ভূতের ভয় পাওয়ার জন্য যদি এই বই হাতে নেন তবে হয়তো হতাশ হতে হবে, গল্পগুলোতে ভয় পাবার মতো কোনো উপাদান নাই। "ভূত বিশ্বাসীরা খবর্দার রাতে এ বই পড়বেন না" এরকম লেখার কি ছিল জানিনা, হয়তো বাজারে চাহিদা বাড়াতেই এমন লেখা। এই বইটিতে মোট ১৮টি গল্প আছে, কোনোটা ভূতের, কোনোটা অলৌকিক, কোনোটা কল্পবিজ্ঞান নির্ভর।প্রতিটা গল্পের শুরুতে একটা করে ছবি আছে, যা দেখতে বেশ লাগে।আর প্রচ্ছদটি কিন্তু গল্পগুলোর সাথে মানানসই হয়নি।
১)প্রথম গল্প 'প্রতিশোধ'।এক পিতা তার ছেলের মাধ্যমে তার খুনীর প্রতিশোধ নেয়,যদিও তার আগেই....। গল্পটা কিন্তু একদমই ভয় লাগে না।শুরুতে এই গল্পটা না রাখলেই হত।
২)'নিছক ভয় দেখানো' গল্পের শুরু রসিকতা দিয়ে হলেও এর পরিণতি ভয়াবহ।
৩)'ভূত মানেই চান্স' এই গল্পের শুরুটা আড্ডা ছলে শুরু হয়েছিল কিন্তু শেষটা দুর্ভাগ্যজনক।
৪)'দিনটা খুব ইন্টারেস্টিং' গল্পটায় এক সামাজিক বার্তা আছে। আমাদের সকলেরই জল অপচয় বন্ধ করা উচিত। এখানে ভূত নাই, আছে অ্যালিয়েন।
৫)'শুধু কুড়ি মিনিট' এ আছে টাইমট্রাভেলের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পাল্টাবার গল্প। কি হয় কি হয় ব্যাপার। সত্যিই কতজনই তো বন্ধু হয়, কিন্তু আমরা ভালোভাবে চিনি কতজনকে?
৬)'নীলকুঠিতে কিছুক্ষন' গল্পটি ঠিক ভালো লাগলো না। ঠিক বুঝতেও পারলাম না।
৭)'তাজমহল' - ইতিহাস ও কল্পবিজ্ঞানের মিশ্রণ। অনিলিখার প্রতিটা গল্পই ভালো লাগে। টাইমট্রাভেলে ট্রাভেল করার ইচ্ছা হচ্ছে খুব।কিন্তু যখন চালু হবে অতবছর পর কি বেঁচে থাকবো !!😔
৮) 'প্রতিবেশী' পড়তে শুরু করলে ভয়ের মনে হলেও সত্যিটা অন্যরকম। তবে বেশ ভালো।
৯)'চশমা এবং অপ্রস্তুতবাবু' : একটা চশমা অপ্রস্তুত বাবুর জীবনে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। চশমা পড়ার জন্য কেউ চোখ খারাপের চেষ্টা করে !?😄
১০) 'প্রোফেসর ইয়াকোয়ার মৃত্যু রহস্য' এর আগে একবার পড়েছিলাম, কিন্তু কোথায় মনে করতে পারছি না। গল্পটা পড়তে ভালোই লাগবে।
১১) 'নিধিরামে অপদস্ত' পড়ার সময় অদ্ভুতুড়ে সিরিজের ফিলিংস পাচ্ছিলাম।বেশ উপভোগ করেছি, হেসেওছি।
১২) 'আধঘন্টার অভিনয়' - আবারও একটা আনিলিখার গল্প। অনিলিখাকে কেন্দ্র করে অলৌকিক গল্প।
১৩) 'ঠিক বিচার' এটাকে সাইন্স ফিকশন বলা চলে। কতটা উন্নত হয়ে ওঠে পৃথিবী তা দেখতে পাই। পড়তে ভালো লাগছিলো না, তবে প্লট বেশ উন্নতমানের।
১৪) 'সুবীর কথা রাখবে তো !' - আদ্য পান্ত ভূতের গল্প। এক মাষ্টারমশায়ের অনুরোধ তার অনুগত ছাত্রের প্রতি।
১৫) 'রাজাবাবু' একটা মন ভালো করা ভূতের গল্প।সবারই খুব ভালো লাগবে।
১৬) 'কম্পিউটারের অদ্ভুত তিন ভবিষ্যতবাণী' : Wow আবারও আর একটা অনিলিখার গল্প। কি সেই ভবিষ্যতবাণী ? পড়েই দেখুন না।
১৭)'পিছনে হাঁটা' - এখানে আছে এমন এক অদ্ভুত ঘড়ি, যার বদান্যতায় সময়কে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। বাস্তবেও কি সম্ভব ? ভূত ও কল্পবিজ্ঞানের সংমিশ্রণে এই গল্প।
ছোটদের জন্যে লেখা যে কত বড় আর কঠিন কাজ, সেকথা শিশু-কিশোর সাহিত্যের জগতে নবাগত এবং প্রতিষ্ঠিত সব লেখকই জানেন| অথচ অনেকের কাছেই শুনেছি যে গোয়েন্দা, হাসি বা ভূত: এই তিনের যে কোন একটি উপাদান নিয়ে কিছু একটা লিখে ফেললেই সে লেখা নাকি ছোটদের পছন্দ হতে বাধ্য| আলোচ্য বইটির রিভিউ করতে গিয়ে তাই প্রথমেই যে কথাটা মনে হয় তা হল: বইটির প্রকাশক “পত্র ভারতী” নির্ঘাৎ উপরোক্ত সরলীকৃত ফান্ডাটা কিছুটা হলেও বিশ্বাস করেন, নইলে শিশু-কিশোর সাহিত্যে এই সময়ের অন্যতম সেরা গল্পকারের এমন চমৎকার একঝাঁক ছোটগল্পের বিপণন করতে গিয়ে “ভূত-বিশ্বাসীরা খবর্দার (বানান ফ্ল্যাপ থেকে) রাতে এই বই কখনই পড়বেন না|” লিখে বাজার গরম করার চেষ্টা করতেন না|
এবার আসা যাক গল্পের কথায়| শিরোণাম-হীন একটি অন্তরঙ্গ প্রাককথনের পর এই বইতে যে গল্পগুলো এসেছে তারা হল: 1. প্রতিশোধ: এই বইয়ের দুর্বলতম এবং নানাবিধ অসংগতিতে ভরা গল্পটি দিয়ে বইটা শুরু বলে প্রথমেই হোঁচট খেতে হয়| এই ধরণের গল্প বছর পঁচিশেক আগে রেডিওতে শুনে ভালো লাগত, কিন্তু আজকের যুগে গল্পের ত্রূটিগুলো বড্ড বেশি করে ধাক্কা দেয়| 2. নিছক একটু ভয় দেখানো: এই নিটোল ছোটগল্পটি দিয়েই বইটা শুরু হওয়া উচিত ছিল, যাতে লেখকের মাপা হাতের ছোঁয়ায় ‘কহানি মে ট্যুইস্ট’-টা দারুণ উপভোগ্য হয়েছে| 3. ভূত মানেই চান্স: প্রথম গল্পটার তুলনায় ভালো, কিন্তু শেষের চমক (যেটা একটু আলাদা রকমেরই ছিল)-সত্বেও গল্পটা আমার খুব ভালো লাগেনি| 4. দিনটা খুব ইন্টারেস্টিং: এটা ভূতের গল্প নয়, কল্পবিজ্ঞানের গল্পও নয়| তবে উদ্ভট রসের গল্পটা ছোটদের মুখে হয়তো এক ঝলক মুচকি হাসি ফোটালেও ফোটাতে পারে| 5. শুধু কুড়ি মিনিট: এ কি লেখকের কমফোর্ট জোনে ফিরে আসার ফল, নাকি সম্পাদকীয় ঘ্যানঘ্যানানি বা ফরমায়েশ না থাকায় মুক্তির প্রকাশ? কল্পবিজ্ঞান-ভিত্তিক এই গল্পটি পড়ে এক ঝটকায় খুঁজে পাওয়া যায় সেই লেখককে, যাঁর কলম বিজ্ঞান-সুবাসিত অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি পড়ার ক্ষেত্রে আজকের প্রজন্মকে সব থেকে বেশি করে উত্সাহিত করেছে| দুর্দান্ত গল্প! 6. নীলকুঠিতে কিছুক্ষণ: বেশ ভালো ভাবে শুরু করেও গল্পটা বড্ড তাড়াতাড়ি প্রেডিক্টেবল হয়ে পড়ল, আর তার ফলে একটা গা-ছমছমে সেটিং নিয়েও লেখকের চেষ্টাটা মাঠে, বা নীলকুঠিতে মারা গেল| 7. তাজমহল: এই বইয়ের সেরা লেখা এই গল্পটি, যা ভৌতিক নয়, অলৌকিক তো নয়ই| ইতিহাস, কল্পবিজ্ঞান, আর বিশুদ্ধ ফ্যান্টাসি দিয়ে গড়া, এবং বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম কিছু কল্পবিজ্ঞান কাহিনিকে মনে করিয়ে দেওয়া এই গল্পটি (নাকি ঘনাদার উদ্দেশ্যে অনিলিখার শ্রদ্ধাঞ্জলি?) সত্যিই ফ্যান্টাস্টিক! 8. প্রতিবেশী: অ..সা..ধা..র..ণ বললেও কম বলা হবে এই গল্পটিকে| কৌতুক, ভয়, রোমাঞ্চ, এবং শেষের “হঠাৎ আলোর ঝলকানি” হয়ে আসা সত্যিটা, এই সব মিলিয়ে গল্পটাকে যেখানে নিয়ে গেছে তা অভাবনীয়| যেসব পাঠক এই গল্পটা প্রথমবার পড়বেন, এখন থেকেই তাঁদের ব্যাপকভাবে হিংসে করতে শুরু করেছি| 9. চশমা এবং অপ্রস্তুতবাবু: একটি ফিল-গুড ফ্যান্টাসি, যা আদ্যন্ত প্রেডিক্টেবল হলেও সুপাঠ্য বলে পড়তে ভালোই লাগে| 10. প্রফেসর ইয়াকোয়ার মৃত্যুরহস্য: এই গল্পটি ইতিমধ্যেই লেখকের অন্য একটি সংকলনে স্থান পেয়েছে, তাই এর বদলে অন্য গল্প দিলে ভালো হত| তবে কল্পবিজ্ঞান আর মূল্যবোধ মিশিয়ে লেখা এই গল্পটা আবারও পড়তে ভালোই লাগে| 11. নিধিরামে অপদস্থ: শীর্ষেন্দুর টপ ফর্মে লেখা গল্পগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে এই নির্মল হাসির গল্পটি| ছোট হোক, বা বড়, পাঠক মাত্রেই এই গল্পটি মুচকি-মুচকি হেসে উপভোগ করবেন: এমনটা আশা করাই যায়| 12. আধঘন্টার অভিনয়: অলৌকিক মানে আসলে আলো-আঁধারির জগৎ, যেখানে সত্যের জোরালো আলো পড়লে বোঝা যায়: সবটাই ফাঁকি| কিন্তু সত্যিই কি তাই হয়? অনিলিখাকে কেন্দ্রে রেখে লেখা এই অসাধারণ গল্পটি প্রথমে ভয়, পরে অলৌকিক রস, আর শেষে তার মানবিকতায় পাঠককে এমনভাবে স্পর্শ করে, যে গল্পটার রেশ তা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও থেকে যায�� অনেক-অনেক সময় ধরে| 13. ঠিক বিচার: ভূত আর কল্পবিজ্ঞান, দুয়ের উপস্থিতি সত্বেও ঠিক কোন গোত্রেই ফেলা যাবেনা এই গল্পটিকে| কিন্তু তবুও, গল্পটাকে আপনি চট করে খরচের খাতায় ফেলেও দিতে পারবেন না| কেন? সেটা আপনাকে পড়ে দেখতে হবে| 14. সুবীর, কথা রাখবে তো!: ছকে বাঁধা শুরু, আদ্যন্ত চেনাজানা সেটিং, কিন্তু তবু গল্পটাকে ভোলা অসম্ভব তার মানবিকতার জন্যে, তার ছত্রে-ছত্রে ভেসে আসা সেই আকুতির জন্যে, যা হয়তো আমাদের সবার মনে প্রতিধ্বনিত হয় নিজের দেশের কথা ভাবলেই| এ গল্প নিছক ভূতের নয়, তার চেয়ে অনেক ওপরে এর স্থান| 15. রাজাবাবু: আর একটি ফিল-গুড ফ্যান্টাসি, যেমনটি আমরা এক সময় পেতাম শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কলমে| লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানতেই হচ্ছে এমন সহজ আর মন-ভালো-করা গল্পটি উপহার দেওয়ার জন্যে| 16. কম্পিউটারের অদ্ভূত তিন ভবিষ্যদ্বাণী: অনিলিখার আরেকটি টানটান কাহিনি, যা বিজ্ঞান, অপবিজ্ঞান, “ক্রাইম ডাজ নট পে”, “তাহলে কি...?” এইসব মিলিয়ে শেষ হয়েও শেষ হয়না, বরং একগাদা প্রশ্নের জন্ম দেয়| কিন্তু লেখক কি গল্পের শিরোণাম হিসেবে একটা গোটা বাক্য ছাড়া কিছু পাননি? 17. পিছনে হাঁটা: ভূত আছে, কল্পবিজ্ঞানও আছে, কিন্তু এই গল্পের কেন্দ্রে আছে একটাই সত্যি, যা লালনের গানে আমরা শুনেছি, অথচ বুঝিনি: “এমন মানব জনম আর কি হবে, মন যা কর ত্বরাই কর এই ভবে”| 18. ৩৮ বিচউড স্ট্রিট: গা-ছমছমে এই গল্পটা পড়তে বেশ লাগে, যদিও সত্যজিৎ আর শরদিন্দু-র গল্পের যে কোন পাঠকই বুঝে যাবেন যে গল্পে কী ঘটতে চলেছে|
বইটি সুমুদ্রিত| সুদীপ্ত মণ্ডলের আঁকা প্রচ্ছদ আর অলংকরণ কোথাও কোথাও ফ্ল্যাট হলেও মিনিমালিস্ট সাদা-কালো আঁকায় দারুণ (যেমনটা আছে “আধঘন্টার অভিনয়”-তে)| তবে বইটার সবথেকে বড় খুঁত দুটো:
(১) গল্পগুলোর প্রথম প্রকাশ সংক্রান্ত কোন তথ্যই এতে নেই| ফলে সময়ের সাথে লেখকের কলমের বিবর্তন বোঝার কোন উপায় পাঠকের কাছে নেই| (২) গল্পগুলোর বেশির ভাগই নির্ভেজাল ছোটগল্প হিসেবেও রসোত্তীর্ণ| তা সত্বেও ‘ডরনা জরুরি হ্যায়’ স্টাইলে বইয়ের ফ্ল্যাপ, ব্যাক-কভার, প্রাককথন: সর্বত্র কেন যে গা-জোয়ারি করে “ভয় পাও, ভয় পাও” মন্ত্র জপা হয়েছে, সেটাই বুঝলাম না|
অভিজ্ঞান রায়চৌধুরীর শ্রেষ্ঠ গল্পের সংকলন এটি নয়, কিন্তু ভূত না খুঁজে নিটোল গল্পের সন্ধানে যদি বেরিয়ে থাকেন, তবে এই বইয়ের স্টপেজে দু দণ্ড জিরিয়ে নিন| বলা তো যায়না, হয়তো এই জায়গাটা আপনার সত্যিই ভালো লেগে গেল| আর আপনার মত একজন পাঠককে পেয়ে লেখক আমাদের উপহার দিয়ে চললেন আরও ভালো লেখা| অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী-র গল্প জগতে আপনাকে স্বাগতম|
পত্র ভারতী থেকে প্রকাশিত অন্য দুটি ভৌতিক অলৌকিক আগেই পড়া ছিল। কভারের দিক থেকে দেখতে গেলে অভিজ্ঞান রায়চৌধুরীর বইখানাই বিজেতা। তবে কিনা মুশকিলটা শুরু হয় গল্পের নিরিখে। নেহাতই সহজ শিশুপাঠ্য কিছু চেনা অচেনা গল্প মিলিয়ে তৈরী এই বইটি, আর যাই হোক, রাতে না পড়ার মতন ভয়াবহ নয়। প্রকাশকেরা অজস্র বার বলে বলে যতই প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করুক না কেন। আপনি রাতে পড়তেই পারেন, চেনা মানের গপ্পো গুলো পড়ে হালকা ঝিমুনি দিলে আপনারই লাভ।
বইটি জুড়ে ১৮ টি ভৌতিক-অলৌকিক-কল্পবিজ্ঞান কাহিনীর মিশেল। চোখে লাগে, লেখকের ভূতের গল্প উপযুক্ত প্রকৃত আবহাওয়া তৈরীর অক্ষমতা। এর সাথেই রয়েছে উত্তেজনার অভাব, সাদামাটা সব চরিত্র এবং ক্লিশেড কাহিনিবিন্যাস। শিশু কিশোর দের পক্ষে মন্দ না হলেও, পোড় খাওয়া পাঠকদের মনে এই বই কতটা কার্যকরী হবে এই নিয়ে আমার সন্দেহ বিস্তর।
বইটির সব গল্প খতিয়ে দেখার ইচ্ছে বা মন কোনটাই এই মুহূর্তে নেই। কেবল আমার পছন্দের কয়টি গল্প এখানে তুলে ধরছি।
'নিছক একটু ভয় দেখানো' - এক জনৈক ভদ্রলোকের প্লেন সমন্ধে ভয়কে কেন্দ্র করে একটু রগড় দেওয়ার প্রচেষ্টা করে শান্তনু। তারপর? - গল্পটিতে হালকা একটা টুইস্ট রয়েছে।
'চশমা এবং অপ্রস্তুতবাবু' - আজীবন চশমা প্রেমী অপ্রস্তুতবাবু, মাঝ বয়সে চোখ খারাপ করে চোখে চশমা নিলেন। সেই চশমা কি নেহাতই সাধারন? - সত্যজিৎ রায়ের গল্পের একটা আভাস রয়েছে এটাতে, তবে গল্প এগোয় বেশ চেনা ছকে।
'নিধিরামে অপদস্থ' - নিধিরাম নামক ভয়াল বিদঘুটে গ্রামে বদলি হয়ে এলেন অঙ্ক শিক্ষক অপদস্থ বাবু। এবং এসেই পিতৃদত্ত প্রাণটা নিয়ে টানাটানি। - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অদ্ভুতুড়ে গল্পগুলোর স্পষ্ট ছায়া এ গল্পটিতে, পড়তে দিব্যি লাগে।
'রাজাবাবু' - মানিকবাবুর হাবে ভাবে বরাবরই একটা রাজকীয় ভাব। খারাপ সময়ে হঠাৎ করেই পাশে পেতে থাকেন একদল 'প্রজাকে' ? কে এরা? - গল্পটি বেশ সরল এবং মন ভালো করে দেওয়া।
এ চারটে গল্প ছাড়াও বইটিতে রয়েছে, বেশ কিছু কল্পবিজ্ঞান কাহিনী, রয়েছে এলিয়েনদের আনাগোনা, টাইম ট্র্যাভেলের অতিমারি। রয়েছে অনিলিখার চারটে গল্পও, তবে একটিও খুব বেশি স্মরণীয় নয়। আলাদা করে কিছু লেখার অবকাশ দেয় না। যাই হোক, ২ তারা দিলুম। প্রচ্ছদের দিক দিয়ে বিজয়ী হলেও, ভৌতিক অলৌকিক সিরিজের সেরা বইয়ের তকমাটা এখনো অনীশ দেবের হাতেই। 💫
একটানে পড়ে ফেলা যায় ঝরঝরে লেখার আঠারোখানা গল্প একসাথে হাসাবে, কাঁদাবে, বিস্ময়বোধ জাগাবে,বিরক্তিতে কপালের ভাঁজটা যেন বেশি প্রকট না হয়ে ওঠে সেজন্য তার ঠিক পরের পাতাগুলোতেই এক চিলতে ঝলমলে রোদের মতো হাসি এনে দিবে
মোট আঠারোটি গল্পের ডালি দিয়ে লেখক সাজিয়ে তুলেছেন এই বই যার বিষয়বস্তুর মধ্যে কিছু ভৌতিক, কিছু বা আবার অলৌকিক।
প্রথম গল্প 'প্রতিশোধ'র গঠনটি খানিক চেনা ছকের হলেও মুগ্ধ করেছে কাহিনীর উপস্থাপনা এবং বাস্তবিক ঘটনার সাথে মেলবন্ধন। 'ভূত মানেই চান্স' গল্পটি বেশ আকর্ষণীয় আর ঠিক তেমনই জোরালো এর ক্লাইম্যাক্স। কল্পবিজ্ঞানের মিশেলে গড়া 'শুধু কুড়ি মিনিট' এবং 'ঠিক বিচার' গল্প দুটি প্ৰকৃতভাবে ভৌতিক পর্যায় না পড়লেও বেশ ভালো লেগেছে। অলৌকিক আমেজের সাথে ইতিহাসের মিশেলকে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে 'নীলকুঠিতে কিছুক্ষণ' এবং আবারও রোমাঞ্চের বাইরেও পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ইতিহাসের নানান তথ্য।
অনিলিখার চারটি গল্প স্থান পেয়েছে এই বইয়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো লেগেছে 'আধ ঘন্টার অভিনয়' ও 'কম্পিউটারের অদ্ভুত তিন ভবিষ্যদ্বাণী' গল্প দুটি তাদের মোড় ঘোরানো ক্লাইম্যাক্সের জন্য। বাকি গল্প দুটোও বেশ ভালো।
ভৌতিক ছোঁয়া থাকলেও একান্ত অনুভব করার গল্প 'রাজাবাবু', 'সুবীর, কথা রাখবে তো ?', 'পিছনে হাঁটা' ও 'নিধিরামে অপদস্থ'। এর মধ্যে নিধিরামে অপদস্থ এক আলাদা ভালো লাগার জায়গা তৈরি করেছে তার মিষ্টি সমাপতন এবং এক বুদ্ধিদিপ্ত শিরোনামের মাধ্যমে। নামের প্রসঙ্গে 'অপ্রস্তুতবাবু' নামটিও বেশ চমকপ্রদ এবং তার সাথে গল্পটাও।
সবের মধ্যে খানিক হতাশ করেছে 'দিনটা খুব ইন্টারেস্টিং' যেখানে ভৌতিক ও হাসির মেজাজ থাকলেও প্লট ততটা জোড়ালো লাগেনি।
তবে মনের মধ্যে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে '৩৮ বিচউড স্ট্রিট' এবং যে গল্পের কথা না বললেই নয়, সেই বিখ্যাত 'নিছক একটু ভয় দেখানো'। সত্যিই, নিছক ভয় দেখানোই বটে এবং তাও শেষ কিছু লাইনে, সারা গল্পে মনেই হয়নি যে এভাবে শেষ হতে পারে।
যাদের সত্যজিৎ রায়ের ভৌতিক কাহিনীর ধরণ প্রিয়, তাদের কাছে এই বই সমাদর পাবেই।
মোট আঠারোটি গল্প আছে বইটিতে। যার মধ্যে অন্তত দশটা গল্পের শুরুটা দারুণ হয়েও লেখক ঠিকঠাক শেষ করতে পারেননি। দু একটি গল্প বেশ ভালো ছিল,বাকিগুলি এভারেজ। ভয়ের এলিমেন্টটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মিসিং। কিছু কল্পবিজ্ঞানের গল্পও ছিল যা আমার মনে হয়েছে এই সংকলনের উপযুক্ত নয়,কেননা বইয়ের নামের সঙ্গে যায় না। লেখকের লেখনশৈলী ভালোই। তবে এটুকুই বলবো গল্পের বাঁধুনিগুলো আরো ভালো হতে কোন বাধা ছিল না।