বইতে টলস্টয়ের প্রধান তিনটি উপন্যাস যুদ্ধ ও শান্তি, আন্না কারেনিনা ও পুনরুজ্জীবন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে মূলত। তিন বইয়ের সূত্র ধরে ঔপন্যাসিক হিসেবে টলস্টয়ের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা; সাথে চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, তাঁর দর্শন, রাশিয়ার সমাজব্যবস্থা, রুশ বিপ্লবে তাঁর ভূমিকাসহ বহু বিষয় উঠে এসেছে লেখকের আলাপনে।পাঠক হিসেবে বেশ সমৃদ্ধ হলাম পড়ে।
লিও টলস্টয়ের জীবন, মতাদর্শ এবং তাঁর রচিত তিনটি মহত্তম সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। মাত্র ৮৪ পৃষ্ঠার বইতে বেশ গভীরভাবে টলস্টয়ের লেখা নিয়ে ব্যাখা-বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যা তত সুখপাঠ্য নয়। বইটির প্রকাশক বাংলা একাডেমি।
জমিদার পরিবারের সন্তান কাউন্ট লিও টলস্টয়। জারতন্ত্রের অধীনে অভিজাত যুবারা উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করত। চূড়ান্ত রকমের নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতনকে সেখানে ধর্তব্যের মধ্যে আনা হতো না। তেমন একটি পরিবেশে বেড়ে ওঠেন টলস্টয়। কিন্তু পরবর্তীতে বদল তার জীবনাচরণে এবং চিন্তায়। তার স্ত্রী সোনিয়া টলস্টয়ের চাইতে বিশ বছরের ছোট ছিলেন। বিয়ের আগে নিজের ডায়েরি সোনিয়াকে পড়তে দেন টলস্টয়। সোনিয়া কিন্তু চাইছিলেন না হবু স্বামীর দিনলিপি পড়তে। কিন্তু টলস্টয় বাধ্য করেন। কারণ এই মহান লেখকের যুক্তি ছিল, বিয়ের ভিত্তি সততা। কোনো লুকোছাপা রাখতে চাননি নিজের অতীত জীবন নিয়ে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে হবু স্ত্রী সোনিয়া নিজের দিনলিপি পড়তে বাধ্য করেন টলস্টয়। সংক্ষেপে টলস্টয়ের জীবন নিয়ে আলোচনা এই বইয়ের সেরা অংশ। এজন্য সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাহবা পেতে পারেন।
টলস্টয়ের রচিত তিনটি উপন্যাস নিয়ে বিশদ লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। উপন্যাসগুলো যথাক্রমে - 'সমর ও শান্তি', ' আন্না কারেনিনা ' এবং 'পুনরুত্থান'।
মহাকাব্যিক পর্যায়ের উপন্যাস 'সমর ও শান্তি' যাঁরা পড়েছেন তাদের জনাব চৌধুরীর লেখাটি না পড়লেও ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না। কিন্তু, যাঁরা এখনও 'সমর ও শান্তির' স্বাদ পাননি, তাঁরা নিঃসন্দেহে লেখাটি পড়ে বইটা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন। হ্যাঁ, কাহিনি জানা হয়ে যাবে বটে। তবে একটি উপন্যাসকে এত আলাদা রকমের আঙ্গিক থেকেও দেখা যায় তা আবিষ্কার করে অবাক হয়ে যাবেন। আমি 'সমর ও শান্তি' পড়িনি। চৌধুরী সাহেবের পাঠপ্রতিক্রিয়া ও তাফসির পড়ে ভীষণ আগ্রহ তৈরি হলো বইটি পড়ার।
'আন্না কারেনিনা'কে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। কেন এটিকে জগতের সেরা উপন্যাসের তকমা দিলেন তা বুঝাতে সুন্দরভাবে আলোচনা করেছেন। 'আন্না কারেনিনা'র জটিল উপন্যাস, বইটিতে প্রায় পাঁচশ'র মতো চরিত্র রয়েছে। এমন একটি উপন্যাস নিয়ে এত মনোগ্রাহী আলোচনা করতে হলে বইটা কতখানি দরদ ও মনোযোগ নিয়ে পড়তে হয়েছে তা ভেবে বিস্মিত হয়েছি। অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখায় 'আন্না কারেনিনা'র ব্যবচ্ছেদ পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই প্রবন্ধ এত সুপাঠ্য ছিল না। অধ্যাপক সিরাজের 'আন্না কারেনিনা'কে উপলব্ধি নিঃসন্দেহে অন্নদাশঙ্কর রায়ের চাইতে গভীরতর।
'পুনরুত্থান' বইটির কাহিনিটুকু বুঝতে পেরেছি। তবে আলোচনা খাপছাড়া লাগছিল। বাকি দুইটি উপন্যাসের মতো প্রাণবন্ত মনে হয়নি এবং যথেষ্ট দুর্বোধ্য ঠেকছিল।
টলস্টয়ের সাহিত্যকর্মে রুশদেশের কৃষক এবং তাঁর সাহিত্যচিন্তা নিয়ে সর্বশেষ দুটো লেখাই অপরিণত মনে হয়েছে। ভীষণ ক্লান্তিকর এই দুইটি লেখা। শেষ করতে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছে এবং প্রাবন্ধিক ঠিক কী বলতে চাইছিলেন তা-ও স্পষ্ট নয়।
প্রাবন্ধিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মহান সাহিত্যিক টলস্টয়কে পছন্দ করেন। একনিষ্ঠ পাঠক তিনি টলস্টয়ের সকল লেখার। আমার মতো সাধারণ মানের পাঠকের জন্য বইটি বিশেষ উপযোগী নয়। কারণ সহজ কথা প্রাবন্ধিক সহজভাবে বলেননি। তাতে পাঠক হিসেবে আমার একাধিকবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে। ইতিবাচক দিক হলো টলস্টয় মহত্তম সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে ভালোভাবে জানা হলো এবং একটা তাগিদ জন্ম নিল উপন্যাসগুলো পড়ার।