সিরিয়াল কিলিং শুরু হয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেসে। টার্গেটদের কেউ ড্রাগডিলার, কেউ গ্যাংস্টার, কেউ আবার বেশ্যার দালাল কেউ গডফাদার। মারা পড়ল রানা এজেন্সির এক এজেণ্ট, জনি। লাশটা দেখতে গিয়েছিল রানা, ওকে খেদিয়ে দিল পুলিশ। কিন্তু ঘটনাক্রমে তদন্তের দায়িত্ব পড়ল ওরই ওপর। কিছু পুলিশ অফিসার ভাবছে, খারাপ লোকরাই তো মরছে, কাজেই অসুবিধা কী? জানা গেল, কোনও কোনও অফিসারের খুঁটির জোরের কাছে নতি স্বীকার করে নিয়েছেন পুলিশ ক্যাপ্টেন। সুযোগটা পুরোপুরি নিচ্ছে খুনি, বিস্তার করছে ওর জাল। সে-জাল যে রানাকেই জড়িয়ে ধরবে অকস্মাৎ, ভাবেনি ও। ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে হাইওয়েতে নিয়ে যাওয়া হলো ওকে- মেরে ফেলে উধাও করে দেয়া হবে লাশ। খতম হয়ে যাবে রানার সমস্ত জারিজুরি।
কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন। ডাক নাম 'নবাব'। তাঁর পিতা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মাতা সাজেদা খাতুন। কাজী আনোয়ার হোসেন সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসাবে ষাটের দশকের মধ্যভাগে মাসুদ রানা নামক গুপ্তচর চরিত্রকে সৃষ্টি করেন। এর কিছু আগে কুয়াশা নামক আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতেই জন্ম নিয়েছিলো। কাজী আনোয়ার হোসেন ছদ্মনাম হিসেবে বিদ্যুৎ মিত্র নাম ব্যবহার করে থাকেন।
মাসুদ রানা... বাংলাদেশের কিংবদন্তী স্পাই। সৃষ্টিতে তার ক্ষমতা অসীম উচ্চতা পেয়েছে, ছাড়িয়ে গেছে অনুপ্রেরণা বণ্ডকেও। দেশের ছেলে বুড়ো কে জানেনা এর নাম। যারা বই পড়েনা তারাও শুনেছে এমনটাই বলবে। অথচ এর আগে কখনও মাসুদ রানা পড়িনি।
আমি তিন গোয়েন্দার পাঠক। এবং পাঠক হিসাবে যথেষ্ট সমস্যা আছে আমার, যে ধারা পছন্দ করিনা তার বাইরেও খুব একটা যাইনা। হার্ডকোর থ্রিলার পড়া শুরু করেছি খুব বেশিদিন হয়নি। হয়তো হাতে হাতের আঙ্গুলে গোনা যাবে বছর, পাঁচ কিংবা সাত!
থ্রিলার গল্পের মূল ফোকাস রহস্যই হতে হবে তেমনটা জরুরি না। থ্রিলার গল্পের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে থ্রিল কিংবা উত্তেজনা। যার পারদ যত উঁচুতে থাকবে গল্প তত উপভোগ্য হবে। শার্প শুটার মাসুদ রানার সুদীর্ঘ সিরিজের অন্যতম সাম্প্রতিক বই। বইটি থ্রিলার। রহস্যোপন্যাস নয়। এবং আমার পড়া প্রথম মাসুদ রানা এটিই।
গল্প শুরু হয়েছে খুন-খারাপি দিয়ে। ট্রাফিক পুলিশের পোশাক পড়া কেউ পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেইঞ্জে গুলি করে মারছে একের পর এক শিকার। এবং শিকারেরা ধোঁয়া তুলসিপাতা নয়, বরং একেক জন দুর্ধর্ষ অপরাধী। ঘটনাচক্রে মাসুদ রানার দলের এক এজেন্ট মারা পড়ল। নড়েচড়ে বসল রানা আর ওর টিমের স্থানীয় প্রধান শায়লা মারিয়া। ওদিকে লাইসেন্স থাকার পরেও পুলিশ বাঁধা দিচ্ছে ওদের অপারেশনে। বিরক্ত হলেও সরাসরি যুদ্ধে গেলনা রানা, ধৈর্য ধরল বুদ্ধির সাথে। এবং ঘুরেফিরে ওর কাছেই সাহায্যের জন্য আসতে হল বরকর্তাদের।
কিন্তু খুন থেমে নেই। যার উপর সন্দেহ, তার দেখা পাওয়া দায়। সে কি আসলেই খুনি, নাকি অন্য কেউ আছে এর পেছনে? বন্দুকে হাত পাকা খুনির, চোখ বন্ধ করে বলা যায়। বেশি নাক গলিয়ে ফেলল রানা, বিপদ ঘনাল ওর উপরেও। বেঁচে থাকা দায় হয়ে পড়ল ক্রমশ।
গল্পটাকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে সৃষ্টি হয়েছে প্রেক্ষাপট, দ্বিতীয় ভাগে সামনে এসেছে খুনি এবং তৃতীয় ভাগ খুনির সাথে একশন। মোটামুটি সচেতন হলে প্রথম ভাগে খুনির সম্পর্কে অনুমান করা সম্ভব, অন্তত আমি পেরেছি। দ্বিতীয় ভাগে খুনির পরিচয় আপনিই বেরিয়ে আসবে আর তৃতীয় ভাগ তো দুর্দান্ত। যাকে বলে একদম থ্রিলিং।
গল্পের শুরুতে কিছুটা একঘেয়ে লেগেছে, তবে তার স্থায়িত্ব খুব বেশি নয়, বড়োজোর ১০-১৫ পাতা। তারপর দ্রুতই এগিয়েছে গল্প। গল্পটা সবলীল, বিভিন্ন স্থানের বর্ণনা যথেষ্ট প্রাণবন্ত ছিল। যারা বিদেশে যায়নি, কিংবা গাড়ীতে চড়েনি, কিংবা মডার্ন গানফাইট সম্পর্কে অজ্ঞ তারাও বেশ স্পষ্ট দেখতে পাবেন দৃশ্যগুলো। আমার ফায়ারিং রেঞ্জের চ্যাপ্টারটা চমৎকার লেগেছে। গল্পের টুকিটাকি হিউমারও ভালোই লেগেছে। বিশেষ করে, যখন রানা উসাইন বোল্টে থেকেও জোরে লাফ দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামে, কিংবা অন্যদের দু'কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়েনা তখন।
বরাবর পড়েছি মাসুদ রানা, কাছে টানে কিন্তু বাঁধনে জড়ায়না। কিন্তু এই গল্পে কাছে টানার কোনও নমুনা দেখা যায়নি। বাঁধনে জড়ানোর তো প্রশ্নই আসেনা! কিন্তু তাই বলে প্রাপ্তবয়স্ক দু'একটি পরিস্তিতি নেই সেটা ভাবলে ভুল হবে। তবে সেগুলো টুকরো টুকরো এবং পরিস্তিতির স্বার্থে রচিত। গল্পে যে বিষয়টা বেমানান লেগেছে সেটা হচ্ছে একই শহরে একই ভাবে এতোগুলো খুন হয়ে যাবার পরেও যে গোত্রের/টাইপের লোকরা খুন হচ্ছে তাদের সচেতনতার সমূহ অভাব এবং একই ভাবে বিপদের পথে পা দেবার প্রবণতা। যদিও পরের দিকের দু'একটি খুন অবশ্য ব্যতিক্রম হয়েছে। এছাড়া রানা এজেন্সির স্থানীয় চিফ হিসাবে শায়লা'র ভূমিকা যথেষ্ট মনে হয়নি। তার আরও সক্রিয় এবং আত্মনির্ভর হওয়া উচিত ছিল। আরও একটি বিষয় আছে, সেটা বললাম না, বললে স্পয়লার হয়ে যাবে।
যেটা বললাম। এই গল্পে রহস্য মুখ্য নয়। থ্রিলটাই আসল। আমি জানিনা ভিণ্টেজ রানা কেমন, হয়তো এই রানার সাথে তার ছবিটা নাও মিলতে পারে। এতদিন লোকমুখে যা শুনেছি তার থেকে বেশ ভিন্ন মনে হয়েছে রানাকে শুরু থেকে। তবে শেষের দিকে এসে একশন অংশে সম্ভবত চিরায়ত রানার দেখা পাওয়া যায়। তবে আবারও বলছি, যেহেতু সিরিজের অন্য কোনও বই পড়িনি তাই তুলনা করা অন্তত আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
স্ট্যান্ড আলোন থ্রিলার হিসাবে মোটামুটি ষ্ট্যাণ্ডার্ড বই শার্প শুটার। কিছু জিনিশ ছেঁটে বাদ দিলে মোটামুটি জ্যাক রিচার ফ্লেভারও পেয়ে যেতে পারেন। বিশেষ করে বর্ণনা এবং একশন গুলো তো দুর্দান্ত। সেই সাথে খুন হওয়া বদ লোকগুলোর কারও কারও মৃত্যুর পূর্ববর্তী পরিস্থিতি বেশ গুছিয়ে দেখানো হয়েছে। আমার ভালোই লেগেছে ওভারঅল।
ইউ.এস পুলিস (এল.এ.পি.ডি) ডিপার্টমেন্টের সাথে মিলে, তাদের অনারারি পোষ্টে জয়েন করে লস এঞ্জেলস এ ঘটে যাওয়া সিরিয়াল কিলিং কেস সলভ করার গল্প। মাসুদ রানা সিরিজের ইউজুয়াল এসপিওনাজ টাইপ বই এর মধ্যে পড়বে না এটা।
কুইক এন্ড ইজি রিড, এন্টারটেইনিং। Overall, a decent book to kill time.