ধরেন ভরা মজলিসে ‘রাষ্ট্রবিরোধী গিটার’ শীর্ষক এই কবিতার বই থেকে একটি কবিতা পাঠ করলেন। এবার আপনার ভবিষ্যদ্বাণী করি। প্রথমে উপস্থিত দর্শক ও শ্রোতাগণ মুখের উপর ছি ছি করবে। তারপর আপনার চৌদ্দগুষ্টি উদ্বার করে ছাড়বে। সবশেষে এমন ক্যালানো ক্যালাবে যে হাড়গোড় সব ছাতু ছাতু করে ফেলবে। মোটকথা আপনার ঘাড় থেকে ইহজনমের কবিতার ভূত বিনা ঝাড়ফুঁকে নামিয়ে দেবে, উইদাউট এনি কস্ট!
“তবে কি তিনি মহাপুরুষ নন? যেহেতু তাঁরও রয়েছে ক্ষুধা, ক্রোধ ও কাম। বটবৃক্ষের কাছে মাথা অবনত করে আমি তাঁকে ধুলির আত্মা পাঠ করতে দেখেছি। যদিও আজ অবধি তিনি মানুষের জন্য কোনো বিধান রচনা করেন নি। তবু কুকুরের সাথে তাঁর সখ্যতা রয়েছে। আর ইদানীং ঈশ্বরের গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে চ্যাট হচ্ছে রাবিশটার।”
কী বুঝলেন? অবশ্য কিছু বোঝার কথা নয়। আমি নিজেও বুঝি নাই! বইটির আলাদা কোনো উৎসর্গ পত্র বা ভূমিকা পাতা নেই। তার বদলে যে পাতায় উৎসর্গ লেখা হয়, সে পাতায় এই অনর্থক কথাগুলো লেখা। শুধু এই পাতা নয়, পুরো বইজুড়ে এমন অনর্থক লেখায় ভরপুর। চাইলে কেবল পড়তে পারবেন, কিন্তু কিছু বুঝতে পারবেন না। যদি বোঝার চেষ্টা করেন, সেটা হবে সময়ের অপচয়। এখন যদি প্রশ্ন ওঠে- লেখক কি খুবই কঠিন শব্দ ব্যবহার করেছেন? জটিল বাক্য তৈরি করেছেন? কবিতাগুলো কি পাঠকের বোধগম্যের বাইরে? হাজার প্রশ্নের একটাই জবাব- লেখকের থেকে বেশি বোঝা যাবে না। আর লেখকের ঠেকাও পড়ে নাই পাঠকদের সব বুঝিয়ে লিখবে!
২০১৩ সালে প্রকাশিত এই বইটি সে বছরই এক বড়ভাই কর্তৃক গিফট পেয়েছিলাম। তখন আমি রীতিমতো বইয়ের পোকা। সংগ্রহে থাকা কোনো বই ফেলে রাখতাম না। যত দ্রুত সম্ভব পড়ে ফেলতাম। এই বইটিও চটজলদি পড়ে ফেলি। বিশ্বাস করবেন কী না জানি না, এটা পড়ার পর এক সপ্তাহ মনে হয় কোমায় ছিলাম। বারবার মনে হয়েছিল- হারপিক দিয়ে চোখ ধুয়ে আসি। নিজের মাথা নিজে ফাটিয়ে ডিটারজেন্ট পাউডার দিয়ে মগজখানা ধুয়ে ফেলি। এমন জঘন্য বই আমি বোধহয় আর দ্বিতীয়টি পড়িনি।
এখন সবচাইতে জরুরি প্রশ্ন হলো- এই বইটির সমস্যা এবং অসঙ্গতি কোথায়? কেন এটি আমার কাছে অপ্রিয় বই? ইয়ে মানে... কোত্থেকে শুরু করি!? আমার কাছে এটা কোনোভাবেই কবিতার বই মনে হয়নি। এমন কী এটা ঠিক কী ধরনের বই সেটা নিয়েও ধোঁয়াশা আছে। তবুও যতদূর জানি, এটি ছিল লেখকের প্রথম কবিতার বই এবং তার ধারণা- তিনি সফল হয়েছেন! অথচ তাকে কেউ বোঝানোর চেষ্টা করেনি- বাংলা সাহিত্যের কবিতা শাখাটিকে তিনি সাড়ে সর্বনাশ করে ছেড়েছেন। রীতিমতো কলুষিত করেছেন।
জোরপূর্বক ধর্মকে টেনে এনে মনগড়া ফতোয়া আর বালখিল্য উপমা-বিশেষণ দিলেই কবিতা হয়ে যায় না, যার উদাহরণ এই বইতে ঢের রয়েছে। আরও রয়েছে প্রেম ভালোবাসার নামে নোংড়ামি, বিকৃত ফ্যান্টাসি, নারী ও পুরুষের গোপন ও স্পর্শকাতর অঙ্গের অযাচিত বর্ণনা, নারীদের প্রশংসার ছলে তাদের শরীর ও নগ্নতা মেশানো বিশদ ব্যাখ্যা। বাদ যায়নি প্রকৃতি, প্রাণী, রাজনীতি, সমাজও; কিন্তু সবখানেই অশ্লীলতার রেশ স্পষ্ট। যা আমি চাইলেও রিভিউতে তুলে আনতে পারছি না। সেই সাহসটুকু আমার নেই।
তবে কী এই বই পাঠযোগ্য নয়? যেহেতু ছাপার অক্ষরে মুদ্রিত হয়েছে, চাইলে তো পাঠ করাই যায়। কিন্তু কোনো পাঠক কেন এই বই পাঠ করবে তার সদুত্তর আমার জানা নেই। তাই অতি দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, এটা কাউকে সাজেস্ট করতে পারছি না। নট আ হ্যাপি রিডিং!
বইয়ের সূচি থেকে- কোরান শরীফ।। এত্তেকাফ।। মসজিদ ভেঙে যাবার দৃশ্য।। জ্যোতির্ময় অন্ধকার ও এক আত্মদর্শী।। আবু জেহেল।। বেড়াল।। অবিনশ্বর ঘোড়াগুলি।। হাতি বিষয়ক কর্মশালা।। পিঁপড়া।। কাঠঠোক্রা।। প্রণত সেজদার গল্প।। তিনজন নদী ও আমার আত্মজীবনীর খণ্ডাংশ।। হেমন্ত ধারণা মাত্র।। বোধিসত্তার বাঘ সাপ ও প্রেমিক।। মাতৃভক্তি।। গুহাবন্দী পুরুষ।। দাঁত এবং জিভবা।। একজন নারীকে।। বেডরুম।। সাবালিকা, তোর জন্য বিচ্ছিন্ন পঙ্ক্তিমালা।। ক্লাসরুম থেকে ফিরে।। জারজ।। রাষ্ট্রবিরোধী গিটার।। অসুস্থ ইন্ডাস্ট্রি।। আত্মজীবনী: দশম খণ্ড।। বাদল কাকার মেয়ে বৃষ্টি।। প্রেমিকা।। অধিবাস্তবতার জ্যামিতি।। কবি।। ছাগল।। যথারীতি সাবজেক্টিভ এবং একটি ফালতু কবিতা।। স্বীকৃতি।। মৃত্যুবিষয়ক চিন্তার তৎপরতা।। বৃক্ষ ও ট্রাফিক।। শখ।। হজরত গালিবের জন্য যৌন অনুষঙ্গহীন প্রেমের কবিতা।। উন্মাদ বুলডোজার।। কালো এক বেড়ালের ছানা।। ইতিহাস বিষয়ক প্রবন্ধ।। মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপানের পর লিখিত কয়েকটি লাইন।
বইয়ের লেখক পরিচিতি থেকে- “আমি সাইয়েদ জামিল। আদৌ কি আমি জন্ম গ্রহণ করেছি? আমি জানি না। শুনেছি আমি জন্ম গ্রহণ করেছি। স্বচোখে দেখি নাই। শোনা কথায় আমার বিশ্বাস নাই। আদৌ কি আমি মারা যাবো? আমি জানি না। একদিন মারা যাবো শুনেছি- আমি বিশ্বাস করি না।” .
এইটা রি রিড। পয়লা পড়ছিলাম ১৪ সনে। তখন তো ভালোই লাগছিল আর কইছিলামও বইটা তো ভালো। একজন গতকাল কইলো বইটা ফালতু আর তারে দেখানির জন্য যে একটাও ভালো কবিতা আছে কিনা! তো কি কমু আর। একটা কবিতা কষ্ট মষ্ট কইরা পাইছি। ওইটা ভালোই। এতো এতো এই বহি নিয়া কি কারণে কথা হয়/হইতো সেইটা ভাবতেছি তো এখন...