শামসুর রাহমানের এই আত্মজীবনীতে রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি শুধু নয়, বৈশিক পটভূমিতে কাছ থেকে দেখা বাঙালির গণ-সংস্কৃতির ইতিহাস যেমন প্রকাশিত হয়েছে তেমনি প্রতিভাত হয়েছে তাঁর কাব্যসত্তার ভেতর-বাহির। জীবনে ঘটেছে এমন কোনো ঘটনাকে লুকোতে চান নি তিনি। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী শামসুর রাহমান অনেক অজানা ইতিহাসকে খোলাসা করেছেন স্পষ্টভাবে, ফলে গ্রন্থটি হয়ে উঠেছে বিশুদ্ধ সত্যাশ্রয়ী আত্মজীবনী।
Shamsur Rahman (Bengali: শামসুর রাহমান) was a Bangladeshi poet, columnist and journalist. Rahman, who emerged in the latter half of the 20th century, wrote more than sixty books of poetry and is considered a key figure in Bengali literature. He was regarded the unofficial poet laureate of Bangladesh. Major themes in his poetry and writings include liberal humanism, human relations, romanticised rebellion of youth, the emergence of and consequent events in Bangladesh, and opposition to religious fundamentalism.
পদ্যকারদের গদ্যে ভিন্নমাত্রিক এক সৌন্দর্য ঘিরে থাকে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের আত্মজীবনী "কালের ধুলোয় লেখা" পাঠ করে আরও একবার এই সরল সত্য অনুধাবন করলাম।
১৯২৯ সালে পুরান ঢাকার মাহুৎটুলিতে জন্মেছিলেন শামসুর রাহমান। শামসুর রাহমানকে ''নাগরিক কবি" অভিধায় সম্মানিত করা হয়। কথাটা বোধকরি অসত্য নয়, নগর জীবনের প্রতি কবির বিপুল আগ্রহের ছিঁটেফোঁটা আত্মজীবনীতে পাওয়া যায়। ত্রিশের দশকের পুরান ঢাকার এমন চিত্রময়রূপ বর্ণনা কবি দিয়েছেন, যেন পাঠকের মনে হবে সে নিজেই ঘুরে বেড়াচ্ছে পুরান ঢাকার বিভিন্ন অলি-গলিতে।
ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন শামসুর রাহমান। শিক্ষাজীবনে অনেকের সাহচর্য পেয়েছেন। নিজের গুণী শিক্ষকদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন৷ অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক তার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন না। তবু তাঁর কথা লিখেছেন একাধিকবার। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, হাসান হাফিজুর রহমান, ডেইলি স্টারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ আলী, বদরুদ্দীন উমর এবং আবুল মাল আবদুল মুহিত তাঁর বন্ধুস্থানীয় ছিলেন। এঁদের মধ্যে হাসান হাফিজ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতা, কাব্যপ্রীতি এবং বন্ধুবাৎসল্যের অনেক ঘটনা বিবৃত করেছেন।
শামসুর রাহমানের বন্ধুপ্রীতি অনেকটা 'অন্ধের' মতো ছিল। যেমন, তাঁর নিকটতম বন্ধু আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে ঘৃণিত হয়েছিলেন। কবি হিসেবে তিনি বড়ো হলেও আদর্শের দিক বিবেচনায় উঁচু পর্যায়ের মানুষ ছিলেন না৷ কবিবন্ধু ওবায়দুল্লাহকে নিয়ে অসংখ্য মধুর অতীতের রোমন্থন করেছেন শামসুর রাহমান। কিন্তু সুহৃদের আদর্শিক দ্বিচারিতা তাঁকে আঘাত করেছে বলে মনে হয় না৷
ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স করলেও মাস্টার্স করার কোনো ইচ্ছে কবির হয়নি৷ তাই একই ক্লাসে অনেক বছর থাকতে হয়েছে। জুনিয়ররা সহপাঠী হয়ে গেছে। তা নিয়ে কিঞ্চিৎ পরিমাণ চিন্তা তরুণ শামসুর রাহমান করেননি৷ সিনেমা দেখার পোকা ছিলেন তিনি৷ অবিশ্বাস্য হলেও সত্য মর্নিং শো দেখার লোভে মাস্টার্স পরীক্ষা দিতে যাননি।
অনেক দ্বিচারিতা কবির জীবনে লক্ষণীয়। কয়েকটি উদাহরণ দিই, আইয়ুবের বিরুদ্ধে ''হাতির শুঁড়" নামে কবিতা লিখেছিলেন৷ আবার সেই শামসুর রাহমান আদমজি পুরস্কার পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন। '৭১ সালের ২৬ মার্চ গ্রামের বাড়ি নরসিংদির পাড়াতালী গাঁয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। বর্তমান প্রথম আলো'র সম্পাদক মতিউর রহমান কবিকে ভারতে নিয়ে যেতে গিয়েছিলেন। কিন্তু কবি রাজি হননি। বরং পয়সা ফুরিয়ে গেছে - এই অজুহাতে ফিরে গিয়েছিলেন নিজ কর্মক্ষেত্র দৈনিক পাকিস্তানে। পুরো নয়মাস সেখানেই চাকরি করেছেন৷ হ্যাঁ, তখন অসাধারণ কিছু কবিতা উপহার দিয়েছেন কবি। তবু বলব, টাকার প্রয়োজনে দৈনিক পাকিস্তানের মতো প্রতিক্রিয়াশীল পত্রিকায় ফিরে যাওয়া শামসুর রাহমানের মতো কবির শোভা পায়নি।
প্রথম কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন এক অসামান্য রূপসীকে। কবি সেই তরুণীকে ভীষণ ভালোবাসতেন তা গোপন করেননি৷ তরুণীর পক্ষ থেকেও সাড়া ছিল। কবির পক্ষে সাহসী হওয়া সম্ভব হয়নি। কেননা ততদিনে তিনি বিবাহিত এবং এক সন্তানের জনক।
দৈনিক বাংলা ও বিচিত্রা'র সম্পাদক ছিলেন শামসুর রাহমান। দীর্ঘদিন করেছেন সাংবাদিকতা। অথচ আত্মকথায় সাংবাদিকতা জীবনকে যেন একপ্রকার উহ্য রাখার চেষ্টা চোখে পড়ে। কবিতা, ব্যক্তিগত জীবনকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন আত্মকথার বর্ণনায়। ভূয়োদর্শী সাংবাদিকতা জীবনের স্মৃতিচারণ শামসুর রাহমানের জীবনের অংশ। কিন্তু তিনি তা স্ব-ইচ্ছায় বাদ দিয়ে চেয়েছেন৷ তাঁর লেখায় সবাইকে ভালো মানুষ হিসেবে দেখানোর একটি প্রয়াস দেখেছি। তাই সাংবাদিকতা জীবনের কথা হয়তো উল্লেখ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেননি৷ কেননা সেখানে সবাইকে, সকল ঘটনার পাত্র-মিত্রকে সাধু হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব ছিল না।
রবীন্দ্র ভক্ত শামসুর রাহমান নন৷ তবে অকারণে রবীন্দ্র-বিরোধিতা সমর্থন করেন না৷ পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতির জন্য ক্ষতিকর বিবেচনায় খাজা শাহাবুদ্দীন রবীন্দ্র সংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করেন৷ রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে এদেশের বুদ্ধিজীবিরা বিভক্ত হয়ে পড়েন। যারা রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধের পক্ষে ছিলেন এমন কয়েকজন হলেন - আবুল মনসুর আহমদ, কবি আহসান হাবীব, কবি ফররুখ আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ, সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরী, শাহেদ আলী, ড. আশরাফ সিদ্দিকী প্রমুখ। পক্ষে-বিপক্ষের বিস্তারিত তালিকা বইতে পাবেন।
''কালের ধুলোয় লেখা" আত্মকথা হিসেবে ফার্স্ট ক্লাস পাবে না। বড়জোর সেকেন্ড ক্লাস দেওয়া চলে। শামসুর রাহমান নিজের চাইতে অন্যের কথা বেশি লিখেছেন। তা লিখুন। আত্মপ্রচার করেননি এটি প্রশংসনীয়। কিন্তু অন্যদের নিয়ে এমন কোনো ঘটনা লেখেননি যা পাঠককে আলোড়িত করবে৷ আত্মসমালোচনা দেখিনি। বলার ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি। স্কুল জীবনের ঘটনা বলতে বলতে হঠাৎ অন্য সময়ে চলে গিয়েছেন। এটি পাঠককে অখুশি করবে। মোটকথা, শামসুর রাহমানের গদ্য আপনাকে বাধ্য করবে বইটি শেষ করতে।
স্মৃতির ধারাবাহিকতা বলো, বা মনে বসার মতো ঘটনা- দুটোই স্বল্প। দৈনিকের পাতায় সাপ্তাহিক কিস্তির জন্যে লেখা বলে বহু পুনরাবৃত্তি আছে, যথেষ্টই বিক্ষিপ্ত। তবে বইয়ের প্রথম এক তৃতীয়াংশে, যেখানে শৈশব আর কৈশোরের স্মৃতিদের ফিরে দেখছেন কবি; ওই অংশটুকু সত্যি চমৎকার।