গত কয়েকদিন ধরে ডাকতির নেশায় ধরেছে । আরে নাহ যা ভাবছেন সেই দিনে দুপুরে ডাকাতির কথা বলছি ডাকাত না বলছি তাদের নিয়ে বই পড়ার নেশা ধরার কথা । খগেন্দ্রনাথ মিত্রের "বাংলার ডাকাত" পড়ার পর এই নিয়ে কৌতূহল বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল তারই ফলশ্রুতিতে পড়ে ফেললাম তরুণ কুমার ভাদুড়ীর "অভিশপ্ত চম্বল " । লেখক নিজে সাংবাদিক ছিলেন তাই পেশার খাতিরেই তাকে মিশতে হয়েছে দুর্ধষ সব ডাকাতদের সাথে । খুব কাছ থেকে দেখেছেন ডাকাতদের হাসি কান্না সুখ দুঃখ । উপর থেকে আমরা শুধু দেখি কুখ্যাত ডাকাতের নির্মমতা , তাদের কঠোরতা । কিন্তু তারাও যে আমাদের মত মানুষ । তাদেরও যে নিজস্ব জগত আছে সে জগতে তারাও যে ঠুকরে কাঁদে তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি । সেইসব ঘটনাই তিনি প্রকাশক কয়েছেন “অভিশপ্ত চম্বল” বইয়ে । এক কথায় দুর্দান্ত , অসাধারণ । তিনি যে রকমভাবে দোষে গুণে প্রত্যক্ষ করেছেন এইসব দুর্ধষ ডাকতদের কেউ এইভাবে আর করেনি । বুঝতে চেয়েছেন তাদের ডাকাত হওয়ার কারন । শুনেছেন তাদের কথা । খুব সার্থকভাবেই বলা যায় বইয়ের নাম ছিল একেবারে সার্থক । চম্বল নদী বয়ে চলেছে উত্তরপ্রদেশ আর মধ্যপ্রদেশের মাঝ দিয়ে । এইপাড়ে উত্তরপ্রদেশ ওইপাড়ে মধ্যপ্রদেশ । মাঝখানে বয়ে চলেছে চম্বল নদী । আর চম্বল নদী ধরে মাইল পাঁচেক ধরে গেলে রাজস্থান । চর্মবতী যা কালের বিবর্তনে হয়েছে চম্বল এর দুই পাশের উত্তর আর মধ্য প্রদেশ জুড়ে আছে হাজার হাজার মাইলের পর মাইল “বেহড” । বেহড বাংলায় যাকে বলে গিরিপথ । শত শত বেহড ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চম্বলের দুই কূল জুড়ে । কোন কোন বেহডের উচ্চতা পাঁচশ ফিট পর্যন্ত । শত শত বছর ধরে এই বেহডগুলো জন্ম দিয়েছে হাজার হাজার কুখ্যাত সব ডকাত । আশ্রয় দিয়েছে, পুলিশ থেকে লুকাবার পথ দেখিয়েছে , খাবার দিয়েছে , ডাকাতি করে ডাকাতির মাল সামানা লুকানোর স্থান দিয়েছে । এই বেহডগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে কান পাতলে শুধু একটা কথাই ভেসে আসে “খুন কা বদলা খুন” অর্থাৎ রক্তের বদলে রক্ত । গ্রামের একজন লোক কোন কারনে আরেজনের সাথে বিবাদ ? দিল মামলা ঠুকে । এই সমাজের মানুষের কাছে জেলে যাবার চেয়ে লজ্জার কিছু আর নেই । তাই পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য বেহড আশ্রয় নিল । কিছুদিন পর দেখা গেল কোন একটা ক্ষেতের মাঝে পড়ে রয়েছে সেই মামলা দায়েরকারির লাশ । ব্যাস হয়ে গেল দস্যু জীবনের শুরু । এরপর আর থামা থামি নেই । হত্যা, লুণ্ঠন , রাহাজানি সবই করে নির্বিচারে । কিন্তু যার লাশ ক্ষেতের মাঝে পাওয়া গিয়েছে তার আত্মীয় স্বজনরা কি করে ? দেখা গেল তার ছেলে বা ভাইও চলে গেল বেহডে । “খুন কা বলদা খুন ” । রক্তের বদলে রক্ত যতক্ষণ না পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত সেও ডাকাতি করে বেড়ায় । যে পক্ষ মারা গেলে তার ছেলে । তারপর তার ছেলে তারপর তার ছেলে । এ যেন একটা রি সাইকেল । একটা সাগা । এইভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম শুধু একটা মোটো নিয়ে বেহড কে আশ্রয় করে হয়ে উঠছে কুখ্যাত সব ডাকাত । কেউ তাদের দমাতে পারে না । পুলিশ আর কয়টাকে গুলি করে মারবে ? যতদিন “খুন কা বদলা খুন” মোটো বদল না হবে ততদিন এই ডাকাত তৈরির কারখানার কোন শেষ নেই । চম্বল নদীর এই অভিশাপ এরও শেষ নেই ততদিন । বড়ই অদ্ভুত এই ডাকাতদের মন । একবার যাকে বোন বলে ডেকেছে তার কোন ক্ষতি হয়ে দিবে না। সকল বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করবে । তাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করবে । রাখির দিনে হাতে রাখি পরবে সেই বোনের হাতে । আবার সেই রাখি হাতে নিয়ে অন্য ঘরের আরেকজনের বোনের সম্ভ্রম নষ্ট করতে যাবে । যাকে একবার ভাল লাগবে তাকে টাকা পয়সা ধন দৌলত আর প্রোটেকশন দিবে । আর যাকে ভাল লাগবে না তাকে ঝাড়ে বংশে নির্বংশ করে দিবে । দেখা গেল একজন লোককে ভাই বলে জড়িয়ে ধরছে আর রাতের আঁধারে তার পাশের বাড়ির লোকদের ধরে নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলছে স্রেফ মজা পাওয়ার জন্য বা অনেকদিন কাউকে খুন করেনি সেই জন্য । বইতে লেখক লেখা শুরু করেছে ডাকাতের সর্দার মান সিং কে দিয়ে । কি করে সে ডাকাত হল ? কেন ডাকাত হল ? ডাকাত হওয়ার পর তার কার্যকলাপ ইত্যাদি । মান সিং শুধু নিজে ডাকাত ছিলেন না । তার আধীনে যারা ডাকাতি করেছে সময়ের পরিক্রমায় সবাই পরে এক একজন কুখ্যাত সব ডাকাত হয়েছে । উঠে এসেছে রুপা,কল্লা,লাখন সিং ,অভিলাখ সিং ,লাল সিং, সুলতান, পুতুলীবাঈ,লুক্কা ডাকাতদের কথা । তাদের জীবনের,কথা শুরুর, শেষের কথা । এদের সাথে মিল খুঁজে পাবেন আমাদের দেশের ডাকাদেরও । আমাদের সুন্দরবনের যে সকল ডাকাতদের আমরা দেখি তারাও কি এইসব মান সিং,রূপা, লাখন সিংদের মত নয় ? শুধু একটা কথা “খুন কা বদলা খুন” । এই একটা কথায় রক্তের হলি খেলেছে মান সিং, রুপা,কল্লা,লাখন সিং ,অভিলাখ সিং ,লাল সিং, সুলতান , লুক্কা ডাকাতরা । নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে । এই কথা প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে । অভিশপ্ত চম্বলের অভিশাপ ছিল এরা । কিন্তু সেই অভিশাপ কি এখনো শেষ হয়েহে ? মান সিং ,রূপা, লাখনদের মত লিজেন্ড তার হয়ত হয়নি । তবে তাদের থেকে কমও না । সেই তেরোশ সাল থেকে যে অভিশাপ চম্বল দিয়ে এসেছে তা এই বিংশ শাতাব্দীতেও এসে শেষ হয়নি । যতদিন “খুন কা বদলা খুন” এই কথার নড়চড় না হবে ততদিন রক্তের এই হলি চলবেই । উপরে আমি শুধু ডাকাতদের কার্যকলাপের সামান্য একটু বিবরণ দিয়েছি । স্পেসিফিকভাবে কোন ডাকতের কথা উল্লেখ্য করিনি । কারন তাহলে ঘটনার টানে এসে যাবে তার সাথে জড়িত আরেক ডাকতের কথা । যা এক ছোট রিভিউতে লেখা সম্ভব নয় । বরং আপনরাই জেনে নিন তাদের কথা । আমি শুধু বলে দিলাম কি পরিমাণ ভাল একটা বই “অভিশপ্ত চম্বল” ।
ডাকাতি কি? ডাকাত কিভাবে হয়? সমাজে একজন ডাকাতের ভূমিকা কি? যা বুঝতে পারলাম ডাকাত হওয়ার অন্যতম কারণ প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ। যে সময়ের কথা আমরা বলছি সে সময়ে মানুষ ডাকাত হতো সাধারণত পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য। ধরুন কেউ কারু সাথে কলহে লিপ্ত হলো তারপর সেই কলহের দরুন অপরের কোন ক্ষতি করলো এরপর সে যখন পুলিশের কাছে ধরা খাওয়ার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে তখন শুধুমাত্র নিজেকে রক্ষা করার জন্য ডাকাতের দলে ভিড়ে যেত। কেউ প্রতিশোধ নিতে চায় কিন্তু নিতে পারছে না তখন হয়তো কোন ডাকাত দলের সর্দারের কাছে গিয়ে বললো কি করা যায়! ডাকাতের সর্দার তাকে আশ্বাস দিতো যে তুমি প্রতিশোধ নাও তাহলে আমি তোমাকে নিজের দলে নিয়ে নিবো। তখনকার সময়ে আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করা ছিলো খুব অপমানজনক সুতরাং তাকে ডাকাত হতেই হতো৷ উপন্যাস এটাকে বলা যায় না বরং এটা অনেকটা ডকুমেন্টারির মতো। ডাকাতদের বর্বরতার কথা শুধু এখানে উল্লেখ নেই এখানে ডাকাত হওয়ার পেছনে একজন মানুষের নিজস্ব কারণ গুলোও তুলে ধরা হয়েছে। ডাকাতি করা যে একজন মানুষের জীবনের লক্ষ্য হতে পারে সেটা জানতুম না। দুর্ধর্ষ ডাকাত মান সিং AKA দস্যুরাজ। ঐসময়ে এই লোক প্রচুর ডাকাতি করে ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছে। এমন নয় যে সবাই তার আতঙ্কে অস্থির হয়ে থাকতো। মান সিং নিজেকে এমনভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো যে মানুষরা তাকে ভালোবাসতো। দরিদ্রের রবিনহুড নামে পরিচিত এই ডাকাত ইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে, মন্দির করেছে, মানুষের অনেক উপকার ও করেছে কিন্তু পুলিশদের উপর ছিলো তার দারুণ ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ থেকেই সে একের পর এক হত্যা, লুটপাট, অত্যাচার ইত্যাদি করতে শুরু করে। ডাকাতের দলে যারা মুখবীর ছিলো অর্থাৎ পুলিশের ইনফর্মার তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হতো শুধু এই কারণে যাতে এরকম অপরাধ অন্যকেউ করতে সাহস না পায়। চম্বল উপত্যকার পানি লাল হতো কখনো ডাকতদের রক্তে কিংবা পুলিশের রক্তে। শুধুমাত্র মান সিং এই ডাকাতকথা থেমে থাকে নি। তার পথ অনুসরণ করে একের পর এক বর্বর, দুঃসাহসি ডাকাতরা পুলিশদের খাতায় নিজেদের নাম লিখিয়েছে। এইসব ডাকাতদের মারতে গিয়ে অনেক পুলিশ নিজেদের প্রাণ ও দিয়ে দিয়েছেন। অপরাধ জগতের একটা জীবন্ত অভিশপ্ত অন্ধকার অংশে পাঠককে স্বাগতম। চম্বলের উপত্যকায় ঘুরতে ঘুরতে যদি ক্লান্ত হয়ে কোথাও বসে পড়েন তাহলে খুব সাবধান! ওদের কিন্তু কোন মায়াদয়া নেই
বইটা নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র। অভিযোগটা লেখার ভাষা নিয়ে মূলত, লেখার ধরণ অতি নাটকীয়, পড়লে মনে হয় হিন্দি সিনেমার স্ক্রিপ্ট পড়ছি। অন্যদিকে, এই বইটা (এবং এরপরে একই বিষয় নিয়ে লেখা বেহড় বাগী বন্দুক) ঐতিহাসিক দলিল বলা যায়। এমন এক বিষয় নিয়ে লেখা, যেটা নিয়ে মনগড়া আজগুবি সত্য-মিথ্যা মেশানো অনেক কিছু লেখা হয়েছে পত্রপত্রিকায় (অবশ্যই ভারতের পত্রিকা, গুগলে খুঁজলে অন্য কোন দেশের কোন লেখা খুঁজে পাওয়া যায় না, যেহেতু সমস্যাটা একমেবাদ্বিতীয়ম ধরণের), কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ এবং সরেজমিনে লেখা নেই বললেই চলে। সেদিক দিয়ে এক অদ্ভুত এবং রোমহর্ষক ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে বইগুলো অনন্য।
সমস্যাটার নাম হলো চম্বলের কুখ্যাত খুনে ডাকাত। আমরা সবাই মোটামুটি ফুলন দেবীর নাম জানি, এবং নাটকীয় ও ট্রাজিক ঘটনাপ্রবাহের জন্য ফুলনই নিঃসন্দেহে চম্বলের ডাকাতদের মাঝে সবচেয়ে বিখ্যাত বা কুখ্যাত। কিন্তু ফুলন হলো চম্বলের শত শত বছর ধরে চলে আসা সমস্যার একেবারে শেষ দিকের কাহিনী। দুর্গম গিরিপথ, নদীনালা আর এখানকার বাসিন্দা তোমর রাজপুতদের বংশধরদের অনেকটা সিসিলি বা কর্সিকার অধিবাসীদের মত বংশানুক্রমে খুনের বদলা খুন দ্বারা প্রতিহিংসা বয়ে চলার প্রবণতার কারণে ডাকাতি এবং তারচেয়েও বেশি প্রতিহিংসামূলক খুন-জখম উত্তর ও মধ্যপ্রদেশের প্রশাসনের মোটামুটি চিরস্থায়ী মাথাব্যথা। দুই পরিবারের দু'জন লোকের হাতাহাতি হলো, একজন আরেকজনকে মেরে মাথা ফাটালো, তো শোধ নিতে অপরজন গিয়ে যোগ দিল কোন ডাকাতের দলে আর কয়েক রাত পরে দলবল নিয়ে খুন করে গেল প্রতিপক্ষের একগাদা লোককে। ব্যস, হয়ে গেল দশকের পর দশক জুড়ে খুনোখুনির সূচনা। এরকম কাহিনী চম্বলের গ্রামে গ্রামে।
স্বাভাবিক আইনে কাজ না হওয়ায় পুলিশও এখানে আইনছাড়া; কথা বলার আগে গুলো চালানোই দস্তুর, আর পুলিশ মারাও গেছে এবং যাচ্ছে অনেক। স্পেশাল ফোর্স গঠন, এনকাউন্টার, পরবর্তীতে বাবা বিনোবা ভাবে'র 'হৃদয় পরিবর্তন' প্রচারণা, কিছুতেই যেন এই সমস্যা শেষ হচ্ছে না। এই কাহিনী পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের, ফুলনের জন্মেরও আগের সব ভয়ঙ্কর খুনে দস্যুদের কথা। মুশকিল হলো, একদিকে এসব দস্যুর আতঙ্কে লোকজন দিশেহারা, আবার কোন এক বিচিত্র কারণে এদেরকে বীর হিসেবে পূজাও করে তারা। এর সাথে মিশেছে দারিদ্র, কুসংস্কার, অতীত ইতিহাস, জাতিগত বৈষম্য, সামাজিক অনাচার, গর্ব আর দুর্গম ভূ-প্রকৃতি। সব মিলিয়ে, যদিও এই বই লেখার সময়কালে, মানে ১৯৬০ এর দিকে বড় ডাকাতরা প্রায় সবাই মারা পড়েছে বা ধরা পড়েছে, কিন্তু লেখক ভবিষ্যদ্বানী করেছেন সমাপ্তিতে এসে, যে শত শত বছর ধরে চলে আসা এই অভিশপ্ত ধারা এত সহজেই শেষ হবে না; মাঝে মাঝে স্তিমিত হলেও আবার মাথা চাড়া দেবে। তাঁর সেই ভবিষ্যদ্বানীকে সত্যি করতেই একে একে এরপরে এসেছে নির্ভয় সিং গুজ্জর, ফুলন দেবী, সীমা, জগজীবন পারিহার, এমনকি একদম হাল আমলের সাধনা প্যাটেলের মত দুর্ধর্ষ ডাকাতরা। এরাও প্রায় সবাই মারা পড়েছে বা ধরা পড়েছে, কিন্তু চম্বলের গহন বেহড়ে এর মাঝেই বেড়ে উঠছে নতুন কোন 'বাগী', যার সামনে আদর্শ হিসেবে আছে অতীতের এইসব ডাকুরা। লেখকের মত সেখানকার প্রশাসন আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও সম্ভবত এখন প্রশ্ন, সমস্যাটা কোথায়? চম্বলের বেহড় কি অভিশপ্ত, নাকি সেখানকার সমাজ? সব মিলিয়ে, নাটুকে ভাষাভঙ্গীটুকু হজম করে যেতে পারলে, খুবই আকর্ষণীয় এক ইতিহাসের দরজা খুলে যাবে পাঠকের সামনে। রেটিং সাড়ে তিন।
বিঃ দ্রঃ বইটা ৭ বছর আগে প্রথম দেখেছিলাম চট্টগ্রাম বাতিঘরে, সেবার পকেটে পয়সা না থাকায় কিনতে পারিনি। এরপর চম্বল দিয়ে নিশ্চয়ই অনেক পানি গড়িয়ে গেছে, এবং অনেকগুলো ডাকাত মারা ও ধরা পড়েছে, কিন্তু এই বই আর পাইনি। অবশেষে বাতিঘর এবং সহপাঠক সুখ পাখির কল্যাণে ঢাকায় পাওয়া গেল বইটা। উভয়কেই ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। বাংলাদেশে চাহিদামত বই পাওয়া, বিশেষ করে দেশের বাইরের বই হলে, চম্বলের ডাকাত ধরার চেয়ে কোন অংশে কম কঠিন নয়। বাতিঘর সেই দায়িত্ব খুব নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাচ্ছে বলে তাদের আরেকটা ধন্যবাদ।
"Truth is stranger than fiction" বারবার শুনে কথাটার আবেদন হয়ত কমে যাচ্ছে কিন্তু তাও না বলে পারা যাচ্ছে না "খুন কা বাদলা খুন" মন্ত্রের জোর যে কত বেশি তা ভারতের উত্তর মধ্যপ্রদেশের বেহড়( Ravine) এর ডাকে উতলা হয়ে যাওয়া চম্বল নদী তীরবর্তী ডাকাতদের চেয়ে বেশি বোধহয় আর কেউ জানে না;বলা হয়ে থাকে চম্বলের পানিতেই নাকি কিছু আছে,যাতে জোয়ানরা বাগি হওয়া থেকে নিজেদের ঠেকাতে পারে না, কী দোর্দন্ড প্রতাপ!কী জীবনযাপন! রাখি বন্ধনের দিনে নিজের বোনের কাছে শতবাধা পেরিয়ে আসার সাহস দেখানো,মুখ্যমন্ত্রীর আগমণ উপলক্ষে শুধুমাত্র মুখ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে মানুষ খুন করে নজরানা দেয়া!,তাঁর ক্যাম্পের পাশের গ্রামে ডাকাতি করে চলে যাওয়াসহ কী করে নাই এই ডাকাতের দল; যারা নিজেদের ডাকে বাগি বলে ( বিদ্রোহী); সেই সাথে আছে অনেক চাপা কান্না,অনেক প্রশ্ন যার উত্তর কারো কাছে নেই আসলে... নন ফিকশন যে শুধুই কাঠখোট্টা হয় না বরং বেশ স্বাদুও হয় তা তরুণ ভাদুড়ি এই বইয়ে দেখিয়েছেন... পড়লে ভিন্ন একটা জগত সামনে চলে আসবে...
"നിങ്ങളോ? മൂന്നുപേർ... എന്നിട്ടും മടങ്ങിവന്നു! വെറും കയ്യോടെ!"
രാംഗഢ് ഗ്രാമത്തിൽ നിന്നും ഗുണ്ടാപ്പിരിവിനു പോയി, തോറ്റുമടങ്ങി വന്ന അനുയായികളോടുള്ള കൊള്ളത്തലവൻ ഗബ്ബർ സിംഹിൻ്റെ അലർച്ച.
പേടിച്ചോടിയ അനുചരരെ വെടിവെച്ചുകൊന്നുകൊണ്ട് ഗബ്ബർ പറയുന്നു: "പേടിച്ചാൽ തീർച്ചയാക്കിക്കോളൂ, നിങ്ങൾ മരിച്ചുവെന്ന്!"
അതുവരെ ബോളിവുഡ് സിനിമയിൽ കണ്ടിട്ടുള്ള, നായകപരിവേഷം ചാർത്തി പൊലിപ്പിച്ചെടുത്ത റോബിൻ ഹുഡ് കഥാപാത്രങ്ങളിൽ നിന്നും തീർത്തും വ്യത്യസ്തനായിരുന്നു "ഷോലെ"യിലെ നിഷ്ഠുരനായ ഗബ്ബർ സിംഹ്. ചരിത്രപരമായി വളരെ സത്യസന്ധമായ ഒരു ചിത്രീകരണം. കാരണം, ചംബൽ നദിയുടെ ഇരുവശങ്ങളിലും നിരന്നുകിടക്കുന്ന "ബേഹഡ്" എന്നറിയപ്പെടുന്ന മലയിടുക്കുകളിൽ ഒരുകാലത്തു വസിച്ചിരുന്ന അധികം കൊള്ളക്കാരും ഗബ്ബറിനെപ്പോലെയോ, അതിനെക്കാളേറെയോ ക്രൂരരായിരുന്നു.
അവരുടെ കഥയാണ് "ശപിക്കപ്പെട്ട ചംബൽ" എന്ന പുസ്ത���ത്തിലൂടെ പത്രപ്രവർത്തകനായ ശ്രീ തരുൺ കുമാർ ഭാദുരി പറയുന്നത്. ഇത് ഒരു ചരിത്രാഖ്യായികയല്ല. കൊള്ളക്കാരുമായും, അവരുടെ കുടുംബാംഗങ്ങളുമായും, പോലീസുകാരുമായും ഗ്രന്ഥകാരൻ നടത്തിയ അനേകം സംഭാഷണങ്ങളിലൂടെ ഉരുത്തിരിഞ്ഞ കഥകൾ, ഒരു നോവലെന്ന പോലെ വായിക്കാം. "ഷോലെ" പോലുള്ള അനേകം കഥകൾ ഇതിലടങ്ങിയിരിക്കുന്നു: കൊലയുടെയും ചോരയുടെയും കഥകൾ; വെറുപ്പിന്റെയും പ്രതികാരത്തിന്റെയും കഥകൾ; ധീരതയുടെയും നിഷ്ഠുരതയുടെയും കഥകൾ; കാമവെറിയുടെയും സാഹോദര്യത്തിൻ്റെയും കഥകൾ...
//ശപിക്കപ്പെട്ട ചംബൽ.
പുരാണങ്ങളിലെ ചവതിയാണ് ഇന്ന് ചംബൽ ആയിത്തീർന്നത്. യുഗയുഗാന്തരങ്ങളായി തന്റെ പാട്ടിന്ന് ഒഴുകിക്കൊണ്ടിരിക്കയാണ്. വടക്കുനിന്നു തെക്കോട്ടേക്കല്ല ഒഴുക്ക്. നേരെ മറിച്ചാണ്. തെക്കുനിന്നു വടക്കോട്ട്. മധ്യപ്രദേശത്തിന്നു പടിഞ്ഞാറാണ് 'മാഉ'. അവിടന്നാണ് ചംബലിന്റെ പുറപ്പാട്. പിന്നെ ഉത്തരപ്രദേശത്തേയും രാജസ്ഥാനേയും സ്പർശിച്ചുകൊണ്ട് 800 മൈൽ തിരിഞ്ഞുനോക്കാതെ കുത്തിയൊലിക്കുന്നു. ഉത്തരപ്രദേശത്തുള്ള ഇട്ടാവ എന്ന ഇടത്തിന് അല്പം ദൂരെവെച്ചാണ് ഈ യാത്രയ്ക്കവസാനം. നീലനിറക്കാരി യമുനയുമായി കൂടിച്ചേർന്നു കളയുന്നു.
സർവ്വം നശിപ്പിക്കുന്ന ചംബൽ.
ഇനിയും അവളുടെ ദാഹം ശമിച്ചിട്ടില്ല. പണ്ട് അവളുടെ ജലം ചുകന്നതായിരുന്നില്ല. അവളുടെ തീരത്തു നടന്ന സമരങ്ങൾക്കു കണക്കില്ല. രക്തധാരയുമായി കലർന്നു ചുകന്നതാണ് അവളുടെ നീലജലം, തേച്ചു കൂർപ്പിച്ച വാളുകൊണ്ടുള്ള വെട്ടേറ്റ് അറ്റുവീണ നരമുണ്ഡങ്ങൾകൊണ്ട് ഒന്നുകൂടി ചുകന്നു അത്. എന്നിട്ടും ആറിയില്ല ദാഹം. നിണം വേണം, ഇനിയും വേണം ചുടുനിണം. നിണം മോന്തി മത്തടിച്ച് ആർത്ത് അലറിക്കൊണ്ട് അന്തംവിട്ടവണ്ണം ചംബൽ കുതിച്ചുപോകയാണ്: ഒപ്പം കിട്ടിയ എല്ലാത്തിനേയും പുഴക്കിയെടുത്തുകൊണ്ട്. തീരംപററി നില്ക്കുന്ന വയലുകളേയും ഗ്രാമങ്ങളേയും കുത്തിത്തകർത്തു നാശം വിതയ്ക്കയാണ്. കളിച്ചും ചിരിച്ചും പുളച്ചിരുന്ന ഗ്രാമങ്ങൾ, മരതകം മുറ്റിനിന്നിരുന്ന വയലുകൾ - അവയുടെ സ്ഥാനത്ത് ഇന്ന് അനേകമനേകം ദുർമങ്ങളായ ഗിരിപഥങ്ങൾ മാത്രം. കാലവർഷക്കാറ്റു വീശുമ്പോൾ ഗിരിമാർഗ്ഗങ്ങളുടെ ഹൃദയത്തിൽ നിന്നു നൂറുനൂറായിരം അശരീരികളായ പ്രേതാത്മാക്കളുടെ തേങ്ങൽ കേൾക്കും. ചെറിയൊരു ശബ്ദം ഉണ്ടായാൽ അതിന്റെ പ്രതിധ്വനി ലക്ഷലക്ഷം ദാനവരുടെ അട്ടഹാസം പോലെ മാനം പിളർക്കും. രാത്രിയുടെ അന്ധകാരത്തിൽ എണ്ണമറ്റ പ്രഹരികൾ പതിയിരിക്കുന്ന പോലെ തോന്നും, അവ കൈകാട്ടി ചംബലിനെ വിളിക്കും, "വാ വാ, കടന്നു വാ! നശിപ്പിക്ക്, വീണ്ടും വീണ്ടും, ഇനിയുമിനിയും!" ശപിക്കപ്പെട്ട ചംബലിന് ഈ ആഹ്വാനം കേൾക്കാം: വിനാശത്തിൻ്റെ രാഗം ആലപിച്ചുകൊണ്ട് അവൾ ഒഴുകിപ്പോകും.//
ഇപ്രകാരം ഒരു നദിയെ മനുഷ്യവത്കരിക്കുന്നത് ഒരു പത്രപ്രവർത്തകൻ്റെ കൃതിക്കു ചേർന്നതാണോ എന്നു ചോദിക്കാം. ശ്രീ ഭാദുരി ശൈലി അതാണ് എന്നു മാത്രമാണ് അതിനുള്ള മറുപടി. അതുകൊണ്ട് പലപ്പോഴും ഈ ഗ്രന്ഥത്തിന് ഒരു നോവലിൻ്റേയോ പുരാണകഥാ പുനരാഖ്യാനം ത്തിന്റെയും സ്വഭാവം കൈവരുന്നു. വായനാക്ഷമത വർദ്ധിക്കുന്നു.
രജപുത്രരുടെ ഇടയിൽ പന്ത്രണ്ടാം നൂറ്റാണ്ടിലുണ്ടായ അന്തച്ഛിദ്രങ്ങൾ മൂലമാണ് കൊള്ളസംഘങ്ങൾ തുടങ്ങിയതത്രെ. രക്തത്തിളപ്പുള്ള ഒരു ജനവിഭാഗം "കൊലയ്ക്കു പകരം കൊല!" എന്നാക്രോശിച്ചു കൊണ്ട് കുടിപ്പക തീർക്കാനിറങ്ങി. ബ്രിട്ടീഷുകാർ വന്നു, പോയി; ഇന്ത്യ ഒരു ജനാധിപത്യമായി. എന്നിട്ടും കൊള്ളക്കാർക്കു നേരം വെളുത്തില്ല. അവർ തങ്ങളുടെ പിടിച്ചുപറികളും നരമേധങ്ങളും നിർബ്ബാധം തുടർന്നു. ഒടുവിൽ 1960 ൽ ആചാര്യ വിനോബ ഭാവെയുടെ പ്രയത്നം മൂലമാണ് പലരും മാനസാന്തരപ്പെട്ട് ആയുധം വെച്ചു കീഴടങ്ങിയത്.
നമ്മൾ ചരിത്രപുസ്തകങ്ങളിൽ മാത്രം കണ്ടുമുട്ടിയുട്ടുള്ള പലരേയും അവരുടെ സ്വന്തക്കാരേയും പലപ്പോഴായി നേരിട്ടുകണ്ട് സംസാരിച്ചിട്ടുണ്ട് ശ്രീ തരുൺ കുമാർ ഭാദുരി. ഈ പുസ്തകത്തിന്റെ താളുകളിൽ മാൻ സിംഹ്, പുത്ലീബായി, ലാഖൻ സിംഹ്, ലുക്കാ, കല്ലാ, അമൃത് ലാൽ എന്നിവരെ നാം കണ്ടുമുട്ടും. അവരുടെ ധീരതയെ അഭിനന്ദിക്കുകയും ക്രൂരത കണ്ടു ഞെട്ടുകയും ചെയ്യും. ഈ സാമൂഹ്യവിരുദ്ധരെ അമർച്ച ചെയ്യാൻ ജീവൻ ഉഴിഞ്ഞുവെച്ച രുസ്തംജി, കുയിൻ സായിപ്പ് എന്നീ പോലീസുകാരുടെ അർപ്പണബോധം നമ്മെ അമ്പരപ്പിക്കും. തങ്ങളെ തസ്കരന്മാരായല്ല, സമൂഹത്തിലെ തിന്മകൾക്കെതിരെ പോരാടുന്ന "വിപ്ലവി"കളായാണ് ചമ്പൽക്കൊള്ളക്കാർ കണ്ടിരുന്നത്. ഇതിൽ സത്യത്തിന്റെ ഒരംശമുണ്ട്: നമ്മുടെ അധികാരിവർഗ്ഗവും പോലീസും എന്നും പണവും പദവിയുമുള്ളവൻ്റെ കൂടെയാണല്ലോ. അതുകൊണ്ടാണല്ലോ ചമ്പൽക്കൊള്ളക്കാരുടെ പ്രതാപകാലം അസ്തമിച്ച ശേഷവും ഒരു ഫൂലൻദേവിക്ക് പിറവിയെടുക്കാനായത്.
তরুন কুমার ভাদুড়ীর নাম ছোটো বেলা থেকে মা'র কাছ থেকে শুনে আসতেসি, আর মা মনে হয় তার ছোটো বেলায় পড়সে। উপন্যাস না। আমি অবাক হইসি। একধরনের পারসোনাল হিস্টোরি বেহড়/চম্বলের ডাকাতদের। আরও অবাক হইলাম যে ভাষা নিউট্রাল বা অব্জেক্টিভ তো নাই, বরং অতিরিক্ত সেন্টিমেন্টাল। আর এতো মাইন্ডলেস রিপিটেশন! আর এতো আলগা ইমোশোন এই সব সেন্টিমেন্টাল রিপিটিটিভ গদ্যে! অথচ আমি ভাবতেসিলাম হয়তো হেমিংওয়ে স্টাইলের হবে, বা এরকম কিছু।
আর, সাবস্ট্যান্স এর দিক দিয়েও খুবই গরীব - রাজনৈতিক দের সমালোচনা পর্যন্ত তাই, আর এই সমস্যার রাজনৈতিক অ্যাস্পেক্ট তো দূরের কথা। এর চেয়েও বেশি সমস্যার হইলো এই সমস্যার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট একেবারেই না থাকা! পুরা সমস্যাটাই নাকি একমাত্র ভৌগলিক আর সাংস্কৃতিক (খুন কা বাদলা খুন)! কী শিশুসুলভ চিন্তা আর লেখা! আর এর সমাধান থাক বা না থাক - এই রাজনৈতিক আর আর্থ-সামাজিক দিক গুলা যে অ্যাট লিস্ট একটু অ্যাটেনশন বা চিন্তার দাবি রাখে এর কোনো রিকগনিশনই নাই - কি আশ্চর্য!
যাই হোক তাও ভালো যে শেষ করসি আর এটা পড়া হইসে - অনেক বোরিং লাগতেসিলো প্রায়ই - কিন্তু সব জায়গায় না। অন্যটা পড়বো কি না দেখা যাবে - সন্ধ্যা দিপের শিখা পেলে পড়বো হয়তো (এটার কথাই আসলে এতো শুনসি মার কাছে)।