দিন-দুপুরে মানুষের চোখের সামনে থেকে চুরি করে যাওয়ার সময় চোর ছোট্ট একটা চিরকুট ফেলে গেছে, যাতে লেখা- “অ্যামিতিস, তোমাকে ভালবাসি”। অথচ প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কিছু বলতে পারছে না। বাধ্য হয়ে ডিবি ইন্সপেক্টর মনসুর হালিম শরণাপন্ন হলেন পাগলাটে গবেষক ড. রুদ্র রাশেদের। দুজনের মিলিত তদন্তে খুলে গেল আড়াই হাজার বছর আগের এক অনন্ত রহস্যের দুয়ার! ব্লাডস্টোন এক মূর্তিমান অভিশাপের নাম, যার শুরুটা হয়েছিল ব্যাবিলনের শুন্য উদ্যানে! এই অভিশাপের বলি হয়ে কত রাজা হারিয়েছেন রাজ্য, সন্তান হারিয়েছে পিতা, প্রেমিক হারিয়েছে ভালবাসা, হয়েছে যুদ্ধ, হয়েছে বিদ্রোহ, হাজার হাজার মানুষ হারিয়েছে প্রান। তবুও শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে এই অভিশাপের পেছনে ছুটছে সবাই। আসুন ড. রুদ্র রাশেদের সাথে আমরাও ছুটি। দেখি এই রহস্যের কোন কূল- কিনারা হয় কিনা!
নাজিম উদ দৌলার জন্ম ১৯৯০ সালের ৪ নভেম্বর নানাবাড়ি কেরানীগঞ্জে। পৈত্রিক নিবাস যশোর জেলায় হলেও বেড়ে উঠেছেন ঢাকার আলো বাতাসের মাঝে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে বিবিএ ও এমবিএ শেষ করে বেশ কয়েক বছর বিজ্ঞাপনী সংস্থায় চাকরি করেছেন।বর্তমানে দেশের প্রথম সারির প্রডাকশন হাউজ আলফা আই-এ ক্রিয়েটিভ ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন। লেখালেখির চর্চা অনেক দিনের। দীর্ঘসময় ধরে লিখছেন ব্লগ, ফেসবুক সহ বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্মে। ২০১২ সালে প্রথম গল্প “কবি” প্রকাশিত হয় কালান্তর সাহিত্য সাময়িকীতে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫-তে প্রকাশিত হয় তার প্রথম থ্রিলার উপন্যাস “ইনকারনেশন”। একই বছর আগস্টে প্রকাশিত হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার “ব্লাডস্টোন” তাকে এনে দেয় বিপুল পাঠকপ্রিয়তা। এ পর্যন্ত ৬টি থ্রিলার উপন্যাস ও ৩টি গল্পগ্রন্থ লিখেছেন তিনি। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট লেখায় মনোনিবেশ করেছেন। সাম্প্রতিককালে তার চিত্রনাট্যে নির্মিত "সুড়ঙ্গ" সিনেমাটি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। শান, অপারেশন সুন্দরবন, দামাল, বুকের মধ্যে আগুন, দ্যা সাইলেন্স, লটারি-এর মতো বেশি কিছু আলোচিত সিনেমা ও ওয়েব সিরিজের চিত্রনাট্য লিখেছেন তিনি। অবসর সময় কাটে বইপড়ে, মুভি দেখে আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে। সদালাপী, হাসি খুশি আর মিশুক স্বভাবের এই মানুষটি স্বপ্ন দেখেন একটি সুন্দর বাংলাদেশের, যেখানে প্রত্যেকটি এক হয়ে মানুষ দেশ গড়ার কাজে মন দেবে।
সাধারনত এদেশের লেখকদের লেখা থ্রিলার গুলো আমি বের হওয়া মাত্রই পড়ে ফেলি । যত নতুন লেখকই হোক না কেন । একটা অন্যরকম আকর্ষণ কাজ করে । বই সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি গ্রুপে থাকার কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই এই উপন্যাসটির নাম শুনছিলাম । আর বই এর সারমর্ম পড়েও বেশ ভালো লাগায় পড়ে ফেললাম একদিনেই বইটা । বইটা মূলত হিস্টোরিকাল থ্রিলার । তো মূল কথায় আসি, যে কারণে রিভিউ লেখা । বইটা কি আশা পূর্ণ করতে পেরেছে ?? না পারেনি, সম্পূর্ণ বই টা পড়ার পরে এই কথাই বলব । বেশ কয়েক বছর ধরেই অনেক ভালো মানের থ্রিলার বের হচ্ছে আমাদের দেশে , তাই এখন আর সেই সময় নেই যে – যা বের হবে তারই প্রশংসা করে যেতে হবে । দুবছর আগে হলেও হয়ত এই আমিই মুগ্ধ হতাম, কিন্তু এখন এক্সপেক্টেশন আসলেও বেড়ে গিয়েছে । একটা থ্রিলার এর মূল হাতিয়ার ই হচ্ছে থ্রিল ধরে রাখা । শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত । একদম শুরু থেকে না হলেও গল্প যত সামনে এগোবে ততই উত্তেজনার পারদ উপরে উঠতে থাকবে। হতাশা জনক হলেও সত্য যে সকল প্রকার উপাদান থাকার পরেও এই বইটাতে তেমন কোন অংশ ছিলই না বলতে গেলে । ইতিহাস ই মনে হয়েছে পুরো বই জুড়ে । তাই ঐতিহাসিক থ্রিলার আমার খুব পছন্দের জনরা হওয়া সত্ত্বেও বই টা একদমই মনে দাগ কাটতে পারেনি । আর কিছু যায়গায় অসামঞ্জস্য ও ছিল যা খারাপ লাগাটা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এটুকু বলতে পারি যে লেখক বেশ ভালোই গবেষণা করেছেন লেখার আগে । সেজন্যে তাকে ক্রেডিট দিতেই হবে । উপন্যাসটা বর্ণনা করে যাওয়া হয়েছে তিনটা টাইমলাইন থেকে । খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৫ অব্দের ব্যা্বিলন শহরে ঘটনার সুত্রপাত , এরপর ১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দ ততকালীন চন্ডিক্যান রাজ্য (বর্তমান যশোর) এবং আরেকটি বর্তমান সময়ে । তিনটি টাইমলাইন ই একটাই সূত্র দিয়ে গাথা – ব্লাডস্টোন । এর রহস্য কে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে পুরো কাহিনী । মাঝে মাঝে গল্পের প্রয়োজনে আবির্ভাব ঘটেছে সম্রাট নেবুচাদনেজার, অ্যামিতিস , আলেক্সান্ডার, টলেমি, প্রতাপাদিত্য এমনকি এক যায়গায় মাদার তেরেসা কেও দেখা যায় । ঢাকার এক প্রদর্শনী থেকে চুরি হয়ে যায় ব্লাডস্টোন । এই রহস্যের কিনারা করতে মাঠে নামেন গোয়েন্দা মনসুর হালিম । এক সময় সে শরণাপন্ন হয় ইতিহাসের প্রফেসর রুদ্র রাশেদের কাছে । এর পরে বের হয়ে আসতে থাকে এই ব্লাডস্টোন কে ঘিরে নানা রহস্যের জাল । চরিত্র গুলো কোনটারই তেমন গভীরতা নেই । তাই কোনটিই তেমনভাবে আকর্ষণ করতে পারেনি । এমনকি মূল প্রোটাগনিস্ট রুদ্র রাশেদকেও অতিরিক্ত কাঠখোট্টা মনে হয়েছে । কতগুলো যায়গায় মনসুর হালিমের সংলাপ দেখে জোর করে হাসানোর চেষ্টা বলে মনে হয়েছে । তাই বলে যে পুরোটাই আমার খারাপ লেগেছে তা নয় । ইতিহাসের কয়েকটি জায়গার বর্ণনা বেশ ভালো ছিল । কিন্তু তবুও শেষ পর্যন্ত দাগ কেটে যেতে পারেনি বইটা । অথচ রসদ ভালোই ছিল । আশা করি লেখকের পরের লেখাগুলো এটা থেকে ভালো হবে । তাকে শুভকামনা । ও হ্যাঁ, বই এর বাইন্ডিং কিন্তু ভালো ছিল ।
জমলো না। রেটিং দুই দিবো নাকি তিন দিবো, তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে অবশেষে ফিনিশিং এর জন্য তিন দিলাম। গল্পটা গুছিয়ে লিখলে এখানে ৫ তারা দেওয়া ছাড়া উপায় থাকতো না। চরিত্রায়ন বলে যে উপন্যাসে কিছু একটা থাকে, তা এখানে পাই নি। ধুপধাপ করে চরিত্র এনেছে, যা ভালো লাগে নাই। গল্প তিনটা লেনে এগিয়েছে। খ্রীস্টপূর্ব ৩০০-৬০০অব্দ, ১৫৮০ সাল এবং বর্তমান সময়। এখানে খ্রীস্টপূর্ব সময়ের কাহিনীটা লেখক এত তারাহুরো করছে যে, প্রায় পুরোটায়ই নন-ফিকশন ফিলিংস পাচ্ছিলাম। এখানে নেবুচাদনেজার, অ্যামিতিস, আলেক্সান্ডার, টলেমি, সাইরাসের মত ঐতিহাসিক চরিত্রদের আগমন হয়েছে। এখানে লেখকের লেখনী প্রচ্চুর ভোগাইছে। কিছু কিছু জায়গায় সাধু আর চলিত ভাষার গুরুচন্ডালীর জন্য। তবে পার্টটা অনেক ইনফরমেটিভ ছিলো। ১৫৮০ সালের টাইমলাইনটা লেখক সবচেয়ে জোশ ভাবে মেইনটেইন করেছে। প্রতিপাদিত্য, অরুণাবতী, মাহতাব খানের প্রতিক্রিয়া গুলো সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছে। এখানে চরিত্রায়ন, আউটলাইন দুটাই ভালো হয়েছে। এছাড়া উঠে এসেছে বারো ভূইয়ার আমলের কিছু চিত্র। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটটা ভালো লাগে নাই। এখানে গোছানো লেখার অভাব আছে। রুদ্র রাশেদ আর মনসুর চরিত্র দুটাকে যেভাবে ফোকাসের দরকার ছিলো সেটা একেবারেই পারে নি। মিলি, কবির, অঞ্জনের এখানে বড্ড বেশি খসে গেছে। প্লটহোল অনেক ছিলো, শেষ মধ্যাংশের অনেকটা জায়গা ঝুলে গিয়েছে।।
ফ্ল্যাপ থেকে: দিন-দুপুরে মানুষের চোখের সামনে থেকে চুরি করে যাওয়ার সময় চোর ছোট্ট একটা চিরকুট ফেলে গেছে, যাতে লেখা- “অ্যামিতিস, তোমাকে ভালবাসি”। অথচ প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কিছু বলতে পারছে না। বাধ্য হয়ে ডিবি ইন্সপেক্টর মনসুর হালিম শরণাপন্ন হলেন পাগলাটে গবেষক ড. রুদ্র রাশেদের। দুজনের মিলিত তদন্তে খুলে গেল আড়াই হাজার বছর আগের এক অনন্ত রহস্যের দুয়ার! ব্লাডস্টোন এক মূর্তিমান অভিশাপের নাম, যার শুরুটা হয়েছিল ব্যাবিলনের শুন্য উদ্যানে! এই অভিশাপের বলি হয়ে কত রাজা হারিয়েছেন রাজ্য, সন্তান হারিয়েছে পিতা, প্রেমিক হারিয়েছে ভালবাসা, হয়েছে যুদ্ধ, হয়েছে বিদ্রোহ, হাজার হাজার মানুষ হারিয়েছে প্রান। তবুও শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে এই অভিশাপের পেছনে ছুটছে সবাই। শেষ পর্যন্ত ……
ভালবাসা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত দুর্লভ একটি উপহার। এই ভালবাসার জন্য মানুষ অনেক অসম্ভবকেও সম্ভব করে তোলে। প্রেয়সীর মনের বিষণ্ণতা দূর করার জন্য এমনই এক অসম্ভবকে বাস্তবে রুপদান করেন ব্যাবিলন সম্রাট নেবুচাদনেজার। তার প্রিয়তমা অ্যামিতিস এর জন্য নির্মাণ করেন ঝুলন্ত উদ্দান। রুক্ষ মরুর বুকে তার বাবার মিডিয়ান রাজ্যের মত একটি পরিবেশ স্থাপন করেন। কিন্তু এই ভালবাসার বহিঃপ্রকাশই যখন অভিশাপ এ পরিণত হয় তখন মানুষকে নিতান্তই অসহায় হয়ে পড়তে হয়। মূলত এখান থেকেই উৎপত্তি হয় ব্লাডস্টোনের। কিন্তু হাজার বছর আগে সহস্র মানুষের রক্তে উৎপন্ন হওয়া অভিশপ্ত ভালবাসার প্রতীক ব্লাডস্টোন কীভাবে বাংলাদেশ এ আসে? অন্যদিকে চন্দিক্যান রাজ্যের পরাক্রমশালী রাজা প্রতাপাদিত্যের মেয়ে রাজকুমারি অরুনাবতী ও একই রাজ্যের সেনাপতি মাহতাব খান একজন অপরজনকে ভালবাসে। কিন্তু তাদের ভালবাসার নীড়েও নেমে আসে কালো মেঘের অভিসম্পাত। এখানেও কি লুকিয়ে আছে ব্লাডস্টোনের অভিশাপ? তাদের জীবনে এমন কি ঘটেছিল যে আলাদা হতে হল দুটি ভালবাসার মানুষকে? এছাড়া সুরের জাদুকর নিকোলা পাগানিনি কিসের মোহে তার জীবন নষ্ট করতে চেয়েছিলেন? কেনইবা তার প্রিয় ছাত্র ক্যামিলো সিভরির ছেলে গঞ্জালো সিভরি আত্মহত্যা করল যে কিনা তার সময়ের জীবন্ত কিংবদন্তী ছিল। এছাড়া বইটিতে আরও আছে পাগানিনির ২৪ ক্যাপ্রাইস আবিষ্কারের বিস্ময়কর কাহিনী, পারস্য সম্রাট সাইরাসের ব্যবিলন দখলের কাহিনী, সম্রাট অ্যালেকজান্ডারের বিশ্বজয়ের ও তার মৃত্যুর করুন উপাখ্যান। বাংলাদেশের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত একটি প্রদর্শনী থেকে চুরি হয়ে যায় ব্লাডস্টোন। এখান থেকেই মূলত উপন্যাসটি শুরু হয়। চোর চুরি করে যাওয়ার সময় চোর ছোট্ট একটা চিরকুট ফেলে গেছে, যাতে ��েখা- “অ্যামিতিস, তোমাকে ভালবাসি”। কিন্তু চুরি করার সময়টুকুর সব কথা প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউই কিছুই মনে করতে পারছে না। ঘটনাটি তদন্তের ভার পড়ে ডিবি ইন্সপেক্টর মনসুর হালিমের উপর। তিনি ঘটনার কুল কিনারা করতে না পেরে শরণাপন্ন হলেন ইতিহাসের গবেষক ড. রুদ্র রাশেদের।
বইটি পড়তে গিয়ে বুঝতে পেরেছি লেখক অনেক পরিশ্রম করেছেন। ইতিহাসের অনেক দিক তুলে ধরেছেন। বইটিতে লেখক অনেক টুইস্ট রেখেছিলেন। কিন্তু টুইস্টগুলোর উত্তর আগেই পেয়ে গিয়েছি ইতিহাস বর্ণনার সময়। আমার কাছে টুইস্ট গুলোকে অনেক দুর্বল মনে হয়েছিল। এছাড়া লেখক কিছু জায়গায় বড় বড় ভুল করেছেন যেগুলোকে বাংলা সাহিত্যে গুরুচণ্ডালী দোষ বলে। বিশেষ করে যখন রাজকুমারী অরুনাবতী আর মাহতাব খান আর কাহিনি এসেছে। তারপর ও গল্পটা ভাল লেগেছে। এছাড়া মনসুর হালিম আর ড. রুদ্র রাশেদের কথোপকথন ভাল লেগেছে। একটি রহস্যের সমাধান লেখক করেন নি। ড. রুদ্র রাশেদের প্রিয় শিক্ষক ড. আবুল ফাতাহের স্ত্রী যাকে ড. রুদ্র রাশেদ নিজের মায়ের মত মনে করতেন তার মৃত্যু রহস্যের সমাধান করেন নি লেখক। প্রকাশনীর সম্পর্কে বলব তাদের পেইজ ফ্রন্ট খুব ভাল লেগেছে আর পৃষ্ঠাগুলো ও ভাল ছিল। তবে কিছু কিছু জায়গায় বানান কিছু ভুল ছিল তবে সহনীয় পর্যায়ে ছিল। সর্বোপরি, ব্লাডস্টোন খুবই উপভোগ্য একটি মৌলিক থ্রিলার। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য সুখপাঠ্য। বাংলাদেশের থ্রিলার সাহিত্য যে দিনদিন সমৃদ্ধ হচ্ছে ব্লাডস্টোন তার প্রমাণ। লেখকের কাছ থেকে ভবিষ্যতে আরো ভাল মৌলিক থ্রিলার আশা করি।
❛ব্লাডস্টোন❜ বইটির সাথে প্রাচীন মেসোপটোমিয়া ইতিহাসের ব্যাবিলনের সভ্যতা ওতপ্রোতভাবে সাথে জড়িত৷ মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের এই সভ্যতার পত্তন হয় ২০৫০ খ্রিষ্টপূর্বে। অ্যামোরাইট নামে পরিচিত সিরিয়ার মরুভূমি থেকে আসা একদল মানুষ গড়ে তোলে এই সভ্যতা। অ্যামোরাইটদের বিখ্যাত নেতা ‘হাম্মুরাবির’ নেতৃত্বে এই সভ্যতার জন্ম হয়। মেসোপটেমির সভ্যতার চূড়ান্ত ধাপ ‘ক্যালডিয়’ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল সম্রাট নেবুচাদনেজার। যদিও লেখক গোড়াপত্তন ও ক্যালডিয় সাম্রাজ্য নিয়ে কোনো তথ্য বইতে ইনক্লুড করেননি।
ঘটনার সূত্রপাত নেবুচাদনেজারের রানি শখ করে রাজাকে একটি বাগান নির্মাণ করে দিতে বলেন। রানির আবদার রাখতে রাজা নেবুচাদনেজার নগরীর চারদিকে যে দেয়াল ছিল তারই ছাদে তৈরি করেন বিশাল বাগান, এটিই এখন ‘ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান’ নামে পরিচিত। যদিও উপন্যাসে রানি শখ করে বাগান নির্মাণ কাহিনির সাথে ইতিহাসের মিল নেই! যাহোক সে-ই রানির নাম অ্যামিতিস! বইয়ের জনপ্রিয় ডায়লগ— ❝অ্যামিতিস আমি তোমাকে ভালোবাসি❞ নামকরণ হয় সম্রাট নেবুচাদনেজারের রানির নামানুসারে।
সম্রাট নেবুচাদনেজারের সময়কালকে নব্য-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য বলা হয় কারণ খ্রিষ্টপূর্ব ১৭৯২ থেকে ১৭৫০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন অ্যামোরিটের রাজা হাম্মুরাবি। তখনকার ব্যাবিলনীয়ার আয়ু ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী। হাম্মুরাবির মৃত্যুর পরই এই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে, এবং ব্যাবিলন পরবর্তী কয়েক শতকের জন্য একটি ছোটো রাজ্য হয়েই থাকে। খ্রিষ্টপূর্ব ৬১২ সালে নিনেভেহে অসরীয়দের পরাজিত করার মাধ্যমে নব্য-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য পরিণত হয় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজ্যে। কিন্তু সেটি খ্রিস্টপূর্ব ৬২৬ থেকে ৫৩৯ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।
পারস্যের কিংবদন্তী রাজা সাইরাস দ্য গ্রেট—মহাবীর আলেকজান্ডার—মুঘল বাদশা—বারো ভূঁইয়া ঈশা খাঁ—রাজা প্রতিপাদিত্য পর্যন্ত উঠে এসেছেন কাহিনির বিভিন্ন বাঁকে বাঁকে। ভূমিকা একটু বিশদভাবে লেখার কারণ মূল ইতিহাস আর উপন্যাসের কাহিনির তফাত কতটুকু সেটা বোঝাতে। যদিও লেখক বেশ ভালোই কাহিনি বুঝিয়েছেন বইয়ের মাধ্যমে কিন্তু সেটা ইতিহাসের সাথে কতটা সম্পৃক্ত সেটা যাচাই-বাছাই করাটাও জরুরি। একই প্রেক্ষাপটের কাহিনি কয়েকবার রিপিটও হয়েছে বিভিন্ন চরিত্রকে জানাতে। এক্ষেত্রে বর্তমান টাইমলাইনের কাহিনি ব্যাপ্তি কম পাওয়ার কারণে নিরুদ্যম হয়েছে। বর্তমান টাইমলাইন এইজন্য বললাম কারণ এই উপন্যাসে তিনটি মূল প্রেক্ষাপটের কাহিনি জড়িয়ে আছে। তিনটি আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও কাহিনির প্রেক্ষিতে খুচরা অনেক গল্প বলা হয়েছে যেটাকে সাবপ্লট বলা হয়।
➲ আখ্যান—
দিন-দুপুরে মানুষের চোখের সামনে থেকে চুরি করে যাওয়ার সময় চোর ছোট্ট একটা চিরকুট ফেলে গেছে, যাতে লেখা- “অ্যামিতিস, তোমাকে ভালবাসি”। অথচ প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কিছু বলতে পারছে না। বাধ্য হয়ে ডিবি ইন্সপেক্টর মনসুর হালিম শরণাপন্ন হলেন পাগলাটে গবেষক ড. রুদ্র রাশেদের। দুজনের মিলিত তদন্তে খুলে গেল আড়াই হাজার বছর আগের এক অনন্ত রহস্যের দুয়ার!
ব্লাডস্টোন এক মূর্তিমান অভিশাপের নাম, যার শুরুটা হয়েছিল ব্যাবিলনের শুন্য উদ্যানে! এই অভিশাপের বলি হয়ে কত রাজা হারিয়েছেন রাজ্য, সন্তান হারিয়েছে পিতা, প্রেমিক হারিয়েছে ভালবাসা, হয়েছে যুদ্ধ, হয়েছে বিদ্রোহ, হাজার হাজার মানুষ হারিয়েছে প্রান। তবুও শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে এই অভিশাপের পেছনে ছুটছে সবাই। আসুন ড. রুদ্র রাশেদের সাথে আমরাও ছুটি। দেখি এই রহস্যের কোন কূল- কিনারা হয় কিনা!
➤ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—
উপন্যাসটি পড়ার পরে প্রতিক্রিয়া খুবই মিশ্র। সরাসরি খারাপ বলতে পারছি না কারণ লেখক কাহিনি বিল্ডাপে দারুণ প্রেক্ষাপট বেছে নিয়েছেন এবং পুরোপুরি ভালো বলতে না পারার কারণ হিসেবে আছে চরিত্রের বিল্ডাপ থেকে টুকিটাকি অনেক কমতি। তবে হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার হিসেবে বইটি দারুণ, নির্দ্বিধায় এক ইতিহাসের সাক্ষী হতে বইটি পড়তে পারেন।
● প্রারম্ভ—
শুরু নিয়ে ওপরে অনেক কথা এমনিতে বলে ফেলেছি। যেহেতু কয়েকটি টাইমলাইন এসেছে কাহিনি বিল্ডাপের কারণে তাই প্রত্যকটি আলাদাভাবে নজর কাড়বে। শুরুটা বেশ চমকপ্রদ লেগেছে, ইতিহাস টেনে নিয়ে আসলেও সাজানো ভালো ছিল।
● গল্প বুনন—
গল্প বুননে লেখকের দক্ষতা পরিলক্ষিত। সাবলীলভাবে গল্প সাজানো হয়েছে পুরো বই জুড়ে। তিনটি প্লট বিল্ডাপের পাশাপাশি সাবপ্লটগুলো নিপুণভাবে বসিয়ে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে উপন্যাস একনাগাড়ে পড়ে যেতে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। গল্প যেভাবে বুনেছেন সেভাবে যদি বিল্ডাপ দিতেন তাহলে আরও ভালো লাগতো। মনে হচ্ছে লেখক বিল্ডিংয়ের ডিজাইন করতে এতই মুগ্ধ ছিলেন যে সেটা গঠনের কথা অবলীলায় ভুলে গেলেন।
● লেখনশৈলী—
লেখকের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। পুরো উপন্যাসে অভিযোগের অনেকগুলো কারণ থাকলেও এই দিকটাতে চুপ থাকতে বাধ্য। দারুণ সাবলীল আর প্রাঞ্জলতা দিয়ে আচ্ছাদিত। কারণে-অকারণে কিছু ভাষাগত ত্রুটি দেখা গেলেও পড়তে খারাপ লাগনি বরঞ্চ ভিন্ন একটা ফ্লেভার যেন যুক্ত করে দিয়েছে। ইতিহাসের যে প্রেক্ষাপট সে-ই থেকে বর্তমান টাইমলাইনে ঘটে যাওয়ার ঘটনা স্পষ্টভাবে লেখনশৈলীতে ফুটে উঠেছে। একটা সূক্ষ্ম টান রয়েছে, যেটা ছিঁড়ে যায়নি। সুন্দর!
● বর্ণনাভঙ্গি—
লেখনশৈলীর প্রভাবে বর্ণনাভঙ্গি জীবন্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যকটি ঘটনা ঘিরে যখন পারিপার্শ্বিক বর্ণনা ও চরিত্রের আচার-ব্যবহার, কাজের ধরন নিয়ে ব্যাখা দেওয়া হয় তখন বর্ণনাভঙ্গি সহজবোধ্য না হলে বিপদে পড়তে হয় পাঠককে। এদিকেও লেখক পাশ মার্ক করে গেছেন। লাইনের পর লাইন পড়ে যেতে কোনো বিরক্তিকর উদ্রেক হয়নি, মনে হচ্ছে রেলগাড়িতে চড়ে আয়েশি ঢঙে পুরো জার্নিটা উপভোগ করেছি।
খ্রিষ্টপূর্বেকার সময়—���ধ্যযুগ—বর্তমান তিন সময়ের যে পারিপার্শ্বিকতার ছোঁয়া ও চরিত্রগুলোর কার্যকলাপ আলাদাভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে লেখক।
● চরিত্রায়ন—
ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে যে চরিত্রগুলো উঠে এসেছে তাদের নিয়ে ঘাটাঘাটি না করা ভালো। কারণ ইতিহাস প্রায় মানুষের জানা, সেইদিক থেকে চরিত্রদের নিয়ে কমবেশ জানাশোনা সবার মধ্য রয়েছে। আমি ফোকাস করব মধ্যযুগীয় সময়কে কারণ এই একটি টাইমলাইনে ��রিত্রগুলো পূর্ণরূপে সজ্জিত ছিল। বর্তমান টাইমলাইনে ব্লাডস্টোন চুরি নিয়ে ডিবি ইন্সপেক্টর মনসুর হালিম চরিত্র বিল্ডাপ যথাযথ হলেও গবেষক ড. রুদ্র রাশেদে কেমন যেন লাইমলাইটে থেকেও অন্ধকারে রয়ে গেলেন। তার অতীত ঘোলাটে। কোনো একটা ট্রাজেডি তার সাথে ঘটেছে কিন্তু সেটার মীমাংসা লেখক করেনি। বাকি বর্তমান সময়ের তিনটি চরিত্র যারা ব্লাডস্টোনের সাথে অন্তর্ব্যাপ্ত তাদেরও সেইরকম বিল্ডাপ পাওয়া যায়নি৷
মাদার তেরেসার মতো ক্যারেক্টর লেখক টেনেছেন! ঘটনা বিশাল, সাজানো ভালো কিন্তু আরও গ্রিপিং করার তথ্য-উপাত্ত দরকার ছিল।
● সমাপ্তি—
সমাপ্তি ছিল নাটকীয়তায় পূর্ণ। ইতিহাস এখানে সবকিছু, তদন্ত ছিল সীমিত পরিসরে। গতানুগতিক জিজ্ঞাসা আর কয়েকবার দৌড়াদৌড়ি করে ফুটেজ চেক পর্যন্ত। এরপরে ক্লাইম্যাক্সের আগে সাসপেন্স ক্রিয়েটে ব্যর্থতা। অনুমান করে ফেলা যায় কখন কী ঘটবে। মূল চরিত্রের একজনের কনফেশন, ইতিহাসে সংঘটিত হওয়া ঘটনার মিল রেখে সমাপ্তি। সেখানেও কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে। বিশেষ করে মোমের মূর্তির গলার নেকলেসটি নিয়ে! অধ্যায় ৭ এর সাথে ভেবেছি শেষের মিল থাকবে কিন্তু সেইরকম হয়নি কিছুই। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যকার ঘটনার আরেকটু বিস্তারিত বিবৃতির ছিল। শুধু জায়গা বদল আর ক্ষমতা স্থাপিত করতে গিয়ে অনেককিছু মিসিং মনে হয়েছে।
● খুচরা আলাপ—
১৮৬৫ সালে প্রকাশিত হওয়া বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাসের রেফারেন্স উঠে এসেছে। তার সাথে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী’র ‘রায় নন্দিনী’ উপন্যাসের হওয়া ক্ল্যাশের একটি দিক উল্লেখযোগ্য ছিল। ইতিহাসের সাথে লেখকের নিজস্ব কিছু কল্পনা যুক্ত করেছে কাহিনি প্রতিষ্ঠা করার জন্য। সেটাও কিছুটা ভালো আবার কিছুটা খারাপও লেগেছে।
➢ লেখক নিয়ে কিছু কথা—
নাজিম ভাইয়ের লেখার সাথে পূর্বে পরিচিত না থাকলেও ❛ব্লাডস্টোন❜ দিয়ে পরিচয় হয়ে গেল। তবে বইটি যে হাইপ ক্রিয়েট করেছিল সে-ই অনুযায়ী হতাশ-ই বটে। ইতিহাসের এত বিস্তৃত প্লট হলেও বর্তমান সময়ের কাহিনি বিল্ডাপে আরেকটু ফোকাস রাখলে পুরো উপন্যাসটি জমজমাট হতো। সবকিছু কেন যেন গুছিয়ে নিয়ে এসেও শেষ পর্যন্ত গোছাতে ব্যর্থ হলেন।
● সম্পাদনা ও বানান—
হ্রস্ব-ই কার এর বদলে দীর্ঘ-ই কারের অপব্যবহার। ‘ও-কার’ ব্যবহারে ভুল সিদ্ধান্ত। রেফ-এর পরিবর্তে বেশকিছু বানানে র-ফলা এসেছে যেমন– ব্যাক্তিবগ্রের। টাইপো প্রচুর ছিল। এক বানানের দুইরকম রূপ। যুক্ত শব্দগুলো ভেঙে যাওয়া যেমন– কাণ্ড জ্ঞান, যার পর নাই। মূল কে মুল, ভূত কে ভুত লেখার মতো ঊ-কার বিভ্রাটও আছে। ন ও ণ এর তফাতে সমস্যা।
৮৭ পৃষ্ঠা : অবতার রামচন্দ্র নিজেই ইন্দ্রজৎকে ছদ্মবেশে কাপুরুষের মতো বধ করেছিলেন।
সংশোধন– রামচন্দ্র কখনও ইন্দ্রজিৎ অথবা মেঘনাদকে বধ করেননি৷ করেছে রামচন্দ্রের ছোটো ভাই লক্ষ্মণ। তাও তৃতীয় দিনের যুদ্ধে ইন্দ্রজিতের চাচা/কাকা বিভীষণের সহায়তায়। আরেকটি বিষয় কাহিনির প্রেক্ষিতে বইতে যেহেতু মেয়ে সংগঠিত কারণে এই ‘কাপুরুষ’ শব্দটি এসেছে সেক্ষেত্রে লক্ষ্মণ ইন্দ্রজিৎ-কে মেরে ফেলার পেছনে সেইরকম কোনো কারণ নেই। রামচন্দ্র মূলত লুকিয়ে হত্যা করেন মিত্র সুগ্রীবের বড়ো ভাই বালীকে। বালী, সুগ্রীবের স্ত্রী রুমাকে ঘটনাচক্রে জোর করে নিজের কাছে রেখে দেন যা সনাতন ধর্মে গর্হিত কাজের একটি।
এছাড়া স্থানের নাম, চরিত্রের নাম এইসব কিছুর ভুল তো আছেই। নতুন সংস্করণ যেহেতু ছিল তাহলে আরও ভালোভাবে সম্পাদনা করা দরকার ছিল।
● প্রচ্ছদ—
স্বয়ং লেখক প্রচ্ছদ তৈরি করেছেন। ফ্রন্ট কাভারে নারী অবয়বের গলার লকেটে স্টোন পাঁচটি দেখা গেলেও মূলত কাহিনিতে লকেটে চারটি স্টোনের কথা উল্লেখ রয়েছে। যেটা ব্যাক কাভারে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। সাথে ভায়োলিনের একটি ইমেজ। বইয়ের হিস্টোরিক কিছু চরিত্র প্রচ্ছদে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস দেখালেও মিল কিছু খুঁজে পেলাম না। প্রচ্ছদ মোটামুটি।
● মলাট, বাঁধাই, পৃষ্ঠা—
শক্তপোক্ত মলাটের সাথে টাইট বাঁধাই। কালার প্রিন্ট কাগজ, মান কেমন জানি না তবে ভালোমতো পড়া গিয়েছে।
➠ বই : ব্লাডস্টোন | নাজিম উদ দৌলা ➠ জনরা : হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার ➠ প্রথম প্রকাশ : আগস্ট ২০১৫ ➠ দ্বিতীয় মুদ্রণ : সেপ্টেম্বর ২০১৫ ➠ নতুন সংস্করণ : জানুয়ারি ২০২০ ➠ প্রচ্ছদ : নাজিম উদ দৌলা ➠ প্রকাশনা : আদী প্রকাশন ➠ মুদ্রিত মূল্য : ৩৯৫ টাকা মাত্র ➠ পৃষ্ঠা : ৩০৪
উপন্যাসের শুরুতেই প্রাচীন ব্যবিলনের সম্রাট নেবুচাদনেজার এবং রানী অ্যামিতিসের প্রনয় ও পরিনয়ের দৃশ্য। রানী অ্যামিতিস সম্রাটকে এক অসম্ভব চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল। সম্রাট তা সানন্দে গ্রহন করল এবং বলল- অ্যামিতিস, তোমাকে ভালবাসি।
পরের দৃশ্যে দেখা গেল সমসাময়িক বাংলাদেশ। এক পাচতারা হোটেলে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী হচ্ছে দুষ্প্রাপ্য সব এন্টিক গহনার। সেই প্রদর্শনী থেকে অভিনব উপায়ে শ’খানেক মানুষের চোখের সামনে থেকে চুরি হয়ে গেল ব্রিটিস রানীর সম্পত্তি ব্লাডস্টোন নামের একটি নেকলেস। উপস্থিত সকলের ১০ মিনিটের স্মৃতি গায়েব। চোর ছোট্ট একটা চিরকুট ফেলে গেছে, তাতে লেখা আছে, অ্যামিতিস, তোমাকে ভালবাসি।
এই পর্যন্ত পড়ার পর পাঠক চমকে যাবে। হাত থেকে বইটা রাখার কথা ভুলেও ভাববে না। প্রাচীন আমলের এক সম্রাজ্ঞীকে ভালবাসার কথা কেন বর্তমান সময়ে কেউ চিরকুটে লিখবে? আর কেনই বা সেটা চুরির স্থানে ফেলে যাবে?
এর পর কাহিনী এগিয়ে গেছে তিনটা মুল টাইম লাইন ধরে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতা, ১৫০০ শতকের আফগানিস্থান-ভারত-বাংলার চন্ডিক্যান রাজ্য আর সমসাময়িক বাংলাদেশ। মাঝে মধ্যে এর বাইরেও দুই তিনটা টাইম লাইন দেখা গেছে। যেমন ১৭০০ শতাব্দীর ইতালি, ১৯৯৬ সালের কোলকাতা, ১৯৪৭ সালের ব্রিটিস পার্লামেন্ট। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময় পর সব গুলো ঘটনাই এক সুত্রে এসে গাঁথা পড়েছে। এই সুত্রের নাম- ব্লাডস্টোন।
ব্লাডস্টোন চুরি হওয়ার পর থেকেই চুরির ঘটনা ঘিরে একের পর এক রহস্য সৃষ্টি হয়ে চলেছে। একটা রহস্যের দিকে নজর দিলে অন্য আরেকটা এসে হাজির। চুরির রহস্য তদন্ত করছে ডিবি অফিসার মনসুর হালিম আর ব্লাডস্টোনের পেছনের ইতিহাস উদ্ঘাটনে ব্যস্ত ড. রুদ্র রাশেদ। দুইজন দুই মেরুর মানুষ। একজন সদা হাসি খুশী, সব বিষয়ে মজা করে বেড়ানোই যার স্বভাব। অন্যজন গম্ভীর, মিতভাষী, শব্দ করে হাসেও না কখনও।
মুল তদন্তের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে উঠে আসছে তাদের জীবনের ছোট ছোট অনেক বিষয়। যার কিছু ব্যাক্ষা লেখক দিয়েছে, কিছু হয়ত তুলে রেখেছে সামনে কোন বইতে লেখার জন্য। রুদ্র রাশেদকে নিয়ে সিরিজ লেখার চিন্তা আছে লেখকের মাথায়, সেটা বই পড়লেই টের পাওয়া যায়। তবে সেখানে মনসুর হালিমকেও দেখানো গেলে মন্দ হয় না। লোকটা ভারী মজার। লেখকের সেন্স অফ হিউমারের প্রশংসা না করে পারছি না। এমন সিরিয়াস কাহিনির মধ্যেও মনসুর হালিম ক্যারেকটারটা পাঠককে খুব হাসাবে। খানিকটা মাসুদ রানার গিলটি মিয়ার মত লেগেছে লাগতে পারে।
যাই হোক, একটা নির্দিষ্ট সময় পর দুজনের মিলিত তদন্ত এক যায়গায় এসে থামল। এর পরের ঘটনা গুলোতে আছে একের পর এক চমক। এভাবেই দারুণ এক ফিনিশিং এর মধ্যে দিয়ে শেষ হয় ব্লাডস্টোন যাত্রা। বলতে বাধ্য হচ্ছি- বইটার এরচেয়ে ভাল ফিনিশিং আর কিছু হতে পারত না। শেষে এসে মনটা একদিকে যেমন বিষণ্ণ হ��়ে যাবে, অন্যদিকে তেমন ভাললাগার অনুভূতি কাজ করবে।
আমার বিশ্লেষণঃ
বইয়ের শুরুর অধ্যায়টা বাদে, বাদ বাকি পুরো বইটা দারুণ উত্তেজনায় ভরপুর। প্রত্যেক ঘটনাবলির দৃশ্যায়ন অতি চমৎকার ছিল যা পাঠককে সারাক্ষণ বইয়ের মধ্যে গেঁথে রাখবে। আর শেষ দশটা অধ্যায় পাঠকের উত্তেজনা বাড়িয়ে দেবে তিনগুন। বার বার মনে হবে- শেষ হতে হতেও যেন হল না।
বইটার যেসব দিক ভাল লেগেছেঃ
প্রহমেই বইয়ে��� গেট আপের কথা বলতে হয়। ডাবল কভার দেওয়া। উপরের কভারে বইয়ের নামটা লেমিনেটিং করা আলো প্রতিফলিত হয়, দারুণ লাগে। ভেতরের কভাব হার্ড বাঁধাই করা, অনেকটা ডায়েরির মত। বাইন্ডিং আর কাগজের মান ভাল। সেই হিসেবে দামটা রিজনেবল হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বইতে ইতিহাসের বোরিং বর্ণনা ছিলনা, লেখকের লেখার স্টাইল খুবই ইন্টারেস্টিং যা পাঠককে বইতে আঁটকে রাখতে বাধ্য করবে। লেখকের ইতিহাস সংক্রান্ত জ্ঞানের পরিধি ব্যাপক। বইতে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার বিভিন্ন গুরুত্পূর্ণ অধ্যায়, মহাবীর আলেক্সান্ডারের মৃত্যু রহস্য বিশ্লেষণ, বাদশা হুমায়ুনের সময়কার ঘটনাবলী, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের রুপ ইত্যাদি বিষয় তো আছেই। পাশাপাশি পবিত্র বাইবেল ও তাওরাত থেকে নেওয়া তথ্যও ছিল। ভাবতে আমার গর্ব হয়- বাংলাদেশী একজন রাইটার একটা বই লেখার পেছনে এমন পরিশ্রম করতে পারে। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে বিবিএ- এমবিএ পাশ করা একজন একটি ছেলের ইতিহাসের প্রতি এত আগ্রহ এল কি করে?
তৃতীয়ত, এই উপন্যাসে মানুষ একই সাথে অনেক কিছুর স্বাদ পাবে। বইতে যেমন আছে ইতিহাস, তেমনি আছে প্রেম, দ্বন্দ্ব, সংখাত, সংগ্রাম। আছে রহস্য, আছে থ্রিল, কিছু একশন দৃশ্যও আছে। সর্বোপরি বইতে বেশ কয়েকটা টুইস্ট বা চমক আছে, যা বইটিতে পারফেক্ট থ্রিলার উপন্যাসের সমস্ত উপকরন জুড়ে দিয়েছে। এক কথা বলা চলে- ভাললাগার সমস্ত উপকরন আছে বই জুড়ে। ভাল না লেগে কোন উপায় নেই। এতদিন বাইরের রাইটারদের এমন লেখা পড়ে এসেছি আমরা। এখন নাজিম উদ দৌলার মত রাইটারদের হাত ধরে বাংলায় সাহিত্যেও সেই ধারার আগমন হচ্ছে। এটা সত্যি আনন্দের বিষয় আমাদের জন্য।
বইটার যেসব দিক খারাপ লেগেছেঃ
বইটাতে কয়েকটা ব্যাপার আছে যা আমার খারাপ লেগেছে। প্রথমত, বানান ভুল আর সেই ভুল থেকে ব্যকরনগত ভুল এর কথা বলব। দুই তিন টা খুব গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে খুব কমন কিছু বানান ভুল ছিল যা দৃষ্টি আঁটকে দিয়েছে। বানান ভুল আমরা সবাই করি, এই রিভিউতেও বেশ কয়েকটা ভুল করেছি আমি জানি। কিন্তু একজন লেখক আমাদের লেখা শেখাবে, সেখানে বানান ভুল অবশ্যই কাম্য নয়। লেখকের আগের বই ইনকারনেশনেও বেশ বানান ভুল ছিল, এবার অবশ্য কম। এটা কি পুরোপুরি লেখকের দোষ বলব নাকি প্রুফ রিডারের ভুল বলব জানি না। আর একটা কথা হচ্ছে- আদী প্রকাশনের বইগুলোতে আদৌ কি প্রুফ রিড করা হয়? বাইরের গেট আপ মাশাল্লাহ ভাল হচ্ছে। কিন্তু এখন ভেতরের ব্যাপারেও নজর দেয়া দরকার। নাজিম উদ দৌলার লেখার স্টাইলটা মারাত্মক, কিন্তু এ ধরনের ভুল সেটার মান নষ্ট করছে।
দ্বিতীয়ত, বইতে ছোটখাট অসঙ্গতি ছিল। লেখক হয়ত অনেক তথ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কিছু ভুল করে ফেলতে পারেন, কিন্তু প্রুফ রিডারের দরকার ছিল এটা ধরা। একটা ভুলের কথা লেখক নিজেই বলেছেন যে মে মাসের বদলে এপ্রিল লেখা হয়েছে শেষ দিকের অধ্যায়গুলোতে। কিন্তু ওটা ছাড়াও কয়েকটা ভুল পেয়েছি আমি। বইয়ের ঘটনা চলছে উত্তরায় কিন্তু চরিত্ররা বেইলি রোডে বসে আছে- এমন আছে একটা দৃশ্যে। ভারী আজিব ব্যাপার। কবির অঞ্জনকে শুরুতে আপনি করে বলছিল, পরের দিকে তা তুমি হয়ে গেল। প্রাচীন সময়কার দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে একটা যায়গায় দেখলাম কয়েকটা লাইনে সাধু ভাষার শব্দ ব্যবহার হয়েছে। একটা বই ফাইনাল প্রিন্ট দেওয়ার আগে কয়েকবার করে বইয়ের খুটিনাটি পড়ে বিচার – বিশ্লেষণ করে নেয়া প্রয়োজন। আশাকরি, বইয়ের পরের মুদ্রনে এই ব্যাপারগুলো ঠিক করে নেয়া হবে। তাছাড়া লেখক এবং প্রকাশনী উভয়ই সামনে এইসব বিষয়ে যত্ন নিবে বলে আশাকরি। কারণ এই ব্যাপারগুলো একটা ভাল লেখাকে অনায়াসে বিরক্তিকর লেখায় পরিনত করতে পারে।
তৃতীয়ত, বইয়ের মূল ক্যারেকটার রুদ্র রাশেদকে আরও লাইভলি দেখানো গেলে ভাল হত। হতে পারে কাহিনীর বিশাল পরিসরের কারণে লেখক এটা করতে পারেনি। কিন্তু করতে পারলে ক্যারেকটার ডেভেলপমেন্ট আরও ভাল হত। এই বিষয়টা প্রত্যেক বইতে জরুরী। কারণ পাঠক পাঠিকারা একটা বই পরার সময় একটা দুইটা মূল চরিত্র বেছে নিয়ে তার দৃষ্টিকোণ থেকে বইটা ভিজুয়ালাইজ করতে শুরু করে। একটা দুইটা ক্যারেকটার ভালভাবে ডেভেলপ করা না গেলে মূল চরিত্র কে, এটা বের করা মুশকিল হয়ে পড়ে। এই বইতে যেমন রুদ্র রাশদ, মনসুর হালিম, মাহতাব খান, নেবুচাদনেজার, অঞ্জন পাল, কবির হুসেইন- ছয়জনের মধ্যে মানুষ কনফিউজড হবে যে কে গুরুত্বপূর্ণ বেশি।
শেষ কথাঃ
বইয়ের শেষে লেখক একটা প্রশ্ন রেখে গেছেন পাঠকের জন্য। প্রশ্নটা অবশ্য হালিম করেছে রাশেদকে- “আবার কি হবে দেখা?” বইয়ের শেষ কটা লাইনে অবশ্য লেখক তার উত্তরও দিয়ে গেছে। “কে জানে হয়ত আবার তাদের দেখা হয়ে যাবে। অন্য কোন ইতিহাসে, অন্য কোন গল্পে”।
আমার উত্তর, অবশ্যই আমরা চাই দেখা হোক। রুদ্র রাশেদকে আবার দেখতে চাই কোন এক ঐতিহাসিক রহস্যের পেছনে ছুটতে। সেই সাথে দেখতে চাই মনসুর হালিমকেও। হয়ে যাক, প্রোফেসর ডাবল আর সিরিজ। বাংলা সাহিত্যে এটা দারুণ এক এডিশন হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
আমার রেটিং= ৮/১০ বানান ভুল এবং টুক টাক অসঙ্গতি বাদ রাখলে= ৯/১০
আর শেষে আমার মত যারা বইয়ের পোকা পাঠক আছেন, তাদের বলব- বই বের হলে মানুষ পড়বে, রিভিউ দেবে, আলোচনা সমালোচনা করবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই সব দেখে বই সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত নিবেন না। আপনার নিজের মতামতটাই আপনার জন্য সবচেয়ে বড় বিষয়।
নাজিম উদ দৌলার মত নতুন রাইটার উঠে আসছেন। চিরায়ত রোম্যান্টিক ঘরানার উপন্যাসের ধরণ থেকে বেরিয়ে এসে বাংলা সাহিত্যের একটা নতুন ধারা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। আপনারা তাদের বই কিনুন, পড়ুন, গঠনমূলক মতামত দিন। উৎসাহ দিন। তাহলেই বাঁচবে আমাদের সাহিত্য।
কাহানী সংক্ষেপ :: ঐতিহাসিক উপন্যাস যেখানে ইতিহাস শেষ হয়ে লেখক তার কল্পনার ছাপ ফেলে ছক তৈরি করেন। অর্থাৎ ইতিহাস যেখানে শেষ উপন্যাসিকের কল্পনা সেখান থেকেই শুরু। ব্লাডস্টোন উপন্যাসটি এমনি এক ঐতিহাসিক উপাখ্যান।
গল্পের শুরু পাচঁ তারকা বিশিষ্ট হোটেল রেডিসন এর একটি চুরির ঘটনা দিয়ে। জাতিসংঘ এর একটি অঙ্গ সংগঠন একটি আন্তর্জাতিক অ্যান্টিক প্রর্দশনী হয় এই হোটেলে। উক্ত প্রদর্শনীতে চুরি হয় লাল রং এর পাথরের একটি হার যা সুদূর ব্রিটেন থেকে এসেছে।মজার ব্যাপার হলো চুরিটা হয় জনসম্মুখে এবং চোর বুলেটপ্রুফ কাচ ভাঙ্গে হাতুরি দিয়ে। কিন্তু কেউ তখন কিছু বলল না চোরকে। ঘটনা স্থলে স্পেশাল গোয়েন্দা বিভাগ থেকে আসেন মুনসুর হালিম ও তারদল। সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে দেখে যে চোর মুখোশ পরে এসেছিল এবং সবার সামনে হাতুরি দিয়ে বুলেটপ্রুফ কাচ ভেঙ্গে নিয়ে যায় সেই লাল রঙের পাথর বসানো হারটি। উপস্থিত লোকজন স্থির হয়ে দাড়িয়েই ছিল সবাই। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ জানতে পারে যে উপস্থিত সবার কারো কোন কিছুই মনে পড়ছে না। সবার মাথা থেকেই যেন এক মুহুর্তের জন্য হারিয়ে গেছে সেই স্মৃতি, কেউ কিছুতেই কিছু মনে করতে পারছে না। প্রাথমিক ভাবে পুলিশ সন্দেহ করে মিলি এবং তার হাজবেন্ড কবির কে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট আবিস্কার করে যাতে লেখা ' অ্যামিতিস, তোমাকে ভালোবাসি'।
অতিতের ঘটনা: খ্রিস্টপূর্ব ৫৯৫, মেসোপটেমীয় সভ্যতায় ব্যাব���লনের দূর্গে, মহাপরাক্রনশীল রাজা নেবুচাদনেজার।তার প্রান প্রিয় স্ত্রী অ্যামিতিস এর মন বিষন্ন। রাজা বিষন্নতার কারন জানত চাইলে অ্যামিতিস বলে তার পিতৃভুমি মিডিয়ান ছিল সবুজে ভরা কিন্তু ব্যাবিলন মরুর দেশ এই মরুর দেশে তার দম বন্ধ হয়ে আসে। রাজা অ্যামিতিস এর কথা শুনে সিধান্ত নেন য়ে আগামী ১৪ পূর্নিমার আগেই ব্যাবিলনে একটি ঝুলন্ত উদ্দান হবে তার রানির জন্য। যেই বলা সেই কাজ এবং সফল রাজা ক��ন্তু মিডিয়ান সম্রাজ্যের মতো আকাশে লালচে রেখা আনতে পারেনি রাজা নেবুচাদনেজার তাই সে বিজ্ঞানী এর সাহায্যে এক কৃত্রিম পাথর আবিস্কার করে ঝুলন্ত উদ্দানের আকাশে লালচে আভা এনে দেন। আর এই কৃতিম পাথর হচ্ছে রক্তের তৈরি। যে সে রক্ত নয় হাজার মানুষের রক্ত।এটাই ব্লাডস্টোন।
বর্তমান সময়ে চুরির রহস্য উন্মোচনে নেমেছে মুনসুর হালিম। চিরকুট এর সূত্র ধরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ডাবল আর এর। সরি ডাবল আর মানে রুদ্র রাশেদ।রুদ্র রাশেদ স্যার বিভিন্ন সূত্র থেকে তাকে জানায় যে ব্লাডস্টোন এর জন্ম প্রাচীন ব্যাবিলনে এবং ব্যাবিলনের শুন্য উদ্দান ধ্বংস করে দিয়েছে পারসিয়ান সম্রাট সাইরাস। এবং সেই সাথে ধ্বংস হয়ে যায় ব্লাডস্টোন পাথরও,তবে কিছু টুকরো অংশ থেকে যায়, যা কালক্রমে আলেকজান্ডার এর হাত ধরে চলে আসে এই উপমহাদেশ এ। তারপর কিছুদিন আফগানদের হাতে থাকে ব্লাডস্টোন এবং পরবর্তী তে সম্রাট হুমায়ূন এর সময়ে এক আফগান মহিলার হাতে থাকে সেই ব্লাডস্টোন এর হারটি। সম্রাট হুমায়ূন এর পত্নী হামিদা বানুর চোখ পরলে মহিলাটি এই ব্লাডস্টোন এর হারটি তার কিশোর পুত্র মাহতাব এর হাত দিয়ে বাংলায় পাঠিয়ে দেয়। তখন ছিল যশোহররাজ রাজা প্রতাপাদিত্য এর রাজ্য। মাহতাব খান প্রতাপাদিত্য এর দরবারে বড় হয় এবং তার সেনাপতি নিযুক্ত হয়। ঘটনাক্রমে অভিশপ্ত ব্লাডস্টোন এর হারটি জরিয়ে পড়ে মাহতাব খান এর প্রেম কাহানিতে। সে কাহানী টা বলবো না এটাই গল্পের মুল সাসপেন্স। তো আপাতদৃষ্টতে যেসকল প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, ব্লাডস্টোন এর ইতিহাস কি? কিভাবে ব্লাডস্টোট বাংলায় আসলো? কিভাবেই ঝুলন্ত উদ্দান ধ্বংস হলো? মাহতাব খানের রহস্য কি? তার প্রেমকাহিনীতে কিভাবে ব্লাডস্টোন জরিয়ে গেলো? বর্তমান সময়ে কে ব্লাডস্টোন চুরি করলো? এতো লোকের সামনে কিভাবে চুরি করলো? আর চুরির পর সে চিরকুট এর রহস্য? তাহলে কি সম্রাট নেবুচাদনেজার খ্রিষ্ট পূর্ব ৫৯৫ থেকে উঠে এসেছে এই বাংলায়? উত্তর খুজতে হলে ডুবদিতে হবে নাজিম উদ দৌলা ভাইয়ের হিস্টোরিক্যাল ফিকশন ব্লাডস্টোন এর অভিশপ্ত জগত এ।
পাঠ প্রতিক্রিয়া :: হিস্টোরিক্যাল থৃলার। ব্লাডস্টোন।অসাধারন। একটি থৃলার এ যা যা থাকে, সাসপেন্স, রহস্য, টুইস্ট সবকিছু ছিল ব্লাডস্টোন এ। লেখক অনেকগুলো ইতিহাস এর চরিত্র এবং ঘটনার সমন্নয়ে এমন ভাবে জাল বুনেছেন যেন পাঠক সে জালে আটকাতে বাধ্য। তাছারা ঐতিহাসিক চরিত্র এবং তার সাথে লেখক এর কল্পনায় অসাধারন একটি প্লট তৈরিতে লেখক সফল। আবার লেখার স্টাইলেও বলা যায় যে পাঠক ধরে রাখার প্রবনতা ছিল। সর্বাপরি গল্প এর প্লট নিয়ে বললে আমি বলবো অসাধারন। লেখক যে অনেক স্টাডি করে গল্পটা সাজিয়েছেন তার পুরো সাফল্য হয়েছে। তো আমার কাছে এক কথায় অসাধারন লেখেছে। অসাধারন প্লট লিখনি স্টাইল,ইতিহাস আর বর্তমানের সমন্বয় সবকিছুততেই লেখক সফল। তাই বলাযায় লেখক এর জন্য ৫ তারকা। এমন সুন্দর একটি বই সম্পর্ক এ আমি আগে জানতাম না তাই একজন এর থেকে শুনে আমি পিডিএফ এ পরেছি আার ঐ পিডিএফ এই নেশা ধরেছে তাই বইটি যেন কেউ মিস না করে আমি কমেন্ট এ পিডিএফ লিংকটি দিয়ে দিচ্ছি।
মন্তব্য :: সব দিক থেকে প্রশংসা এর দাবি রাখে নাজিম উদ দৌলা ভায়ের ব্লাডস্টোন থৃলারটি। বাংলাদেশের থৃলার সাহিত্য যে কতটা উন্নত হচ্ছে দিনদিন তা এই ধরনে বই না পরলে বুঝা যাবে না। প্রিয় পাঠক একটি মাস্ট বি বইয়ের তালিকায় আপনি নিতে পারেন ব্লাডস্টোনকে। তাই আপনাকে ব্লাডস্টোন এর জগতে স্বাগতম। আর হ্যা ''অ্যামিতিস,তোমাকে ভালোবাসি''।
ব্লাডস্টোন একটি হিস্টোরিকেল থ্রিলার। এর কাহিনী গড়ে উঠেছে একটি রহস্যময়, এবং অভিশপ্ত পাথরকে কেন্দ্র করে যার নাম ব্লাডস্টোন। এই পাথরটির গোড়া ব্যবিলনে, সেখানেই সমস্ত রহস্যময়তার শুরু। গল্পটি শুরু হয়েছে ব্যবিলনের রাজা নেবুচাদনেজার আর তার রানী অ্যামিতিস এর প্রেমোময় ঘটনার ভেতর দিয়ে। প্রথম চ্যাপ্টারের শেষের দিকের দুটি কথা পাঠকের হৃদয় হরণ করে নেবে। ‘অ্যামিতিস, তোমাকে ভালবাসি।’ ‘অ্যামিতিসও আপনাকে ভালবাসে, সম্রাট।’
এরপর শুরু হবে মুল কাহিনী। ঢাকার অভিজাত হোটেল, র্যাডিসন থেকে একদম প্রকাশ্য দিবালোকে অন্তত কয়েকশ লোকের চোখের সামনে চুরি হয়ে যায় ইংল্যান্ডের রাণীর এক অমূল্য জুয়েল। চুরি হওয়াটা যতটা না বিস্ময়কর, তার চেয়ে ঢের বিস্ময়কর চুরির পদ্ধতিটা। চুরি হওয়ার সময় সেখানে প্রায় একশ লোক উপস্থিত থাকলেও, কেউ কিছুই দেখেনি, যদিও তাদের চোখের সামনেই ভাঙ্গা হয়েছে কাচের বক্সটি। তাদের সবার জীবন থেকে দশ মিনিট স্রেফ গায়েব হয়ে গিয়েছে; কেউই বলতে পারছে না, এই দশ মিনিট ওরা কি করছিল। সিসি ক্যামেরাগুলোতে দেখা যাচ্ছে কোন এক মুখোশ পরিহিত লোক সবার চোখের সামনে কাচ ভেঙ্গে জুয়েলারি নিয়ে পালিয়ে গিয়েছে, এবং সবাই সেটা অপলক তাকিয়ে থেকে দেখছে, কিন্তু কারোই কিছু মনে নেই! এতগুলো লোক কি একসাথে মিথ্যা বলছে? সম্ভব নয়। রহস্য আরো ঘনীভূত হয়, যখন পুলিশের ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের কর্মকর্তা মনসুর হালিম জুয়েলারির ভাঙ্গা বক্সের ভেতর একটি চিরকুট পান, যাতে লেখাঃ অ্যামিতিস, তোমাকে ভালবাসি।
এরপর শুরু হয় রহস্য সমাধানের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান। চরিত্রগুলো ভ্রমন করতে থাকে ইতিহাসের পাতায় পাতায়, এঁকে দিতে থাকে চিহ্ন, বলতে থাকে সুত্র, যার মাধ্যমে চোর পর্যন্ত পৌছানো যাবে।
অতীত এবং বর্তমান মিলিয়ে বেশ কয়েকটি কাহিনী একসাথে সমান্তরালে চলেছে এখানে। এখানে আছে অতীতের এক জোড়া প্রেমিক যুগল, যাদের প্রেম উপাখ্যান পড়লে চরম নিষ্ঠুর মনেও দাগ কেটে যাবে। সেই সাথে আছে, ইতিহাসের নিষ্টুরতার বিবরণ, সত্য উদঘাটন। কে সেই চোর? কেন সে চুরি করে সেখানে ঐ চিরকুট ফেলে গিয়েছে? কি তার উদ্দেশ্য? জানতে হলে পড়তে হবে, ব্লাডস্টোন।
এবার ব্লাডস্টোনের কিছু ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে বলি। এগুলো বলার আগেই শুরুতে বলে রাখি, লেখক এই উপন্যাস দুইবার লিখেছে। প্রথমবার লেখার পর, ওর হার্ড ডিস্ক পুরোই ক্র্যাশ করে, সব মুছে যায়, ব্লাড স্টোন এর ম্যানুস্ক্রিপ্ট সহ। কতটা ধৈর্যশীল আর পরিশ্রমী হলে একজন মানুষ এই পুরো উপন্যাসটি আবার লেখতে পারে, সেটা ভাবতেই অবাক লাগে। লেখকের প্রতি আলাদা সম্মান না এসেই পারে না। তাই লেখার ছোট-খাট ভুল যদি সেটা থেকেও থাকে, সেটা ধরাটা অর্থহীন, আমার মতে। আমি যেগুলো নিয়ে কথা বলবো সেগুলো আসলে লেখার ভুল নয়। এই ভুলগুলো একমাত্র একজন এডিটর ছাড়া, আর কারোই চোখে পড়ার কথা নয়। এবং স্বাভাবিকভাবেই, এটা এডিটিং এর ভুল, লেখকের নয়। সবচেয়ে চোখে পড়েছে দাড়ির আগে ডায়ালগের কোটেশান শেষ করে দেয়ার ব্যাপারটা। আবার বেশ কিছু জায়গায় আশ্চর্য বোধক চিহ্নের আগেই কোটেশান শেষ করা দেয়া হয়েছে। যেমনঃ “পরীক্ষিত সত্য নয়। গবেষনালব্ধ”। বলল রাশেদ।
তারপর, কেউ কিছু একটা বলেছে, এমন বলা হলে, ডায়ালগের কোটেশান মার্ক্স এর আগে অবশ্যই কমা দেয়া হয়। কিন্তু অনেক জায়গাতেই আমি দাঁড়ি পেয়েছি। যেমন উপরের লাইনটি, ওখানে কমা হওয়ার কথা ছিল, দাঁড়ি হয়েছে।
এস্টেরিস্কস মানে *** এইটার আগে এবং পরে একটা করে স্পেস দেয়া নিয়ম। সেটা ছিল না। এবং এস্টেরিস্কস এর পরের প্যারায় ইন্ডেনশান হয় না। কিন্তু এখানে ইন্ডেন্ট করা ছিল।
এলিপসি�� মানে ... এটাতে দেখলাম শুরুতে কোন স্পেস নেই, কিন্তু পরে আছে একটা স্পেস। আমি যতদুর দেখেছি, এবং জানি, বইগুলোতে এলিপসিস এভাবে দেয়া হয় না। কয়েকটা নিয়মে দেয়া হয়ঃ হয় এলিস্পসিস এর আগে এবং পরে একটা করে স্পেশ দেয়া হয় নাহলে কোনো স্পেসই দেয়না অথবা প্রত্যেকটা এলিপসিসকে এর মাঝে স্পেস বাড়িয়ে দেয়া হয় আমার এই তিনরকমই চোখে পড়েছে বইগুলোতে।
এছাড়া, কিছু কিছু জায়গায় ইটালিক হরফ ব্যবহার করলে আরো সুন্দর লাগতো হয়তো। এবং কিছু জায়গায় যতি চিহ্নের পর স্পেস চোখে পড়েনি। এইটুকুই।
ব্লাডস্টোন নিয়ে আমার ব্যক্তিগত মত কী? ইটস এন ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিটি নভেল। ভাবতেই গর্ব হয় যে আমাদের দেশের একজন লেখক এই মানের একটি উপন্যাস লিখেছেন। আমি বলতে পারি, এটি যদি বিদেশের বাজারে উপস্থাপন করা যেত, হয়তো এটি বেষ্ট সেলার এর মাঝে একটি হতে পারতো। আজ হয়তো সেটা হয়নি, কিন্তু একদিন হবে। একদিন এই বাংলাকে সবাই চিনবে। একদিন...
ফ্ল্যাপের আলাপতো পড়েই ফেলেছেন। পড়া না হলে একবার চোখ বুলিয়েন নেন। আমি আর ঐ দিকে না যাই।
ব্লাডস্টোনের প্রচ্ছদ দেখার পর আমার প্রথমেই মনে হইছিল এইটা দ্য স্ট্রমলাইট আর্কাইভ সিরিজের মতো এপিক ফ্যান্টাসি জনরার বই। পরে দেখি হিস্ট্রোরিকাল থ্রিলার। প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতি থেকে যখন চুরির ঘটনা ঘটার সময়কার প্রায় পুরো দশ মিনিটের মতো নাই হইয়া গেল, তখন মনে হইছিল- হইলেও হইতে পারে। কিন্তু এরপরেই শুরু হইলো ইতিহাসের ঘোড়ার দৌড়। হিস্ট্রোরিকাল থ্রিলার যেহেতু, এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক।
কাহিনী ধীরে ধীরে খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ শতাব্দির ব্যাবিলন থেকে নানা পথ ঘুরে, নানা জনের হাত ধরে পনেরো শতকের ভারতে আসলো। ধীরে ধীরে বর্তমান সময়ের সাথে যুক্ত হইলো। ডটগুলো মিলাইতে গিয়া বিচ্ছিন্ন পারিবারিক ইতিহাস, বিখ্যাত এক ব্যক্তির ইতিহাসও আনা হইলো। এমনে এমনেই আড়াইশ পৃষ্টার বইটা শেষ হইয়া গেল। বর্তমান সময়, উপন্যাসের মূল পটভূমিতে তেমন সময়ই দেওয়া হয় নাই। ফ্ল্যাশব্যাকেই প্রায় পুরো গল্প শেষ। এর মধ্যে আবার একই ইতিহাস একের অধিকবার বলা হইছে।
কাহিনী এমনিতে বেশ গতিশীল। কিছু কিছু কনভার্শেসন বেশ বিরক্তিকর ঠেকছে। লেখক চাইলেই এভয়েড করতে পারতেন। কিছু টুইস্ট আছে, গল্পটাও বেশ ডিটেইলে লেখা। কিন্তু থ্রিলার যেহেতু, সেহেতু টুইস্ট, ডিটেইলড নেরেটিভের থাইকা আরো বেশি কিছু আশা করছিলাম।
একটি পাথর, নাম ব্লাডস্টোন এরই কাহিনী এটি। কাহিনীর শুরু হয় ব্লাডস্টোনের চুরির মাধ্যমে। একটি পাঁচ তারকা হোটেলের প্রদর্শনী থেকে পাথরটি চুরি হয় সবার চোখের সামনেই কিন্তু কেউই বাধা দেয়নি! অথচ ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে সবার সামনেই চোর পাথর নিয়ে চলে যাচ্ছে। ডিবি ইন্সপেকটর মনসুর হালিমের পাগল হবার দশা, একি করে সম্ভব? সন্দেহভাজন যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে তারা সবাই একই কথা বলছে চুরির সময়টার কথা তারা কিছুই মনে করতে পারছে না! সাহায্যের জন্য গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক রুদ্র রাশেদের কাছে। শুরু হলো চমকপ্রদ কাহিনী...। ঘটনার শুরু খ্রিস্টপূর্ব আড়াইহাজার বছর পূর্বে ব্যবিলনে। সম্রাট নেবুচাদনেজার তার রাণী অ্যামিতিসের বিষন্নতা কাটানোর জন্য হ্যাঙ্গিং গার্ডেন বা ঝুলন্ত উদ্যান তৈরি করেন। রুক্ষ মরুর বুকে রাণী অ্যামিতিসের বাবার বাড়ি মিডিয়ান রাজ্যের সবধরনের পরিবেশ স্থাপন করা হয় কিন্তু আকাশে আবীরের মত রঙ আনা কোনোভাবেই সম্ভব হয় না। সেই সময়ের বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও নেবুচাদনেজারের শিক্ষাগুরু ময়নিহান সম্রাটের কাছে অপারগতা প্রকাশ করলে সম্রাট হতাশ হয়ে পড়েন। তবে একটি উপায় আছে যা বিজ্ঞানী প্রকাশ করতে চান না। ব্যবিলনের উত্তরে হীরকের মত কিছু পাথর পাওয়া যায় যাতে সূর্যের আলো পড়লে হলুদ আলোর বিচ্ছুরণ হয়। যদিও সেই পাথর পরিমাণে অনেক কম আছে কারণ অ্যাসিরীয়রা বেশির ভাগই নিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু আবীরের মত আলো ছড়াবে কি করে?
কাহিনী এখানেই শেষ নয়, আরও আছে পারস্য সম্রাট সাইরাসের ব্যবিলন দখলের কাহিনী, সম্রাট অ্যালেকজান্ডারের বিশ্বজয়ের ইতিহাস, চন্ডিক্যানের রাজা প্রতাপাদিত্যের অসভ্যতার কাহিনী, আফগান সেনাপতি আফতাব খান আর তার পুত্র সেনাপতি মাহতাব খানের বীর গাঁথা, কান্দাহার সুলতান আসকরী মীর্জা এবং কাবুল সুলতান কামরান মীর্জা কর্তৃক মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে বিতাড়িত করার ঘটনা আর আছে বিখ্যাত ইতালিয়ান বেহালাবাদক নিকোলাই পাগানিনির সুর সাধনা আর তার ২৪ ক্যাপ্রাইস আবিষ্কারের বিস্ময়কর কাহিনী আর আছে বরাবরের মতই ইতিহাসের সবচেয়ে এক বেঈমান জাতির কাহিনী।
বইটি পড়ার পর বোঝাই যায় লেখককে বেশ পড়ালেখা করতে হয়েছে ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে একত্র করতে। কারণ ঘটনাগুলো ছিলো বিভিন্ন সময়কালের। যারা ইতিহাস বিষয়ক কাহিনী পড়তে পছন্দ করেন তারা নিশ্চিন্তে দেশীয় প্রেক্ষাপটের উপন্যাস "ব্লাডস্টোন" পড়তে পারেন। তবে কিছু কিছু জায়গায় পড়তে গিয়ে বেশ হোঁচট খেতে হয়েছে সেগুলো বানান ভুল আর কাহিনীর কিছু অসংগতি, অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়েছে। কয়েকটি উল্লেখ করে দিই - =>পৃষ্ঠা ৯ এ এক জায়গায় "পশমি" লিখা হয়েছে, আমার জানামতে হবার কথা "পশমী", =>পৃষ্ঠা ৪৩ এ এক জায়গায় "তড়িকা" লিখা হয়েছে, আমার জানামতে হবার কথা "তরীকা", => পৃষ্ঠা ৪৩ এ এক জায়গায় "পরিক্ষা" লিখা হয়েছে, আমার জানামতে হবার কথা "পরীক্ষা", => পৃষ্ঠা ৪৩ এ এক জায়গায় "কররে" লিখা হয়েছে, আমার জানামতে হবার কথা "করে", => পৃষ্ঠা ৪৬ এ এক জায়গায় "বসতী" লিখা হয়েছে, আমার জানামতে হবার কথা "বসতি", => পৃষ্ঠা ৪৭ এ এক জায়গায় "ব্যতিত" লিখা হয়েছে, আমার জানামতে হবার কথা "ব্যতীত", => পৃষ্ঠা ৪৮ এ এক জায়গায় "ভয়ঙ্গর" লিখা হয়েছে, আমার জানামতে হবার কথা "ভয়ঙ্কর", => পৃষ্ঠা ৬৪ এ এক জায়গায় "ভরোবেলা" লিখা হয়েছে, আমার জানামতে হবার কথা "ভোরবেলা", => পৃষ্ঠা ৭৩ এ এক জায়গায় "বা" লিখা হয়েছে, আমার জানামতে হবার কথা "বাঁ/বাম", => পৃষ্ঠা ৮৭ এ এক জায়গায় "রাত কাঁটিয়ে যায়" লিখা হয়েছে, আমার জানামতে হবার কথা "রাত কাটিয়ে যায়", => পৃষ্ঠা ১০০ এ এক জায়গায় "সেড়ে" এবং "পোগ্রাম" লিখা হয়েছে, আমার জানামতে হবার কথা "সেরে" এবং "প্রোগ্রাম"
এছাড়াও পৃষ্ঠা ১৭০ এ বিখ্যাত ইতালিয়ান বেহালাবাদক পাগানিনির নাম "পানিগিনি" উল্লেখ করা আছে। আরেক জায়গায় পড়তে গিয়ে দেখলাম আফগান সেনাপতি আফতাব খানের স্ত্রীর নাম সালমা বেগম খান কিছুক্ষণ পর জুলেখা হয়ে গিয়েছে! আবার এক জায়গায় দেখলাম প্রফেসর ড. রুদ্র রাশেদকে প্রভাষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার রুদ্র রাশেদ এবং মনসুর হালিমের মধ্যকার আলোচনায় "ইকবাল" নামটি কোত্থেকে এলো কিছুই বুঝিনি! উপন্যাসে মিলির বাবার নাম মাহাবুব ইকবাল কিন্তু সেই নাম রুদ্র রাশেদ এবং মনসুর হালিমের এই আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে আমার। এইরকম আরও বেশ কয়েক জায়গায় উপন্যাসটিকে বেসুরো লেগেছে। এছাড়া পড়তে গিয়ে আর কোনও সমস্যা হয়নি।
ইতিহাস ঘেঁটে পরিশ্রম করে লিখা ছিলো মজাদার। ভালো লাগবে যারা ইতিহাসকে নিয়ে উপন্যাস পড়তে পছন্দ করেন। মজা লেগেছে মনসুর হালিম আর রুদ্র রাশেদের নামকরণের কাহিনী এবং তাদের আলাপচারিতা। তবে একটি রহস্য লেখক নাজিম উদ দৌলা খোলাসা করেননি যে ইতিহাসের রিটায়ার্ড প্রফেসর ড.আবুল ফাতাহর স্ত্রী ড. শান্তা ইসলাম যিনি ড. রুদ্র রাশেদের মায়ের মত ছিলেন তার মৃত্যুর পর রুদ্র রাশেদ বলেছিলেন উনার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিলো না। পরে ড. আবুল ফাতাহ জানতে চাইলে রুদ্র রাশেদ কৌশলে এড়িয়ে যায়। তখন ড. আবুল ফাতাহ মনে মনে বলেছিলেন এই রহস্যের জট একমাত্র ড. রুদ্র রাশেদই ছাড়াতে পারবেন। জানতে ইচ্ছে হচ্ছিলো কি ছিলো সেই রহস্য? নাকি এই নিয়ে আলাদা একটি উপন্যাস হবে?
প্লট অনেক , প্লট হোল ও অনেক। বানান ভুল অনেক বেশি ,কিন্তু এখন আর এগুলোকে গুরুত্ব দেই না ,ধরেই নেই বানান ভুল কম - বেশি থাকবেই ! তবে পাগানিনির মতো চরিত্রকে পানিগিনি নামে দেখা আসলেই বিরক্তিকর। ছোটখাট প্লটহোল ইগনোর করলে বেশ উপভোগ্য , শেষ পর্যন্ত সব কিছুই বুঝলাম কিন্তু যে জিনিষকে নিয়ে এতো কাহিনী সেটা বাংলাদেশের হয় কিভাবে সেটাই বুঝলাম না। লেখকের লেখায় খাটা খাটুনির ছাপ স্পষ্ট,সে দিক থেকে তিনি সাধুবাদ পেতে পারেন।আশা করি লেখকের কাছ থেকে সামনে আরো ভালো মানের লেখা পাব।
প্রত্যাশা অনেকই ছিল। সেইটা যদিও পুরণ হয় নাই, তারপরো বেশি আশাহত হইসি বলা ঠিক না। নাজিম ভাইয়ের অনেক খাটাখাটি গেসে এই বইয়ের পিছনে, সেজন্যে তাকে সাধুবাদ। বঙ্গদেশে এত গবেষনা করে কেউ বই লিখে বেশিরভাগ সময়। একটু বেশিই ফ্যাকচুয়াল হয়ে গেসে। একটু থ্রিলিং ভাব।বেশি রাখলে আরো ভাল হত। অভারল, গুড জব।
সারসংক্ষেপ: দিনে-দুপুরে হোটেল র্যাডিসনের প্রদর্শনী কক্ষে অনুষ্ঠিত অ্যান্টিক জুয়েলারির প্রদর্শনী হতে চুরি হয়ে গেল 'ব্লাডস্টোন' নামক এক নেকলেস। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে জানা গেল, সকল দর্শনার্থীর উপস্থিতিতেই চোর চুরি করেছে এটি। কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার হচ্ছে, কারো কিছুই মনে নেই। যেন উধাও হয়ে গেছে সেই মুহুর্তের স্মৃতি। মিলল ছোটো একটা চিরকুট, যেখানে লেখা; 'অ্যামিতিস, তোমাকে ভালোবাসি।'
ডিবি ইন্সপেক্টর মনসুর হালিম এর সুরাহা করতে না পারায় শরণাপন্ন হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রুদ্র রাশেদ ওরফে প্রফেসর ডাবল আর'র। দুজন এক হয়ে শুরু করলেন, চিরকুটের রহস্য উদ্ধার করার প্রচেষ্টা।
আড়াই হাজার বছর পুরোনো এক ঐতিহাসিক ঘটনা কী করে এই চুরির ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে উঠলো? মহাবীর আলেক্সান্ডারের মৃত্যুর রহস্য কিংবা মুঘল বাদশাহ হুমায়ূনের পুনরায় দিল্লি দখল করার ঘটনার মধ্যে একটি নেকলেস চুরির বিষয়টি কীভাবে জড়িত? 'ব্লাডস্টোন' এমন এক অভিশাপের নাম যার জন্য উঠে এসেছে বারো ভূঁইয়া ইশা খাঁ আর প্রতাপাদিত্যের ব্যাক্তিগত দ্বৈরথ এমনকি কিংবদন্তি পাগানিনির সুরের সাধনা। এছাড়া আরও আছে একশো বছর পূর্বের বৃটিশ চংক্রান্তের ঘটনাপ্রবাহ। সকল ঘটনার যোগসাজশকে নজরবন্দী করে মনসুর হালিম আর প্রফেসর সাহেব কি বের করতে পারবেন এই রহস্য নাকি নিজেরাই আটকে যাবেন জটিল এই গোলকধাঁধায়? জানতে হলে পড়ুন, লেখক নাজিম উদ দৌলার ঐতিহাসিক রোমাঞ্চক উপন্যাস 'ব্লাডস্টোন'।
পাঠ-প্রতিক্রিয়া: চমৎকার একটি বই। ঐতিহাসিক থ্রিলারের প্রতি আমার সবসময়ই আলাদা রকমের একটি আকর্ষণ কাজ করে থাকে। ব্লার্ব ভালো লাগলে তো সেই বই কেনা থেকে কেউই ঠেকাতে পারবে না। এমন একটিই বই ছিলো, 'ব্লাডস্টোন'। ঝটপট কিনেই পড়ে ফেলি ২০২১ সালেই। নানান ব্যস্ততায় বইটার রিভিউ দেওয়া হয়নি। বইটির ব্লার্ব নিয়ে যতোটা উত্তেজনা বিরাজ করছিলো ঠিক ততোটাই বইয়ের ভেতরকার কন্টেন্ট নিয়ে আমি স্যাটিসফাইড।
এই বই লিখতে লেখকের প্রচুর মানসিক শ্রম লেগেছে বোঝাই যায়। ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাসকে একত্রে এনে একটি প্লট তৈরি করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। পারলে অমৃত, না পারলে কিছুই না। আর সেই অমৃতটুকু পেয়েছি আমি বইতে। স্টোরিলাইন খুব ভালো লেগেছে।
স্টার্টিং অবশ্য একটু ধীরগতির ছিলো। তবে চরিত্র গঠন সঠিক সময়ে করে ফেলতে পেরেছেন। এছাড়া ঐতিহাসিক বর্ণনায় এতো এতো চরিত্রের নাম উঠে আসছিলো যে সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। কোনটা কে বা নাম মনে রাখতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছিল(ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো নয়, সাপোর্টিং চরিত্র যেগুলো কাল্পনিক হবার সম্ভাবনাই বেশি)।
লেখকের লেখনশৈলী ভালো লেগেছে। শব্দচয়ন ও গল্পের গাঁথুনি চমৎকারভাবে করেছেন। লেখকের এ পর্যন্ত দুটি বই পড়েছি। আশা করি, আগামীতে তার অন্যান্য বইগুলো পড়বার সৌভাগ্য আমার হয়ে উঠবে।
বানান ভুল ও ব্যাকরণ জনিত ভুল কম চোখে পড়েছে। তবে যে কয়েকটা বানান ভুল পেয়েছি আশা করব পরবর্তী মুদ্রণে সংশোধিত হবে।
বই প্রকাশিত হয়েছে আদী প্রকাশনের প্রডাকশনে। প্রডাকশন মোটামুটি ভালোই হয়েছে তবে পেজের মান আরেকটু ভালো করা উচিত। পেজের জন্য প্রিন্টিং'টাও ভালোভাবে ফুঁটেনি মনে হলো। তবে বাঁধাইটা সুন্দর হয়েছে।
প্রচ্ছদ করেছেন লেখক নিজেই। অসাধারণ কিছু না হলেও যেহুতু বইটি ২০১৫ সালে প্রকাশিত সে অনুযায়ী প্রচ্ছদ ঠিকই আছে। ওই সময়কার বইয়ের প্রচ্ছদগুলো এমনই ছিল।
বই থেকে দূরে থাকার নির্বাসন কালীন সময়ে বইটা একবার পড়েছিলাম। তখন দূর্দান্ত লেগেছিল। কিন্তু এখন অসংখ্য বই পড়ার পর আবার রি-রিড দিতে গিয়ে বইয়ের ফাঁক ফোঁকরগুলো চোখে ধরা পড়ল। ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসাবে, ইতিহাসের অংশগুলো মোটামুটি চলনসই লেগেছে। তবে বর্তমানকাল একেবারেই জমেনি৷ লেখকের আগে পড়া মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়াতে অতি নাটকীয়তার বহর দেখে ভীষণ বিরক্ত হয়েছিলাম। এটাতেও দেখলাম সেই সমস্যা রয়েছে। তবে তূলনামূলক কম।
তবুও অনেক সমস্যা রয়েছে, পূর্ণাঙ্গ রিভিউ লেখার সময় খুঁটিনাটি ধরে লিখব। প্রথম পড়ার তুলনায় এবার বেশি খারাপ লাগার কারন মূলত এতে যোগ করা বাড়তি পাতা গুলো। ৩য় প্রোটাগনিস্টের যে অংশ লেখক এখানে এনেছেন সেগুলো সম্ভবত প্রথম পর্বে ছিল না। কিংবা থাকলেও আমার মনে নেই। এই অংশটুকু বইয়ের যেটুকু ভালো লাগা ছিল সেটাও নষ্ট করে দিয়েছে আসলে। মানে তার ব্যাকস্টোরি মোটেও খাপ খায়নি এখানে৷
ব্লাডস্টোন বা রক্তপাথর। খুবই দুষ্পাপ্য লাল রঙের হীরায় তৈরি মনোমুগ্ধকর ডিজাইনের একটা নেকলেসের নাম, যার পেছনে আছে আড়াই হাজার বছরের রক্তাক্ত ইতিহাস কিন্তু যার বর্তমান মালিক ইংল্যান্ড এর রাণী। জাতিসংঘের শিল্প ও সংষ্কৃত বিষয়ক একটা প্রতিষ্ঠান দেশের একটা পাঁচ তারকা হোটেল অ্যান্টিক জিনিসের একটা প্রদর্শনী আয়োজন করেন, যেখানে বৃটেনের রাণীর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা থেকে ব্লাডস্টোনও আসে প্রদর্শিত হওয়ার জন্য। কিন্তু দূর্ভাগ্য বশত দিনে দুপুরে সবার চোখের সামনে থেকে ব্লাডস্টোন চুরি যায়। চোর সবার সামনে দিয়ে হেলে দুলে এসে ব্লাডস্টোন চুরি করে নিয়ে যায়, কিন্তু কেউ বাঁধা দেয়া তো দূরে থাক, বলতেও পারে না ব্লাডস্টোন কিভাবে চুরি হল! সবারই মিনিট দশেকের স্মৃতি বেমালুম গায়েব হয়ে যায়। কিন্তু কেউ? চোর চুরি করার জন্য কোন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল? সেটা কি আদৌ পার্থিব কোন উপায় ছিল? আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে চোর রাষ্ট্র বলে অভিহিত করা হয়। গা থেকে কলংকের দাগ মুছতে প্রশাসন ও আদাজল খেয়ে নামে চোরকে ধরতে। সামনে থাকে চোরের রেখে যাওয়া ছোট্ট একটা ক্লু, একটা চিরকুট, যাতে লেখা থাকে - "অ্যামিতিস, তোমাকে ভালবাসি।" কিন্তু কে এই অ্যামিতিস? তাকে কে ই বা এত ভালবাসে? তবে কি ব্লাডস্টোন চুরির পেছনে কোন অর্থলোভ কাজ করে নি? এর পেছনে কি কোন ইতিহাস আছে? কি সেই ইতিহাস? ব্লাডস্টোনের ইতিহাস অনুসন্ধানে তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত তরুণ গোয়েন্দা মনসুর হালিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. রুদ্র রাশেদের শরণাপন্ন হয়। প্রফেসর ডাবল আর কি পারবেন ব্লাডস্টোনের প্রকৃত ইতিহাস বের করে আনতে? যদি পারেন তবে কি সেই ইতিহাস? যে চিরকুটের সূত্র ধরে ড. রুদ্র রাশেদ কাজ করছেন, সেই চিরকুটটি কি আসলেই চোর ফেলে এসেছিল? নাকি এর পছনেও কোন কাহিনী লুকিয়ে আছে? অন্য কেউ আড়ালে বসে কল কাঠি নাড়ছেন সবকিছুর? জানতে হলে পড়ে ফেলুন তরুণ লেখক নাজিম উদ দৌলার সদ্য প্রকাশিত মৌলিক থ্রিলার 'ব্লাডস্টোন'। উপরে ছিল ব্লাডস্টোনের স্পয়লার ফ্রি সংক্ষিপ্ত কাহিনী। এবার আমি আমার কিছু ব্যক্তিগত ভাল লাগা মন্দ লাগার কথা বলব। যারা এখনো বইটি পড়েন নি, চাইলে তারা এই অংশটুকু এড়িয়ে যেতে পারেন। বইয়ের বাঁধাই এবং প্রিন্টিং যথেষ্ট ভাল হয়েছে। কাগজের মানও মন্দ না। বইয়ের পৃষ্ঠা হিসেবে দামটা মোটেও বেশি হয় নি। তাছাড়া অনলাইন বুক সপগুলোর বদৌলতে ৩০-৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ে বইটি সংগ্রহ করা যাচ্ছে। বলতে গেলে পাঠক সুলভ মূল্যেই বইটি সংগ্রহ করার সুযোগ পেয়েছেন। বানান ভুলের হার খুব নগন্য। দুয়েকটা যা আছে তা প্রিন্টিং মিস্টেক বলে এড়িয়ে যাওয়া যায়। ৯০-৯১ পৃষ্ঠায় হঠাৎ হঠাৎ করে সাধু ভাষা ঢুকে গেছে। কিন্তু বইয়ের বিশালতার বিবেচনায় ভুলের পরিমাণ এতই কম যে রেটিং এ এর জন্য কোন নেগেটিভ মার্ক দেয়া উচিত হবে না। গতবছর প্রকাশিত লিটল ম্যাগ পত্রজে যারা নাজিম ভাইয়ের অশ্রু পাথর উপন্যাসিকাটি পড়েছেন, ব্লাডস্টোন পড়তে গিয়ে তারা খানিকটা হতাশ হতে পারেন। অশ্রু পাথরের কাহিনীর প্রায় পুরাটা ব্লাডস্টোনে ঢুকে গেছে। এমনকি অশ্রু পাথরের কিছু কিছু ডায়ালগও হুবাহু ব্লাডস্টোনে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে যারা পত্রজ পড়েন নি, তারা একটি পিউর মৌলিক থ্রিলারের স্বাদ পাবেন। রেটিং করার সময় আমি পত্রজের ব্যাপারটা এড়িয়ে গেছি। তবে আমার কাছে বইয়ের মূল কাহিনীতে বড় সড় ধরনের একটা খটকা আছে বলে মনে হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন ব্লাডস্টোনের প্রকৃত মালিক বাংলাদেশ । কিন্তু আমার প্রশ্নটা হচ্ছে এর মালিকানা বাংলাদেশের কিভাবে হয়? অফতাব খান মৃত্যুপথযাত্রী সেই বৃদ্ধের কাছ থেকে এই শর্তে ব্লাডস্টোন পেয়েছিলেন যে, এটা আপনার কাছে আমার আমানত। যতদিন পর্যন্ত না অন্য কেউ এই আমানত ফিরিয়ে নিতে না আসে ততদিন এটা দেখে রাখবেন। তার বংশধররা তাই করে আসছে। আমাতন হিসেবে পাওয়া জিনিসের তো আপনি নিজেকে আর মালিক বলে দাবি করতে পারেন না, তাই না? আরো একটা ব্যাপার দৃষ্টিকটু লেগেছে। কবির যখন অঞ্জনকে ব্লাডস্টোনের ইতিহাস শোনাচ্ছিল তখন সেটার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছিল। প্রকৃত ঘটনার এতটা বিস্তারিত কবির জানার কোন উপায় নেই। আমার কাছে এটাকে বাড়াবাড়িই মনে হয়েছে। তবে মোটের উপর বলতে গেলে বলা যায়, ব্লাডস্টোন খুবই উপভোগ্য চমৎকার একটি মৌলিক থ্রিলার। বাংলাদেশের থ্রিলার সাহিত্য যে দিনদিন সমৃদ্ধ হচ্ছে ব্লাডস্টোনই তার প্রমাণ। আশা করি লেখকের কাছ থেকে ভবিষ্যতে আরো ভাল মৌলিক থ্রিলার পাব।
অনেক প্রত্যাশা নিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম। কিন্তু সে অনুযায়ী বইটা আমার প্রত্যাশা পূরন করতে পারেনি। থ্রিলার জনরার মধ্যে হিস্টোরিকাল থ্রিলার আমার সবচেয়ে প্রিয়। আর সেটা যদি কোন বাংলাদেশী লেখকের মৌলিক উপন্যাস হয় তবে তো কোন কথাই নেই। উপন্যাসটা আমার ভালোই লেগেছে বলতে গেলে। তবে কিছু বিষয়ের জন্য পুরোপুরি ভাল লাগাটা কাজ করেনি। বইয়ের পজিটিভ দিকঃ ১/ লেখক প্রচুর খেটেছেন। এর জন্য তিনি অনেক রিসার্চ করে তিনি একটা প্লট দাড় করিয়েছেন তার জন্য তিনি অবশ্যই সাধুবাদ পাবেন। ২/ ইতিহাস ঘটনাবলি বইতে খুব সুন্দরভাবে লেখক তুলে ধরেছেন। ৩/ লেখার ভাষা খুব সহজ,সরল ও প্রাঞ্জল ছিল। ৪/ গল্পটা কোথাও ঝুলে যায়নি। রোলার কোস্টার গতিতে এগিয়েছে। ৫/ প্রিন্ট, বাধাই ও কাগজের মান যথেষ্ট ভালো লেগেছে। বইয়ের নেগেটিভ দিকঃ ১/ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টে সময় দেওয়া হয়নি। ২/ ইতিহাসের ঘটনা বেশি আসার কারনে মূল তদন্ত প্রক্রিয়া খুব সংকীর্ন হয়ে গেছে। ৩/ বইতে প্রচুর পরিমানে বানান ভুল ছিল। কিছু কিছু জায়গায় সর্বনামগত ভুলও চোখে পড়েছে। ৪/ ফিনিশিং আরও ভালো হতে পারতো। ৫/ আর শেষের টুইস্টটা খুব উইক বলে মনে হয়েছে আমার কাছে।
পরিশেষে, বলা যায় ব্লাডস্টোন লেখকের দারুন একটা কাজ। না পড়ে থাকলে পড়ে ফেলুন। সময়টা ভালো কাটবে।
সমকালীন ঘটনার সমান্তরালে ইতিহাসের সমন্বয় লেখক চমৎকারভাবেই করেছেন। ট্যুইস্টগুলোও ভালো ছিল। তবে কিছু কিছু জায়গায় আমার মনে হয়েছে এত ইতিহাস দেওয়া আবশ্যক ছিল না। অধিক ইতিহাসে জর্জরিত লেগেছে। আর তাছাড়া বাংলাদেশি থ্রিলারে একটা জিনিস আমার খুব বিরক্ত লাগে, তা হলো দেশী থ্রিলারে এমন একটা চরিত্র থাকবেই যিনি সবই জানেন। মানে, অগাধ জ্ঞান ভান্ডার, যখন যা জিজ্ঞেস করা হবে তখনই সে উত্তর দিয়ে দিতে সক্ষম। বাস্তবে এমন কয়টা লোক আছে দেশে আর যদি এত মারাত্মক জ্ঞানী ব্যক্তি থাকতোই তাহলে দেশের পুলিশের আজ এ অবস্থা কেন? এই উপন্যাসে যেমন আছেন এক র��দ্র রাশেদ। প্রতিটা থ্রিলারে এমন জ্ঞানীগুণী সবজান্তা পাবলিক দেখতে দেখতে একঘেয়ে আর বিরক্ত লাগে।
ওভারঅল, উপন্যাসটা ভালো লাগবে যদি আপনি মন দিয়ে পড়তে পারেন। আর ইতিহাসের কচকচানি ভালো না লাগলে ভালো লাগবে না।
৩.৫ স্টারস। তিনটি টাইম লাইনে আগানো বইয়ের মূল প্লটটা চমৎকার ছিল। তবে আমার কাছে যেটা ভালো লাগেনি সেটা হলো, চ্যাপ্টার ব্রেকে কোন প্রশ্ন বা প্রতিজ্ঞা ছিল না, (প্রশ্ন যে সবসময় প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে করতে হবে তা নয়), ফলে বইয়ের পৃষ্ঠা উলটানোর প্রতি উৎসাহ পাচ্ছিলাম না। তবে শেষটা ভালো লেগেছে। টাইম পাস রিড হিসেবে খারাপ না।
নাজিম উদ দৌলা ভাইয়ের ছোটগল্পের ফ্যান আমি। তার লেখা আমার পড়া প্রথম উপন্যাস 'ব্লাডস্টোন'। চমৎকার ছোট গল্পের লেখক নাজিম ভাই কেন যেন এ উপন্যাসটা একদম জমাতে পারেনি নি। ব্লাডস্টোন নিয়ে রগরগে অ্যাকশন কিংবা একটা কন্সপারেসী থৃলার হতে পারতো, কিন্তু সেটা হয়নি।
দুইটা টাইমলাইন একসাথে টেনে নিয়ে যাওয়া বইগুলা অসম্ভব প্রিয়! আর দেশী প্রেক্ষাপটে এরকম জিনিস, বলাই বাহুল্য প্রশংসার দাবীদার। শুধু সেটাই না, লেখক বেশ ভালো একটা থিম এডাপ্ট করেছেন এবং ফিনিশিংও মোটামুটি বেশ ভালো করেছেন। প্রত্যাশা বাড়লো আরো।
প্লট ভালো ছিলো। কিন্তু লেখকের চরিত্রায়নে খাপ রয়ে গেছে। তাছাড়া কয়েকটা বিষয় একদম ভালো লাগে নি। তবে জ্ঞাত ইতিহাসকে এক কোনায় রেখে বইটা পড়লে এনজয় করা যাবে
এই বইটার অনেক হাইপ দেখে এটা পড়ার অনেক ইচ্ছে জেগেছিল। জন্মদিনে এক ছোট বোনের কাছ থেকে উপহার স্বরূপ এই বইটা পেলাম। জন্মদিনের ৬ মাস পেরোনোর পর এখন গিয়ে এটা পড়েছি। প্রায় ২-৩ মাস কোনো বই পড়া হয়নি। ২-৩ মাস পর এই বইটা দিয়ে শুরু করলাম আবার বই পড়ার যাত্রা। ইনফ্যাক্ট বলতে গেলে বহুদিন পর বেশ চমৎকার একটা বই পড়লাম।
শুরুটা ছিল ব্লাডস্টোন নেকলেস চুরির মাধ্যমে এবং একটি চিরকুট যেখানে লেখা ছিল-অ্যামিতিস,তোমাকে ভালোবাসি। এরপর একের পর এক ঘটনাপ্রবাহ লেখক খুব সুন্দরভাবেই প্রেজেন্ট করেছে। পড়তে গিয়ে একটুও একঘেয়েমি আসেনি। বরং যত পেইজ আগাচ্ছিল, এক্সাইটমেন্ট ততই বাড়ছিলো। হিস্ট্রি আমার কোনোকালেই ভালো লাগতো না। ছোটবেলায় সমাজ বই পড়ার সময় আমি সবসময় মুক্তিযুদ্ধের চ্যাপ্টার বাদে বাকি যে হিস্ট্রি রিলেটেড চ্যাপ্টার থাকতো,তা আমি সবসময় বাদ দিতাম। এতো এতো সাল,এতো এতো নাম,কার সাথে কার যুদ্ধ আমার রীতিমতো মাথার উপর যেত। কিন্তু এখন যখন মাঝে মাঝে হতে ইতিহাস নিয়ে কোনো আর্টিকেল বা কোনো উপন্যাস, গল্প পড়া হয়,তখন বুঝি হিস্ট্রি পড়ার মাঝে কি আনন্দ। এখনও যদিও সব গুবলেট পাকিয়ে ফেলি তারপরও বেশ মজা লাগে।
বইটার স্টোরি টেলিং, ক্যারেক্টার বিল্ড আপ বেশ প্রশংসনীয়। একটা রক্তপাথর কে কেন্দ্র করে অনেক ইতিহাস উঠে এসেছে। একটু বর্তমান অবস্থা আবার এরপরে আবার ইতিহাসের সেই সময়টা। দেখানো হয়েছে নিজের ভালোবাসার জন্য মানুষ চাইলে কি না করতে পারে।একেক পর্ব একেক রকম অধ্যায় উঠে এসেছে। প্রথমদিকে সব চরিত্রকে মনে রাখতে একটু কষ্ট হয়েছে,কিন্তু পরে বেশ দুর্দান্ত গতিতে কাহিনি এগিয়ে এসেছে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ও লেখক বেশ চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। এককথায় বলতে গেলে জাস্ট ওয়াও একটা সময় কেটেছে। এখানে শুধু গম্ভীর রহস্য উদঘাটনই না,ডিবি অফিসার মনসুর হালিমের কমিক টাইমিং টাও সেই ছিল। প্রফেসর ডাবল আর এর সাথে তার জুটিটাও দারুণ লেগেছে।
শেষদিকে মনে হচ্ছিল এই বুঝি সব রহস্যের সমাধান হলো। কিন্তু তারপরও সমাধান হয়েও হচ্ছে না। চিরকুটের কারণে আমার সন্দেহ ছিল একজনকে।কিন্তু শেষে যা বের হলো তাতে মনে হয়েছে কোথায় কী,পান্তা ভাতে ঘি। লিখতে তো আরও অনেককিছুই ইচ্ছে করছে,কিন্তু সব গুলিয়ে ফেলছি।
লেখকের আরও একটা বই আগে পড়া হয়েছে। তাই উনার লেখা সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা ছিল। বেশ ঝরঝরে লেখা। একটুও কষ্ট হয়নি পড়তে। তবে বইয়ের ৮৭ পৃষ্ঠায় রাজা প্রতাপাদিত্য মাহতাবকে স্বর্ণময়ীকে অপহরণ করার জন্য রামচন্দ্র আর ইন্দ্রজিৎ এর উদাহরণ টি দিয়েছেন তাতে একটু ভুল ছিল। ইন্দ্রজিৎকে রামচন্দ্র মারে নি।মেরেছে রামচন্দ্রের ভাই লক্ষ্মণ, ইন্দ্রজিৎ এর কাকা বিভীষণকে কাজে লাগিয়ে। এতে রামচন্দ্রের কোনো হাত ছিল না।
কী বলব বুঝতে পারছি না। বাকেট লিস্টে প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্লাডস্টোন বইটা ছিল। কিন্তু পড়ার পর হতাশই বলতে হবে।
প্রথমে যে বিষয়টা উল্লেখ না করলেই নয়। একটি চরিত্র কবির লন্ডনে পড়াশোনা করার সময় ব্লাডস্টোন এর উপর একটা প্রজেক্ট করে। সেখানে স্টোনের সূচনা লগ্ন থেকে শুরু করে পুরো ইতিহাস উঠে আসে তার কাছে। এর ঠিক পরের চ্যাপ্টারেই দেখা যায়, প্রফেসর রাশেদও পুরো ইতিহাস জেনে বসে আছেন। কেমন হলো বিষয়টা? প্রথম প্রথম ব্লাড স্টোনের ইতিহাস ভালো ভুগাচ্ছিল তাকে। প্রচুর পড়াশুনা করতে হয়েছিল, পুরনো এক প্রফেসরের কাছেও ধরনা দিতে হয়েছিল। কিন্তু শেষে এসে কেমন দৈব বলে সব জেনে গেলেন তিনি। তাহলে এর আগে যখন পড়াশুনা করেছিলেন তখন কেনো জানতে পারলেন না কিছু। ধারণা করছি কবিরের করা প্রজেক্টটি সাহায্য করেছে তাকে। হঠাৎ করে এই পরিবর্তন মানসপটে খুব দৃষ্টিকটু লেগেছে। কিছু অদরকারি তথ্য উঠে এসেছে। বইয়ের পৃষ্ঠাসংখ্যা কমতে পারতো আরো অনেক।
এর বাইরে বলতে গেলে লেখনশৈলি তেমন আহামরি কিছু নয়। ইতিহাসের ট্রেইল দারুণ লেগেছে আমার কাছে, যেভাবে কন্টিনিউ করেছেন তিনি। টুইস্টের প্রত্যাশা পূর্ণ হলো না। অতৃপ্তি রয়ে গেলো একটুখানি
This entire review has been hidden because of spoilers.
অ-সা-ধা-র-ণ। Bravo. 5 stars on so many levels. Specially humour, though.
Kudos to the author for such brilliant work and effort on the history, mystery, suspense, comedy and conclusion (or a beginning of more adventurous mythological investigations?)
One thing. I get stressed and restless on even double of triple POV switches in between chapters, but here the author used multiple POVs, all of which were necessary for the story. I finally let out a sigh of relief when I was able to make the connection in chapter 20 and 25, and when some of the main characters did, in chapter 26. This was well done, so kept me intrigued since the beginning of the book despite my lack of preference for it.
Was surprised at the use of triple twists near the end.
This (alternate?) history-based novel was refreshing to read, in a long while.
বই টা লিখার স্তাইল ড্যান ব্রাউন এর মত হলেও, বাংলাদেশি লেখক হিসেবে আমার পরা বই এর মধ্যে একটু ভিন্ন ধাচের ছিল লেখক ব্লাডস্টোন এবং এর ইতিহাস নিএ খুব সুন্দর এবং রমাঞ্চকর গল্প ফেদেছেন