ার ব্যাপার-স্যাপার চলে আসে তাহলে অভিজ্ঞতা থেকেই দু-চারটে ভালো বইপত্রের কথা বলার সুযোগ হয়। আবার, জানা বিষয় হলে রিভিশনের কাজটাও একটু হয়ে যায়।
মিশরের ইতিহাস নিয়ে আমি আইজাক আসিমভের "মিসরের ইতিহাস" বইটি পড়েছি। সংক্ষিপ্ত ইতিহাস স্বরূপ চমৎকার একটি বই। সন্দেশ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই অনুবাদ বইটির অনুবাদ দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন সত্যিই দারুণ ভাবে বইটি অনুবাদ করেছেন। তবে এ বইটি ছাড়াও বেশকিছু জনপ্রিয় বই আছে। এদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য হলো অনির্বাণ ঘোষের "হায়রোগ্লিফের দেশে"। আবার, এবছর প্রকাশিত সাহাদত হোসেন খানের "প্রাচীন মিশর"। অবশ্য এদুটো বই আমি এখনও পড়িনি। কবে পড়বো তারো ঠিক নেই। তবে প্রথমটির কথা আগ্রহী প্রায় অধিকাংশ মানুষই জানেন। আর দ্বিতীয়টি সুবিশাল একটি বই। সম্ভব মিশরের ইতিহাসের বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু নিয়ে এখন পর্যন্ত সেরা। তবে না পড়ে আপাতত সরাসরি কিছুই বলবো না। তাছাড়া, জানামতে ভাষাশহীদ গ্রন্থমালা সিরিজের অন্তর্গত মিশরের ইতিহাস নিয়েও বই আছে। কিন্তু, এসব ভালো বইয়ের একটিও ছোটদের বই নয়।
ছোটদের জন্য সভ্যতা নিয়ে বইপত্রের কথা উঠলেই পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর "কল্যাণীয়াসু ইন্দু" বইখানার কথা প্রায় সকলেরই কমবেশি মাথায় আসে। বইটি আমি পড়েছি। ছোটদের জন্য সত্যিই দারুণ একটি বই। এ বিষয়ের প্রথম পাঠ! খুবই সহজ ও সাবলীল ভাবে প্রায় সামগ্রিক বিষয়বস্তু এখানে বোঝানো হয়েছে। আসলে, ছোট থেকেই ছোটদের বিশ্ব ইতিহাস, বিশ্বসভ্যতা সম্পর্কে ক্ষুদ্র করে হলেও ধারণা থাকা উচিত, এতে করে ওরা মানবজাতি হিসেবে নিজেদের সম্পর্কে ও জগত সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠবে, যা একজন সচেতন মানুষ মাত্রই করণীয়।
তবে, কল্যাণীয়াসু ইন্দু বইতে স্বভাবতই সব সভ্যতা নিয়ে আলোচনা সম্ভব হয়নি। কিন্তু, একেক সভ্যতার ইতিহাস, বিশেষত্ব ও গুরুত্ব একেক রকম। আলাদা আলাদা সভ্যতা হতে আমরা আলাদা আলাদা শিক্ষা পাই, যা সামগ্রিক ভাবে মানবজাতি হিসেবে আমাদের অর্জন। ফলে, প্রতিটি সভ্যতা সম্পর্কেএ আলাদা ভাবে মোটামুটি জ্ঞান থাকা সচেতন মানুষের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি উচিত ছোটদেরকে ছোট থেকেই তার নির্জাসের সুযোগ করে দেয়া। এ থেকেই চলে আসে ছোটদের জন্য প্রথমা প্রকাশনের "প্রাচীন সভ্যতা সিরিজ" গ্রন্থমালার কথা।
প্রাচীন সভ্যতা সিরিজের গ্রন্থসমূহের রচয়িতা ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ। আমি প্রতিবছর আমার ছোট ভাই নতুন বোর্ড বই পেলে ঘেটে দেখি। ঠিক তেমনি ওর সমাজ বইটি ঘাটতে গিয়ে ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ স্যারের নামটি প্রথম পাই। পরে একদিন নিজের জন্য কিছু বইপত্র ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে আবিষ্কার করি প্রাচীন সভ্যতা সিরিজের বইগুলো। আর, রচয়িতার নামটি দেখামাত্রই মনে পড়ে বোর্ডের সমাজ বইয়ের কথা।
প্রাচীন সভ্যতা সিরিজের প্রথম বই মিশর নিয়ে। সবেমাত্র পড়ে উঠলাম বইখানা। ভাষা বেশ সুন্দর এবং সাবলীল। এককথায় সুখপাঠ্য। প্রতিটি পৃষ্ঠায় আছে আলোচ্য বিষয়ের ওপর একটি করে রঙিন ছবি। আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে আছে ভূগোল, সভ্যতা, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, জ্ঞান-বিজ্ঞান সহ নানাবিধ! ভারিক্কি কিছু নেই তবে, আছে না বললেই নয় জাতীয় প্রয়োজনীয় ইতিহাস সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়। তবে আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হলো — একটি কি দু'টি জাগায় আরো এক লাইন বাড়িয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে হয়তো ভালো হতো। তবে, এর তেমন কোনো আহামরি প্রয়োজন নেই। সবমিলিয়ে ছোটদের জন্য সুস্বাদু একটি বই। তবে শুধু ছোটদের জন্যই নয়। এ নিয়ে আগ্রহী ব্যক্তি মাত্রই বইটি পড়ে জানবেন এবং মজা পাবেন! আর আমার মতো ছোটদের বই মজা লাগলে তো কথাই নেই!
ছোটদের জন্য লেখা মোটেই সহজ কোনো কাজ নয়। তার ওপর আগ্রহের জন্ম দিতে প্রয়োজন রঙিন ছবি। আবার ছোটদের হাত যাবে বিধায় তার বাধাই হওয়া চাই মজবুত! ফলে, সব মিলিয়ে বইগুলোর দাম বেশি মনে হতেই পারে, কিন্তু বিদেশের তুলনায় এদেশের বইয়ের দাম বেশ কম! তাছাড়া, রকমারিতে এই সিরিজের সব বইয়ের একটি কালেকশনও আছে!
বাসায় যদি ছোট কেউ থাকে, থাকে কোনো আত্মীয়ের ছোট ছেলেমেয়ে, তবে তাদের জন্য এই সিরিজটি হতে পারে অন্যতম আনন্দদায়ক একটি পুরস্কার!
হৃদয় হক ১৯শে চৈত্র ১৪২৭ ২রা এপ্রিল ২০২১ চট্টগ্রাম
🔸 প্রাচীন সভ্যতা সিরিজ এর প্রথম বই মিসর। এই বই লেখক খুব অল্প পরিসরে মিসর দেশের পরিচয় থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে মিসরীয় সভ্যতা, নগর সভ্যতা, কৃষিজীবী সমাজের বিকাশ, শুরুর দিকে মিসর সভ্যতার বিকাশ, ফারাওদের যুগ, সভ্যতার হারিয়ে যাওয়া, মিসরের ধর্ম, লিপি, রজেটা পাথর, কাগজ কলমের আবিষ্কার, বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসা, মমি, পিরামিড, ভাস্কর্যসহ দেয়া আঁকা নানা ছবি নিয়েও আলোচনা করেছেন। ছোট্টকরে প্রতিটা বিষয় উঠে এসেছে এই বইয়ে।
🔸 লেখকের পড়া প্রথম বই। লেখা খুবই সাবলীল। যেহেতু ছোট্ট একটা বই তাই এক বসায় শেষ করে ফেলার মতো। বইয়ে প্রতিটা পৃষ্ঠায় ইলাস্ট্রেশন জুড়ে দেয়া হয়েছে।
🔸 প্রথমার প্রডাকশন খুব সুন্দর। একটা বানান ভুলও চোখে পড়েনি। যদিও ছোট্ট পরিসরের বই তবুও। পেজ থেকে শুরু করে বাঁধাই, ছাপা সব কিছু সুন্দর।
পৃথিবীর মধ্য যে কয়েকটি প্রাচীন সভ্যতা গড়ে উঠেছে তার মধ্য উল্লেখযোগ্য সুমেরীয়���য়, মিশরীয়রান, রোমান এবং গ্রীক। মিশরীয়ান সাম্রাজ্য যেমন অনেক কৌতূহল দিয়ে পরিপূর্ণ তেমনি অাজও এটি মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। প্রথম রাজবংশের ফারাও মেনিসের দুই মিশর একীকরণ এর মধ্যদিয়ে যে সাম্রাজ্যের শুরু ক্লিওপেট্রার মৃত্যু দিয়ে সেই সাম্রাজ্যের পতন। ভ্যালি অব ডেড এ অাজও মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে অাছে ফারাও খুফু, খাফরা এবং মেনেনকাউ এর বিশাল বিশাল তিনটি পিরামিড। এই পিরামিড এবং এদের মধ্য মমি করে রাখা ফারাওদের নিয়ে রয়েছে অনেক রহস্যময় গল্প।