প্রাসাদবাড়ির রহস্য সদ্যপ্রয়াত এক পাগলাটে পরিচালকের উইলে পাওয়া গেছে অদ্ভুত এক ধাঁধা, ভেদ করতে পারলে মিলবে গুপ্তধন। তাই বান্ধবী রিয়াকে নিয়ে সাগর পাড়ি দিয়ে প্রাচীন এক প্রাসাদবাড়িতে ঢুকল অয়ন-জিমি। আধপাগল কেয়ারটেকার আর লোভী আত্মীয়ের দল ভিড় জমিয়েছে ওখানে, রয়েছে অদৃশ্য এক প্রতিপক্ষও। বিপদ আরও বাড়িয়ে তুলল প্রাসাদবাড়ির আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ানো এক মৃত দাসী! তারপর?
বিপদের ছয়টি আঙুল অদ্ভুত একটা হাতমোজা কুড়িয়ে পেল অয়ন আর জিমি - পাঁচটার জায়গায় সেটার ছ’টা আঙুল! কৌতূহলের বশে মালিকের খোঁজে বেরুতেই পড়ে গেল মহাবিপদে। প্রথমে এল হুমকি, তারপর আক্রমণ। কেউ একজন চাইছে না মানুষটাকে ওরা খুঁজে বের করুক। কারণটা কী? রোখ চেপে গেল দু’বন্ধুর─রহস্যটা ভেদ করে ছাড়বে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটা হারানো মুকুট যে পুরো ব্যাপারটাকে এভাবে জট পাকিয়ে তুলবে, সেটা তদন্ত শুরুর সময় কল্পনাও করতে পারেনি ওরা!
পাথরপিশাচ চমকে উঠলেন বৃদ্ধ হিউ মিচাম। তাঁর পাশের বাড়ির ব্যালকনিতে জ্যান্ত হয়ে উঠেছে একটা পাথরের তৈরি পিশাচমূর্তি! টিকটিকির মত ওঠানামা করছে দেয়াল বেয়ে! অবিশ্বাস্য! তদন্ত করতে গেল অয়ন, জিমি আর রিয়া। আঁতকে উঠল রাতদুপুরে জানালায় গারগয়েলের মুখ দেখে। শুরু হয়ে গেল একের পর এক রহস্যময় কাণ্ড। কে ঘটাচ্ছে এসব? কেন?
অনেক দিন পরে শুরুর দিকের তিন গোয়েন্দা পড়ার ফ্লেভার পেলাম। রহস্যের জমাট বাঁধা তারপরে তার উন্মোচন হওয়া ধীরে ধীরে। অয়ন হচ্ছে কিশোর পাশা আর রবিন মিলফোর্ডের কম্বিনেশন। কিশোরের মতো একই রকম মাথা খাটাতে ভালোবাসে। পেটে বোম মারলেও নিজ থেকে না চাইলে কথা বলে না। চিন্তায় পরে গেলে নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটা। রবিনের মতো বই পোকা। অন্যদিকে জিমি হচ্ছে আমাদের ব্যায়ামবীর মুসা আমানের মতো সারাদিন শুধু খিদে লেগে যায়। হা হা। রিয়া ওয়েস্টমোর সাহস আর জেদের দিক দিয়ে আমাদের জরজিনা পারকার। জিমি আর রিয়ার কথায় কথায় ঝগড়া লেগে যাওয়া মুসা আর জিনার খুনসুটির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলো।
জানি না কেন বারবার সব তিন গোয়েন্দার সাথে তুলনা করে ফেলছি। ভালো লেগেছে পড়ে তিনটা গল্পই।
তিনটে কাহিনির প্রত্যেকটাই দুর্দান্ত। প্রতিটা কাহিনিই তিন গোয়েন্দা স্বর্ণযুগের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। ট্রেজার হান্টিং মিস্ট্রি 'প্রাসাদ বাড়ির রহস্য' মনে করিয়ে দিয়েছে তিন গোয়েন্দার টেরর ক্যাসেল অ্যাডভেঞ্চারের কথা। 'বিপদের ছয়টি আঙ্গুল' কে কিশোর স্পাই থ্রিলার এবং ট্রেজার হান্টিং এর মিশ্রন, মনে করিয়ে দিয়েছে তিন গোয়েন্দার 'রুপালি মাকরসা' অভিযানের কথা। আর 'পাথর পিশাচ' মনে করিয়ে দিয়েছে 'ছায়াশ্বাপদ' এবং 'রত্নদানো'র কথা। অয়নকে বলা যায় কিশোর পাশা এবং রবিন মিলফোর্ডের কম্বিনেশন, জিমি আর রিয়ার খুনসুটি মনে করিয়ে দিয়েছে মুসা আর জিনার খুনসুটিকে। তবে কাহিনিগুলোয় জিমির ভূমিকা আরেকটু বেশি থাকলে ভাল হতো। আর প্রতিটা কাহিনিতেই পাঠকদের সাথে ওদের পরিচয় না করিয়ে দিলেও হয়তো চলে এখন।
সম্ভবত একনিষ্ঠ তিন গোয়েন্দা ভক্ত হওয়ার কারণেই আমি তিন তারকা দিয়েছি। নয়তো রহস্যগুলো বেশ ভালো ছিল। পাঁচ তারা না দিতে পারলেও চার তারা অনায়াসেই দেওয়া যেত।
আমার সমস্যা হচ্ছিলো কোথায় তা বলি। যেহেতু তিন গোয়েন্দা আমার এক রকম গুলে খাওয়া তাই আমি না চাইতেও অবচেতন মন অয়ন জিমিকে তিন গোয়েন্দার সাথে তুলনা করছিলো, ব্যাপারটা বেশ অস্বস্তিদায়ক। কীভাবে? কিশোর আর অয়ন দুজনেই রহস্যের পাগল। কিশোর ভাবার সময় ঠোঁটে চিমটি কাটে, কেন করে জানতে চাইলে বলে এতে একাগ্রতা আসে। অয়ন ভাবার সময় ঠোঁট কামড়ায়, কেন করে জানতে চাইলে বলে এতে একাগ্রতা আসে। মুসা ভূতের ভয় পায়, জিমিও ভূতের ভয় পায়। মুসার পথ চিনে রাখার একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে, জিমিরও তাই। কিশোর সামনাসামনি প্রশংসা কখনো স্বাচ্ছন্দ্যে নিতে পারে না, অয়নও পারে না। রিয়া আর জিমির মধ্যে খুব ঝগড়া চলে, যেমনটা চলে জিনা আর মুসার মধ্যে। মেয়েদের ছোট করে দেখা জিনা পছন্দ করে না, রিয়াও করে না। কিশোর প্রায়ই সবাইকে ধোঁয়াশায় রাখে, অয়নও তাই করে। কিশোর জ্ঞান দেওয়া শুরু করলে মুসা সেগুলোকে "গ্রিক ভাষা" বলে, একই কাহিনি দেখা যায় অয়ন জিমির ক্ষেত্রেও।
মনে হচ্ছিলো জোর করে তিন গোয়েন্দার মতো বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রাসাদবাড়ির রহস্য + বিপদের ছয়টি আঙ্গুল + পাথরপিশাচ - এই ভলিউমের তিনটি বইই অসাধারণ! ক্লাসিক তিন গোয়েন্দার স্বাদ পাওয়া যায় এই রহস্যগুলোতে।
প্রাসাদবাড়ির রহস্য বইয়ে প্রয়াত খ্যাপাটে চলচ্চিত্র নির্মাতার আজব উইলের ধাঁধা সমাধান করতে নামে অয়ন-জিমি-রিয়া। কী সেই মহার্ঘ সম্পদ, কোথায়ই বা লুকানো আছে? সেই ধাঁধার সমাধান করতে ইংল্যান্ডের এক রহস্যময় প্রাসাদ-বাড়িতে হাজির হল ওরা তিনজন!
বিপদের ছয়টি আঙ্গুল গল্পে একটা দস্তানা খুঁজে পায় অয়ন ও জিমি, যেটাতে পাঁচের বদলে ছয়টি আঙুল! দস্তানার মালিককে খুঁজতে গিয়ে পড়ল মহাবিপদে। কিন্তু হুমকি আক্রমণে ভয় পাবার ছেলে নয় ওরা। সিংহাসনচ্যুত এক রাজকুমারী সাহায্য চাইল ওদের কাছে। বুদ্ধি গুলিয়ে দেয়া ধাঁধা সমাধান করে, আততায়ীর হাত থেকে বেঁচে, ওরা কি পারবে হারানো মুকুট উদ্ধার করতে? সম্পূর্ণ মৌলিক এই রহস্যকাহিনীকে সিরিজের সেরা বলা যায়।
পাথরপিশাচ বইয়ে লেখক তোমাদের শোনাবেন একটি পাথরের মূর্তির গল্প। সত্যিই কি জ্যান্ত হয়ে উঠেছে পাথরের মূর্তি? নাকি ভুল দেখেছেন বৃদ্ধ মিস্টার মিচাম? পুরাতন থিয়েটার বাড়িটায় কী ঘটছে আসলে? তদন্ত করতে নামল অয়ন-জিমি আর রিয়া। আরেকটা চমৎকার বই।