দীপেন ভট্টাচার্য তাঁর গল্পের সঙ্গে পাঠকের মেলবন্ধন ঘটাতে পারেন অনায়াসেই। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে তিনি এক রহস্যময় জগতের অবতারণা করতে চান, যার রহস্যের সমাধান কখনো হয় প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকে অবলম্বন করে কখনো হয় মনোজগতের বিশ্লেষণের আলোকে। তাঁর অনেক গল্পেই রয়েছে দৈনন্দিন বাস্তবতার মাঝে চমকপ্রদ ঘটনার উপস্থিতি, তাই তাঁকে শুধুমাত্র বিজ্ঞান কল্পকাহিনির লেখক বলে সীমায়িত করা সংগত নয়। তাঁর কাহিনির স্থাপত্য নির্মিত হয় সময়ের কাঠামোয়, সময়ের অন্তর্নিহিত বোধ অবলম্বনে। আর এই বইটির গল্পগুলোয় পরাবাস্তবতা ও সমকালীন দ্বান্দ্বিকতার মধ্য দিয়ে তিনি পাঠককে আহ্বান করেছেন সেই সময়ের প্রকৃতিকে বুঝে নিতে
এই গল্পগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত হয়েছে (Facebook, art.bdnews24.com, galpopath.com, mukto-mona.com, প্রথম আলো, randomworldtravel.com, জিরো টু ইনফিনিটি, আকাশগঙ্গা), অনেকেরই পড়া, এখানে এক করে রাখা হল।
দীপেন (দেবদর্শী) ভট্টাচার্য (Dipen Bhattacharya) জ্যোতির্বিদ, অধ্যাপক ও লেখক। জন্ম ১৯৫৯ সালে। আদি নিবাস এলেঙ্গা, টাঙ্গাইল। ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল, নটরডেম কলেজ ও ঢাকা কলেজে পড়াশুনা করেছেন।
মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ম্যারিল্যান্ড-এ নাসার (NASA) গডার্ড স্পেস ফ্লাইট ইনস্টিটিউটের গবেষক ছিলেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে (ইউসিআর) গামা রশ্মি জ্যোতি জ্যোতিঃপদার্থবিদ হিসেবে যোগ দেন। মহাশূন্য থেকে আসা গামা-রশ্মি পর্যবেক্ষণের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে বায়ুমণ্ডলের ওপরে বেলুনবাহিত দূরবীন ওঠানোর অভিযানসমূহে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করছেন ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড কমিউনিটি কলেজে; এছাড়া পদার্থবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে অধ্যাপনা করছেন ক্যালিফোর্নিয়ার মোরেনো ভ্যালি কলেজে। ১৯৭৫ সালে তিনি বন্ধুদের সহযোগিতায় ‘অনুসন্ধিৎসু চক্র’ নামে একটি বিজ্ঞান সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৬-২০০৭ সালে ফুলব্রাইট ফেলো হয়ে ঢাকার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। বাংলাদেশে বিজ্ঞান আন্দোলন ও পরিবেশ সচেতনতার প্রসারে যুক্ত।
পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা ছাড়াও বাংলা ভাষায় তাঁর বিজ্ঞান-কল্পকাহিনিভিত্তিক ভিন্ন স্বাদের বেশ কয়েকটি ফিকশন বই প্রকাশিত হয়েছে।
"আপনারা পাঠকেরা যারা এই কাহিনি পড়ছেন, ...... আপনাদের ঘরে যদি সেকেন্ডের কাঁটাসম্পন্ন কোনো দেয়ালঘড়ি থাকে সেটা খুব ভালো করে খেয়াল করুন, সেই কাঁটা কি সত্যিই সামনের দিকে ঘুরছে? আপনি কি সত্যিই কোনটা ভবিষ্যৎ আর কোনটা অতীত সেটা বুঝে নিতে পেরেছেন? হয়তো আপনার জীবনে যা ঘটার ছিল সবই ঘটে গেছে। আপনি এখন যেটা ভবিষ্যৎ ভাবছেন, যেটা সময়ের প্রবাহে সংঘটিত হবে ভাবছেন, সেটা ইতিমধ্যে হয়ে গেছে, আর এখন আপনি একটা অদ্ভুত অপার্থিব খাঁচায় বন্দি, যার থেকে বের হবার কোনো উপায় নেই।"
"মাউন্ট শাস্তা" গল্পে বলা কথাগুলো পুরো বইয়ের জন্যই প্রযোজ্য। কয়েকটা গল্প পড়ে মাথা ভনভন করে ঘুরে উঠতে পারে (যেমন - মাউন্ট শাস্তা, বার্ট কোমেনের ডান হাত, প্রজাপতির স্বপ্ন।) মানুষের চিরচেনা সময়ের ধারণা আর প্রত্যক্ষণ নিয়ে সচেতনভাবে খেলেছেন দীপেন ভট্টাচার্য। আমাদের জগৎকে আক্ষরিক অর্থেই উল্টেপাল্টে দিয়ে যেন গভীর কোনো যাত্রার সঙ্গী করেছেন লেখক- যেখানে বুদ্ধি আর স্বাভাবিক বিচার বিবেচনা কাজ করে না। গল্পের জনরাও দুমড়ে মুচড়ে দেন লেখক।বিজ্ঞান কল্পকাহিনি পড়ছি নাকি পরাবাস্তব কোনো গল্প-তা ভেবে মাঝেমধ্যেই ভ্রম হয়। আর গল্পগুলো, বিশেষত "নিয়ন বাতি" পড়তে পড়তে একসময় নিশ্চুপে পাঠকের মনে বিষণ্ণতা ভর করে। মৃদু,নিশ্চুপ অথচ সর্বগ্রাসী সে বিষণ্ণতা।
বইটা পড়া শেষ করেছি ২ দিন আগে... খুব ভালো বই পড়ার পর মনে হয় একটু বিশ্রাম নেয়া খুব জরুরী, পাঠ প্রতিক্রিয়া জানানো কিংবা নতুন কোন বই ধরার আগে এই বিশ্রাম জরুরী, এই বিশ্রাম অবশ্য বিশ্রাম না, নিজের মতো চিন্তা করার জন্য নিজেরই তৈরি করা আর্টিফিশিয়াল একটা স্পেস। আমার পড়া এটা দীপেন ভট্টাচার্যের দ্বিতীয় বই। প্রথম বইয়ে যে উচ্ছ্বাস জন্ম নিয়েছিল মনে, এই বই পড়তে পড়তে তা নিঃসন্দেহে হয়েছে দ্বিগুণ।
পাঠককে কম্ফোর্ট জোন থেকে বের করে আনাই যেন দীপেনের গল্পের মূল উদ্দেশ্য, অনুষঙ্গ হতে পারে সায়েন্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, ম্যাজিক রিয়েলিজম কিংবা মিষ্টিক থ্রিলার... অনুষঙ্গ যাই হোক না কেন, গল্পগুলো কোন না কোনভাবে নিশ্চিত প্রভাব বিস্তার করে পাঠকের মনে। বার্ট কোমেনের ডান হাতে তাই আমরা দেখতে পাই মস্তিষ্কের কোষ, কখনও হাইকিং করতে গিয়ে চলে যাই অন্য কোন সময়ে কিংবা পুরনো বাড়িতে ফিরে গিয়ে আমরা হালকা হয়ে যাই যেন আমরা হাওয়াই মিঠাই, যেন আমরা সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি। দীপেনের গল্পের ভাষা সহজ, কিন্তু ক্যাচি... পাঠককে পরগাছার মতো জড়িয়ে ধরার মতো সব উপকরণই আছে দীপেনের স্টোরি টেলিংয়ে... আর প্লটে আছে অমীমাংসিত ধাঁধা... ফলে বই শেষ করার পর আপনার মনে হতে পারে, ২ দিনের জন্য বিশ্রাম নেয়া খুব দরকার, মনে হতে পারে, এখন সময় নিজের মতো করে চিন্তা করার...
৪.৫/৫ মাঝেমধ্যেই ভাবি, দীপেন ভট্টাচার্যের লেখার সঙ্গে এতটা একাত্ম হয়ে ওঠার মূল কারণটা আসলে কী। তাঁর লেখায় এমন কী উপাদান আছে যা অন্যান্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনী থেকে উচ্চরবে আলাদা করে! নিজস্ব জ্যোতির্বিজ্ঞানী পরিচয়ের কারণেই কি তাঁর লেখায় বাস্তববিজ্ঞানের দৃঢ় উপস্থিতি থাকে যা কল্পনাকে করে তোলে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য? সেসব আলোচনায় যেতে ইচ্ছে করে না। আমি কেবল বুঁদ হয়ে উল্টে যাই পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা আর পড়তে পড়তে ভাবি- এমন ঘটনা কি ভবিষ্যতে সত্যি সত্যিই ঘটতে পারে!
ধরুন, বিমানযাত্রায় আপনার পাশের সিটে বসা শ্বেতকায় মার্কিন ভদ্রলোক আপনাকে বললেন তার ডান বাহুর চামড়ার নিচের কোষগুলি আসলে মস্তিষ্কের। কিংবা ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত মাউন্ট শাস্তার খাড়াই পাথুরে পথ ভেঙ্গে উপরে উঠতে গিয়ে দেখলেন অবিকল আপনার মতো দেখতে কেউ একজন সেই খাড়াই পথের দিকে না তাকিয়েই নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে! অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার না? এই গল্পগ্রন্থের প্রায় প্রতিটা গল্পই এমন সব অদ্ভুত বিষয়ের ওপর ভর করে গড়ে উঠেছে।
'বার্ট কোমেনের ডান হাত' গল্পে চরিত্রগুলোর গভীরতা ও কাহিনীর মোচড় একে সংকলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প করে তুলেছে। 'প্রজাপতির স্বপ্ন' গল্পটি একদিক দিয়ে বিজ্ঞানের মোড়কে এক দার্শনিক জিজ্ঞাসা- বাস্তবতা আসলে কী? স্বপ্ন আর বাস্তবের দোলাচলে থাকা এই গল্পের শেষটুকু পাঠকমনকে ধাক্কা দেয় বেশ জোরেশোরেই। নারীর সামাজিক অবস্থান ও ভবিষ্যতের এক ভিন্ন বাস্তবতা নিয়ে লেখা 'তৃতীয়া' শিরোনামের গল্পটি আমার দৃষ্টিতে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি লেখা। আকারে বইয়ের দীর্ঘতম গল্পটির নাম 'মাউন্ট শাস্তা'। এ গল্পে লেখক আমাদের পরিচয় করান সময়ের বিপরীতমুখী স্রোতের সাথে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে। গতি ধীর হলেও রহস্যময় আবহ ধরে রাখার দরুন শুরু থেকে শেষ অবধি দারুণ উপভোগ্য হয়ে ওঠে এ গল্পটিও।
সবশেষে, বইতে আমার সবচেয়ে পছন্দের গল্পটি নিয়ে কিছু না লিখে প্রতিক্রিয়া শেষ করতে চাই না। গল্পটির নাম 'নিয়ন বাতি'। শহুরে জীবনের এক গল্প যেখানে বিজ্ঞানের আংশিক ছোঁয়া থাকলেও এর মূল আকর্ষণ মানুষের মনস্তত্ত্ব। সম্পর্কের জটিলতা আর নিঃসঙ্গতার যে ছবি এই গল্প আঁকে, তার রেশ গিয়ে শেষ হয় এক অদ্ভুত শূণ্যতায়।
শুধু বিনোদনের খোরাক হিসেবে নয়, দীপেন ভট্টাচার্যের প্রতিটা লেখাকে আমি দেখি চিন্তার পরিধি বাড়ানোর উৎস হিসেবেও, যা পাঠকসত্তাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। গল্পগ্রন্থ 'নিস্তার মোল্লার মহাভারত' এবং উপন্যাস 'দিতার ঘড়ি'র চেয়ে খুব বেশি পিছিয়ে রাখব না তাঁর এই গল্পগ্রন্থকে। আর হ্যাঁ, নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ একটু বেশিই সুন্দর।
রেটিং - ৪.৫ আপাতত বলার মত কিছু পাচ্ছি না। কিছু কিছু গল্পের রেশ এখনো রয়ে গেছে। একটু থেমে কিছুদিন পর হয়তো কিছু লিখবো। এই বইটাকে শুধুমাত্র কল্পবিজ্ঞান এর বই বলা একেবারেই উচিৎ হবে না। যারা একটু গতানুগতিক গল্পের বাইরে কিছু ইন্টারেস্টিং কনসেপ্টের গল্প পড়তে চান, তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য। এখন লেখকের "নিস্তার মোল্লার মহাভারত" শুরু করবো। তারপর "নক্ষত্রের ঝড়" পড়বো। লেখকের ম্যাগনাম ওপাস "দিতার ঘড়ি" সবার শেষে পড়বো।
একে তো বইটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি । তার উপর খুব কাছের বড় দা’র লেখা । একটা বই ভাল লাগতে আর কি ই-বা ���াগে ? কিন্তু না, বইয়ের প্রত্যেকটি গল্প এক একটি অনবদ্য সৃষ্টি । আমি এমনিতেই দীপেন দা’র লেখার ভক্ত । প্রত্যেকটা গল্প যেন ‘শেষ হইয়াও হইলনা শেষ’ ধাঁচের । গল্প শেষে এক ধরনের ভাবনা ধরে বসে । আর কি হতে পারত; আর কি হতে পারে ? যেন আমার আশে-পাশে দেখতে পাচ্ছি ঘটনাগুলো আবার ঘটতে যাচ্ছে । চরিত্রগুলো, ঘটনাগুলো বই থেকে উঠে এসে যেন আমার সময়, কাল এবং অভিজ্ঞতাকে আচ্ছন্ন করে নিচ্ছে বা বলা যায় এক ধরণের দখল নিয়ে নেয়া ।
বই-এ যে গল্পগুলো আছে তাদের সমন্ধে দুই-এক লাইন করে লিখলেই কেউ আর পড়ার লোভ সমালাতে পারবে না আশা করি । (এখানে হাঁসির ইমো আছে – হি: হি:)
* বার্ট কোমেনের ডান হাত – যে গল্পের নামে বইয়ের নাম । ধরুন আপনার ডান হাতে মস্তিষ্কের ডান হাত চালানোর স্নায়ু কোষগুলো বা নিউরণ-কে প্রতিস্থাপন করে দেয়া হলো । কি ঘটবে আন্দাজ করতে পারছেন ?
* প্রজাপতির স্বপ্ন – আমি স্বপ্ন দেখলাম যে আমি রঙিন প্রজাপতি, ঘুরে বেড়াচ্ছি ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় । ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখি আমি মানুষ । নাকি আমি আসলেই প্রজাপতি যে কিনা ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখছে যে সে মানুষ ।
* মাউন্ট শাস্তা – দশ বছর আগে বন্ধুর সাথে কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলেন । আজ সে বন্ধু নিখোঁজ । ঠিক দশ বছর পর আবার সেই স্থানে গিয়ে যদি আপনার বন্ধুকে দেখেন ক্ষণিকের জন্য যে পেছন দিকে যাচ্ছে, তার বয়স দশ বছর কম, কেমন হবে ব্যাপারটা ?
* কাপ্রির নীল আকাশ – দুশো কোটি বছর পর পৃথিবী দেখতে কেমন হবে ? পৃথিবীর মানুষই-বা কেমন হবে দেখতে ? কি করবে সে মানুষ ?
* প্রতিসরতি প্রতিবিম্ব – আপনি আপনার অনুজ প্রতিলিপির সম্মুখীন হলে কি করবেন ?
* তৃতীয়া – জীবনের কিছু জিনিস হয়তো যুক্তি দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয় । তুমি গথিক গল্পের কথা জানো, যে গল্পের মাঝে বিভীষিকা ও প্রেমের রোমাঞ্চ এই সঙ্গে বর্তমান । ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, এডগার এলান পো ইত্যাদি ।
* নিয়ন বাতি – সময় মানুষকে দিয়ে সব কিছু করিয়ে নেয় স্বার্থপরের মতো । আর মহাশক্তিশালী মানুষ আমরা সময়ের বাঁধনে আবদ্ধ, ইশারায় চালিত ।
* নিওলিথ স্বপ্ন – দশ হাজার বছর আগে কোন এক গুহামানব দেখে এক বিমান উড়ে যেতে !
১/ বার্ট কোমেনের ডান হাত - বেশ ভাল! সাইন্স অনেক ভাল (আর বায়োসাইন্স, বাংলায় এরকম দেখি নাই আগে), আর টুইস্ট গুলাও খুব ভাল। গল্পের স্টাইলড়টাও ভাল, একটু অন্যরকম-কয়েকটা নামের ভিতর দিয়ে আগায় যে- এইটা এমনিতে অনেক নতুন কিছু এরকম না, সিকোয়েন্সগুলা কে ১, ২, ৩ দিয়ে আলাদা না করে মানুষের নাম দিয়ে আগানো হইসে, কিন্তু ওইযে টুইস্টগুলার সাথে এই ব্যাপারটার কানেকশন আসে- যার জন্য এইটা বেশ ইন্টারেস্টিং। ভাষাটাই আরেকটু ভাল হইতে পারত খালি-কিন্তু এত চাওয়ার মানে নাই তো কোনো।
আর বেঙ্গলের বই এর আগে পড়সি কিনা খ্যাল নাই, কিন্তু এইটা বেশ ভাল লাগতেসে- বানান ভুল নাই এইটাই মেইনলি-কী লো এক্সপেক্টেশন আমাদের, আমাদের পাব্লিকেশন নিয়ে! (১/১১/২০)
২/ প্রজাপতির স্বপ্ন - এটাও বেশ ভাল! গল্পের ভিতর গল্প- আর মেমরি/মেমরি লস নিয়ে গল্প, বেশ ইন্টারেস্টিং। মেমেন্টো আর এটারনাল সানশাইন অফ দা স্পটলেস মাইন্ড কে রেফার করে যে, ভাল লাগে। আরও ইনোভেটিভ কি হইতে পারত, এই একই থিম নিয়ে? কি দরকার, এইটাই তো যথেষ্ট ভাল ছিল, আগেরটার মতই। যদিও টুইস্টটা মনে হয় একটু কম হিট করে, কিন্তু ভাল। আর কি মজা যে কয়েকদিন আগেই মেমেন্টো দেখলাম। এটারনাল তো আমার সবচেয়ে প্রিয় সিনেমার একটা, কিন্তু আইরোনিকালি প্রায় কিসুই মনে নাই এখন হাহা। অনেক দিন হইসে দেখসি, ঠিক কখন দেখসি এইটাও মনে নাই ভাল করে-উত্তরায় থাকতে? না কি ক্যান্টনমেন্টে? যাই হোক আরেকটা ইন্টারেস্টিং জিনিস হইলে এই দুইতিনদিন আগে, মেমেন্টো দেখারও ১-২ সপ্তাহ পর, অর্ণব এর এই গানটা ফাইনালি শুনতে গিয়ে দেখি এইটা একটা ফ্যান প্রজেক্ট, কিসের ফ্যান প্রজেক্ট? এই গান অবশ্যই, আর এটারনাল এর! সুন্দর করে মন্তাজ করসে (কি জানি কালেক্ট করসে নাকি অন্য কোথাও, আশা করি -না, মনে হয় না) আর এই গান (এইটা হয়ত শুনার সময় ঠিক তখনও হয় নাই, আর অনেক দিন থেকেই তো একটু রিলাক্স করসি এই দিক, সমস্যা নাই এটা চলুক, আর এই সময় এত খারাপও ছিল না)।--আর প্রজাপতির স্বপ্ন দেখে যেই গল্পের কথা মনে হয়, সেই গল্পই-উইকি ঠিকুজী সহ! আর বেঙ্গল এর বইএর কাগজ, প্রিন্টিং এই সবের কোয়ালিটিও ভাল লাগতেসে, কিন্তু কি জানি একটা এত ভাল লাগে নাই, আঠার কাজ কী, নাকি বই ফরম্যাট? এইটা তো বাংলাদেশের সব বইএর ফরম্যাট, কত আর চাওয়া যায়! ~৩/১১/২০২০
৩/ মাউন্ট শাস্তা - কালকে শেষ করসি। বড় গল্প আর এখন তো সপ্তাহে কয়েক পেইজ পড়া গেলেই অনেক। অনেক দিন লাগলো পড়তে। খুব ভাল। এইটা এত ভাল হবে এরকম মনে হইতেসিল না। কিন্তু এইটা অনেক ভাল, আগের দুইটা থেকেও ভাল। এইটার ক্ষেত্রে ওই নাম ধরে আগানোর ব্যাপারটা খুবই ভাল কাজ করে। খুবই। খুবই। আর মজার জিনিস- তিনজনের কথাই এক ডায়েরিতে লেখা হয়, একজনের পরে আরেকজনের, ঠিক যেই সিকোয়েন্সে থাকার কথা সেই সিকোয়েন্সেই, আর এইটা গল্পের সাথে ভাল যায় মানে, গল্পটাই তো এভাবে যায়। আর গল্পটা ভাল, সাইন্স ও ভাল। এক্সিস্টেন্সিয়াল ব্যাপার স্যাপার নিয়ে বিগ সাইন্স। সবচেয়ে ভাল যেইটা সেইটা হইল- প্রথম থেকে অনেক দূর পর্যন্ত, দ্বিতীয় জনের (পাওলোর) কথারও অনেক দূর পর্যন্ত এক ধরনের সাস্পেনশন অফ ডিসবিলিফ কাজ করে, আর তারপর হঠাৎ করে অন্য একটা রিয়ালিটি শুরু হয়, অন্য এক সাস্পেনশন অফ ডিসবিলিফ, আর এই রিয়ালিটি অনেক রিয়েল, ডিসবিলিফ খুব একটা হয় না যে সাস্পেন্ড করতে হবে। অনেক রিয়েল। অনেক ভাল। আসলেই। বেশ ইম্প্রেসিভ। দিতার ঘড়ি পড়তে হবে। আর নাহ বেঙ্গলের বইও আসলেই ভাল লাগতেসে। এখনও মনে হচ্ছে যদিও কোন একটা সমস্যা আসে, কিন্তু কি সেটা। নাই মনে হয় কোন। লেখা একটু ঝাপসা? এইতা সমস্যা না কোন। লেখা যথেষ্ট পরিষ্কার আসে। শুধু যখন বইটা না দেখে মনে করে লেখার চেষ্টা করি তখন মনে হয় কোন সমস্যা আসে, হাতে নিয়ে পড়ার সময় তো মনে হয় না। এইটা একদম প্রথম দিন হাতে নিয়ে পড়ার সময় যেই ইম্প্রেশন হইসিল সেইটার একরকম ক্যারিঅন এর জন্য মনে হয়। প্রচ্ছদ এর ম্যাট্ম্যাটে ব্যাকগ্রাউন্ড সেই ইম্প্রেশনের একটা কারন হয়ে থাকতে পারে। ~১৬/১১/২০২০
৪/ কাপ্রির নীল আকাশ - খুব সুন্দর। সুন্দর এপ্রোপ্রিয়েট। বেশ কিছুদিন আগে পড়সি (সপ্তাহ খানেক হতে পারে, বেশিও হইতে পারে একটু)। আজকে ২৮-১১-২০। টুইস্টটা ভাল ছিল এইটারও। আর একটা হোমলি ফিল আসে এক রকম। ছোট শহরের গল্প দেখে বোধ হয়। ছোটবেলার ফ্রেন্ড/বান্ধবী, বড় হয়ে বড় শহরে, একবার ফিরে আসে। ভাল।
৫/ প্রতিসরিত প্রতিবিম্ব - বেশি ভাল না। মোটামোটি।
৬/ তৃতীয়া - এইটা কি আগেরটার থেকে একটু ভাল না খারাপ? যেটাই হোক এত ভাল না। মোটামোটি। তবে আগেরটার থেকে ভালই হয়ত। একটু ডিস্কম্ফরট ক্রিয়েট করবে, কিন্তু এইটা তো প্রবলেম না, স্ট্রেংথ বরং। আগেরটা আর এইটা আজকে, ২৮-১১-২০। আর পাব্লিকেশন কোয়ালিটি নিয়ে আজকে ভাবিই নাই, খ্যাল করি নাই, বেশ ভালই। তবে এই রিভিউ লিখার জন্যে নাম গুলা দেখার দরকার ছিল, সূচি দেখতে গিয়ে প্রথম পেজ গুলা খুলেই পুরা মিস্ট্রিটা বুঝতে পারলাম, প্রথম দিকের পেজ গুলা (একদম প্রথম অন্য রঙের মোটা পেইজটা) আঠা দিয়ে কভারের সাথে অর্ধেক লাগানো। প্রথম খুলে তো প্রথম ইম্প্রেশন খারাপ হবেই।
৭/ নিয়ন বাতি - ভাল না। থিনলি ভেইল্ড ওইটা কি? সেক্সুয়ালিটি? আর কি হবে-এইটা প্রবলেম না, ডিস্কম্ফোরটতো ভাল, কিন্তু গল্পটা ভাল না। সাইন্স না থাকাই হয়ত এক কারণ। ���র জনরা মিক্সিং কেমন জানি লাগে- লেজিটিমেট ডিস্কম্ফোরট।
৮/ নিওলিথ স্বপ্ন - সিউডোসাইন্স (আগেরটাতে ছিল অল্প একটু সিউডো-সিউডোসাইন্স) থাকলেও এইটাও ভাল না। শেষের কয়েকটা বেশ ডিসাপয়েন্টিংই ছিল বলতে হয়। ওভারঅল (আগেরগুলার জন্য) ভালই বইটা তারপরও। ৭ আর ৮ আজকে, পরের দিন ২৯-১১-২০। আর এইটাতে বা আগেরটায় একটা বানান ভুল পাইসি, মনে নাই ঠিক কিন্তু হয়ত সারা বইএ এই একটাই- খুবই এক্সেপ্টেবল আর ম্যানেজেবল। কিন্তু বইএর প্রিন্ট একটু লাইট, আরো ডিপ হওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু ভাল পাব্লিকেশন।
দীপেন ভট্টাচার্যের সঙ্গে পরিচয় "দিতার ঘড়ি"র মাধ্যমে। বলাই বাহুল্য, দুর্দান্ত ছিল। তারপর "নিস্তার মোল্লার মহাভারত" পড়ে তাঁর প্রতি মুগ্ধতা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। তিনি জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো গল্পের ছাঁচে ঢেলে সুন্দর, সাবলীল রূপ দেন গুণী ভাস্করের নৈপুণ্যে। তাঁর গদ্য, উপস্থাপনা, এক্সিকিউশন মখমলের স্নিগ্ধ আবেশ বুলিয়ে যায়। এই বইয়ের ৮টি গল্পই অভিনব, ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে।
* মাউন্ট শাস্তা;
* বার্ট কোমেনের ডান হাত;
* প্রজাপতির স্বপ্ন;
* নিয়ন বাতি।
গল্পগুলো বেশি ভালো লেগেছে।
দীপেন ভট্টাচার্য হতাশ করেন না, অন্তত এখন পর্যন্ত করেননি। পরবর্তী গন্তব্য "অদিতার আঁধার"—নতুন এক দীপেন ভট্টাচার্যকে খুঁজে নেওয়ার প্রতীক্ষায় রইলাম।
৪.৫/৫ আগে উনার কল্পবিজ্ঞানের উপন্যাস পড়লেও গল্প এই প্রথম। মারাত্মক সুন্দর গল্প সব। কল্পবিজ্ঞান ছাপিয়ে সুন্দর বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক ছোটগল্প, আবার হাল আমলের পরাবাস্তব থিমে চলে যাওয়া, প্রায় গল্পেই এই ব্যাপারটা দেখলাম। আশ্চর্য হয়ে যাই লেখকের চিন্তাভাবনা দেখে। আর কিছু গল্পে এত্ত সুন্দর টুইস্ট দেয়া, যেনো ওসব ওভাবেই হবার কথা ছিলো। পরিমিত বিজ্ঞান, পরিমিত সাহিত্য, পরিমিত জীবনবোধের অনিশ্চয়তা - সব মিলিয়ে এনাদার দীপেন ভট্টাচার্য মাস্টারক্লাস।
একেবারে অভিভূত হয়ে প্রতিটি গল্প পড়েছি। এতো মুনশিয়ানার সাথে বিজ্ঞান কল্পগল্প বাংলায় আর কেউ বলেছে কিনা- আমার জানা নেই। দীপেন ভট্টাচার্যের গল্পের ভাষা প্রতিটি ফিকশন রচয়িতার মনে ঈর্ষা জাগাবে নিশ্চিত।
দীপেন ভট্টাচার্যর ভক্ত আমি 'দিতার ঘড়ি' থেকে। এই বইটার সব গল্প ভালো লাগে নি, তবে এক 'মাউন্ট শাস্তা' গল্পটাই পয়সা উসুল করে দিয়েছে। দারুণ একটা গল্প ছিল ওটা। বাকি গুলাও খারাপ না খুব।
দীপেন ভট্টাচার্য তাঁর লেখায় সময় আর বিবিধ কাল নিয়ে এক স্বাপ্নিক মায়াজাল বুনন করে সেই নিয়ে খেলা করতে ভালোবাসেন, এই ব্যাপারটি গল্পের মধ্যে রোমাঞ্চকর ভাবে তুলে ধরা এলেবেলে কারো পক্ষে সম্ভব নয়, যেটি তিনি করেন যথেষ্ট মুন্সিয়ানার সাথে। তাঁর লেখা পড়ার সময় তাই যেন ডুবে যাই, একবার শেষ করার পর ফিরে এসে আগের লাইনগুলো আবারো পড়ি.
এই বইটিতে স্থান পেয়েছে কয়েকটি ছোট গল্প, যার প্রতিটি মনের কোঠায় দাগ ফেলবার মতো হলেও সবচেয়ে ভালো লেগেছে বোধ করি "মাউন্ট শাস্তা" গল্পটি।
বইঃ বার্ট কোমেনের ডান হাত ও অন্যান্য কল্পকাহিনি লেখকঃ ডঃ দীপেন ভট্টাচার্য প্রকাশকালঃ ২০১৫ প্রকাশনাঃ বেঙ্গল পাবলিকেশন্স ধরনঃ পরাবাস্তবতা, সময় পরিভ্রমণ, ভবিষ্যতের পৃথিবীর মহাকাশ আখ্যান, সমকালীন মানবমনের বিচিত্রতা সহ বিভিন্ন ঘরানার ৮টি ছোট-বড়ো গল্পের সংকলন।
পাঠ-অনুভূতিঃ
একটু আশাহত; তবে "মাউন্ট শাস্তা" আর "কাপ্রির নীল আকাশ" এ দুই গল্পে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে পতিত হওয়া, তারপর প্রশান্ত চিত্তে তা মেনে নেওয়া, আর ব্যাখ্যার অতীত রহস্যের হাতছানিময় বৈজ্ঞানিক কল্পগল্পের মিশেল থাকায় বইটা ভালো লাগা-না লাগার টানাপোড়েনে উৎরে গিয়েছে।
বার্ট কোমেনের ডান হাত – ২.৮ তারকা (শেষে একটা চমক ছিল।) প্রজাপতির স্বপ্ন – ২.৮ তারকা (ভালোই লেগেছে।) মাউন্ট শাস্তা – ৪.২ তারকা (সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় আর সুন্দর ছিল এ গল্পটা।) কাপ্রির নীল আকাশ – ৩.৬ তারকা (একইসাথে বিষণ্ণতা আর আশার ছোঁয়া ছিল।) প্রতিসরিত প্রতিবিম্ব – ০ তারকা (একেবারেই ভালো লাগেনি।) তৃতীয়া – ১.৮ তারকা (অন্যরকম কাহিনী ছিল, তবে শেষতক রহস্যে ঘেরাই রয়ে গেল।) নিয়ন বাতি – ০.৬ তারকা (খুব একটা টানেনি।) নিওলিথ স্বপ্ন – ১.২ তারকা (খুবই ছোট্ট গল্প; সময় পরিভ্রমণের ইঙ্গিত ছিল।)
বইটিতে মোট ৮টি ছোট গল্প রয়েছে। যার অধিকাংশই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি। ২য়,৩য়,৪র্থ এই ৩টি গল্প অসাধারণ সুন্দর। অনেক ভাবাবে। শুধু এই ৩টি গল্প নিয়ে বইটি হলেও আমার আফসোস হত না। কিন্তু বাকি ৫টি গল্প আমার একেবারেই ভালো লাগেনি। বা হয়ত আমিই বুঝতে পারিনি।