কিংবদন্তিতুল্য বর্ণনামূলক দীর্ঘ উপন্যাস। প্রকাশিত প্রথম সংস্করণে(১৯১৪) আনোয়ারার পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০০। এখনকার পাঠকের মনোযোগ বিবেচনায় মমতাজউদ্দীন ৪টি পর্বে ৪৩টি পরিচ্ছেদ নিয়ে এই ‘অনুপম’ সংস্করণ করেছেন। উপন্যাসটি বাঙালি মুসলমান পারিবারিক জীবনধারা অবলম্বনে একটি সরল ও স্নিগ্ধ কাহিনী। মধুপুর গ্রামের আনোয়ারা ও নুরল এসলামের সংসারজীবনের নানা সংগ্রামকে অবলম্বন করে এই উপন্যাস। মধুপুর গ্রামে যেমন অসংখ্য ভালোমানুষ আছে- যারা স্নেহ, মায়া, মমতা ও পরোপকারের জন্য উদারচিত্ত মানুষ- তেমনি এ জনপদে হিংসা, দ্বেষ ও নীচপ্রবৃত্তিসম্পন্ন মানুষেরও অভাব নেই। এমন পরিবেশে সবার সাথে এক হয়ে থাকতে গেলে নিত্যই কত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয় তা সবার ই জানা। মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের ঘরের কোণে, আঙিনায় কিংবা গোয়ালঘরে যেখানে যা ঘটছে তাঁর নিপুণ চিত্র এঁকেছেন লেখক। স্নেহময়ী দাদী, ব্যক্তিত্বহীন অসহায় পিতা, প্রীতিস্নিগ্ধ সখী সব আছে। মনোরম একটি পরিচিত সংসারের হাসি-কান্না, জয়-পরাজয় অথবা দুর্যোগ ও সংকট এ উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করেছে। এ উপন্যাসে বাঙালি রমণীর পরিচয়কে বিশেষভাবে আলোকিত করা হয়েছে। নারীর কাছে পিতামাতা যেমন শ্রদ্ধার পাত্র তেমনি স্বামীর জন্য তাঁর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাও অনিবার্য। রমণীর এই ‘সনাতন’ রুপকে লেখক সরল বিশ্বাসে এঁকেছেন। তবে লেখক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বার্তাটি দিতে চেয়েছেন সেটি হলঃ মানুষ সংসাররাজ্যে বিবিধ ঘটনা ও সংঘাতের সম্মুখীন হবে, এতা অনিবার্য। ঘটনা ও সংঘাতের মধ্যে বাস করেও মানুষকে সৎ, পবিত্র আর ধৈর্যশীল হতে হবে। খোদার কাছে অকৃপণ নিবেদন করতে হবে। বিপদের মধ্যেও যেন আত্মবিশ্বাস অটুট থাকে, আনন্দ ও সুখের সময়ও যেন সৃষ্টিকর্তার মহিমার প্রতি শ্রদ্ধা অবিচল থাকে ।
বইয়ের প্রধান দুই চরিত্র আলাদা নজর কাড়বেই। আমার নিজস্ব একটা অনুমান হল, এই বইয়ের পাঠকের অধিকাংশই ছিলেন নারীরা। লেখক নুরল এসলাম চরিত্রটিকে নানা গুণের সমন্বয়ে এমন ব্যক্তিত্ববান করেছেন সেটাকে ‘স্বপ্নপুরুষ’ বললে ভুল হবে না কিন্তু তাই বলে, নারীদের ছোট করেছেন এতা ভাবলে ভূল হবে। বরং শিক্ষা-দীক্ষা, চিন্তা-চেতনা, বিচক্ষনতা, কর্মগুণ, চারিত্রিক গুণাবলি সব মিলিয়ে এই উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ চরিত্রটি একজন নারী।
একটা ব্যাপার না বললেই নয়। সংখ্যায় কম হলেও উপন্যাসে হিন্দু চরিত্রগুলোকে মোটাদাগে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয��েছে। কিন্তু আর সবকিছুর মতোই, কোন সম্প্রদায়ের সবাই খারাপ হতে পারে না। ভালো মন্দ মিলিয়েই মানুষ। এটার পেছনে একটা কারণ হতে পারে লেখকের নিজের ধর্মবিশ্বাস। আরেকটা কারণ প্রেক্ষাপট থেকেই জানা যায়। সেসময়ে অর্থাভাবে লেখক উপন্যাসটি প্রচার করতে পারছিলেন না। পরবর্তীতে রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী জুনিয়র মাদ্রাসার মুসলিম ছাত্রবৃন্দ লেখককে এজন্য ৩০০ টাকা আর্থিক সাহায্য প্রদান করেন। যেকারণেই হোক, এটা এই উপন্যাসের সীমাবদ্ধতা। তবে, নেতিবাচক মুসলিম চরিত্র-ও এখানে আছে। এর বাইরে বলতে গেলে উপন্যাসটি কাল্ট ক্লাসিক। প্রকাশের পরপরই অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৪৯ সালের মধ্যেই এ গ্রন্থের ২৩তম সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং দেড় লক্ষের বেশি কপি বিক্রি হয়। এ উপন্যাসের জনপ্রিয়তার কারণ সস্তা বা হালকা আবেদন নয়, বরং উপন্যাসটিতে সততা ও সরলতার সাথে প্রকাশ পাওয়া মুসলিম বাঙালি জীবনের চিত্র। বিশেষত পরিচয় পর্বে লেখক যে মাধুর্য সৃষ্টি করেছেন তা যেকোন শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের সাথে ঠেক্কা দিতে পারে। এ উপন্যাস সম্পর্কে মুহম্মদ আবদুল হাই এর কথা থেকেই তাঁর আচ পাওয়া যায়, ‘মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের নরনারীর এমন টিপিক্যাল চরিত্র নজিবুর রহমানের মতো আজো কেউ চিত্রিত করতে পারেন নি’।
বইয়ের ভালো লাগা কয়েকটা অংশঃ
- নুরল অসলাম দেখিয়েছিলেন, চাকরিজীবীর শারীরিক ও মানসিক সমুদয় ইন্দ্রিয় সর্বক্ষণ প্রভুর (মানে বস বা মালিক) মনোরঞ্জন সম্পাদনের জন্য নিয়োজিত রাখিতে হয়। এ নিমিত্ত চাকরিকে তিনি অন্তরের সহিত ঘৃণা করিতেন। বিএ পাস করিয়া স্বাধীন ব্যবসায়ের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিবেন, ইহাই তাহার জীবনের স্থির সংকল্প ছিল।
- নীচ বংশের কন্যা আনিলে যত দোষ না হয়, নীচ ঘরে মেয়ে বিবাহ দেওয়ায় তাহা অপেক্ষা বেশি দোষ।
- পৃথিবী সর্বংসহা হইলেও সুচের ঘা সহ্য করিতে পারে না, আর স্ত্রীলোক পরম ধৈর্যশীলা হইলেও পিতামাতার অযথা নিন্দাবাদ সহ্য করিতে পারে না।
- ন্যায়পথে থাকিলে লোকে কী বলিবে, সে ভয় আমি করি না। আমি তো তাহাকে তিরস্কার করি নাই। কেবল তাহার ব্যবহারে দুঃখিত হইয়া উপদেশভাবে কয়েকটি কথা বলিয়াছি মাত্র।
- মা মরণকালে আমাকে উপদেশ দিয়াছিলেন, সংসারে যত বিপদে পড়িবে, ততই খোদাকে আকড়াইয়া ধরিবে, বিপদ আপনাপনি ছাড়িয়া যাইবে।
- প্রেমময়ী প্রেমের ছলে রেখো দাসে চরণতলে।
প্রাণ জুড়িয়ে যায় এমন চমৎকার লেখা। আপনাদেরকেও আমন্ত্রণ জানাই।