বাঁকাউল্লার দপ্তর 19th সেঞ্চুরি-র শেষপদে রচিত গোয়েন্দা কাহিনী, ১৯৮৩-তে সুকুমার সেন সম্পাদিত এডিশন থেকে নেওয়া সংকলন। Bankulla is the pen-name of Barkatulla Khan who after finishing Madrasa Education joint police department, most probably his joining period is 1844 -1848. The book was first published before 1896. The book contains interesting detective stories, twelve in number, narrating incidents of real life.
"সত্য ঘটনা অবলম্বনে" এই একটা ট্যাগ দেখলেই পড়ার আগ্রহ অনেক গুন বেড়ে যায়। তাহলে ধরুন যদি দেখেন সব গুলোই পুলিশ কেস তাহলে আগ্রহ কোন যায়গায় যাবে? আর তাও আবার ঘটনা নিকট কোন সময়ের না। বলা হয়ে থাকে এইটা উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীনতম ক্রাইম কাহিনী। স্বাভাবিক ভাবেই প্রত্যাশার পারদ তুংগে উঠে বসে থাকবে।
অনেক গুলো ছোট ছোট ঘটনা নয়ে বইটা এগিয়েছে। বাকাউল্লাহর পুলিশ জীবনের সব কাহিনী। কাহিনী গুলো থেকে তৎকালীন সময়ের অবস্থান খুব ভাল করেই বোঝা যায়। পড়তে খারাপ লাগেনি। তবে সাধু ভাষার কারনে একটু ঝামেলা লেগেছে বইকি। সম্পাদনা করার সময়ে চলিত ভাষায় রূপান্তর করলে সুখ পাঠ্য হত আরেকটু।
টানটান উত্তেজনাময়। শেষ দিকগুলো অনাটকীয়ভাবে সমাপ্ত হয়েছে। সত্যিকারের মামলা বলেই হয়তো। কিছু পরিভাষা, কিছু বাংলা দিলপসন্দ হয়েছে। যেমন: বাতাবন্দি (কর্ডন করে রাখা), ঘোরতোলা বিনামা (বুট জুতা), মাল আখেরি (Closing Stock)।
গোয়েন্দা কাহিনি সাহিত্যের অন্যতম প্রসিদ্ধ এক শাখা। থ্রিল, রহস্য, চো র-পুলিশ ধরপাকড়ের মাঝে বেশ রোমাঞ্চ আছে। গোয়েন্দা কাহিনি বললেই মাথায় আসে বিখ্যাত ❛শার্লক হোমস❜ এর কথা। তবে দেশী সাহিত্যে নজর দিলে এমন রোমাঞ্চ কাহিনির ক্ষেত্রে নাম আসবে ❛ব্যোমকেশ❜ বা ❛ফেলুদা❜ এর কথা। তবে সাহিত্যে প্রথম গোয়েন্দা বা দারোগা কাহিনি কবে এসেছে এই প্রশ্নের উত্তর বেশ ঘোলাটে। অনেকে অনেকে বলে গিরিশচন্দ্র বসুর ❛সেকালের গোয়েন্দা কাহিনি❜ আবার অনেকে বলে দারোগা প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের ❛দারোগার দপ্তর❜। এদের কাটিয়ে আরেকটি নাম লোকমুখে প্রচার হয়। বাংলার প্রাচীনতম ক্রা ই ম কাহিনি হিসেবে ❛বাঁকাউল্লার দপ্তর❜ কে বলে থাকেন। ধারনা করা হয় ১৮৩০ বা ৪০ এর দিকে বরকতউল্লাহ খাঁ নামে এক দারোগা ছিল। তার চাকরিজীবনে ঘটিত কিছু ঘটনা নিয়েই বইটি রচিত। তবে ঘটনাগুলোর লেখক স্বয়ং সে ব্যক্তিই নাকি সেটা নিয়ে তর্ক করে অনেকেই মগজের কারফিউ ভেঙেছেন। সঠিক কবে প্রকাশিত তাও নির্দিষ্ট করে বলা যায়না। বর্তমানে আ সা মি পাকড়াও করা অতীত থেকে বেশ সহজ। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কাজের সময় আর শ্রম কমেছে। অপরাধ যত টেকনোলজিক্যাল ভাবে করা যায় তেমনভাবে পাকড়াও করার পন্থাও আছে বেশ। কিন্তু অতীতে এমনটা ছিল না। অ প রা ধ তখন এত চিকন বুদ্ধিতে হতো কিনা কে জানে, তবে শনাক্তকরণ ছিল সময়সাধ্য। মাস পেরিয়ে যেত শুধু স্বাক্ষী খুঁজতে। তেমন এক কালেই দারোগা বরকতউল্লাহ পুলিশে চাকরি করেছেন। অনেকে বলে বরকত না বাঁকাউল্লা নামেই এক দারোগার কাহিনি আছে। সে যাই হোক অতীতের প্রযুক্তিহীন, ঘোরারগাড়ির যুগে অপরাধও বেশ ঘটতো। বলা যায়, ❛জোর যার মুল্লুক তার❜ ধরনেই অপরাধ ঘটতো। খাঁ সাহেবের চাকরিজীবনে ঘটা বেশ রোমাঞ্চকর কিছু ঘটনা আছে। আমরা প্রায়ই বলি আগের মানুষ বেশ নাইস, কিউট ছিল। আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম বলে অবিভক্ত মহাদেশের সময় মাঝেমধ্যে একটু মিস করি। তবে ভালোর মাঝেও খারাপ ছিল। সেই খারাপেরাই দুষ্কম্য করতো।
এই যেমন আগেও লোকে ছদ্মবেশ ধরে আখড়ায় লুকিয়ে থাকতো। তাদের সাধু সমন্ত ভেবে লোকে প্রণাম করতো। কিন্তু শেষমেষ দেখা যায় ব্যাটা ব দ। এখনো যেমন প্রেমিকাকে না পেলে জেলাস প্রেমিক ঠিকই প্রেমিকার ক্ষতি করে বসে সেই ঊনবিংশ শতাব্দীতেও হরিশ নামে এক লোক এ কাজ করেছিল। আর খাঁ সাহেব তাকে পাকড়াও করেছিলেন।
বসের হম্বিতম্বি ঐকালেও ছিল। খাঁ সাহেবের বস তাকে মাথায় আল্টিমেটাম দিয়ে নথি জালের তদন্তে পাঠালেন। কিন্তু বেচারা একা আর তৎক্ষণাৎ যোগাযোগের সুবিধার অভাবে নানা ঘোল পেরিয়ে কেস সমাধানের পথে এগোলো।
রায় মহাশয়ের ভগ্নীর ঘটনাও বেশ চটকদার। বেনামী কোনো এক ঘোষ দাবি করে রায় মহাশয়ের বিধবা ভগ্নী পেট বাঁধাইয়াছেন। আবার গর্ভপাতও করেছেন। তাই নিয়ে গায়ের লোক দোষ দিলো। জাত গেলো, জাত গেলো! উপায়ান্তর করতে খাঁ সাহেবের তলব। দেখা যাক বিধবা ভগ্নীর জাত আসলেই গেছিলো নাকি ষড়যন্ত্র অন্য খালে।
আগের যুগেও চোখে দেখার মতো খু ন হতো। এই যেমন দেওয়ানজির আমলে প্রতিবাদ করা এক লোককে দেয়ালে গেঁথে হ ত্যা! কেন, কীভাবে সেটাই বাঁকাউল্লাকে খুঁজে বের করে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।
এক কাজ থেকে ফিরতে না ফিরতেই খাঁ সাহেবকে এক মাসের আলটিমেটাম। চু রি আর খু নের ঘটনার তদন্ত করতে হবে একমাস সময়। আ সা মি ধরা শক্ত হলেও ধরা যাবে। কিন্তু ঘটনার সময় ছিঁড়ে যাওয়া এক দলিলের খন্ড খুঁজে পেতেই হবে। নাহয় এগারো বারো বছরের হারাণী দাদার সম্পত্তি পাইবে না। বেজায় শক্ত মামলা। দারগা বাবুর ঘাম ঝরবে।
ফেলুদা, শার্লক এদের অমীমাংসিত তদন্ত আছে না? যার কাছে তারা হেরে গেছিলেন বা শেষটা হয়নি। বাঁকাউল্লা সাহেবেরও এমন দশা হয়েছিল। এই যেমন এক মান্নি ব্যক্তির পয়সা চু রি র দায় পড়েছিল আশ্রিত এক যুবকের ওপর। তদন্তে ঘটনা জানা গেলেও খাঁ সাহেব আসল আ সা মি ধরতে গিয়ে একেবারে লেজে গোবরে অবস্থা। আ সা মি, প্রমাণ সবকিছু গায়েব।
এবারের তদন্ত আরো কঠিন। পুরোনো আসামির আবির্ভাব নতুন নামে। একেবারে যাকে বলে, ❛Old wine in a new bottle❜। কিন্তু খাঁ সাহেব সে কথা প্রমাণ তো করতে পারছেন-ই না উপরন্তু তার ভ্রম হয়েছে বলে কথা শুনতে হচ্ছে। খু নে র কিনার করতে গিয়ে নানা হল্লা। তবে দারোগা বাবু এবার আদাজল খেয়ে নেমেছেন। ইনিয়ে বিনিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে আসামির স্বীকারোক্তি নিবেনই নিবেন!
ছদ্মবেশের কঠিন উদাহরণ জেনেছিলাম মরিস লেবলাঁর সৃষ্ট চরিত্র ❛আর্সেন লুপাঁ❜ র মাধ্যমে। তার আসল চেহারা যে কোনটা কেউ বুঝেই পেতো না। চোখের সামনে হাজারবার দেখেও পরেরবার বান্দাকে চেনার উপায় অসাধ্য। বাঙালি চো রের ছদ্মবেশ তেমনটা না হলেও মোটামুটি ভালোই ছিল। সে বহুরূপের কারণেই খাঁ সাহেব এবারের তদন্তে বেশ কাঠখড় পার করেছেন। এমনকি বেচারাকে মাস তিনেক গারদের সাজাও ভুগতে হয়েছে!
গহনা নারীর প্রিয় সম্পদ। তবে গহনা প্রিয় কুমির দেখেছেন? শুনেছেন কখনো কুমির গহনা গিলে ফেলে? দারোগা সাহেব এবার পড়লেন অদ্ভুত গহনাভোজি এক কুমিরের তদন্তে। কুমির মিয়া নাকি নদীতে চান করতে নামা নারীদের ডুবিয়ে তাদের গয়না খুলে নেয়। তাজ্জব ব্যাপার। এর সমাধান কীভাবে হবে?
রক্ষকই ভক্ষক। এমনটা প্রায়শই দেখা যায়। দারোগা বাবু এবার উমোকান্ত বাবুর তদন্তে নামলেন। কঠিন তদন্ত। সন্দেহ আছে অনেক। কিন্তু প্রমাণের উপায় নাই।
ডা কা তি করে সর্বস্ব নিয়ে মানব হ ত্যা অতি প্রাচীন রীতি। সে আমলেও হয়েছিল। জানতে হবে দারোগা বাবু সমাধান করেছিলেন কেমনে?
জ্ঞানিকাবল্লভ বাবুর পয়সা ভরতি সিন্দুক চুরি গেছে জল পথে। খোঁজে নামে যথারীতি বরকতউল্লাহ খাঁ দারোগা। সন্দেহভাজন একজনের সাথে কথাও হয়। প্রশ্ন হলো পাঁচ মইন্না সিন্দুক জলের মধ্যে তুলে কার সাধ্যি? হাতির শক্তি থাকা চাই এমন লুট করতে।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
বাংলার প্রাচীনতম ক্রা ই ম কাহিনি ❝বাঁকাউল্লার দপ্তর❞। অধ্যাপক সেনের সংস্করণ থেকে বাংলাদেশে নতুন করে সম্পাদনা করেন মাহবুবুল আলম। বইটিতে বাঁকাউল্লার চাকরি জীবনের ১২ টি তদন্ত নিয়ে বলা আছে। গল্প সংকলন বলা যায়। বাস্তব জীবনে��� গল্প। বইটি অতি প্রাচীনকালের অ প রা ধে র কাহিনি নিয়ে লিখিত। প্রাচীন আমলের হিসেবে সে সময় ঘটা ঘটনাগুলোর পন্থা, সমাধানের ধরন বেশ ভালোই লেগেছে। যেসব ফাঁকফোকর রয়েছে সেসব ধর্তব্যের মধ্যে না নেয়াও যায় আরকি। প্রাচীনকালের স্বাদ আস্বাদনে বইটি বেশ ভালো। আর মূল লেখক আসলে কে সেটা নিয়ে তর্ক রয়েছে। তাই বইয়ে ব্যবহৃত ভাষা সাহিত্য প্রাঞ্জলতাপূর্ণ নয়। বর্ণনার আকারে লেখা ছোটো ছোটো ঘটনা। বইয়ের সবথেকে কঠিন দিক ভাষা। এত আগের সাধু ভাষা আর অনেক অপরিচিত শব্দের প্রয়োগ পড়তে গিয়ে ঘোল তো খেয়েছি বলাই বাহুল্য। যদিও সম্পাদক আলাদা টিকায় শব্দগুলোর মানে উল্লেখ করেছিলেন। পড়ার সময় গল্পের খাতিরে কিছু শব্দের মানে এমনিতেই বুঝে গেছিলাম।
১২ টি ঘটনার মধ্যে আমার ❛গহনাভোজি কুমির❜ আর ❛কেঁচো খুঁড়িতে সাপ❜ এই দুটো বেশ ভালো লেগেছে। ❛বহুরূপী❜ গল্পের দারোগা সাহেবের শেষতক বেকার চৌদ্দ শিকের সাজা ভোগটাও চমকপ্রদ ছিল।
দারোগা হিসেবে খাঁ সাহেব কেমন ছিল এমন যাচাই করার আসলে তেমন অবকাশ নেই। সেকালের তদন্ত ধরনের সাথে বর্তমানের ফারাক তো আছেই। যেসব জায়গায় মনে হয়েছে দারোগাবাবু নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছেন সেগুলো হয়তো সেকালের জন্য বিশেষ অবাস্তব ছিল না। মুসলমান দারোগা হলেও তাঁর মাঝে সম্প্রীতি এবং উদারতার পরিচয় ছিল। কাজের খাতিরে বা ধর্মীয় কারণে গ্রহণযোগ্য হতে জায়গাভেদে তিনি ছদ্মবেশ নিয়েছেন। মূল অপরাধীকে ধরতে আর নির্দোষকে মুক্ত করতে তার চেষ্টা বেশ ভালো ছিল।
সময়টাকে প্রাধান্য দিয়ে সেকালের ক্রা ই ম কাহিনি হিসেবে বইটি আপনি একবার পড়তেই পারেন। কিন্তু ইবুক ছাড়া পড়তে পারবেন না! কারণ বাজারে বইটির কপি নেই আর।
১৮৩০ সালের দিকের বাঙালী দারোগা বরকতুউল্লা খাঁ, তারই সলভ করা ১২টি কেস নিয়ে এবই। এটাকে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম ক্রাইম কানিহী বলা হয়। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৯৬ সালেরও আগে। বইখানা আছে তবে এর আদি লেখক যে কে ছিলেন তা আজ আর জানা যায় না।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম গোয়েন্দা কাহিনী সংকলন বলা যায় যদিও সেখানে তর্ক থেকে যায়। বরকতউল্লাহ্ খাঁ নামক একজন পুলিশ কর্মচারীর জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি কয়েকটি কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছেন। ছোট ছোট গল্পের এই সংকলন। গোয়েন্দা সাহিত্যের গোঁড়ার দিকের লেখা বলেই আমাদের মতো পাঁড় পাঠকরা খামতিগুলো বুঝতে পারবেন। কিন্তু কেউ যদি থ্রিল পাওয়ার জন্য এই বই পড়ে তাহলে হতাশ হবে। লেখক যেহেতু মূলত 'লেখক' নন তার লেখার ধরনও তত আগ্রহ জাগায় না। তবে আপনি কুতূহলী হলে কিংবা গোয়েন্দা কাহিনীর পাঠক হলে ে বই অবশ্যপাঠ্য।
বই : বাঁকাউল্লার দপ্তর সম্পাদনা : মাহবুবুল ইসলাম প্রকাশক : ভূমিপ্রকাশ ধরণ : গোয়েন্দাকাহিনী ( সংকলন ) পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৯৬ প্রচ্ছদ : রোমেল প্রথম সংস্করণ : আগস্ট ২০১৭ সংস্করণ : আগস্ট ২০১৭ ( প্রথম মুদ্রণ ) মুদ্রিত মূল্য : ১৩৫ টাকা ISBN : 978-984-930-180-6
ফ্ল্যাপের কথা :
যতদূর সন্ধান পাওয়া যায়, বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম ক্রাইম কাহিনি হলাে পুলিশের দারোগা বাঁকাউল্লার কীর্তিকলাপ। "বাঁকাউল্লার দপ্তর নাম দিয়ে প্রকাশিত দারোগা সাহেবের বারােটি কীর্তির প্রথম প্রকাশ যে কবে, সে সম্বন্ধে জানা যায় নি । তবে বাঁকাউল্লার দপ্তরে বর্ণিত ঘটনার সময়কাল যতদূর সম্ভব উনবিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকের একেবারে শেষ দিকে কিংবা চল্লিশের দশকে। কারণ ঠগী দমনের জন্য নির্দিষ্ট আলাদা বিভাগের সুপারিনটেন্ডেন্ট স্লীম্যান সাহেব কমিশনার পদে উন্নীত হয়েছিলেন ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে।
অবশ্য বরকতউল্লা খাঁ যে তার কীর্তিকাহিনি ওই চল্লিশের দশকেই রচনা করেছেন, তা-ও নয়। তিনি নিজেই লিখছেন, “আমার নিজের জীবনে যে সকল অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটিয়াছে...তাহা অতি অদ্ভুত, অবসরকালে সে সকল বৃত্তান্ত শুনিবার জন্য দেশের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি পথ খরচ করিয়া আমার দরিদ্র-কুটীরে পদার্পণ করেন।”
অধ্যাপক সেন, আরও জানিয়েছেন, বরকতউল্লার সফল তদন্তের কিছু কাহিনি পুলিশের ফাইল থেকে উদ্ধার করে ইংরেজি ভাষায় ছাপা হয়েছিল আনুমানিক ১৮৫৫ সালের পর। তার বেশ কিছুকাল পরে এটি বাংলায় রূপান্তরিত ও মুদ্রিত হয় "বাঁকাউল্লার দপ্তর" নামে। আনুমানিক ১৯০৫ নাগাদ বইটির একটি সংস্করণের পর অধ্যাপক সুকুমার সেনের সম্পাদনায় ১৩৮৯ বঙ্গাব্দে (ইং ১৯৮৩) নতুন করে প্রকাশিত হয় “ বাঁকাউল্লার দপ্তর”।
ব্যক্তিগত মন্তব্য :
ইংরেজ অধিকৃত ভারতে উনবিংশ শতকের ত্রিশের দশকেই পুলিশ-ব্যবস্থা প্রচলিত হয় অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের জন্যে ৷ বাঁকাউল্লা তখনকার বাঙালি মুসলিম দারোগা ৷ অনেক ক্ষেত্রে বাঙলায় তাকে পরতে হতো নানা সমস্যায় ৷ ধর্মীয় কুসংস্কারের জন্যে অনেক স্থানেই ছদ্মবেশে ৷ বাঁকাউল্লার দপ্তর বাঙলাসাহিত্যের প্রাচীনতম ক্রাইম কাহিনী ৷
বইটিতে বারোটি কীর্তির গল্পই তুলে ধরা হয়েছে ৷ যার একেকটির সাথে অন্যটির কাহিনীর কোন মিল নেই ৷ এ থেকেই বুঝা যায় তখনকার বাঙলাতে বিভিন্ন ধরণের ক্রাইম হতো ৷ যেমন 'নবীন নবেসেন্ধা' শিরোনামের কাহিনীটি বেশ কৌতুহলদীপ্ত ৷ এটি মূলত সরকারী নথি জাল করার মতন অপরাধের কাহিনী ৷ আবার, 'রায় মহাশয়' কাহিনীটির মাধ্যমে বুঝা যায় তখনকার সমাজ-ব্যবস্থায় দলীয়-গুষ্টি এসবের তিক্ততার পরিণতি পর্যায় ৷ তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দুটি কাহিনী 'বহুরুপী' আর 'উমোকান্ত' শিরোনামের ৷ প্রথমটিতে মানুষের চেহারা জাল, চরিত্র জালের মতন ঘটনা আর দ্বিতীয়টিতে শিশু বলি দেবার মতন ঘৃণ্য অপরাধের পর্দা ফাঁস ৷
বইটি পড়লে বাঁকাউল্লার বিচক্ষণতা বেশ্ টের পাওয়া যায় ৷ সেসময়ের সমাজের অপরাধ ,অপরাধের মাত্রা ও শাস্তির বিধান নিয়েও খানিকটা ধারণা হয় ৷ একবসায় বইটি পড়া যায় অনায়াসেই ৷ যারা একটু পুরোনো ধাঁচের আমাদের উপমহাদেশিয় ক্রাইম কাহিনী পড়তে চান, তাদের জন্যই 'বাঁকাউল্লার দপ্তর' ৷
বই নেমঃ- বাকাউল্লার দপ্তর জনরাঃ- গোয়েন্দা কাহিনী ( সত্য ঘটনা) বানোয়াট গোয়েন্দা কাহিনীর চেয়ে বাস্তবের গোয়েন্দা কাহিনী বেশি অসাধারন এই বইটি তার প্রমান। ব্রিটিশ ভারতে পুলিশের প্রথম দিকের গোয়েন্দা, দারোগা বাকাউল্লার ১২ টি অসাধারন গোয়েন্দাগিরি নিয়ে বইটি এক কথায় অসাধারন। রেটিং ৫/৫
ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগের এক দারোগার ১২ টি ভিন্ন তদন্তের ঘটনার বর্ণনা আছে এই বইয়ে। দারোগাটির নাম কি ছিল এখন তা নিশ্চিত করে বলা যায় না, বাঁকাউল্লা নামে লেখা হলেও তার আসল নাম বরকতউল্লা ছিল এমন ধারণা করেন কেউ কেউ। সময়কালও নিশ্চিত করে বলা না গেলেও বইয়ে উল্লিখিত বিভিন্ন চরিত্রের নাম থেকে ধারণা করা হয় সেটা ঊনবিংশ শতকের চল্লিশের দশকে বা তার পরেই হবে। সেকালের মানুষ খুব সহজ সরল ভালো মানুষ ছিল এ হয়তো আমাদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা, তবে চাতুরী, শঠতা, হিংস্রতাও যে কম ছিল না এই কাহিনীগুলো তারই প্র��াণ। আমাদের বইয়ের লেখক দারোগা খাঁ সাহেব ছিলেন বুদ্ধিমান, অসম সাহসী। সব ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধীকে হয়তো ধরা যায় নি, কিন্তু জীবন বাজী রেখে বারবরই তিনি অপরাধীকে ধরার চেষ্টায় ব্রতী হয়েছিলেন। তার সৎ, অসাম্প্রদায়িক, পরোপকারী চরিত্রটিও ভালো লেগেছে ভীষণ। তদন্তের প্রয়োজনে কখনো গিয়েছেন নবদ্বীপে, কৃষ্ণনগরে, পাবনা, তখনের বাংলার অন্তর্ভুক্ত দুমকা, এমনকি কাশীতেও। একবার তো মিথ্যে অভিযোগে ফেঁসে তাকেই জেল খাটতে হয়েছিল। সত্যিকারের গোয়েন্দা কাহিনীও যে কতো রোমাঞ্চকর হতে পারে বইটির কাহিনীগুলো তার প্রমাণ।
বাংলায় প্রকাশিত প্রথম রহস্য বা গোয়েন্দা কাহিনীর বইটা আসলে দারোগা বরকতউল্লাহর সমাধান করা কেস গুলোর সংকলন। কে লিপিবদ্ধ করেছেন তা ঠিক জানা যায় নি। দেড়শ বছর আগেও এমন অভিনব সব অপরাধ হতো, ভাবতেই কেমন লাগে। তবে তদন্ত করার ধরন ও তথ্য সংগ্রহের উৎসগুলো এত বছর পরেও প্রায় একই রয়ে গেছে বলা যায়। পুলিশ সায়েন্স ও ক্রিমিনোলজি নিয়ে যারা পড়েন, তাদের জন্য বেশ ইন্টারেস্টিং বই। বিনোদন এবং একাডেমিক দুই ক্ষেত্রেই।
খুবই উপভোগ্য একটি বই। দেড়শো বছর আগের অপরাধের তরিকা এখনো গায়ে সমান রোমাঞ্চ এনে দেয়। বাঁকাউল্লাহ সাহেবের তদন্তের বর্ণনা চমৎকার। সেই সময়ের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের মারাত্মক অস্বাভাবিক ঘটনাকে যুক্তির দৃষ্টিতে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। থ্রিলার প্রেমিকদের জন্য সুন্দর একটা অভিজ্ঞতা এই বইটি।