নাম আমার রহমতউল্লাহ,
বাপের নাম কেরামতউল্লাহ,
বাড়ি আমার কুমিল্লা।
একবার খাইবেন,
বারবার চাইবেন,
আমার কাছেই পাইবেন।
মাসের শেষে,
যাইবেন দেশে,
নিয়া যাইবেন কিছু
প্রমি কোম্পানির লিছু।।
ভাবী দিবো হাসি,
বলবো ভালোবাসি
খাইব বেশি বেশি।
দীর্ঘ পাঁচ বছর মৌচাক থেকে অফিস শেষে নাবিস্কো যাবার পথে পরিচিত মুখ রহমতউল্লাহ-র সাথে প্রতি সপ্তাহেই বাসে দেখা হতো, সবসময় আগ্রহ নিয়ে তার ছড়ায় ছড়ায় লিচু বিক্রি করার বিজ্ঞাপন শুনলেও কখনোই কেনা হয়নি প্রমি কোম্পানির লিচু। গন্তব্য বদল হবার পর অনেক কিছুই বারবার মনের কোনায় এসে ধরা পড়বে সেটা অবশ্যম্ভাবী হলেও রহমতউল্লাহকে আলাদা করে কখনো মনে পড়তে পারে সেটা কখনোই চিন্তা বা চেতনায় ছিল না। রহমতউল্লার সাথে চলতি পথে আবার কখনো দেখা হলে, তার কাছ থেকে অবশ্যই প্রমি কোম্পানির লিচু কিনে নেবো।
শুধু রহমতউল্লাহ নয়, চলতি পথে ঘুরতে ফিরতে হরহামেশাই আমাদের চোখে পড়ে বিভিন্ন ফেরিওয়ালা। মনোযোগে না আসলেও কারো কারো হাঁকডাক অজান্তেই মনে যোগ হয়ে যায়; কেউ কেউ আবার সময়ের আবর্তে হারিয়েও যায় দেয়াল থেকে খুলে রাখা ক্যালেন্ডারের মতো। মনে পড়ে ছেলেবেলায় বেগুনী রঙের রঙউঠা কাপড় পরে এক মহিলা প্রতিদিন মহল্লার গলি দিয়ে হেঁটে যেত “ছাই লাগবে, ছাই” বলে চিৎকার করতে করতে। ধীরগতিতে হেঁটে চলা তার পায়ের আঘাতে বেজে উঠা নুড়ি পাথরের আওয়াজ আমাদের কর্ণগোচরে বিরক্তি না ঢাললেও, তার যাবার সময়ে মহল্লার মধ্যে ক্রিকেট খেলাটা একটু বেশি সময় ধরেই থামিয়ে রাখতে হতো বলে তার প্রতি ছিল আমাদের অসীম বিরক্তি। সেই মহল্লা, সেই গলি আজো আছে; আজো সেখানে ছেলেরা ক্রিকেট খেলে; শুধু সেই মহিলার পায়ের আঘাতে নুড়ি পাথরেরা এখন আর গড়িয়ে যায় না।
ফেরিওয়ালাদের এই রকমারি হাঁক ডাক বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে অনেকের কলমে আসলেও শুধু এই বিষয় নিয়ে রচনার জন্য কলম উঠার পরিমাণটা একেবারেই নগণ্য। ফরাসী এবং ইংরেজি সাহিত্যে এ বিষয়ে এন্তার বই বের হলেও বাংলায় প্রথম (এবং এখন পর্যন্ত সম্ভবত একমাত্র) উদ্যোগ ছিল রাধাপ্রসাদ গুপ্তের কলকাতার ফিরিওয়ালার ডাক আর রাস্তার আওয়াজ। বই লিখতে গিয়ে লেখক অনেক বই থেকে রেফারেন্স নিয়েছেন, অনেক পড়াশোনা করেছেন, সেই সাথে নিজের অভিজ্ঞতা থেকেও তথ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন আর পাঠককে করে তুলেছেন স্মৃতি কাতর। এক নিমিষেই মনে করিয়ে দেয় একসময় ঢাকার অলিগলিতেও হাঁক তুলে দাবড়ে বেড়ানো কিছু হকারের কথা, যারা আজ বিস্মৃত প্রায়। ছেড়া ফাড়া বই খাতা, টিনের কৌটা, কাচের খালি বোতল দিয়ে পাওয়া যেত কটকটি, পাওয়া যেত বাঁশের মধ্যে রাখা চিনির দলা, যা দিয়ে বানিয়ে দিতো হাতি ঘোড়া থেকে শুরু করে সবকিছু। কাঠের বাক্সের ডালা খুলে আর বন্ধ করে আওয়াজ করতে করতে চলে যাওয়া সেই আইসক্রিম ওয়ালা। ছোট একটা বাক্স নিয়ে “লেইইইইইইস ফিতা” বলে হাঁক পেড়ে যাওয়া লেইস ফিতা ওয়ালা কিংবা “দাঁতের পোকা ফালাই, বাতের ব্যথা সাড়াই” বলতে বলতে চলে যাওয়া সেই বেদেনী মেয়ের দল। দৃষ্টির এবং স্মৃতির আড়ালে লুকিয়ে পড়া সেই বরফওয়ালা, রোজার মাসে বিকাল থেকে হাঁক পেড়ে ভ্যানে করে বরফ বিক্রি করতে করতে সূর্যাস্তের সাথে সাথে যে হারিয়ে যেতো।
বই পড়তে পড়তে একি সাথে হা হুতাশ আর আক্ষেপটা ও বেড়ে যায় ঘটি-ওয়ালা, রাস্তার মোড়ে মোড়ে কেরোসিনের বাতি কখনো দেখা হয়নি বলে। দেখা হয়নি তপসে মাছ ওয়ালা, শোনা হয়নি সন্ধ্যার আগে আগে তার হাঁক,
"কুড়ি দরে কিনে লই দেখে তাজা তাজা,
টপাটপ খেয়ে ফেলি ছাঁকা তেলে ভাজা।।"
শোনা হয়নি কখনো চাই শাখা, চাই সিঁদুর, চাই ঘোল, চাই মিশি। মিশি একপ্রকারের দাঁতের মাজন যেটা দিলে দাঁত কালো হতো। একটা সময় খুব অল্প কিছু বছরের জন্য সৌন্দর্যের মাপকাঠি ছিলো কালো দাঁত আর দাঁত কালো করার জন্যই ব্যবহার করা হতো মিশি।
"হাঁসের ডিম চাই গো হাঁসের ডিম" ডাক ছাড়তে ছাড়তে ফিরিওয়ালা বলে যেতো ছন্দময় কবিতা,
"রূপেতে মোহিত করে মহিমা অসীম।
সর্ব রোগ নাশ করে এ হাঁসের ডিম।।
সিদ্ধ খাও ভাজা খাও সব দিকে হিত।
ব্যঞ্জন করিয়া খাও আলুর সহিত।।
ঘৃণায় যে নাহি খায় এ হাঁসের ডিম।
মরুক সে চিরকাল খেয়ে তেতো নিম।।
বৃথাই রসনা তার বৃথা তার মুখ।
কোন কালে নাহি পায় আহারের সুখ।।"
এবং সবচাইতে অবাক করা তথ্য ফুল বিক্রি হতো তখন রাস্তায় রাস্তায় ফেরী করে, ঝাঁকাতে করে ফুল নিয়ে। অন্য সব কিছু না দেখার আফসোস যদি খুব বেশি না-ও পোড়ায়, এটা না দেখার আফসোস; আফসোস হিসেবেই রয়ে যাবে। বেলফুল বিক্রেতা ফুল বিক্রি করতো গানে গানে –
বেলফুল ফিরি করি পাড়ায় পাড়ায়।
এ ফুল পরিলে গলে বিরহিদের প্রাণ জুড়ায়।।
আমার দেখা পাবার আশে,
মেয়েরা বসে রয় জানালার পাশে।
ফুলের মধুর বাসে হৃদয় হারায়।।
যদি, পয়সা নাহি থাকে ঘরে,
কিনে নাওনা আজকে ধারে।
কাল না হয় শোধ দিও কড়ায় গন্ডায়।।
তথ্য সমৃদ্ধ এই বইকে আরও আকর্ষণীয় করেছে চমৎকার সব ইলাস্ট্রেশন আর কিছু দুর্লভ ছবি। মাত্র ১০৫ পৃষ্ঠার কিন্তু জানার এবং সংগ্রহে রাখার জন্য চমৎকার একটা বই।