বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা নিয়ে ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল এই অতি আধুনিক বইটি। বিদ্যুৎ মিত্র ছদ্মনামে কাজী আনোয়ার হোসেন বইটি রচনা করেছিলেন তার প্রথম পুত্রের উদ্দেশ্য। (সেবার অনেক বই এমনকি মাসুদ রানাও একসময় বিদ্যুৎ মিত্র নামে ছাপা হতো)। প্রথমে বইটির নাম ছিল 'যৌনসঙ্গম- সন্তানোৎপাদন, স্বর্গীয় প্রেম বা নিছক দৈহিক তৃপ্তি?' পাঠক পাঠিকার পরামর্শ অনুযায়ী দ্বিতীয় সংস্করণে নাম রাখা হয় 'যৌনসঙ্গম'। আরো পরে পাঠক-পাঠিকাদের আপত্তি ও পরামর্শেই অনেক চিন্তা করে নাম রাখা হয়' যৌন বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান'। সেই থেকেই চলছে এই বই। কিশোর কিশোরী বয়সের সময় এই বইটি যদি আপনি কারও হাতে তুলে দেন, সে সারাজীবন আপনার কাছে ঋণী হয়ে থাকবে কৈশোরে চেপে বসা অব্যক্ত ভয়াল সব কুসংস্কার থেকে চির মুক্ত করার জন্য।
বইয়ের প্রথমেই ধাপে ধাপে নানা অধ্যায়ে একে একে অত্যন্ত গুছিয়ে পয়েন্টে পয়েন্টে বলা হয়েছে সকল তথ্য। এবং সন্তানকে এই বিষয়ে অবহিত করা নিয়ে মানুষের লোকলজ্জা নিয়ে লেখক নিঃসঙ্কোচে বলেছেন “শরীরবিদ্যা বা জন্মরহস্য যদি কারো কাছে অসুন্দর বা পাপ বলে মনে হয় তাহলে তার উচিত ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেবার আগে যত শীঘ্রি সম্ভব নিজের শিক্ষা সম্পূর্ণ করে নেয়া।“
এবং এর পরে ঠিক গল্পচ্ছলে শিশু কন্যা এবং পুত্রের নানা প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে কী করে বাবা এবং মা তাদেরকে জন্ম রহস্য ও শরীর বিদ্যা নিয়ে জানাতে পারেন , সেই সাথে কৈশোরের পরিবর্তনগুলো নিয়ে অবহিত করে সেগুলো কে সহজে নেওয়ার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে পারেন, এবং যৌন অপরাধ গুলো নিয়ে বিস্তারিত জানাতে পারেন সেই বিষয়ে বলা হয়েছে।
“ছেলেদের কি ঋতুস্রাব সম্পর্কে জানানোর প্রয়োজন আছে? জানতে চাইলে না জানাবারই বা কি আছে? ওটা শরীরের ঘাম বা প্রস্রাবের মতই একটা স্বাভাবিক ব্যাপার বৈ তো নয়।“
মানুষকে কুসংস্কার মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন সেই ৫০ বছর আগেই- “শতকরা ১০০ জন পুরুষই জীবনের কোন না কোন সময় যৌন বিপত্তিতে ভুগে থাকে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করে দিয়েছেন নাম মাত্র কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া সঙ্গমে অক্ষমতা আদৌ কোনো শারীরিক ব্যাধি নয়। মানসিক ব্যাধি। রোগটা লিঙ্গে নয়, মাথায়। উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করলে সেরে উঠতে পারে শতকরা ৯৫ জন রোগী।“
ভাঙার চেষ্টা করেছেন সেই প্রাচীন ট্যাবু, “সাধারণত তিনটি উদ্দেশ্যে নারী-পুরুষ সঙ্গমে লিপ্ত হয়- সন্তান উৎপাদন, গভীর স্বর্গীয় প্রেমের প্রকাশ আর নিছক দৈহিক আনন্দ। প্রজননের জন্য সঙ্গম,বড়জোর প্রেমের জন্য সঙ্গম পর্যন্ত সহজ স্বীকৃতি পেয়েছে আমাদের সমাজে- আনন্দের জন্য সঙ্গমকে লালসা বা কুৎসিত দৈহিক কামনা হিসেবে দেখতে শেখানো হয়েছে আমাদের। নারী-পুরুষের যৌন মিলন যে অত্যন্ত আনন্দজনক এক খেলা সে ব্যাপারে খুব একটা সন্দেহের অবকাশ নেই। কেন যে এর মধ্যে এই অন্যায় বোধটা ঢুকল সেটা রীতিমতো গবেষণার বিষয়। তবে তুমি জেনে রেখো যে যা-ই বলুক, শিল্প ও সংস্কৃতির ধারক-বাহক রুচিবান এরা যে যা-ই ভাবুক, দৈহিক আনন্দের জন্য সঙ্গমে কোন অন্যায় নেই।“
আবার সেই সাথে কারো ইচ্ছের বিরুদ্ধে সঙ্গম করা নিয়ে সাথে সাথেই লিখেছেন “ধর্ষণ একটা মারাত্মক অপরাধ। কোনো পুরুষ যদি কোন মেয়েকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গায়ের জোরে তার সাথে যৌন মিলনে বাধ্য করে, সেটাকে বলে ধর্ষণ।
বাংলাদেশের অতি বিখ্যাত একাধিক মানসিক রোগের চিকিৎসক সিনিয়র বন্ধুরা বলেছিলেন তাদের কাছে রোগী হিসেবে আসা অধিকাংশ মানুষের আশঙ্কা হস্তমৈথুনের ফলে বেশী ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে না তো, সকল বয়সের, বিবাহিত-অবিবাহিত সকল পুরুষ! যে কারণে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী বিজ্ঞাপন দেখা যায় সকল জনপদে ‘যৌন সমস্যার সমাধানের’! এই নিয়ে সবচেয়ে সত্যি কথাটা লেখক বলেছিলেন অনেক যুগ আগেই, আফসোস এই জ্ঞান বা তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে নাই-
"ইংরেজিতে Masturbation শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ Masturbari থেকে- এর মানে নিজেকে কলুষিত করা। বাংলা ভাষাতেও আমরা স্বমেহন বা হস্তমৈথুনের সাথে এই কলুষ বা পাপবোধ যুক্ত করে নিয়েছি।
ছোটকাল থেকে আমরা শুনে আসছি হস্তমৈথুন শরীরের জন্য ক্ষতিকর, পাপ। এটা চর্চা করলে শরীর ভেঙে পড়ে, মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে, স্মরণশক্তি নষ্ট হয়ে যায়, পুরুষত্ব হানি ঘটে, আত্মা কলুষিত হয়, মুখে ব্রণ ওঠে, দাম্পত্য জীবন অসুখী হয়, স্ত্রীকে সঙ্গমে সুখ দেয়া যায় না। শুনেছিলাম, সত্তর ফোঁটা রক্ত দিয়ে নাকি তৈরি হয় এক ফোঁটা বীর্য, কাজেই বীর্যপাত ঘটলে সেই সাথেই বেরিয়ে যাচ্ছে পুরুষের জীবনীশক্তি। আরও কত কী! বড় হয়ে যখন জানতে পারলাম সব ভুয়া কথা তখন ভয়ানক রাগ হয়েছিল। এইসব আজগুবি কথা বিষময় করে দিয়েছিল আমার জীবনের দশ-বারোটা বছর। নানা রকম ভয়,ভীতি আর আশঙ্কায় কাটাতে হয়েছে আমাকে এতগুলো মূল্যবান বছর।
তোমার মনেও নিশ্চয়ই এসব ভুল ধারণা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে ইতিমধ্যেই। তোমার প্রথম কর্তব্য হচ্ছে এই কাজের সঙ্গে জড়িত সবক'টা ভুল ধারণাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা।-- হস্তমৈথুনের একমাত্র ক্ষতি হচ্ছে এই কলুষবোধ। আর কোন ক্ষতি আছে বলে পৃথিবীর কেউ কোন প্রমাণ দেখাতে পারেনি। অতিরিক্ত সবকিছুই খারাপ। খাওয়া, লেখাপড়া, ঘুম, খেলা সবকিছুই অতিরিক্ত হয়ে গেলে খারাপ। তাই বলে এগুলোকে খারাপ কাজ বলা যায় না।
তোমার জানা উচিত, হস্তমৈথুনের ফলে শারীরিক বা মানসিক কোন দিক থেকে কোনরকম ক্ষতির আশঙ্কা নেই। যদি তাই হতো তাহলে পৃথিবীর সব মানুষের সর্বনাশ হয়ে যেত। কারণ পৃথিবীতে এমন একটি ব্যক্তি নেই যে বুকে হাত রেখে বলতে পারবে জীবনের কোন না কোন সময়ে হস্তমৈথুনে প্রবৃত্ত হয়নি।
এই বয়সে তোমার মধ্যে যৌন উত্তেজনার যে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে সেটাকে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করার চেষ্টা করা বোকামি। বহিঃপ্রকাশ চাই। খেলাধুলো, পড়াশোনা গান-বাজনা কোন কিছু দিয়ে ভুলাতে পারবে না তুমি নিজেকে। যখন তখন মাথা চাড়া দিয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইবে তোমার গোপন অঙ্গ। ব্রহ্মচর্যের বুলি শুনিয়ে ওটাকে ঠাণ্ডা রাখা যাবে না। হস্তমৈথুন ছাড়া পথ নেই। বিয়ের বয়স বা যোগ্যতা অর্জন করতে অনেক দেরি আছে এখনও, কাজেই উদ্রিক্ত লিঙ্গ ঘষতে ঘষতে কল্পনায় নানা রকম ছবি দেখা ছাড়া আর কোন উপায় নেই তোমার।
শরীরের তাগিদে হস্তমৈথুন করায় বিন্দুমাত্র অন্যায় নেই ।মনের তীব্র আবেগ ও উচ্ছ্বাসকে মাঝে মাঝে মুক্তি না দিয়ে দমন করে রাখলে নিজেকে মানসিক রোগীতে পরিণত করা ছাড়া আর কোন লাভ হয় না। যাদের সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সান্নিধ্য লাভ করার উপায় নেই, যেমন - জেলখানার বন্দী, বিধবা বা বিপত্নীক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ,অন্ধ - হস্তমৈথুনকে তাদের মানসিক চাপ হালকা করার ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। সঙ্গমের আনন্দ এতে হয় না, কিন্তু সঙ্গম এর বিকল্প হিসেবে এটা তুলনাহীন।"
বইয়ের এক্কেবারে শেষ পর্যায়ে যে তিনি বার্ধক্যে আসা শারীরিক পরিবর্তন পুরুষের বার্ধক্য, নারীর বার্ধক্য ইত্যাদি নিয়ে আলোচনার পরে বার্ধক্যের প্রেম নিয়ে দৃঢ় ভাবে বলেছেন,
' সমাজ বলবে বুড়ো বয়সে ভীমরতি, তারা আল্লাহ আল্লাহ করবে অপেক্ষা করবে মৃত্যুর জন্য তাদেরকে তো মানায় না ওসব কাজ। ভাগ্যিস বুড়ো মানুষের খাওয়া-দাওয়া মল-মূত্র ত্যাগ, ঘুম���নো ইত্যাদি কাজগুলোই বন্ধ করার জন্য কোন সামাজিক চাপ নেই। তাহলে সব বুড়োবুড়ি সাফ হয়ে যেত দুনিয়া থেকে।
বইয়ের শেষ দুই লাইন ছিল –
"আমি যুদ্ধ করব বলে স্থির করেছি। পুত্র, আশাকরি তুমিও তাই করবে।"
খেয়াল রাখতে হবে বইটি হাজার ১৯৭৪ সালে লেখা, তখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী লেখা অনুযায়ী দু'একটি ব্যাপারে উল্লিখিত ভুল তথ্যে পরবর্তী সংস্করণে পরিবর্তন আনা দরকার যার ম��্যে সমকামিতা অন্যতম, এছাড়া বৈবাহিক সম্পর্কের পরেও যে সমস্ত অবদমন থাকে ইত্যাদি ইত্যাদি, যেগুলো নিয়ে তখন সারা বিশ্বই অন্ধকারে ছিল। আবার এই বইতেই নারী যৌন চেতনা নিয়ে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের যে ভুল ব্যাখ্যা ছিল সেটি নিয়ে চমৎকার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এবং এই বইয়ের সূচিপত্র পড়লেই বুঝবেন যে এটি আসলে ছেলে-মেয়ে সকলের জন্যই লেখা। সকলেই উপকৃত হবেন খোলা মন নিয়ে পড়লে, জানলে, বুঝলে।
‘সেবা প্রকাশনী’র অসামান্য এই বইটি এখনো সহজেই পাওয়া যায়। অনলাইন বা দোকানে।
# এমন একটা বই লিখে ফেলা বিশাল বড় পদক্ষেপ। # লেখার টোন ভাল লেগেছে। অযথা পর্ন বানানোর চেষ্টা ছিল না। # বেশ খেঁটে খুটে লিখেছেন।
তবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু অভিযোগ থেকেই যাচ্ছে। # ছোট খাট স্ববিরোধী অবস্থান আছে। # ছোট খাট কিছু মিস ইনফরমেশন আছে। মিস ইনফরমেশন মেয়েদের বেলাতেই বেশী। # হালকার উপরে ঝাপসা সেক্সিস্ট ব্যাপার স্যাপার আছে, যেমন ছেলেদের বহুবিবাহ সমর্থনযোগ্য এবং মেয়েদের বহুবিবাহ সমর্থনযোগ্য নয়। হয়তো লেখক সমাজের বর্তমান অবস্থার কথাই বলেছেন কিন্তু একই বইতে লেখক সমাজের বর্তমান অনেক অবস্থান যে সঠিক নয় সেটাও বলেছেন, এই ব্যাপারেও বললেই পারতেন। # লেখক অবস্থান সমকামিতা বিরোধী।
* যৌনশিক্ষা ব্যাপারটা আসলে অনেক বড়, সেটাকে ছোট একটা গন্ডির মধ্যে নিয়ে আসাটা বিরক্তিকর। কিভাবে সেক্স করলে বেশি তৃপ্তি (১৮+) পাওয়া যাবে তা নিয়ে এত না লিখে বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ের মানসিকতা নিয়ে একটু লিখলেও তো পারতেন।
* পুরো বইটা পড়লে ভাষার (!) ব্যাপারটা চোখে পড়ে। যেগুলো বাচ্চাদের বললে সমস্যা হয়না সেগুলো মা বলছে বাচ্চাদের। (দুই একটা কথা বাবা বললে কী ক্ষতি হত?) আর এসব কিভাবে করলে ... এসবে ওসবের বালাই নেই। তুমি এখন বড় হচ্ছো বাচ্চাদের জন্য লেখা আর এই বইটা বাচ্চা আর ১৮+ দের জন্য লেখা। আলাদা বই লিখলেই পারতেন।
* বইয়ের কিছু কিছু বিষয় নিয়ে সমস্যা আছে। একটা বলতে ইচ্ছে করছে। এসব-ওসব করলে কাঙ্ক্ষিত লিঙ্গের সন্তান জন্ম দেয়া সম্ভব। আমি কয়েক মিনিট এ নিয়ে পড়লাম। স্যূডো সায়েন্স + পছন্দের ডেটা নির্ভর ফলাফল মনে হল। [সুত্র ১, সুত্র ২]। ওয়েল, আসলে কয়েক মিনিটের জ্ঞান আসলে কোন জ্ঞান না। কিন্তু আমার মাথায় অন্য বিষয় আসছে। এই জ্ঞান বাবা-মায়েদের জানা থাকলে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইন্ডিয়া, চায়নার কত বাবা-মাকেই না অন্যায় করা থেকে রক্ষা করতো। ;)
* সমকামিতা বিরোধী। কিন্তু বইয়ের রচনাকাল '৭৪ দেখে বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিনা।
এই বইটা কিনতে গেলে সবাই আমতা আমতা করে। কারো টেবিলে বা সেলফে দেখলে হাসাহাসি করে। কিন্তু যৌনতা নিয়ে জানবার আগ্রহ কমবেশি সবার মধ্যেই থাকে। বইটার কথা আগে থেকে অল্পবিস্তর শোনার কারনে সেবা প্রকাশনীর বইয়ে ছাড় চলাকালীন সময়ে ওদের হেডঅফিসে গিয়ে এই বইটা দেখে কিনতে আমার দ্বিতীয়বার চিন্তা করা লাগেনি। পড়ার পরের অনূভুতি থেকে বলতে পারি, সেবা প্রকাশনি বলতে গেলে কখনোই আমাকে হতাশ করে নি। এই বইটাও ঠিক সে রকম হতাশতো করেই নি বরং কাজী আনোয়ার হোসেনের উপর শ্রদ্ধা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বইটা পড়ার আগে বইটা লেখার পিছনের কথা কিছুটা বলে নেয়া উচিত। কাজীদার এক সাক্ষাৎকারে এ বই লেখার পেছনের কথা জানতে পেরেছিলাম। বইয়ের লেখক বিদ্যুৎ মিত্র, যেটা কিনা আসলে কাজীদারই ছদ্মনাম। বইটা কাজীদা লিখেছিলেন তার ছেলের জন্য।
যৌনতা বিষয়ক যেসব কথা কখনোই মা বাবা বা অভিভাবকেরা তাদের সন্তানের সাথে বলে উঠতে পারেন না, কিন্তু সন্তানদের যেসব জ্ঞান বা শিক্ষা দেয়া খুব জরুরী সেসব কথা কে খুবই সহজ বন্ধুত্বসুলভ ভাষায় কাজীদা এ বইয়ে লিখে রেখেছেন। কাজীদার লেখার যাদুই হচ্ছে তার ভাষা বা বাক্যচয়ন ভঙ্গি। পড়তে গিয়ে একমুহুর্তের জন্যও জড়তায় পরতে হয়না।
বইটা বাচ্চা থেকে বুড়ো সবার পড়াটা কেন আবশ্যক সেকথা বলতে গেলে বলতে হয় যে আমাদের দেশে যৌনতা নিয়ে কোন ধরনের সামাজিক,প্রাতিষ্ঠানিক বা পারিবারিক শিক্ষা দেয়া হয় না। তাই বেশিরভাগ সময়েই যৌনতা নিয়ে বাচ্চারা ভুলভাল শিখতে শিখতে বড় হয়। এইসব ভুল ধারনা এবং অবদমিত কামনা আর কুশিক্ষার কারনে যৌনতা নিয়ে মানুষের মনে যে অন্ধকার ফ্যান্টাসির জন্ম হয় তার ফলশ্রুতি হচ্ছে দেশে যৌনবিকৃতি, নিপীড়ন আর টিজিং বৃদ্ধিপাওয়া। যে ব্যপারটা প্রাণী হিসাবে মানুষের জৈবিক চাহিদা সেটা সম্পর্কে জানাশোনাকে যখন ট্যাবুতে পরিনত করা হয় তখন পরিস্থিতি খারাপ বৈ ভালো হয় না।
বইটা বেশ অনেক বছর আগের লেখা। এরপরে যৌনতা বিষয়ক জ্ঞান বিজ্ঞানের আরো অনেক অগ্রগতি হয়েছে, পরিবর্তনও হয়েছে। কিন্তু জানার শুরুটা করবার জন্য বা সাধারন জ্ঞানের জন্য এ বই এখনো যথেষ্টই ভালো উপকারি। তাই রাস্তায় বিক্রি করা কামসূত্র বা চটি বই অথবা ইন্টারনেটের পর্নোগ্রাফি থেকে ভুল শিক্ষা নেয়ার আগেই বাচ্চাদের সঠিক ব্যাপারটা জানায় আগ্রহ তৈরি করার জন্য এবই যথেষ্ট ভালো।
নিঃসন্দেহে প্রসংশনীয় উদ্যোগ। বাংলা ভাষায় এ ধরনের বইয়ের সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু বইটা বাচ্চাদের জন্য লেখা বলা হলেও পড়ে তেমনটা মনে হয় নি। খুব সংক্ষেপে অনেক বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে।
প্রতিটি মানব সন্তানের বয়সের সাথে সাথে শারীরিক কিছু পরিবর্তন এবং এ পরিবর্তনের সাথে মস্তিষ্কের সমন্বয় সাধনের ফলে কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশেন এবং এর সমাধানকল্পে যে সমাধান জানা প্রয়োজন তা আমাদের সমাজে খুবই নিষদ্ধ ও খুব খারাপ মনে করা হয়। আলো, বাতাস, বায়ু,পানি, খাবার, মলমূত্রত্যাগ মানবজীবনে যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি জন্ম রহস্য ও যৌনতা সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান থাকা খুবই প্রয়োজন।
আমাদের শিক্ষা জীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং জটিল বিষয়গুলো শিক্ষক বা পরিবারের বড়দের সহায়তায় খুব সহজে বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে ও শিখতে পারি কিন্তু তার চেয়ে যে বড় বিষয়, অর্থাৎ যে বিষয়গুলো আমাদের শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অঙ্গের সাথে সম্পৃক্ত অর্থাৎ আমাদের জন্ম রহস্যের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত যা আমরা কখনোই পরিবারের বিশেষ করে মা বাবার কাছে জানতে চাইনি বা তারাও কখনই কোন সময় বলিনি। তার ফলে আমাদের মনের গহীনে জাগ্রত হওয়া বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরের জন্য বিভিন্ন উৎসের দ্বারপ্রান্ত হয় যা পরবর্তীতে হিতে বিপরীত হয়। কিন্তু এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তরগুলো যদি বাবা-মার কাছ থেকে জানতেও শিখতে পারে তাহলে এই বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞতা যেমন দূর হবে এবং একই সাথে তার সাথে সম্পৃক্ত নানাবিধ অপরাধ যেমন ধর্ষণ, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক, সমকামিতা ও অজাচার এর মত গুরুতর পাপ ও অস্বাস্থ্যকর বিষয় সম্পর্কে জানতে ও সচেতন হতে পারবে।
বিদ্যুৎ মিত্র "যৌন বিষয়ক প্রাথমিক জ্ঞান " বইয়ের মাধ্যমে মূলত যৌনতা বিষয়ক প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কার এবং মিথ গুলোকে খন্ডন করেছেন এবং একই সাথে এর যথাযথ বিষয়ের প্রাথমিক জ্ঞান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন যা প্রতিটি মানুষেরই খুবই জানা প্রয়োজন।
মানুষের জীবনে কৈশোর,যৌবন ও বার্ধক্য পর্যায়ক্রমে আসে। এই সময়গুলোতে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন দেখে আমরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু মানব শরীর সম্পর্কে কিঞ্চিত জ্ঞান যদি আমাদের সংগ্রহে থাকে তবেই আমরা প্রতিকূলতায় ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার হাত থেকে বেঁচে যেতে পারি। এই বইয়ে আলোচিত বিষয়গুলো আমাদের কৈশোর জীবনে কৌতূহলের হলেও বড়দের জন্য এগুলোর আলোচনা লজ্জাজনক। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি যেমন মানুষের তুমুল আগ্রহ থাকে তেমনই শারীরিক এই পরিবর্তন সম্পর্কে জানার ইচ্ছা কোথাও থেকে না মিটলে তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে, অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়ে। যৌনজীবনের শারীরিক পরিবর্তনজনীত প্রস্তুতি নিতে বড়দের এগিয়ে আসতে হবে।অথচ এই বিষয়গুলোকে ট্যাবু হিসেবে বিবেচনা করে লুকিয়ে রাখা হয়। পরবর্তীতে যখন আমরা জীবনের এই ধাপগুলো অতিক্রম করতে যাই সঠিক ধারণার অভাবে তখন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। যৌনশিক্ষা প্রতিটি মানুষের জন্য পরবর্তী সময়ের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক , যেহেতু সবাই সুখী দাম্পত্য জীবন যাপন করতে চায়। এই বইয়ে সেইসব বিষয় ও প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে যেগুলোর মুখোমুখি আমরা একদিন অবশ্যই হবো। নিজের সম্পর্কে জানা খারাপ নয়; তথাপি ভুল ধারণা আমাদের পরবর্তী জীবনে বিপদে ফেলবে,অসুখী করবে। এই বইয়ের শেষ অংশ 'বার্ধক্য' । আমরা মানি বা না মানি যথাসময়ে বার্ধক্য হাজির হবে। একদিন যে শরীরের রূপ ও প্রাণশক্তি নিয়ে বড়াই করতাম সেসময় বার্ধক্যের কাছে আমাদের নতজানু হয়ে সর্বস্ব দান করতে হবে।এই অমোঘ সত্য সম্পর্কেও আমাদের এখন থেকেই জানতে হবে। এই বইয়ে আলোচিত বিষয়গুলো মা ও ছেলের মধ্যে হচ্ছিল।যদিও পুরো অংশ জুড়ে একবারও মনে হয়নি মা তার ছোট ছেলেকে যৌনশিক্ষার খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন।কেননা বইতে অনেক বিষয় খোলামেলা অথচ সীমার মধ্য থেকে আলোচিত হচ্ছিল। যারা বলে সময় হলেই আমরা আশেপাশের পরিবেশ থেকে সব শিখে ও জেনে নিব ,তারা ভুল। বাইরের জগৎ থেকে আমরা হয় আংশিক নতুবা ভুল ধারণায় লাভ করি। তাই সুখী জীবনের প্রয়োজনে এই বই সঠিক সময়ে হাতে নেওয়া উচিত বা দেওয়া উচিত। কিছু বই আনন্দের জন্য পড়তে হয়, কিছু সময় কাটানোর জন্য । কিন্তু এই বই শুধুমাত্র জীবনের প্রয়োজনে বুঝে পড়া উচিত।
সন্তানকে যৌনতা বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান দিতে এবং নিজেদেরও অনেক ভুল ভ্রান্তিকে দূর করতে চাইলে এই বইটি অবশ্য পাঠ্য। বইটিতে কিছু অবৈজ্ঞানিক ও বর্তমানে বাতিল বিষয় রয়ে গেছে, যেহেতু অনেক পুরোনো বই। বর্তমান সময়োপযোগী একটি নতুন সংস্করন আনলে সমাজের জন্য মঙ্গলময় হবে।