বইটা যখন হাতে নিলাম, মনে হল এখানে বুঝি বিভিন্ন মানসিক সমস্যা ও তার সমাধান নিঢে অালোচনা করা হয়েছে। কিংবা মানুষজন তার সমস্যার কথা লিখে চিঠি পাঠাইছে, তার জবাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পড়তে গিয়ে দেখলাম সম্পূর্ণ উল্টা ব্যাপার।
লেখিকা তখন কাজ করতেন লন্ডনের বিভিন্ন হাসপাতালে। নিজের ডাক্তারি জীবনে সম্মুখীন হওয়া কয়েকজন মানসিক রোগীর ১৮ টি কেসহিস্ট্রি নিয়ে লেখা বই এটি।
বইটি পড়তে গিয়ে টের পেলাম, ঘটনাগুলো দূর প্রবাসে ঘটলেও, অামাদের দেশের অবস্থা একেবারে ভিন্ন না। মানসিক সমস্যাগুলো লেখক অত্যন্ত সুন্দর ভাবেই উপস্থাপন করেছেন। বইটি বর্তমানে বাজারে খুব একটা পাওয়া যায় না। তবে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। সেবা প্রকাশনীর চমৎকার একটি বই।
খুব উত্তেজনাকর সাইকোলজিক্যাল জনরার কিছু মনে করলে ভুল করবেন ।একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের গল্পের মত করে লেখা ডায়েরি বলা যেতে পারে। আঠারটি অধ্যায়ে বিভিন্ন রোগীদের কেস হিস্টরি লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি । সব গল্পে সমাধান নাই, বরং শেষে রোগীদের অসহায়ত্বই ফুটে উঠে । মানব জীবনের এত সব অদ্ভূত আর জটিল সমস্যা গুলো পড়লে মন কেমন উদাস হয়ে যায়। আমরা, মানুষরা কত দুর্বল আর অসহায়! আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করলাম, পশ্চিমাদের সমাজ ও পরিবার ব্যবস্থা ব্যক্তি মানুষকে নিঃসঙ্গ করে ফেলে। সেই দিক থেকে উপমহাদেশে জন্ম নিয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে।
এই বই পড়েছি দেখে ভাবার কোন কারন নাই আমার কোন মানসিক প্রবলেম আছে বা অতি শীঘ্রই হতে যাচ্ছি । কারন এটা একটি নন ফিকশন বই । ডাক্তারের দেওয়া কোন এনালাইসিস নয় বরং ১৮টি ছোট ছোট ডাক্তারের রুগিদের কেস হিস্টোরি নিয়ে সাজানো একটি বই । রিয়েল লাইফ স্টোরি সাইকোলজিক্যাল বই । বেশ ভালোই লাগল ।
এই বই এর আগে জানতাম না লেখিকা সম্পর্কে। ডাঃ আনোয়ারা বেগম, বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী। পাশাপাশি সাহিত্যের জগতেও রয়েছে তার পদচারণা। সব্যসাচী লেখক প্রয়াত সৈয়দ শামসুল হকের সহধর্মিণী তিনি। সেই সুবাদে আনোয়ারা সৈয়দ হক হিসেবেই অধিক সুপরিচিত। যদিও এই বইটির কভারে লেখিকার নামে ডাঃ আনোয়ারা বেগম লেখা। বইএর ভেতরেও লেখিকা নিজেকে ডাঃ বেগম সম্বোধন করেছেন। সহজ সাবলীল ভাষায় তিনি লিখেছেন তার কয়েকজন রোগীর কেস হিস্ট্রি। গল্পের ছলে এবং সঙ্গত কারণেই ছদ্মনাম ব্যবহার করে। মোট আঠারোটি কেস। একেকটি গল্প পাঁচ থেকে বিশ পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ। প্রতিটি রোগীর গল্প আলাদা, তাদের জীবনের গল্প আলাদা। মাঝে মাঝে তাদের মন ও সেই মনের সমস্যার ধরন দেখেও অবাক হতে হয়। একজন পরিণত মানুষের চরিত্র-আচরণ প্রভাবিত তার শৈশব-কৈশোর এর জীবন, পরিবেশ ও অভিজ্ঞতা দ্বারা। এই স্বতঃসিদ্ধ সত্যটিই আরো একবার অনুধাবন করায় বইয়ের চরিত্রগুলো। প্রতিটা গল্পে রোগীর ব্যবহারে প্রথমে একটু বিরক্ত হবেন, কিন্তু আস্তে আস্তে লেখিকা আপনাকে নিয়ে যাবেন তাদের জীবনের পটভূমিতে, যার কারণেই রোগীর বর্তমান পরিস্থিতি। তখন হয়তো প্রশ্ন জাগবে মনে, মানুষের জীবন এমনও হয়? গল্পগুলো শুরু হয় গৎবাঁধা হাসপাতালের করিডোরে, হয়তো ডাক্তারের সাথে নিয়মমাফিক সাক্ষাৎ, হাসপাতালে ভর্তির জন্য সোশাল ওয়ার্কার বা আত্মীয়ের সাথে আসা রোগী অথবা এমারজেন্সি ডিপার্টমেন্টে। কিন্তু একেকটা গল্পের পরিণতি একেক রকম। কখনো রোগী সুস্থ জীবনে ফিরে গেছেন, কখনো হয়তো কারো জীবনের সুর আটকে গেছে একটা বাক্যেই, কখনো বা বছরের পর বছর কোন রোগী বার বার ফিরে আসছেন সেই হাসপাতালের করিডোরেই। ১৮৫ পৃষ্ঠার বই। একবার শুরু করলে শেষ না করে ওঠা দুষ্কর। অথবা আমার মত রয়েসয়ে 'One story at a time' স্টাইলেও পড়তে পারেন। :)