মুভি, চলচ্চিত্র, সিনেমা, ছবি, বই- একেকজন একেক নামে ডাকে। কিন্তু পর্দায় আবেদন একই- হোক সেটা ছোট পর্দা কিংবা বড়। আমরা পর্দায় অভিনেতা, অভিনেত্রীদের অভিনয় দেখে আপ্লূত হই; তাঁদের সাথে একাত্মবোধ করি। কিন্তু একটা সিনেমার পিছনের গল্প জানতে কয়জনেরই বা আগ্রহ হয়।
১৯৫৫ সালে পথের পাঁচালী সিনেমার মাধ্যমে সত্যজিৎ রায় বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে এক নতুন ধারা প্রণয়ন করেন। কিছু অপেশাদার আর্টিস্ট, প্রায় অপেশাদার টেকনিশিয়ান, সাথে প্রচুর সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করলেন সত্যজিৎ রায়। তাঁর এই ছবিটি দেশ-বিদেশে ভূয়সী প্রশংসা পায়। এরপরেই তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে ফুল টাইম সিনেমার জগতে চলে এলেন। পরিচালক হিসেবে প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞতার কথা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখেছেন। সেগুলোর সংগ্রহ নিয়েই প্রকাশিত বই প্রবন্ধ সংগ্রহ।
সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর বাস্তবধর্মিতা। এমনকি যেখানে মেকাপ ছাড়া অভিনয় কল্পনাও করা যায় না সেখানেও তিনি উল্টোপথে হাঁটলেন। তাঁর সিনেমার বড় একটা অংশ জুড়ে অপেশাদার আর্টিস্টদের প্রাধান্য রয়েছে। এজন্যই যখন নায়ক সিনেমায় প্রথমবারের মতো উত্তম কুমারের সঙ্গে কাজ করলেন তখনও অনেক সমালোচনা হয়েছিল। তবে সত্যজিৎ রায় সে সমালোচনার মোক্ষম জবাবও দিয়েছিলেন।
সমালোচনার প্রসঙ্গে চারুলতা'র কথা বলা যায়। রবীন্দ্রনাথের নষ্টনীড় গল্প অবলম্বনে এই সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৬৪ সালে। তখন এ নিয়ে পরিচয়-এ একটি সমালোচনা বের হয়। সত্যজিৎ রায় এর যৌক্তিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব দিয়েছিলেন বিশাল এক প্রবন্ধ লিখে। সেখানে তিনি গল্প থেকে সিনেমা বানানোর চ্যালেঞ্জ এবং তা থেকে উত্তরণের বিষয়ে বিশদে আলোচনা করেন। সেই সাথে গল্প থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে সিনেমায় কী কী পরিবর্তন এনেছেন এবং আনতে বাধ্য হয়েছেন তাও বলেন। যেকোনো চলচ্চিত্র বোদ্ধাই বেশ ভালো করেই জানেন যে গল্প থেকে সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে গল্পের প্লটে অনেক পরিবর্তন আনতেই হয় সিনেমার খাতিরেই, বরং সিনেমাটি যথার্থভাবে হৃদয়গ্রাহী হলো কি না তাই মূখ্য।
এছাড়াও সিনেমায় রঙের ব্যবহার, আবহসংগীত, টেকনিক্যাল বিষয়গুলো, ক্যামেরা, চিত্রনাট্য, দর্শকের মনোজগৎ, এবং তৎকালীন বাংলা সিনেমার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও বিশ্বচলচ্চিত্র সম্পর্কে লিখিত প্রবন্ধগুলো পড়লেই বুঝা যায় সত্যজিৎ রায় কত বড় মাপের পরিচালক। এছাড়াও বিভিন্ন প্রবন্ধে তাঁর সংগীত জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। মোট পাঁচটি ভাগে বিভক্ত প্রবন্ধ সংগ্রহ বইতে একেই বলে শুটিং এবং বিষয় চলচ্চিত্র বইদুটির সব প্রবন্ধই স্থান পেয়েছে। বইটি পড়ার আগে সত্যজিৎ রায়ের মাত্র একটা সিনেমা দেখেছিলাম, পথের পাঁচালী। কিন্তু বই পড়তে পড়তেই চারুলতা, মহানগর, নায়ক, আগন্তুকসহ বেশ কিছু সিনেমা দেখে ফেলি! সব মিলিয়ে ফেলুদা আর শঙ্কুর বাইরে এক নতুন সত্যজিতের সাথে পরিচয় হলো।
সেই গত বছর শতাব্দী আপু এই বইয়ের খোঁজ দিয়েছিলেন। কয়েকটা লাইব্রেরি ঘুরেফিরে বই না পেয়ে চলে এসেছিলাম। রিসেন্টলি সত্যজিতের অপুর পাঁচালী পড়ে মুগ্ধ হয়ে যাই এবং প্রবন্ধ সংগ্রহও কালেক্ট করে ফেলি। প্রসঙ্গত আরেকটা কথা বলা যায়। প্রবন্ধ সংগ্রহ পড়ার পরেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা মানিকদার সঙ্গে পড়ি। এই বইতে পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে কিভাবে একজন গুণী শিল্পীর জন্ম হলো তার অসাধারণ স্মৃতিচারণায় মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই!
.
প্রবন্ধ সংগ্রহ
সত্যজিৎ রায়
আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড
প্রথম সংস্করণ ২০১৫; ৬০০ রুপি।
রিভিউ: ৮ আগস্ট, ২০২১; ফেসবুক গ্রুপ।